মুক্তগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুক্তগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান


❑ সাম্য রাইয়ান

উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি করাকে গর্হিত মনে করেন, এরকম কিছু মানুষের সাক্ষাৎ পাবার দণ্ড আমার হয়েছিলো! আর শাস্তিস্বরূপ দেয়া হয়েছিলো অজস্র অবান্তর প্রশ্ন। তাই নিরূপায় আমি একবার শুধু বন্ধুর মুখে চেয়ে অকপট ঝেড়েছি শব্দ; ভাবের গাণ্ডীব থেকে।

এ শহর, পথ-ঘাট, এতোটা হেঁটেছি আমি। এ শহর-বন্ধুজন, কতোটা জেনেছি আমি? নিকট শহরে থেকে দূরবর্তী যারা, আসলে তাদের বিষয়ে তেমন কিছুই জানা হয় নি এখনো; রাতভর শুধু পাক পাখিদের শব্দ!

হাাঁটার অভ্যেস হওয়ার পর থেকে আমার বন্ধুরা মেতেছে পায়ের গল্পে। আমি হাঁটতে গিয়ে দেখি পায়ে কিছু ভুল আছে। আমার পা আমাকেই জড়ায় ফাঁদে। পথে শিকারীর অবিকল ওঁত পেতে থাকে নিষেধ আর নিয়মাবলী। আমিও ভুলে যাই পায়ের গ্রামার।
হাাঁটাহাঁটির দিনশেষে অবসরে একদিন মনে হলো পা এক কঠিন পাজল। হাজার বছরের পিছু পিছু হেঁটেছি মাত্র কয়েক কিলো। তারমধ্যে জাড়য়েছে কতো কালি ও ধুলো। পথিকের ছদ্মে এতাদিন রয়ে গেলাম। আমাকে ভাঙিয়ে সবাই কুড়িয়ে নিলো কড়ি ও সেলাম।
আমার দু’পা তারাও চলেছে দূরত্ব বজায় রেখে...
(আমার পা / উপল বড়ুয়া)

২.
মনে ভীষণ জ্বর আর দীর্ঘ ডানা থেকে খসে পড়া ঝড়ো মেঘ নিয়ে থার্মোমিটার খুঁজে বেড়াচ্ছে রঙিন পা-ছাপ। জ্বরের প্রকোপে চুরমার হয়েছে যন্ত্রের কাঁচ। কী দরকার এতো উত্তাপে; আমি বলি কি মেঘের নিচে আসো; বারবার আসো, আসতেই থাকো। মৃদুমন্দ ঝংকার তুলে যথার্থ ছায়াকে গুছিয়ে রেখে - মেঘের নিচে বসো; জিরিয়ে নাও। হাসি পায় না কি বোকার প্রলাপে, বোকা? চেনাজানা কোনো হাসিমুখ আছে কি না, পকেট হাতরাও; দ্যাখো পাও কি না! পাবে না; সবটা ত্যাজ্য হয়েছে পূর্ণ দূষণে আজ।

মেঘের ছায়াতো আন্তর্জাতিক
আর সবচে’ বড় কথা,
ওরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
স্বাদু-পানির কারখানা
লোনা তাই দুঃখ থাকে না তাতে-
আমাদের ছায়া ও বসবাসে
কতোটা লবণ আছে জানা নাই
আহা! এই সল্টি প্লানেটে যদি
স্বাদু পানি বেশি হতো?
(সল্টি প্লানেট / শামীমফারুক)

৩.
আমার একটা নাম আছে। আমার বন্ধুদেরও, প্রত্যেকের একটা করে নাম আছে। তবে আমার নামের বানানে ভুল আছে। জীবনপুরাণ বলে, বানান ভুল হলে কাছের মানুষও কাচের হয়ে যায়; উপরে তখন কোনো চন্দ্রবিন্দু থাকে না।

কাছের মানুষগুলো কি দিন দিন কাচের হয়ে যাচ্ছে! এর উপরে ভেসে ভেসে বেঁচে আছি একটা স্বতন্ত্র নাম নিয়ে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যরেখায়। একটা রেলপথ, একটা স্টেশন; আটকে গেছি এইখানে। আছি। সকলে জানেন। আমার থাকা আর না থাকাজুড়ে একটা ভুল বানানের নাম আছে। মহামান্য বলেন, ভুল হলেও পুরোটা নামে আছে নন্দনের ঘ্রাণ, দৃশ্যত সরল সুন্দর। টিটো ভাই জানেন, মহামান্য মানে নন্দনের বালিকা; সৃজনের ফুল।

মওদুদ নামে বেঁচে আছি জীবিতদের কাছে আর মৃতদের কাছে আছি মরে। নামহীন যায় না তো বাঁচা, মৃতরাও আছে স্ব-নামে। নামফলক তারা ভালোবাসে। ভালোবাসার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, মরে থাকার জন্য নামটাই জরুরী। ভূমিষ্ট হওয়ার আগে, পরে, মরেছে যে শিশু, যার কোন নাম নেই সে তো মরে নেই, বেঁচেও তো নেই। তাহলে নাম মানে আছে, নামহীন মানে নেই। আমি তবে আছি মওদুদ নামে। থাকবো না জানি মওদুদ নামেই।
(দুঃস্বপ্নের চিরস্থায়ী বাগানে-৩৩ / আহমেদ মওদুদ)


৪.
যতোটা শুনেছ তুমি, রসালো স্বাদের প্রেম; জলবৎ তরলং; এইসব জীবন্ত কথামালা ঘুরছে-ফিরছে মেঘেদের মতো। এইসব দলছুট কথাদের ছোটাছুটি থামিবে না কিছুতেই। মৃত্যুসমান বয়সী একেটি শূন্যতা আমার দিকে ঘোড়া হাকিয়ে এসেছিলো; তারপর সবেগে ফিরে গেছে। ফিরে যাওয়া মেঘ - ফেরাতে চাই না আর। যারা ফিরে গেছে তারা জ্যামিতিক হারে দূরে যাক; ছিন্ন জোট অনেক দূরে যাচ্ছে-যাক। শুধু কালোবাঘ-লালকাক পাশাপাশি শুয়ে থাক।

প্রিয় ইমন- ‘প্রেম বোঝেনি
গোরের কবাট খুলে বেড়াল
ছানার মতো উঁকি দেয় লাল মুখ।
তার গা ছুঁয়ে বলি সবুজ পাতার মতো
পরিপুষ্ট করো আমাদের বিষয়-আশয়।
রন্ধ্রে-রন্ধ্রে পৌঁছে দাও সত্যের ক্যালরি
প্রিয় ইমন, প্রেম বোঝো-শসার
সজীবতা নয় চাই তার হলদেটে বীজ।
(দুই / ফরহাদ নাইয়া)

৫.
অকারণ ক্রোধন্মত্ত হচ্ছিলাম কখনো বা। সবকিছু তছনছ করে ফেলতে হতো তখন। নইলে বিস্ফোরিত হতে পারে নিউরণসমগ্র। অথবা স্খলন করতে হয় শরীর শরীরে। সেই সব কিছু না হলে উন্মাতাল গানেই শুধু হৃদয়ের প্রকৃত স্বরের সমতাল হতে পারে।

সতত যৌবন বলে যে ওষধি তুমি খাইয়েছিলে, এতো বিষণ্নতা তাতে;- একবার বললে আমি হাসিমুখে শুয়ে থাকতাম রেললাইনে-শরীর ছড়িয়ে, নক্ষত্র গুনতে গুনতে-ঝিনাইদহগামী হুইসেল শোনার আগমুহূর্তে আমার চৈতন্যের উদয় হতো-কুৎসিত গাল দিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতাম ফের...
অভিধান খুলে জেনে নিতাম কাকে বিভ্রম বলে আর ঠিক কাকে ডাকা যায় পতিত-প্লাবন।
(সুইসাইডাল / রাসেল রায়হান)

❑ সাম্য রাইয়ান
আমাদের সামনে শুধু শাদা অন্ধকার ─ সূর্যোদয়ে আজ আর আমাদের কিছুই আসে না
গোধূলি বিদায় নিলে ভেঁপু বাজে ‘এম ভি শীলা’র ─ তবু শরতে হেমন্তে কেন
আমরা জাগি না কেউ!
(শাদা অন্ধকার)

সীমান্তে আলোর ধারা তুমি, ইবাদতে কী করবে! কাঁটাতার, প্রতিটি শিরায় পঁচে যাওয়া রক্তের গন্ধ। ঐ পারে সুখের বিন্দু কি দেখা যায়? কোথাও কি বেহেশতের চিহ্নটি দেখা যায়? তোমার শরীরের ভাঁজে অবিনাশী প্রেম ও যাতনা, বারবার টের পাই। অভিমানে কী করবে আর, ছবিটবি আঁকো। নীরীক্ষণের জন্য এর চে’ উত্তম শরীর আর পাবে না সকলে জানে; তবুও বন্ধ চোখে অসীম সুখের খোঁজে, ডুবে যায়..

হাজার বয়সী যুবা হুর হয়ে আছে
পরাজিত তার কাছে দুনিয়াবি নারী
সতীনের ঘরে ঘরে মাশুকের যাওয়া আর আসা
বেহেশত মানে এক হারাম দুনিয়া?
(দ্যুলোক/অন্য মন্ত্র)

কতোদিন ঝরে ঝরে ফুরিয়ে গেছে পাথরের বীণা। ছিলো যখন প্রবল ঝংকারে, কার ইশারায় ধ্বণিত হতো সে, কার আমন্ত্রণে। এই যে পৃথিবী─সবার সঙ্গে মিশে যায়;─ শাদা অন্ধকার নেমে আসে পৃথিবীতে শ্রাবণ মাসজুড়ে। যদি ফিরে পাই সত্যি আগুনের দোলা বুকের ভেতরে ফের, শাদাশঙ্খের গানগুলো চুঁইয়ে পড়া উচ্ছ্বসিত বিষ্টি, তাহলেই জানা যাবে কতোটা আগুন জমিয়ে রেখেছে শ্রাবণপাখি।

কোন গোলাপী কনের বিয়ে কে করেছে দান
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় নাহি বান
শ্রাবণ বুকে আগুন পোষে হয় না ধারাপাত
সারাটা মাস পার হলো সে ছিটিয়ে কেবল থুতু
শ্রাবণের এই বুকে সত্যি আগুন কিছু আছে?
(শ্রাবণের থুতু/অন্য মন্ত্র)


কোথায় হারাচ্ছো পরী। কোথায় গড়ছো আবাস। পুরোনো বকুলে কোনও গন্ধরেণু নাই। একদা যে পাখিগুচ্ছ নদীর ধারে প্রার্থনাগীতি গাইতো , তাদের অভিজ্ঞানে সকল ঢেউ কুলে পৌঁছতে পারে না কখনও। সংকট ও সম্মোহনে নিকটবর্তী শালিক ধীর মন্দ্র স্বরে কাছে এসে চলে যায়। ভীষণ দূরত্ব জাগে─মিলিয়ে যায়। মগডাল সমীপে তুমুল উড়াউড়ি আবদ্ধ! অক্ষরস্তম্ভে দাঁড়িয়ে, প্রভিন্ন পৌনঃপুনিক।

দুয়ারে গাড়ির প্রস্তুতি কার দ্বিপ্রহরে জানা নেই
যেতে দিতে হলো ঊন-প্রস্তুত রথে
নিয়তিকে মানা দায়
যেতে তবু দিতে হয়
তবু চলে চলে যায়
(প্রস্থান/অন্য মন্ত্র)

মনে যা আসে সব নামিয়ে ফেল। কাঞ্চনগাছের ছায়ায় রেখে দাও সমূহ আযানের ধ্বণি। অভিমানে ঘর ছাড়া ফড়িং একদিকে চকচকে নদীর সোনালী ধূসর শীর্ষপথে চলে গেছে বুঝি! বিস্তীর্ণ কবিতাভূমি ক্রমে ঢেকে যায় প্রকৃত অন্ধকারে। আলোর সকল দীনতা ভেতরেই সজীব-প্রাণবন্ত, দুর্নিবার। আমার বন্ধু পরোপকারী ট্রেন, সর্বত্র গান গেয়ে বেড়ায়।

কাগজে কবিতা নেই, বিজু’র দোকানে নেই, ‘প্যানটেক্স’ বন্ধ আর
সংসদ ভবনে আলো আঁধারিও তোমাকে টানে না বুঝি!
সবুজের এক কোণে বুঁদ বসে থাকা ঝাঁকড়া বাবরি নেই
মেথর পট্টিতে নেই
নেই তুমি গোঁয়াছি বাগানে
লিরিকেও নেই তুমি আজ।
তবে কি পেয়েছো তুমি হৃদয়ের আসল ঠিকানা? কবিতার?
(নিখোঁজ কবি/ শাদা অন্ধকার)

আমি প্রস্তুতি নিয়ে একটা কবিতা লিখতে বসেছিলাম। একটা নামও ঠিক করেছিলাম, মাতালন্ত। কিন্তু লেখা হলো না এখনও। প্রস্তুতি নিয়ে প্রেম হয় না বুঝি! কামান-জল তো সবই প্রস্তুত, শুধু বৃক্ষ জন্মালো না কিছু। কী কা- বাপু, কী অবাক কা- দেখুন! সামান্য বৃক্ষ তবু ভিন্ন আঙ্গিকে জাগলো না অন্যত্র। যেন পূর্বপুরুষের ভিটে তার। মানুষ অনাহূত, অনাকাক্সিক্ষত জঞ্জালসমগ্র। কে করিবে উচ্ছেদ আহা শেখের জঞ্জাল!

তারপর আমাদের পায়েরা এগুলো সুবিশাল কীত্তনখোলার দিকে। কী বিমল বাতাসে ভরেছে বুক। নৌকার মাঝি আনমনে গায় ভাটিয়ালি। যুবকেরা আড্ডা জমালো আঁধারের সাথে সাথে। খিস্তিও শুনেছি কিছু হঠাৎ বাতাসে। সেদিনের দমকা উড়িয়ে নিয়েছে সব কালো আর ধবল মেঘ ─ আকাশের, হৃদয়ের...
(কবির দেশে/শাদা অন্ধকার)

বেঁচে কি আছি আদৌ; না কি মরহুম মনটাকে বহন করে চলি! ওগো হাওয়া, মৌসুমী বায়ুর কোলাহলে জাগে আমার বাড়িতে ছোটনদী। ছোট্ট নদীটা ফের, দীর্ঘ দিন বাদে; ভাঙা পাড়─ধূলিপথ মিলিয়ে গেছে লজ্জায়। ঐ পথের স্মৃতিকথা রবিবাবু লিখেছেন ছোটনদী কবিতায়। কৈয়ের দোকান খুলেছে একজন। তার থেকে দূরত্ব রেখেছি আমি। কীসের প্রেম আমার মৎস্যশিকারীর সাথে! কীভাবে অবগাহন!

