❑ সাম্য রাইয়ান
বাতাশে অনেক শব্দ ভেসে বেড়ায়; অসংখ্য দৃশ্য, স্মৃতি। হঠাৎ তাদের মধ্যে কিছু সংযোগ তৈরি হয়। এমন নিখুঁতভাবে হয় যে ভাষা একটি জীবন্ত সত্তায় পরিণত হয়। কখনো কখনো গান শুনবার সময় আমার এমন মনে হয়। গজল শুনলে আরও বেশি। শিল্পী এই সংযোগের কারিগর। বিচ্ছিন্ন সুর, বিচ্ছিন্ন শব্দ, এমনকি বিচ্ছিন্ন অনুভূতিগুলোকে পাশাপাশি বসিয়ে প্রাণদান করেন।
দেবারতি মিত্রের কবিতা পড়ার সময়ও আমার প্রায় একই অনুভূতি হয়। তিনি শব্দগুলোর মধ্যে বহুদিন ধরে লুকিয়ে থাকা সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। একটি পাখি এসে মিশে যাচ্ছে একটি ফুলের সঙ্গে, একটি বৃষ্টির বিকেল গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে মানুষের শরীরে, একটি মৃত শালিখ জলাভূমিতে শ্বেতপদ্ম হয়ে ফুটে উঠছে। দৃশ্যগুলো আলাদা আলাদা নয়। তারা একে অপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অনেক কবি আছেন, যাঁদের কয়েকটি বিশেষণ দিয়ে চিহ্নিত করা যায়। দেবারতি মিত্রকে সেইভাবে চিহ্নিত করতে গেলে বিপদ। তিনি প্রেমের কবি, আবার শুধু প্রেমের কবি নন। তিনি প্রকৃতির কবি, অথচ প্রকৃতিকে বিষয় করে লেখেন না। তিনি অন্তর্জগতের কবি, কিন্তু আত্মমগ্নতায় আটকে থাকেন না। তাঁর কবিতার সামনে দাঁড়িয়ে দেখবেন, তিনি সর্বদা আপনার থেকে সামান্য সরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা যে দরজা দিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছাতে চাই, তিনি তার পাশের দরজাটি খুলে দেন।
বাঙলা কবিতার ষাট, সত্তর, আশির দশকে যখন সমাজ, রাষ্ট্র, বিপ্লব, ভাঙন, নগরজীবন কবিতার ভেতর প্রবলভাবে প্রবেশ করছিল, সেই সময় আমরা দেখি, দেবারতির কবিতায় আত্মশ্রবণের আকাঙ্ক্ষাই বেশি। বাইরে কী ঘটছে তার চেয়ে ভেতরে কী ঘটছে, সেই বিষয়ে তাঁর কৌতূহল গভীর। পৃথিবীর ভিড় থেকে খানিকটা দূরে সরে গিয়ে তিনি শুনতে চেয়েছেন মানুষের অন্তর্লোকের শব্দ।
কবিতা সম্পর্কে তাঁর একটি মন্তব্য বহুবার উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি লিখেছিলেন, “কবিতা নিয়ে আমি কিছু করতে পারি না, করতে চাই না, শুধু পৌঁছতে চাই সেই সমুদ্রের কিনারায় যার একদিকে জীবন ও শিল্প অন্য দিকে শূন্যতা যেখানে কল্পনা মুহুর্মুহু অবিরাম নিজেকে সৃষ্টি করে চলে।”
গত কয়েক দশক থেকে আমরা কবিতার কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করেছি। কবিতা সমাজ বদলাবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, মানুষের পক্ষে কথা বলবে। দেবারতি এসব প্রত্যাশার বাইরে ছিলেন। তিনি পৌঁছতে চেয়েছিলেন। কোথায়? সেই সীমান্তে, যেখানে জীবন আর শিল্প একে অপরকে স্পর্শ করে।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে’। নামের মধ্যেই লুকানো বিষণ্ণতা। অন্ধদের স্কুলে ঘণ্টা বাজছে। যারা দেখতে পায় না, তাদের জন্য সময় ঘোষণা করছে একটি শব্দ। দৃশ্যের বদলে ধ্বনি। আলোহীনতার মধ্যে প্রতিধ্বনি। এই নামটি বারবার মনে পড়ে। তাঁর কবিতার সৌন্দর্য অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয়। চোখের চেয়ে অনুভূতির ভূমিকাই সেখানে বেশি।
দেবারতি সম্পর্কে আলোচনায় মণীন্দ্র গুপ্ত নামটি নেবো কি? নেয়া ঠিক হবে? স্বামী হিসেবে, কবি হিসেবে বা সমসাময়িক হিসেবে। যদিও এই সম্পর্কটিকে কেন্দ্র করে দেবারতিকে পড়লে ভুল হবে। কারণ তাঁর কবিতার নিজস্ব ভূগোল আছে। তিনি একবার বলেছিলেন, “একই ছাদের নিচে থাকলেও দুজনের কবিতার ঘর আলাদা।” তিনি নিজের কণ্ঠকে অন্য কারও ছায়ায় মিশে যেতে দেননি। এটুকুই উল্লেখ্য।
