❑ সাম্য রাইয়ান
বাঙলাদেশে অ্যাকাডেমিক পরিসরে কবিতার অধ্যয়ন অদ্ভুত সংকটে পড়ে আছে; সংকটটি যেমন পাঠকের, তেমনই গবেষকের; যেমন রাষ্ট্রের, তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাঙলা কবিতা নিয়ে ‘অ্যাকাডেমিক’ আলোচনা বলতে আমরা যা বুঝি— যেমন বিশ্ববিদ্যালয়পাঠ্য বিশ্লেষণ, গবেষণাপত্র, পিএইচডি থিসিস, অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেসব বিভাগে বাঙলা কবিতা পড়ানো হয়— সেই পাঠক্রমকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এক গভীর আত্মঘাতী প্রবণতা। এই প্রবণতা একদিকে কবিতাকে গদ্যের মানদণ্ডে বিচার করছে, অন্যদিকে পাঠকের অনুভূতিমূলক সাড়া মুছে দিয়ে কবিতাকে মিউজিয়ামের মরা বস্তুতে পরিণত করছে।
বাঙলাদেশে কবিতার পাঠ্যক্রম নির্ধারণে যে তত্ত্ব ও কাঠামো প্রয়োগ করা হয়, তা মূলত ঔপনিবেশিক যুগে নির্মিত লিটারেরি এনালাইসিসের সূত্র দ্বারা প্রভাবিত। এখনো বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে ‘সামাজিক পটভূমি’, ‘ছন্দ ও অলংকার’, ‘আদর্শবাদ’, কিংবা ‘ঐতিহাসিকতা’— এই চার-পাঁচটি চাবিকাঠি দ্বারা পুরো পাঠ পরিচালিত হয়। ফলে, কবিতার ভাবব্যঞ্জনা, প্রতীকময়তা, ভাষিক বিনির্মাণ, কিংবা রচনাশৈলীর আত্মগত দিকগুলো প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। যেমন ধরুন জীবনানন্দ দাশ— যাঁর কবিতা মূলত এক আত্মঘাতী ভাষাবিন্যাসের রূপ— তাঁকে আজও ‘নির্জনতা’ কিংবা ‘প্রকৃতিপ্রেম’ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। যেন জীবনানন্দের কবিতায় ভাষার অন্বেষা নেই, আছে কেবল নিসর্গচিত্র।
এমন পাঠক্রমে কবিতার আত্মা মরে যায়। পাঠ্যপুস্তকে কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান, আবুল হাসান, আল মাহমুদ পর্যন্ত— সবাইকে নিয়ে একই রকম ছাঁদে আলোচনা হয়। তত্ত্বের নামে পাঠ্যকর্মে ঢুকে পড়ে এক ধরনের ‘মৌখিক-পরীক্ষা উপযোগী ফর্মুলা’— কবিতা নেই, আছে কেবল ‘নির্ধারিত ফর্মুলা মেনে’ কবিতার আলোচনা।
বাঙলাদেশে উচ্চতর শিক্ষা পর্যায়ে বাঙলা কবিতা নিয়ে যে গবেষণা হয়, তার প্রধান সমস্যা হলো এগুলো বেশির ভাগই তথ্যসংগ্রহমাত্র। যেমন: “১৯৬০–৭০ দশকের কবিতায় জাতীয়তাবাদ”, “আধুনিক বাঙলা কবিতায় নারীচিত্র”— এইসব গবেষণায় কবিতার ভাষা, ছন্দ, শৈলী কিংবা নির্জন প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশ্লেষণ প্রায় অনুপস্থিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গবেষণাপত্রগুলো হয়ে ওঠে কেবলই তথ্যের সংকলন; যেখানে কবিদের জন্মতারিখ, কাব্যগ্রন্থের তালিকা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জাতীয়তাবাদ বা স্বাধীনতার অভিঘাতের বিবরণ থাকে— কিন্তু কবিতা থাকে অনুপস্থিত।
সর্বনাশটা ঘটে যখন কবিতার আলোচনাকে নিছক “ডাটাবেস”-এ পরিণত করা হয়। গবেষণা তখন হয়ে পড়ে সাহিত্য-সংগ্রহশালা বা ক্রনিকলস। যেমন শামসুর রাহমানের একটি কবিতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একজন পিএইচডি গবেষক বিশাল রাজনৈতিক পটভূমি আঁকেন, যা আবার চর্বিতচর্বনও বটে; কিন্তু তার কবিতার শব্দবিন্যাস, বাক্যসংগঠন, অলংকারগত ব্যঞ্জনা কিংবা অন্তঃস্থ দ্বন্দ্ব সম্পর্কে সেই তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত আলোচনা করেন। কবিতা তখন কেবল বিষয়বস্তুতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই সংকট অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যা হতো না, কিন্তু এর অভিঘাত গিয়ে পড়ে সাধারণ পাঠকের উপরেও। বাঙলা সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীরা কবিতা পড়েন না, মুখস্থ রাখেন; তারা আলোচনা করেন না, শুধু উদ্ধৃত করেন। বাঙলা বিভাগে কবিতা নিয়ে পাঠচক্র, সমালোচনাগ্রন্থ, নতুন ধারার পাঠ, এমনকি সমকালীন কবিদের আলোচনাও খুব বিরল। ফলে কবিতা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শব হয়ে শুয়ে আছে, একদা প্রাণবন্ত শিল্প যা পাঠকের হৃদয়ের খাঁজে ধরা দিত, এখন সেটি কেবল “ব্যাখ্যাযোগ্য” অথবা “নিরীক্ষাযোগ্য” বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিচ্ছেদ আরও তীব্র হয় যখন দেখা যায়, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা আধুনিক কবিতা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানও রাখেন না। অধিকাংশ বাঙলা বিভাগের শিক্ষক এখনো ভাবেন, কবিতা মানেই কেবল ছন্দ ও অলংকারের গৎবাঁধা আলোচনা। তাঁরা এখনো নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী পড়ান “সাধারণ বোধ্যতা”র নমুনা হিসেবে। অথচ নীরেন্দ্রনাথ নিজেই ভাষার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর কবিতায়। সাহিত্যের পাঠে যদি পাঠক কবির দ্বন্দ্বকে ধরতে না শেখে, তবে সে কেবল ‘উত্তরযোগ্য’ প্রশ্নই মুখস্থ করবে।
বাঙলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কবিতা পাঠ্যপুস্তকও কবিতার অ্যাকাডেমিক বিপদের অন্যতম দায়ী ক্ষেত্র। এখানে কবিতা মূলত নৈতিকতা শেখার হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কবিতা এখানে ভাষার বিপ্লবী সম্ভাবনা নয়, বরং নীতিশিক্ষার মামুলি হাতিয়ার মাত্র।
বাঙলাদেশে এনসিটিবি প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তকে কবিতা নির্বাচনের মানদণ্ড কোনো সাহিত্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং রাষ্ট্র নির্ধারিত জাতীয় পরিচয়ের এক ‘মানুষ বানানো কারখানা’। কবির কণ্ঠস্বর, কবিতার ভাষা, কিংবা আধুনিক সংকেত— এসব বিষয় নিয়ে পাঠ নেই, আছে ‘শিক্ষণীয় বার্তা’, ‘দেশাত্মবোধের স্লোগান’।
এনসিটিবি যে পাঠ্যপুস্তক তৈরি করে, সেখানে কবিতার উপস্থাপনাটি মূলত দ্বিতীয় সারির একটি অবস্থা দখল করে আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সাহিত্যের পাঠ্যসূচিতে গল্প ও প্রবন্ধের তুলনায় কবিতার পরিমাণ অনেক কম।
উদাহরণস্বরূপ, নবম-দশম শ্রেণির “বাংলা সাহিত্য” বইয়ে যেসব কবিতা রাখা হয়েছে তার মধ্যে অধিকাংশই ক্লান্ত ও ক্লিশে ধাঁচের। কাজী নজরুল ইসলাম বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্বাচিত কবিতার পঙক্তিগুলো প্রায়শই রূপক, প্রতীক কিংবা ছন্দের দিক থেকে শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন, অথচ সেই পাঠকে অনুভবযোগ্য করার জন্য কোনো প্রাসঙ্গিক দিকনির্দেশনা বা ভিন্নমুখী পাঠপ্রক্রিয়া নেই।
আবার, এই পাঠ্যপুস্তকে আধুনিক বাঙলা কবিতার প্রতিনিধি হিসেবে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মোহাম্মদ রফিক কিংবা সিকদার আমিনুল হক—এইসব গুরুত্বপূর্ণ নাম কখনো অনুপস্থিত আবার কখনো নামমাত্রভাবে উপস্থিত। ফলে শিক্ষার্থীরা কবিতার বিবর্তন, শৈলীভেদ ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারাবাহিক জ্ঞান লাভ করতে পারে না।
বাঙলাদেশে পাঠ্যপুস্তকের কবিতা নির্বাচন প্রায়শই রাজনৈতিক, আরো স্পষ্ট করে বললে দলীয় উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত। যেমন, ২০১৭ সালে পাঠ্যক্রমে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেখানে বেশ কিছু আধুনিক কবিতা ও গল্প বাদ দিয়ে ইসলামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। কবিতার জায়গায় কিছু নীতিকথামূলক ছড়া, ধর্মীয় মূল্যবোধ-নির্ভর রচনা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পাঠ্যসূচি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যহীন এবং আদর্শিকভাবে সংকুচিত।
বাঙলাদেশের সমাজ যেমন বহুবর্ণিল, তেমনি বাঙলা কবিতাও বহুস্বরতা ও বহুমাত্রিকতার ধারক। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে সেই বহুস্বরতার কোনো প্রতিফলন নেই। গ্রামীণ জীবনের সাদামাটা বর্ণনা অথবা অতীতমুখী দেশপ্রেম—এই দুই ঘরানায় কবিতাকে সীমাবদ্ধ রেখে মূলত একটি ‘নিরাপদ’ পাঠ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রশ্ন ওঠে না, নতুন চিন্তাজগৎ উন্মোচিত হয় না, এমনকি বাঙলাদেশের পরিবর্তিত আর্থসামাজিক রূপরেখাকেও প্রতিফলিত করে না।
ফলে বর্তমান পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের কবিতা সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটি স্বাভাবিক শিক্ষার্থী যখন ‘আমাদের গ্রাম’, ‘বাঙলাদেশ’ কিংবা ‘আমার স্কুল’ টাইপের ছড়ার পুনরাবৃত্তি শুনতে থাকে, তখন তার কাছে কবিতা হয়ে ওঠে শুধুই মুখস্থ করার একটি ক্লান্তিকর কাজ। সে বুঝতেই পারে না কবিতা কেমন করে মানুষের আত্মার কথা বলে, প্রেম বা প্রতিরোধের ভাষা হয়, নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করে বা একটি জাতির স্বপ্নের প্রকাশভঙ্গি হয়ে উঠতে পারে।
দুঃখজনক হলো, শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা সাহিত্যে ভর্তি হওয়ার পরেও আধুনিক কবিতার কোনো উল্লেখযোগ্য নাম জানে না। কারণ তারা স্কুলজীবনে কবিতাকে আবিষ্কারের সুযোগ পায়নি, শুধু মুখস্থ করেছে নিরর্থক পংক্তিমালা। এমনকি বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকদের সাথেও বাঙলা সাহিত্যের কোনো সম্পর্ক তৈরি হয় না৷ এর কারণ, অ্যাকাডেমিক জীবনে সাহিত্য তার জিভে স্বাদ তৈরি করতে পারেনি৷ ফলে সারাজীবন সে থেকে গেছে স্বাদবঞ্চিত৷
শুধু কবিতা নির্বাচন নয়, পাঠ্যপুস্তকে কবিতার বিশ্লেষণ-চর্চাও সীমিত এবং যান্ত্রিক। “কবিতাটির মূলভাব কী?”, “কবি কী বলতে চেয়েছেন?”—এই প্রশ্নগুলো এতই যান্ত্রিক যে শিক্ষার্থীকে ভাবনার সুযোগ দেয় না। তারা শিখে নেয়, একটি নির্দিষ্ট ‘সঠিক উত্তর’ আছে, সেটাই মুখস্থ করতে হবে। কবিতা হয়ে ওঠে ব্যাকরণমূলক পঠনের একটি অবয়ব, যেখানে কল্পনার, প্রশ্নের, অনুভবের কোনো জায়গা নেই।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা সাহিত্যের পাঠকে ‘অ্যাকাডেমিক বোঝা’ হিসেবেই দেখে। কাব্যিক বোধ, শৈল্পিক ভাবনা বা প্রতীকের ব্যঞ্জনা—এসব কিছুই তাদের কাছে অনুপস্থিত থেকে যায়। বুদ্ধদেব বসুর প্রাসঙ্গিক মন্তব্য উদ্ধৃত করা যাক, “কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনে; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো’ যাবে না।”
‘অনুভূতি’ বলে যাকে আমরা চিহ্নিত করলাম, মানুষে মানুষে তার পার্থক্য হয়। কারণ এক একজন মানুষ এক এক রকমভাবে জীবনকে যাপন করেন, এক এক রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন৷ ফলে একই ক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ও অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু অ্যাকাডেমি তা মানতে নারাজ৷
বাঙলাদেশে বর্তমানে যেসব শক্তিশালী কবি সাহিত্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন— যেমন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মজনু শাহ, মাসুদ খান, নাভিল মানদার, আরো অনেক নাম বলা যাবে— এদের নিয়ে অ্যাকাডেমিক আলোচনা বা পাঠ্যসূচিতে কোন আলাপই নেই। কবিতার নামমাত্র সমকালীনতা মানে এখনো শামসুর রাহমানের ১৯৯০ সালের কবিতা। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকেও কবিতায় যে বাঁকবদল ঘটেছে, যে নতুন ধারার কবিদের আগমন ঘটেছে তার উল্লেখ পাঠ্যপুস্তকে নেই৷ শাহেদ শাফায়েত, শোয়েব শাদাব, শামীম কবির কিংবা এরকম আরো বেশ ক’টি নাম উল্লেখ করা যাবে, যা অ্যাকাডেমিক আলোচনায় বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত!
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কিংবা বোর্ড নির্ধারকরা কবিতার বদলের ভাষা সম্পর্কে উদাসীন। অনেক শিক্ষক হয়তো জানেনই না, বাঙলাদেশের কবিতা এখন প্রকৃতি, শরীর, অভিবাসন, কুইয়ার পরিচয়, রাজনৈতিক নিপীড়ন, অথবা ভাষাগত বেদনার নতুন রূপে প্রবেশ করেছে। এই রূপায়ণকে অস্বীকার করে যখন পাঠ্যক্রমে পুরনো কবিতাগুলোকে পুনরাবৃত্তি করা হয়, তখন কবিতা এক ধরনের সাংস্কৃতিক ‘মমিফিকেশন’-এর শিকার হয়। কবিতা তখন আর জীবন্ত শিল্প থাকে না, বরং হয়ে ওঠে মৃত সময়ের প্রত্নতত্ত্ব।
তবে এই আঁধারের ভেতরেও কিছু আলো দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ব্র্যাক, আইইউবিটি, কিংবা ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সাহিত্য পাঠক্রমে শুনেছি কিছু কিছু সমকালীন কবিতা যুক্ত হয়েছে। সেখানে ফেমিনিস্ট পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেও কবিতা পড়ানো হয়, পোস্টকোলোনিয়াল পাঠের আলোকেও ভাবা হয় কবিতার নির্মাণকে। তবে এই উদাহরণগুলো ক্ষীণ, এবং এখনো বৃহত্তর অ্যাকাডেমিক কাঠামোকে পরিবর্তন করার মতো শক্তি অর্জন করেনি।
সাহিত্যের দার্শনিক অভিঘাত ও বাঁকবদল বুঝতে হলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই সাহিত্যের আন্দোলনসমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারনা রাখা উচিৎ৷ কিন্তু আমাদের উন্নাসিক অ্যাকাডেমিগুলো এ বিষয়ে কতটুকু ওয়াকিবহাল? বাঙলাদেশের এতগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো বাংলা বিভাগের মধ্যে দুটিতে মাত্র ‘সাহিত্য-আন্দোলন’ নামক কোর্সের অস্তিত্ব রয়েছে! বিস্ময়কর! কিন্তু সেখানেও নেই পর্যাপ্ত তথ্য ও তত্ত্বের সমাবেশ৷ নেই বাঙলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের আলোচনা, নেই সাহিত্যের দিকবদলের সাহিত্যিকের আলোচনা! পুরো ‘ঝোঁক’টাই কেবল নিরাপদ সাহিত্যের দিকে৷ যে সাহিত্য শুধুই রাষ্ট্র ও তার চালকের পক্ষে কথা বলে নয়তো এড়িয়ে যায়৷ ফলে অ্যাকাডেমিতে যে শিক্ষকরা পড়ান, অতিসামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে এরা জীবনে ‘লিটলম্যাগ’ শব্দটার সাথেও পরিচিত না৷ ফলে এদের হাতে সাহিত্যের আলোচনা বা শিক্ষা দানের কাঙ্ক্ষা কেবলই বানরের হাতে খন্তা প্রবাদটি স্মরণ করায়৷
বাঙলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোও নানামাত্রিকভাবে অ্যাকাডেমির কম সর্বনাশ করেনি৷ দলীয় লবিংয়ে অযোগ্য, অথর্ব লোকজনকে শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদগুলোতে নিয়োগ, অ্যাকাডেমিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এর মধ্য দিয়ে এবং ইতিহাসে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে ইতিহাস বিকৃত করার মতো জঘন্য কাজও একাধিকবার দেখা গেছে৷ এই ধরনের সর্বনাশের মুখোমুখি শুধু ইতিহাস বিভাগকেই নয়, বাঙলা সাহিত্য বিভাগকেও হতে হয়েছে, এমনকি এখনো হচ্ছে৷ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন তার দলীয় লেখকদের লেখা সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে মানহীন নিম্নমানের সাহিত্যকর্ম পাঠ্যতালিকায় যুক্ত করা হয়েছে৷ এই কথা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এরশাদ… সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ এমনকি চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরপরই আমরা দেখেছি তড়িঘড়ি করে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের ধুম পড়ে গেছে! উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দক্ষিণপন্থী লেখকদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে৷ এই সকল কর্মকাণ্ডে বাঙলাদেশের অ্যাকাডেমি বিপর্যস্ত৷ ক্ষমতাবলে অযোগ্য-অথর্ব লোকেদের ভিসি, অধ্যক্ষ, শিক্ষক এরকম নানা পদে বসানোর যে সংস্কৃতি বহুবছর ধরে চলমান, অভ্যুত্থানের পর তা বরং বৃদ্ধি পেয়েছে! এইরূপে অ্যাকাডেমি যোগ্য ব্যক্তিকে যথাস্থানে পায় না, ফলে সে ক্ষতির ভার বহন করতে হয় ছাত্রদের৷
এর ফলে বর্তমানে কবিতা বিষয়ক আগ্রহ অ্যাকাডেমির কল্যানে যতটা না জন্ম নিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জন্ম নিচ্ছে ইউটিউব, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে ভিডিও রিল, আবৃত্তি কিংবা মাইক্রোপোয়েট্রির মাধ্যমে। আমি অনেককে দেখেছি, অনলাইনে কোনো কবিতার পংক্তি বা অনুচ্ছেদ পাঠ করে সেই কবি সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছে৷ কিন্তু এখানেও সমস্যা—এই আগ্রহ একটি ঝলমলে আবেগময়তা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, কারণ শিক্ষার্থীর মধ্যে কবিতার কাঠামো, ব্যঞ্জনা, ধ্বনি কিংবা প্রতীকের গভীর উপলব্ধি তৈরিই হয়নি।
তারা কেবল ‘মন ভালো করার লাইন’ খোঁজে। কারণ পাঠ্যপুস্তক তাদের এমন এক নিরুত্তাপ, বর্ণহীন কবিতা চিনিয়েছে যার কোনো আবেগ নেই, প্রতিবাদ নেই, স্বপ্ন নেই। এইভাবে পাঠ্যপুস্তক এক বিস্মৃত প্রজন্ম গড়ে তুলছে, যারা কবিতার নাম জানে, কিন্তু তা অনুভব করার শক্তি আর তাদের অন্তরে নেই।
বাঙলাদেশে যত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগ আছে এগুলো বেসিক্যালি অথর্ব প্রতিষ্ঠান; কিন্তু তারা যদি ঠিকমতো পারফর্ম করতো, অর্থাৎ নিজ দায়িত্বটুকু পালন করতো, তাহলে সমাজে জীবন্ত কবি-সাহিত্যিকের সাথে ছাত্রদের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হতো, সমাজে তাদের মূল্যায়ন ও পারস্পরিক আদান-প্রদান ঘটতো, যার প্রভাব সমাজে দৃশ্যমান হতো৷ এর ফলে দেখা যেত দেশে এমন কোনো আলোচনাযোগ্য কবি বাকি থাকতেন না যাকে নিয়ে অ্যাকাডেমি অন্তত পাঁচটা প্রবন্ধ-থিসিস তৈরি করেনি৷ কিন্তু এই অথর্ব প্রতিষ্ঠানগুলো ও তার শিক্ষক নামক চাকুরীজীবীগুলো অন্য পেশাজীবীর মতোই স্রেফ চাকুরী বাঁচানো আর নানা দুর্নীতি করে অবৈধ পয়সা কামানোর ধান্দায় মত্ত!
বাঙলাদেশে কবিতার অ্যাকাডেমিক বিপদ কাটাতে হলে প্রথমত প্রয়োজন, পাঠ্যক্রমে ভাষাবিন্যাস ও পাঠভিত্তিক মডেল অন্তর্ভুক্ত করা। কবিতার বিশ্লেষণ হওয়া উচিত তার অন্তর্গত নির্মাণ পদ্ধতি, শব্দ ও প্রতীকের সম্ভাব্য পাঠভেদ ও পাঠপ্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে।
দ্বিতীয়ত, গবেষণা করতে হবে কবিতার ভেতর ঢুকে, তার ছন্দ, ভাষা, প্রতীক, নীরবতা— সবকিছুর সমন্বয়ে। তথ্যসংগ্রহের বাইরে গিয়ে কবিতা-নির্ভর বিশ্লেষণ আমাদের একমাত্র রক্ষা।
তৃতীয়ত, পাঠ্যপুস্তকে সাহিত্যের নাম করে কেবল উপদেশ বা বার্তা ঠেসে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। কবিতা হলো পাঠকের একাকিত্বের অনুরণন, যা কেবল রাষ্ট্রীয় বার্তা নয়, আত্মিক জিজ্ঞাসাও বটে।
চতুর্থত, আধুনিক কবিতা ও সমকালীন কবিদের জায়গা করে দিতে হবে অ্যাকাডেমিক পাঠে। সাহিত্যের পাঠ হতে হবে জীবনের পাঠ, নিছক চরিত্র বা বিষয় নয়।
বাঙলা কবিতা যদি কোনোদিন বেঁচে থাকে, তবে সেটি অ্যাকাডেমির রেফারেন্স-ভিত্তিক গবেষণায় নয়, বরং সেই পাঠকের হৃদয়ে, যে এখনও কবিতায় নিজেকে খোঁজে। কিন্তু অ্যাকাডেমি যদি এই পাঠককে তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে কবিতা একদিন কেবল মিউজিয়ামে টিকে থাকবে— মরা ভাষায়, মরা কাগজে, মৃত পাঠকের অপেক্ষায়।
বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে কবিতার অ্যাকাডেমিক বিপদ মানে কেবল পাঠক্রমের ত্রুটি নয়, বরং একটি বৃহৎ সাহিত্য-সংস্কৃতির আত্মপরিচয় সংকট। এই সংকট কাটাতে হলে চাই নতুন পাঠ-রাজনীতি, মুক্ত পাঠচর্চা, এবং সেইসঙ্গে এমন গবেষক ও শিক্ষক, যাঁরা কবিতার প্রেমে পড়েছেন— কেবল চাকরির প্রশ্নে নয়, নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে।