❑ সাম্য রাইয়ান
যার নাম উচ্চারণও এই সময়ে সহজরৈখিক নয়, তিনি হুমায়ুন আজাদ; এক মেটাথিয়োরিকাল ব্যক্তি, যার কণ্ঠস্বর ছিল শুধু বিতর্কের জন্য নয়, বরং মুক্ত চিন্তার সন্ধানে এক ত্রাসদায়ক দার্শনিক পরীক্ষা। নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সামগ্রিক সমাজের কাঠামোর সংঘাত কখনো সরলভাবে মিটে না, বরং তা সবসময় দ্বন্দ্বপূর্ণ, জটিল এবং রহস্যময়। এই দ্বন্দ্বই আমাদের জন্য সতর্ক বার্তা বহন করে—স্বাধীন চিন্তার মূল্য কখনো সস্তা হয় না। তাঁর জীবন ও সাহিত্য এক দার্শনিক ত্রাসের আভাস বহন করে, যেখানে ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে ওঠে বিকাশমান আধুনিকতার ক্রান্তিকাল।
আমার কাছে হুমায়ুন আজাদ কেবল একজন লেখক নন—ভাষার মাইনফিল্ড। তিনি শব্দকে এমনভাবে সাজিয়ে বাক্য গড়ে তোলেন, যা পড়তে পড়তে মনে হয়, প্রতিটি শব্দের ভেতরে বিস্ফোরক পুঁতে রাখা আছে; যে বিস্ফোরণ কেবল সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বস্তি তৈরি জন্য নির্মিত। তাঁর লিখনভঙ্গিমা নিরীহ জলধারা নয়; তা একদিকে ধর্ম, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় গঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অন্যদিকে ব্যক্তির মুক্তচিন্তাঞ্চল সন্ধানে রত।
ঐতিহ্যগত শাসনকাঠামোকে কঠোরভাবে চ্যালেঞ্জ করে ধর্মীয় অথচ স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতাকে প্রবলভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছিলেন।
মানব জীবনের অর্থহীনতা ও অসহনীয়তাই তাঁর সাহিত্যের অন্যতম সুর। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল—তিনি আমাদের আরামকে ধ্বংস করতে চান। সেই আরাম, যেখানে আমরা নিজেদের ছদ্ম-নৈতিকতা, ভণ্ড উদারতা, আর ক্ষুদ্র স্বার্থে ঢেকে রাখি।
বাঙলা সাহিত্যে এরকম বিদ্যুৎ-তেজি, স্বতন্ত্র এবং ভয়ংকরভাবে যুক্তিবাদী কণ্ঠস্বর খুব কম এসেছে। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন লেখকের অবসান নয়—এ ছিল জনপরিসর থেকে এক অদম্য বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার অপসারণ। অথচ তাঁর অনুপস্থিতিতেও, তাঁর বাক্যগুলো এখনো বিদ্যুতের মতো আঘাত হানে—প্রমাণ করে যে, হুমায়ুন আজাদের আসল সমাধি তাঁর রচনার পৃষ্ঠায়, যেখানে তাঁর ক্রোধ, তির্যক হাসি, আর বুদ্ধির শীতল আলো অম্লান হয়ে আছে।