আমাকে আমার মতো বাঁচতে দিলে যদি
কলির যিসাস হয়ে আত্মা দেবো দেহে
এখন স্মৃতির খোলে আত্মা জাদুঘরে
কেবল দেহের শব চলে ফিরে দেশ মাঠ ঘাট।
নীতির সফেদ রুহ বখিলার দেশে পরবাসী
বাঁচার প্রবল শর্তে অর্থহীন আমি বর্তমান।
(বাঁচার প্রবল শর্তে/শাদা অন্ধকার)

সে আসে─আনন্দে আকাশ জুড়ে শাদাপালক মেলে। অন্য কোনও নামে তাকে চিনি, প্রত্যেকে। অভিন্ন একক তবু আছে উল্টোমুদ্রায়ও। দিনচক্রে সবুজ গাঁয়ের নাম লেখা নদীর পরিচয় হারিয়ে যায়। মাটির দীঘল পথে দানবেরও মুখ চেনা দায়; মুখোশ সরাও প্রিয়─ আমি তোমার মুখটা দেখতে চাই। নিঝুম চোখদুটো─ঠিকরে আসা নীলরঙ পৃথিবীর ছবি দেখতে চাই। বিনীত অনুরোধ যতো লীন হয়ে যাক, সুদূর বাজনা হারা বাদকের ম্লান আকাশ আমাকে দেখতেই হবে।

চারপাশে নিতান্ত ইমেজ শুধু আমাকে জড়িয়ে ডাকে
‘কেবলই প্লাস্টি হও, ফ্যান্টাস্টিক হও’
মুখোশে শ্রমণ ঢাকা, হৃদয় মন্দির জুড়ে সিডরিক ভরত নাট্যম ককটেল তৃপ্তি ....
বোধের বিকল্প বুঝি কৌশল ─ চাতুরি ─ রোডম্যাপ
হৃদয়ের উষ্ণতা না, মাপকাঠি আজ সারফেস ─ টেক্সচার ─ মুখোশ-মুখোশ
বহুবিধ রূপকের আমি এক ঝাপসা একক
বোধহীন আধা জাগরুক স্বপ্নভুক, জীবনের জালে মোড়া....
(জালে জটাজালে/শাদা অন্ধকার)

প্রতিবার; সত্যি কথা বলি─ প্রত্যেকটা বছর ভাবতে থাকি লালনের ডেরায় যাবো; অথচ একটা বারও যাওয়া হলো না। যাবো হয়তো একদিন; অথবা যাবো না কখনোই; হয়ত হবেই না যাওয়া। মনের ভিতরে কীভাবে প্রবেশ করবি মন? স্বপ্নাদ্য আঙুলে স্বর আছে, নিমিঝিমি আলোয় বসে আছে আমার লালন। উন্মাতাল পোড়াকাঠে, আদাগন্ধে, আবছা ভালোবাসার মতো যে উড্ডয়ন নামছে সিক্তচুলে, তার সাথে গান হবে খুব, প্রেমে।

লালনের ডেরা থেকে নদীতে ভাসে নৌকা ─ শিলাইদহ ঘাটে আমাদের প্রথম পদচ্ছাপ। ভ্যান গাড়িতে পা দুলিয়ে দু’বন্ধুর নিরব আলাপ ─ মেঠা পথ ─ লাল মরিচের গালিচা বিছানো আবাহন! পৌঁছে দিলো শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে ─ দূরে লাল কুঠিবাড়ি ─ ধীরে অতি ফেলেছি তো পা ─ পাতার শব্দের ফাঁকে বেজে ওঠে চেয়ারের পায়া ......
তুমি কি রয়েছো কবি অন্তরালে? তোমার নিঃশ্বাস আমাকে গিয়েছে ছুঁয়ে..... আমি আর তোমাকে অতিক্রম করতে পারি না।
(শিলাইদহের যাত্রী/শাদা অন্ধকার)

আকাশ দেখে আশ্চর্য হওয়া মানুষের অনিবার্য কর্ম না কি! আদি থেকেই মানুষ আকাশ নিয়ে গভীর মগ্নতায় দিন কাটিয়েছে। চর্যাপদেও এ বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। শুধু কি আকাশ-নীল? আকাশের প্রতিটি উপাদান মানুষকে গভীর চিন্তিত করেছে প্রতিটি সময়খণ্ডে। মেঘ নিয়ে কি ভাবনার অবশেষ আছে? সেই মেঘ, সবুজমেঘ, আহা মেঘ, ওহ্ মেঘ, উত্তরের মেঘ, কালো মেঘ, মেঘদূত, মেঘের অবয়ব..  ‘আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল’..

মেঘের নানান রঙে ভালোবাসা মাখা
বৃষ্টি ধারা ধুয়ে নাও স্নেহ প্রেম যতো
ফিরে এসো পূর্ব মেঘ, বোলো না কখনো তাকে
এ যুবক ময়ূরের র্হদয়ে পেখম রাঙা বরিষণ!
(মেঘদূত কথা/শাদা অন্ধকার)

____________________________
[ লেখকের নোটঃ এই মুক্তগদ্যে উদ্ধৃত কবিতাংশগুচ্ছ কবি জিললুর রহমানের দুইটি কবিতাবই যথাক্রমে ‘অন্য মন্ত্র’ (১৯৯৫) ও ‘শাদা অন্ধকার’ (২০১০) থেকে নেয়া হয়েছে। ]


❑ সাম্য রাইয়ান

হিসেবহীন ছোট ছোট অভিযোগ আমার প্রতি
এইসব ছোট ছোট ভাইরাস
কীই-বা ক্ষতি করতে পারে আমার?
আমি তো প্রেম আর মৃত্যুর অধিক
জীবনহীনতা করি যাপন।

এই আমরা। আমরা যারা এখানে কাজ-কারবার বাদ দিয়ে জীবনচর্চায় ব্যস্ত আছি, তারা আসলে কী করব তা একমাত্র আমরাই জানি; মহাবিশ্বে একথা আর কেউ জানে না। আমরা যারা ভবিষ্যৎ বিক্রির টাকা দিয়ে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মত্ত, মিডলক্লাস তাদের গালি দেয় মন খুলে। কখনো পাগল বলে প্রচার করে। আমরা যে আসলে কী করব তা কেবল আমরাই জানি অথবা জানি না।

    এইখানে   নিয়মিত  ঠিকঠিক
রোদ আসে                 ঝড় আসে
মেঘ আসে                  খরা আসে
 বান আসে                  ঋণ আসে

—কিছু কি অহেতু হয় জীবের নিকটে বলো
—রাত্রি একটা অনাহুত বেদনার নাম
—মনের ভিতরে আছে প্রকৃত শরীর
—মেঘলা ধ্বংসস্তূপের ভাঁজে চাপা পড়েছে সবুজাভ টিয়া
—শ্যামল ডানার দিকে বিষাদের রঙ ঢালো

পথভুলো ট্রেনই কেবল চলে যায় প্রয়োজনহীন গন্তব্যে। আমরা ট্রেনের অপেক্ষায় রাত পার ক’রে ফিরে আসি ঘরে। প্রত্যেক রাতে কোনো না কোনো রেস্তোরাঁয় আড্ডা শেষে বেশ পবিত্র-পবিত্র ভাব নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আর তখন আমার পকেটভর্তি আলোচনা, মিলুর বাজারের ব্যাগভর্তি কবিতা। খুব বেশি জ্ঞানী না হলেও কেউ কেউ জানেন, মৃত্যুর আগে প্রগতিশীল উন্মাদ বলে পরিচিত—নির্বোধের কাছে।

অনবরত শব্দ গাঁথি স্বপ্নবাজ তাঁতিদের মতো। পুরো গাঁথা শেষ হলে এগুলো ছেড়ে দিই; পুকুরে ছড়িয়ে পড়ে ঘনবুনটের জাল।

প্রচুর শব্দের অপচয়
অনর্গল বাক্যব্যয়, হয়েছে
হুলস্থুল সব এলোমেলো;
আক্রমণাত্মক শব্দ
বেরিয়েছে ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের ফলা বেয়ে
আর যত যানজট তৈরি হয়েছে
মগজময়; মৃত্যুমুখি—

ধূসর সমস্ত মদের বোতল ভেঙে হৃদয়ে চালিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। একদম ঠেলে, ধাক্কা দিয়ে পুরোটা আত্মস্থ করাতে ইচ্ছে হয়। আহা মানবতা! তুমি মদের বোতলে থিতু অথবা কাচের সেই টুঙটাঙ শব্দে। সেই শব্দ অথবা গন্ধের ভিতর দিয়ে আমরা নির্মাণ করি আরেকটা জগৎ। মনে করি সেটা আমাদের।

কতদিন কত দীর্ঘদিন ইচ্ছেমতো হেঁটেছি প্যারিসরোড ধরে; উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি করাকে গর্হিত মনে করে এরকম কিছু মানুষের সাক্ষাৎ পাবার দণ্ড আমার হয়েছিল। আর শাস্তিস্বরূপ হেমলকের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছিল অজস্র অবান্তর প্রশ্ন। তাই নিরুপায় আমি একবার শুধু বন্ধুর মুখের দিকে চেয়ে অকপট ঝেড়েছি শব্দ—মিথ্যার গাণ্ডীব থেকে। বৃষ্টির বাহনে সৌখিন পরিব্রাজক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, বুঝিবা বৃক্ষেরও আছে ঘুমপাড়ানি গান। ঘুমের আগে তা শিশুবৃক্ষরা শোনে। শুনতে শুনতে খায়, ঘুমায়! ওরাই রচনা করেছে আদিম সংগীত; পাখিদের মতো। হয়তো পকেট হাতরে পাওয়া যাবে বাঁশি বাজানোর স্মৃতি। মায়ের কবরে দাঁড়িয়ে ওরাও গাইতে পারে বেদনাসংগীত। শেষে ভাবলাম, এই সন্ধ্যাকালের একটা নাম দিতে হবে। নামহীন সন্ধ্যাকালকে কেন অপার মনে হয়? অথচ একজন আমাদের সুস্থতা বোঝাতে এসে এই দৃশ্যত উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটিকে গর্হিত বলে চলে গেলেন!


❏  সাম্য রাইয়ান 

বৃক্ষেরও আছে ঘুমপাড়ানি গান। ঘুমের আগে তা শিশুবৃক্ষরা শোনে। শুনতে শুনতে খায়, ঘুমায়। ওরাই রচনা করেছে আদিম সংগীত; পাখিদের প্রতিবেশী। হয়ত পকেট হাতরে পাওয়া যাবে বাঁশি বাজানোর স্মৃতি। মায়ের কবরে দাঁড়িয়ে ওরাই গাইতে পারে বেদনাসংগীত।

অক্ষয় বটের স্নেহে যারা ঘুমিয়ে গেছে শেকড়ের ভেতর মাটির ঘণ্টা বাজলে
তারা শুনে শোকের মাতম।
প্রতপ্ত নুড়ি পাথরে মুখ গুঁজে শ্বাস নাও পাতার বসতি জুড়ে ছড়িয়ে দাও
অসংখ্য কংক্রিটের হাত
তুমিও শুনতে পাবে প্রথম ঘুঙুর নাচের আওয়াজ
(ডলক/ সাইইদ উজ্জ্বল)
২.
দাঁড়িয়ে থাকলেই বুঝি ঘোড়ারোগ তাকে! ঘোড়ারোগ নেই, ঘোরা রোগ আছে। পেছনে তাকানো নতুন অভ্যেস; প্রাণীজ ব্যাকরণ বলে, পেছনে তাকানো পাপ—যে কোনো ভাবে শুধু পেছনে ‘ফেলতে’ হয়। মাটির পাশে দাঁড়িয়ে আছি যদি বলি তবে বিশ্বাস হবে কি? একাকী জোনাকি আলো দিয়ে চলে গেল আমার জামার ভেতরে, সজোরে।

ফয়েল প্যাকে বাতাস এসে শব্দ তোলে কর্কশ, কানে লাগে
পরিবেশবাদীদের নিদ্রামগ্ন শরীর তখন আড়মোড় ভাঙে
প্লেজার ট্রিপের রোদ ফুরিয়ে বৃষ্টি নেমে এলে চারদিকে
আমাদের তখন সাঁতার শেখার তীব্র বাসনা জেগে ওঠে।
ছিপ দিয়ে মাছ শিকারের ধৈর্য আমরা হারিয়েছি আগেই
খাদ্যজ্বর আমাদের পুড়িয়েছে বিকলাঙ্গ জিহ্বার ক্রন্দনে
নেহায়েত মুগ্ধতা শোনায় গল্প, বলে কত ম্যানিফেস্টো
আসলে এইসব ঢেকে রাখা মুখোশের কলকব্জা বিশেষ!
(প্লেজার ট্রিপ/ সৈয়দ সাখাওয়াৎ)

৩.
টাংকি ফুল হলে কেমন ঝিমুনি লাগে!.. নদীতে লাফ দিতে ইচ্ছে করে… ঝপঝপ জল পতনের শব্দ আর ঘর ঘর ঘর ঘর বুঝি নাক ডাকছে ঘুমন্ত শরীর। মনে হয় যেন গলাপথ বেয়ে অগ্নিফুলকি বয়ে যাচ্ছে; তরল আগুন। তার সাথে মাথার গভীরে একটা রেলগাড়ি চলছে, ঝমঝম ঝমঝম… কু ঝিকঝিক কু ঝিক ঝিক…
কত উল্টোপাল্টা ভাবি, কত উল্টোপাল্টা দেখি! আসলে পুরোটা সময় একটা প্রজাপতিদেবী আমাকে পথ দেখায়, সঠিক পথ ধরে নিয়ে যায়। ওহে প্রজাপতিদেবী, আমি তোমাকেই ভগবান মানি।

ভরদুপুরে জেগে উঠেন ভগবান টিলা
গায়ে পাখির পোশাক পরে জটাচুল নাচে
মেঘডুমুরের বনে; তামাটে রোদে বেঘোর
মাতাল—দু’হাঁটুর মাঝে বয়ে দিলেন এক
ফটিক জলাধার। দূরে ঝাপসা পুরুষের
স্থির ছায়া দেবী তোমার অজুহাতে কাঁপে।
কোথায় যায় মন গোত্তা খেয়ে খেয়ে মন
লাটিমের সুতো ছিঁড়েছে যদিও ভগবান
তোমার টালত আমার মাটির ঘর; নাহি
পড়বেশী হাঁড়ি ভরে দিও প্রভু মদে-গানে
যতদিন বাঁচি।
(ভগবান টিলা/ উপল বড়ুয়া)

৪.
ক’দিন আগে একটা স্বপ্ন দেখেছি ফের; স্বপ্ন না আসলে দুঃস্বপ্ন। দেখলাম: খুন হয়ে যাচ্ছি, দৌড়াচ্ছি…
ঘুমাতে সাহস পাচ্ছি না সেই স্বপ্নের কথা ভেবে। তুমি আমাকে ঘিরে থাকো ঝিমলি; স্বপ্নটা আমাকে খুন করে ফেলবে…
কী কষ্ট হবে বলো তো, যদি ফের না জন্মাই! অথবা ভাবো তো যদি আমার ভূত মাঝরাতে তোমার বিছানায় উঠে বলে, দ্রুত উঠো, নইলে ট্রেন ফেইল করবে তো। সত্যি করে বলো তো, তুমি তখন কী করবে?

ঘুম থেকে জেগে দেখি খুন হয়ে গেছি। কারা কারা যেন আমার কব্জি দিয়ে বানানো কাবাবের দিকে তাকিয়ে কাঁটাচামচ খুঁজছে। কব্জির পাশে ওয়াইনে ভিজিয়ে রেখেছে আমার স্বপ্নকাতর চোখ। যেন চোখ দুটো মুখে পুরলেই, আমার স্বপ্ন ইনস্টল হয়ে যাবে ঘাতকদের চোখে। খুলিটা ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়েছে; পরবর্তী ভোজের পরিকল্পনায়। আমার স্নেহাস্পদ ঘাতকেরা আমার হৃদয় ধরে টানাহেঁচড়া করে নি আর। আমি নিহত হয়েছি, আমার কব্জি-চোখ-মগজ ওদের দখলে। ওদের কাছে এতটুকুই হয়তো ব্যাস্। তারপর তুমি আমার হৃদয়টাকে মাশরুমের মতো কেটে টুকরো টুকরো করে জিরো ফ্যাট ম্যায়োনিজ দিয়ে বানিয়েছো সালাদ।
(৯ জুলাই ২০১৫/ আহমেদুর রশীদ)

৫.
রোদের কারণে ঘুম ভেঙে গেল ঝিমলি। এত তীব্র রোদে আগে আমি কিভাবে ঘুমাতাম? যেভাবে যেদিক দিয়ে পাচ্ছে আলোরা ঢুকে পড়ছে। হা হা আ হা। তীব্র গরম ভাবে জ্বলন্ত চুল্লি। এখন কী হবে ঝিমলি; আমার তো ঘুম ভেঙে শরীর পুড়ে গেল!
প্রচণ্ড বাতাস ভেদ করে চলে গেল এক ঝাঁক তীব্র প্রজাপতি। তুমি কি প্রজাপতির রঙিন ডানা ভালোবাসো মেঘ?
যেন ঝরা ফুলের বিষাদে আমি হই উনুনের
আগুন-উত্তাপ; জলচোখ পাপড়িগুলো খুলে, তুমি
দ্যাখো জলজ নীলের জলোচ্ছ্বাস। হলুদ গোলার্ধ
বুকের পরিধি উপছায়া মাঝখানে নুয়ে আসে।
উঁচু ঢিবির মতন হাঁ-ক’রে রোদ মেখে
নেয় বালুর শরীর; প্রবল নুনের দীর্ঘশ্বাস
স্রোতহীন কাদায় উর্বর জলের বুদ্বুদ কেটে
ভেসে যায়। সন্ধ্যাঅগ্নি যেন গোধূলির চোখ মুখে
পুরে দেয় দেহের আলোক। কচুরিপানা পাতার
উপর বিষের নীল উল্লাস, রক্তের ছোপ ছোপ
মৌন বাতাসের স্বপ্নরিক্ত অনুভূতি, যতদূর
চোখ যায়, নীলিমার বুকে গাঢ় রাত্রির আঁধার;
অনন্তের পূর্ণিমায় ফুঁড়ে ওঠে ফুলের পরাগ
তোমার উচ্ছল, দেহের আবেগ বীজ বপনের।
(হাঁ/ চঞ্চল নাঈম)

৬.
রাত্রিকে অস্বীকার করে ফ্রেম থেকে ছুটে যায় কেউ। ও চোখে কেবলই ছুটে চলা; প্রচণ্ড নীরবে খসে পড়ে রাত্রির সমস্ত অন্ধকার। এ আঁধার কবর সমান দীর্ঘ; মরুর তপ্ত বালুর মতো তেজি। তাকেই কি না অস্বীকার করে ছুটে যায় চিরমলিনের হাসি! আশ্চর্য সে তাকায় না পেছনে—কিংবা আশেপাশে; অনুভূতির বড়শি গাঁথে না বুঝি এইসব কথামালায়। সামনে যদি মেঘমল্লার থাকে তবে তো সমস্ত পিছুটান ছুটে যাবে ওর। এত সময়ের বিশিষ্টতা গ্রীষ্মজ্যাকেটের মতো খুলে টুপ করে বসে পড়বে পছন্দমতো আড়ালে; বিদায়ের ক্ষণে ক্রমাগত ডেকে ডেকে অঘ্রানি কম্বলের মতো জড়িয়ে নেবে প্রিয়তম সঙ্গীকে।

দৃশ্যে যে ছিল, সে অন্য কেউ। অনাহুতের মতো ফ্রেমে ঢুকে পড়া শুধু। ওগো রাত্রি, হে তুমুল আঁধার-ঢাকো; আমাকে আড়াল করো। দৃশ্যে, চিরমিলনের হাসি, অমলিন থাক। চলাচল গতিশীল হোক আরো।
দৃশ্যচ্যুত আমি- বিদায়ের ক্ষণ এল বুঝি চলে!
(মা ও বিবিধ প্রলাপ-৫/ বিধান সাহা)

 প্রকাশ করেছে পরস্পর ডট কম

অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

❏  সাম্য রাইয়ান 

এত এত দিস্তা ছাপা কাগজের পুস্তক, এত যে বৃক্ষনিধনের আয়োজন—এর জন্য কী মূল্যবোধের ডিসকোর্স? মূলা থেকে মূল্যের কী বোধ তৈরি হয় বলো! যে দেশে মূল্যবোধের বোতল থাকে হাতের মুঠোয় বন্দি, সেখানে মদেরও দোকান থাকে! মানুষ সেখানে যায়। দ্রুতগতিতে যায়, আর ফিরেও আসে দ্রুতই। কিন্তু তারা পান করে ধীরে, মন্থরগতিতে। এইসব ঘটনা কত স্বাভাবিক হয়ে গেছে মানুষের কাছে! মানুষ কি মদ নয়? আমি কি মদ নই? তুমিও কি মদ নও? আমার প্রেমিকা কি মদ নয়? মদের ভুবনে কে গো ধ্রুবতারা হয়?
এই শহরের একমাত্র মদের দোকান
রাত অব্দি খোলা থাকে
শহরের সকল রাস্তা দিগ্বিদিক ছুটে গেছে
শুধুমাত্র এই রসাত্মক দোকানের দিকে…
মদের দোকানে যাচ্ছি এই ভাবনাটাই
মনের ভেতর বিপুল আনন্দ ঢেলে দেয়
(মদের দোকান / নাভিল মানদার)

২.
একসময় প্রায় প্রতিদিন যে চায়ের দোকানে চা খেতাম, সেই শহিদুল ভাইয়ের ধারণা জন্মেছিল : আমরা কবি। তার এমন ধারণা তৈরির কারণ হলো, আমরা আড্ডা দিলে শিল্প-সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি-সংস্কৃতি নিয়েই বেশি কথা বলি; বই পড়ি, কাব্যপাঠ করি, লেখালিখি করি। উনি এই ধারণা থেকে আমাদের খুব ভালোবাসতেন; কখনো বিনে পয়সায় চা খাওয়াতেন; কবিতাও শুনতেন।

আমাদের কপাল ভালো, শহিদুল ভাই আর্তুর র‌্যাঁবোকে জানতেন না। [এখানে একটি অট্টহাসি]



আমার এক চিকিৎসক বন্ধু ঘোষণা দিলেন, কবিতা হলো ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতন—অর্ধেক বোঝা যায়, বাকিটা তথ্যসূত্র ধরে বুঝে নিতে হয় দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়। যেহেতু স্বাভাবিক বেঁচে থাকার জন্য ঔষধ ও কবিতা উভয়ই কোনো না কোনো মাত্রায় প্রয়োজনীয়; শেষপর্যন্ত সারমর্ম দাঁড়াল, কবিতাও এক ধরনের চিকিৎসা পরামর্শ ।
(কবিতা প্রেসক্রিপশন / ভাগ্যধন বড়ুয়া)

৩.
শিল্পকলায় যদি শিল্প না থাকে তবে থাকবে শুধুই কলা। প্রতিষ্ঠানের হুইলচেয়ারে বসে একাডেমস তখন কলা ছেলাবেন আর খাবেন, ছেলাবেন আর খাবেন; সেইসাথে ছালগুলো পথে ছুঁড়ে দেবেন; যাতে করে আপনি/আমি কেউ কেউ তাতে আছাড় খেয়ে দাঁতমুখ ভাঙতে পারি।
দেয়ালের ক্যানভাসে তুলির ভাষায় আঁকা রঙের চিত্রন—শিল্প !
দেয়ালের ক্যানভাসে ছোঁড়া, কাদার চিত্রল কথকতা—প্রতিশিল্প !
ভদ্রতার কাদামাখা লোকটাকে দেখে, কে কাকে ছুঁড়ছো কাদা?
দেয়ালের ক্যানভাসে, রঙ ও তুলির চিত্রিত সময়ে ছুঁড়ে মারলাম,
কাদার চিত্রল কথকতা, …
মেয়েটি, ছেলেটিকে ছুঁড়ে মারলো, একমুঠো ভোরের শিউলি,…
(শিল্প, প্রতিশিল্প / আরণ্যক টিটো)

৪.
এইম ইন লাইফ বিষয়ে কথা বলার সময় ছাত্রটি যখন বলছিল আমি ডাক্তার হতে চাই মানুষের সেবা করার জন্য, আর্ত-মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার জন্য, তখন হাসতে হাসতে আমার মনে পড়ছিল সেই যুবকটির কথা, যে মূত্রাগারে ঢুকে সোসাইটির চকমকে মানবতাবাদী মুখগুলো মনে করে মুখসকলকে সারিবদ্ধ করে ‘ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ’ ভাবতে ভাবতে অবিকল্প মূত্রপাত করতে থাকে।
পৃথিবীর যেদিকে যেতে চাও যেতে পারো
হতে পারো নীলাভ পানশালার ঝলমলে পেয়ালা
কিংবা শুধুই পানীয়; কেননা
তোমার সুস্বাদু মাংসের লোভ আমার নেই..
পশ্চিমে আন্দোলিত হৃৎপিণ্ডের ঊর্ধ্বাংশ
আর আমায় কাঁপায় না; কারণ
শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়েও
পাজামার ব্যাপক গিঁট খোলা অনেক বেশি সহজ
(শ্রীমতি শোচনিয়া ব্যাধি / রাশেদুন্নবী সবুজ)

৫.
আঁধারের মাঝে অন্ধের মতো তাকাই যেদিকে, কী যেন এক অস্পর্শ শরীরের মতো অনুভূত হয়, কম্পমান ও নরম। তখন আগুনের বাক্স থেকে আলো বের করি সন্তর্পণে। সীমাহীন আলো ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিক। রাশি রাশি সন্ধ্যাতারার মতো উজ্জ্বল আলো। এ ঘটনা প্রতিদিনের, নিয়মতান্ত্রিক। এটি আসলে মধ্যরাতে যখন বাড়ি ফেরার পথজুড়ে শুধু কুকুর ছাড়া আর কারো দেখা পাওয়া যায় না তখন কুকুর প্রতিরোধে আলো বের করার মাধ্যমে সেভ দাইসেল্ফের গল্প। যখন সামান্য আলোর ফোটাকেই সূর্যালোকের মতো মনে হয়, সেইরকম অন্ধকারে সাঁতার কাটে একাকী সোনার হরিণ।
ফলে যা যা হয় : আমরা একই আকাশের ভেতর শুয়ে পড়ি, পা টানি এবং গান গাই; এমন মানবজমিন রইল… এটুকুতে এসে আমরা পৃথিবীর আরো কার্নিশে এসে পড়ি এবং স্ব স্ব খেলনা হরিণ অভ্যস্ত অন্ধকারের চোখে ছুঁড়ে মারি। অন্ধকার দৃষ্টি পায়। অন্ধকার গতি পায়। অন্ধকার ছুটে যায় নৈঋতে মেঘ রেখে এবং আকাশ হেলে পড়ে ।
(খেলনা হরিণ / রাজীব দত্ত)

৬.
অনন্ত রাত্রির কথা ভেবে ঘুমাই নি যেহেতু, তাই ঠিক সময়মতো সকাল হতে দেখে আমার ভালো লাগল। কিন্তু বিছানা ছাড়ার আগমুহূর্তে মনে হলো, রোদটা এতো তীব্র হচ্ছে কেন? কবিতার রোদের মতো একটু নরম কিংবা মিষ্টি হলে কী এমন ক্ষতি হতো শুনি? অন্তত আর কিছুক্ষণ ঘুমভোগ করা যেত; তা আর হলো না। একটা অভিমানী উড়োজাহাজ সাঁই করে চলে গেল; রেখা দেখে ডাকলাম, শুনল না; কফির ধোঁয়া মিশে গেল মেঘপুঞ্জের সাথে।
হে ডেনভার, তোমার উড়োজাহাজ ধার দিবে কি? একটু উড়ব বলে। কবরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে পড়ে নেব সমাধিফলক। পকেটে আছে বন্ধ ঘড়ি। চাবি হারিয়ে ফেলেছি। ফিরিয়ে নিও মাউথ-অর্গান ও ঘৃতকুমারীর ব্লু স্কার্ফ। সেও উড়তে চাইবে। উড়তে পারো, পকেটে বন্ধ ঘড়ি রেখ শুধু।
(ক্ষত ২০ / হাসনাত শোয়েব)


❏  সাম্য রাইয়ান 

নরক হতে উত্তীর্ণ বোধগুলো দু’হাতে জড়িয়ে শূন্যে ছেড়ে দিলে সব ভাসতে থাকে চলনবিল পেরিয়ে রাজধানীমুখী; একটার পর একটা বিকেল, একটার পর একটা সন্ধ্যা আর রাত।
একটার পর একটা নদী লিখে যাচ্ছি,
মার্কার পেন দিয়ে আন্ডারলাইন করে রাখতে হচ্ছে ঘন ঝোপঝাড়গুলোকে।
সবচেয়ে শান্ত হরিণের দিকে দৃষ্টির চাকু ছাল ছাড়াচ্ছে বারবিকিউর তৃষ্ণা।
আর খুলে পড়ে যাচ্ছে আফ্রিকান হাতির দাঁত।
শক্ত জিপের চাকা কড়কড় করে উঠে আসছে কচি পায়ের উপর।
এন্টেনা দিয়ে বাঘদের ঘিরে রাখছে ডিসকোভারি চ্যানেল।
প্রাণীগুলি বড়ই লাজুক যখন তাদের সার্কাসে দেয়া হয়।
ওদের মাতৃকালীন স্রাব হাসি ছড়াচ্ছে রানওয়ের গেটে,
সেখানে একদল বয়স্ক নর্তকী নিজেদের বুকের উপর বন্দুক ধরে আছে
(লিখতে লিখতে যাচ্ছি । পদ্ম)
 
১.২
এইসব বিচ্ছিরি বোধের দেশে নিজের ভেতরে নিজেই গুটিয়ে থাকে নিঃসঙ্গ আকাশ। আর জীবন এতোটাই প্রাণহীন যে, টোকখাওয়া চেহারায় আঁধারে দাড়িয়ে লাভ নেই।

নিজের ভেতরে নিজেই লুকিয়ে থাকবার চেষ্টা করতাম একসময়
কেউ দেখে ফেলতে পারে ভেবে হৃৎপিন্ডটা সরিয়ে রাখতাম দূরে

আলোকিত পৃথিবীতে মুখ লুকানোর জায়গার খুব অভাব চলছে এখন
(পৃথিবী, পৃথিবী এবং নার্সিসাস । সাম্য রাইয়ান)
 

চকচকে ব্লেড দিয়ে অনবরত কাটছিলো সে স্মৃতির পাউরুটি। প্রচন্ড ক্ষুধায় তাকাচ্ছিলোনা এদিকে-সেদিকে, কোনোদিকেই; একমনে কাটছে তো কাটছেই। ওদিকে আরেক দৃষ্টান্ত; ব্লেড দিয়ে জলকাটার মতো করে চলছে ভূমিভাগপ্রক্রিয়া।



পূর্বের জীবন এখন কেবলই স্মৃতি। সেইসব সন্ধ্যা, বিকেল, রাত আর ঐসব গল্পশোনাকাল। সেইসব বৃক্ষ, নদী, বাড়ি, বুড়ি, শিশুর গল্প বলার কেউ নাই আর। শুধু জেগে আছি আমি স্মৃতির শলাকা পুড়িয়ে। হৃৎপিণ্ড এক জ্বলন্ত গোলক।

তুমি আর শুধু সন্ধ্যা নও-
স্মৃতির আধার:
ওই যে পাখিটি ডাকলো সাঁঝের শেষ ডাক;
ওই যে দূরে কোথায় কী একটা শব্দ হঠাৎ;
শাঁখ বাজছে, উলুধ্বনি, শিশু কাঁদে;
এই যে ঘরেতে কত কালের মাকড়সারা,
কলমদানির গায়ে ধুলো, ফুরোনো কলম...

শেষ হলো তবে?
আঁধারের প্রতিটি ভিতরে এখন যাত্রা গহীন:
আকাশ সারাটা জুড়ে উঠছে ফুটে মোহন মিথ্যা
ক্লেদ পাপ মিথ্যাচার ছলা ও ছলনা
ক্লান্তশ্বাস দ্রুতম্বাস কত দীর্ঘ নিঃশ্বাস
অশ্রু আর রক্ত আর ঘ্রাণ ও লবন

আরও কত অজানা নক্ষত্র...

তারপর
আগুন জ্বালার ঠিক পূর্বক্ষণে ভেবে নিতে দিও
সব স্মৃতি ভাবা হল কি না-!
(স্মৃতি । অনুপ চণ্ডাল)
 

এইখান হতে যতোগুলো শব্দ শোনা যায়, তার সবগুলো কিছুটা সময় নিয়ে, মিশ্রিত, একটি গর্জন হয়ে হাজির হবে। আর দূর হতে ভেসে আসা শত-সহস্র কন্ঠস্বর কুলধ্বনির মতোই মিশে যাবে একটি বিন্দুতে। আর সেই বিন্দুগুলো, অগণিত, জড়ো হতে হতে তৈরি হবে আরেকটি বিন্দু। এর ভেতর দিয়ে তুমি বারো মাস কেবল ভেরেণ্ডা ভেজে খাও, নয় বৌয়ের পুতুলনাচ দেখো, মরার উপর খাঁড়ার ঘা দেখো, কোথাওবা উটের পিঠে স্বচ্ছ জলকণা জন্ম নিতে দেখো। তারপরেও জেনো, তবু অনেক কিছুই জানবার তাকে বাকি।

অভ্যেসে মিলাও বিন্দু, তার মাঝে ভাবো বহুদূর, তার মাঝে
সব দায়দেনা শোধবোধ করো, তারপর ঘুমাও ছ’মাস,
বিন্দুবিসর্গের খোঁজ আর তখন থাকে না, বাকি বারো মাস
কেবল ভেরেণ্ডা ভেজে খাও, নয় বৌয়ের পুতুলনাচ দেখো,
মরার উপর খাঁড়ার ঘা দেখো, কোথাও উটের পিঠে স্বচ্ছ
জলকণা জন্ম নিতে দেখো, তথাপি অনেক কিছু জানবার
থাকে বাকি, ওইটুকু বিন্দুর সমান তবু এখনও অনেক
কিছু তুমি জানতে পারো না, তাই খেদে কিচেন-নাইফ দিয়ে
অন্নচিন্তা কুচি কুচি করো, কেটে-ছিঁড়ে দেখো সব সম্ভাবনা,
পান করো সমস্ত নির্যাস, মদ ও কৌমার্য, তার মাঝে চলে
আরও কিছু কাল, ফের শুরু হয় আরও সুক্ষ জল্পনাা-কল্পনা,
বিন্দু বিন্দু ভাব জমে, ভাব থেকে জন্মায় কথা সারিৎসাগর,
তার অর্থে টের পাও নিয়তির খেল, আক্ষেপে আটকে যায়
সব, তাতে তুমি খুদে বিন্দু হয়ে যাও, ধরো, ক্ষুদ্রতম কেউ,
যেন অণুপ্রমাণিত, না কি ফের নরকে বিছানা নেবে তুমি,
সারাক্ষণ তাকবে সবার কুনজরে, তার চেয়ে হও দেবদারুগত,
(বিন্দুবিসর্গের খোঁজে । শান্তনু চৌধুরী)

[ নিখিল নওশাদ সম্পাদিত 'বিরোধ', প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ]

❏  সাম্য রাইয়ান 

আর এইভাবে জঙধরা সুখ নিয়ে আমরা বেঁচে আছি। আমাদের সুখভর্তি মরিচা; আর দুঃখগুলো ইস্পাতের মতো বেগময়। সে যাই হোক, আমরা বেঁচে আছি, এটাই বড়ো কথা। জঙধরা সুখ নিয়ে- ইস্পাতগতির দুঃখ নিয়ে- আর যেটা মূল বিষয়- কিংবা বলতে পারেন আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র লক্ষ্য/উদ্দেশ্য/সার্থকতা/বৈশিষ্ট্য/তৃপ্তি/আকাঙ্খা/চাওয়া-পাওয়া- যে বিষয়টা অত্যন্ত মধ্যবৃত্তিয়- পিচ্ছিল সুবিধাবাদ নিয়ে আমরা নিজে নিজেই বেশ তৃপ্তিবোধ করি।

এর অর্থ দাঁড়ায়- আমরা বেঁচে আছি। অনেকেই মরে গ্যাছে- আমার অনেক বন্ধু, অনেক আত্মীয়, অনেক চেনা-জানা/অচেনা-অজানা; অনেকেই মরে গ্যাছে। আমাদের কাছাকাছি থেকেও অনেকে মরে গ্যাছে। আমরা বেঁচে আছি।
উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা, হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!
মানুষের লোকালয়ে লালিত লোভনকান্তি কবিদের মতো
তুমি বেঁচে থাকো।
তুমি ফের ঘুরে ঘুরে ডাকো সুসময়!
( উদিত দুঃখের দেশ । আবুল হাসান  )


২. 
তার আছে প্রাণখোলা জীবনবোধের গান, যা সে হাঁটতে হাঁটতে গায়। এটা তার নিত্যদিনের অভ্যেস। রাত নেমে এলে যখন চাঁদের দ্যাখা পাওয়া যায়, তখন তাকে ঘর থেকে ডেকে আনে চাঁদ; আকাশ থেকে ডাক দ্যায়; ওপরে উঠে আসতে বলে কিংবা নিজেই নেমে আসতে চায়। ডাকে আয় আয়। সে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, আঁতকে ওঠে। সকালে সূর্যকে দেখে তার চাঁদের কথা মনে পড়ে যায়। চাঁ দ, এর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যার জন্য তার এতো খ্যাতি-বিখ্যাতি, তা হল রাত না হলে তার দ্যাখা পাওয়া যায় না।

এইগুলো শুধু চলতে চলতে দেখা
যবে আমি একা,
যদি কেউ বলে চাঁদ নিয়ে তো হয়েছে
কথা ঢের, তোমার ভাবনা তুমি-ই
করো একা একা,
প্রয়োজন নেই পুরাতন তর্কের!

কালকের চাঁদ আজকে উঠেছে আবার
চলতি পথে দেখছি যে বারবার
দালানগুলো সবার চেয়ে উঁচু
তারি ফাঁকে একটুকরো আকাশ,
বিষ্ময় যদি দালানচূড়ায় ওঠে
থাকতেই পারে চাঁদ দেখার অবকাশ!
( চাঁদ দেখার অবকাশ । আহমেদ নকীব  )

৩. 
প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে হঠাৎ রথি-মহারথিরা গাছ থেকে নেমে এলেন। এবং মাটিতে পা দিয়ে পরমূহুর্তেই বুঝতে পারলেন  মা টি  গ র ম। লাস্টবেঞ্চির ছাত্ররা ওতেই শস্যৎপাদনের লাগি অমানুষিক চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর ক্লাসের সেইসব উজ্জল সন্তানেরা, বৃদ্ধার স্তনের মতো; ওরাও ব্যস্ত, মাটিকে দিচ্ছে বরফের স্বাদ; কখনো ঠুকছে মাধা নরম গদিতে; কখনো দিচ্ছে গাল প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, লাস্টবেঞ্চির। 

      কার পক্ষে যাবো? কোন দিকে যাবো? আমাকে দিওনা গাল- আমি নিরুপায়
ক্লাশভর্তি উজ্জল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেপ সমস্ত কাগজ!
আমি বাজে ছেলে, আমি লাস্টবেঞ্চি, আমি পারবো না!
ক্ষমা করবেন বৃক্ষ, আপনার শাখায় আমি সত্যপাখি বসাতে পারবো না!
বানান ভীষণ ভুল হবে আর প্রুফ সংশোধন করা যেহেতু শিখিনি
ভাষায় গলদ: আমি কি সাহসে লিখবো তবে সত্য পাখি সচ্চরিত্র ফুল?

আমার হবে না আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ আকাঠ!
সচ্চরিত্র ফুল আমি যত বাগানের মোড়ে লিখতে যাই, দেখি
আমার কলম খুলে পড়ে যায় বিষ পিঁপড়ে বিষের পুতুল ।
( আমার হবে না আমি বুঝে গেছি
। আবুল হাসান  )

৪.
মাঝরাতে জেগে যদি রাজাকারমন উসখুস করে মাফিয়া তোমার, ডেকে নিও কাছে, হৃদয়ের আলিঙ্গণে, মুখোশী নির্মূলকারীকে। সে দেবে মাথায় হাতবুলিয়ে পূণর্বার-পূণর্বার।

দৃশ্যমান সকল কিছুই সত্য নয়, কখনো অদৃশ্যমান অনেক কিছুই সত্য প্রমাণিত হয়।


ঐ পারের সৌন্দর্যের কথা ভেবে যেতে ইচ্ছে হয়। পার তো জানে না, পৃথিবীময় পরের রয়েছে একই দৃশ্য; অন্তত আমার কাছে তাই-ই মনে হয়, ব্যতিক্রম নয়।


আমি
একজন রাজাকার
…৭১ টি পাঁপড়ি মেলা
একটি সকালকে বলাৎকার করেছিলাম
সকালের মর্মে লুকায়িত রাগ
সাক্ষ্য দিচ্ছে
আমি একজন রাজাকার
……………………………….
রাজা যায়
রাজা আসে…
আমি কেবলি আকার পাই
আবডালে রয়ে যাই রাজাকার
রাজা কার
জানে যূধিষ্ঠির
(আমি
একজন রাজাকার  । আরণ্যক টিটো )
* *  *  * *  *  * *  *  * *  *  * *  *  * *  * 
আমি রাজাকার।
আমি রাজাকার ৭১ নং ডিপার্টমেন্ট
স্টোরের চিফ একাউন্টেন্ট বলছি।
রক্তে মাখা পুঁজি আর
কলুষিত বুক নিয়ে আগামিকাল
আমি হজ্বে যাবো;
……………………………….
সত্যি বলছি
আমি পাল্টে গিয়ে
মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডারের
খাতায় নিজের নামটা লেখাব।
( অপরিবর্তনীয় । শুভ্র সরখেল  )

৫.
অন্তরটা তার বাজি ওঠে থাকি থাকি। কোন প্রচেষ্টা লক্ষিত হয় না থামানোর, বরং কৃতজ্ঞদৃষ্টির আমরা যখন তার সামনে থাকি তখনি বরং অধিক মর্মরি ওঠে অন্তর তাহার। যেতে যেতে দিন, এক কুমারীর সাথে দ্যাখা হয় তার। পরস্পর দ্যাখা-শোনা-বাদ্য-মর্মও চলতে থাকে। যুবকের মর্মও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাইতে থাকে; কুমারীর অন্তরের বাজনাও কি এতদিন পর অনুভূত হইল না কি; যেভাবে কাঁপিয়া উঠিল কবি!..



দেখা হয়েছিল শুকনো গাছের সাথে
গাছেরা কেবলি ঝরায় তাদের পাতা
কথা হয়েছিল নগ্ননারীর সাথে
গাছেরা খাদ্য চেয়েছে পদক্ষেপে

ভোজনবিলাসী পুরুষ খেয়েছে পাতা
অগ্নিদ্রবণ, নির্বাপনের স্বাদ-
আমাদের পিঠে কালো মোহরের ছাপ
আমাদের ঘরে ঘুনপোকাদের ঘর;
( আয়না । শাহেদ শাফায়েত )

৬.
কলমের ঝনঝন শব্দে কাগজের ঘুম ভেঙে গেল। কাগজ জেগে বলল, আমার ঘুম ভাঙানোর অপরাধে তুমি অপরাধী, তা কি জান? কলম বলল, আমি অপরাধী জন্মলগ্ন থেকে। এরপর কোত্থেকে দোয়াত বলে উঠল, ওর জন্মই হয়েছে অপরাধের মধ্য দিয়ে; আমি ওরে জন্ম হতে চিনি; প্রচুর অপরাধে অপরাধী ও। কাগজের ঝুড়ি হঠাৎ বলে উঠল, ওনার দন্ড হোক।

পিপাসার্ত বাতাসের হাতে এক গ্লাস পরিপাটি জল
বিশুষ্ক গলার নলে পতন খুশিতে দিশেহারা
জলের গভীরে সামুদ্রিক ঘুম, আনিত ঘুমের নুনচোখ এলাকায়
কখনোবা ফেটেছে তোমার পিপাসার ডিম

তালা খুলে খামের শরীর থেকে বেরিয়েছে চৌকোণ বাতাশ
উড়েছে তোমার লম্বা চুল-লম্বা ফুল- ব্যাপক কোমলে

পর্যটক খাম মৃত্যুমনি ফুটফুটে হস্তাক্ষর
একে অন্যের জড়িয়ে কাঁধ- জলের তরল বিষ্ফোরণ
( পর্যটক খাম । নাভিল মানদার  )

৭. 
একজন কবি আমাকে বলেছিলেন; সাম্য, সবকিছু বুঝে ফেলো না, তাহলে আর বাঁচতে ইচ্ছে হবে না; মন চাইবে আত্মহত্যা করি।

এসে দেখি সকলই ভোজবাজি
ঘর নেই গেরস্থালি নেই
কেবলই মানুষ
একে অপরের দিকে আঙুল তুলে
জগৎ বোঝাচ্ছে
আমার দায় নেই অত
এত কিছু বুঝতেও আসিনি
এসেছিলাম ঘরের সন্ধানে
এসে দেখি
মানুষেরা এখনো সেভাবে
ঘরটর বাঁধা শেখেনি
(লোকালয়ে ।  সুহৃদ শহীদুল্লাহ )

[ কৃতজ্ঞতা:  শিলাজিৎ, তানভীর তজিব, রবিন সরকার, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য ]

চিরকুট: লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় কলকাতার পত্রিকা ‘ধ্বংসকাল’-এ৷

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *