ভাঙনের ভাষ্য, প্রত্যয়ের প্রতিধ্বনি

❏ সাম্য রাইয়ান 

কবিতা কি কেবল সৌন্দর্যের উদ্‌যাপন? নাকি কখনো তা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা, আত্মসংশয়ের রোজনামচা, রাষ্ট্র ও বাস্তবতার নির্মোহ বিশ্লেষণ? এ তো সকলেই জানি—কবিতা অনেকরকম৷ উদয়ন ভট্টাচার্য সেই কবিকণ্ঠ—যাঁর কবিতায় সময়, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিসত্তার টানাপোড়েন একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর কবিতা রাজনৈতিকও, অস্তিত্ববাদীও।

কবিতা কালের আয়না। কোনো একক সত্য নয়, বরং সময়, পরিসর ও ব্যক্তি— এই ত্রিভুজে দাঁড়িয়ে জীবনের বহুমাত্রিক অনুভবকে প্রতিফলিত করে। উদয়ন ভট্টাচার্যের ‘নাগরিক’ কবিতাটি পাঠ করলে এমনই এক বিচিত্র অনুভূতির সম্মুখীন হই— যেখানে ব্যক্তির মনোজগতে জেগে থাকা ভয়, রাষ্ট্রের অবিচার, নাগরিকত্বের সংকট, এমনকি আধুনিক সভ্যতার ছলনাময় আলো সব মিলেমিশে এক বহুমাত্রিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।

“এত ধূলা জমে আছে ভেতরে ভেতরে
কোষবদ্ধ তরবারী মুক্ত করতে আজ তাই
বড়ো ভয় করে।”

এই তিন পংক্তিতে লুকিয়ে আছে এক যুগের সংকেত। ‘ধূলা’ এখানে শুধু সময়ের নয়, বরং ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অবদমনের প্রতীক। সেই ধূলায় ঢেকে গেছে মানুষের সাহস, প্রতিবাদ করার ভাষা। “তরবারী মুক্ত করতে ভয়”— এই ভয় ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক; আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নিপীড়নের চোরাবালিতে নিমজ্জিত নাগরিকের ভয়।

এই ‘ভয়’ কোন নিছক মানসিক দুর্বলতা নয়। বরং রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসের ছায়াতলে নাগরিক যখন নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে চলার লড়াই করে, তখন সে চুপ থাকে, নির্লিপ্ত থাকে। উদয়ন বোঝান, এই নির্লিপ্তি ভয়াবহ এক প্রতিক্রিয়া—
“কী জানি কখন কোন ছল ও আক্রমণে
হত্যারক অন্ধ ছুটে যায়
সন্ধ্যার আকাশে।”

এই অন্ধতা কেবল খুনের নয়; সত্য, বিবেক, আদর্শ— সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে। এখানে ‘সন্ধ্যার আকাশ’ ক্লান্তি, অবসন্নতা ও অনিশ্চয়তার আভাস দেয়। কবিতার ভেতরকার এই রূপক একদিকে যেমন রাজনৈতিক, তেমনি সাংস্কৃতিকও।

“মায়াবী জনপদ আলো ও বিভ্রয়
সকলেই দাবি করে আমরাই এ দেশ।”

এই পংক্তি সমগ্র কবিতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে রাষ্ট্র এক মায়াবী জনপদ— বিভ্রান্তিকর, মোহময়, যেখানে প্রত্যেকে ‘আমরাই দেশ’ বলে দাবি করার মধ্য দিয়ে অপরের অংশীদারিত্বের প্রতি অবজ্ঞা ও আগ্রাসনের রূপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। যেন দেশ এমনই এক কাঙ্ক্ষিত-লোভনীয় বস্তু, যার ওপর সকলে একক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এখানেই আমরা দেখতে পাই কবির গভীর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি। দেশ কেবল জন্মসূত্রে পাওয়া কোনো বস্তু নয়, বরং তাকে ধারণ করতে হয়, প্রতিপালন করতে হয় মানবিকতায়, ন্যায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু যারা নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেই ক্ষুদ্র অংশটি, যারা শাসন করে তারা ব্যতীত বাকিদের অবস্থা—
“নদীর দুই তীরে বিপন্ন মানুষ
আত্মরক্ষার ছুটিতে উড়ালো ফানুস।”

নদী এখানে বিভাজনের রূপকও হতে পারে কি? বিপন্নতা বাস্তবতার? একদিকে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ, অন্যদিকে মানচিত্রের কৃত্রিম সীমা। মানুষ এখানে দিশাহীন, সংকটে জর্জরিত। তার আত্মরক্ষা এখন ফানুসে নির্ভরশীল— এক অলীক আশাবাদে।

এই অবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? কবির ব্যঙ্গ ও বেদনা একসাথে উচ্চারিত হয়, যেখানে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের আগ্রাসী রূপ:
“স্পষ্টিত আলোর মধ্যে কাঁটার সীমানা
রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়
কে থাকবে, কে থাকবে না।”

এই চারটি পংক্তি আধুনিক বিশ্বের ‘জাতীয়তা’, ‘নাগরিকত্ব’, ‘নির্বাসন’, ‘ডিটেনশন’ ইত্যাদি ভয়াবহ বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে। রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, কে নিজের ভূমিতে থাকবে, আর কে থাকবে না। এখানে ‘আলো’ যেন আইনি ভাষ্য, আর ‘কাঁটার সীমানা’ হলো বাস্তবতার নির্মমতা। ‘নাগরিক’ হয়ে ওঠে এক অনিশ্চিত পরিচয়।

এই কবিতা পাঠ করতে করতে বারবার মনে পড়ে যায় জার্মান দার্শনিক হান্না আরেন্টের সেই বিখ্যাত উক্তি— “The right to have rights.” এই কবিতা যেন সেই মৌলিক অধিকারেরই বিচারে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের হাতে যখন নাগরিকত্ব এক রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন নাগরিক কেবলই একটি আইনি কাগজের উপস্থাপক নয়— সে এক অস্তিত্ব সংকটে ভোগা সত্তা।

এই কবিতায় নেই কোনো অতিনাটকীয়তা, নেই কোনো স্লোগানের সরলতা। বরং শব্দের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে গূঢ় প্রতীক, রাজনৈতিক তীক্ষ্ণতা ও দার্শনিক নিরীক্ষা। উদয়ন ভট্টাচার্যের কাব্যভাষা সংযত, কিন্তু তীব্র। এখানে শব্দ নয়, নিঃশব্দতাই মূল বার্তাবাহক।

আমরা দেখি এক সামাজিক বাস্তবতা যেখানে ‘রাষ্ট্র’ এক সর্বগ্রাসী সত্তা, যে আলো দেয়, আবার সেই আলোতেই সীমা আঁকে। নাগরিক সেই আলোয় পথ চলতে চলতে নিজেই সন্দেহে পড়ে যায়— আমি কি এই রাষ্ট্রের অংশ? নাকি শুধু তার নজরদারির বস্তু?

এটি শুধুমাত্র একটি কবিতা নয়, বরং আধুনিক ভারতের নাগরিক-চরিত্রের এক প্রামাণ্য দলিল। এর পংক্তিগুলির মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে এনআরসি, সিএএ, ডিটেনশন ক্যাম্প, জাতপাতের বিভাজন, রাজনৈতিক হিংসা, এবং তার ছায়ায় টিকে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা। কবির এই গভীর ও সংবেদনশীল চিত্রায়ন বাংলা কবিতার রাজনৈতিক শিরায় নতুন সঞ্চার ঘটায়।

উদয়ন ভট্টাচার্য এখানে কেবল কবি নন, বরং এক সত্যানুসন্ধানী পর্যবেক্ষক, যিনি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ভেতরকার ফাটল, ভয়ের উৎস, নিরুত্তাপ নীরবতা, আর ‘নাগরিক’ হয়ে ওঠার কষ্টকর প্রয়াসকে এক মর্মস্পর্শী কাব্যিক ভাষা দিয়েছেন।

এই কবিতা পাঠের পর পাঠক যেন নিজের প্রতিচ্ছবি খোঁজে ‘রাষ্ট্র’ নামক এক অতল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে—আমি কি সেই নাগরিক, যার অস্তিত্ব আজ প্রশ্নের মুখে?

আত্মালোকিত স্বীকারোক্তি ও সংবেদনশীল প্রতিরূপ উদয়ন ভট্টাচার্যের ‘জয়-পরাজয়’ কবিতাটি৷ ‘নাগরিক’ কবিতার রাষ্ট্রসঙ্কট থেকে বেরিয়ে এসে ‘জয়-পরাজয়’ কবিতায় উদয়ন নিজের অন্তর্গত বাস্তবতার দিকে ফিরে তাকান। এখানেও রাষ্ট্র আছে, সময় আছে, কিন্তু সবকিছুর উপরে আছে আত্মবিশ্লেষণের ছায়া। কবিতা শুরু হয়—
“যতবার পরাজিত হয়েছি জয়ী হয়েছি তার চেয়েও অনেক বেশি
তবু পরাজয়ের মুহূর্তগুলিই
দেওয়াল লিখনের মতো কখনও মুছে দিতে পারিনি”

পরাজয় এখানে শুধুই ব্যর্থতা নয়— এটি স্মৃতি, শিক্ষা, ইতিহাস। ‘দেওয়াল লিখন’ একটি অসাধারণ রূপক। সমাজের ভেতরকার সত্য যেমন দেওয়ালে লেখা থাকে, তেমনি মানুষের ভেতরকার যন্ত্রণাও মুছে যায় না। এই পংক্তিগুলো একধরনের ব্যতিক্রমী হিউম্যানিজমের বার্তা দেয়।

“যতবার ধ্বংস করেছি সৃষ্টি করেছি তার চেয়েও অনেক বেশি
তবু ধ্বংসের ছাপগুলিই
স্মৃতির শহরের ভাঙা ঐতিহ্যের মতো মনে থেকে যায়”

সৃষ্টি ও ধ্বংসের দ্বন্দ্ব এখানে আত্মজিজ্ঞাসার একটি কাব্যিক পরিসর। আমরা যা সৃষ্টি করি, তার চেয়ে বেশি মনে থাকে যা ধ্বংস করেছি। এই আত্মানুসন্ধান প্রমাণ করে কবি কেবল বাহ্যিক সমাজবীক্ষণ করছেন না, নিজের অস্তিত্বের পরিভাষাও নির্মাণ করছেন।

“যতবার অপমাননা করেছি প্রণাম করেছি আরও অনেক বেশি
তবু সম্মানের মান আলোয়
মনে পড়ে যায় হেমন্তের মৃত্যুদিন, পাথরের ফাটা লালের কথা”

‘হেমন্তের মৃত্যুদিন’ এক ঋতুর ভিতর মৃত্যু এনে দেয়। ‘পাথরের ফাটা লাল’— মনে করিয়ে দেয় দগদগে রক্তাক্ত স্মৃতি, হয়তো রাজনৈতিক নিপীড়ন, হয়তো নিজস্ব যন্ত্রণা—যা একান্তই ব্যক্তিগত। এই পংক্তিগুলি কবিকে শুধু এক আত্মানুসন্ধানী নয়, এক দুঃখস্মারক চিত্রকর করে তোলে।

“যতবার বিনয়ী হয়েছি, সততার কাছে নতজানু হয়েছি
মৌমাছিশিল্পকে বলেছি মধুসঞ্চয় এমন কিছু জীবিকা নয়
তবু বাইরের কেউ যেন বলছে আর খুব দূরে নেই প্রান্তরও”

এই অংশে কবি আত্মমুখিতা ত্যাগ করে আবারও সামাজিক বাস্তবতার দিকে ফিরে যান। বাইরের কণ্ঠস্বর যেন রাষ্ট্র, সমাজ বা সময়— যা কবির সকল আত্মসচেতনতা ভেদ করে বলে দেয়, বিপন্নতা এখনো যায়নি। কবি জেনেও জানেন না, এই সংকেত শোনা দরকার।

শেষদিকে কবি আশাবাদী হয়ে ওঠে—
“নীলসমুদ্রে ডুবে যাওয়া সূর্য কাল প্রভুত্বই
আবার নতুন হয়ে ফিরে আসবে।”

এটি একটি পুনর্জন্মের দৃশ্য। কবি বুঝে গেছেন, এই চক্র চলতেই থাকবে— পরাজয় থেকে জয়, আবার পরাজয়— কিন্তু প্রতিটি বার্তাই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়। এই অংশে কবিতা হয়ে ওঠে জীবনের দর্শন।

‘জয়—পরাজয়’ সরাসরি রাজনৈতিক কবিতা নয়, কিন্তু একটি আত্মনৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রতিবেদন। এটি একচোখো বিজয়গাথা নয়, বরং পরাজয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ার কাব্যিক অভিপ্রায়। এই কবিতা পাঠ করে মনে পড়ে যায় পল সেলানের কথা— “Poetry is a message in a bottle.” উদয়নের এই কবিতা সেই বোতলে ভরা বার্তা, যা আমাদের স্মৃতির গভীর থেকে টেনে আনে এক অনিবার্য সত্য— বিজয় নয়, পরাজয়ই মানুষকে মানুষ করে তোলে।

‘নাগরিক’ এবং ‘জয় পরাজয়’— দুটি কবিতাই একে অপরের পরিপূরক। প্রথমটি রাষ্ট্রকে বিশ্লেষণ করে, দ্বিতীয়টি আত্মসত্তাকে। একটি যদি হয় বাইরের অন্ধকার, অন্যটি তখন ভেতরের আলো খোঁজার প্রয়াস। উদয়ন ভট্টাচার্য নিজেকে বারবার ভেঙে আবার গড়েন। তাঁর কবিতা পাঠকের চেতনাকে শুধু প্রসারিত করে না, তাকে চিন্তার দায়ও দেয়।

এই কবিতাগুলির মধ্যে দিয়ে আমরা একটি যুগের স্বর শুনি— এক ভয়ানক রাষ্ট্রের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আত্মজিজ্ঞাসায় নিমজ্জিত মানুষের স্বর। এ কবিতাগুলো শুধুমাত্র সাহিত্য নয়— এক ধরণের বেঁচে থাকার দলিল। তারা একরকম কালানুক্রমিক স্মৃতিলিপি, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ে থাকবে একটি দর্শন, একটি শ্বাস, একটি ভাষ্য।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *