❑ সাম্য রাইয়ান
আমার বাড়ির পাশে একসময় যখন রেলস্টেশন সচল ছিল তখন দেখতাম ভোর থেকেই অসংখ্য মানুষ ব্যাগবস্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে—তাদের চোখে অনন্ত তাড়াহুড়ো, যেন ট্রেন মিস করলে কেবল গন্তব্য নয়, জীবনটাই হারিয়ে যাবে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অনেকে কোনো বগিতেই উঠতো না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকতো। যেন কোথাও যাবার জন্য জন্ম হয়নি তাদের, বরং যাবার দৃশ্য দেখাটাই তাদের নিয়তি। এই দৃশ্য মনে পড়ে যায় গাসসান কানাফানির Men in the Sun পড়তে পড়তে৷ যেখানে আবু কায়েস, আসাদ আর মারওয়ান—তিনজন শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে কুয়েতে যাবার জন্য মরিয়া, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে কেবল মৃত্যুর কাছে।
গাসসান কানাফানি (১৯৩৬–১৯৭২) ফিলিস্তিনের সেই লেখক, যিনি জানতেন যে শরণার্থীর গল্প কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি সমষ্টিগত রাজনৈতিক নথি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল মুক্তির হাতিয়ার—প্রতিরোধ-শিল্প। তিনি ছিলেন মার্কসবাদী, বিপ্লবী, এবং একইসাথে এক চরম মানবিক কথক। ফিলিস্তিনের নির্বাসিত জীবনের ধুলোমাখা প্রতিটি শ্বাস তিনি গল্পে রূপান্তর করেছিলেন, যেন ইতিহাসের পাতা নয়, সরাসরি মানুষের মাংসে খোদাই হয়ে থাকে।
Men in the Sun (১৯৬৩)–এ কানাফানি তিন ভিন্ন প্রজন্মের শরণার্থীর কাহিনী বলেন—পুরনো যুদ্ধে হারানো জমির ব্যথা, নতুন রাজনৈতিক সংকটে ছিন্নমূল হওয়া, আর যুবক বয়সের কর্মসংস্থানের হতাশা—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনের একটি যুগল প্রতিকৃতি তৈরি হয়। গল্পের শেষ মুহূর্তে চালক আবু খিজির সেই ঐতিহাসিক প্রশ্ন—“Why didn’t you knock on the walls of the tank?”—শুধু গল্পের তিন মৃত মানুষের প্রতি নয়, বরং সমগ্র উপনিবেশিত বিশ্বের প্রতি নিক্ষিপ্ত এক চাবুক। এখানে “ট্যাংকার” কেবল একটি যান নয়, বরং প্রতীক—অবরুদ্ধ বাস্তবতার, রাজনৈতিক নীরবতার, এবং মানুষের ভেতরে জমে থাকা ভয়ের।
আজকের দিনে এই প্রতীক আরও বিস্তৃত। গাজার শিশু যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে শ্বাস নিতে পারছে না, লিবিয়ার উপকূলে নৌকা ডুবে যাচ্ছে, বাঙলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে মানুষ কাঁটাতারের পাশে জীবন কাটাচ্ছে—তখন সেই “ট্যাংকার” আসলে আমাদের সময়ের প্রতিদিনের খবর। মৃত্যু এখনো আসছে, শুধু তার নাম পাল্টেছে—একদিন ছিল যুদ্ধ, আজ তার নাম সীমান্তনীতি বা অভিবাসন সংকট।
তাঁর আরেকটি অনন্য কাজ Returning to Haifa (১৯৭০)। সাঈদ আর সাফিয়া, ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় যাদের পাঁচ মাসের ছেলে হারিয়ে যায়, বিশ বছর পর ফিরে এসে দেখে—সেই সন্তানকে লালন করেছে এক ইহুদি দম্পতি, আর সে এখন ইসরায়েলি সেনা। এখানে কানাফানি কোনো নাটকীয় পুনর্মিলনের গল্প বলেননি; বরং নির্বাসনের এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছেন—তুমি যতই অতীত ফিরে পেতে চাও, সেটি হয়তো এমনভাবে বদলে গেছে যে, ফেরত পাওয়ার মানে দাঁড়ায় তাকে আরো বেশি করে হারিয়ে ফেলা। এই গল্পে “হারানো সন্তান” কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং হারানো মাতৃভূমির প্রতীক, যা শত্রুর পরিচয়ে গড়ে উঠেছে।
কানাফানির ভাষার বিশেষত্ব হলো তার সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ ও নিরাভরণ বর্ণনা। তিনি আবেগকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে লেখেন না, বরং কেটে-ছেঁটে এমন এক নগ্ন অবস্থা তৈরি করেন, যেখানে পাঠক নিজের আবেগ ঢেলে দেয়। তাঁর প্রতীকগুলো দৃশ্যত সহজ—ট্যাংকার, রাস্তা, হারানো সন্তান—কিন্তু এরা বহন করে গভীর রাজনৈতিক অর্থ। আর এখানেই তিনি এডওয়ার্ড সাঈদের মতো নির্বাসন-তত্ত্ববিদদের সাথে মিলে যান—যেখানে পরিচয়, স্মৃতি, স্থান সব একসাথে ভেঙে গিয়ে নতুন এক বিপর্যয়-বাস্তবতা তৈরি করে।
কানাফানি পড়ার অর্থ হলো নৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া। Men in the Sun–এর দেয়ালে কড়া নাড়ার আহ্বান আমাকে ভাবায়; Returning to Haifa আমাকে প্রশ্ন করে—আমি কি প্রস্তুত এমন এক ফেরার জন্য, যেখানে ফেরার জায়গাটাই আমার শত্রুর হাতে গড়ে উঠেছে?
১৯৭২ সালে বৈরুতে মোসাদ তাঁর গাড়িতে বোমা রেখে হত্যা করে। মৃত্যু তাকে থামাতে পারেনি; বরং তাঁর মৃত্যু নিজেই এক রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে উঠে—প্রমাণ করেছে যে, তার কলম ছিল ইসরায়েলি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে আতঙ্ক আর ভয়ংকর শব্দদুটির যৌথরূপ। আজ তাঁর লেখা পড়লে মনে হয়, এই গল্পগুলো শুধু ফিলিস্তিনের নয়, আমাদের সবার—কারণ প্রতিটি অবরুদ্ধ মানুষ, প্রতিটি নির্বাসিত আত্মা, আসলে একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়—“তুমি কি এখনও কড়া নাড়ছ?”
দিনহীনের দিনলিপি : নভেম্বর ২০১৫