❑ সাম্য রাইয়ান
ষাটের দশকের কবিতায় যখন একদিকে রাজনৈতিক উত্তাপ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, তখন আবুবকর সিদ্দিক জঙ্গল, নদী, হাওর ও গ্রামের আকাশের নৈঃশব্দ্যের ভিতর দাঁড়িয়ে লিখেছেন মানুষ ও পরিবেশের অন্তরঙ্গ কথোপকথন।
ইদানিং আবুবকর সিদ্দিকের (১৯ আগস্ট ১৯৩৪—২৮ ডিসেম্বর ২০২৩) নাম তেমন কোথাও চোখে পড়ে না কেন? আপনাদের চোখে পড়ে?
তাঁর কাব্যগ্রন্থ জোছনা ও মায়া কিংবা সন্ধ্যার গান পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এই কবি ভূগোলকে আত্মার উপকরণে পরিণত করেছেন। বৃষ্টির ধারা, মাটির গন্ধ, গাছের কাণ্ড—সবকিছু তাঁর কবিতায় শুধু উপমা নয়, বরং অস্তিত্বের অংশ। বাঙলাদেশ প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের যে গভীর অভিজ্ঞতা বহন করে, তার ভাষ্য তিনি দিয়েছেন এক ধীর অথচ গভীর টোনে।
কিন্তু শুধু প্রকৃতির কবি বললে আবুবকর সিদ্দিককে খন্ডিত বিচার করা হবে। তিনি ছিলেন সামাজিক সত্যেরও কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় যেমন আছে গ্রামীণ জীবনের অক্ষয় সৌন্দর্য, তেমনি আছে দারিদ্র্য, প্রান্তিক মানুষের বেদনা, অবহেলিত সমাজের দীর্ঘশ্বাস। আধুনিকতার আলো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তিনি সবসময় মনে করিয়ে দিয়েছেন—মানুষ কেবল শহরের নাগরিকতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার শেকড় মাটির ভেতরে, নদীর ধার ঘেঁষে, কৃষকের ঘামে।
২০২৩ সালের শেষ প্রহরে যখন তিনি চলে গেলেন, তখন বাঙলা কবিতা হারালো এক আত্মমগ্ন অথচ দায়বদ্ধ কণ্ঠ। আজকের বাঙলাদেশে, যেখানে প্রকৃতি ধ্বংসের মুখে, পরিবেশ প্রতিনিয়ত হুমকির শিকার, সেখানে আবুবকর সিদ্দিক বরং প্রাসঙ্গিক পাঠ। তাঁর কবিতার প্রতিটি গাছ, প্রতিটি নদী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা যদি প্রকৃতিকে ভুলে যাই, তবে নিজেদের অস্তিত্বকেও হারিয়ে ফেলব।
দিনহীনের দিনলিপি : ১৯ আগস্ট ২০২৫