ছোটগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

❑ সাম্য রাইয়ান 

নীলাব্জ চক্রবর্তীর সেই পোস্ট—
“হাসপাতাল চললাম। সম্ভবতঃ সামান্য কয়েক রাত। জীবনে এই প্রথম। ফলতঃ একটু নার্ভাস। প্রসঙ্গ, লিভার। জানানো হল। বেশী উদ্বিগ্ন হবেন না। আবার হতেও পারেন। যা ইচ্ছা।” (২০-০৯-২৫)

এখন পড়ে মনে হয়, যেন নিজের শরীরের ভেতর ঘনিয়ে ওঠা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলেছিলেন—আমি যাচ্ছি, তবে ভয় পেয়ো না। অথচ আমরা জানতাম না, সেই ভয়ই শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রাস করবে।

১৯ তারিখ সকালে ঘুম ভাঙতেই দুঃসংবাদটি পেলাম। ১৮ নভেম্বর ২০২৫, রাত ১১টা ৪০—কবি নীলাব্জ চক্রবর্তী মারা গেছেন। সংবাদটি যেন হঠাৎ করে ভেতরের কোথাও গভীর ফাটল তৈরি করল। মনে হল, তার ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ যেন এখন অন্য অর্থে ঝলসে উঠছে—তিনি আমাদের খুব আগেই সতর্ক করেছিলেন, অথচ বুঝতে পারিনি।

তার মৃত‌্যু সংবাদ মন প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু যখন উপলব্ধি করতে শুরু করলাম, তখন বুঝতে পারলাম, তাঁর সেই “বেশী উদ্বিগ্ন হবেন না। আবার হতেও পারেন। যা ইচ্ছা।”– বলার ভেতর ছিল এক ধরণের কবি-দৃষ্টির গহন সংকেত, যেখানে মৃত্যু এক ছায়াময়ী দরজা মাত্র, ভীতিহীনভাবে আতঙ্কের সঙ্গে গাঁথা। এবং আজ, তাঁর অনুপস্থিতিতে, সেই দরজা আমাদের জন্য এক অমোঘ অনুরোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে—।

নীলাব্জের কবিতায় প্রায়ই অনুভব হয় সময় ও স্মৃতির এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য — জীবনের ক্ষুদ্র, অভিজাত ফাঁক-ফোকরগুলো তিনি যেভাবে ধরেছেন, তা সাধারণ চিত্র নয়, কিন্তু একটি অন্তরাত্মার মানচিত্র। উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে তাঁর কবিতা “বুকের বরফ / কেমন স্থিতিস্থাপক হল চাঁদে চাঁদে … আমি এই সতর্কবার্তার ভেতর ঢুকে যাচ্ছি…” — এখানে একটি সহজ কিন্তু গভীর অনুভব প্রকাশ পায়: দুঃশ্চিন্তা, অপেক্ষা, সেই অন্তরদৃষ্টির মধ্য দিয়ে “সতর্কবার্তা” শুধু কারণ বা উপাখ্যান নয়, বরং একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো অনুষঙ্গ।

এছাড়া, তাঁর “নিউটাউন” শিরোনামের কবিতায় দেখা যায় কাচ, বাদামী রুটি, পোস্ট-টেনসন তার — সব কিছু মিলিয়ে একটি আধুনিক শহরের ধীর গতির নকশা, যেখানে সময় নিজেই একটা স্বাদ বদলাচ্ছে। ভাষা ও শারীরিক অনুভূতির মিশ্রণ, তাঁর অন্তর্মুখী কণ্ঠকে এক নতুন মাত্রা দেয়।

তার কবিতার পৃথিবীটাকে আরও একটু ধীরে, আরও শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো তাল রেখে দেখতে হবে আমাদের। কেননা অনুভূতির কথা তিনি সশব্দে বলেননি; বরং সে অনুরণন কাগজে বৃষ্টির দাগের মতো লেগে থেকেছে। তার গদ্য, তার ফেসবুকের ছোট ছোট লেখা, আর তার বেড়ে ওঠার ধারাটি—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক “দূরবর্তী আত্মীয়তা”—যাকে চোখে দেখা যায় না, তবু টের পাওয়া যায়। এখন মনে হয়, তিনি আর লিখবেন না, পোস্ট করবেন না, নিজের ভেতরের গানটুকু শোনাবেন না—এটা ভাবতেই শ্বাস আটকে আসে।

নীলাব্জের নিজস্ব ভাষা, স্মৃতির প্রতি তার আন্তরিক নিষ্ঠা, আর বাস্তবকে সবসময় একটু তির্যক দিকে সরিয়ে দেখার অভ্যাস—সব মিলিয়ে তার কবিতা ও গল্পে এক প্রবল অন্তর্জগৎ গড়ে উঠেছিল। সেই অভ্যন্তরীণ উত্তাপে তিনি নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, আর আমরাও তার সেই উত্তাপেই আশ্রয় পেয়েছিলাম।

তার কবিতা এক ধরনের মৌন বোঝাপড়ায় যুক্ত—যেখানে বর্ণনার অধিক আছে অনুভূতির নক্ষত্রমণ্ডলের ভেতর দিয়ে জীবনকে অনুধাবনের চেষ্টা।

তার গল্পেও একই প্রবাহ। তার চরিত্রের কখনো পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না; বরং তারা নিজের অসমাপ্ত রূপেই পাঠকের মনে থেকে যায়। এটি ছিল তার স্বাতন্ত্র্য—অসমাপ্তির মধ্যেই অর্থ খুঁজে নেওয়া।

তার লেখায় শহরের গন্ধ, আলো-অন্ধকারে বসে থাকা কৈশোর, কিংবা ভেঙে যাওয়া প্রেমের অগোচর দগ্ধতা দেখে মনে হয়—তিনি মানুষকে নয়, মানুষের ভিতরের ছায়াকে ধরতে চেয়েছিলেন।চরিত্র তো অনেক লেখকই নির্মাণ করেন; কিন্তু নীলাব্জ চরিত্রের গলিঘুপচি চিনতেন।

তার শেষ দিকের লেখাগুলো পড়লে টের পাওয়া যায়—মানুষ নিজের জীবনকে কত বিচিত্রভাবে বহন করে। অসুস্থতার সময়ে তার ভাষা আরও ধীর ছন্দে রূপ নিতে থাকে, আরও নিবিড় মেদহীন হয়ে ওঠে। মৃত্যু তার কাছে ভয়ের ছিল বলে মনে হয় না; বরং তিনি মৃত্যুকে নিজের মতো করে এক ধরনের অন্ধকার দরজা হিসেবে দেখেছিলেন—যার ওপাশে নিশ্চয় আলো আছে, কিন্তু আমাদের দেখার সুযোগ নেই।

নীলাব্জ চক্রবর্তীর মৃত্যু—এক গভীর প্রয়োজনীয় স্বরের অনুপস্থিতি। এই স্বর তাকে ছাড়া অন্য কেউ তুলে নিয়ে যেতে পারবে না। তিনি যে স্তব্ধতা, যে আলো-ছায়ার পথ রেখে গেলেন—সেটাই এখন আমাদের কাছে আসল উত্তরাধিকার।

তাঁর মৃত্যুতে আমরা শুধু একটি স্বর হারালাম না; আমরা সেই নিঃশব্দ ঘোরটুকুই হারালাম, যা তাঁর প্রতিটি পংক্তি থেকে ধীরে ধীরে স্পন্দিত হয়। আমাদের কাজ অবশিষ্ট সেই স্পন্দনকে ধারণ রাখা, তাঁর বাকি কাব্যকে যত্নের সঙ্গে স্মরণ করা, এবং তাঁর আলো-ছায়ার মানচিত্রে আরেকবার ফিরে যাওয়া।

এমন একজন লেখকের জন্য প্রকৃত শোক লেখা যায় না। শুধু মনে রাখা যায়—তিনি আমাদের জীবনকে একটু বেশি স্পর্শ করতেন, অভ্যন্তরকে আরও সজাগ করতেন, এবং এই কঠিন সময়েও মনে করিয়ে দিতেন—লেখালিখি আসলে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটি ছোট আলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

নীলাব্জ চক্রবর্তী সেই আলোটি রেখে গেছেন। আর আমরা, যারা তাকে পড়েছি, তাকে অনুভব করেছি—আমাদের ভেতরের একটি জানালা আজ শূন্য হয়ে গেল।

২১ নভেম্বর ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান 

আজ শিক্ষক দিবস। এ দিনে শ্রদ্ধার ফুলের চেয়ে বেশি জরুরি প্রশ্ন করা—এই শিক্ষাব্যবস্থায় আসলে আমরা কী উদযাপন করছি? যে দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের প্রথম পাঁচশোর তালিকায় নেই, যে দেশে স্নাতক ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে না, যে দেশে শিক্ষকরা জ্ঞান নয়, প্রশাসনের অনুমোদনে বাঁচেন—সে দেশে শিক্ষক দিবস এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। আমরা উৎসব করছি, অথচ শিক্ষার মান তলানিতে নেমে গেছে। জ্ঞানের চর্চা হারিয়েছে, কেবল ডিগ্রি বেচাকেনা চলছে। শ্রেণিকক্ষ এখন আর চিন্তার ক্ষেত্র নয়, বরং চাকরির প্রশিক্ষণকেন্দ্র। শিক্ষক দিবস তাই উদযাপনের নয়, লজ্জা ও প্রতিবাদের দিন। একদিকে শিক্ষানীতির নামে ব্যবসা, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্ধ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের সংঘর্ষে বাঙলাদেশের শিক্ষা আজ নিস্পৃহ, জীর্ণ, পরাজিত এক প্রতিষ্ঠান।

দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর বলেছিলেন,
 
 “বস্তুত বিদ্যাশিক্ষার অনেক ডিগ্রী আছে, কিন্তু জ্ঞানের কোন ডিগ্রী নেই৷ জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন৷” 
 
অথচ এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য, জ্ঞান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে আজ ‘চাকরি পাওয়ার লাইসেন্স অফিস’। শিক্ষকরা জ্ঞানের অনুশীলক নন, বরং প্রশাসনিক নির্দেশের অনুসারী কেরানি। গবেষণার জায়গা দখল করেছে নকলপত্র, তোষণমূলক থিসিস, এবং পদোন্নতির রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের মুক্ত চিন্তা নয়, বরং আনুগত্য শেখাচ্ছে—ক্ষমতার প্রতি, দাতাদের প্রতি, অথবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি।

বাঙলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনোটি আজও QS World University Ranking বা Times Higher Education Ranking–এর প্রথম পাঁচশোর মধ্যে নেই। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, এমনকি ভিয়েতনাম পর্যন্ত তাদের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। কারণ তারা অন্তত গবেষণা, মৌলিক চিন্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব বুঝেছে। আমরা বুঝিনি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষমতার প্রান্তিক কার্যালয় বানিয়েছি।

শিক্ষার মান পতনের আরেকটি চিহ্ন—দেশের স্নাতক ও ফাউন্ডেশন কোর্সের মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। এমনকি বাঙলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক প্রোগ্রামই WES (World Education Services) বা UK ENIC–এর মানদণ্ডে স্বীকৃতি পায় না। এর মানে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় অকার্যকর। অথচ এই সনদ নিয়েই হাজারো তরুণ-তরুণী বিদেশে গিয়ে ব্যর্থ হয়, অপমানিত হয়। এর দায় কে নেবে?

আজকের শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন একটাই: এই ব্যবস্থায় শিক্ষক বলতে আমরা কাকে বুঝি? যিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, নাকি যিনি প্রশাসনিক চেয়ারে বসে শিক্ষকদেরই দমন করেন? শিক্ষকরা যদি ন্যায় ও নীতির কণ্ঠস্বর না হন, যদি তাঁরা প্রতিরোধের ভাষা রচনা না করেন, তবে তাঁরা শিক্ষার্থী নয়, কেবল পদস্থ কর্মকর্তাদের আনুগত্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন। একসময় যারা মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন, আজ তারা নিজেরাই ব্যবস্থার দাস।

শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির প্রশ্নটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি আর্থিক অনটনে ভোগেন, তবে তিনি মনোযোগ দিয়ে শিক্ষা দিতে পারবেন না। বরং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণে অধিক মনযোগী হবেন, প্রাইভেট পড়াবেন, কোচিং সেন্টার চালু করবেন, গাইড বইয়ের ব্যবসা করবেন, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ থেকে অর্থ লোপাট করার মতো দুর্নীতিতে যুক্ত হবেন৷ সমাজে শিক্ষকের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো তাঁদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা উন্নত করা এবং তাদেরকে রাজনৈতিক গোলাম বানানো বন্ধ করা। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার মর্যাদা যদি শিক্ষকেরা পান, তবে এ পেশা মেধাবীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বাঙলাদেশে প্রতিটি সরকারই শিক্ষানীতি সংস্কারের নামে বিকৃত করেছে। একদিকে বইপুস্তক নির্ভর, মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা, অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগণিত বাণিজ্য—সব মিলিয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটি হারিয়ে গেছে। শিক্ষা আর বিকশিত হবার উপায় নয়, এটি এখন কেবলই চাকরির প্রতিযোগিতার অস্ত্র। আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ক্রমশ কমছে। জাতীয় আয়ের মাত্র ২ শতাংশেরও কম ব্যয় করা হয় শিক্ষায়। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো অন্তত ৫–৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য, পরিবহন, প্রতিরক্ষা খাতে যেভাবে বরাদ্দ বাড়ানো হয়, শিক্ষাকে তেমনি গুরুত্ব না দিলে জাতি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারাবে।

এদেশে শিক্ষা আন্দোলন একসময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে গর্জেছিল। আজ সেই শিক্ষা আন্দোলন কোথায়? শিক্ষক সংগঠনগুলো আজ প্রশাসনের অনুচর, শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আজ রাজনৈতিক অস্ত্র। জ্ঞানচর্চা নেই, কেবল পদলাভের প্রতিযোগিতা।

শিক্ষক দিবসে তাই শ্রদ্ধার ভাষার চেয়ে প্রতিবাদের ভাষাই অধিক প্রাসঙ্গিক। কারণ, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করা মানে শিক্ষাকে রক্ষা করা। আর শিক্ষাকে রক্ষা করা মানে সত্যের পক্ষ নেওয়া, অন্ধ অনুসরণে না গিয়ে বোধের রাজনীতি তৈরি করা। শিক্ষকরা যদি আবার জ্ঞানের অন্বেষণে ফেরেন, যদি তারা শ্রেণিকক্ষকে প্রশাসনিক কক্ষ নয়, বরং মুক্ত চিন্তার মঞ্চে রূপান্তর করেন—তবেই বাঙলাদেশে শিক্ষা পুনর্জন্ম পাবে।

আজকের শিক্ষক দিবস তাই ফুল ও বক্তৃতার নয়, বিবেকের পুনর্জাগরণের দিন হওয়া উচিত। এই দিনে অঙ্গীকার হওয়া উচিত—শিক্ষাকে মুক্ত করব রাজনীতি, বাণিজ্য ও তোষণ থেকে। শিক্ষককে ফিরিয়ে দেব তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা—যিনি কেবল পাঠদানকারী নন, বরং সত্যের অনুসন্ধানী, সমাজবোধের নির্মাতা। শিক্ষা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রতিরোধ করতে শেখায়। শিক্ষক দিবসের আসল উদযাপন সেখানেই—যেখানে শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে নতুন চিন্তার গবেষণাগার, আর শিক্ষক হয়ে ওঠেন আলোর অনমনীয় প্রহরী।

❑ সাম্য রাইয়ান 

বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক কল্পচিত্র থেকে ফেব্রুয়ারি মাসকে বাদ দিয়ে দেখা যায় না। ফেব্রুয়ারির ভোর মানে শহীদ মিনারের পাদদেশে হাজারো কণ্ঠে গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’। ফেব্রুয়ারির বাতাসে আজও শোনা যায় রক্তঝরা পদধ্বনি, ফুলে ভরে ওঠে মিনার, শহীদের স্মৃতি মিলেমিশে যায় বর্তমানের শীতল সকাল আর উত্তাল বিকেলের সাথে। ফেব্রুয়ারি মানে প্রতীকী পুনর্জন্ম—এটি ভাষার, সংস্কৃতির, চেতনার মাস। এই ফেব্রুয়ারির বুকেই জন্ম নিয়েছিল অমর একুশে বইমেলা, যেটি আজ কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, হয়ে উঠেছে জাতির আত্মপরিচয়ের অন্যতম দ্যোতক।

কিন্তু বাংলা একাডেমি হঠাৎ ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালের বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসে নয়, শুরু হবে ২০২৫-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এবং শেষ হবে ২০২৬-এর জানুয়ারিতে। সরকারি যুক্তি—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রমজান মাস। শুনতে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণের এক কুৎসিত ছায়া।

প্রথমে নির্বাচন প্রসঙ্গ। ইতিহাস সাক্ষী, তিনবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হয়েছে—১৯৭৯, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে। অথচ বইমেলার সময় পাল্টাতে হয়নি। নির্বাচনের দিন ছুটি হওয়ায় অনেকেই ভোট দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বইমেলায় গিয়েছেন, ভিড় বরং বেড়েছে। তাহলে কেন এইবার হঠাৎ ভোটের অজুহাত? নির্বাচনের কারণে বইমেলায় ভিড় কমে যাবে—এমন ধারণা বাস্তব অভিজ্ঞতায় ভিত্তিহীন। আসলে এই সিদ্ধান্তের আড়ালে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অযৌক্তিক কর্তৃত্ব এবং মৌলবাদের চাপ, যা ধীরে ধীরে বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনকে গ্রাস করছে। মনে হয় যেন বইমেলাকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের অধীনস্থ করার এক মানসিকতা কাজ করছে—যেখানে সংস্কৃতি আর ইতিহাসের স্বাধীনতা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। 

বাংলা একাডেমি দ্বিতীয় যে অজুহাত দিয়েছে, তা হলো রমজান মাস। বলা হচ্ছে, রোজার মাসে বইমেলা চলতে পারে না। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, এটা একধরনের আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছু নয়। সন্ধ্যার পর ইফতার শেষে মেলায় ভিড় বাড়তে পারত, মানুষ পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত, ইফতারের পর বইমেলার পরিবেশ ভিন্ন মাত্রা পেত। অথচ এই সম্ভাবনাকে আঁকড়ে না ধরে বাংলা একাডেমি মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রমাণিত, মেলায় অস্থায়ী মসজিদ থাকে, নামাজের ব্যবস্থাও থাকে। তাহলে কেন এই ভীতসন্ত্রস্ত মনোভাব? স্পষ্টতই মৌলবাদের প্রতি একরকম তুষ্টির নীতি কাজ করছে। এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; একপ্রকার সাংস্কৃতিক পরাজয়ও।

একটু ফিরে দেখা যাক। ষাটের দশকে চট্টগ্রামে ছোট আকারে বইয়ের মেলা হতো, ঢাকায় বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে লেখক ও পাঠকের মিলনমেলা তৈরি হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাঙলাদেশে বইমেলা প্রকৃত রূপ নেয়। ১৯৭২ সালের পর থেকে এটি ধীরে ধীরে একুশের মাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। আশির দশকে বইমেলা শুধু বই বিক্রির জায়গা থাকেনি, হয়ে উঠেছে মত প্রকাশের ক্ষেত্র, রাজনৈতিক প্রতিরোধের জায়গা। সেনাশাসনের বিরুদ্ধে লেখক-পাঠক-শিল্পীরা বইমেলাকে ব্যবহার করেছেন প্রতীকী প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে। স্বাধীনতার পর বইমেলা হয়ে উঠেছে শহীদ মিনারের এক সম্প্রসারণ—যেখানে বই মানে প্রতিরোধ, বই মানে স্বাধীন চিন্তা। ফেব্রুয়ারির মাটিতে দাঁড়িয়ে বইমেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহীদদের রক্তে লেখা এই ভাষার উত্তরাধিকার বইয়ের ভেতরেই জীবন্ত।

ফেব্রুয়ারি মাসের সাথে বইমেলার প্রতীকী সম্পর্কের প্রশ্ন এখানে মুখ্য। তাহলে বইমেলাকে ফেব্রুয়ারি থেকে সরিয়ে নিলে কী হারাব আমরা? একুশের শহীদ স্মৃতির আবহে বইমেলার অর্থ দাঁড়ায় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। একে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সরিয়ে নিলে তা হয়তো প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভালো হবে, কিন্তু সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এটি হবে আত্মবিরোধী, আমরা হারাব সেই প্রতীকী সংযোগ, হারাব শহীদদের সাথে সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। বইমেলা হয়ে উঠবে শুধু কাগজ আর কালি বিক্রির বাজার। অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি তারিখ নয়, এটি ইতিহাস, এটি প্রতীক, এটি সংগ্রামের উত্তরাধিকার। ফেব্রুয়ারি না থাকলে বইমেলার বুক থেকে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ভয়াবহ—প্রজন্মের পর প্রজন্ম বইমেলাকে কেবল বাণিজ্যিক মেলা ভেবে বড় হবে, তারা আর জানবে না যে ফেব্রুয়ারি মানেই মাতৃভাষার আন্দোলন, শহীদ মিনার, আর বইমেলা একসাথে মিলে এক চেতনার নাম।

আজ যে বাঙলাদেশে মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তার প্রভাব পড়ছে সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর। বাংলা একাডেমি ও বইমেলাও এর বাইরে নয়। একসময় একাডেমি ছিল মুক্তচিন্তার প্রতীক, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা জায়গা। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনিক অজুহাতের আড়ালে মৌলবাদের তুষ্টিতে লিপ্ত। এটা কি কেবল কাকতালীয়? না, এর পেছনে একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা কাজ করছে—যেখানে মৌলবাদীরা চায় সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হোক, মানুষ বই থেকে দূরে সরে যাক, মুক্তচিন্তার জায়গা ধ্বংস হোক। তারা সবসময় চেয়েছে মানুষকে বই থেকে বিচ্ছিন্ন করতে, জ্ঞান ও সাহিত্য থেকে সরিয়ে নিতে। কারণ, বই মানুষের চিন্তাশক্তি জাগায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখায়। মৌলবাদ কখনোই প্রশ্ন পছন্দ করে না; তারা চায় অন্ধ অনুসরণ, চায় চিন্তার বদলে আনুগত্য। তাই বইমেলা দুর্বল করা তাদের পক্ষে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। যদি মানুষ বইমেলা থেকে দূরে সরে যায়, যদি ফেব্রুয়ারির প্রতীকময় সম্পর্ক ভেঙে যায়, তবে মৌলবাদের জয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাদের জন্য এটি সাংস্কৃতিক পরিসর খালি করার এক সুযোগ। বাংলা একাডেমির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে এটি স্পষ্ট যে, মৌলবাদের প্রতি তুষ্টির নীতিই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, বইমেলা অন্য মাসে হলেও কী আসে যায়? বই তো থাকবেই, পাঠক চাইলে আসবেন। কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রতীকী অর্থকে অবহেলা করলে তার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি অগাধ। একুশে ফেব্রুয়ারির আবহের সাথে বইমেলার এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আছে। ফেব্রুয়ারি আমাদের ইতিহাসে শোক, সংগ্রাম ও গৌরবের মাস। এই মাসেই বইমেলা মানুষকে বইয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের সাথে যুক্ত করে, শহীদদের স্মৃতির সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই যোগসূত্র ভেঙে গেলে বইমেলা হয়ে উঠবে কেবল একটি ব্যবসায়িক মেলা, ইতিহাসবিচ্ছিন্ন, আত্মাহীন।

দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কী হতে পারে? প্রথমত, সাংস্কৃতিক চেতনার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাবে। বইমেলা আর একুশের প্রতীক হয়ে থাকবে না। দ্বিতীয়ত, পাঠকপ্রজন্ম বইয়ের সাথে ইতিহাসের যোগসূত্র হারাবে। তৃতীয়ত, মৌলবাদীরা সাংস্কৃতিক পরিসর খালি করার সুযোগ পাবে। চতুর্থত, বাংলা একাডেমি তার ঐতিহাসিক ভূমিকা হারিয়ে কেবল একটি প্রশাসনিক অফিসে পরিণত হবে।

বইমেলার শক্তি সবসময় ছিল পাঠক ও লেখক। কিন্তু এবার লেখক-পাঠক-প্রকাশক, দৃশ্যত সকলের মতকে অগ্রাহ্য করে বইমেলার তারিখ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে এই সাংস্কৃতিক শক্তিকে দুর্বল করার অর্থ হলো দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা। বইমেলা ফেব্রুয়ারি ছাড়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধীরে ধীরে ভুলে যাবে কেন বইমেলা একুশের সাথে যুক্ত ছিল। তাদের কাছে বই হবে কেবল ব্যবসা, আর মেলা হবে কেবল উৎসব—এর ভেতরে আর থাকবে না সংগ্রামের উত্তরাধিকার। এটি শুধু ক্ষতি নয়, এটি সাংস্কৃতিক বিপর্যয়।

বাঙলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস প্রমাণ করে, মৌলবাদকে তুষ্টি করে টিকে থাকা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্রের লড়াই—সবকিছুতে মৌলবাদ ছিল প্রতিপক্ষ। আজ আবার সেই প্রতিপক্ষ সাংস্কৃতিক মঞ্চে প্রবেশ করেছে, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। বাংলা একাডেমি যদি সত্যিই বইমেলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চায়, তবে তার দরকার হবে মৌলবাদের ভয়ে না থেকে বই প্রকাশনা ও বিপণনকে সুশৃঙ্খল করা, লেখক-পাঠকের পারস্পরিক বিনিময়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা, সাহিত্যচর্চাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা। প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাত দেখিয়ে বইমেলার সময় সরিয়ে দেওয়া সমাধান নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, প্রতিষ্ঠানটি তার সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধের চেয়ে প্রশাসনিক সুবিধাবাদিতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এটি সেই আত্মবিরোধী সিদ্ধান্ত, যা কেবল প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নয়, মৌলবাদের জন্য পথ প্রশস্ত করার জন্যও নেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল—বাঙলাদেশ কি সত্যিই এই পথে যাবে? ফেব্রুয়ারির বইমেলা হারানো মানে শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হারানো নয়; এর অর্থ জাতির আত্মপরিচয়ের টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া। শহীদ মিনারের ফুল শুকিয়ে গেলে যেমন আমাদের বুক খালি লাগে, ফেব্রুয়ারি ছাড়া বইমেলা হলে তেমনই আত্মা খালি হয়ে যাবে।

অতএব এখনো সময় আছে—বাংলা একাডেমি চাইলে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বইমেলার মূল শক্তি পাঠক ও লেখক; তাঁদের ইচ্ছা ও অংশগ্রহণকেই সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফেব্রুয়ারি ছাড়া একুশে বইমেলা কল্পনা করা যায় না। এটি কেবল অগ্রহণযোগ্য নয়, সাংস্কৃতিকভাবে আত্মঘাতীও।

ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে শুধু একটি মাস নয়; এটি প্রতিরোধ, ভাষা, আত্মত্যাগ ও সৃষ্টির প্রতীক। একুশে বইমেলা সেই প্রতীকেরই সাংস্কৃতিক রূপায়ণ। ফেব্রুয়ারি ছাড়া বইমেলা মানে আত্মপরিচয়ের বিপর্যয়, ইতিহাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, এবং মৌলবাদের হাতে সাংস্কৃতিক পরাজয়।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত৷

❑ সাম্য রাইয়ান

খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় অষ্টম শ্রেণির এক আদিবাসী কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দমননীতি, নৃশংসতা ও ন্যায়বিচারের অভাবের আরেকটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই ঘটনার ভয়াবহতাকে ছাপিয়ে গেছে যে বিষয়টি—তা হলো, ধর্ষণের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের উপর সেনাবাহিনী ও সেটলার বাঙালিদের যৌথ হামলা। তাহলে বিষয়টি দাঁড়াল এই যে—ধর্ষণ নয়, বরং ধর্ষণ-বিরোধী প্রতিবাদই আজ রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ। এই ঘটনা শুধু একটি কিশোরীর প্রতি বর্বরতা নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার মৃত্যু।

বাঙলাদেশের সংবিধান বলে, সবাই সমান অধিকারভোগী। কিন্তু পাহাড়ে গিয়ে সেই বাক্যটি এক নির্মম ঠাট্টায় পরিণত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী যখন ধর্ষিত হন, তখন তিনি শুধু এক ব্যক্তি হিসেবে নয়—একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রতীক হিসেবে অপমানিত হন। তার শরীরে যে নির্যাতন চালানো হয়, তা মূলত রাষ্ট্রের দখলদারিত্বের ভাষায় প্রকাশিত সহিংসতা। এই ধর্ষণগুলো কেবল যৌন অপরাধ নয়, এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকাশ। পাহাড়ে নারীদেহ দীর্ঘদিন ধরে কি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে—যেখানে অস্ত্রের জায়গায় ব্যবহৃত হয় ক্ষমতার দম্ভ, প্রশাসনের পক্ষপাত, এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তাহীনতা?

পাহাড়ে ধর্ষণ নতুন নয়। কিন্তু বিচার? নেই। কেউ শাস্তি পায় না। বরং দেখা যায়, প্রশাসন ঘটনাকে আড়াল করতে উঠে পড়ে লাগে, গণমাধ্যমে খবর চাপা পড়ে যায়, তদন্তে বিলম্ব হয়, আর শেষে ‘অপরাধী অজ্ঞাত’—এই বাক্যে সবকিছু মিশে যায়। এই ‘অজ্ঞাত’ আসলে কারা? তারা কি পাহাড়ের আড়ালে বসবাসরত কোনো প্রেতাত্মা? না, তারা খুবই চেনা মানুষ—রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় বেঁচে থাকা, অপরাধে অভ্যস্ত, দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতিতে গা ভাসানো এক শ্রেণি।

এই দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি আমাদের রাষ্ট্রীয় চেতনারই অংশ হয়ে গেছে। ধর্ষণ যেন আর অপরাধ নয়, বরং প্রশাসনিক রুটিনের একটি অংশ। পাহাড়ে ধর্ষণ ঘটে—অভিযোগ ওঠে—প্রতিবাদ হয়—হামলা হয়—তারপর রাষ্ট্র চুপ থাকে। এই চক্রটি এক ভয়ঙ্কর নৈরাশ্য তৈরি করেছে, যেখানে পাহাড়ি মানুষ ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলেছে।

২৩ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর খাগড়াছড়ির রাস্তায় যেভাবে শিক্ষার্থীরা, সাধারণ মানুষ, স্থানীয় সংগঠন প্রতিবাদে নেমেছিল—সেটা ছিল পাহাড়ের ইতিহাসে এক সাহসী মুহূর্ত। কিন্তু সেই প্রতিবাদের উপর হামলা চালিয়েছে সেনাবাহিনী ও সেটলাররা। এই আক্রমণ শুধু একটি জনসমাবেশ ভাঙেনি, এটি পাহাড়ের মানুষের হৃদয়ে নতুন করে গেঁথে দিয়েছে সেই পুরনো ভয়—‘পাহাড়ে ন্যায়বিচারের কথা বলা যাবে না।’

পাহাড়ে সেনাবাহিনী থাকার উদ্দেশ্য কী? সেনাশাসন কি পাহাড়ের শান্তির নিশ্চয়তা দিয়েছে, না কি তা বরং পাহাড়কে এক স্থায়ী কারাগারে পরিণত করেছে? পার্বত্য শান্তি চুক্তির পরও কেন এখনো পাহাড়ে এত সেনাক্যাম্প, এত টহল, এত নজরদারি? পাহাড়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান এখন শান্তির নয়, একধরনের উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। তারা সেখানে পাহাড়িদের রক্ষা করতে নয়, বরং পাহাড়কে নজরবন্দি রেখেছে।

এই উপনিবেশিক মনোভাবই পাহাড়ের প্রতিটি ধর্ষণের পেছনে কাজ করে। ধর্ষণকে আমরা বারবার দেখি একক অপরাধ হিসেবে, কিন্তু পাহাড়ের ধর্ষণগুলো আসলে রাজনৈতিক অপরাধ। এগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দখলনীতি, বৈষম্য, সামরিকীকরণ, এবং বাঙালি সেটলারদের স্থায়ী প্রভাব। পাহাড়ে যখন কোনো কিশোরী ধর্ষিত হয়, তখন তার চিৎকার কেবল তার নয়, একটি গোটা জাতিগোষ্ঠীর আর্তনাদ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাষ্ট্র তা শোনে না। প্রশাসন তখন ব্যস্ত থাকে “আইনি প্রক্রিয়া চলছে” এই মুখস্থ কথায়।

যেন একটি স্বাধীন বাঙলাদেশের ভেতরে আরেকটি পরাধীন বাঙলাদেশ।

এই বিচ্ছিন্নতা, এই উদাসীনতাই পাহাড়ে অন্যায়কে স্থায়ী করে তুলেছে। রাষ্ট্রের নিরবতা আজ ধর্ষণের অন্যতম সহায়। প্রশাসন যখন কোনো অপরাধীকে রক্ষা করে, যখন কোনো ধর্ষণ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন রাষ্ট্র আসলে নিজেই ধর্ষকের পক্ষে দাঁড়ায়। 

ধর্ষণের বিচারহীনতা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা। ধর্ষণ পাহাড়ে এক ধরনের সামাজিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি ভীতির জন্ম দেয়, প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে, এবং আদিবাসী নারীর দেহকে রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের ভাষায় পরিণত করে।

একটি কিশোরীর শরীরের উপর দিয়ে চলে যায় জাতিগত নিপীড়নের ইতিহাস—তার আর্তনাদে মিশে থাকে শতাব্দীর অন্যায়।

পাহাড়ে যে মেয়েটি ধর্ষিত হলো, সে হয়তো এখন হাসপাতালে শুয়ে আছে—শরীরে অসহ্য ব্যথা, চোখ আতঙ্কে নীরব। তার নীরবতা বাধ্যতামূলক, কারণ এই সমাজে ধর্ষিত নারী এখনো লজ্জার প্রতীক, আর ধর্ষক ক্ষমতার প্রতীক।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই পাহাড়ের প্রতি দায়বদ্ধ হতো, তাহলে এই ঘটনাটি আজ জাতির আলোচনার কেন্দ্রে থাকত। কিন্তু রাষ্ট্র নীরব। উপদেষ্টাদের মুখে আলোচনা নেই, সরকারি পার্টি ও নেতাদের কণ্ঠে প্রতিবাদ নেই, গণমাধ্যমের বেশিরভাগই চুপ। এই নীরবতাই প্রমাণ করে—ধর্ষণের সংস্কৃতি এখন রাষ্ট্রেরই অংশ।

পাহাড় থেকে সেনাশাসন প্রত্যাহার না করলে, পার্বত্য চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না করলে, পাহাড়ে ন্যায়বিচার কখনো সম্ভব নয়। পাহাড়ের মানুষের অধিকার মানে কেবল জমির অধিকার নয়—এটি জীবন, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।

আমরা দাবি জানাই—
১. খাগড়াছড়ির ধর্ষণে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২. ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে হামলাকারী সেনাসদস্য ও সেটলারদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৩. আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. পাহাড়ে সেনাশাসন প্রত্যাহার ও পার্বত্য শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. পাহাড়ে সংঘটিত সকল ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীও জবাবদিহির আওতায় আসে।

একটি রাষ্ট্র তখনই সভ্য হয়, যখন সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা আজ এমন এক রাষ্ট্রে বাস করছি, যেখানে দুর্বলকে চেপে ধরা হয়, প্রতিবাদীকে দমন করা হয়, আর অপরাধীকে রক্ষা করা হয়।

পাহাড়ের কিশোরীর চোখে আজ পুরো বাঙলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তার অশ্রুতে ধুয়ে যাচ্ছে আমাদের সভ্যতার মুখ। আমরা যারা সমতলে বসে নীরব থাকছি, আমরা এই অপরাধের অংশ। কারণ নীরবতা মানে সম্মতি।

খাগড়াছড়ির সেই মেয়েটি আজ শুধু পাহাড়ের নয়, সে বাঙলাদেশের বিবেকের কন্যা। তার আর্তনাদ আমাদের সকলের ঘুম ভাঙিয়ে দিক—যাতে একদিন এই রাষ্ট্র তার কন্যাদের রক্ষা করতে শেখে, পাহাড়ে আবার শান্তি নামে, আর ধর্ষণ আর কখনো কোনো জাতির রাজনীতি না হয়।

রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিতে চাই—
একটি কিশোরীর কান্না পাহাড়ে পড়ে থাকে না,
তা প্রতিধ্বনি হয়ে একদিন সমতলেও আঘাত হানে।
যে রাষ্ট্র তার কন্যাদের রক্ষা করতে পারে না,
সে রাষ্ট্রের পতাকা যতই দিকে দিকে উড়ুক না কেন—তার নীচে কেবল লজ্জা, রক্ত আর ধর্ষণের গন্ধ।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান

ষাটের দশকের ঝঞ্ঝার মধ্যে জন্ম নেওয়া হাংরি আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি সুবিমল বসাক৷ কিন্তু তিনি কেবলমাত্র আন্দোলনের সীমায় আটকে না থেকে নিজের ভাষা ও ভঙ্গিমায় তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র পরিচয়। বাঙলা কবিতার শরীরে তিনি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকাইয়া বুলির হালকা অথচ ঝলমলে মিশ্রণ, যা পাঠকের কানে হাসির মতো বাজে আবার বিদ্রূপের মতো খোঁচাও দেয়। এমনকি তাঁর গদ্যেও ছিল একই ঢঙ—ডানপিটে, তীক্ষ্ণ অথচ প্রাণবন্ত, যেন একেবারে রাস্তাঘাট থেকে উঠে আসা ভাষা।

কিন্তু শুধু কবি বললে সুবিমল বসাককে সীমাবদ্ধ করা হয়। তিনি ছিলেন চিত্রকরও, রেখার টানে যার হাত ছিল অসামান্য। তাঁর আঁকায় যে মায়া ফুটত, সেটি যেমন আলাদা, তেমনি তাঁর সাহিত্যচর্চা ছিল বহুমুখী। সতীনাথ ভাদুড়ীর ভাবশিষ্য ফণীশ্বরনাথ রেণুর সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল, আর রেণুর ‘ময়লা আঁচল’ উপন্যাসের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন তিনি। অনেকেই জানেন না, সতীনাথ সমগ্র সম্পাদনার কাজেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। অর্থাৎ তিনি কেবল নিজের সৃষ্টির ভিতর দিয়ে নয়, অন্যের সৃষ্টিকেও নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ছিলেন।

হাংরি আন্দোলনের প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান ছিল কিছুটা আলাদা। অন্যরা যেখানে রাগ আর প্রতিরোধের তীব্রতায় মগ্ন, সেখানে তাঁর কবিতায় পাওয়া যেত খুনসুটি, রসিকতা, হালকা হাসি, আবার একইসঙ্গে জীবনযন্ত্রণার অদ্ভুত টান। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বিদ্রোহ হাসতেও পারে, আঞ্চলিক বুলিকে কাব্যের উচ্চভাষায় বসিয়েও জেগে থাকতে পারে। ‘হাবিজাবি’ কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায় এই ভঙ্গি ছড়িয়ে আছে। আমরা যারা পূর্ববঙ্গীয়, তাঁদের কাছে ঢাকাইয়া ভাষার টান এক অন্য আনন্দের উৎস ছিল, সুবিমল বসাক সেটিকে কবিতায় এনে এক নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিলেন।

আমার কাছে সুবিমল বসাকের সবচেয়ে বড় অবদান হলো কবিতার উপাদানকে বিস্তৃত করার দুঃসাহস। আমরা আগে ভাবতাম কবিতা মানেই কাব্যিকতা, সুন্দর শব্দ, অলঙ্কার, সুশ্রী আবহ। কিন্তু সুবিমল বসাক দেখিয়ে দিলেন, কবিতা আসতে পারে টঙের দোকান থেকে, ফাটা চপ্পলের শব্দ থেকেও, এমনকি কথার মধ্যে ছুঁচ-সুতো, পেরেক-ইস্ক্রুও কবিতার শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। হাংরিদের পুরো আন্দোলনের ভেতরই এই বদল ঘটেছিল, কিন্তু সুবিমল সেই বদলকে এমনভাবে জীবন্ত করে তুলেছিলেন যে তা হয়ে উঠেছিল মজা, খেলা আর প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে এক নতুন ছন্দ।

তাঁর প্রয়াণ আমাদের মনে এক শূন্যতা রেখে গেছে। কিন্তু শূন্যতা মানেই নিস্তব্ধতা নয়। তাঁর ভাষা, তাঁর ঢাকাইয়া মেজাজ, তাঁর আঁকা রেখার খেলা, সবকিছুই আমাদের ভেতর বেঁচে আছে। যখনই আমরা ভাবি কবিতা মানেই কিছু আলাদা, কিছু উচ্চাঙ্গ, তখনই সুবিমল বসাক ফিরে আসেন মনে করিয়ে দিতে—কবিতা মানে জীবন, কবিতা মানে প্রতিদিনের ভাষাকে নতুন চোখে দেখা। কাব্যিকতা উবে গেলে ভয় নেই, কারণ কবিতা আসবে নতুন চেহারায়, ভাঙাচোরা বাস্তব থেকে, মানুষের কথোপকথন থেকে।

কবিতা আসলে আমাদের বেঁচে থাকারই এক অদম্য ঘোষণা।

❑ সাম্য রাইয়ান

বাঙালি পাঠকের এক বড় ভুল ধারণা হলো—শিল্পী মানেই বোহেমিয়ান, কবি মানেই অগোছালো, লেখক মানেই ভাঙাচোরা জীবনের প্রতিচ্ছবি। তাঁকে অবশ্যই রাতভর মদ খেতে হবে, সংসার ভাঙতে হবে, পথে পড়ে থাকতে হবে। তাঁর ঘর বলতে হবে ধুলোমাখা খাট, ছেঁড়া কাগজ, এলোমেলো বইয়ের স্তূপ। যেন বিশৃঙ্খলাকে মহৎ সৃষ্টির একমাত্র শর্ত হিসেবে কল্পনা করা ছাড়া আর কিছুই আমরা জানি না। কিন্তু সত্যিটা এরকম নয়।

বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখবেন—মহৎ স্রষ্টারা ছিলেন ভীষণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। কাফকা অফিসের চাকরির ক্লান্তি নিয়েও প্রতিদিন রাত ঠিক সময়ে লিখতে বসতেন। ভার্জিনিয়া উলফ ছিলেন অসুস্থতায় জর্জরিত, তবু লিখতেন অবিশ্বাস্য নিয়মে। মার্শেল প্রুস্ত তাঁর রোগশয্যায় থেকেও প্রতিদিন নির্দিষ্ট ঘণ্টার কাজ শেষ না করে বিশ্রাম নিতেন না। শেক্সপিয়ারের নাটকগুলো রচিত হয়েছে এক নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভেতরে—তাঁর ব্যক্তিজীবন যতই রহস্যে ঢাকা থাকুক, তাঁর লেখকজীবন ছিল অদ্ভুত সুশৃঙ্খল।

এমনকি আমাদের বাঙলাতেই উদাহরণ কম নেই। নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী, দুঃখভোগ করেছেন অসীম, কিন্তু তাঁর প্রতিটি লেখা জন্ম নিয়েছে এক আশ্চর্য শৃঙ্খলার ভেতরে। সুকান্ত, অকালমৃত হলেও, লিখেছেন তীব্র জীবনবোধ ও কর্মের মধ্য দিয়ে। আর রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই—দুঃখে-শোকে ভরা জীবনের ভেতরেও তাঁর সৃষ্টির ভাণ্ডার কখনো ফুরোয়নি, প্রতিটি কাজেই ছিল প্রস্তুতি ও সুনিপুণ পরিকল্পনা। ঋত্বিক ঘটককে নিয়েও ভুল ধারণা কম নেই। তাঁকে আমরা অনেক সময় দেখি মদমত্ত, ভগ্ন, অকালমৃত এক শিল্পী হিসেবে—যেন তাঁর অগোছালো জীবনই তাঁর সিনেমার আসল উৎস। কিন্তু সত্যিটা হলো, তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র এক অসাধারণ পরিকল্পনা, নিখুঁত প্রস্তুতি ও শৃঙ্খলার ফসল।

কোনো শিল্পীর জীবনেই দুঃখ, কামনা, ব্যর্থতা, মদ, রোগ—এসব আসতে পারে। এগুলোই তাঁকে লেখক বানায় না। লেখককে লেখক বানায় তাঁর নির্দিষ্ট টেবিল, তাঁর কলমের প্রতি দায়বদ্ধতা, প্রতিদিনকার নির্ধারিত পরিশ্রম। সাহিত্য নিছক অগোছালো জীবনের হঠাৎ ঝলক নয়; সাহিত্য হলো দীর্ঘস্থায়ী অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার ফসল।

যে জীবনে প্রতিদিনকার শৃঙ্খলা নেই, একাগ্রতা নেই, সেই জীবন থেকে কালজয়ী রচনা জন্ম নেয় না। শিল্পী হতে হলে প্রথমেই হতে হয় নিয়মানুবর্তী। বিশৃঙ্খলার ভেতর থেকেও তাঁকে খুঁজে নিতে হয় এক ভেতরের শৃঙ্খলা। আর সেই শৃঙ্খলাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে আলাদা করে তোলে, দেয় অমরত্ব।

শিল্পীজীবন নিয়ে যে ‘অগোছালো’ মিথটি ছড়িয়ে আছে, তার একটি সামাজিক ব্যাখ্যা রয়েছে। আমরা অনেক সময় শিল্পীর ব্যক্তিগত ভাঙনকে তাঁর সৃষ্টির মূল বলে ভেবে নিই। কারণ দুঃখ, মদ, বা ভাঙাচোরা প্রেম আমাদের কাছে রহস্যগল্পের মতো আকর্ষণীয় শোনায়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই—এই গল্পের বাইরে প্রতিদিনকার কাঠিন্য, প্রতিদিনকার নিয়মিত অনুশীলন ছাড়া কোনো শিল্প দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

অন্যদিকে, বাজার ও গণমাধ্যমও এই মিথকে শক্তিশালী করেছে। লেখকের দুর্ভোগকে বিক্রি করার মতো গল্পে রূপান্তরিত করা সহজ, কিন্তু তাঁর নিরলস নিয়মমাফিক কাজকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে না। তাই বোহেমিয়ান ইমেজটিই বারবার প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ বাস্তবে একজন কবি বা ঔপন্যাসিকের দৈনন্দিন জীবন দেখতে গেলে পাওয়া যাবে শৃঙ্খলার কঠিন কাঠামো, যার ভেতর দিয়ে তিনি নিজের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাকে কণ্ঠস্বর দেন।

লিও টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, কিংবা জেমস জয়েস—যাঁদের জীবন নিয়ে অসংখ্য কিংবদন্তি ছড়ানো আছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই সত্য। টলস্টয়ের আধ্যাত্মিক টানাপোড়েন, দস্তয়েভস্কির জুয়া ও ঋণ, জয়েসের নির্বাসিত জীবন—এসবই আকর্ষণীয়, কিন্তু এদের বাইরেও ছিল প্রতিদিনকার লেখার টেবিল, একাগ্র অনুশীলন। দস্তয়েভস্কি তাঁর ‘দ্য গ্যাম্বলার’ লিখেছিলেন নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর, প্রায় সামরিক শৃঙ্খলায়। জয়েস তাঁর ‘ইউলিসিস’-এ প্রতিটি বাক্য নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করেছেন। কঠোর শৃঙ্খলা ছাড়া এত বড় শিল্পকর্ম জন্ম নিতে পারত না।

বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, আমাদের কবি-লেখকদের অনেককেই ভুলভাবে ‘অগোছালো’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। আবুল হাসানকে যেমন শুধুই বোহেমিয়ান বলে দেখা হয়, অথচ তাঁর কবিতা পড়লেই বোঝা যায়—তিনি ছিলেন গভীরভাবে প্রস্তুত, প্রতিটি শব্দ বাছাই করেছেন তীব্র শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে নিয়ে একই বিভ্রান্তি আছে। তাঁর অকালমৃত্যু, রাজনৈতিক চাঞ্চল্য—এসবই বেশি আলোচিত হয়, কিন্তু তাঁর কবিতার ভিতরে ছিল সযত্ন শ্রম ও সচেতন নির্মাণ।

শিল্পের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক জটিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশৃঙ্খলা থেকেই শিল্প জন্ম নেবে। বরং বলা যায়, শিল্প হচ্ছে এক প্রকার প্রতিরোধ—জীবনের অস্থিরতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সৃষ্টির মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। কবিতা বা গল্প আমাদের যে সৌন্দর্যের স্বাদ দেয়, তা আসলে লেখকের ভেতরের এই আত্মনিয়ন্ত্রণেরই ফল।

আজকের সময়ে, যখন আমরা ‘কনটেন্ট’ আর তাৎক্ষণিক অভিব্যক্তির যুগে বাস করছি, তখন শৃঙ্খলার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ মুহূর্তে ভেসে যাওয়া লেখালেখি হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছুদিন আলোচনায় থাকে, কিন্তু টিকে থাকে না। যে কাজ সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে, তা আসে অধ্যবসায় থেকে, প্রতিদিনকার কঠোর পরিশ্রম থেকে।

অতএব, শিল্পী মানেই অগোছালো—এই ধারণা এক ধরনের অলস কল্পনা। শিল্পী আসলে হন সেই মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে গুছিয়ে নেন সৃষ্টির জন্য। তিনি যতই দুর্বল হোন, ভেতরে যতই দ্বন্দ্ব থাকুক, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে টেবিলে বসেন, কলম হাতে নেন, অথবা ক্যামেরা চালান। এই নীরব নিয়মই তাঁকে আমাদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী করে রাখে।

❑ সাম্য রাইয়ান

আমার মনে হয়, ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—তিনি দর্শকের অভ্যন্তরীণ অনুভূতি স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। ক্যামেরার ভাষা, আলো-ছায়ার ব্যবহার, চরিত্রদের কথোপকথনের নিরাসক্ত অথচ মর্মস্পর্শী সুর—এসব মিলে এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গ পরিবেশ তৈরি করতেন। দর্শক সেই পরিবেশের ভেতরে ঢুকে পড়ে নিজেকে আবিষ্কারের অবকাশ পেত।

বাঙলা সিনেমার মূলধারার অভ্যন্তরে যখন বেশিরভাগই বাণিজ্যিক মেলোড্রামার পুনরাবৃত্তি চলছিল, সেই সময় তিনি সাহসীভাবে ভিন্ন এক ভাষা তৈরি করলেন—যেখানে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তর্দন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, যৌনতা, লিঙ্গ-পরিচয়ের সংকট সবকিছুই একইসাথে উঠে আসে।

তাঁর সিনেমার বর্ণনাভঙ্গি এমনই অনন্য, যেখানে গল্প শুধু দৃশ্য নয়, মানুষের অন্তর্গত অনুভূতির ভাষায় প্রকাশ পায়। উনিশে এপ্রিল থেকে শুরু করে চোখের বালি, দোসর কিংবা শুভ মহরৎ—প্রতিটি চলচ্চিত্রে তিনি চরিত্রদের ভেতরের ভাঙনকে এমনভাবে উন্মোচন করেন যে, দর্শক মনে করে এই ভাঙন আসলে আমাদের নিজেদের। তিনি সম্পর্ককে কখনো সরল রেখায় আঁকেননি; বরং দ্বন্দ্ব, ঈর্ষা, ভালোবাসা, অভিমান, সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে সম্পর্ককে এক জীবন্ত মানচিত্রে রূপ দিয়েছেন।

ঋতুপর্ণ ঘোষের সাহিত্যকর্ম, বিশেষত তাঁর প্রবন্ধ ও আত্মজৈবনিক লেখা, তাঁর দর্শনের আরেকটি দিক প্রকাশ করে। তাঁর কলমে যেমন দেখা যায় বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের টানাপোড়েন, তেমনই ব্যক্তিগত সাহস—নিজের লিঙ্গপরিচয় নিয়ে খোলামেলা স্বীকারোক্তি, সমাজের কপটতা ভাঙার প্রচেষ্টা। তিনি জানতেন, শিল্প মানে নিছক নন্দনবোধ নয়, বরং একধরনের অবস্থান নেওয়া। আর এ অবস্থান সমাজের প্রচলিত প্রবাহে অস্বস্তি তৈরি করে৷ একারনেই তিনি বলেন, “আমি জানি আমার শহর আমায় নিতেও পারবে না ফেলতেও পারবে না৷”

ঋতুপর্ণের দর্শন মূলত মানবিকতার দর্শন। তিনি চাইতেন মানুষ নিজেকে মুক্ত করে তুলুক সমাজের আরোপিত বাঁধন থেকে। বিশেষ করে লিঙ্গ ও যৌনতার বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল রাজনৈতিকও। তিনি প্রায় একাই গোটা বাঙলায় ‘কুইয়ার’ পরিচয়ের স্বীকৃতির লড়াইকে শিল্পের মূলধারায় টেনে আনেন। তাঁর শেষ দিকের ছবি—আরেকটি প্রেমের গল্প, চিত্রাঙ্গদা—এই জায়গায় একেবারেই ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এগুলো শুধু সিনেমা নয়, বরং ঘোষণা—মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকারের ঘোষণা।

তবে তাঁর কাজ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। অনেকেই বলেছেন, ঋতুপর্ণ কখনো কখনো অতিরিক্ত মেলোড্রামাটিক হয়ে যান, বা তাঁর সিনেমা শহুরে মধ্যবিত্তের সঙ্কীর্ণ জগৎকে ঘিরে আবর্তিত। এই সমালোচনাগুলো হয়তো পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এটাও ঠিক যে, তিনি সচেতনভাবেই সেই জগতকে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ সেখান থেকেই তিনি প্রশ্ন তুলতে পারতেন সমাজের ভেতরের লুকোনো ভণ্ডামি সম্পর্কে। তিনি ভাষ্য, “সেন্সরের ভয়, সমাজের ভ্রুকুটি-এসবের ফাঁক গলে গল্প বলি। চরিত্রগুলোকে এমন জায়গায় দাঁড় করাই, যেখানে তারা ‘নিয়ম’ ভাঙে না; বরং নিয়মের অমানবিকতাকে ফাঁস করে। শিল্প যদি কারও ক্ষত ঢাকে, তবে সেটি স্রেফ প্রসাধন। আমি চাই, শিল্প ক্ষত দেখাক-আর দেখানোর মাধ্যমেই সান্ত্বনা দিক।”

ঋতুপর্ণ ঘোষ শিল্পের মাধ্যমে জীবনের বহুমুখী সত্যকে ধরতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্প কেবল বিনোদন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অপরিহার্য অংশ।

❑ সাম্য রাইয়ান

সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু নাম থাকে যাদের আলো একেবারে সরাসরি দেখা যায় না, বরং আড়াল ভেদ করে আসে—নরম অথচ অনমনীয়, ধুলোমাখা অথচ অমোঘ। অরুণেশ ঘোষ এমনই এক কবি, কথাসাহিত্যিক; একজন গৃহস্থ মানুষ, যিনি শিক্ষকতা করেছেন, জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন গ্রামের মাটিতে, অথচ তাঁর ভেতরে যে কবি জন্মেছিল, তার অগ্রসর মানসিকতা, মানবিক বোধ ও আত্মঘাতী নির্জনতা বাঙলা কবিতার মাটিকে গভীরভাবে চিহ্নিত করে গেছে। তাঁর জীবনযাপন ও সাহিত্যকে আলাদা করা যায় না; তাঁর কবিতা আসলে তাঁর প্রতিদিনের প্রান্তিক বাস্তবতার বয়ান। অরুণেশ ঘোষকে বুঝতে চাইলে বাঙলা কবিতার শহরকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে সরে এসে গ্রাম, অভাব, শ্বাসরুদ্ধ জীবন, এবং নিঃশব্দ মৃত্যুর দিকে তাকাতে হয়।

জন্ম ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের শেষপ্রহরে, কুচবিহারের এক অখ্যাত গ্রাম হাওয়ারগাড়িতে। এই গ্রামেই তিনি জীবন কাটিয়েছেন, সেখানেই লিখেছেন। সেসময়ে বাঙলা সাহিত্যের প্রায় সবাই শহর, প্রকাশক, সেলিব্রিটি সংস্কৃতি বা রাজনীতির টানে একদিন না একদিন কলকাতা মুখী হয়েছেন—কিন্তু অরুণেশ ঘোষ এ নিয়ম ভেঙেছিলেন। গ্রাম ছাড়েননি। গ্রামই ছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়, তাঁর মঞ্চ, তাঁর কবিতার ভিত।

ষাটের দশকের শুরুতে হাংরি সাহিত্যিকরা যখন কবিতা-ভাষায় ভূমিকম্প সৃষ্টিতে মত্ত, তখন অরুণেশ অল্পবয়সী এক পাঠক। সেই তিনিই পরে ‘জিরাফ’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করে হাংরি আন্দোলন পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেন। বলা হয়, তাঁর হাংরি সম্পর্কটা ছিল প্রতীকি ও স্বতন্ত্র। তিনি কেবল শহুরে অভিজাত কবিতার বিরুদ্ধে ছিলেন না, তিনি গ্রাম্য কবিতার এক বাস্তবতাকে গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে মানুষের বেঁচে থাকার রূঢ় অথচ গভীর ছবি অঙ্কিত।

তাঁর মৃত্যু হয় ২০১১ সালের আগস্টে, এক পুকুরে ডুবে। দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা—এ নিয়ে আজও প্রশ্ন আছে। কিন্তু যেভাবেই হোক, এই মৃত্যু অরুণেশ ঘোষকে আরও রহস্যময় করে তোলে। অনেকেই বলেন, তাঁর জীবনযাত্রা সমাজ-প্রান্তিক মানুষের সাথে এতটাই মিশে গিয়েছিল যে নিজেকেও তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন।

অরুণেশ ঘোষ হয়তো বিখ্যাত নন, কিন্তু অত্যাবশ্যক। কেননা তিনি বাঙলা কবিতার এক ভিন্নতর স্রোত—যেখানে মাটি, দুঃখ, এবং অন্ধকার একত্রে প্রবাহিত।

দিনহীনের দিনলিপি : ২৪ আগস্ট ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান

রাত নামছে। জানলার বাইরে শহুরে ঝাপসা আলো। মনে হচ্ছে, বোর্হেসের সেই অসীম গ্রন্থাগারের ভেতরে আটকে গেছি। যত পড়ি, তত নতুন তাক, নতুন বই, নতুন করিডোর খুলে যাচ্ছে।

সাহিত্য মানেই বাস্তবের প্রতিফলন নয়, কখনো কখনো তা এক অদৃশ্য দরজা, যেটা খুলে দিলে অন্য জগতের আলো এসে পড়ে। বোর্হেসের ক্ষেত্রে দেখি, তিনি দস্তয়েভস্কি বা কাফকার মতো মানবজীবনের দুঃখ কিংবা অপরাধের ইতিহাস লেখেননি; বরং মানুষের বাইরেও কিছু ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রতিটি গল্প একটা কবিতার মতো, অর্ধেক বলা, অর্ধেক পাঠকের মনের ভেতর গড়ে ওঠা। তাঁর অন্ধত্বও যেন প্রতীক—দৃষ্টি হারিয়েও তিনি অদৃশ্য পৃথিবীকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখতে পেরেছিলেন।

বোর্হেসকে আমার এমন এক পাঠক মনে হয়, যিনি পড়ার ভেতর দিয়ে লিখেছেন, আর সেই লেখাগুলো আমাদের হাতে পৌঁছেছে কোনো রহস্যময় পথ ধরে। “আলেফ”, “দ্য লাইব্রেরি অব ব্যাবেল”, কিংবা “ফিকসিওনেস”—প্রতিবার পড়তে গিয়ে আমি পৃথিবীর নতুন নতুন রূপের সাথে পরিচিত হয়েছি। বইয়ের তাক, আয়না, গোলকধাঁধা, সময়—এগুলো তাঁর লেখায় এমনভাবে চরিত্র হয়ে ওঠে, আমি আর নিশ্চিত থাকতে পারি না জিনিসগুলো সত্যিই বাহ্যিক, নাকি কেবল ভাষার ভেতরকার প্রতিচ্ছবি। ফলে পৃথিবীর ভেতরে আরেকটা পৃথিবী আবিষ্কারের অনুভূতি হয়। এমন নয় যে এই পৃথিবীটা দৃশ্যমান—বরং সেটা এক ধরনের অদৃশ্য আলোকরেখা, যেটা চোখে ধরা পড়ে না কিন্তু মনের গভীরে অস্বস্তির মতো টের পাওয়া যায়। 

প্রথমবার “দ্য আলেফ” পড়ার পর মনে হয়েছিল, এ কি সত্যিই সম্ভব? সবকিছুর সমগ্রতা এক বিন্দুতে দেখা? কিন্তু তখনই বুঝলাম, বোর্হেস আসলে আমাকে একদম বাস্তব কিছু দেখাচ্ছেন না, তিনি আমার বিশ্বাসকে পরীক্ষা করছেন। আমি জানি না আলেফ আসলেই আছে কিনা, কিন্তু গল্পটা পড়তে পড়তে আমি বিশ্বাস করেছি যে আছে। আর এ বিশ্বাসের খেলা বোর্হেসের কাছেই শেখা। তাঁর নির্মিত মানচিত্রে আমরা ঢুকে পড়ি, ঘুরি, পথ হারাই, আবার হঠাৎ করে কোনো অদৃশ্য দরজা পেয়ে যাই!
যেন এইভাবে পথ চলাতেই আনন্দ!

দিনহীনের দিনলিপি : ২৪ আগস্ট 

❑ সাম্য রাইয়ান

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ির মানুষ যে সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল, তা শুধু একটি কয়লাখনি রক্ষার আন্দোলন ছিল না—এটি ছিল জীবন, জমি, নদী ও প্রকৃতি রক্ষার লড়াই। শহীদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে ফুলবাড়ি কয়লাখনি রক্ষা পেয়েছিল, কিন্তু সারা দেশে প্রকৃতির বিরুদ্ধে উন্নয়নের নামে নিপীড়ন আজও বন্ধ হয়নি৷ জলবায়ু সংকট, নদী দখল, পাহাড় কাটা, বনভূমি ধ্বংস—সবই আমাদের চোখের সামনে ঘটছে। 

ফুলবাড়ি আন্দোলনের মূল শিক্ষা ছিল, মানুষের অস্তিত্বের উপরে কোনো মুনাফা নয়। স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প টেকসই হতে পারে না। 

অথচ আজও আমাদের দেশে জ্বালানি সংকটের সমাধান খোঁজা হয় বিদেশি কোম্পানির শর্তে! ওদিকে বিকল্প নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা কেবল উপেক্ষিতই থেকে যায়। ফুলবাড়ি দিবস তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি বর্তমানের প্রশ্ন—এ রাষ্ট্র প্রকৃতপ্রস্তাবে কাদের জন্য উন্নয়ন চায়, এবং কোন মূল্যে?

ফুলবাড়ি শিক্ষা দেয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অমর উক্তি, “সংগঠিত জনগণই ইতিহাসের নির্মাতা”। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবেশবান্ধব ও জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়নের দাবি তোলা। ফুলবাড়ি দিবস তাই আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান জ্বালাময়।

শ্রদ্ধা ফুলবাড়ির শহীদদের প্রতি, যাদের রক্তে লেখা আছে মানুষের অধিকার ও প্রকৃতির মুক্তির অঙ্গীকার।

❑ সাম্য রাইয়ান

“জীবিত কাজী নজরুল ইসলামকে ‘কাফের-নাস্তিক-মুরতাদ’ খেতাব দিয়েছিল সমকালীন মোল্লা-মৌলভিরা; অর্ধমৃত নজরুলকে বাঙলাদেশ দিয়েছে নাগরিকত্ব, বানিয়েছে ‘জাতীয় কবি’। বাঙালি মুসলমান জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিণত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে আগরবাতি জ্বালে।”
– হুমায়ুন আজাদ

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির এমন এক প্রতিভা, যিনি জীবিত অবস্থায় যতটা উপেক্ষা, তিরস্কার ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন, মৃত্যুর পর ততটাই কৃত্রিম মহিমায় আবৃত হয়েছেন। তাঁর কবিতার বিপ্লবী সুর, গান ও প্রবন্ধের মুক্তচিন্তা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নির্ভীক উচ্চারণ তাঁর সমকালীন সমাজের কাছে ছিল ভয়ের।

আজ তাঁর কবিতার আগুনকে আমরা প্রদীপে রূপান্তরিত করেছি; তাঁর বিদ্রোহকে ভক্তির ফুলে ঢেকে দিচ্ছি। অথচ সত্যিকারের নজরুলকে গ্রহণ করতে যে সাহস প্রয়োজন, তা এ সমাজের নেই—কারণ তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে শঙ্খধ্বনি, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ।

বাঙলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পর তাঁকে “জাতীয় কবি” ঘোষণা করা হয়, কিন্তু তখন তিনি ছিলেন স্মৃতিভ্রংশ, কার্যত অচেতন। তাঁর জীবন্ত কণ্ঠ, তাঁর বিদ্রোহী ভাষা তখন আর শোনা যায়নি। রাষ্ট্র তাঁকে যে সম্মান দিয়েছে, তা একরকম প্রতীকী শোকাচ্ছাদন মাত্র। ভাবুন তো—যদি তিনি জীবিত থাকতেন তাঁর পূর্ণ শক্তিতে, তবে কি আমরা তাঁকে সহ্য করতে পারতাম? নাকি আবার তাঁকে দমন করার জন্যই ষড়যন্ত্র হতো, মবের আক্রমণ হতো?

আজকের বাঙলাদেশে নজরুলের কবিতা প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতার আসরে উচ্চারিত হয়, অথচ তাঁর মূল বিদ্রোহী চেতনা, সাম্যের ডাক, ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে অবস্থান—সবই চাপা পড়ে গেছে। নজরুলকে মৃত প্রতীকে পরিণত করা হয়েছে, তাঁর জীবন্ত ভাবনা ও বিপ্লবী দিকটিকে অস্বীকার করা হয়েছে।

বাঙলাদেশ নজরুলকে জাতীয় কবি করেছে, কিন্তু তাঁর চিন্তাকে জাতীয় চেতনায় রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর বিদ্রোহকে আমরা পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ করেছি, কিন্তু জীবনে প্রয়োগ করিনি। নজরুল আজ তাই এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি—যাকে আমরা স্মরণ করি, কিন্তু পালন করি না। 

❑ সাম্য রাইয়ান

“গায়ে জোর নেই বলে রিক্সা টানতে পারি না‚ তাই কলম টানি। কলমের প্রতি টান আমার ওইটুকুই। লিখতে আমার একটুও ভালো লাগে না। লিখতে মেহনত‚ বহু পরিশ্রমের ফল সেই লেখার গা থেকে ঘাম মুছতে মেহনত আবার। আদৌ সাহিত্যিক নই আমি‚ মেহনতি জনতারই একজন—মজদুরের সগোত্র। মুটেও বলতে পারেন আমায়। মোট ফেলেই আমার খাওয়া; মোটামুটি লিখে মোটের ওপর কিছু পেয়ে যাওয়া।”
–শিবরাম চক্রবর্তী

শৈশবের পাঠ-স্মৃতি আমাদের মনে যেমন থাকে, তেমনি থাকে সেই পাঠের ভেতর দিয়ে পৃথিবীকে প্রথম চিনে নেওয়ার অনুভূতি। শিবরাম চক্রবর্তীকে আমি প্রথম পড়েছিলাম প্রাইমারী স্কুলে, ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’। হয়তো সেই সময় ‘পালিয়ে পড়া’ মানে ছিল নিজের ছোটো পৃথিবীটাকে ভাঙা এবং তার বাইরে এক ঝলক উঁকি দেওয়া। বই-ই ছিল সেই বাইরে দেখা, যেখানে হাসি, খুনসুটি, অদ্ভুত সব কাহিনি, আর শিবরামের নির্ভার বাচনভঙ্গি হাত ধরে নিয়ে যেতো অচেনা রাস্তায়। শিশু বয়সে শিবরামের বই পড়তে পড়তে প্রথম যে জিনিসটা শিখেছিলাম, তা হলো—কৌতুকও হতে পারে গভীর সত্য বলার এক অভিনব ভাষা।

শিবরামের ভঙ্গি অনন্য। তিনি কেবল হাসাতে জানেন না, বরং হাসির আড়াল থেকে জীবনের গাম্ভীর্যও টেনে আনেন। একে একে যত পড়েছি, মনে হয়েছে শিবরাম যেন আমাদের ঘরেরই একজন—একজন এমন আত্মীয়, যিনি বকেন না, পড়তে বাধ্য করেন না, শুধু গল্প শোনান আর অকারণে আমাদের হাসিয়ে দেন।

কিন্তু তাঁর রসবোধের ভেতরে লুকিয়ে থাকে দার্শনিক গভীরতা। যেমন ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ আর ‘ভালোবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’—এই দুই গ্রন্থ পড়ার সময় মনে হয়েছিল, তিনি আমার হাতে লাড্ডুর মতো সহজভাবে এক মহাজাগতিক সত্য তুলে দিচ্ছেন। 

শিরবাম এক অদ্ভুত ব্যঙ্গাত্মক অথচ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঈশ্বর, ধর্ম, আর মানুষের জটিল সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। মনে হয়, ঈশ্বরকে তিনি আক্ষরিক অর্থে মাটিতে নামিয়ে আনছেন, যেখানে হাসির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রশ্ন—মানুষের দুঃখকষ্ট, ক্ষুধা, অপমান কি ঈশ্বর দেখেন না? শিবরামের উত্তর মজার মতো হলেও আসলে ভয়াবহ গভীর, কারণ তিনি জানেন এই প্রশ্ন কোনোদিন শেষ হয় না। তিনি শুধু ব্যঙ্গ করেন না, বরং মানুষের ভেতরে লুকোনো এক সহজ বিশ্বাসকে সামনে আনেন। পৃথিবীর দুঃখ, শোক, রক্তাক্ত ইতিহাসের মাঝেও ভালোবাসা নামের যে শক্তি আছে, তার মতে—সেটাই মানুষের আসল আশ্রয়।

শিবরাম আমাদেরকে হাসির সিঁড়ি বেয়ে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে জীবনের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলো হালকা মনে করা যায়। তাঁর এই কাজ একেবারেই অনন্য—কারণ সাহিত্য ইতিহাসে এমন খুব কম লেখক আছেন, যাঁরা কৌতুকের ভেতর দিয়ে পাঠককে দার্শনিক চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করান।

শৈশবে বাড়ি থেকে পালিয়ে হাতে পাওয়া বইয়ের হাস্যরস আর কৈশোরে পৌঁছে পাওয়া দার্শনিক গভীরতা—শিবরামের লেখার এই দ্বিমুখী শক্তিই আজও আমাকে আকর্ষণ করে। তাঁর বই পড়ার সময় মনে হয়, জীবন আসলে এক অদ্ভুত মিশ্রণ—হাসি ও বেদনার, সরলতা ও জটিলতার, ঈশ্বর আর ভালোবাসার। শিবরাম আমাদের শিখিয়েছিলেন, পৃথিবীকে ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

❑ সাম্য রাইয়ান

“আমাদের স্বপ্ন হোক ফসলের সুষম বন্টন”—এই পংক্তিই সমর সেনের সমাজকল্পনা। যেখানে মানুষের শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত হবে, যেখানে ক্ষুধা-দারিদ্র্য নয়, ন্যায়সঙ্গত বণ্টন হবে জীবনের মূলনীতি। তাঁর কাব্যপথে এই স্বপ্ন যেমন উজ্জ্বল, তেমনি তা ভেঙে যাওয়ার করুণ আর্তিও সমান তীব্র। ত্রিশের দশকের বাঙলা কবিতায় তিনি সেই কণ্ঠস্বর, যিনি বিপ্লবের আহ্বানের পাশাপাশি ক্লান্তি, বিভ্রান্তি আর পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড় করালেন পাঠককে, যা নৈর্ব্যক্তিক অথচ গভীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা।

তাঁর কবিতায় জীবনানন্দীয় রোমান্টিকতা নেই, নজরুলীয় উদ্দামতা নেই—আছে ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের হতাশার খসখসে ছাপ। তিনি যে যুগে লিখতে শুরু করেছিলেন, সেই তিরিশের দশকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ঢেউ, শ্রমিক-রাজনীতির উত্থান, আর একই সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশনি সংকেত বাঙালি জীবনে প্রবলভাবে আঘাত করেছিল। কিন্তু সমর সেন এই ইতিহাসকে কবিতায় আনলেন একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে—দেখালেন ক্লান্ত মানুষের অন্তর্গত বিপর্যয়।

তাঁর কবিতা বহন করে নিঃশব্দ আর্তি, শহরের অগণিত পরাজিত মানুষের স্বর। তিনি যে ব্যক্তিগত ক্লান্তি-হতাশা ও ভেঙে পড়ার কথা বলছেন, তা আসলে সমাজের বৃহত্তর ক্লান্তির প্রতীক।

রাজনীতির প্রতি স্পষ্ট সমর্থন নিয়েও তাঁর কবিতার ভাষা একেবারেই নৈর্ব্যক্তিক, প্রাত্যহিক ও বাস্তবানুগ। প্রচলিত ছন্দ-প্রকরণ ভেঙে, হঠাৎ থেমে যাওয়া বাক্যের ভেতরেই তিনি খুঁজে নিলেন সময়ের তিক্ততা।

সমর সেনকে মনে করা যেতে পারে সেই কবি, যিনি বাঙালি সাহিত্যে পরাজিত মানুষের কণ্ঠস্বরকে প্রথম সাহসের সঙ্গে কবিতায় রূপ দিয়েছিলেন। আর তাই তাঁর মৃত্যুদিন বা জন্মদিনে নয়, প্রতিদিনই যখন শহরের রাস্তায় ভগ্নস্বপ্নের ভিড় দেখি, তখনই তাঁর কবিতার শ্লথ অথচ ছুরির মতো ধারালো স্বর কানে বেজে ওঠে।

❑ সাম্য রাইয়ান

বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুসংবাদ আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তাঁর শেষ খোলা চিঠি আমি বারবার পড়েছি—এক জীবনের হিসাবনিকাশ, এক সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অথচ রাজনৈতিক আত্মজিজ্ঞাসা। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করা মানুষটির মৃত্যুর আগে এমন অসহায় স্বীকারোক্তি রেখে যাওয়া কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়, বরং বাঙলাদেশের বর্তমান সাংবাদিকতার অবস্থার নির্মম দলিল।

বিভুরঞ্জনের লেখায় দেখা যায়, তিনি সত্য প্রকাশ করেছেন কিন্তু তার বিনিময়ে পেয়েছেন আর্থিক অনটন, পেশাগত বঞ্চনা, সামাজিক অস্বস্তি। অথচ তার চারপাশে একই সময়ে এমন মানুষ ভেসে উঠেছে যারা সাংবাদিকতাকে বাণিজ্যিক পণ্য বানিয়ে সুবিধা ও পুরস্কার অর্জন করেছে। তাঁর “আমি নাম আড়াল করলেও সত্য গোপন করিনি”—এই বাক্য আজকের সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপটে ভয়ংকর প্রাসঙ্গিক। কারণ এখন নাম-পরিচয় প্রকাশ করে অনেকেই গোপন করে ফেলছেন মূল সত্য, আর সত্যের ঝুঁকি নিচ্ছেন কেবল প্রান্তিক কয়েকজন।

বাঙলাদেশের সাংবাদিকতা বর্তমানে এক দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। একদিকে, ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যারা তৈরি করেছে তারা প্লট, বিদেশ সফর, মোটা সম্মানি, আর আর্থিক নিরাপত্তা অর্জন করছে। অন্যদিকে, যারা ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য প্রকাশ করছে, তারা কর্মস্থলে অবহেলিত, সমাজে নিঃসঙ্গ, আর ব্যক্তিগত জীবনে দারিদ্র্যপীড়িত। বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু তাই শুধু একজন প্রবীণ সাংবাদিকের ট্র্যাজেডি নয়, বরং পুরো গণমাধ্যমের অবক্ষয়ের প্রতীক।

বাঙলাদেশে সাংবাদিকতা আজ আর মূলত পেশা নয়, বরং ক্ষমতা ও সুবিধার দালালি আর চুপ থাকার চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। যখন কেউ সাহস করে এর বাইরে দাঁড়ায়, তখন তাকে অচল করে দেওয়া হয়, তার লেখা “পাঠক খায় না” বলে বাতিল করা হয়।

বাঙলাদেশি সাংবাদিকতার বর্তমান সংকটকে বুঝতে হলে এর অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হয়। দেশের প্রায় সব পত্রিকাই আজ বিজ্ঞাপননির্ভর—তাও মূলত কর্পোরেট বিজ্ঞাপন ও সরকারি বিজ্ঞাপন। কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের কারণে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রাখতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতাদের কোনো সমালোচনা ছাপানো যায় না। সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীলতার ফলে সংবাদপত্রগুলো সরকারবিরোধী সত্য প্রকাশ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। আর অনলাইন পোর্টালের যুগে অধিকাংশ সাংবাদিক মাসের পর মাস বেতন পান না, পানও যদি সেটা হয় ১০-১৫ হাজার টাকার অল্প পরিমাণ। সাংবাদিক ইউনিয়নগুলিও কার্যকরভাবে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছে না।

এই অর্থনৈতিক কাঠামোর ফাঁদে সাংবাদিকরা নিজেরাই ভেঙে পড়ছেন। তারা বাধ্য হচ্ছেন পার্টটাইম চাকরি করতে, মালিকের পক্ষের প্রচারণা চালাতে বা নিজের বিবেককে বারবার অস্বীকার করতে। এর ফলে সাংবাদিকতা হয়ে যাচ্ছে কেবল টিকে থাকার জন্য এক প্রকার বাজারি পণ্য, যেখানে মূলধারার বাইরে যারা সত্য বলছেন তারা বেকার হয়ে পড়ছেন, দারিদ্র্যপীড়িত হচ্ছেন।

বিভুরঞ্জন সরকার শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই। সাংবাদিক হিসেবেও এডাল ওডাল করে কোনো শক্ত ডাল ধরতে পারিনি।” এই আত্মস্বীকারোক্তি ভয়ংকর সত্যকে উন্মোচন করে—বাঙলাদেশের সাংবাদিকতায় আজ আর “সাহসী সত্যবক্তা”দের জায়গা নেই। তারা শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যান একা, ঋণগ্রস্ত, উপেক্ষিত।

তবু তাঁর মৃত্যুর পরও আমার মনে হয়, বিভুরঞ্জন সরকারের চিঠিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে—সত্য প্রকাশ করা এখনও সম্ভব। যদিও তার মূল্য ভয়ংকর। বাঙলাদেশের সাংবাদিকতা যদি আবার ন্যায্যতা ও জনস্বার্থের দিকে ফিরে যেতে চায়, তবে বিভুরঞ্জন সরকারের জীবনের এই করুণ অথচ আলোকিত দলিল থেকে শিক্ষা নিতেই হবে। নাহলে আমাদের সাংবাদিকতার পরিণতি হবে আরও অন্ধকার, যেখানে থাকবে কেবল প্রচারণা আর বাজারি সংবাদ, কিন্তু অনুপস্থিত থাকবে মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো সাহসী কণ্ঠস্বর।

দিনহীনের দিনলিপি : ২২ আগস্ট ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান

ষাটের দশকের কবিতায় যখন একদিকে রাজনৈতিক উত্তাপ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, তখন আবুবকর সিদ্দিক জঙ্গল, নদী, হাওর ও গ্রামের আকাশের নৈঃশব্দ্যের ভিতর দাঁড়িয়ে লিখেছেন মানুষ ও পরিবেশের অন্তরঙ্গ কথোপকথন।

ইদানিং আবুবকর সিদ্দিকের (১৯ আগস্ট ১৯৩৪—২৮ ডিসেম্বর ২০২৩) নাম তেমন কোথাও চোখে পড়ে না কেন? আপনাদের চোখে পড়ে? 

তাঁর কাব্যগ্রন্থ জোছনা ও মায়া কিংবা সন্ধ্যার গান পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এই কবি ভূগোলকে আত্মার উপকরণে পরিণত করেছেন। বৃষ্টির ধারা, মাটির গন্ধ, গাছের কাণ্ড—সবকিছু তাঁর কবিতায় শুধু উপমা নয়, বরং অস্তিত্বের অংশ। বাঙলাদেশ প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের যে গভীর অভিজ্ঞতা বহন করে, তার ভাষ্য তিনি দিয়েছেন এক ধীর অথচ গভীর টোনে।

কিন্তু শুধু প্রকৃতির কবি বললে আবুবকর সিদ্দিককে খন্ডিত বিচার করা হবে। তিনি ছিলেন সামাজিক সত্যেরও কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় যেমন আছে গ্রামীণ জীবনের অক্ষয় সৌন্দর্য, তেমনি আছে দারিদ্র্য, প্রান্তিক মানুষের বেদনা, অবহেলিত সমাজের দীর্ঘশ্বাস। আধুনিকতার আলো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তিনি সবসময় মনে করিয়ে দিয়েছেন—মানুষ কেবল শহরের নাগরিকতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার শেকড় মাটির ভেতরে, নদীর ধার ঘেঁষে, কৃষকের ঘামে।

২০২৩ সালের শেষ প্রহরে যখন তিনি চলে গেলেন, তখন বাঙলা কবিতা হারালো এক আত্মমগ্ন অথচ দায়বদ্ধ কণ্ঠ। আজকের বাঙলাদেশে, যেখানে প্রকৃতি ধ্বংসের মুখে, পরিবেশ প্রতিনিয়ত হুমকির শিকার, সেখানে আবুবকর সিদ্দিক বরং প্রাসঙ্গিক পাঠ। তাঁর কবিতার প্রতিটি গাছ, প্রতিটি নদী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা যদি প্রকৃতিকে ভুলে যাই, তবে নিজেদের অস্তিত্বকেও হারিয়ে ফেলব।

দিনহীনের দিনলিপি : ১৯ আগস্ট ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান

গতকাল সন্ধ্যায় এক বন্ধু ফোনে জানালেন—সোনালা ইব্রাহিম [২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৭—১৩ আগস্ট ২০২৫] মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল অষ্টআশি। খবরটা শুনেই মনে পড়ে গেল সেই বহুল আলোচিত ২০০৩ সালের কায়রো অপেরা হাউসের ঘটনা, যা আজও আরবি সাহিত্যচর্চার ভেতরে-বাইরে এক রকম প্রতীক হয়ে আছে। আমরা জানি, জীবদ্দশায় অনেক লেখক নানা পুরস্কার পান, গ্রহণ করেন, বক্তৃতা দেন। কিন্তু খুব কম জনই আছেন, যারা সেই সুযোগকেই রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। সোনালা ইব্রাহিম ছিলেন তাদেরই একজন।

সে বছর সরকার তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছিল আরবি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবে। উপস্থিত ছিল তাবড় তাবড় মন্ত্রী, সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা, আলো ঝলমলে সেলিব্রিটি সমাজ। যখন নাম ঘোষণা করা হলো, হাততালিতে গর্জে উঠল পুরো অপেরা হাউস। কিন্তু যিনি মঞ্চে উঠলেন, তাঁর চোখে-মুখে কোথাও কৃতজ্ঞতার হাসি নেই—বরং কণ্ঠে ছিল রুদ্ধ কষ্ট আর প্রতিবাদের দৃঢ়তা। হাতে মাইক নিয়ে তিনি বলেছিলেন—
“…আমাদের নাটক সিনেমা সাহিত্য গল্প-উপন্যাস থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিংবা শিক্ষা বিদ্যাচর্চা সবই গিয়েছে। বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। ... সরকার বলতে যা, তা হলো একগুচ্ছ মেলা-খেলা-মোচ্ছব আর মিথ্যার সমষ্টি। আর সীমাহীন দুর্নীতি। … দেশের সমগ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে দাবিয়ে রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ... দেশের মানুষের কাছে এই সরকারের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।...”

পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের এই ঘোষণার পর অপেরা হাউসে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তা বিস্ফোরণের চেয়ে কম কিছু নয়। মন্ত্রী-আমলা থেকে শুরু করে সাহিত্যিক-সেলিব্রিটি সবাই বুঝেছিলেন, এখানে সাহসের সংজ্ঞা রচিত হলো। পরবর্তীকালে ঘটনাটি “অপেরা ইনসিডেন্ট” নামে সাহিত্য ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

সোনালা ইব্রাহিমের জীবন যেন একেবারেই তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রতিচ্ছবি। তিনি একসময় কারাবন্দি ছিলেন, রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুলাগ-বন্দি সাহিত্য পড়তেন, নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে রূপ দিতেন উপন্যাসে। তাঁর প্রথম বড় কাজ That Smell (Tilka al-Ra’iha, 1966)—যা সেন্সরের কারণে বিকৃত রূপে প্রকাশিত হয়, কিন্তু তাতেও কায়রোর পরাজিত এক প্রজন্মের বাস্তবতা তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। The Committee (Al-Lajna, 1981)-তে দেখা যায় অদৃশ্য এক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এক নাগরিকের টিকে থাকার সংগ্রাম, যা নিছক রাজনৈতিক রূপক নয়—বরং আরব জগতের বাস্তবের শ্লেষ। আবার Zaat (1992)-এ তিনি এক নারী সাংবাদিকের জীবনকাহিনি দিয়ে গোটা মিশরীয় সমাজের দুর্নীতি, ধর্মীয় ভণ্ডামি, আর টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিসরকে ব্যঙ্গ করেছেন।

সোনালা ইব্রাহিমের ভাষা ছিল কঠোর, প্রায় কাটা-কাটা, শুষ্ক রিপোর্টের মতো। কিন্তু সেই শুষ্কতার মধ্যেই থাকত পাঠককে আন্দোলিত করার মতো বিদ্রোহী স্পন্দন।

ইব্রাহিমের লেখায় বারবার উঠে এসেছে রাষ্ট্রের মিথ্যাচার, দুর্নীতি, দমননীতি—এবং এর ভেতর আটকে থাকা সাধারণ মানুষের অসহায়তা। নিজের লেখনী এবং ব্যক্তিগত অবস্থান দুই দিয়েই দেখিয়ে দিয়েছেন—সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের উৎসব নয়, বরং সত্য বলার দায়।

বাঙলা ভাষার পাঠকমহলে আমরা তাঁকে চিনতেই পারিনি। হয়তো সমকালীন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধ সমালোচনা আড়াল করেছে তাঁর সাহিত্যকে। হয়তো অনুবাদের অভাবই আমাদের চোখ থেকে তাঁকে দূরত্বে রেখেছে। অথচ এ পৃথিবীতে যেখানে লেখকরা রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত, সেখানে সোনালা ইব্রাহিম দেখিয়েছেন—একজন ঔপন্যাসিক রাষ্ট্রকে আঙুল তুলতে পারেন, কণ্ঠে ঝড় তুলতে পারেন, এমনকি পুরস্কারের চকচকে আলোকও প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।

আমাদের সাহিত্য জগৎ যদি তাঁকে যথাযথভাবে স্মরণ না-ও করে, তাতে তাঁর গুরুত্ব কমে না। শুধু প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আসলেই বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তাল মেলাতে চাই, নাকি কেবল নিজস্ব পরিসরের মেলানকোলি আর আত্মতুষ্টি আঁকড়ে থাকতে চাই?

দিনহীনের দিনলিপি : ১৫ই আগস্ট ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান

আলো-অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ভেতরে গভীর ব্যাকুলতা ছিলো দেশকে বুঝতে চাওয়ার, নিজের সময়কে ধারণ করার, ফলে তার হাতেই সিনেমা হয়ে উঠেছে জাতির আত্মাকে প্রশ্ন করার ভিজ্যুয়াল ভাষা।

স্টপ জেনোসাইড দেখে এখনও আমার মনে হয়, তিনি শুধু পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞই নথিভুক্ত করেননি, বরং ইতিহাসের পিঠে রক্তাক্ত এক আর্তনাদ খোদাই করে গেছেন।

তাঁর সাহিত্যও একইরকম জরুরি। যেমন হাজার বছর ধরে উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন, কেমন করে একটি পরিবারের ইতিহাস পুরো বাঙালি জাতির ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে! প্রেম, বেদনা, সামাজিক ভাঙন—সব একসাথে মিলেমিশে গেছে।

জহির রায়হানের কলমে ব্যক্তিগত কাহিনি কখনোই স্রেফ ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে জাতির সমষ্টিগত স্মৃতি। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের সিনেমা ও সাহিত্য আরেক দিগন্ত ছুঁতে পারত।

কিন্তু যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল বিপজ্জনক। স্বাধীন বাঙলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান, তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে গেলেন। এই ভূখণ্ডে সাহসী কণ্ঠস্বরের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই হারিয়ে যাবার ঘটনা তারই প্রতীক। তবু আমি মনে করি, তাঁর না-ফেরা আমাদের একইসাথে ক্ষতি ও দায়। কারণ তিনি যেই স্বপ্নের আকার এঁকেছিলেন চলচ্চিত্রে ও সাহিত্যে, সেটিকে পূর্ণ করে তোলা এখনো আমাদের দায়িত্ব।

বাঙলাদেশের ইতিহাস যদি শুধু রাজনৈতিক দলিল দিয়ে লেখা হয়, তবে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে—তাকে পূর্ণতা দিতে প্রয়োজন হবে জহির রায়হানের ছবি আর লেখা। যতদিন না বাঙলাদেশ তার স্বপ্নের সমান হবে, ততদিন জহির রায়হান আমাদের কাছে এক অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি হয়ে থেকে যাবেন।

~

দিনহীনের দিনলিপি : ১৯ আগস্ট

❑ সাম্য রাইয়ান

যার নাম উচ্চারণও এই সময়ে সহজরৈখিক নয়, তিনি হুমায়ুন আজাদ; এক মেটাথিয়োরিকাল ব্যক্তি, যার কণ্ঠস্বর ছিল শুধু বিতর্কের জন্য নয়, বরং মুক্ত চিন্তার সন্ধানে এক ত্রাসদায়ক দার্শনিক পরীক্ষা। নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সামগ্রিক সমাজের কাঠামোর সংঘাত কখনো সরলভাবে মিটে না, বরং তা সবসময় দ্বন্দ্বপূর্ণ, জটিল এবং রহস্যময়। এই দ্বন্দ্বই আমাদের জন্য সতর্ক বার্তা বহন করে—স্বাধীন চিন্তার মূল্য কখনো সস্তা হয় না। তাঁর জীবন ও সাহিত্য এক দার্শনিক ত্রাসের আভাস বহন করে, যেখানে ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে ওঠে বিকাশমান আধুনিকতার ক্রান্তিকাল। 

আমার কাছে হুমায়ুন আজাদ কেবল একজন লেখক নন—ভাষার মাইনফিল্ড। তিনি শব্দকে এমনভাবে সাজিয়ে বাক্য গড়ে তোলেন, যা পড়তে পড়তে মনে হয়, প্রতিটি শব্দের ভেতরে বিস্ফোরক পুঁতে রাখা আছে; যে বিস্ফোরণ কেবল সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বস্তি তৈরি জন্য নির্মিত। তাঁর লিখনভঙ্গিমা নিরীহ জলধারা নয়; তা একদিকে ধর্ম, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় গঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অন্যদিকে ব্যক্তির মুক্তচিন্তাঞ্চল সন্ধানে রত। 

ঐতিহ্যগত শাসনকাঠামোকে কঠোরভাবে চ্যালেঞ্জ করে ধর্মীয় অথচ স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতাকে প্রবলভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছিলেন।

মানব জীবনের অর্থহীনতা ও অসহনীয়তাই তাঁর সাহিত্যের অন্যতম সুর। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল—তিনি আমাদের আরামকে ধ্বংস করতে চান। সেই আরাম, যেখানে আমরা নিজেদের ছদ্ম-নৈতিকতা, ভণ্ড উদারতা, আর ক্ষুদ্র স্বার্থে ঢেকে রাখি।

বাঙলা সাহিত্যে এরকম বিদ্যুৎ-তেজি, স্বতন্ত্র এবং ভয়ংকরভাবে যুক্তিবাদী কণ্ঠস্বর খুব কম এসেছে। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন লেখকের অবসান নয়—এ ছিল জনপরিসর থেকে এক অদম্য বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার অপসারণ। অথচ তাঁর অনুপস্থিতিতেও, তাঁর বাক্যগুলো এখনো বিদ্যুতের মতো আঘাত হানে—প্রমাণ করে যে, হুমায়ুন আজাদের আসল সমাধি তাঁর রচনার পৃষ্ঠায়, যেখানে তাঁর ক্রোধ, তির্যক হাসি, আর বুদ্ধির শীতল আলো অম্লান হয়ে আছে।

❑ সাম্য রাইয়ান

আমার বাড়ির পাশে একসময় যখন রেলস্টেশন সচল ছিল তখন দেখতাম ভোর থেকেই অসংখ্য মানুষ ব্যাগবস্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে—তাদের চোখে অনন্ত তাড়াহুড়ো, যেন ট্রেন মিস করলে কেবল গন্তব্য নয়, জীবনটাই হারিয়ে যাবে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অনেকে কোনো বগিতেই উঠতো না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকতো। যেন কোথাও যাবার জন্য জন্ম হয়নি তাদের, বরং যাবার দৃশ্য দেখাটাই তাদের নিয়তি। এই দৃশ্য মনে পড়ে যায় গাসসান কানাফানির Men in the Sun পড়তে পড়তে৷ যেখানে আবু কায়েস, আসাদ আর মারওয়ান—তিনজন শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে কুয়েতে যাবার জন্য মরিয়া, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে কেবল মৃত্যুর কাছে।

গাসসান কানাফানি (১৯৩৬–১৯৭২) ফিলিস্তিনের সেই লেখক, যিনি জানতেন যে শরণার্থীর গল্প কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি সমষ্টিগত রাজনৈতিক নথি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল মুক্তির হাতিয়ার—প্রতিরোধ-শিল্প। তিনি ছিলেন মার্কসবাদী, বিপ্লবী, এবং একইসাথে এক চরম মানবিক কথক। ফিলিস্তিনের নির্বাসিত জীবনের ধুলোমাখা প্রতিটি শ্বাস তিনি গল্পে রূপান্তর করেছিলেন, যেন ইতিহাসের পাতা নয়, সরাসরি মানুষের মাংসে খোদাই হয়ে থাকে।

Men in the Sun (১৯৬৩)–এ কানাফানি তিন ভিন্ন প্রজন্মের শরণার্থীর কাহিনী বলেন—পুরনো যুদ্ধে হারানো জমির ব্যথা, নতুন রাজনৈতিক সংকটে ছিন্নমূল হওয়া, আর যুবক বয়সের কর্মসংস্থানের হতাশা—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনের একটি যুগল প্রতিকৃতি তৈরি হয়। গল্পের শেষ মুহূর্তে চালক আবু খিজির সেই ঐতিহাসিক প্রশ্ন—“Why didn’t you knock on the walls of the tank?”—শুধু গল্পের তিন মৃত মানুষের প্রতি নয়, বরং সমগ্র উপনিবেশিত বিশ্বের প্রতি নিক্ষিপ্ত এক চাবুক। এখানে “ট্যাংকার” কেবল একটি যান নয়, বরং প্রতীক—অবরুদ্ধ বাস্তবতার, রাজনৈতিক নীরবতার, এবং মানুষের ভেতরে জমে থাকা ভয়ের।

আজকের দিনে এই প্রতীক আরও বিস্তৃত। গাজার শিশু যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে শ্বাস নিতে পারছে না, লিবিয়ার উপকূলে নৌকা ডুবে যাচ্ছে, বাঙলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে মানুষ কাঁটাতারের পাশে জীবন কাটাচ্ছে—তখন সেই “ট্যাংকার” আসলে আমাদের সময়ের প্রতিদিনের খবর। মৃত্যু এখনো আসছে, শুধু তার নাম পাল্টেছে—একদিন ছিল যুদ্ধ, আজ তার নাম সীমান্তনীতি বা অভিবাসন সংকট।

তাঁর আরেকটি অনন্য কাজ Returning to Haifa (১৯৭০)। সাঈদ আর সাফিয়া, ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় যাদের পাঁচ মাসের ছেলে হারিয়ে যায়, বিশ বছর পর ফিরে এসে দেখে—সেই সন্তানকে লালন করেছে এক ইহুদি দম্পতি, আর সে এখন ইসরায়েলি সেনা। এখানে কানাফানি কোনো নাটকীয় পুনর্মিলনের গল্প বলেননি; বরং নির্বাসনের এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছেন—তুমি যতই অতীত ফিরে পেতে চাও, সেটি হয়তো এমনভাবে বদলে গেছে যে, ফেরত পাওয়ার মানে দাঁড়ায় তাকে আরো বেশি করে হারিয়ে ফেলা। এই গল্পে “হারানো সন্তান” কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং হারানো মাতৃভূমির প্রতীক, যা শত্রুর পরিচয়ে গড়ে উঠেছে।

কানাফানির ভাষার বিশেষত্ব হলো তার সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ ও নিরাভরণ বর্ণনা। তিনি আবেগকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে লেখেন না, বরং কেটে-ছেঁটে এমন এক নগ্ন অবস্থা তৈরি করেন, যেখানে পাঠক নিজের আবেগ ঢেলে দেয়। তাঁর প্রতীকগুলো দৃশ্যত সহজ—ট্যাংকার, রাস্তা, হারানো সন্তান—কিন্তু এরা বহন করে গভীর রাজনৈতিক অর্থ। আর এখানেই তিনি এডওয়ার্ড সাঈদের মতো নির্বাসন-তত্ত্ববিদদের সাথে মিলে যান—যেখানে পরিচয়, স্মৃতি, স্থান সব একসাথে ভেঙে গিয়ে নতুন এক বিপর্যয়-বাস্তবতা তৈরি করে।

কানাফানি পড়ার অর্থ হলো নৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া। Men in the Sun–এর দেয়ালে কড়া নাড়ার আহ্বান আমাকে ভাবায়; Returning to Haifa আমাকে প্রশ্ন করে—আমি কি প্রস্তুত এমন এক ফেরার জন্য, যেখানে ফেরার জায়গাটাই আমার শত্রুর হাতে গড়ে উঠেছে?

১৯৭২ সালে বৈরুতে মোসাদ তাঁর গাড়িতে বোমা রেখে হত্যা করে। মৃত্যু তাকে থামাতে পারেনি; বরং তাঁর মৃত্যু নিজেই এক রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে উঠে—প্রমাণ করেছে যে, তার কলম ছিল ইসরায়েলি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে আতঙ্ক আর ভয়ংকর শব্দদুটির যৌথরূপ। আজ তাঁর লেখা পড়লে মনে হয়, এই গল্পগুলো শুধু ফিলিস্তিনের নয়, আমাদের সবার—কারণ প্রতিটি অবরুদ্ধ মানুষ, প্রতিটি নির্বাসিত আত্মা, আসলে একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়—“তুমি কি এখনও কড়া নাড়ছ?”

দিনহীনের দিনলিপি : নভেম্বর ২০১৫

❑ সাম্য রাইয়ান

আমি প্রথম ব্রেখট পড়ি কলেজে পড়ার সময়। তখন নাটক নিয়ে তেমন বোঝাপড়া ছিল না—ছিল কেবল গল্পের টান, চরিত্রের ভেতর ঢুকে পড়ার আনন্দ। কিন্তু মাদার কারেজ পড়ে আমি জাস্ট স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কেননা ব্রেখটের নাটক চরিত্রকে কেবল “বিশ্বাসযোগ্য” করে না, বরং চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমার কাছে এ এক অদ্ভুত উলোটপালোট অভিজ্ঞতা ছিল; গল্পে নিমগ্ন হওয়ার বদলে আমি গল্পের কাঠামো নিয়েই ভাবতে শুরু করলাম। অস্কার ইউস্টিস মাদার কারেজকে বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক এবং সম্ভবত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধবিরোধী নাটক বলে মন্তব্য করেছিলেন।

ব্রেখটের সবচেয়ে বড় সাহস ছিল নাটককে বিনোদনের নিরাপদ অঞ্চল থেকে সরিয়ে এনে চিন্তার ক্ষেত্র বানানো। তাঁর “Verfremdungseffekt”—যাকে আমরা বিচ্ছিন্নকরণ প্রভাব বলি—ছিল এই তত্ত্বের কেন্দ্রে। ব্রেখট বিশ্বাস করতেন, নাটক দর্শককে গল্পে ডুবিয়ে রেখে নিষ্ক্রিয় করে তুলবে না; বরং দূরত্ব তৈরি করবে, যাতে দর্শক সমালোচনামূলক বোধ নিয়ে ঘটনাগুলো ভাবতে পারে। হয়তো এজন্যই তাঁর নাটক পড়তে গিয়ে আমি বারবার কেবল চরিত্রের সাথে নয়, লেখকের সাথেও আলাপ করতে চাইতাম—কেন এখানে এই সংলাপ, কেন ওই মঞ্চ-নির্দেশনা?

ব্রেখট শিল্পীকে সমাজের এমন অংশ হিসেবে দেখতেন, যে সমাজের অবিচারকে দেখে, বুঝে, এবং প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। তাঁর গ্যালিলিও’র জীবন নাটকে বৈজ্ঞানিক সত্য আর রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এমনভাবে এসেছে, যা পড়লে আজকের পৃথিবীর জ্ঞানবিরোধী রাজনীতির মুখোশও খুলে যায়। গ্যালিলিও এখানে নায়কও, আবার আপসকামী মানুষও—এ দ্বৈততা আমাদের দেখায়, ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, লজ্জারও দলিল।

ব্রেখটকে স্মরণ করার মানে সেই দৃষ্টিকে স্মরণ করা—যা আমাদের স্বস্তি ভাঙতে বাধ্য করে। আজকের বাঙলাদেশি থিয়েটার বা সাহিত্যেও যদি আমরা একটু ব্রেখটীয় দূরত্ব আনি, তবে হয়তো দর্শক হাসিকান্নার অনুভূতির পাশাপাশি প্রশ্নও করতে শিখবে। কেন এই চরিত্র এমন হলো? কেন এই সমাজ এমন? কেন আমি এমন?

লেখক হিসেবে আমার জন্য ব্রেখটের বড় শিক্ষা—গল্প বলো, কিন্তু গল্পের ভেতরে থাকা গোপন যন্ত্রগুলোও দর্শককে দেখাও। কারণ সচেতন দর্শকই একমাত্র পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। হয়তো এজন্যই তিনি বলেছিলেন— “শিল্প কেবল আয়না নয়, হাতুড়িও বটে—যা দিয়ে আমরা পৃথিবীকে গড়তে পারি।”

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *