প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

❑ সাম্য রাইয়ান 

বাঙলা ছোটোগল্পের অন্দরভুবনে একবিংশ শতাব্দীতে যে রূপগত পরিবর্তন এসেছে, তার ভেতরে কবীর রানার নামটি আলাদা গুরুত্ব নিয়ে উচ্চারিত হবার মতো। তাঁর গল্প প্রথমদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়—রাজনীতি, ভাষা, ইতিহাস, স্মৃতি, পৌরাণিক ভাবনা, নগরজট, অন্তর্গত অন্ধকার, অদৃশ্য ক্ষমতা এবং মানুষের একাকিত্ব—এসব মিলেমিশে তাঁর গদ্যের অন্তরালে তৈরি হয় এক তীব্র এবং ধোঁয়াটে রূপকবিশ্ব। ছোটোগল্পের এই গঠনে দৃশ্যমান ঘটনা অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘ঘটনার ভাষা’, এবং ঘটনার ভিতরে জমে থাকা ‘অবচেতনের বিস্তার’। এই বিস্তারই তাঁর গল্পকে সহজপাঠ্য থেকে বহুস্তরীয় বয়নকৌশলে রূপান্তরিত করে।

কবীর রানার গল্পে যে চিত্রলহরি, তা একদিকে গভীরভাবে দেশজ, অন্যদিকে গভীরভাবে উত্তর-আধুনিক বোধের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর গল্পে দেখা যায় মানুষ অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে লড়াই করে, কখনো সেই শক্তি রাষ্ট্র, কখনো সমাজ, কখনো প্রযুক্তি, কখনো স্মৃতি; অথচ সেই শক্তিকে স্পষ্ট নাম দেওয়া হয় না। ফলে গল্পগুলো একধরনের সংকেতভিত্তিক মানচিত্র হয়ে ওঠে, যার ভেতরে পাঠককে নিজস্ব চাবিকাঠি দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।

বাঙলা ছোটোগল্পের জগতে আভাস-নির্মিত গদ্যশৈলী খুব বেশি দেখা যায় না, ঠিক এই বিন্দুতেই কবীর রানা প্রবল ব্যতিক্রম। তিনি কখনো হঠাৎ গল্পের কেন্দ্রে রেখেছেন একটি হারিয়ে যাওয়া দরজা; আবার কখনো তুলে ধরেছেন এমন একটি শহর যেখানে বিজ্ঞাপনগুলো রহস্যময়ভাবে বাতাশে মিলিয়ে যায়; কখনো দেখিয়েছেন এমন পরীক্ষা-হল যেখানে একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ তার শরীরে এক স্পর্শ অনুভব করে—যার ব্যাখ্যা কেউ দেয় না, কিন্তু সেই অভিঘাত সমাজটিকে ভেতর থেকে উন্মুক্ত করে দেয়।

এভাবে, কবীর রানা তার গল্পে বাস্তবতাকে ঠাঁই দিলেও একথা বলতে হয়—বাস্তবতাই তার গল্পের শেষ সত্য নয়। বাস্তবতাকে গল্পে এনে তিনি তার ওপর নির্মাণ করেন রূপকের একটি নতুন, কুয়াশামাখা ভূগোল—যার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাঠক নিজেকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করেন।

নতুন শতকের বাঙলা ছোটোগল্প ক্রমশ যখন সারল্য, স্মৃতিনির্ভর রোমান্থন কিংবা দৈনন্দিন বাস্তবতার সরাসরি প্রতিবেদনধর্মী বয়ানের দিকে ঝুঁকছিল, তখন কবীর রানা সেই প্রবাহের পাশে দাঁড়িয়ে তৈরি করছিলেন আরেকটি পথ—যেখানে গল্পের মূল শক্তি ঘটনাপুঞ্জে নয়, ঘটনার মধ্যবর্তী অংশে, ভাষার ভিতরের গোপন চলনে। এই কারণে তাঁর গল্প পাঠের মধ্য দিয়ে তাকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল—অর্থাৎ অনুভূতির ধূসরতা, অজানা আতঙ্ক, চিহ্নহীন সংকেত, এবং বাস্তবের ভেতর লুকোনো পরাবাস্তব গাঁথুনি—এসবও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রানা গল্পকে ব্যবহার করেন একপ্রকার ক্ষেত্র-পরীক্ষা হিসেবে, যেখানে সামাজিক সজ্জা, ক্ষমতার বলয়, নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক দোলাচল কিংবা স্মৃতি-অচেতন—এসবকে একেকটি বিমূর্ত শক্তি হিসেবে হাজির করা হয়। ফলে তাঁর গল্পে দৃশ্যমান ‘কী ঘটল’—এর চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ‘কেন ঘটল’, কিংবা তারও গভীরে—‘ঘটনার শূন্যে পাঠক কী শুনতে পেলেন’।

এই বোধটি বুঝতে হলে পাঠককে গল্পের প্রচলিত কাঠামো থেকে একটু সরে আসতে হয়। রানা আমাদের সামনে এমন চরিত্র হাজির করেন, যারা কখনো শহরের ভিতরে উড়ে যাওয়া বিজ্ঞাপনের সঙ্গে লড়াই করছে, কখনো নিজের ঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া দরজার অনুসন্ধানে পথ হারাচ্ছে, কখনো আবার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দমবন্ধ করা নির্দেশের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। এই চরিত্ররা সাধারণ মানুষের প্রতিরূপ হলেও, তাদের অভিজ্ঞতা সাধারণ থাকে না; বরং ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রতীকে। গল্পের কার্যকারিতা এখানেই—চরিত্র যেন তার সংকটের ভাষা হয়ে ওঠে, গল্প যেন তার সময়ের সমগ্র অভিঘাত বহন করে।

এইসব কারণেই কবীর রানার গল্প একক অভিজ্ঞতার সীমা পেরিয়ে এক যুগের সামষ্টিক পাঠ হয়ে ওঠে। তাঁর অভিনব চিত্রকল্প—যেমন বনের ভেতর গভীর রাতে দাঁড়িয়ে থাকা দরজাবিহীন বৃদ্ধ, কিংবা এমন তরুণেরা যারা নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইন্টারনেটে আপলোড করে অমরত্ব খোঁজে—এসবই আমাদের যুগের গভীর মানসিক সংকটকে প্রতীকী কাঠামোয় ধরে ফেলে। এমনকি যখন তিনি একটি ক্ষুদ্র গ্রাম বা একটি অবহেলিত জনপদের কথা বলেন, তখনও স্থানীয়তার সংকীর্ণ গণ্ডিতে সেই আখ্যান ভেঙে পড়ে না; বরং ছড়িয়ে পড়ে সামগ্রিক মানবজিজ্ঞাসায়। এতে বোঝা যায়, তাঁর গল্পে স্থান-কালিতার ভৌগোলিক সীমানা গুরুত্ব পেলেও সেটি গল্পের চূড়ান্ত আগ্রহ নয়; আগ্রহ হলো মানুষের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা, এবং সেই ধারাবাহিকতার ভেতরে জন্ম নেওয়া অনিশ্চয়তা।

এমন স্বাতন্ত্র্যই পাঠকের সামনে এক ধরনের প্রস্তুতির দাবি তোলে। পাঠককে প্রস্তুত থাকতে হয় গল্পের ভেতরে হঠাৎ খোলা অগণিত দরজা কিংবা সিঁড়ির জন্য, প্রস্তুত থাকতে হয় ভাষার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে থাকা ভাষার গোপন নকশা অনুধাবন করার জন্য। ঠিক এই জায়গাতেই তাঁর গল্পগুলো হয়ে ওঠে একেকটি অভিজ্ঞতা, যার ভেতরে পাঠকের নিজস্ব বোধও ধীরে ধীরে আকার বদলায়।

এই প্রেক্ষাপটে এবার তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প—‘হাত’, ‘রাজহাঁসগুলো আমাদেরকে ধর্ষণ করেছিলো’, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ’, ‘বিজ্ঞাপন চুরি হয়ে যাচ্ছে’, ‘দরজা’, ‘পদ্মপুকুর’, ‘কেউ চুম্বন করেনি’, ‘জমির দলিল বিক্রি করা হবে’—প্রতিটির উপর বিশদ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। কারণ প্রতিটি গল্পই কবীর রানার নির্মিত ওই রূপকবিশ্বের আলাদা আলাদা জানালা, এবং প্রতিটি জানালার দৃশ্যপট ভিন্ন, অথচ পরস্পরকে ছায়ার মতো স্পর্শ করে যায়। এখন সেই গল্পগুলোর দিকে আলাদাভাবে এগোনোর আগে এটি মনে রাখা জরুরি—এই গল্পগুলো পড়তে গেলে আমাদের পূর্বানুমান, অভ্যাসগত পাঠপ্রণালী ও অর্থ-অন্বেষণের সহজ সূত্রগুলো সাময়িক বিরতি নেয়; ফলে পাঠক ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন এমন এক ভূগোলে, যেখানে অর্থ আসে বিক্ষিপ্ত ছায়া থেকে, অসমাপ্ত দৃশ্য থেকে, এবং চরিত্রের অভ্যন্তরের অনিশ্চয়তাপূর্ণ দোদুল্যমানতা থেকে।

এই সেতুবিন্দুটি মাথায় রেখে তার গল্প পাঠের দিকে এগোনোই যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে করি।

কবীর রানার অন্যতম শক্তিশালী গল্প ‘হাত’। গল্পটি পড়লে মনে হয় যেন পরিচিত একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো সাধারণ ঘটনা ঘটছে—এক শিক্ষার্থীর শরীরে পরীক্ষার সময় একটি হাত এসে পড়েছে। কিন্তু খুব দ্রুতই বোঝা যায়, এই ঘটনার ভেতর লুকিয়ে আছে ক্ষমতার কাঠামো, জ্ঞানের রাজনীতি, এবং শরীরকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আধিপত্যের মানচিত্র। রিয়া যখন বলে “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে শরীরচর্চার ক্ষেত্র”, তখন সে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাষাহীন দুর্নীতি তুলে ধরে না, বরং দেখিয়ে দেয় একটি সমাজ কীভাবে জ্ঞানের আড়ালে শরীরকে অঙ্কিত ও সংজ্ঞায়িত করে।

গল্পটির শক্তি এই যে, ‘হাত’ এখানে একটি ঘটনা নয়; এটি একটি প্রতীক, এমন প্রতীক যার ভেতরে লুকিয়ে আছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার অসঙ্গতি, লিঙ্গ-রাজনীতির অদৃশ্য চাপ, এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ক্ষমতার বলয়। রিয়া যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানায়, তখন গল্পে দেখা যায় “হাত” নিয়ে সমাজের যুক্তিকাঠামো কেমন জট পাকিয়ে যায়। আলোচনা, তর্ক, নৈতিকতা—সবকিছু মিলে একধরনের বিকৃত নাট্যমঞ্চ তৈরি করে। গল্পটির আড়ালে তাই শুধু নারী-শরীরের নিয়ন্ত্রণ নয়—এখানে উঠে আসে জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি বৃহত্তর যন্ত্রের ছবি।

অন্যদিকে, ‘দরজা’ গল্পে আমরা দেখি এক বয়স্ক কাঠমিস্ত্রি আফসারকে—যার জীবনের সারাংশ জন্ম থেকেই দরজা তৈরি করা, কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে সে নিজের ঘরের দরজাগুলো খুঁজে পাচ্ছে না। সন্তানরা কোথায় যেন সেগুলো সরিয়ে ফেলেছে। দরজা না থাকায় সে একটি অদ্ভুত যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে—অরণ্যে যায়, গাছগুলোর সামনে দাঁড়ায়, এবং উপলব্ধি করে গাছই আসলে দরজার আদিস্বজন। এই ‘আবিষ্কার’ তার ভিতরের দীর্ঘদিনের অপরাধবোধকে স্পর্শ করে—সে বুঝতে পারে, যেসব গাছকে কেটে সে সারাজীবন বসবাসের জন্য দরজা তৈরি করেছে, সেই গাছই ছিল তার অস্তিত্বের ছায়া।

এই গল্প মূলত মানুষের শ্রমজীবনকে অন্য আলোয় দেখায়। আফসার দরজা বানিয়ে সারাজীবন কাটিয়েছে, কিন্তু সে কখনো তার নিজের জীবনের ‘খোলা-বন্ধ’ হওয়ার জায়গাকে বুঝতে পারেনি। গল্পটি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক প্রশ্ন ছুঁয়ে যায়—আমাদের জীবনে যে দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়, সেগুলোর প্রকৃত আকার কোথায়? আমরা কি সত্যিই জানি— কোন দরজায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি?

‘বিজ্ঞাপন চুরি হয়ে যাচ্ছে’ গল্পটি এক অদ্ভুত শহরকেন্দ্রিক রূপকে ভরপুর। যেখানে প্রতিদিনের খবরে দেখা যায়—বাড়িভাড়া, চাকরির নিয়োগ, মানুষের আপাত প্রয়োজনের বিজ্ঞাপনগুলো হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এই বিজ্ঞাপন হারিয়ে যাওয়াকে তিনি শুধু শহরের অস্থিরতা হিসেবে দেখান না, বরং একটি অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহার করেন।

নগরে মানুষের জরুরি প্রয়োজনের তথ্য—যা সাধারণত প্রকাশিত হয় বিজ্ঞাপনে—সেগুলো হারিয়ে যাওয়া মানে শহরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গোপন কাঠামো ব্যাহত হওয়া। আর গল্পের আড়ালে স্পষ্ট যে আধুনিক শহর এমনভাবে নির্মিত— সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজনও ধীরে ধীরে একটি অশরীরী ব্যবস্থার হাতে চলে যায়। বিজ্ঞাপন হারিয়ে যাওয়ার এই পরাবাস্তব ঘটনাটি বাস্তবের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে, এবং পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে—কীভাবে শহর আমাদের জীবনের নিত্য প্রয়োজনের তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।

‘জমির দলিল বিক্রি করা হবে’ গল্পে সাতমাথা শহরের এক ‘মেথরপট্টি’-র কথা উঠে আসে—যেখানে রাস্তা পরিষ্কার করা শ্রমজীবী মানুষরা বহু বছর ধরে থাকে, অথচ কোনো দলিল নেই, কোনো মালিকানা নেই। এই গল্পে কবীর রানা দৃশ্যত বাস্তবতার ভিতর দিয়ে আঘাত করেন—কেন এই লোকগুলো শহরকে পরিষ্কার রাখলেও শহর তাদের ঠিকানা স্বীকৃতি দেয় না? কীভাবে মালিকানার রাজনীতি গড়ে ওঠে, এবং সেই রাজনীতির আড়ালে কীভাবে মানুষকে অদৃশ্য করে রাখা হয়?

এই গল্পের মূল শক্তি তার সংযমী ভাষায়। রানা কখনো আবেগী হন না, বরং ঘটনাগুলোই এখানে কাজ করে প্রধান শক্তি হিসেবে। জমির দলিল, একটি কাগজ—যার মূল্য শূন্যও হতে পারে, আবার জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তও দিতে পারে—এই কাগজকেন্দ্রিক গল্পটি আসলে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্ববহ দার্শনিক প্রতীক চিহ্নিত করে।

‘রাজহাঁসগুলো আমাদেরকে ধর্ষণ করেছিলো’ গল্পটি রানা-গদ্যের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ—রাজনীতি, দেহ, ইন্টারনেট-বাস্তবতা এবং সমষ্টিগত উন্মাদনা। গল্পের শুরুতে দেখা যায় নির্বাচনের সময় নাগরিকদের বলা হচ্ছে—“নগরের বাক্সে জমা আছে আমাদের হাত।” হাতকে শুধু ভোটের প্রতীক নয়, ব্যক্তিসত্তার সনদ হিসেবে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। ভোটের সময় হাত তোলা, হাতের তালিকা, হাতের নথি—সব মিলিয়ে একটি বিকট প্রশাসনিক রূপকে তৈরি করে।

গল্পের পরবর্তী অংশ আরও ভয়াবহভাবে চিত্রিত হয়—মানুষজনকে বলা হয়, পরিচয়পত্র হারালে মানুষ হাত-পা-গৃহ সব হারাবে। গল্পে তরুণেরা নিজেদের অনুভূতি বাঁচাতে হাত-পা ইন্টারনেটে আপলোড করে বলে, “ইন্টারনেট আমাদের অমর করে তুলেছে।”

এখানে কবীর রানা যে আধুনিকতা-বিশ্লেষণ করেছেন তা অসাধারণ—ইন্টারনেটে আপলোড মানেই অমরতা—এমন ধারণা আজকের তরুণ প্রজন্মের গভীর ভয় ও অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। এ যেন এক ডিজিটাল যুগের পুরাণ, যেখানে মানুষ নিজের শরীরকে মেঘে ভাসিয়ে ‘অমরত্ব’ খোঁজে।

‘পদ্মপুকুর’ গল্পকে শহরের আর্কিটেকচার-দর্শন হিসেবে পড়া যেতে পারে। গল্পে সেউজগাড়ি নামে একটি শহরের কথা বলা হয়েছে, যেখানে মরুভূমি থেকে ছায়া এনে উঁচু দালান নির্মাণ করা হয়। শহরেচিহ্নগুলো এত বিশাল যে মানুষ আকাশ দেখতে পারে না। পরে বোঝা যায়—শুধু ইট-সিমেন্ট দিয়ে শহর নির্মাণ করলে চলে না; মানুষের দৃষ্টি কোথায়, মানুষের অস্তিত্ব কোথায়—সেটিও বিবেচ্য।

এ গল্পটি অত্যন্ত সমকালীন—দালান দিয়ে আকাশ ঢেকে ফেলা মানে মানুষের মনকেও ঢেকে ফেলা। ফলে গল্পটি শুধু স্থাপত্য নয়, মানুষের জীবনপ্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

সবশেষে, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ’—যা কবীর রানার অন্যতম জটিল গল্প। গল্পটি বিভিন্ন খণ্ডচিত্রে গঠিত, এবং প্রতিটি খণ্ড একটি নিরাপত্তা-ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে: পরিবার, রাষ্ট্র, পরিচয়, ঘর, ভাষা—এইসব স্বতঃসিদ্ধ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গল্পে অদ্ভুতভাবে ভেঙে পড়ে।

গল্পটি খুবই কাব্যময় বলে একাধিক পাঠক একে ‘চিত্রকল্পের বিস্ফোরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই গল্পে রানা ঠিক ‘ঘটনা’ লেখেননি; বরং লিখেছেন নিরাপত্তাহীনতার এক দীর্ঘ কাব্যগদ্য, যেখানে পাঠককেই নিজস্বভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। খণ্ডচিত্রগুলো একেকটি অস্থির মানসিক অবস্থা ফাঁস করে দেয়।

এই সব গল্প একত্রে পড়লে বোঝা যায়—কবীর রানা ছোটোগল্পকে কেবল গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে গল্প মানে প্রশ্নের বহুবিশ্ব—যেখানে মানুষের জীবন একটি ভৌগোলিক মানচিত্র, আবার একইসঙ্গে মানসিক অরণ্য। কখনো অদৃশ্য হাত, কখনো অদৃশ্য দরজা, কখনো অদৃশ্য বিজ্ঞাপন, কখনো অদৃশ্য পরিচয়—এসব মিলিয়ে একটি অচেনা কিন্তু ভয়ানকভাবে পরিচিত পৃথিবী।

এই পৃথিবী পাঠককে শুধু ভাবায় না; তাকে নিজের ভেতর তাকাতেও বাধ্য করে। আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষের বিচ্ছিন্নতা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, মালিকানার রাজনীতি, নগরের অজস্র দিক এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ—এসবের মাঝখানে কবীর রানার গল্পগুলি এক ধরনের সতর্কতার ঘন্টা বাজায়।

বাঙলা ছোটোগল্পে যেখানে আগে গল্প বলতে বলতে চরিত্রের জীবন তুলে ধরা হতো, সেখানে কবীর রানা চরিত্রের জীবন নয়—জীবনের প্রতীকী দোকানঘর, রাস্তা, দরজা, ছায়া, শরীর, দলিল—এসব ব্যবহার করে গড়ে তোলেন মানুষের মনস্তত্ত্বের অদৃশ্য কাঠামো।

তার গল্পে পাঠক আপাতভাবে অস্বস্তি অনুভব করতে পারে, আর তাতেই গল্পের সার্থকতা। যে গল্প পাঠকের মধ্যে জিজ্ঞাসা তৈরি করতে পারে, সে-ই তো টিকে থাকে নাকি?


❑ সাম্য রাইয়ান 

রাজনৈতিক কবিতা বলতে আমরা সাধারণত সেই কবিতাকেই বুঝি, যেখানে সমাজ, রাষ্ট্র, শ্রেণিবিন্যাস, শোষণ, বিপ্লব ও মানবমুক্তি নিয়ে ভাবনা কাব্যের ভাষায় প্রকাশ পায়। কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক কবিতা কখনোই দলীয় প্রচারণা নয়; বরং তা মানুষের অস্তিত্ব, ন্যায়বোধ, ও স্বপ্নের কাব্যিক অনুবাদ। কবিতা তখনই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, যখন তা ক্ষমতার কেন্দ্রে আঘাত করে, ব্যক্তি ও সমাজের অদৃশ্য বৈষম্যের রেখা উন্মোচিত করে, এবং মানুষকে তার নিজস্ব মর্যাদা ও শক্তি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। বাঙলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক কবিতার ধারা গড়ে উঠেছে—যেখানে প্রেমও রাজনৈতিক, শরীরও রাজনৈতিক, আর দ্রোহও গভীর মানবিকতার ভাষা। রুদ্রের ইশতেহার এই ধারার এক অনবদ্য ও সমকালীন প্রতিধ্বনি—যা ইতিহাসের ছায়া ও ভবিষ্যতের আলো একসঙ্গে ধারণ করে, এবং মানুষের আত্মমুক্তির ভাষায় রচিত হয় এক বিস্তৃত মানবিক ম্যানিফেস্টো হিসেবে।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ইশতেহারকে বলা যেতে পারে আদিম সাম্যবাদী স্মৃতির প্রতি আহ্বান এবং ভবিষ্যৎ সমতার কাব্যিক মানচিত্র। এটি সেই দীর্ঘশ্বাস, যা ইতিহাসের স্তরে স্তরে জমে থাকা মানুষের নিস্পৃহতা, প্রতারণা, প্রেম, সংগ্রাম, ও মৃত্যুর সমবেত প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। এখানে কবি নিজেকে একজন একক কণ্ঠ নয়, বরং এক সমষ্টিগত আত্মার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত করেন।

রুদ্রের এই কবিতা বিশ্বকবিতার সেই দীর্ঘ ধারার অংশ, যেখানে কবিরা ভাষাকে রাজনৈতিক চেতনার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন পাবলো নেরুদার Canto General লাতিন আমেরিকার আদিবাসী ও শ্রমজীবীদের কণ্ঠ হয়ে ওঠে, তেমনি রুদ্রের ইশতেহার বাঙলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের স্বপ্নের প্রতিধ্বনি। নেরুদা যেমন সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শ্রম ও ভালোবাসাকে পুনর্দখল করতে চান, রুদ্রও ঘোষণা করেন—“আমাদের পুরুষেরা সুলতানের ছবির পুরুষের মতো স্বাস্থ্যবান, কর্মঠ আর প্রচণ্ড পৌরুষদীপ্ত হবে।” উভয় কবিই বিশ্বাস করেন, মানবমুক্তির ভিত্তি গড়ে ওঠে শ্রম, শরীর ও শিল্পের সম্মিলনে।

কবিতাটি শুরু হয় আদিম মানবসমাজের এক নিস্পাপ সমতার কল্পচিত্র দিয়ে—যেখানে মানুষ প্রকৃতির সন্তান, ভূমির কোনো মালিকানা নেই। এই কৌমজীবনে শরীর ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। “আমরা তখন সোমরস, নৃত্য আর শরীরের পবিত্র উৎসব শিখেছি”—এই পংক্তি শরীরের ভোগবাদী বন্দনা নয়; বরং মানুষের অস্তিত্বে শরীরের স্বাভাবিকতা ও পবিত্রতাকে পুনরুদ্ধারের ঘোষণা। কিন্তু পরমুহূর্তেই কবি ঘোষণা করেন: “তারপর—কৌমজীবন ভেঙে আমরা গড়লাম সামন্ত সমাজ।” এখানেই শুরু হয় মানবসভ্যতার ট্র্যাজেডি। আত্মরক্ষার অস্ত্র পরিণত হয় দমনযন্ত্রে, কৃষি ও যন্ত্র সভ্যতা হয়ে ওঠে শৃঙ্খলের প্রতীক। “আমাদের নির্মিত যন্ত্র শৃঙ্খলিত করলো আমাদের”—এই পংক্তিতে কবির ইতিহাসচেতনা এক দার্শনিক স্তরে পৌঁছে যায়।

মানুষ বারবার খাঁচা তৈরি করে, আবার ভাঙে, আবার বন্দি হয়—এই চক্রই রুদ্রের ইতিহাসবোধের কেন্দ্র। “আমরা আবার খাঁচা বানিয়েছি, আবার বন্দি হয়েছি, আবার একা হয়ে গেছি”—এই স্বীকারোক্তি কেবল এক ব্যক্তির নয়, সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বগত একাকিত্বের প্রতীক।

এখানেই জন্ম নেয় কবিতার কেন্দ্রীয় ‘আমি’। এই ‘আমি’ কেবল রুদ্র নন—তিনি মুক্তিযুদ্ধের তরুণ, শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি, এক বঞ্চিত নাগরিক, এবং এক চিরদ্রোহী মানবপ্রাণ। “সে আমি”—এই পংক্তিটি যেন সমগ্র কবিতার হৃদস্পন্দন। এখানে ব্যক্তিগত জীবন ও ইতিহাস পরস্পরে মিশে যায়; আত্মজৈবনিক যন্ত্রণা পরিণত হয় সম্মিলিত মানবস্মৃতিতে।

রুদ্রের ‘আমি একা’ উচ্চারণটি এক অর্থে ওয়াল্ট হুইটম্যানের Song of Myself-এর প্রতিধ্বনি হলেও প্রকৃত অর্থে এটি তার প্রতিবাদ। হুইটম্যানের ‘আমি’ আত্মবিশ্বাসী ও বিশ্বজনীন; রুদ্রের ‘আমি’ ক্ষতবিক্ষত, দমিত, এবং সামাজিক কাঠামোর বন্দি। তবু উভয়ের মধ্যেই মানুষের প্রতি অগাধ আস্থা বিদ্যমান। রুদ্রের একাকিত্ব কোনো হতাশা নয়—এটি সেই প্রস্তুতি, যেখান থেকে নতুন সমাজের স্বপ্নের সূচনা হয়।

এই একাকিত্ব থেকে সমতার দিকে যাত্রাই রুদ্রের ইশতেহার-এর মর্ম। “আমার জীভ কাটা / তবু এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন আমাকে কাতর করে”—এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে, কবির ভাষা ক্ষতবিক্ষত হলেও তাঁর আশা অক্ষয়। কবি জানেন, পৃথিবীর চিকিৎসা বিজ্ঞানে নয়, বরং মানবিকতায়। “আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান নিরোগ করবে পৃথিবীকে”—এই স্বপ্ন কোনো ইউটোপিয়া নয়; বরং বিজ্ঞান ও মানবতার মেলবন্ধনে বিশ্বাসী এক সমাজচিন্তার প্রতিধ্বনি। তাঁর পৃথিবীতে নারী শ্রমবতী ও লাবণ্যময়ী, পুরুষ কর্মঠ, শিশু সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। এখানে শরীর, শ্রম ও স্বপ্ন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একদল ‘সামান্য কিছু মানুষ’—যারা সবচেয়ে কম শ্রম দেয়, অথচ সবচেয়ে বেশি সম্পদ ভোগ করে। তারা সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মের নামে তৈরি করেছে এক ভয়ংকর কারাগার। তাদের পুরুষেরা কদাকার, নারীরা কৃত্রিম, তারা মানবতাবিরোধী। রুদ্র তাদের বলেন “অতিকায় কদাকার বন্যমানুষ।” কবিতার অন্তিম পর্বে তিনি আহ্বান জানান—এই কারাগার ভেঙে, এই মানুষগুলিকে অতিক্রম করে, আবারও একটি উৎসবমুখর সমতার পৃথিবী গড়ার।

রুদ্রের ভাষা এখানে ঘোষণা, অভিশাপ, প্রার্থনা ও স্বপ্নের এক মিশ্র ধ্বনি। “আমরা উৎসব করবো শস্যের / আমরা উৎসব করবো পূর্ণিমার”—এই পংক্তিগুলো এক শোষণহীন ভবিষ্যতের প্রতীক। এই কবিতা তাই একাধারে ইতিহাসের রূপক ও ভবিষ্যতের ম্যানিফেস্টো।

এখানে তুলনা টানা যায় আমেরিকান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের Howl-এর সঙ্গে। Howl যেমন এক ক্ষতবিক্ষত প্রজন্মের আর্তনাদ—“I saw the best minds of my generation destroyed by madness”—তেমনি রুদ্রের ইশতেহারও এক ভাঙন ও বিশ্বাসহীন সময়ের আত্মপ্রত্যয়। গিন্সবার্গ যেমন মার্কিন ভোগবাদী সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, রুদ্র তেমনি উপনিবেশোত্তর দুর্নীতিপূর্ণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ভাষা দুই কবির হাতেই পরিণত হয় অস্ত্রে; ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রূপ নেয় সামাজিক ঘোষণাপত্রে।

একইভাবে বার্টোল্ট ব্রেখটের To Those Born Later কবিতার সাথেও ইশতেহার-এর আত্মিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রেখট লিখেছিলেন “in the dark times”–এ জন্মানো এক হতাশ প্রজন্মের কথা; রুদ্রও লিখেছেন এমন এক সময়কে কেন্দ্র করে, যখন মানুষ বারবার খাঁচায় বন্দি হয়েও মুক্তির স্বপ্ন দেখে। এই দুই কবিতাই মানবিক চেতনার ঘোষণাপত্র—একদিকে ইউরোপের ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিবাদ, অন্যদিকে বাঙলাদেশের পরাজিত স্বাধীনতার অন্তর্গত শোক ও সম্ভাবনা।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ইশতেহার আধুনিক বাঙলা কবিতার এক ব্যতিক্রমী মাইলফলক। এর ভেতরে আছে গদ্য ও কাব্যের সীমা অতিক্রমের সাহস, ইতিহাস ও দর্শনের সংলাপ, ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব, এবং প্রেম ও বিপ্লবের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। এই কবিতা একাধারে মানবিক আর্তি ও দার্শনিক ঘোষণা। এর মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ উন্মোচিত হয়, তা কেবল সমাজ-রাজনৈতিক নয়, নন্দনতাত্ত্বিকও বটে। তিনি বিশ্বাস করেন, কাব্যিক সৌন্দর্য ও রাজনৈতিক চেতনা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং তারা একই মানবিক অন্তঃসত্তার দুটি রূপ। রুদ্র এখানে এক নতুন ভাষার জন্ম দেন—যেখানে বিপ্লব কোনো রোমান্টিক কল্পনা নয়, বরং উৎপাদন-সম্পর্কের সম্প্রসারিত রূপ। তাঁর ‘আমরা উৎসব করবো পূর্ণিমার’ উচ্চারণে যেমন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা ফিরে আসে, তেমনি ‘আমার জীভ কাটা’–র যন্ত্রণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্য ভাষার মূল্য আজও রক্তে পরিশোধ করতে হয়। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই রুদ্র এক নতুন কাব্যতত্ত্ব নির্মাণ করেন—যা দুঃখের মধ্যেও আশার, হতাশার মধ্যেও মানবমুক্তির, আর ব্যক্তিগত ক্ষতের ভেতর দিয়েও সামাজিক স্বপ্নের কবিতা হয়ে ওঠে।

আজও এই কবিতা অনিবার্য, কারণ পৃথিবী এখনো বিশ্বাসহীন, সমাজ উৎসবহীন, রাষ্ট্র বন্দি। তাই ইশতেহার কেবল কাব্যিক স্বপ্ন নয়, এটি এক সতর্ক উচ্চারণ—যা না শুনলে ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হবে। এই কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের মুক্তি কোনো রাষ্ট্রনির্ভর পরিকল্পনায় নয়; বরং যৌথ স্বপ্নে, সম্মিলিত ন্যায়বোধে, আত্মিক বিপ্লবে।

শেষমেশ, ইশতেহার এমনই প্রতিবিম্ব—যেখানে আমরা দেখি নিজেদের মুখ, আমাদের সময়ের মুখ, শাসকের মুখোশ। এবং কবি ঘোষণা করেন—এই মুখোশ একদিন খুলে ফেলতেই হবে। এই প্রত্যয়ের কবিতা ইশতেহার। এটি কেবল রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর নয়—এটি আমাদের সকলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই ‘আমি’-র কবিতা, যে এখনো একা, কিন্তু বিদ্রোহে নিবেদিত। এর প্রতিটি পংক্তি মানুষের প্রতি কবির দায়বদ্ধতার সাক্ষ্য, আর প্রতিটি স্বপ্ন নৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক। আজকের বিশ্ব যখন নতুন রূপে শোষণ, যুদ্ধ, ও বিভাজনের মধ্যে নিমজ্জিত, তখন ইশতেহার আমাদের জানান দেয়—কবিতা কেবলই সৌন্দর্যের চর্চা নয়, সত্য উচ্চারণের সাহস। রুদ্র তাঁর কণ্ঠে সেই সাহসেরই ধারাবাহিকতা নির্মাণ করেছেন; তাই তাঁর ইশতেহার আজও সমকালীন, আজও বিপ্লবী। এটি এমন এক কবিতা, যা আমাদের পুনরায় আহ্বান করে মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতে, একাকিত্বের ভিতর থেকেও সমতার পথ চিনতে, এবং বারবার পতনের পরও উঠে দাঁড়াতে—ভালোবাসার, শ্রমের, আর মুক্তির ইশতেহার হয়ে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

দেবারতি মিত্র, বাঙলা কবিতার নীরবতম অথচ সবচেয়ে দীপ্ত কণ্ঠগুলোর একটি। যে সময়ে কবিতা ছিল জনতার উত্তেজনা, আন্দোলনের ভাষা, রাজনৈতিক বা নগর-অস্তিত্বের শব্দ, সেই সময়ে দেবারতি নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন নিঃশব্দতা। তাঁর কবিতায় কেউ হাঁক ছাড়ে না, কেউ পতাকা উড়ায় না, কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান তোলে না—কিন্তু প্রতিটি কবিতার ভেতরেই আছে অদৃশ্য প্রতিরোধের ধ্বনি, যা সময়কে অস্বীকারের ভাষায় অনুরণিত হয়। তিনি বলেছিলেন, “কবিতা নিয়ে আমি কিছু করতে পারি না, করতে চাই না, শুধু পৌঁছতে চাই সেই সমুদ্রের কিনারায় যার একদিকে জীবন ও শিল্প অন্য দিকে শূন্যতা যেখানে কল্পনা মুহুর্মুহু অবিরাম নিজেকে সৃষ্টি করে চলে। ঘটনাচক্রে আমার জীবনে কবিতার বিকল্প আর কিছু নেই, ওই একটিমাত্রই আমার পথ ও পাথেয়।” (ভূমিকা, কবিতা সমগ্র)

এই ‘কিছু করতে চাই না’—এই বাক্যটিই তাঁকে আলাদা করে। কারণ বাঙলা কবিতায় অধিকাংশই কিছু করতে চায়—উদ্ধার করতে, পরিবর্তন ঘটাতে, প্রতিরোধ জানাতে। দেবারতির আকাঙ্ক্ষা ছিল বিপরীতমুখী—তিনি কোনো লক্ষ্য স্থির করেননি, তিনি শুধু পৌঁছতে চেয়েছেন। 

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে’। নামেই নিস্তব্ধতার আওয়াজ আছে। অন্ধদের জন্য বাজে ঘণ্টা—এ কীসের সংকেত? হয়তো আলোহীন জগতে প্রতিধ্বনিই একমাত্র পথপ্রদর্শক। দেবারতির কবিতা সেই প্রতিধ্বনির পথে জন্ম নেয়—শব্দ, যা দেখতে পায় না, কিন্তু অনুভব করে। তাই তাঁর কবিতা পাঠে চোখ নয়, অন্তঃকর্ণ জরুরী হয়ে পড়ে।

দেবারতির জীবনের সবচেয়ে পরিচিত তথ্য—তিনি মণীন্দ্র গুপ্তের সহধর্মিণী। কিন্তু এই পরিচয়টিকে তিনি কখনোই তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে মেলাননি। বরং এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ওঁর কবিতা, আমার কবিতা—দু’জনেরই ঘর আলাদা, ছাদের নীচে থাকলেও।” এই বিভাজন, এই আত্মপরিচয়ের স্থিরতা—তাঁর কবিতার মধ্যেও গভীরভাবে উপস্থিত। তিনি নিজের স্বরকে মিশতে দেননি কারও সঙ্গে, এমনকি ভালোবাসার মানুষের সঙ্গেও নয়।

তাঁর কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা—সবই আছে, কিন্তু কোনওটিরই স্পষ্ট আবেগ নেই। আবেগ যেন ছায়া হয়ে হাঁটে তাঁর কবিতার পাশে, কিন্তু তাকে কখনো ছুঁয়ে ফেলে না। যেমন তিনি লিখেছেন— “সমস্ত জীবন যদি জ্যোৎস্নায় একা থাকা যায় / যেখানে কেবল সুর, কোনও আলো নেই– / সোনার চুলের গোছা যেন খুলে গেল হু হু করে / বিরল জানালা দৃষ্টি ঢেকে অন্ধকার / রাশি রাশি সুরেলা যন্ত্রের সরু তার / তেমন জ্যোৎস্না নয় আমার শরীরে।‌” (তোমার জ্যোৎস্না সুর)

এই “সুর” এবং “আলো”-এর বিরোধেই দেবারতি দাঁড়িয়ে। আলো তাঁর কাছে প্রকাশ, সুর হলো অভ্যন্তর। তিনি প্রকাশের চেয়ে অনুভবকে বেশি মূল্য দিয়েছেন। তাঁর কবিতা অন্ধকারে ফোটা ফুল, যার ঘ্রাণ পাই, কিন্তু রঙ দেখতে পাই না।

দেবারতি মিত্রের কবিতা প্রথাগত নারীবাদের ঘোষণায় বিশ্বাসী নয়। কিন্তু তাঁর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে নারীর অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। তাঁর উচ্চারণে কোনো স্লোগান নেই, কিন্তু এক আনকোরা-অনিবার্য সত্য আছে। নারী সেখানে সৃষ্টির সহযাত্রী নয়, সৃষ্টির একমাত্র অবলম্বন। ফলে তা পুরুষতান্ত্রিক বর্ণনার এক গোপন ভাঙন ঘটায়—নরমভাবে, কোমল কণ্ঠে, কিন্তু সম্পূর্ণ অনিবার্যভাবে।

তাঁর কবিতায় একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—একাকিত্ব। প্রেমেও তিনি একা, মৃত্যুতেও একা। তিনি কখনোই ‘দুজন’কে বিশ্বাস করেননি; হয়তো তাঁর কবিতার প্রেমিক-প্রেমিকাও একই শরীরে দুটি সত্তা। ‘রাত্রি জেগেছিলাম’ কবিতায় তিনি লিখেছেন— “ফুলদানি ঐ তোমার শরীর / কাল কে অত ফুল সাজিয়েছিল / আমার বুকে পাপড়ি ঝরেছিল / বুকের মধ্যে পাপড়ি উড়েছিল /…/ ঘুরে ঘুরে পাগল স্রোতের মতন অবিরাম / কালকে তোমার সঙ্গে যখন রাত্রি জেগেছিলাম।”

এই কবিতায় প্রেমের মাধুর্য নেই, আছে ঘূর্ণির তীব্রতা। দেবারতির প্রেম হলো প্রবাহ—নদীর মতো, যা একবার শুরু হলে আর থামে না। এখানে যৌনতা একটি গভীর সত্তার উন্মোচন—কিন্তু তা শরীর নয়, আত্মার। প্রেম এখানে মৃত্যুর সমার্থক—অন্তিমে এক নিঃশেষিত রাত্রি।

তাঁর অনেক কবিতায় প্রকৃতি আসে, কিন্তু তা কোনো অলঙ্কার হিসেবে নয়। বৃষ্টি, ফুল, ছায়া, আলো, নদী—সবই তাঁর কবিতায় আত্মীয় সত্তা। তিনি নিজেকে প্রকৃতির ভেতর বিলিয়ে দিতে চান। ‘বৃষ্টিতে আমি ও তুমি’ কবিতায় লিখেছেন— “গভীর বৃষ্টিপাতের পরে এখন জেগে উঠেছি, / অঝোর পাগল বৃষ্টিপাত, / ছাদ ভাসিয়ে জল জমেছে, / ঝুঁকে আসা কচি ত্রিচূড় শাখার মতো তুমি / আদর নিচ্ছ বৃষ্টিপাতের।”

এই চিত্রটি নিছক বৃষ্টির নয়—এ এক জেগে ওঠা আত্মার দৃশ্য। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি মানে আত্মপরিচয়ের রূপান্তর। মানুষ এখানে কোনো কেন্দ্র নয়; বরং মানুষ প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র অথচ দীপ্ত অংশ।

দেবারতি মিত্রের কবিতা একরকম “বিচ্ছিন্ন আলো”—এতে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নেই, কিন্তু তবু এতে সময়ের বিরুদ্ধে থাকা এক প্রতিস্বর আছে। এক নির্দিষ্ট সময়ের সমাজে, যেখানে কবিতা হয়ে উঠছিল প্রতিবাদের ভাষা, তিনি নিঃশব্দতার পক্ষে দাঁড়ালেন। তাঁর এই অবস্থান অনেকের কাছে এক ধরনের ‘অপসরণ’ মনে হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি ছিল নিভৃত, সংযমী এক অন্যরকম প্রতিবাদ। হয়ত তিনি ভেবেছেন, ভাষা যত বেশি উচ্চারণে ব্যস্ত হয়, ততই তার আত্মাকে হারায়।

এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—‘আপনি কেন এত কম লেখেন?’ তিনি হেসে বলেছিলেন, “আমি তো লিখি না, কবিতাই আমাকে লিখে নেয়।” এই বাক্যটি শুনলে মনে হয়, দেবারতি কবিতাকে ‘কাজ’ হিসেবে দেখতেন না, দেখতেন এক অন্তঃপ্রবাহ হিসেবে। তিনি লিখতেন তখনই, যখন ভাষা নিজে এসে তাঁর ভেতরে স্থান চাইত। এ কারণেই তাঁর কবিতার সংখ্যা কম, কিন্তু প্রতিটি কবিতা যেন নিজস্ব জীবন্ত সত্তা।

দেবারতির কবিতায় মৃত্যুর কোনো ভয় নেই, কারণ মৃত্যুকেও তিনি শ্বেতপদ্মের মতো পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর কবিতার এই অন্তঃপ্রবাহ তাঁকে অন্যান্য সমসাময়িক কবিদের থেকে আলাদা করে। যেখানে অনেকে জীবনের ভাঙনকে কাব্যের উপাদান করেছেন, দেবারতি সেখানে ভাঙনের মধ্যেই এক অনবচ্ছিন্ন শান্তি খুঁজেছেন। বলতে চেয়েছেন—চুপ থেকেও বাঁচা যায়, বিভক্ত পৃথিবীতেও অখণ্ড থাকা যায়, আর অসুখকেও ভালোবাসা যায়। মৃত্যু ছিল তাঁর কাছে স্থিতির নাম। মৃত্যুকে তিনি ব্যক্তিগত করে তোলেননি। মৃত্যু তাঁর কাছে সমগ্র সত্তার এক অনিবার্য গতি। এক সময়ের পরে সবাই জানালা খুলে দেবে, সবাই পর্দা উড়িয়ে দেবে—এটাই জীবন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে লিখেছিল রবিবার পত্রিকা: “তিনি ছিলেন আধুনিকতার অন্তরালে এক পরম নিভৃত কণ্ঠ।” এই বাক্যটিই হয়তো তাঁর সবচেয়ে সত্য বর্ণনা।

দেবারতি মিত্রর কবিতায় আছে নিঃশব্দ-সংলাপ—যেখানে কথা বলে বিরতি, আর উচ্চারণের চেয়ে গভীর হয়ে ওঠে স্থিতি। যেমন তাঁর ‘অসুখ করেনি’ কবিতা শুরু হয়—“আমাদের অসুখ করেইনি, সারবে কী?” এই প্রথম পংক্তিটিই যেন দেবারতির অন্তর্গত দ্বিধার রূপক। অসুখ, যেটি আমরা সারাতে চাই, তিনি সেটিকেই জীবনের অঙ্গ হিসেবে মেনে নিচ্ছেন। অসুখই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার প্রাণরস। তাঁর “সঙ্গী” তখন বলে, “ওই যে কালকে শালিখ পাখিটাকে দেখলে / সুকুমারদের ছাতে স্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে, / এখন সে জলাভূমিতে শ্বেতপদ্ম হয়ে ফুটে রয়েছে।” এই চিত্রকল্পে বাস্তবের মৃত্যু আর পুনর্জন্মের অলৌকিকতা এক হয়ে যায়—যেন দেবারতির কবিতা প্রকৃতির পুনর্জাগরণের ভাষা। শালিখ পাখি স্তব্ধ হয়, কিন্তু তারই মৃতদেহ থেকে ফুটে ওঠে শ্বেতপদ্ম। জীবন, মৃত্যু, প্রেম—সবই এক অখণ্ড প্রতিক্রিয়া।
এরপর তিনি বলেন, “দুঃখ-কষ্ট-দারিদ্র-বেদনা-অশান্তি তো / প্রথম থেকে আছে, থাকবেই।” এই পংক্তি কোনো আক্ষেপ নয়, বরং এক চূড়ান্ত মেনে নেওয়া। দেবারতির কবিতার শক্তি এখানেই—তিনি দুঃখকে প্রতিরোধ করেন না, বরং তার সহাবস্থানে এক ধরণের শান্তি খুঁজে নেন। “তবুও তুমি আমি কিন্তু দুজনে চিরদিন / একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে থাকব”—এই ঘোষণা শুধুমাত্র প্রেমের নয়, অস্তিত্বের। আমাদের অদৃষ্ট কেউ খণ্ডাতে পারেনি, পারবেও না—এই বিশ্বাস নিঃশব্দ প্রতিবাদের মতো। অসুখ সারবে না, কিন্তু সেটাই ভালো। দেবারতি বুঝেছেন, অসুখই জীবন, সারিয়ে তোলার চেষ্টা এক প্রকার মৃত্যুই। তাই তাঁর ভাষা নিভৃত অথচ দীপ্ত।

‘সবই অখণ্ড’ কবিতায় তিনি বলেন, “টুকরো টুকরো করে কিছু দেখো না, / সবই অখণ্ড।” এই ‘অখণ্ডতা’ই বোধ করি তাঁর কবিতার মূল তত্ত্ব। আধুনিক মানুষের দৃষ্টি যত খণ্ডিত, দেবারতির দৃষ্টি তত পূর্ণ। পৃথিবীকে আমরা যেভাবে ভাগ করি—রাজনীতি, প্রেম, দেশ, দেহ—সবখানেই তিনি সেই ভাগের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। “ভাগ-বিয়োগে কী লাভ? যোগ আর গুণ অঙ্কেরই বা কী দরকার?”—এই পংক্তিগুলো আধুনিক জীবনের গাণিতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক অন্তর্মুখী ঘোষণা। তিনি সম্পর্কের গাণিতিক পরিমাপ মানতে চান না, সুখ-দুঃখ, সফলতা-ব্যর্থতার অঙ্কে নিজেকে বাঁধতে চান না। তাঁর কবিতায় অঙ্কের পরিবর্তে কাজ করে অনুভবের নন্দনশাস্ত্র।

তাঁর কবিতার একান্ত আশ্রয় সেই অনুভবেই—“এইভাবে এসো, স্বপ্নকেও মুছে ফেলে / আমরা দুজনে মিলে একা একা থাকি। / অস্তিত্বে জাগরণ ও তন্দ্রা অহরহ / অনুভব করি। / কেউ আমাদের বোঝে না, বুঝবেও না।” (দুজনে মিলে একা একা) এই অংশে তাঁর চিরচেনা আত্মনিবিড় সুর আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। স্বপ্নকেও মুছে ফেলা মানে কল্পনার পরিসর ছাড়িয়ে এক সত্যের দিকে এগোনো, যেখানে একাকিত্বই পরম সম্পর্ক। “আমরা দুজনে মিলে একা একা থাকি”—এই চূড়ান্ত বৈপরীত্যই দেবারতির ভাবগাম্ভীর্য। একা থেকেও যুগল, যুগলেও নিঃসঙ্গ। বোঝার আকাঙ্ক্ষা নেই, বোঝা যাবে না বলেই মুক্তি। এই মুক্তিই তাঁর কবিতার আত্মা।

তাঁর কবিতাসমগ্র পড়তে পড়তে মনে হয়, দেবারতি যেন এক আধুনিক উপনিষদ লিখেছেন—যেখানে প্রেমের মধ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার স্নিগ্ধতা, নিঃসঙ্গতার মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণতার বিশ্বাস। তাঁর ভাষা স্নিগ্ধ, কিন্তু তা কখনোই কোমলতাবিলাসী নয়। বরং, সেখানে থাকে কঠোর প্রশান্তি—যেমন বৃষ্টির পরে মাটি গরম থাকে, কিন্তু পৃষ্ঠে নেমে আসে শীতলতা। দেবারতির কবিতা সেই রকমই: নীরব কিন্তু অগ্নিময়।

এই নিস্তব্ধতার উৎস খুঁজলে আমরা তাঁর সাক্ষাৎকারগুলিতে এর প্রতিধ্বনি পাই। একবার তিনি বলেছিলেন—“আমার কবিতা আমি কারও দিকে তাকিয়ে লিখি না। আমি শুধু ভিতরটা শুনি।” (সাক্ষাৎকার: আনন্দবাজার পত্রিকা, “দেবারতি মিত্র: আমি ভিতরটা শুনি”, ২০১৪) এই “ভিতরটা শুনি” কথাটাই আসলে তাঁর কাব্যদর্শন। তাঁর কবিতায় কোনো বাহ্যিক অলঙ্কার নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। বরং, অভ্যন্তরীণ সুরের ধীরতা, আত্মবিশ্বাস, এবং এক প্রকার অনাসক্তি আছে। আধুনিক বাঙলা কবিতায় যেখানে অনেকেই ছন্দের ভাঙনে আত্মপরিচয় খুঁজেছেন, দেবারতি সেখানে নীরবতার ভেতর দিয়ে পরিচয় গড়েছেন।

দেবারতির কবিতায় প্রেম কেবল রোমান্টিক সংলগ্নতা নয়; অস্তিত্বের সহযাত্রা। তাঁর পংক্তি—“আমাদের অদৃষ্ট কেউ খণ্ডাতে পারেনি, কেউ পারবেও না”—এই অদৃষ্টের মধ্যেই তিনি মানবজীবনের পরম আশ্রয় দেখেছেন। সম্পর্ক এখানে দেহগত নয়, এটি এক আত্মিক বন্ধন। “অসুখ করেইনি তো সারবে কী”—এই পংক্তি যতটা বিষাদময় শোনায়, ততটাই তা এক অন্তরঙ্গ স্বীকারোক্তি। জীবনকে তিনি চিকিৎসার বিষয় মনে করেননি, বরং তার রোগকেই জীবনের আরেক রূপ ভেবেছেন। এই অসুখই তাঁকে অনুভব করিয়েছে জীবনের সঞ্চার, ভালোবাসার স্থায়িত্ব।

দেবারতি মিত্র বাঙলা কবিতাকে রাজনীতির বাইরে এনে পুনরায় অন্তর্লোকের পথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাব্যস্বর কোনো ঘোষণায় বিশ্বাসী নয়, কোনো রণভূমিতে অবস্থান নেয় না। তিনি দেখিয়েছেন, কবিতা আসলে উচ্চারণ নয়, শ্বাস। শব্দ নয়, বিরতি।

আজকের কোলাহলময় সাহিত্যজগতে দেবারতির কবিতা প্রতিচিহ্ন বিশেষ। তিনি লিখেন— “সব শব্দ শেষ হলো / ঘণ্টা বাজে দূরে৷” সেই শব্দ আজও থেকে গেছে—নির্জন, কিন্তু দীপ্ত ভাবে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

কবিতায় করুণার সুক্ষ্ম আবরণ নিয়েও আবুল হাসান এক তীব্র আত্মবিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। অনেকেই তাঁকে ‘আধুনিকতা’র বিষণ্ণ বংশধর বলে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতা একটানা নির্জন নয়, বরং সেখানে পিছুটান, পরাজয়, প্রেম, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও রূপক-সংকেতের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় এক ধরনের অন্তর্গত মহাকাব্য। এ মহাকাব্যে আবুল হাসান নিজের আত্মাকে খণ্ডিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখেন—নগ্ন, ঋজু, অথচ অতল স্পর্শে নরম।

‘আবুল হাসান’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। যা তাঁর কাব্যিক আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি—
“এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্নাভেজা চোখ?”
(আবুল হাসান)

এই প্রশ্নাবলী শুধু নাম বা সত্তা নয়, বরং একপ্রকার আত্ম-অনুসন্ধানের অন্তর্গত সংগীত। এখানে কবি নিজেই নিজের অস্তিত্বকে নিরীক্ষণ করছেন বহুবিধ রূপকে: পাথর, নদী, কান্নাভেজা চোখ, ছয়টি তারা। একজন কবির ‘নাম’ কখনো কেবল উচ্চারণ নয়—তা হয়ে ওঠে তার চেতনাসত্তা, তার কাব্যিক ঐতিহ্য ও আত্ম-সংগ্রামের প্রতীক।

এই আত্মসন্ধানের দুঃখ-গাঁথা এক অনন্য উদাহরণ তাঁর কবিতা “পাখি হয়ে যায় প্রাণ”, যেখানে স্মৃতি শুধু নয়, বরং একটি পুরাকালের জনপদের বিলুপ্তির সাক্ষী হয়ে ওঠে কণ্ঠস্বর:
“দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি”
(পাখি হয়ে যায় প্রাণ)

আবুল হাসান আত্মজৈবনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কাব্যিক প্রহেলিকায় পরিণত করেন। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে ওঠে এক জাতির স্মৃতি, এক প্রজন্মের দুঃখবোধ, যার কোনো নিদান নেই, কেবল চিহ্ন থাকে। “উচ্চারণগুলি শোকের” কবিতায় দেখি, তিনি প্রশ্ন করেন:
“তবে কি আমার ভাই আজ ঐ স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদিতে উৎসব?”
(উচ্চারণগুলি শোকের)

পতাকা কিংবা উৎসব হয়ে ওঠে অবিশ্বাস্য এক পরাবাস্তব। এই হারিয়ে যাওয়া একান্ত ব্যক্তিগত নয়— রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের চিরন্তন অদৃশ্য গহ্বর।

আবুল হাসানের কবিতায় প্রতীক ব্যবহারে অনন্যতা লক্ষ্য করা যায় “স্রোতে রাজহাঁস আসছে” কবিতায়, যেখানে রাজহাঁস কেবল একটি পাখি নয়, বরং প্রতীকী হয়ে ওঠে প্রেম, স্মৃতি ও রাষ্ট্রচর্চার। তিনি বলেন—
“আমাদের নৌকার জলে ভাসতে ভাসতে যেন প্রতীকের হাঁস
ঐ রাজহাঁস
জল থেকে আরো জলে,
ঢেউ থেকে আরো ঢেউয়ে ছড়াতে ছড়াতে
পৌঁছে যাব আগে।”
(স্রোতে রাজহাঁস আসছে)

এই যাত্রা আক্ষরিক নয়— অভ্যন্তরীণ অভিযাত্রা। আবুল হাসানের ভাষা আমাদের টেনে নিয়ে যায় আত্মপরিচয়ের গভীরে, যেখানে আমরা উপলব্ধি করি, সময় ও সমাজের ছায়ায় একজন কবি কীভাবে নৌকা, ঢেউ, রাজহাঁসের মতো ছায়াপ্রতিম উপমায় নিজেকে ধারণ করেন।

কিন্তু শুধু নিঃসঙ্গতা বা ব্যক্তিপরিচয়ের সংকট নয়—আবুল হাসান বাঙলা কবিতায় প্রবেশ ঘটিয়েছেন চাষাবাদের অন্যতর চেতনা, এক মহাকাব্যিক শ্রম ও প্রত্যয়ের রূপ। “কালো কৃষকের গান” কবিতায় তিনি লেখেন—
“দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদি রাখব না আর আমার ভেতর!”
(কালো কৃষকের গান)

দুঃখও এক কৃষিজমি, যেখানে কবি ধানের বদলে চাষ করেন অনুভবের শস্য, প্রজন্মের প্রতীকী যন্ত্রণা। তিনি কৃষকের চোখে কবিতার ভূমিকে দেখেন, যেখানে
“ও জল, ও বৃক্ষ, ও রক্তপাত, রাজনীতি ও নিভৃতি, হরিৎ নিভৃতি
পুনর্বার আমাকে হোমার করো”
(কালো কৃষকের গান)

এই হোমার-উল্লেখ কেবলমাত্র ধ্রুপদী রেফারেন্স নয়—এটি একান্তভাবে রাজনৈতিক। একাধারে গ্রিসের নারীর কামুকতা, অন্যদিকে বাঙলাদেশের দুঃখ, সবই এই কাব্যে একসঙ্গে মিশে যায়—যেমন প্রকৃতি ও শহর, স্মৃতি ও তমোহর।

তাঁর কবিতায় নারীচরিত্র ও কামনাবোধও একধরনের আবেগবিকর্ষের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। “পরাজিত পদাবলি” কবিতায় প্রেম ও রতির দহন ঘনিয়ে আসে বিচ্ছেদের রূপকে:
“তোমার কাছে গিয়েছিলাম রাতে নদীর ঢেউ
তোমায় আমি পরিয়েছিলাম অঙ্গুরীয় মেয়ে”
(পরাজিত পদাবলি)

এই ধরনের প্রেম—যেখানে কামনা ও করুণা একাকার, যেখানে রাজনীতি ও প্রেম মিলেমিশে তীব্র নরকবোধ তৈরি করে—এটাই আবুল হাসানের কবিতার প্রকৃত সুর। এমনকি “নিঃসঙ্গতা” কবিতায়, যেখানে একটি মেয়েশিশুর সহজ আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যায় চাঞ্চল্যের ভিড়ে, সেখানে আবুল হাসান লিখে যান—
“একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!”
(নিঃসঙ্গতা)

এখানে পুরুষ বলার মধ্যে আছে এক অভ্যন্তরীণ ভাষা ও গ্রহণযোগ্যতা খোঁজার আকুতি, যা এই কবির পুরো সাহিত্যকর্মের এক অপরিহার্য স্বর।

তবে আবুল হাসান কেবল শোকবহ কবি নন—তিনি আত্মিক প্রেমের পরিপ্রেক্ষিতে এক বৈচিত্র্য রচনা করেন “তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না” কবিতায়, যেখানে স্পিরিচুয়াল সংকেত এক আশ্চর্য মোহনায় মিলিত হয়। তিনি বলেন—
“আমি কাছে যাব আমি তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না!”
(তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না)

এখানে ‘কালিমা’ তার অভিজ্ঞান হারায় না, কিন্তু তার ব্যঞ্জনা নতুন অর্থে উচ্চারিত হয়। শরীর ও আত্মার সম্পর্ক এক গভীর রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে দাঁড় করিয়ে দেন কবি।

তাঁর “নর্তকী ও মুদ্রাসঙ্কট” কবিতাটি নারীর ভোগ্য-অবস্থানকে কাঁপিয়ে তোলে।
“তুমি তো নও আম্রপালী, বর্তমানের নারী
তোমার লাগে লিনোলিয়াম সিফনঘেরা শাড়ি
তোমার লাগে সাত প্রেমিকের সুলভ করতালি,
বাগান তুমি, যুবারা যেন তোমার কেনা মালি।”
(নর্তকী ও মুদ্রাসঙ্কট)

এখানে রাষ্ট্র ও পুরুষতন্ত্রের চোখে নারী যেভাবে রূপান্তরিত হয়, আবুল হাসান সেভাবে তাদের মুখোশ খুলে দেখান, অথচ একপ্রকার করুণ রূপে।

সবশেষে, আমার অত্যন্ত প্রিয় এক কবিতা তাঁর “জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন”-এর কথা উল্লেখ করি—
“মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা”
(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন)

এত সরাসরি, এত উচ্চকণ্ঠ আত্মস্বীকারোক্তি বাঙলা কবিতায় দুর্লভ। আবুল হাসানের কণ্ঠ এখানে ব্যক্তিগত নয়, এক প্রত্যাখ্যাত রাষ্ট্রের কবি, এক নিঃসঙ্গ বোধিবৃক্ষের আত্মপরিচয়।

আবুল হাসান মারা যান মাত্র ২৮ বছর বয়সে। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনি বাঙলা কবিতায় রেখে যান এমনসব স্তব্ধ ও দীপ্ত প্রতীক, যা এখনো আমাদের কণ্ঠে ফিরে ফিরে আসে। তাঁর কবিতা নিঃসঙ্গ, কিন্তু নিজের মতো করে এক শুদ্ধ পথের খোঁজে অদম্য।

তিনি ছিলেন সেই কবি, যিনি বলেছিলেন—
“আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে”
এ প্রশ্নই হয়তো আজও বাঙলা কবিতার ভিতরে গুঞ্জরিত হচ্ছে—একজন আবুল হাসান হয়ে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

কবিতার কাজ যদি হয় ভাষা দিয়ে এমন এক বাস্তব নির্মাণ করা, যা পাঠকের চৈতন্যকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, তবে সব্যসাচী মজুমদার নিশ্চিতভাবেই এক আধুনিক কবিতার কারিগর। তাঁর কবিতা পঠনের অভিজ্ঞতা একান্তই শরীরগত, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক দ্বন্দ্বে ঘেরা এক ভ্রমণ, যা পাঠককে সরলীকরণের বিপরীতে ঠেলে দেয়। এখানে কবিতা খণ্ড নয়, বরং প্রবাহ। এক ধরনের ভাষিক-সমগ্র যার মধ্যে ‘অংশভাগ’ হয়ে থাকে শরীর, মন, সমাজ, প্রকৃতি এমনকি ভাঙা ইতিহাসও।

সব্যসাচী মজুমদারের কবিতা এক অভিযান, যেখানে ভাষা শুধু বাহন নয়, বরং অন্বেষণের ক্ষেত্র; তাঁর পংক্তিমালা এক একটি জৈব-ভূখণ্ডের মতো বিচ্ছিন্ন, অথচ অভ্যন্তরীণ ছন্দে সংযুক্ত। তাঁর কবিতায় সময়, দেহ, ভাষা, যৌনতা ও ভূগোলের রক্তমাখা উপস্থিতি যেমন আছে, তেমনি আছে একধরনের জৈবিক নিরুদ্দেশতা—যা নিতান্ত চেনা বাস্তবের বাইরে, অথচ তারই অংশ। তাঁর কবিতা কোনো একক ব্যক্তিসত্তা ধারণ করে না—বরং ছড়িয়ে থাকে অনেক স্তরে।

এই স্তরবিন্যাসের একটি দৃষ্টান্ত হল “অংশভাগ” কবিতাটি, যা বারোটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এক বিরাট অনুভূতির অনুপুঙ্খ পাঠ তৈরি করে। কবিতার প্রথম অংশেই উচ্চারণ করা হয় এক আত্মগত প্রত্যাহার, যে প্রত্যাহার কোনো আত্মদংশ নয়, কিংবা নিছক আত্মবিমুখতা নয়, বরং ইতিহাস, প্রেম ও সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে এক ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জন্মের ইঙ্গিত। “পিছিয়ে এসেছি যত, ততটাই তোমার রোদ্দুর / যত দীর্ঘকাল যাই ততই শকুন…”—এই দুই পংক্তি যেন কবিতার গোড়াতেই পাঠককে জানান দেয়, এখানে সময় রৈখিক নয়; বরং ছিন্ন অংশের সমাহার। রোদ্দুর ও শকুনের দ্বৈততা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, আলো ও মৃতদেহ একই পৃথিবীর বাসিন্দা। এই দ্বৈততাই সব্যসাচীর কবিতার কেন্দ্রে অবস্থিত।