আসলে দেবারতির কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাঁর স্বাতন্ত্র্য। যেখানে কোনো পরিচিত সূত্র কাজ করে না। জীবনানন্দের সঙ্গে মিল খুঁজতে গেলে একসময় থমকে যেতে হয়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে কিছু দূর গিয়েই পথ শেষ হয়ে যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেম, শঙ্খ ঘোষের বৌদ্ধিক নির্মাণ কিংবা উৎপলকুমার বসুর ভ্রমণচেতনা— কোনোটির সঙ্গেই তাকে পুরোপুরি মেলানো যাবে না। নিজের জন্য তিনি আলাদা একটি অঞ্চল তৈরি করেছিলেন।
যেখানে নানারূপে ফিরে এসেছে প্রেম। কিন্তু সেই প্রেমে নাটকীয়তা কম। প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কও সেখানে প্রচলিত অর্থে উপস্থিত নয়।
“ফুলদানি ঐ তোমার শরীর
কাল কে অত ফুল সাজিয়েছিল”
এই পংক্তিগুলো পড়ে প্রথমে প্রেমের কবিতা মনে হয়। কিন্তু একটু এগোলেই দেখা যায়, প্রেম এখানে সামাজিক সম্পর্ক নয়, অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতার স্বরূপ। শরীর আছে, আকর্ষণ আছে, ঘনিষ্ঠতা আছে, কিন্তু তার থেকেও বড় কিছু আছে। দুজন মানুষ পরস্পরের ভেতরে প্রবেশ করছে, আবার দূরেও সরে যাচ্ছে।
এই দূরত্বের অনুভূতি দেবারতির বহু কবিতায় ছড়িয়ে আছে। তিনি প্রেমকে সম্পূর্ণ মিলনের জায়গা হিসেবে কল্পনা করেননি। মানুষরা সেখানে পাশাপাশি থাকে, তবু ফাঁক থেকে যায়। সেই ফাঁকটিই হয়তো সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষকে পুরোপুরি জানা যায় না, এই বোধ তাঁর কবিতার অন্তর্গত সুরগুলোর একটি।
দেবারতির কবিতায় প্রকৃতির উপস্থিতিও লক্ষ করার মতো। তবে এই প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি নয়, জীবনানন্দের প্রকৃতিও নয়। তিনি বৃষ্টি, ফুল, পাখি, নদী কিংবা আলোকে দৃশ্যসজ্জা হিসেবে ব্যবহার করেন না। এগুলো তাঁর কবিতার চরিত্র। কখনও কখনও মনে হয়, মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে কোনো সীমারেখা নেই। মানুষ ফুল হয়ে যাচ্ছে, পাখি পদ্ম হয়ে ফুটে উঠছে, বৃষ্টি এসে মানুষের শরীরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
“গভীর বৃষ্টিপাতের পরে এখন জেগে উঠেছি” এই পংক্তির দিকে তাকানো যাক। সাধারণ একটি বাক্য। কিন্তু এর মধ্যে জেগে ওঠার যে অভিজ্ঞতা আছে, তা শারীরিক নয়। বৃষ্টি শেষ হওয়ার পর মানুষ নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করছে। এভাবে প্রকৃতিকে প্রায়ই আত্মপরিচয়ের আয়না করে তোলেন।
প্রেম বা নিঃসঙ্গতা না বলে, বলা ভালো দেবারতি মিত্র মূলত সম্পর্কশাস্ত্রের কবি। মানুষ ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ক—এই সংযোগগুলোই তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। তাঁর কবিতার ভেতর বিচ্ছিন্নতার চেয়ে সংযোগের অনুসন্ধান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রসঙ্গে ‘অসুখ করেনি’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। কবিতাটি শুরু হয় একটি বিস্ময়কর পংক্তি দিয়ে—“আমাদের অসুখ করেইনি, সারবে কী?” বাঙলা কবিতায় প্রথম পংক্তির শক্তি নিয়ে আলোচনা হলে এই লাইনটির কথাও বলা উচিত। কারণ এখানে একটি প্রচলিত ধারণা উল্টে দেওয়া হয়েছে। আমরা সাধারণত অসুখকে সারাতে চাই। কবি প্রশ্ন তুললেন— অসুখই যদি না হয়ে থাকে, তাহলে আরোগ্যের প্রয়োজন কোথায়?
কবিতাটি যত এগোয়, তত বোঝা যায় যে অসুখ এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়। জীবনের রূপক। মানুষের জীবনে দুঃখ, অস্থিরতা, অপূর্ণতা আছে। এগুলো মুছে ফেলার জিনিশ নয়। এগুলোর সঙ্গেই বাস করতে হয়। সেই বাস করার মধ্যেই জীবনের অর্থ তৈরি হয়।
দেবারতির অনেক কবিতায় মৃত্যুর উল্লেখ আছে। তাঁর মৃত্যুচেতনা, ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা নয়। একে তিনি সমাপ্তি হিসেবে ভাবেননি। ভেবেছেন, পরিবর্তন, রূপান্তর। এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় যাত্রা। তাই তাঁর কবিতায় মৃত পাখি কখনও শ্বেতপদ্ম হয়ে ফিরে আসে। হারিয়ে যাওয়া জিনিশ অন্য কোনো রূপে আবার উপস্থিত হয়।
এই চিন্তাবিন্দুতে তাঁর কবিতার সঙ্গে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চেতনার কিছু সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। অখণ্ডতার ধারণা কাজ করে। জীবন, মৃত্যু, প্রেম কিংবা বিচ্ছেদ; তিনি মনে করেন, এসবকিছুই একটি বৃহত্তর প্রবাহের অংশ। আলাদা আলাদা ঘটনা নয়।
এই কারণেই ‘সবই অখণ্ড’ কবিতাটি তাঁর কাব্যজগত বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখছেন,
“টুকরো টুকরো করে কিছু দেখো না,
সবই অখণ্ড।”
আধুনিক মানুষের জীবন খণ্ডিত। আমরা সবকিছুকে আলাদা আলাদা ভাগে দেখি। কাজ, প্রেম, পরিবার, রাজনীতি বী শিল্প সবকিছুর জন্য আলাদা ঘর তৈরি করি। দেবারতি মিত্র এই বিভাজনের বিরুদ্ধে ছিলেন। প্রথম পাঠে এই ভাবনাগুলো সরল বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে এগুলো যথেষ্ট কঠিন। কারণ আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে বিভাজনই স্বাভাবিক। মানুষ নিজের মধ্যেও বিভক্ত। দেবারতি মিত্রের কবিতা সেই বিভাজনের ভেতরে দাঁড়িয়ে অখণ্ডতার কথা বলে।
তিনি এমন এক সময় লিখছেন, যখন নারীর অভিজ্ঞতা বাঙলা কবিতায় নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু তাঁর কবিতাকে সরাসরি নারীবাদী কবিতা বললে কিছুটা সরলীকরণ হয়ে যায়। পৃথিবীকে তিনি যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, তা বাঙলা কবিতাকে নতুন প্রপঞ্চ দিয়েছে।
এই দেখার ভঙ্গির মধ্যে স্বাধীনতা আছে। তিনি নিজেকে কারও পরিপূরক হিসেবে ভাবেন না। প্রেমের কবিতাতেও তাঁর বক্তা সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ একজন মানুষ। সম্পর্ক আছে, ভালোবাসা আছে, কিন্তু আত্মবিলোপ নেই। এমনকি তাঁর নিঃসঙ্গতাও বিষণ্ণতার সমার্থক নয়। নয় কোনো সামাজিক ব্যর্থতার ফল। বরং মানুষের অস্তিত্বের একটি মৌলিক সত্য। মানুষ শেষ পর্যন্ত একাই। এই সত্যকে তিনি ভয় পাননি। এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেননি। মুখোমুখি হয়েছেন৷
‘দুজনে মিলে একা একা’ কবিতাটি এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিরোনামটিই একটি আপাতবিরোধ। দুজন মানুষ একসঙ্গে আছে, অথচ একা। মানবসম্পর্কের গভীরতম সত্যগুলোর একটি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমরা কারও খুব কাছে যেতে পারি, তার সঙ্গে জীবন কাটাতে পারি, কিন্তু তার সম্পূর্ণ অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারি না। মানুষের ভেতরে সব সময় একটি ব্যক্তিগত অঞ্চল থেকে যায়।
দেবারতি এই সত্যকে দুঃখের বিষয় হিসেবে না দেখে মানুষের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই ধারণা তাঁর কবিতার অনেক সম্পর্ককে অদ্ভুত গভীরতা দিয়েছে।
বাঙলা কবিতায় প্রেম নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত দীর্ঘ একটি ধারা আছে। দেবারতির প্রেম সেই ধারার মধ্যেও আলাদা। তাঁর কবিতায় প্রেম প্রায়ই শরীর থেকে শুরু করে আত্মার দিকে চলে যায়। আবার কখনও আত্মা থেকে শরীরে ফিরে আসে। এই যাওয়া-আসার মধ্যে কোনো নাটকীয়তা নেই। সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটে।
“কালকে তোমার সঙ্গে যখন রাত্রি জেগেছিলাম” –এই পংক্তি পড়লে মনে হয়, তিনি কোনো স্মৃতি লিখছেন। কিন্তু কবিতার ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায়, স্মৃতির চেয়ে অভিজ্ঞতা সেখানে বড় হয়ে উঠেছে। একটি রাতের ঘটনা ধীরে ধীরে সময়ের সীমানা অতিক্রম করছে। ব্যক্তিগত মুহূর্ত বৃহত্তর মানবিক অনুভূতিতে পরিণত হচ্ছে।
আসলে দেবারতি মিত্রের কবিতার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এই রূপান্তরের ক্ষমতা। তিনি ছোট একটি দৃশ্য থেকে বড় একটি অনুভূতির দিকে যেতে পারেন। একটি পাখি, একটি ফুল, একটি বৃষ্টিভেজা দুপুর, একটি জানালা -এ ধরনের আপাত ক্ষুদ্র প্রসঙ্গের ভেতর দিয়ে এমন জায়গায় পৌঁছে যান, যেখানে পাঠক নিজের জীবনকেও নতুনভাবে দেখতে শুরু করে।
তাঁর ভাষা নিয়েও আলাদা করে কথা বলা দরকার। বাঙলা কবিতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি ভাষাকে জটিল করেছেন। কেউ ভেঙেছেন, কেউ নতুনভাবে সাজিয়েছেন, কেউ পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন। দেবারতির ভাষা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু, বাক্য সহজ হলেও অভিজ্ঞতা সহজ নয়। তাঁর ভাষা অবশ্যই মৃদু। কিন্তু তার ভেতরে কঠোরতা আছে। তিনি আবেগকে অতিরঞ্জিত করেন না। নাটকীয় উপসংহার টানেন না। কোথাও পাঠকের করুণা আদায়ের চেষ্টা নেই।
এই সংযম তাঁকে শক্তিশালী করে তুলেছে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সবাই কথা বলছে। চিৎকার করছে। দেবারতি মিত্র এই কোলাহলের বাইরের মানুষ।
তাঁর কবিতার পাঠকসংখ্যা হয়তো কোনোদিন খুব বেশি হবে না। ঠিক জনতার কবি বলতে যা বোঝায়, তা তিনি নন। আবৃত্তির জন্যেও তাঁর কবিতা লেখা হয়নি। এগুলো মূলত একাকী পাঠের কবিতা।
এই কারণেই হয়তো দেবারতি মিত্রকে নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। তাঁর চারপাশে মতাদর্শগত শিবিরও তৈরি হয়নি। কিন্তু বাঙলা কবিতার ভেতরে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত স্থায়ী।
অনেক লেখকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের গুরুত্ব কমে যায়। যে সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে তাঁরা লিখেছিলেন, তা বদলে গেলে তাঁদের রচনাও ক্রমশ ম্লান হতে থাকে। দেবারতি মিত্রের ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি। কারণ তিনি মানুষের এমন কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন, যা সময়ের সঙ্গে বদলায় না।
ভালোবাসা বদলায় না। একাকিত্ব বদলায় না। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা বদলায় না। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত একই থাকে। এই চিরকালীন বিষয়গুলিই তাঁর কবিতার ভিত।
তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়, তিনি পাঠকের জন্য এমন সব দরজা খুলে দেন, যার ওপারে পাঠককে একাই যেতে হয়। একটি ভালো কবিতার কাজও সম্ভবত সেটাই। সমস্ত রহস্য ব্যাখ্যা করে দেওয়া নয়, রহস্যের দিকে ইঙ্গিত করা। দেবারতি মিত্র সেই ইঙ্গিতের শিল্প জানতেন। সম্ভবত এটাই স্থায়ী কবিতার লক্ষণ।