এই দ্বৈততার সঙ্গে যুক্ত হয় ফসিল, বাঁশি ও লিপির প্রসঙ্গ, যা একরকম প্রত্নচেতনাকে হাজির করে। “আমি কি বুঝি না তার বাঁশি, তার লিপি ও ফসিল”—এই পংক্তিতে ভাষা, সংগীত ও ইতিহাসের সংমিশ্রণে গঠিত এক পাণ্ডুলিপির আভাস পাওয়া যায়। কবি এক অতীত-অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী, যে বসন্তকালেও সামুদ্রিক প্রাণীর জন্ম প্রত্যক্ষ করে এবং এইসব বেঁচে উঠতে চাওয়া প্রাণী দেখে “বিশ্বাস করে মমির বিদ্বেষ”। বিদ্বেষ এখানে ভয় কিংবা অস্বীকার নয়, বরং মৃতকে শত্রু বলে মানার মধ্যে দিয়ে জীবনের প্রামাণ্যতা পুনরুদ্ধার।

এই দ্বন্দ্বে ধরা পড়ে শরীর ও দেহের ভেতরকার দূরত্ব। “যদিও দেহটি শরীরের মতো নয় / দ্রবণ দ্রবণ যুগ পার…”—এই উচ্চারণে সময়ের সঙ্গে শরীরের বিকলতা এক হয়ে যায়। শরীর আর প্রমাণ নয়, বরং দ্রবণে দ্রবণে ভেসে যাওয়া এক অবয়ব। এই দ্রবণের সঙ্গে যুক্ত হয় শরণার্থীত্ব—“নদী ডাকতে এখনও পার না / তুমি কি গো! / বস্তুত শরনার্থী প্রবাহ!” শরীর হয়ে ওঠে বহিষ্কৃত, অসার, অথচ প্রবাহমান। এই ‘নদী না ডাকার’ অপারগতা প্রেমেরও, সময়েরও।

একইসাথে দেখা যায়, বাষ্প, রোদ্দুর ও শ্রেণি-জটিলতার এক চমৎকার ব্যবচ্ছেদ। “বাষ্পের ভূমিকা বুঝি / কীভাবে জটিল হয় তার শ্রেণি!” এই শ্রেণিবিন্যাস শুধু সামাজিক নয়, প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যেও এক ক্ষমতার পরিসর নির্মাণ করে। সেই পরিসরে “একটি রোদ হয়ে গেছিল আরেক রোদ”—একটি আলোর অস্তিত্বকে গ্রাস করে অন্যটি। এই স্বপ্লবাক্য রচনার মধ্য দিয়ে সব্যসাচী ভাষার প্রপঞ্চটিকে উন্মোচন করেন, যেখানে ফাল্গুন এসে “কেবল বাগার্থ ঘটে”। সে ভাষা আর নিছক যোগাযোগ নয়, বরং এক ধরণের ছদ্মভাবনার উৎপত্তিস্থল।

কবিতায় কখনো কখনো ‘তুমি’ হয়ে ওঠে কৃষিজীবী, সংসারী অথবা প্রাকৃতিক প্রাচীনতায় গড়া এক শরীর। “তুমি ক্ষেতে ক্ষেতে পটল বুনেছ / পটলের ওপরে ওস / তাতে তৃতীয় দুনিয়া…”—এই পংক্তি কৌতুকমিশ্রিত হলেও প্রহসনের আড়ালে সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা অনুপমভাবে ধরা পড়ে। পটল শুধুই সবজি নয়; এটি হয়ে ওঠে তৃতীয় বিশ্বের প্রতীক—যার উপর অপ্রত্যাশিতভাবে ওস পড়ে, হয়তো আন্তর্জাতিক দৃষ্টি বা সাম্রাজ্যিক হস্তক্ষেপ। এই অনুপুঙ্খের মাধ্যমে সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি এক অন্তঃস্রোতের মতো কবিতায় ঢুকে পড়ে।

শরীর ও সমাজের দ্বিমুখিতা আরও সুস্পষ্ট হয় “তুমি দ্বিমুখী হরিণ / দৌড়ে পার হচ্ছ সন্ন্যাস-গ্রহণ, কিসসা, রামায়ণ” উচ্চারণে। এখানে হরিণ শুধু নিরীহ নয়; ছলনারও আরেক নাম, দ্বিধাগ্রস্ত এবং ধর্মীয় আখ্যানের সীমায় ধাবমান। এই দ্বিমুখীতা বাঙলা আধুনিক কবিতায় বহুল ব্যবহৃত হলেও সব্যসাচীর হাতে তা মিথ-উন্মোচনকারীর মতো হয়ে ওঠে—যেখানে ‘সিউডো ধারণা’ মাথায় নিয়েই প্রেম, সমাজ ও ইতিহাস ছুটে চলে।

সবচেয়ে সংবেদনশীল ও দর্শনমূলক যে অনুচ্ছেদটি দেখা যায় তা হল—“কিছুটা পাহাড়ি ছাঁদে আমার মরণ / সেভাবে কি বলা যায়— কেন যে মরেছি!” এখানে মৃত্যু ব্যক্তিগত নয়; তা এক অভিজ্ঞতার ভাষায় রূপান্তরিত হয়। সেই মৃত্যু রেণুতে পৌঁছায়, পূণর্ভবার প্রশ্ন তোলে। অথচ কবি স্বীকার করেন: “বুঝিনি আমি তোমার হলুদ / বুঝিনি তোমার মতো ওড়ার কারণ”। এই ‘তোমার’ প্রতীক কখনও নারী, কখনও দেশ, কখনও স্বপ্ন—তবে তার মূল রহস্য এক অপার ওড়ার ভঙ্গিমা।

শেষদিকে এসে কবি আমাদের ফেলে যান একটি স্তম্ভিত বাস্তবতার মুখোমুখি। “তবে কি অবর্ণনীয় ঘাসে / আমি হাড় কটি পুঁতে চলে যাব?”—এই প্রশ্নে মৃত্তিকার সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হয়। এই হাড় পোঁতা এক মুদ্রাদোষ নয়; বরং তা নতুন ভাষার জন্মস্থান। কারণ পরক্ষণেই উচ্চারিত হয়: “তুমি দেখবে অবিন্যস্ত ভূমি / ফুটেছে জগৎ…”—এ যেন মৃত্যুর মধ্য দিয়েই এক জগৎ তৈরি হবার রহস্য।

এই রহস্যের অভ্যন্তরে থাকে এক বিক্ষিপ্ত গান, এক ভাঙা নদীর পার হয়ে যাওয়া, একক শেয়ালের ডাক, এবং প্রান্তিক জনতার কোলাহল—যা সব্যসাচীর কাব্যভাষায় গড়ে তোলে এক প্রত্নঋতু। এই কবিতাগুলো পাঠক ফিরে ফিরে পড়ে; পড়তে হয়। কারণ এগুলো এক পাঠে আত্মস্থ হয় না, বরং শরীরের ভেতরে জমে থাকে।

শুধু “অংশভাগ” নয়, “কবিতা”, “যৌথরাগ” ও “সারঙ”-এর মতো কবিতাগুলিও সেই জৈবিক-বিকল চৈতন্যের ধারক। “কবিতা”-য় লেখা হয়, “একাকী মাংসের বিনীত চলে যাওয়া / তুমুল মেঘ দিল অসহ্যে…”—এ যেন আত্মার মাংসে রচিত বেদনা। আবার “যৌথরাগ”–এ যৌনতা এক চৈতন্য হয়ে ওঠে। সেখানে বলা হয়: “দ্রংষ্ট্রা চাই লিঙ্গ চাই / নিঃসহায় তক্ষকের / গন্ধ চাই স্বপ্ন চাই”—যৌনতা এখানে পুরুষতন্ত্রের ভাষায় নয়, বরং এক আকুল প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ায় রূপান্তরিত।

“সারঙ” কবিতায় আবার নদী ও শরীর এক অনুপম মিথোজীবিতার ভাষা রচনা করে—“তুমি তা জেনেও ফের রুক্ষস্তনদ্বয় / মেলেছো রোদের দিকে মফসসলি মেয়ে”—এই মফস্বল যেন শুধু ভৌগোলিক নয়, এক সাংস্কৃতিক উপনিবেশ, যেখানে নারী শরীর বারবার ধুয়ে নেয় প্রান্তিকতা, প্রলয় ও প্রেম।

এই সবকিছু মিলে সব্যসাচীর কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে স্বরলিপিহীন সংগীত, যার ধ্বনি শোনা যায়, অর্থ ধরা যায় না—তবে অনুভব করা যায় অক্ষরের শরীর। তাঁর কবিতা কেবল পাঠ্য নয়, এক ধরণের বহুমাত্রিক ভাস্কর্য, যাকে ছুঁতে গেলে আপন শরীরের সীমা টের পাওয়া যায়।

❑ সাম্য রাইয়ান 

বাঙলাদেশে অ্যাকাডেমিক পরিসরে কবিতার অধ্যয়ন অদ্ভুত সংকটে পড়ে আছে; সংকটটি যেমন পাঠকের, তেমনই গবেষকের; যেমন রাষ্ট্রের, তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাঙলা কবিতা নিয়ে ‘অ্যাকাডেমিক’ আলোচনা বলতে আমরা যা বুঝি— যেমন বিশ্ববিদ্যালয়পাঠ্য বিশ্লেষণ, গবেষণাপত্র, পিএইচডি থিসিস, অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেসব বিভাগে বাঙলা কবিতা পড়ানো হয়— সেই পাঠক্রমকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এক গভীর আত্মঘাতী প্রবণতা। এই প্রবণতা একদিকে কবিতাকে গদ্যের মানদণ্ডে বিচার করছে, অন্যদিকে পাঠকের অনুভূতিমূলক সাড়া মুছে দিয়ে কবিতাকে মিউজিয়ামের মরা বস্তুতে পরিণত করছে।

বাঙলাদেশে কবিতার পাঠ্যক্রম নির্ধারণে যে তত্ত্ব ও কাঠামো প্রয়োগ করা হয়, তা মূলত ঔপনিবেশিক যুগে নির্মিত লিটারেরি এনালাইসিসের সূত্র দ্বারা প্রভাবিত। এখনো বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে ‘সামাজিক পটভূমি’, ‘ছন্দ ও অলংকার’, ‘আদর্শবাদ’, কিংবা ‘ঐতিহাসিকতা’— এই চার-পাঁচটি চাবিকাঠি দ্বারা পুরো পাঠ পরিচালিত হয়। ফলে, কবিতার ভাবব্যঞ্জনা, প্রতীকময়তা, ভাষিক বিনির্মাণ, কিংবা রচনাশৈলীর আত্মগত দিকগুলো প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। যেমন ধরুন জীবনানন্দ দাশ— যাঁর কবিতা মূলত এক আত্মঘাতী ভাষাবিন্যাসের রূপ— তাঁকে আজও ‘নির্জনতা’ কিংবা ‘প্রকৃতিপ্রেম’ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। যেন জীবনানন্দের কবিতায় ভাষার অন্বেষা নেই, আছে কেবল নিসর্গচিত্র।

এমন পাঠক্রমে কবিতার আত্মা মরে যায়। পাঠ্যপুস্তকে কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান, আবুল হাসান, আল মাহমুদ পর্যন্ত— সবাইকে নিয়ে একই রকম ছাঁদে আলোচনা হয়। তত্ত্বের নামে পাঠ্যকর্মে ঢুকে পড়ে এক ধরনের ‘মৌখিক-পরীক্ষা উপযোগী ফর্মুলা’— কবিতা নেই, আছে কেবল ‘নির্ধারিত ফর্মুলা মেনে’ কবিতার আলোচনা।

বাঙলাদেশে উচ্চতর শিক্ষা পর্যায়ে বাঙলা কবিতা নিয়ে যে গবেষণা হয়, তার প্রধান সমস্যা হলো এগুলো বেশির ভাগই তথ্যসংগ্রহমাত্র। যেমন: “১৯৬০–৭০ দশকের কবিতায় জাতীয়তাবাদ”, “আধুনিক বাঙলা কবিতায় নারীচিত্র”— এইসব গবেষণায় কবিতার ভাষা, ছন্দ, শৈলী কিংবা নির্জন প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশ্লেষণ প্রায় অনুপস্থিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গবেষণাপত্রগুলো হয়ে ওঠে কেবলই তথ্যের সংকলন; যেখানে কবিদের জন্মতারিখ, কাব্যগ্রন্থের তালিকা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জাতীয়তাবাদ বা স্বাধীনতার অভিঘাতের বিবরণ থাকে— কিন্তু কবিতা থাকে অনুপস্থিত।

সর্বনাশটা ঘটে যখন কবিতার আলোচনাকে নিছক “ডাটাবেস”-এ পরিণত করা হয়। গবেষণা তখন হয়ে পড়ে সাহিত্য-সংগ্রহশালা বা ক্রনিকলস। যেমন শামসুর রাহমানের একটি কবিতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একজন পিএইচডি গবেষক বিশাল রাজনৈতিক পটভূমি আঁকেন, যা আবার চর্বিতচর্বনও বটে; কিন্তু তার কবিতার শব্দবিন্যাস, বাক্যসংগঠন, অলংকারগত ব্যঞ্জনা কিংবা অন্তঃস্থ দ্বন্দ্ব সম্পর্কে সেই তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত আলোচনা করেন। কবিতা তখন কেবল বিষয়বস্তুতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এই সংকট অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যা হতো না, কিন্তু এর অভিঘাত গিয়ে পড়ে সাধারণ পাঠকের উপরেও। বাঙলা সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীরা কবিতা পড়েন না, মুখস্থ রাখেন; তারা আলোচনা করেন না, শুধু উদ্ধৃত করেন। বাঙলা বিভাগে কবিতা নিয়ে পাঠচক্র, সমালোচনাগ্রন্থ, নতুন ধারার পাঠ, এমনকি সমকালীন কবিদের আলোচনাও খুব বিরল। ফলে কবিতা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শব হয়ে শুয়ে আছে, একদা প্রাণবন্ত শিল্প যা পাঠকের হৃদয়ের খাঁজে ধরা দিত, এখন সেটি কেবল “ব্যাখ্যাযোগ্য” অথবা “নিরীক্ষাযোগ্য” বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বিচ্ছেদ আরও তীব্র হয় যখন দেখা যায়, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা আধুনিক কবিতা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানও রাখেন না। অধিকাংশ বাঙলা বিভাগের শিক্ষক এখনো ভাবেন, কবিতা মানেই কেবল ছন্দ ও অলংকারের গৎবাঁধা আলোচনা। তাঁরা এখনো নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী পড়ান “সাধারণ বোধ্যতা”র নমুনা হিসেবে। অথচ নীরেন্দ্রনাথ নিজেই ভাষার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর কবিতায়। সাহিত্যের পাঠে যদি পাঠক কবির দ্বন্দ্বকে ধরতে না শেখে, তবে সে কেবল ‘উত্তরযোগ্য’ প্রশ্নই মুখস্থ করবে।

বাঙলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কবিতা পাঠ্যপুস্তকও কবিতার অ্যাকাডেমিক বিপদের অন্যতম দায়ী ক্ষেত্র। এখানে কবিতা মূলত নৈতিকতা শেখার হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কবিতা এখানে ভাষার বিপ্লবী সম্ভাবনা নয়, বরং নীতিশিক্ষার মামুলি হাতিয়ার মাত্র।

বাঙলাদেশে এনসিটিবি প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তকে কবিতা নির্বাচনের মানদণ্ড কোনো সাহিত্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং রাষ্ট্র নির্ধারিত জাতীয় পরিচয়ের এক ‘মানুষ বানানো কারখানা’। কবির কণ্ঠস্বর, কবিতার ভাষা, কিংবা আধুনিক সংকেত— এসব বিষয় নিয়ে পাঠ নেই, আছে ‘শিক্ষণীয় বার্তা’, ‘দেশাত্মবোধের স্লোগান’।

এনসিটিবি যে পাঠ্যপুস্তক তৈরি করে, সেখানে কবিতার উপস্থাপনাটি মূলত দ্বিতীয় সারির একটি অবস্থা দখল করে আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সাহিত্যের পাঠ্যসূচিতে গল্প ও প্রবন্ধের তুলনায় কবিতার পরিমাণ অনেক কম।

উদাহরণস্বরূপ, নবম-দশম শ্রেণির “বাংলা সাহিত্য” বইয়ে যেসব কবিতা রাখা হয়েছে তার মধ্যে অধিকাংশই ক্লান্ত ও ক্লিশে ধাঁচের। কাজী নজরুল ইসলাম বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্বাচিত কবিতার পঙক্তিগুলো প্রায়শই রূপক, প্রতীক কিংবা ছন্দের দিক থেকে শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন, অথচ সেই পাঠকে অনুভবযোগ্য করার জন্য কোনো প্রাসঙ্গিক দিকনির্দেশনা বা ভিন্নমুখী পাঠপ্রক্রিয়া নেই।

আবার, এই পাঠ্যপুস্তকে আধুনিক বাঙলা কবিতার প্রতিনিধি হিসেবে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মোহাম্মদ রফিক কিংবা সিকদার আমিনুল হক—এইসব গুরুত্বপূর্ণ নাম কখনো অনুপস্থিত আবার কখনো নামমাত্রভাবে উপস্থিত। ফলে শিক্ষার্থীরা কবিতার বিবর্তন, শৈলীভেদ ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারাবাহিক জ্ঞান লাভ করতে পারে না।

বাঙলাদেশে পাঠ্যপুস্তকের কবিতা নির্বাচন প্রায়শই রাজনৈতিক, আরো স্পষ্ট করে বললে দলীয় উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত। যেমন, ২০১৭ সালে পাঠ্যক্রমে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেখানে বেশ কিছু আধুনিক কবিতা ও গল্প বাদ দিয়ে ইসলামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। কবিতার জায়গায় কিছু নীতিকথামূলক ছড়া, ধর্মীয় মূল্যবোধ-নির্ভর রচনা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পাঠ্যসূচি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যহীন এবং আদর্শিকভাবে সংকুচিত।

বাঙলাদেশের সমাজ যেমন বহুবর্ণিল, তেমনি বাঙলা কবিতাও বহুস্বরতা ও বহুমাত্রিকতার ধারক। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে সেই বহুস্বরতার কোনো প্রতিফলন নেই। গ্রামীণ জীবনের সাদামাটা বর্ণনা অথবা অতীতমুখী দেশপ্রেম—এই দুই ঘরানায় কবিতাকে সীমাবদ্ধ রেখে মূলত একটি ‘নিরাপদ’ পাঠ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রশ্ন ওঠে না, নতুন চিন্তাজগৎ উন্মোচিত হয় না, এমনকি বাঙলাদেশের পরিবর্তিত আর্থসামাজিক রূপরেখাকেও প্রতিফলিত করে না।

ফলে বর্তমান পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের কবিতা সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটি স্বাভাবিক শিক্ষার্থী যখন ‘আমাদের গ্রাম’, ‘বাঙলাদেশ’ কিংবা ‘আমার স্কুল’ টাইপের ছড়ার পুনরাবৃত্তি শুনতে থাকে, তখন তার কাছে কবিতা হয়ে ওঠে শুধুই মুখস্থ করার একটি ক্লান্তিকর কাজ। সে বুঝতেই পারে না কবিতা কেমন করে মানুষের আত্মার কথা বলে, প্রেম বা প্রতিরোধের ভাষা হয়, নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করে বা একটি জাতির স্বপ্নের প্রকাশভঙ্গি হয়ে উঠতে পারে।

দুঃখজনক হলো, শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা সাহিত্যে ভর্তি হওয়ার পরেও আধুনিক কবিতার কোনো উল্লেখযোগ্য নাম জানে না। কারণ তারা স্কুলজীবনে কবিতাকে আবিষ্কারের সুযোগ পায়নি, শুধু মুখস্থ করেছে নিরর্থক পংক্তিমালা। এমনকি বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকদের সাথেও বাঙলা সাহিত্যের কোনো সম্পর্ক তৈরি হয় না৷ এর কারণ, অ্যাকাডেমিক জীবনে সাহিত্য তার জিভে স্বাদ তৈরি করতে পারেনি৷ ফলে সারাজীবন সে থেকে গেছে স্বাদবঞ্চিত৷

শুধু কবিতা নির্বাচন নয়, পাঠ্যপুস্তকে কবিতার বিশ্লেষণ-চর্চাও সীমিত এবং যান্ত্রিক। “কবিতাটির মূলভাব কী?”, “কবি কী বলতে চেয়েছেন?”—এই প্রশ্নগুলো এতই যান্ত্রিক যে শিক্ষার্থীকে ভাবনার সুযোগ দেয় না। তারা শিখে নেয়, একটি নির্দিষ্ট ‘সঠিক উত্তর’ আছে, সেটাই মুখস্থ করতে হবে। কবিতা হয়ে ওঠে ব্যাকরণমূলক পঠনের একটি অবয়ব, যেখানে কল্পনার, প্রশ্নের, অনুভবের কোনো জায়গা নেই।

এর ফলে শিক্ষার্থীরা সাহিত্যের পাঠকে ‘অ্যাকাডেমিক বোঝা’ হিসেবেই দেখে। কাব্যিক বোধ, শৈল্পিক ভাবনা বা প্রতীকের ব্যঞ্জনা—এসব কিছুই তাদের কাছে অনুপস্থিত থেকে যায়। বুদ্ধদেব বসুর প্রাসঙ্গিক মন্তব্য উদ্ধৃত করা যাক, “কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনে; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো’ যাবে না।”

‘অনুভূতি’ বলে যাকে আমরা চিহ্নিত করলাম, মানুষে মানুষে তার পার্থক্য হয়। কারণ এক একজন মানুষ এক এক রকমভাবে জীবনকে যাপন করেন, এক এক রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন৷ ফলে একই ক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ও অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু অ্যাকাডেমি তা মানতে নারাজ৷

বাঙলাদেশে বর্তমানে যেসব শক্তিশালী কবি সাহিত্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন— যেমন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মজনু শাহ, মাসুদ খান, নাভিল মানদার, আরো অনেক নাম বলা যাবে— এদের নিয়ে অ্যাকাডেমিক আলোচনা বা পাঠ্যসূচিতে কোন আলাপই নেই। কবিতার নামমাত্র সমকালীনতা মানে এখনো শামসুর রাহমানের ১৯৯০ সালের কবিতা। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকেও কবিতায় যে বাঁকবদল ঘটেছে, যে নতুন ধারার কবিদের আগমন ঘটেছে তার উল্লেখ পাঠ্যপুস্তকে নেই৷ শাহেদ শাফায়েত, শোয়েব শাদাব, শামীম কবির কিংবা এরকম আরো বেশ ক’টি নাম উল্লেখ করা যাবে, যা অ্যাকাডেমিক আলোচনায় বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত!

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কিংবা বোর্ড নির্ধারকরা কবিতার বদলের ভাষা সম্পর্কে উদাসীন। অনেক শিক্ষক হয়তো জানেনই না, বাঙলাদেশের কবিতা এখন প্রকৃতি, শরীর, অভিবাসন, কুইয়ার পরিচয়, রাজনৈতিক নিপীড়ন, অথবা ভাষাগত বেদনার নতুন রূপে প্রবেশ করেছে। এই রূপায়ণকে অস্বীকার করে যখন পাঠ্যক্রমে পুরনো কবিতাগুলোকে পুনরাবৃত্তি করা হয়, তখন কবিতা এক ধরনের সাংস্কৃতিক ‘মমিফিকেশন’-এর শিকার হয়। কবিতা তখন আর জীবন্ত শিল্প থাকে না, বরং হয়ে ওঠে মৃত সময়ের প্রত্নতত্ত্ব।

তবে এই আঁধারের ভেতরেও কিছু আলো দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ব্র্যাক, আইইউবিটি, কিংবা ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সাহিত্য পাঠক্রমে শুনেছি কিছু কিছু সমকালীন কবিতা যুক্ত হয়েছে। সেখানে ফেমিনিস্ট পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেও কবিতা পড়ানো হয়, পোস্টকোলোনিয়াল পাঠের আলোকেও ভাবা হয় কবিতার নির্মাণকে। তবে এই উদাহরণগুলো ক্ষীণ, এবং এখনো বৃহত্তর অ্যাকাডেমিক কাঠামোকে পরিবর্তন করার মতো শক্তি অর্জন করেনি।

সাহিত্যের দার্শনিক অভিঘাত ও বাঁকবদল বুঝতে হলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই সাহিত্যের আন্দোলনসমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারনা রাখা উচিৎ৷ কিন্তু আমাদের উন্নাসিক অ্যাকাডেমিগুলো এ বিষয়ে কতটুকু ওয়াকিবহাল? বাঙলাদেশের এতগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো বাংলা বিভাগের মধ্যে দুটিতে মাত্র ‘সাহিত্য-আন্দোলন’ নামক কোর্সের অস্তিত্ব রয়েছে! বিস্ময়কর! কিন্তু সেখানেও নেই পর্যাপ্ত তথ্য ও তত্ত্বের সমাবেশ৷ নেই বাঙলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের আলোচনা, নেই সাহিত্যের দিকবদলের সাহিত্যিকের আলোচনা! পুরো ‘ঝোঁক’টাই কেবল নিরাপদ সাহিত্যের দিকে৷ যে সাহিত্য শুধুই রাষ্ট্র ও তার চালকের পক্ষে কথা বলে নয়তো এড়িয়ে যায়৷ ফলে অ্যাকাডেমিতে যে শিক্ষকরা পড়ান, অতিসামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে এরা জীবনে ‘লিটলম্যাগ’ শব্দটার সাথেও পরিচিত না৷ ফলে এদের হাতে সাহিত্যের আলোচনা বা শিক্ষা দানের কাঙ্ক্ষা কেবলই বানরের হাতে খন্তা প্রবাদটি স্মরণ করায়৷

বাঙলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোও নানামাত্রিকভাবে অ্যাকাডেমির কম সর্বনাশ করেনি৷ দলীয় লবিংয়ে অযোগ্য, অথর্ব লোকজনকে শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদগুলোতে নিয়োগ, অ্যাকাডেমিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এর মধ্য দিয়ে এবং ইতিহাসে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে ইতিহাস বিকৃত করার মতো জঘন্য কাজও একাধিকবার দেখা গেছে৷ এই ধরনের সর্বনাশের মুখোমুখি শুধু ইতিহাস বিভাগকেই নয়, বাঙলা সাহিত্য বিভাগকেও হতে হয়েছে, এমনকি এখনো হচ্ছে৷ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন তার দলীয় লেখকদের লেখা সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে মানহীন নিম্নমানের সাহিত্যকর্ম পাঠ্যতালিকায় যুক্ত করা হয়েছে৷ এই কথা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এরশাদ… সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ এমনকি চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরপরই আমরা দেখেছি তড়িঘড়ি করে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের ধুম পড়ে গেছে! উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দক্ষিণপন্থী লেখকদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে৷ এই সকল কর্মকাণ্ডে বাঙলাদেশের অ্যাকাডেমি বিপর্যস্ত৷ ক্ষমতাবলে অযোগ্য-অথর্ব লোকেদের ভিসি, অধ্যক্ষ, শিক্ষক এরকম নানা পদে বসানোর যে সংস্কৃতি বহুবছর ধরে চলমান, অভ্যুত্থানের পর তা বরং বৃদ্ধি পেয়েছে! এইরূপে অ্যাকাডেমি যোগ্য ব্যক্তিকে যথাস্থানে পায় না, ফলে সে ক্ষতির ভার বহন করতে হয় ছাত্রদের৷ 

এর ফলে বর্তমানে কবিতা বিষয়ক আগ্রহ অ্যাকাডেমির কল্যানে যতটা না জন্ম নিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জন্ম নিচ্ছে ইউটিউব, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে ভিডিও রিল, আবৃত্তি কিংবা মাইক্রোপোয়েট্রির মাধ্যমে। আমি অনেককে দেখেছি, অনলাইনে কোনো কবিতার পংক্তি বা অনুচ্ছেদ পাঠ করে সেই কবি সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছে৷ কিন্তু এখানেও সমস্যা—এই আগ্রহ একটি ঝলমলে আবেগময়তা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, কারণ শিক্ষার্থীর মধ্যে কবিতার কাঠামো, ব্যঞ্জনা, ধ্বনি কিংবা প্রতীকের গভীর উপলব্ধি তৈরিই হয়নি।

তারা কেবল ‘মন ভালো করার লাইন’ খোঁজে। কারণ পাঠ্যপুস্তক তাদের এমন এক নিরুত্তাপ, বর্ণহীন কবিতা চিনিয়েছে যার কোনো আবেগ নেই, প্রতিবাদ নেই, স্বপ্ন নেই। এইভাবে পাঠ্যপুস্তক এক বিস্মৃত প্রজন্ম গড়ে তুলছে, যারা কবিতার নাম জানে, কিন্তু তা অনুভব করার শক্তি আর তাদের অন্তরে নেই।

বাঙলাদেশে যত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগ আছে এগুলো বেসিক্যালি অথর্ব প্রতিষ্ঠান; কিন্তু তারা যদি ঠিকমতো পারফর্ম করতো, অর্থাৎ নিজ দায়িত্বটুকু পালন করতো, তাহলে সমাজে জীবন্ত কবি-সাহিত্যিকের সাথে ছাত্রদের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হতো, সমাজে তাদের মূল্যায়ন ও পারস্পরিক আদান-প্রদান ঘটতো, যার প্রভাব সমাজে দৃশ্যমান হতো৷ এর ফলে দেখা যেত দেশে এমন কোনো আলোচনাযোগ্য কবি বাকি থাকতেন না যাকে নিয়ে অ্যাকাডেমি অন্তত পাঁচটা প্রবন্ধ-থিসিস তৈরি করেনি৷ কিন্তু এই অথর্ব প্রতিষ্ঠানগুলো ও তার শিক্ষক নামক চাকুরীজীবীগুলো অন্য পেশাজীবীর মতোই স্রেফ চাকুরী বাঁচানো আর নানা দুর্নীতি করে অবৈধ পয়সা কামানোর ধান্দায় মত্ত!

বাঙলাদেশে কবিতার অ্যাকাডেমিক বিপদ কাটাতে হলে প্রথমত প্রয়োজন, পাঠ্যক্রমে ভাষাবিন্যাস ও পাঠভিত্তিক মডেল অন্তর্ভুক্ত করা। কবিতার বিশ্লেষণ হওয়া উচিত তার অন্তর্গত নির্মাণ পদ্ধতি, শব্দ ও প্রতীকের সম্ভাব্য পাঠভেদ ও পাঠপ্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে।

দ্বিতীয়ত, গবেষণা করতে হবে কবিতার ভেতর ঢুকে, তার ছন্দ, ভাষা, প্রতীক, নীরবতা— সবকিছুর সমন্বয়ে। তথ্যসংগ্রহের বাইরে গিয়ে কবিতা-নির্ভর বিশ্লেষণ আমাদের একমাত্র রক্ষা।

তৃতীয়ত, পাঠ্যপুস্তকে সাহিত্যের নাম করে কেবল উপদেশ বা বার্তা ঠেসে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। কবিতা হলো পাঠকের একাকিত্বের অনুরণন, যা কেবল রাষ্ট্রীয় বার্তা নয়, আত্মিক জিজ্ঞাসাও বটে।

চতুর্থত, আধুনিক কবিতা ও সমকালীন কবিদের জায়গা করে দিতে হবে অ্যাকাডেমিক পাঠে। সাহিত্যের পাঠ হতে হবে জীবনের পাঠ, নিছক চরিত্র বা বিষয় নয়।

বাঙলা কবিতা যদি কোনোদিন বেঁচে থাকে, তবে সেটি অ্যাকাডেমির রেফারেন্স-ভিত্তিক গবেষণায় নয়, বরং সেই পাঠকের হৃদয়ে, যে এখনও কবিতায় নিজেকে খোঁজে। কিন্তু অ্যাকাডেমি যদি এই পাঠককে তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে কবিতা একদিন কেবল মিউজিয়ামে টিকে থাকবে— মরা ভাষায়, মরা কাগজে, মৃত পাঠকের অপেক্ষায়।

বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে কবিতার অ্যাকাডেমিক বিপদ মানে কেবল পাঠক্রমের ত্রুটি নয়, বরং একটি বৃহৎ সাহিত্য-সংস্কৃতির আত্মপরিচয় সংকট। এই সংকট কাটাতে হলে চাই নতুন পাঠ-রাজনীতি, মুক্ত পাঠচর্চা, এবং সেইসঙ্গে এমন গবেষক ও শিক্ষক, যাঁরা কবিতার প্রেমে পড়েছেন— কেবল চাকরির প্রশ্নে নয়, নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

কবিতা তার কাছে ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, রাজনৈতিক মৃদু বিদ্রোহ এবং এক অন্তর্মুখী হাসির পুঁজি দিয়ে লালিত এক রচনাকৌশল। ফলে তা প্রচলিত রোমান্টিকতা বহন করে না; বরং আত্মবিশ্বাসহীনতা, সংবেদী আত্মসমালোচনা এবং একধরনের চতুর, চাপা প্রতিবাদে আবৃত। বাঙলা কবিতায় যা ‘সাবভার্সিভ কবিতা’ নামে পরিচিত, প্রবুদ্ধসুন্দর কর হয়তো তারই এক সংক্ষিপ্ত, নিরুচ্চার প্রতিনিধি—যার কবিতায় গভীর রাজনৈতিক উচ্চারণ নেই, কিন্তু মেদুর সামাজিক বিদ্রুপ আছে।

প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতা আত্মজৈবনিক নয়, অথচ আত্মপরিহাসে পরিপূর্ণ; তাঁর কবিতা গম্ভীর নয়, বরং গম্ভীরতার মুখোশ ভেঙে ফেলে; এই কবিতা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দাবি জানায়, অথচ সংগঠিত রাজনীতির নয়, বরং অরাজনৈতিক সংকেত দিয়েই ভাষা তৈরি করে।

যেমন, ‘সংকর’ মাত্র তিনটি পংক্তির কবিতা। বাঙলা কবিতায় এত কম কথায়, এতটা আত্ম-আঘাতী সত্য অনেক কম লেখকই বলতে পেরেছেন:
“বাবা, বেগবান অশ্ব
মা, উদ্ভট সংসারের ভারবাহী গাধা
আমি খচ্চর, বাংলাকবিতা লিখি।”

এই কবিতাটি আত্ম-অবমাননা দিয়ে শুরু হলেও তা নিছক কৌতুক নয়। এখানে ‘খচ্চর’ শব্দটির মধ্য দিয়ে কবি যেন তার নিজের পরিচয়ের অনিশ্চয়তা তুলে ধরেন। খচ্চর—যে না অশ্ব, না গাধা—এই সংকর জাতটাই কবির কাব্যচর্চার উৎস। এবং এই সংকরতা দিয়ে কবি বাঙলা কবিতার নির্মাণকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন। এখানে ‘বাংলাকবিতা লিখি’ বলে যে আত্মসমাপ্তি, তা আসলে অনুচ্চারিত উপহাসও হতে পারে—যেখানে কবি নিজেই কবিতাকে লঘু করে তোলেন, আবার পাঠককেও ভাবতে বাধ্য করেন, কবিতা কাদের দ্বারা, কীসের দ্বারা রচিত হয়?

প্রবুদ্ধসুন্দর কর এক আশ্চর্য মর্মস্পর্শী অথচ সংযত বিদায় মুহূর্ত এঁকেছেন তিনি ‘দরজা’ কবিতায়। আমাদের আশেপাশের সম্পর্কগুলো যখন ভেঙে যায়, তখন সেই বিচ্ছেদের অনুভূতিকে কীভাবে সাহিত্যে ধরতে হয়, তা এই কবিতা নিঃশব্দে শিখিয়ে দেয়। কবি বলেন:
“একটি কথাও না বলে তার
ব্রিফকেস গোছাতে সাহায্য করো।”
“শুধু এগিয়ে দেওয়ার পথে নীচু স্বরে বোলো
দরজা ভেজানো থাকবে
টোকা দেওয়ার দরকার নেই।”

এই পরামর্শ—ভেতরে যে আবেগ জমে আছে তা যেন বাইরে না আসে—সেই অদ্ভুত সংযমের পাঠ, যা আমাদের সামাজিক আচরণেরও এক মডেল হয়ে দাঁড়ায়। বিচ্ছেদের মঞ্চে চিৎকার না করে, মৃদুস্বরে বলা “দরজা ভেজানো থাকবে” হয়ে ওঠে কবিতার হৃদয়। যেন এক লালন-কবি, যিনি বলেন, ‘যাহা বাহিরে, তাহাই অন্তরে’—তবে এখানে তা আরও সংযত, আরও নীরব, আরও গোপন।

তাঁর রাজনৈতিক কবিতার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক৷ যেমন ‘অস্ত্র’ কবিতাটি অনেকটা স্বাস্থ্য-বিজ্ঞাপনের ছদ্মাবরণে লেখা রাজনৈতিক কাব্য। প্রথমদৃষ্টিতে মনে হবে এটি স্বাস্থ্য-পরামর্শ:
“জল যখনই খাবেন, বসে দিনে জল বেশি খান, রাতে কম।”
“ভুলে যাবেন না, অনেক কিছুর উপরই পেচ্ছাপ করে যেতে হবে আমাদের।”

এই কবিতাটি এক মোক্ষম কৌশল। কবি জানেন, আমাদের কোনো সংগঠন নেই, ম্যানিফেস্টো নেই, কিছুই নেই—শুধু আছে ‘বৃক্ক’। এই বৃক্ক বা কিডনি-কে কবি একমাত্র অস্ত্র বলেছেন, কারণ এটিই ছাঁকনি—ভালোকে রাখে, খারাপকে ত্যাগ করে। এখানে রাষ্ট্র বা সমাজের নোংরামি, কুৎসা, অবদমন এবং সহ্যশক্তির বিরুদ্ধে এক মেটাফোর তৈরি হয়। বৃক্ক সচল থাকলে, মানসিক প্রতিবাদও সচল থাকবে—এইবার্তাটি কখনোই সরাসরি দেওয়া হয় না, কিন্তু একটি স্বাস্থ্য-সতর্কবার্তার পেছনে যেন গোটা রাজনৈতিক কবিতাটিই ঢুকে পড়ে।

আধুনিক কবিতার কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব—সাহিত্যজগৎ বনাম ব্যক্তিগত অহংবোধ, তার এক নির্মম উপস্থাপনা ‘ইগো’। এ কবিতায় নিজেকে “এক নাস্তিক ব্লগার” হিসেবে দেখিয়ে কবি এমন এক দৃশ্যকল্প রচনা করেন, যেখানে “চাপ চাপ লাল ইগো মিশে যাচ্ছে পথের ধূলিতে।” কিন্তু এই ‘ইগো’ যেন কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক—কবি এখানে একতরফাভাবে প্রতারিত হয়েছেন বলেই নয়, বরং নিজের অবস্থান নিয়েও আত্মসমালোচনায় নিমগ্ন হয়েছেন। বাঙলাদেশে গত এক যুগের বাস্তবতা সম্পর্কে যদি আপনি অবগত থাকেন, তাহলে তো জানেনই নিজেকে ‘ব্লগার’ শব্দদ্বারা পরিচয় করানোর অর্থই হলো মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে নিজেকে হত্যাযোগ্য করে তোলা; আর যদি পরিচয় গড়ে ওঠে “নাস্তিক ব্লগার” তবে এদেশে তার হত্যা অনিবার্য৷ এমন পরিস্থিতিতে নিজকে “নাস্তিক ব্লগার” বলার মধ্য দিয়ে কবি আসলে এই সংখ্যালঘু, জিজ্ঞাসু অংশের মানুষেরই পাশে দাঁড়ালেই মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে৷
“আমি তো তোমাকে ডাকিনি কখনো।
তুমিই এগিয়ে এসে খুব গায়ে পড়ে রেখেছিলে প্রণয়প্রস্তাব।”

এই ‘তুমি’ কে? প্রেমিকা? কবিতা? পাঠক? না কি সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান? এই বহুব্যাখ্যামূলকতা কবিতাটিকে বহুমাত্রিক ও আধুনিক করে তোলে। এখানে চূড়ান্ত ব্যক্তিগত অপমান এবং সামাজিক বিদ্রুপ একসূত্রে বাঁধা।

তথাপি প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতা কোনো নিরেট বক্তব্য দিতে চায় না—তারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, ‘ডামি’ পাঠকের সামনে রেখে আসল কবিকে গোপন রাখে। ‘ঝুঁকি’ কবিতার দিকে তাকানো যাক—
“এতদিন যাকে দেখা গেল, সে আমার ডামি
আজ থেকে ডামি সরিয়ে সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিতে চাই।”

এই ঘোষণা, বাঙলা কবিতার জগতে এক নিজস্ব আত্মপ্রকাশ। আমরা যারা কবিতা লিখি, তাদের প্রত্যেকেরই এক-একটা ‘ডামি’ থাকে—নিরাপদ মুখ, সুস্থ স্বর, প্রতিষ্ঠানের উপযোগী ভাষা। কিন্তু এই কবিতাটি সেই মুখোশ খোলার কবিতা। এবং সেই মুখোশ খুলে কবি সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিতে চান—এই সাহসী উচ্চারণই প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতাকে সমকালীন অন্য অনেক রচনার থেকে পৃথক করে তোলে।

শেষে যেটি বলা দরকার, তা হলো ‘কু-কবিতা’—যা প্রবুদ্ধসুন্দর করের রচনার সবচেয়ে সামাজিক এবং সবচেয়ে দার্শনিক নির্মাণ। একটি নীতিশিক্ষার খেলনা তিনটি পুতুল—যে পুতুলগুলো মুখ, কান ও চোখ বন্ধ রাখে—তার মধ্য দিয়ে কবি তুলে ধরেন সমগ্র সমাজের ভণ্ডামি। এমন লেখা কৌতুকের ঢঙে হলেও ভয়াবহ রকমের সিরিয়াস:
“যে-পুতুল মুখ চেপে রাখে, তার চোখ ও কান খোলা থাকার কারণে সে সবসময় কু-কথা দেখে এবং কু-কথা শোনে।”

তিনটি পুতুলই নিজ নিজভাবে ব্যর্থ—কারণ তারা আংশিক নিষেধ মেনে চলে, পূর্ণত নিষিদ্ধ করে না। আর তাই:
“আজ, দু-হাত খোয়ানো তরুণ কবিরা, কু-কথা বলতে বলতে, কু-কথা শুনতে শুনতে এবং কু-দৃশ্য দেখতে দেখতে, পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মরুভূমির বালিতে, নীতিপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে অজস্র কু-কবিতা লিখে রাখে।”

এই ভঙ্গিমার মধ্য দিয়েই প্রবুদ্ধসুন্দর কর হয়ে ওঠেন চূড়ান্ত প্রতিবাদী। কোনো রাজনীতি নেই, কোনো শ্লোগান নেই—তবু এই কবিতা কম্পিত করে। বালির ওপর পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে লেখা কু-কবিতার এই দৃশ্য আমাদের সময়ের অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাহসী কবির প্রতীক হয়ে থাকে।

প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতা আমাদের সামনে তুলে ধরে একান্ত কাব্যিক ব্যক্তিত্ব, যে নিজেকে প্রচলিত কবিতার ‘ডামি’ থেকে মুক্ত করে “সম্পূর্ণ ঝুঁকি” নিতে চায়। তার ভাষা কখনো ঠাণ্ডা-বিদ্রুপে ভরা, কখনো আশ্চর্য নরম আত্মপরিচয়ে ঘেরা, কখনো আবার নিঃশব্দ বিস্ফোরণ। বাংলা কবিতার শ্লেষ, হাস্যরস, আত্মসমালোচনা এবং অন্তর্লীন বিদ্রোহকে যিনি এক কিমিয়া করে ফেলেছেন—তাঁর নাম প্রবুদ্ধসুন্দর কর। তাঁর কবিতা এক অস্ফুট দাহ—যার উত্তাপ পুড়িয়ে দেয় নৈতিকতা, নৈরাশ্য এবং নকল কবিতার মুখোশ।

❑ সাম্য রাইয়ান 

“Let us go then, you and I,”
—এই আহ্বানের মধ্যে কি প্রেমের গোপন গন্ধ লুকানো আছে? নাকি শুধু একাকীত্বের কাতর স্বীকারোক্তি? টি এস এলিয়টের The Love Song of J. Alfred Prufrock কোনো প্রেমের গান নয়, বরং এক ভেঙে-পড়া মানুষের আত্মসমীক্ষা—যেখানে প্রেম আসেনি বলেই তার প্রেম-হীনতা নিয়ে এত কথা। কবিতার নায়ক প্রুফ্রক এক অনিশ্চিত, দ্বিধাগ্রস্ত, অসহায় আধুনিক মানুষ—যে আত্মপ্রেমিক, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী নয়। কবিতার আড়ালে সেই প্রশ্নবিদ্ধ মানুষের মুখই উঁকি দেয়, যার গলায় আটকে থাকে ‘Do I dare?’—এর মতো বাক্য।

টি এস এলিয়ট কবি হিসেবে এমন এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেখানে তাঁর প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, দর্শন ও ব্যক্তিগত অনুভবের সংমিশ্রণ। আলোচ্য কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে Poetry: A Magazine of Verse-এ, যখন বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক পরিসরে নয়, মানুষের মনোজগতে ভয়াবহ ছাপ রেখে চলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রুফ্রক হয়ে ওঠেন এক মানসিক উদ্বেগের প্রতীক।

প্রুফ্রকের ভাষা, তার বাক্যবন্ধ, তার চিন্তার গতিপ্রকৃতি—সবই যেন এক আত্মপর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতা। ‘I have measured out my life with coffee spoons’—এই বাক্যে বুঝিয়ে দেয় সময় কেমন একঘেয়ে, কেমন নিরানন্দ ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে। একটি গোটা জীবনের হিসাব কফির চামচ দিয়ে মাপা—এ যেন বিষণ্নতা ও আত্মসমালোচনার এক চরম রূপক। এখানে সময় কোনো মহাকাব্যিক মহিমা নয়, বরং দৈনন্দিনের ক্লান্তিকর টানাপোড়েন।

কবিতাটি শুরু হয় দান্তের Inferno থেকে নেওয়া এক উদ্ধৃতি দিয়ে—যা প্রমাণ করে এলিয়ট কেবল আধুনিক নন, তিনি সাহিত্য-ঐতিহ্যের উত্তরসূরিও। তিনি পুরাণ ও ইতিহাসকে আধুনিক চেতনাজগতে টেনে এনেছেন, যেন দেখাতে চান—মানুষ বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু আতঙ্ক, সংশয়, পাপবোধ ও আত্মগ্লানির মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো চিরকালীন। এলিয়টের এই কাব্যভাষা কঠিন, সংকেতময়, কিন্তু একবার এই সংকেতগুলোর মানে খুঁজে নিতে পারলে, পাঠকের সামনে এক অন্য জগত খুলে যায়।

এখানে প্রেম নেই, অথচ কবিতার নাম ‘Love Song’। কিন্তু তাই বলে এলিয়ট আমাদের ফাঁকি দেন না, বরং প্রশ্ন করেন—‘What is love in a world so barren, so self-conscious, so filled with doubt?’ এই কবিতা প্রেমের এক অনুপস্থিতি থেকে জন্ম নেয়। প্রুফ্রকের প্রেমের গান মানেই তার প্রেমহীন জীবনের রুদ্ধ কান্না। হয়তো তাই কবিতার শেষে এসে সে বলে:
“I do not think that they will sing to me.”
এই ‘they’ কে? প্রেমিকারা? সমাজ? ইতিহাস? পাঠক?—এলিয়ট উত্তর দেন না। এবং এখানেই কবিতাটি হয়ে ওঠে বহুমুখী পাঠের জন্য প্রস্তুত এক রূপান্তরযোগ্য শিল্পকলা।

এলিয়ট বিশ্বাস করতেন, একজন কবিকে কেবল অনুভূতির ধারক হলেই চলবে না; তাকে হতে হবে দার্শনিক, ঐতিহাসিক ও আত্মসচেতনও। এলিয়ট নিজে ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, অথচ আধুনিকতার সমস্ত জটিলতা ও সংশয় নিয়ে লিখেছেন। ফলে তাঁর কবিতায় ধর্ম এক নৈতিক বিবেচনা বা চেতনার বিষয়, কেবল বিশ্বাসের রূপ নয়। প্রুফ্রকের মধ্যে সেই ধর্মবোধ নেই, কিন্তু আছে গ্লানিবোধ। এটা একরকম পাপবোধ, যেখানে অপরাধ নেই, কিন্তু আত্মসমালোচনা আছে।

এই কবিতায় শহরের অলিগলি, বিকেলের কুয়াশা, ধুলোজমা জানালা, মুচমুচে রুটি ও চায়ের কাপ—সবই যেন এক উদাসীন, জড় অথচ প্রাণবান বাস্তবতার অভিজ্ঞতা। শহর এখানে মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়, তাকে আত্মগত করে তোলে। এলিয়ট এক শহুরে আধুনিকতার কবি—যেখানে শহর মানে আত্মপরিচয়ের সংকট।

প্রুফ্রক কথা বলে, কিন্তু সেই কথা পৌঁছে না। কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইন হলো—
“That is not it at all,
That is not what I meant, at all.”
এই বাক্য দুটো যেন আমাদের সকল ‘miscommunication’-এর সারমর্ম। এলিয়ট আমাদের বলে দেন না কী করতে হবে, বরং আমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোকে চিহ্নিত করেন। তাই তাঁর কবিতা বোঝা কঠিন—কারণ সেটি সরল বার্তা দেয় না, বরং জটিল অভিজ্ঞতার দিকে আমাদের ঠেলে দেয়।

একসময় প্রুফ্রক স্বপ্ন দেখে, সে হয়তো “a pair of ragged claws / Scuttling across the floors of silent seas” হয়ে যেতে পারত। এ যেন এক হিরো হতে না পারার শোকগাথা। এই অনুপুঙ্খ বর্ণনায় মানুষটির আত্মতাড়না ফুটে ওঠে। সে জানে, তার কথায় কেউ সাড়া দেবে না; তাই সে নিজের সঙ্গে কথা বলে।

টি এস এলিয়ট বলেছিলেন,
“Genuine poetry can communicate before it is understood.” 
The Love Song of J. Alfred Prufrock কবিতাটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পাঠক প্রথমে হয়তো কিছুই বোঝেন না, কিন্তু অনুভব করেন। এই অনুভবের মধ্যেই কবিতার বাস্তবতা; কেননা এলিয়টের কবিতা ‘বোঝা’ নয়, ‘অনুভব’ দাবি করে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

তানজিন তামান্না কবিতায় নির্মাণ করেছেন নিজস্ব বার্তাবাহী ভূগোল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে সম্পর্ক, প্রত্যাশা, অপেক্ষা আর বিচ্ছেদের অপার বার্তাবলয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘কুরিয়ার সিরিজের কবিতা’ এই সময়ের বাঙলা কবিতায় এক ব্যতিক্রমী সংযোজন; যেখানে প্রতিটি কবিতা একেকটি চিঠি, আর প্রতিটি চিঠিই যেন একেকটি দৃশ্যান্তরের নকশা। কোথাও শালিক হয়ে কুরিয়ার আসে, কোথাও আসে পদ্মফুল, কোথাও আবার ঘুম অথবা জানলার কাঁচ। উত্তর-আধুনিক এই কবির কবিতায় বারবার ফিরে আসে প্রেরক, প্রাপক, খাম, ফুটফুটে হাঁসের বাচ্চার মতো নরম শব্দের অবতারণা, আবার কখনো শালিক বা ঘুমের মত বিমূর্ত অভ্যন্তরীন অবস্থাও হয়ে ওঠে কাব্যিক চরিত্র। এখানে কবিতা হয়ে উঠেছে কুরিয়ার—প্রেরক, প্রাপক আর মাঝে দূরত্বে ভরসা রেখে যাওয়া অদৃশ্য এক বার্তাবাহক। মলাটবদ্ধ গ্রন্থখামে শুয়ে আছে দূরবর্তী সম্পর্ক, নিরব প্রতীক্ষা, স্মৃতি ও আবেগের ভাঁজ খোলা সুর।

বইটি প্রথমেই পাঠককে এক ঘুমভাঙা অবচেতনতার দিকে ডেকে নিয়ে যায় এভাবে—
“তোমার ঘুমের পাশে বসে থাকতে থাকতে— কিছুট‍া ঘুম নিয়ে ঘুমিয়ে পড়বো আমিও”
“আমাদের ঘুমের ভেতর এসে দাঁড়াবে— দীর্ঘকায় বেনাপোল এক্সপ্রেস”

এই ‘ঘুম’ কেবল নিদ্রা নয়, বরং এক জীবনঘুম—যার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে ট্রেনের মতো দীর্ঘ শ্বাস। ঘুমিয়ে থাকাই এখানে এক ধরনের প্রতীক্ষা, যেখানে স্মৃতির ট্রেন এসে থামে না—সে চলে যায়, রেখে যায় শব্দহীনতা। কবি প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছেন ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’—যা সীমান্তের ট্রেন, এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে যায়, অথচ ভেতরে এক অনন্ত অদৃশ্য যাত্রার আভাস।

তাঁর কবিতায় চিঠির ধারণাটি হয়ে ওঠে সময়ের মধ্যকার এক নৈর্ব্যক্তিক কথোপকথন। ঘুম, ট্রেন, প্ল্যাটফর্ম—সবই এখানে জীবিত প্রতীক। পাঠকের হৃদয়ে তারা এসে দাঁড়ায় নম্র-নৈঃশব্দ্যে, কুরিয়ারের মতো। এক ধরনের বিমূর্ত অথচ স্পষ্ট কল্পজগত নির্মাণ করে। ‘কলতলা’ কবিতায় শালিকের স্নান এবং পিপাসার সম্ভাবনা দিয়ে যে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়, তা নিছক পাখি ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নয়, বরং একাকিত্ব ও স্নেহের মিশেলে শূন্যতার প্রতীকায়ন:
“তবু পিপাসা মেটাতাম তোর পালকের জলে
স্নান দেখতে দেখতে বয়ে যায় আমার একমাত্র দুপুর”

‘একমাত্র দুপুর’—হয়তো একটি জীবনের অতিক্রান্ত সময়, যেখানে শুধু পালকের জলই হয়ে উঠতে পারে অন্তর্গত শান্তির সম্ভাবনা। তানজিন তামান্নার কবিতায় সময় কখনোই নিরপেক্ষ থাকে না; বরং তা স্মৃতি, শরীর, ঘুম ও ঘরের মধ্যে বিচরণশীল।

‘ঘুমের ফাঁদ’ কবিতায় আমরা দেখতে পাই জানলার কাঁচ ঠোকরানো বোকা শালিককে, যার ডানায় ভেসে বেড়ায় ঘুমচুরির কৌশল। কবি লিখছেন—
“জানলার কাঁচে ঠোক মেরে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো বোকা শালিক!
আমার ঘুম নিয়ে উড়ে যায় বোকা শালিকের দল”

শালিক এখানে নিছক পাখি নয়; সে ঘুমের দূত, স্মৃতিচিহ্ন বহনকারী পাখি, যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে ভেঙে ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে—তবু কোনো অভিযোগ থাকে না, কেবল “চেয়ারের হাতলে ভেজা গামছাটা পড়ে থাকে অভিযোগহীন।”

এই রকম দৃশ্যচিত্র তানজিন তামান্নার কবিতার স্বাক্ষর, যেখানে অবজেক্টগুলো নিছক বস্তু নয়, বরং চরিত্র হয়ে ওঠে, এবং নিঃশব্দ-ভাষায় বলতে থাকে অনুচারিত কথাগুলো।

‘বৃষ্টির রাতে’ কবিতায় পদ্মফুল ও ডিঙার সংলাপে রচিত হয় এক নারীর নীরব প্রত্যাবর্তনের কাহিনি—
“ডিঙা বাইতে বাইতে বউটির দু’হাত পদ্মফুল হয়ে যায়
খাতায় আঁকা ছিলো ডিঙা ও একটি পদ্মফুল”

শালিকের মতো এখানেও পদ্মফুল কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য হয়ে থাকে না; সে নারী শ্রম ও স্মৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে, যা খাতায় আঁকা থাকলেও বাস্তবের জলে ভিজে গিয়ে মুছে যায়। এ কবিতাগুলোর বিশেষত্ব এই—এরা অপ্রত্যক্ষ কথা বলে, বিমূর্ত বর্ণনায় বাস্তবচিত্র আঁকে।

‘মানিপ্ল্যান্ট’ কবিতায় কবি স্পর্শের স্মৃতি ও অনুপস্থিতির অভ্যন্তরে ভাঙনের এক অনবদ্য ভাষ্য রচনা করেছেন—
“আপনার হাত নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে
ভিজে গেছে সকল শুকনা কাপড়, সকল ঘরবাড়ি”

মানিপ্ল্যান্ট যেমন গ্রীলের সান্নিধ্যে বাড়ে, তেমনি স্মৃতিও বাড়ে অনুপস্থিত মানুষের কাপড়ের গন্ধে। বারান্দায় ফেলে রাখা কাগজ আর বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া কাপড়—এ যেন আমাদের হারানো স্পর্শের প্রতিমা।

‘লুকানো কোলাহল’ কবিতায় কবি যেভাবে ‘কোলাহল’কে আড়াল করেন, আবার বসন্তের উদ্দামতাকে ঢেকে তুলে ধরেন বিষণ্ণতায়, তা দেখবার মতো:
“বসন্ত তারপরও ডেকে তোলে তুমুল হাওয়ায়
কোকিলের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে তুলে আনে প্রচণ্ড বিষণ্ণতা!”

এই কাব্যিক দ্বৈততা—উল্লাস ও বিষণ্ণতা একসাথে নিয়ে আসা—তানজিন তামান্নার কবিতার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। তিনি বাতাশ, পাতা, কোকিল—সবকিছুর ভেতর অনুপস্থিত মানুষের সংলাপ ফোটান।

কবিতায় সাম্প্রতিকতম প্রকৃতি-সংলগ্ন রাজনীতি ফুটে ওঠে ‘অনাহারী মাছ’ কবিতায়। সেখানে কবি বলেন—
“ক্ষুধার্ত হলে পুড়তে পারে বাঁশি”
“ধানক্ষেতের জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনাহারী মাছ”

ফলে ক্ষুধা কেবল মৎস্যজগতে আবদ্ধ না থেকে হয়ে উঠছে সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক। বৃষ্টির জলে ভেজা ধানক্ষেত—সেই জলেও শান্তি নেই, মাছের তৃপ্তি নেই—শুধুই অনাহার। এবং সেই অনাহারকে বাঁশির দূরত্ব দিয়ে মেপে কবি নিজেই প্রশ্ন রাখেন:
“তুমি কি যাবে পোড়া বাঁশির টানে?”

এই কবিতাগুলোর বিশেষ সুর হলো—সবচেয়ে গোপন শব্দটিকেই সামনে আনা, যেন ফিসফিস করে বলা কথাটি প্রতিধ্বনি তোলে এক গভীর নির্জনতায়।

‘শালিকের সঙ্কেত’ কবিতায় ফিরে আসে বার্তার গোপন ভঙ্গি। জোনাকীর আলো, মশারির ফাঁক, শালিকের ডানার সংকেত—সবই হয়ে ওঠে অর্ধস্পষ্ট বার্তা। কবি লিখছেন—
“মশারীর ফাঁকে আটকে পড়া জোনাকীকে বাঁচানো গেলোনা!
গর্তধরা যে বৃষ্টিতে আটকে গেছে শালিকের ফাঁকে—
ওরা পৌঁছে দিতে চায় ভুবুক জোনাকির আভাস”

এইখানে শালিক, জোনাকি, মশারী—সবকিছু যেন বার্তার বাহক। মেঘের ফাঁকে যেমন হঠাৎ আলোর রেখা দেখা যায়, ঠিক তেমনই এই কবিতার প্রতিটি পংক্তি একেকটি সংকেত, যা জীবন ও মৃত্যু, উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির মাঝখানে বাঁধা পড়ে আছে।

তানজিন তামান্না বুঝিয়ে দেন—প্রেমের ভাষা আর কেবল মানবীয় নয়, বরং এক জীব-প্রকৃতি-স্মৃতি সংলগ্ন অনুরণন। ‘শালিকের সংকেত’ নামটি শুনেই বোঝা যায়—এখানে প্রকৃতি নিজেই বার্তাবাহক। কবি যেন বলছেন, প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্য একেকটি লুকোনো চিঠি—যা পাঠককে নিজে পড়ে নিতে হবে।

‘ঘরভর্তি সমুদ্র’ কবিতায় চিত্ররূপ পায় ঘরের ভিতরের বাহ্যিকতা, যেখানে ঘরও সমুদ্র হয়ে যায়, দুপুরও ভেসে যায়:
“ঘরে রাখা ঝিনুকই সমুদ্দুরের গান!
ঘরভর্তি সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে শীতের দুপুর”

এই কবিতাগুলো যেন জীবনভর্তি খামের মতো—বাহকের গন্তব্য অনিশ্চিত, বার্তার ভাষা নীরব, প্রেরক-প্রাপক শুধু সময়ের অলিতে গলিতে দেখা দেন।

‘কুরিয়ার সিরিজের কবিতা’ এক অনন্য কাব্যিক গ্রন্থনা; পত্রচালিত জীবনব্যাখ্যার রূপরেখা, দীর্ঘ আদানপ্রদানের আর্কাইভ।
তানজিন তামান্না এখানে কেবল কবি নন, এক অনন্ত প্রেরক। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমরা আরেকবার অপেক্ষা করতে শিখি, আবিষ্কার করি নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য।

❏ সাম্য রাইয়ান 

কবিতা কি কেবল সৌন্দর্যের উদ্‌যাপন? নাকি কখনো তা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা, আত্মসংশয়ের রোজনামচা, রাষ্ট্র ও বাস্তবতার নির্মোহ বিশ্লেষণ? এ তো সকলেই জানি—কবিতা অনেকরকম৷ উদয়ন ভট্টাচার্য সেই কবিকণ্ঠ—যাঁর কবিতায় সময়, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিসত্তার টানাপোড়েন একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর কবিতা রাজনৈতিকও, অস্তিত্ববাদীও।

কবিতা কালের আয়না। কোনো একক সত্য নয়, বরং সময়, পরিসর ও ব্যক্তি— এই ত্রিভুজে দাঁড়িয়ে জীবনের বহুমাত্রিক অনুভবকে প্রতিফলিত করে। উদয়ন ভট্টাচার্যের ‘নাগরিক’ কবিতাটি পাঠ করলে এমনই এক বিচিত্র অনুভূতির সম্মুখীন হই— যেখানে ব্যক্তির মনোজগতে জেগে থাকা ভয়, রাষ্ট্রের অবিচার, নাগরিকত্বের সংকট, এমনকি আধুনিক সভ্যতার ছলনাময় আলো সব মিলেমিশে এক বহুমাত্রিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।

“এত ধূলা জমে আছে ভেতরে ভেতরে
কোষবদ্ধ তরবারী মুক্ত করতে আজ তাই
বড়ো ভয় করে।”

এই তিন পংক্তিতে লুকিয়ে আছে এক যুগের সংকেত। ‘ধূলা’ এখানে শুধু সময়ের নয়, বরং ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অবদমনের প্রতীক। সেই ধূলায় ঢেকে গেছে মানুষের সাহস, প্রতিবাদ করার ভাষা। “তরবারী মুক্ত করতে ভয়”— এই ভয় ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক; আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নিপীড়নের চোরাবালিতে নিমজ্জিত নাগরিকের ভয়।

এই ‘ভয়’ কোন নিছক মানসিক দুর্বলতা নয়। বরং রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসের ছায়াতলে নাগরিক যখন নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে চলার লড়াই করে, তখন সে চুপ থাকে, নির্লিপ্ত থাকে। উদয়ন বোঝান, এই নির্লিপ্তি ভয়াবহ এক প্রতিক্রিয়া—
“কী জানি কখন কোন ছল ও আক্রমণে
হত্যারক অন্ধ ছুটে যায়
সন্ধ্যার আকাশে।”

এই অন্ধতা কেবল খুনের নয়; সত্য, বিবেক, আদর্শ— সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে। এখানে ‘সন্ধ্যার আকাশ’ ক্লান্তি, অবসন্নতা ও অনিশ্চয়তার আভাস দেয়। কবিতার ভেতরকার এই রূপক একদিকে যেমন রাজনৈতিক, তেমনি সাংস্কৃতিকও।

“মায়াবী জনপদ আলো ও বিভ্রয়
সকলেই দাবি করে আমরাই এ দেশ।”

এই পংক্তি সমগ্র কবিতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে রাষ্ট্র এক মায়াবী জনপদ— বিভ্রান্তিকর, মোহময়, যেখানে প্রত্যেকে ‘আমরাই দেশ’ বলে দাবি করার মধ্য দিয়ে অপরের অংশীদারিত্বের প্রতি অবজ্ঞা ও আগ্রাসনের রূপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। যেন দেশ এমনই এক কাঙ্ক্ষিত-লোভনীয় বস্তু, যার ওপর সকলে একক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এখানেই আমরা দেখতে পাই কবির গভীর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি। দেশ কেবল জন্মসূত্রে পাওয়া কোনো বস্তু নয়, বরং তাকে ধারণ করতে হয়, প্রতিপালন করতে হয় মানবিকতায়, ন্যায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু যারা নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেই ক্ষুদ্র অংশটি, যারা শাসন করে তারা ব্যতীত বাকিদের অবস্থা—
“নদীর দুই তীরে বিপন্ন মানুষ
আত্মরক্ষার ছুটিতে উড়ালো ফানুস।”

নদী এখানে বিভাজনের রূপকও হতে পারে কি? বিপন্নতা বাস্তবতার? একদিকে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ, অন্যদিকে মানচিত্রের কৃত্রিম সীমা। মানুষ এখানে দিশাহীন, সংকটে জর্জরিত। তার আত্মরক্ষা এখন ফানুসে নির্ভরশীল— এক অলীক আশাবাদে।

এই অবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? কবির ব্যঙ্গ ও বেদনা একসাথে উচ্চারিত হয়, যেখানে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের আগ্রাসী রূপ:
“স্পষ্টিত আলোর মধ্যে কাঁটার সীমানা
রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়
কে থাকবে, কে থাকবে না।”

এই চারটি পংক্তি আধুনিক বিশ্বের ‘জাতীয়তা’, ‘নাগরিকত্ব’, ‘নির্বাসন’, ‘ডিটেনশন’ ইত্যাদি ভয়াবহ বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে। রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, কে নিজের ভূমিতে থাকবে, আর কে থাকবে না। এখানে ‘আলো’ যেন আইনি ভাষ্য, আর ‘কাঁটার সীমানা’ হলো বাস্তবতার নির্মমতা। ‘নাগরিক’ হয়ে ওঠে এক অনিশ্চিত পরিচয়।

এই কবিতা পাঠ করতে করতে বারবার মনে পড়ে যায় জার্মান দার্শনিক হান্না আরেন্টের সেই বিখ্যাত উক্তি— “The right to have rights.” এই কবিতা যেন সেই মৌলিক অধিকারেরই বিচারে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের হাতে যখন নাগরিকত্ব এক রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন নাগরিক কেবলই একটি আইনি কাগজের উপস্থাপক নয়— সে এক অস্তিত্ব সংকটে ভোগা সত্তা।

এই কবিতায় নেই কোনো অতিনাটকীয়তা, নেই কোনো স্লোগানের সরলতা। বরং শব্দের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে গূঢ় প্রতীক, রাজনৈতিক তীক্ষ্ণতা ও দার্শনিক নিরীক্ষা। উদয়ন ভট্টাচার্যের কাব্যভাষা সংযত, কিন্তু তীব্র। এখানে শব্দ নয়, নিঃশব্দতাই মূল বার্তাবাহক।

আমরা দেখি এক সামাজিক বাস্তবতা যেখানে ‘রাষ্ট্র’ এক সর্বগ্রাসী সত্তা, যে আলো দেয়, আবার সেই আলোতেই সীমা আঁকে। নাগরিক সেই আলোয় পথ চলতে চলতে নিজেই সন্দেহে পড়ে যায়— আমি কি এই রাষ্ট্রের অংশ? নাকি শুধু তার নজরদারির বস্তু?

এটি শুধুমাত্র একটি কবিতা নয়, বরং আধুনিক ভারতের নাগরিক-চরিত্রের এক প্রামাণ্য দলিল। এর পংক্তিগুলির মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে এনআরসি, সিএএ, ডিটেনশন ক্যাম্প, জাতপাতের বিভাজন, রাজনৈতিক হিংসা, এবং তার ছায়ায় টিকে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা। কবির এই গভীর ও সংবেদনশীল চিত্রায়ন বাংলা কবিতার রাজনৈতিক শিরায় নতুন সঞ্চার ঘটায়।

উদয়ন ভট্টাচার্য এখানে কেবল কবি নন, বরং এক সত্যানুসন্ধানী পর্যবেক্ষক, যিনি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ভেতরকার ফাটল, ভয়ের উৎস, নিরুত্তাপ নীরবতা, আর ‘নাগরিক’ হয়ে ওঠার কষ্টকর প্রয়াসকে এক মর্মস্পর্শী কাব্যিক ভাষা দিয়েছেন।

এই কবিতা পাঠের পর পাঠক যেন নিজের প্রতিচ্ছবি খোঁজে ‘রাষ্ট্র’ নামক এক অতল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে—আমি কি সেই নাগরিক, যার অস্তিত্ব আজ প্রশ্নের মুখে?

আত্মালোকিত স্বীকারোক্তি ও সংবেদনশীল প্রতিরূপ উদয়ন ভট্টাচার্যের ‘জয়-পরাজয়’ কবিতাটি৷ ‘নাগরিক’ কবিতার রাষ্ট্রসঙ্কট থেকে বেরিয়ে এসে ‘জয়-পরাজয়’ কবিতায় উদয়ন নিজের অন্তর্গত বাস্তবতার দিকে ফিরে তাকান। এখানেও রাষ্ট্র আছে, সময় আছে, কিন্তু সবকিছুর উপরে আছে আত্মবিশ্লেষণের ছায়া। কবিতা শুরু হয়—
“যতবার পরাজিত হয়েছি জয়ী হয়েছি তার চেয়েও অনেক বেশি
তবু পরাজয়ের মুহূর্তগুলিই
দেওয়াল লিখনের মতো কখনও মুছে দিতে পারিনি”

পরাজয় এখানে শুধুই ব্যর্থতা নয়— এটি স্মৃতি, শিক্ষা, ইতিহাস। ‘দেওয়াল লিখন’ একটি অসাধারণ রূপক। সমাজের ভেতরকার সত্য যেমন দেওয়ালে লেখা থাকে, তেমনি মানুষের ভেতরকার যন্ত্রণাও মুছে যায় না। এই পংক্তিগুলো একধরনের ব্যতিক্রমী হিউম্যানিজমের বার্তা দেয়।

“যতবার ধ্বংস করেছি সৃষ্টি করেছি তার চেয়েও অনেক বেশি
তবু ধ্বংসের ছাপগুলিই
স্মৃতির শহরের ভাঙা ঐতিহ্যের মতো মনে থেকে যায়”

সৃষ্টি ও ধ্বংসের দ্বন্দ্ব এখানে আত্মজিজ্ঞাসার একটি কাব্যিক পরিসর। আমরা যা সৃষ্টি করি, তার চেয়ে বেশি মনে থাকে যা ধ্বংস করেছি। এই আত্মানুসন্ধান প্রমাণ করে কবি কেবল বাহ্যিক সমাজবীক্ষণ করছেন না, নিজের অস্তিত্বের পরিভাষাও নির্মাণ করছেন।

“যতবার অপমাননা করেছি প্রণাম করেছি আরও অনেক বেশি
তবু সম্মানের মান আলোয়
মনে পড়ে যায় হেমন্তের মৃত্যুদিন, পাথরের ফাটা লালের কথা”

‘হেমন্তের মৃত্যুদিন’ এক ঋতুর ভিতর মৃত্যু এনে দেয়। ‘পাথরের ফাটা লাল’— মনে করিয়ে দেয় দগদগে রক্তাক্ত স্মৃতি, হয়তো রাজনৈতিক নিপীড়ন, হয়তো নিজস্ব যন্ত্রণা—যা একান্তই ব্যক্তিগত। এই পংক্তিগুলি কবিকে শুধু এক আত্মানুসন্ধানী নয়, এক দুঃখস্মারক চিত্রকর করে তোলে।

“যতবার বিনয়ী হয়েছি, সততার কাছে নতজানু হয়েছি
মৌমাছিশিল্পকে বলেছি মধুসঞ্চয় এমন কিছু জীবিকা নয়
তবু বাইরের কেউ যেন বলছে আর খুব দূরে নেই প্রান্তরও”

এই অংশে কবি আত্মমুখিতা ত্যাগ করে আবারও সামাজিক বাস্তবতার দিকে ফিরে যান। বাইরের কণ্ঠস্বর যেন রাষ্ট্র, সমাজ বা সময়— যা কবির সকল আত্মসচেতনতা ভেদ করে বলে দেয়, বিপন্নতা এখনো যায়নি। কবি জেনেও জানেন না, এই সংকেত শোনা দরকার।

শেষদিকে কবি আশাবাদী হয়ে ওঠে—
“নীলসমুদ্রে ডুবে যাওয়া সূর্য কাল প্রভুত্বই
আবার নতুন হয়ে ফিরে আসবে।”

এটি একটি পুনর্জন্মের দৃশ্য। কবি বুঝে গেছেন, এই চক্র চলতেই থাকবে— পরাজয় থেকে জয়, আবার পরাজয়— কিন্তু প্রতিটি বার্তাই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়। এই অংশে কবিতা হয়ে ওঠে জীবনের দর্শন।

‘জয়—পরাজয়’ সরাসরি রাজনৈতিক কবিতা নয়, কিন্তু একটি আত্মনৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রতিবেদন। এটি একচোখো বিজয়গাথা নয়, বরং পরাজয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ার কাব্যিক অভিপ্রায়। এই কবিতা পাঠ করে মনে পড়ে যায় পল সেলানের কথা— “Poetry is a message in a bottle.” উদয়নের এই কবিতা সেই বোতলে ভরা বার্তা, যা আমাদের স্মৃতির গভীর থেকে টেনে আনে এক অনিবার্য সত্য— বিজয় নয়, পরাজয়ই মানুষকে মানুষ করে তোলে।

‘নাগরিক’ এবং ‘জয় পরাজয়’— দুটি কবিতাই একে অপরের পরিপূরক। প্রথমটি রাষ্ট্রকে বিশ্লেষণ করে, দ্বিতীয়টি আত্মসত্তাকে। একটি যদি হয় বাইরের অন্ধকার, অন্যটি তখন ভেতরের আলো খোঁজার প্রয়াস। উদয়ন ভট্টাচার্য নিজেকে বারবার ভেঙে আবার গড়েন। তাঁর কবিতা পাঠকের চেতনাকে শুধু প্রসারিত করে না, তাকে চিন্তার দায়ও দেয়।

এই কবিতাগুলির মধ্যে দিয়ে আমরা একটি যুগের স্বর শুনি— এক ভয়ানক রাষ্ট্রের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আত্মজিজ্ঞাসায় নিমজ্জিত মানুষের স্বর। এ কবিতাগুলো শুধুমাত্র সাহিত্য নয়— এক ধরণের বেঁচে থাকার দলিল। তারা একরকম কালানুক্রমিক স্মৃতিলিপি, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ে থাকবে একটি দর্শন, একটি শ্বাস, একটি ভাষ্য।

❑ সাম্য রাইয়ান 

মানুষের নিয়ম
সমুদ্র গুপ্ত

স্বাধীনতা জিনিসটা অন্যরকম
একেক পরিপ্রেক্ষিতে একেক বিষয়কেন্দ্রে 
একেক পরিস্থিতিতে একেক চাহিদাক্ষেত্রে 
স্বাধীনতার একেক চেহারা

আজ যা তোমার স্বাধীনতা 
একই সাথে অন্যের ক্ষেত্রে বিপরীত 
আবার 
সহসাই এটির চিত্র ও ভঙ্গি পাল্টে যায়

একজন কবি কী ফর্মে সময়কে ধারণ করেন? না, ফ্রেমে আটকে রাখা যায় না উত্তরটা। তার কবিতার ভাষা, ছন্দ, ছায়া, প্রতিসরণ, দ্ব্যর্থকতা— সবকিছু মিলিয়েই যে এক অনিবার্য প্রতিবাদ রচনা করে, সেটিই হয়ে ওঠে কবির কাল-নিরীক্ষা। সমুদ্র গুপ্ত সেই অর্থে বাঙলাদেশের কবিতার জটিলতম নামগুলোর একটি। অরণ্যপ্রিয়, জনপদসন্ধানী, উচ্চারণে গর্বিত অথচ নিঃশব্দে ক্লান্ত; সমুদ্র গুপ্তের কবিতা এক অতল শব্দ-খনন। সেখানে আছে নরম, স্নিগ্ধ প্রেম; আবার হিংস্র সময়ের রক্তাক্ত দলিল, কখনো চিত্ররূপময়।

১৯৪৬ সালে জন্ম, ষাটের দশকের শেষভাগে কাব্যজগতে প্রবেশ। যে সময় বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বামপন্থা ও বিপ্লবী চেতনা তুঙ্গে, সেই সময়েই তাঁর লেখার শুরু। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব তাঁর কবিতায় গভীরভাবে অনুরণিত। কিন্তু তিনি শুধুই রাজনৈতিক কবি নন। বরং তিনি সময়ের উপর দাঁড়িয়ে সেই সময়কেই প্রশ্ন করতে পারেন, যেমন তিনি প্রশ্ন করেছেন ‘মানুষের নিয়ম’ কবিতায়— স্বাধীনতা আসলে কী? এটি কি পরম মান? নাকি আপেক্ষিক এক কৌশল?

সমুদ্র গুপ্তের কবিতায় প্রায়ই ধরা পড়ে ভাষার নিজস্ব উন্মোচন। শব্দ এখানে অর্থের অতিরিক্ত কিছু বহন করে— তারা রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং অস্তিত্বমুখী। কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে পরিহাস, কখনো চূড়ান্ত নির্লিপ্তি, কখনো রক্তাক্ত সংলাপ। “কোনো কোনো সময় কবিতা লিখি না; কবিতায় আমি বাস্তবতা লিখি”— এই কথাটি যেন তাঁর নিজের কবিতা নিয়ে নিজের স্বীকারোক্তি।

তাঁর কবিতার একাধিক থিম— আধিপত্য, শাসনব্যবস্থা, প্রতিরোধ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, দ্বিধা— বারবার ঘুরে ফিরে আসে বিভিন্ন রূপে। কিন্তু একটি বিষয় আসে আরও ঘনঘন—মানুষ। সেই মানুষ, যে কখনো রাষ্ট্রের প্রক্সি, কখনো প্রেমিক, কখনো বিদ্রোহী, আবার কখনো নির্বাক ভিখিরি। এই বিচিত্র মানুষের নিয়তিকে সামনে এনে তিনি প্রশ্ন রাখেন সময়ের কাছে। “মানুষের নিয়ম” এই ধারাবাহিকতার এক সংহত প্রকাশ।

স্বাধীনতা নামের শব্দটা কেবলই গর্বময় নয়, বরং ভয়ংকরও। এই শব্দ দিয়ে রচনা করা যায় ইশতেহার, আবার এই শব্দ দিয়েই ধামাচাপা দেয়া যায় যুদ্ধাপরাধ। অনেকটা টর্চলাইটের মতো— যেদিকে তাকাও, অন্য দিক অন্ধকার হয়ে যায়। কবি সমুদ্র গুপ্ত সেই অন্ধকারই আমাদের সামনে টেনে আনেন, অতলস্বরে বলেন—
“স্বাধীনতা জিনিসটা অন্যরকম।”

অন্যরকম মানে কী? বিপরীত? বিকল্প? নাকি বিদ্রোহ? এভাবে প্রশ্ন করতে করতে পাঠক বুঝতে পারে, কবিতার শুরুতেই যেন ঘোষণা করে দেয়া হলো— যে সংজ্ঞা আমরা জানি, কবি তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমাদের যাপিত সময়ে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি ঘন ঘন ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপনে, করপোরেট ব্র্যান্ডিংয়ে, বা ভুয়া বিপ্লবের ব্যানারে। ফলে সমুদ্র গুপ্তের কবিতা হয়ে উঠেছে এক প্রকার প্রতিবাদী আবেগ-নির্মাণ, এক ধরণের contra-poetry— যা পাঠককে নাড়িয়ে দেয় অভ্যন্তরীণ দ্বিধায়।

এই কবিতা পড়ার পর পাঠক দ্বিধায় পড়েন— আমি কি আসলে স্বাধীন? আমার যে স্বাধীনতা, সেটি কি কারও দাসত্বের বিনিময়ে? কবিতা তখন আর ভাষার খেলা নয়; হয়ে ওঠে এক গভীর দার্শনিক অবয়ব।

সমুদ্র গুপ্ত আমাদের মতো করে প্রেম করেননি, রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করেননি; এমনকি কবিতাও লেখেননি আমাদের মতো করে। তাঁর কবিতার ভাষা অনেকটা ঠান্ডা ছুরির মতো— রক্তপাতের পূর্বাভাস দেয়, কিন্তু চিৎকার করে না।
ঠিক যেমন “মানুষের নিয়ম” কবিতায়:
“একেক পরিবেশে একেক বিষয়কেন্দ্রে
একেক পরিস্থিতিতে একেক চাহিদাক্ষেত্রে
স্বাধীনতার একেক চেহারা”

এই বাক্য তিনটি যেন এক দ্রোহী লিফলেট। আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে সবকিছুর ‘নির্দিষ্ট-নির্ধারিত’ সংজ্ঞা আছে। স্বাধীনতারও খুব পরিষ্কার একটা সংজ্ঞা আছে পাঠ্যবইয়ে, রাষ্ট্রে, সমাজে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীনতা কোনো স্থির, সর্বজনীন ধারণা নয়। তা আপেক্ষিক, প্রেক্ষিতনির্ভর, ক্ষেত্রনির্ভর। শোষণ ও মুক্তির অভিঘাতে এর অর্থ বদলায়, যেমন মঞ্চের আলোর তীব্রতায় বদলায় মুখের অভিব্যক্তি। ‘মানুষের নিয়ম’ আমাদের এই সত্যের মুখে দাঁড় করায়৷

এমন কথা শোনার পর পাঠক যদি হকচকিয়ে যান, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা অভ্যস্ত সেইসব স্বাধীনতায়, যেখানে একজন ফেসবুকে যা খুশি লেখে আর ভাবে, “আমি কতো স্বাধীন!” অথচ সে বোঝে না, সে যেটা বলার অনুমতি পাচ্ছে— সেটাই আসল কারসাজি। অনুমতির স্বাধীনতা, নিঃশর্তের নয়। দৃশ্যমান স্বাধীনতার আড়ালে সে কতখানি পরাধীনতার শেকলবন্দি৷ সে এক বিরাট আলোচনা, শুধু একচিমটি নোকতা দিয়ে যাই, যেকারনে আইডির রিচ কমে যায়, যে কারনে আইডি ‘রেস্ট্রিকটেড’ হয়ে যায়৷

এটাই তো মানুষের নিয়ম—‘স্বাধীনতা’ যখন শাসকের ছায়ায় জন্ম নেয়, তখন সে নিজেই এক যন্ত্র হয়ে দাঁড়ায় অপরকে দমনের। এ কবিতা সেই যন্ত্রের মুখোশ খুলে দেখায়:
“আজ যা তোমার স্বাধীনতা
একই সাথে অন্যের ক্ষেত্রে বিপরীত৷”

কী অসহ্য একটা লাইন! তোমার অধিকার মানে অপরের দাসত্ব। তোমার চুমু মানে অপরের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া। তোমার ভাত মানে অপরের অনাহার। তোমার পতাকা মানে অপরের ভূগোল হারানো। এই যে একান্ত ব্যক্তিগত জয়, সেটা অন্য কাউকে হারিয়েই অর্জিত হয়। কবি বুঝতে পারছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাধীনতা ব্যক্তিস্বার্থের একটি প্রকরণ, যার চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে নিপীড়নের আকারে।

এই বিশ্লেষণ বিশ শতকের রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চারও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ইতালীয় চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি বলেছিলেন, “যে ক্ষমতা নিজেকে সর্বজনীন বলে দাবি করে, তার মধ্যেই নিহিত থাকে একান্ত ব্যক্তিগত আধিপত্য।” সমুদ্র গুপ্তও যেন কবিতায় সেই দর্শনের ছায়ায় এসে দাঁড়ান।

এ কবিতা পাঠ্যবইয়ের মুখস্ত স্বাধীনতা শেখায় না, বরং শেখায় স্বাধীনতাকে সন্দেহ করার মধ্য দিয়ে পরাধীনতা চিহ্নিত করতে।

এই সন্দেহটাই কবির বিশ্বাস। কবিরা তখনও কথা বলেন যখন বাকিরা চুপ থাকে। আর সমুদ্র গুপ্ত তেমন কবি, যিনি চুপ করে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর। তার কবিতা ধাক্কা দেয়— নিঃশব্দে। না, এখানে কোনও মহাকাব্যিক উচ্চারণ নেই, কোনও বিপ্লবের মোড়ক নেই। কিন্তু এই লাইনগুলো গুপ্তক্ষরণ ঘটায়—
“সহসাই এটির চিত্র ও ভঙ্গি পাল্টে যায়৷”

শুধু মানে বদলায় না, রং বদলায়, ভঙ্গিমা বদলায়। স্বাধীনতা একবার শীতল, একবার উন্মত্ত। একবার ডানপন্থী, একবার বাম। একবার ব্যানার, একবার ব্যারিকেড। একবার কবি, একবার সেনাপতি।

এমন কবিতা লেখা মানে রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ানো। কারণ রাষ্ট্র চায় বিশ্বাস, আর কবি চায় প্রশ্ন। রাষ্ট্র চায় সারিবদ্ধ উত্তরের ফর্মুলা, আর কবি লেখেন ছেঁড়া কাগজে, হঠাৎ ছিঁড়ে ফেলা প্রেমপত্রের মতো করে।

“মানুষের নিয়ম” কবিতাটি সেই আয়না, যেখানে মুখ নয়, দেখা যায় কেবল গলার দড়ি, কিংবা পায়ের বেড়ি। 
এই কবিতা কোনো আশ্বাস দেয় না, বরং পাঠকের স্নায়ুতে অস্পষ্ট সংকেত পাঠায়।
এমনভাবে, যেন মানুষ বলতে আমরা যা বুঝি, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একধরনের ট্র্যাজিক কার্টুন— যে স্বাধীনতা চায়, অথচ স্বাধীনতা কী তা-ই বোঝে না।

কবি এখানে রাজনীতি লেখেন না, বরং রাজনীতির ইথার ধরেন।
‘মানুষের নিয়ম’ কবিতাটি এ সমাজের মেডিকেল রিপোর্ট— যার প্রতি পংক্তিতে লেখা আছে সময়ের অসুখ, সমাজের বিকৃতি, আমাদের ভালোবাসার পচন। 

সমুদ্র গুপ্ত এমন কবি, যিনি শব্দ দিয়ে আঘাত করেন না— বরং শব্দের অনুপস্থিতি দিয়েই আঘাত করেন। তাঁর কবিতা পড়ে বোঝা যায়, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র ‘না-বলা বাক্য’।

এই কবিতা আমাদের সেই না বলা বাক্যগুলোর দিকে ঠেলে দেয়। যেখানে স্বাধীনতার ভাষা নেই, আছে শুধু অস্বস্তি। একধরনের গোপন আতঙ্ক— যা পাঠককে বলে, “মানুষের নিয়ম” নামের নিয়মগুলো আসলে নিয়ম নয়, সেগুলো মুখোশ। তাদের ভেতরে লুকিয়ে আছে চিৎকার, নিঃস্বতা, ব্যর্থতার দীর্ঘ ক্যানভাস।

এই কবিতা কোনো গাইডলাইন দেয় না, দেয় না পরিত্রাণও। শুধু প্রশ্ন তোলে। আর সেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে পাঠক বুঝে যায়—তার যে স্বাধীনতা দৃশ্যমান, হয়তো সেটাই তার সবচেয়ে বড় শৃঙ্খল। হয়তোবা৷

❑ সাম্য রাইয়ান 

লেখাগুলি আমাকেই বলে ৩৩
রাহুল পুরকায়স্থ

আমারও ক্ষতের মাঝে পলি পড়ে আছে
          তুমি তাকে শিল্প রূপে চালাও বাজারে বাজারে বায়স ওড়ে, ঠোঁটে ওড়ে পাণ্ডুলিপিখানি 
কী কী লিপি লেখা আছে 
                    তুমি কল্পনা কর, আর 
ভূতগ্রস্ত শামুকেরা মাথার উপরে দেখি 
                                   গড়াগড়ি যায় 
আনন্দস্বরূপ এই বেঁচে থাকা 
যেন সাইকেল, দৃষ্টি-আবছায়ে
                       তারা বৃক্ষে মিশে গেল
কেতলিতে জল ফোটে, বাষ্প, বাষ্প, বাষ্পে 
ভরে যায় কবিতার খাতা
          কে তুমি আমাকে নাচাও, নাচাও প্রিয় বাজারে রটাও আজও বসন্ত-বারতা।

পৃথিবীতে প্রতিটি যুগেই কবিতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে। অথচ এই অপ্রয়োজনীয়তাই সবচেয়ে জরুরি সত্য হয়ে উঠে যখন একজন কবি উচ্চারণ করেন—
“আমারও ক্ষতের মাঝে পলি পড়ে আছে”।

এই একটি পংক্তিতেই রাহুল পুরকায়স্থ বুঝিয়ে দেন—কবিতা কেবল বাহ্য রূপ নয়, তা ক্ষতের আবরণও নয়, বরং জমে থাকা পলির মতো, ধীরে ধীরে তৈরি করে এক নতুন ভাষা, নতুন অনুভব, এমনকি নতুন রাজনৈতিক বোধ। ‘লেখাগুলি আমাকেই বলে’ কাব্যভুক্ত ৩৩ নম্বর কবিতাটি রাহুলের কবি-চেতনাকে গভীরভাবে চিনে নেওয়ার এক অনুপম রচনাচিহ্ন।

এই কবিতায় শিল্প, পণ্য, বাজার ও কবিতার শরীর—এই চারটি সত্তা পরস্পরকে ধাক্কা দিতে দিতে চলে। কবি বলেন—
“তুমি তাকে শিল্প রূপে চালাও বাজারে
বাজারে বায়স ওড়ে, ঠোঁটে ওড়ে পাণ্ডুলিপিখানি”

শিল্পের পণ্যায়ন নিয়ে তার এ উক্তি সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ। এখানে শিল্প একটি স্বাধীন সৃষ্টি নয়—তাকে চালানো হচ্ছে, অর্থাৎ চালকের হাতে সে অসহায়। যে শিল্প একদিন মানুষের মুক্তি বা প্রতিরোধের ভাষা ছিল, সে এখন বাজারের ঠোঁটে লিপস্টিক হয়ে ওঠে, ‘পাণ্ডুলিপিখানি’ হয়ে ওঠে উচ্চারণযোগ্য স্লোগান। এই ‘ওড়ে’র ব্যবহার—একদিকে বায়সের মতো ধূর্ত, অন্যদিকে ঠোঁটের মতো চটুল—দ্বিবাচনিকতার দারুণ উদাহরণ।

এই কবিতার ‘তুমি’ আসলে কে? প্রেমিকা? পাঠক? রাষ্ট্র? শিল্প-নির্মাণের নিয়ন্ত্রক? না কি আমাদেরই ভেতরের সেই অংশ, যা কখনো নিজেকে শিল্পীর বাইরে মনে করে এবং কবিকে চালিয়ে নেয় বাজারে? এই দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে কবি দেখতে পান ভূতগ্রস্ত শামুকের গড়াগড়ি—
“তুমি কল্পনা কর, আর
ভূতগ্রস্ত শামুকেরা মাথার উপরে দেখি
গড়াগড়ি যায়”

এই চিত্রকল্প নিছক Surrealist বা অবচেতনা-নির্ভর নয়। এটি এক রাজনৈতিক উপমা। ‘ভূতগ্রস্ত শামুক’—যারা ধীরে চলে, যারা আত্মরক্ষায় খোলসে ঢুকে পড়ে, তারা আজ উল্টে গেছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে মানুষের মাথার উপর। তাদের ‘ভূতগ্রস্ততা’ আসলে আমাদেরই আতঙ্ক, যা আমরা দীর্ঘকাল এড়িয়ে চলি। শিল্পের ক্ষয়, বাজারে রটনা, ভাষার সাম্রাজ্যবাদের ফলে যে সাংস্কৃতিক ভূত জন্মেছে—তারা আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের চিন্তা-চেতনার উপরেই রাখছে প্রভাব!

এরপর কবি বলেন—
“আনন্দস্বরূপ এই বেঁচে থাকা
যেন সাইকেল, দৃষ্টি-আবছায়ে”

মানুষ ভিন্ন আবহে অভিন্ন আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে যেন এক রূপকথার ধোঁয়াটে গ্রামে, চারপাশে কুয়াশা, কিন্তু তার গন্তব্য নেই। ‘আনন্দ’ নিছকই আশাবাদ নয়, বরং বেঁচে থাকার একটি অনিবার্য খেলা, যেখানে দৃষ্টি সবসময় স্পষ্ট নয়। বরং কুয়াশা, বিভ্রম, গতি—এইসব নিয়েই জীবনের যাত্রা।

তবে এই দৃষ্টি-আবছায়ে সত্তারও তো এক জৈব অস্তিত্ব আছে। সেই অস্তিত্বই হয়তো—
“তারা বৃক্ষে মিশে গেল
কেতলিতে জল ফোটে, বাষ্প, বাষ্প, বাষ্পে
ভরে যায় কবিতার খাতা”

‘তারা’ কারা? যে ভূতগ্রস্ত শামুকেরা, না কি সেই শোষিত মানুষেরা, যাদের দেহ-মন একসময় গাছ হয়ে যায়? বা সেই অদৃশ্য পাঠকেরা, যাদের স্পন্দনেই কবিতার কেতলি চাপে? এই উপমাটি অসাধারণ। কবিতা এখানে কেতলি, তাতে ফুটে উঠছে জল, তার থেকে ওঠা বাষ্প—যা দিয়ে ‘কবিতার খাতা’ ভরে যায়। অথচ বাষ্প ধরতে পারি না, বাষ্পের কোনও রং নেই, গন্ধ নেই—আছে শুধু ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি। অর্থাৎ কবিতা একটি অভাবের ভাষা, যা পূর্ণ হয়ে ওঠে অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে।

শেষে কবি এক তীব্র আত্মসমর্পণ আর প্রতিবাদ একসঙ্গে উচ্চারণ করেন—
“কে তুমি আমাকে নাচাও, নাচাও প্রিয়
বাজারে রটাও আজও বসন্ত-বারতা।”

এই ‘নাচানো’ একধরনের শোষণ—কবি জানেন, তার ভাষা, তার ব্যথা, তার ক্ষত—সবই বাজার উপভোগ করে। বসন্ত একসময় ছিল প্রেম ও পুণর্জন্মের ঋতু—কিন্তু এখানে বসন্ত কেবল ‘বারতা’, মানে প্রচারপত্র, মানে বিজ্ঞাপন। বসন্তের যৌবনকে পণ্য করে ফেলা হয়েছে। এইরকম ভাষা-রাজনীতির মুখে কবি আত্মজিজ্ঞাসায় ভেঙে পড়েন—‘কে তুমি’—এই প্রশ্নটি একদিকে ব্যক্তি-জিজ্ঞাসা, আবার অন্যদিকে সমষ্টিগত আত্মসন্ধান।

রাহুল পুরকায়স্থ মূলত আত্মানুসন্ধানী কবি। তাঁর কবিতা আত্মবীক্ষণ, প্রাত্যহিকতা এবং রাজনৈতিক বোধের মিশ্রণে তৈরি। তিনি কখনোই সরাসরি শ্লোগান বা বক্তব্যে যান না; বরং চিত্রকল্পের মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করেন প্রতিরোধের কাব্য। এই কবিতাটিও সেই শৈলীর নিখুঁত উদাহরণ।

আমরা যেন এই কবিতার ভেতর দিয়ে হাঁটি—পলি পড়া ক্ষত থেকে বাজারের ঠোঁটে চেপে ধরা পাণ্ডুলিপি পর্যন্ত, এবং শেষে বসন্তের বারতা হয়ে ওঠা প্রচারণার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের দৃষ্টিকে খুঁজি, স্পষ্ট করতে চাই সেই আবছায়া।

এই কবিতাটি শুধুমাত্র এক সামাজিক সমালোচনা নয়, এটি এক আত্মপ্রতিকৃতি—যেখানে কবি নিজেই শিল্প ও শিল্প-চালিতের দ্বন্দ্বে আটকে যান। তাই তো কবিতার খাতা কেবল ‘ভরে যায়’—তার মধ্যে বাস করে বাষ্প, এবং সেই বাষ্পের মধ্যে আমরা খুঁজি কবির মুখ, আমাদেরও।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— “যে কাঁদে সে পায়, যে পায় সে কাঁদে”। রাহুলের কবিতা যেন সেই কাঁদা-পাওয়ার অনন্তচক্র—যেন সাইকেল।

❑ সাম্য রাইয়ান

আজকের কবিতা কি শুধুই দেখতে দেখতে যাওয়া, অহেতু ন্যারেটিভ, তার সাথে খানিকটা বিস্ময়বোধ, না কি শতবর্ষ ধরে চলমান সেই চিরচেনা প্রেমার্তি— বাঙলার দৃষ্টিকর্ণহীন লেখককূল যা মাথায়-কাঁধে বহন করে চলেছে পরম ভক্তিভরে! সেই শব দ্বারা এ বিপুল-জটিল পৃথিবীর সাথে সংযোগ স্থাপন করা যেতে পারে কি? মাধ্যাকর্ষণের বিস্ময়রেখা পেরিয়ে সংযোগ ঘটতে পারে ভেনাসের সাথে? যেমনটা জয় গোস্বামী মনে করতেন, “আমাদের এই পৃথিবীর অনেক ওপর আকাশে ভেসে থাকে ওজোনোস্ফিয়ার। তাকে তো আমরা চোখে দেখতে পাই না। সূর্যের থেকে আসা ক্ষতিকর রশ্মি যে নিঃশব্দে শোষণ করে চলে। পরিশুদ্ধ করে দেয় আমাদের প্রতিদিনের আলো। কোনও কোনও গান, কোনও কোনও কাব্য, চিত্রকলা এইভাবে আমাদের সভ্যতার মন পরিশুদ্ধ করে চলে। ক্ষত উপশম করে। দূর থেকে করে বলেই আমরা বুঝতে পারি না।” সেই ধরনের কবিতা কিংবা চিত্রকলা কিংবা সুরই সভ্যতার আরাধ্য। লাখ লাখ পৃষ্ঠা আবর্জনা লিখে যেমন পরিবেশ বিপর্যয় ব্যতীত কোনো লাভ হয় না, তেমনি কখনো কখনো একটি পংক্তিও প্রাণ-প্রকৃতির উপশমে ভূমিকা রাখতে পারে।

সময়ের বাস্তবতা লেখকের কল্পনার অধিক জটিল, সেই বাস্তবতার রূপায়ন ততোধিক জটিল। সেই জটিল সময়ের অনন্য রূপকার রাশেদুন্নবী সবুজ। সময়ের চিত্র তিনি রচনা করেন রূপক, প্রতীক, উপমার কালিতে। তাঁর কবিতা নতুন চিন্তাকল্পের সূত্রমুখ নিয়ে উপস্থিত হয়। নতুন ডাইমেনশন, বিকল্প আলোকায়নের সন্ধান হাজির করেন অনায়াস সাবলীল ভঙ্গিতে। প্রেমের কবিতা অতি প্রাচীন ও বহুচর্চিত বিষয়। ‘প্রেমের কবিতা’ নামেই প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা ও কবিতাবই। কিন্তু এমন নাম কি চোখে পড়ে, যেমনটা কবি রাশেদুন্নবী সবুজ লিখেছেন, “এটি একটি প্রেমের কবিতা হতে পারতো”! নামের নতুন ব্যঞ্জনা বুঝিয়ে দেয়, এটি প্রেমের কবিতা হয়ে উঠেও শেষমেশ হয়নি; যেন ঠিক না হয়ে ওঠা প্রেমের মতো, কিংবা পূর্ণতা না পাওয়া প্রেমের মতো। কবিতাটি শুরু হচ্ছে ‘টাইটানিক’ রূপকের আশ্চর্য ব্যবহারের মধ্য দিয়ে,
টাইটানিক প্রত্যয় ছিলো আমার উপর তোমার।

শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও টাইটানিক এখনো অনেকের কাছে স্বপ্নের জলযান। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারও স্মৃতি, প্রশ্ন, কৌতুহল আর স্বপ্নভঙ্গের গল্প। প্রত্যাশার ব্যাপকতা- শক্তিমত্তা বোঝাতে মাত্র একটি বাক্যে কবি টাইটানিককে হাজির করে দ্বিতীয় বাক্যেই লিখছেন স্বপ্নভঙ্গের কথা, যার ব্যাপকতা টুইন টাওয়ারের সমান!

সত্যের সামনে দাঁড় করাতেই তুমি ভেঙে পড়লে টুইন টাওয়ারের মতো

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ভবন বিদ্ধস্ত করার ঘটনাকে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্ব চমকে গিয়েছিল ঘটনার ভয়াবহতায়। টাইটানিকের মতো বিশালতা যে প্রত্যাশার তা ভঙ্গ হলে যে ধ্বংসস্তুপ তৈরি হয় তা টুইন টাওয়ার ছাড়া অন্য কিছুর সাথে তুলনীয় হতে পারে কি? অন্য কোনো উপমা দ্বারা এ অনুভূতি প্রকাশ সম্ভব?

এরপর স্মৃতির বিবরণ দু’বাক্যে, যার অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ব্যাপক-বিস্তৃত। কবি লিখছেন,
মিগ টোয়েন্টি নাইনে মন ছুটতো তোমার পাড়ায়, ভেঙে দিলে পাড়াটা বেবিলনের শূন্যদ্যানের মতো।

সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি মিগ টোয়েন্টি নাইনের বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর দিলেই পাঠক বুঝতে পারবেন এই রূপকের মধ্য দিয়ে কবি মনের ছুটে চলাকে কতখানি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তুলেছেন। এরপরেই ছুটে বেড়ানো সেই পাড়া, যা ভেঙে পড়ে বেবিলনের শূন্যদ্যানের মতো। যে উদ্যান ৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য রাজ্যের সাথে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছিল।

এর পরই কবি লিখছেন সকল চোখ এড়িয়ে সংঘটিত সেই চুমুর কথা,
কৃত্রিম উপগ্রহে ধরা পড়েনি আমাকে দেয়া তোমার প্রথম চুমু

কৃত্রিম উপগ্রহ কীভাবে ছায়াপথ থেকে পৃথিবীর অব্যাহত পর্যবেক্ষণ করে চলেছে সে বিষয়ে আমরা জানি। সেই পর্যবেক্ষণও এড়িয়ে গেছে সেই চুমুটি, যা ছিলো প্রথম প্রেমের চিহ্ন-সলজ্জ, আড়ষ্ট, আড়ালপ্রিয়।

সেই প্রেম পরিণত হয় বিচ্ছেদে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের সূচনা করেন এভাবে,
তোমার ভালোবাসা পাওয়া পাঞ্জাবিটা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থান করে নিয়েছে।

থাকে শুধু স্মৃতি- প্রেমে, অপ্রেমে! প্রেম না থাকলেও সেই স্মৃতি ফেলনা নয়, নয় পরিত্যাক্ত-তাই তার জায়গা হয় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে, যাতে তা দর্শনের সুযোগ ঘটে অন্যদের! ভাবনায় বৈচিত্র্য দেখে অবাক না হয়ে উপায় নাই। কবি চাইছেন, সেই স্মৃতিসমেত মানুষটিকে লোকে জানুক রোমিও-জুলিয়েট, লাইলি-মজনু কিংবা ‘খুনি শাহজাহানের’ মতো করে। শেষ উপমায় কবি প্রচলিত ইতিহাসের কাউন্টার দিয়েছেন। যে সম্রাট পরিচিত প্রেমের নিদর্শন ‘তাজমহল’ নির্মাণের জন্য, তাকে কবি খুনি হিসেবে চিহ্নিত করছেন। কেননা সম্রাটের রয়েছে প্রেমহত্যার অগণিত আড়ালে থাকা ইতিহাস। আগের দিনের রাজা-বাদশাহরা গৃহপালিত লেখক কবি পুষতেন। তাদের কাজ ছিল রাজাদের গুণকীর্তন প্রচার করা। তারাই রাজা-বাদশাহদের গুণকীর্তন লিখতো, প্রচার করতো। ইবনে খালদুন বলেছিলেন, “একটি জাতির সঠিক ইতিহাস ঘটনার ১০০ বছর পরে সঠিকভাবে রচিত হয়।” এখানেও তা প্রযোজ্য। দীর্ঘকাল পর সম্রাট শাহজাহানের সেই চাপা পড়া রূপ বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, আর তারই উপস্থাপন ঘটেছে এই কবিতায়। কবি কি চাইছেন, শতবর্ষ পরে ‘প্রেমিক শাহজাহান’-এর ‘খুনি’ রূপ যেভাবে সামনে এসেছে সেভাবেই স্মৃতিজড়ানো পাঞ্জাবীর গল্পটি লোকে জানুক?

কবিতার শেষ পংক্তিটি যেন মনে করিয়ে দেয় রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আকাশের ঠিকানার কথা। তবে রাশেদুন্নবী সবুজের আহ্বানে যোগ ঘটেছে প্রযুক্তির; বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিকাশের এ কালের সার্থক প্রকাশ ঘটেছে এখানে,
ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ ডট মেঘবালিকা ডট কম-এ ঠিকানায়।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *