আত্মার গোপন রাষ্ট্র

❑ সাম্য রাইয়ান 

কবিতায় করুণার সুক্ষ্ম আবরণ নিয়েও আবুল হাসান এক তীব্র আত্মবিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। অনেকেই তাঁকে ‘আধুনিকতা’র বিষণ্ণ বংশধর বলে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতা একটানা নির্জন নয়, বরং সেখানে পিছুটান, পরাজয়, প্রেম, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও রূপক-সংকেতের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় এক ধরনের অন্তর্গত মহাকাব্য। এ মহাকাব্যে আবুল হাসান নিজের আত্মাকে খণ্ডিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখেন—নগ্ন, ঋজু, অথচ অতল স্পর্শে নরম।

‘আবুল হাসান’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। যা তাঁর কাব্যিক আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি—
“এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্নাভেজা চোখ?”
(আবুল হাসান)

এই প্রশ্নাবলী শুধু নাম বা সত্তা নয়, বরং একপ্রকার আত্ম-অনুসন্ধানের অন্তর্গত সংগীত। এখানে কবি নিজেই নিজের অস্তিত্বকে নিরীক্ষণ করছেন বহুবিধ রূপকে: পাথর, নদী, কান্নাভেজা চোখ, ছয়টি তারা। একজন কবির ‘নাম’ কখনো কেবল উচ্চারণ নয়—তা হয়ে ওঠে তার চেতনাসত্তা, তার কাব্যিক ঐতিহ্য ও আত্ম-সংগ্রামের প্রতীক।

এই আত্মসন্ধানের দুঃখ-গাঁথা এক অনন্য উদাহরণ তাঁর কবিতা “পাখি হয়ে যায় প্রাণ”, যেখানে স্মৃতি শুধু নয়, বরং একটি পুরাকালের জনপদের বিলুপ্তির সাক্ষী হয়ে ওঠে কণ্ঠস্বর:
“দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি”
(পাখি হয়ে যায় প্রাণ)

আবুল হাসান আত্মজৈবনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কাব্যিক প্রহেলিকায় পরিণত করেন। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে ওঠে এক জাতির স্মৃতি, এক প্রজন্মের দুঃখবোধ, যার কোনো নিদান নেই, কেবল চিহ্ন থাকে। “উচ্চারণগুলি শোকের” কবিতায় দেখি, তিনি প্রশ্ন করেন:
“তবে কি আমার ভাই আজ ঐ স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদিতে উৎসব?”
(উচ্চারণগুলি শোকের)

পতাকা কিংবা উৎসব হয়ে ওঠে অবিশ্বাস্য এক পরাবাস্তব। এই হারিয়ে যাওয়া একান্ত ব্যক্তিগত নয়— রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের চিরন্তন অদৃশ্য গহ্বর।

আবুল হাসানের কবিতায় প্রতীক ব্যবহারে অনন্যতা লক্ষ্য করা যায় “স্রোতে রাজহাঁস আসছে” কবিতায়, যেখানে রাজহাঁস কেবল একটি পাখি নয়, বরং প্রতীকী হয়ে ওঠে প্রেম, স্মৃতি ও রাষ্ট্রচর্চার। তিনি বলেন—
“আমাদের নৌকার জলে ভাসতে ভাসতে যেন প্রতীকের হাঁস
ঐ রাজহাঁস
জল থেকে আরো জলে,
ঢেউ থেকে আরো ঢেউয়ে ছড়াতে ছড়াতে
পৌঁছে যাব আগে।”
(স্রোতে রাজহাঁস আসছে)

এই যাত্রা আক্ষরিক নয়— অভ্যন্তরীণ অভিযাত্রা। আবুল হাসানের ভাষা আমাদের টেনে নিয়ে যায় আত্মপরিচয়ের গভীরে, যেখানে আমরা উপলব্ধি করি, সময় ও সমাজের ছায়ায় একজন কবি কীভাবে নৌকা, ঢেউ, রাজহাঁসের মতো ছায়াপ্রতিম উপমায় নিজেকে ধারণ করেন।

কিন্তু শুধু নিঃসঙ্গতা বা ব্যক্তিপরিচয়ের সংকট নয়—আবুল হাসান বাঙলা কবিতায় প্রবেশ ঘটিয়েছেন চাষাবাদের অন্যতর চেতনা, এক মহাকাব্যিক শ্রম ও প্রত্যয়ের রূপ। “কালো কৃষকের গান” কবিতায় তিনি লেখেন—
“দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদি রাখব না আর আমার ভেতর!”
(কালো কৃষকের গান)

দুঃখও এক কৃষিজমি, যেখানে কবি ধানের বদলে চাষ করেন অনুভবের শস্য, প্রজন্মের প্রতীকী যন্ত্রণা। তিনি কৃষকের চোখে কবিতার ভূমিকে দেখেন, যেখানে
“ও জল, ও বৃক্ষ, ও রক্তপাত, রাজনীতি ও নিভৃতি, হরিৎ নিভৃতি
পুনর্বার আমাকে হোমার করো”
(কালো কৃষকের গান)

এই হোমার-উল্লেখ কেবলমাত্র ধ্রুপদী রেফারেন্স নয়—এটি একান্তভাবে রাজনৈতিক। একাধারে গ্রিসের নারীর কামুকতা, অন্যদিকে বাঙলাদেশের দুঃখ, সবই এই কাব্যে একসঙ্গে মিশে যায়—যেমন প্রকৃতি ও শহর, স্মৃতি ও তমোহর।

তাঁর কবিতায় নারীচরিত্র ও কামনাবোধও একধরনের আবেগবিকর্ষের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। “পরাজিত পদাবলি” কবিতায় প্রেম ও রতির দহন ঘনিয়ে আসে বিচ্ছেদের রূপকে:
“তোমার কাছে গিয়েছিলাম রাতে নদীর ঢেউ
তোমায় আমি পরিয়েছিলাম অঙ্গুরীয় মেয়ে”
(পরাজিত পদাবলি)

এই ধরনের প্রেম—যেখানে কামনা ও করুণা একাকার, যেখানে রাজনীতি ও প্রেম মিলেমিশে তীব্র নরকবোধ তৈরি করে—এটাই আবুল হাসানের কবিতার প্রকৃত সুর। এমনকি “নিঃসঙ্গতা” কবিতায়, যেখানে একটি মেয়েশিশুর সহজ আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যায় চাঞ্চল্যের ভিড়ে, সেখানে আবুল হাসান লিখে যান—
“একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!”
(নিঃসঙ্গতা)

এখানে পুরুষ বলার মধ্যে আছে এক অভ্যন্তরীণ ভাষা ও গ্রহণযোগ্যতা খোঁজার আকুতি, যা এই কবির পুরো সাহিত্যকর্মের এক অপরিহার্য স্বর।

তবে আবুল হাসান কেবল শোকবহ কবি নন—তিনি আত্মিক প্রেমের পরিপ্রেক্ষিতে এক বৈচিত্র্য রচনা করেন “তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না” কবিতায়, যেখানে স্পিরিচুয়াল সংকেত এক আশ্চর্য মোহনায় মিলিত হয়। তিনি বলেন—
“আমি কাছে যাব আমি তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না!”
(তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না)

এখানে ‘কালিমা’ তার অভিজ্ঞান হারায় না, কিন্তু তার ব্যঞ্জনা নতুন অর্থে উচ্চারিত হয়। শরীর ও আত্মার সম্পর্ক এক গভীর রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে দাঁড় করিয়ে দেন কবি।

তাঁর “নর্তকী ও মুদ্রাসঙ্কট” কবিতাটি নারীর ভোগ্য-অবস্থানকে কাঁপিয়ে তোলে।
“তুমি তো নও আম্রপালী, বর্তমানের নারী
তোমার লাগে লিনোলিয়াম সিফনঘেরা শাড়ি
তোমার লাগে সাত প্রেমিকের সুলভ করতালি,
বাগান তুমি, যুবারা যেন তোমার কেনা মালি।”
(নর্তকী ও মুদ্রাসঙ্কট)

এখানে রাষ্ট্র ও পুরুষতন্ত্রের চোখে নারী যেভাবে রূপান্তরিত হয়, আবুল হাসান সেভাবে তাদের মুখোশ খুলে দেখান, অথচ একপ্রকার করুণ রূপে।

সবশেষে, আমার অত্যন্ত প্রিয় এক কবিতা তাঁর “জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন”-এর কথা উল্লেখ করি—
“মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা”
(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন)

এত সরাসরি, এত উচ্চকণ্ঠ আত্মস্বীকারোক্তি বাঙলা কবিতায় দুর্লভ। আবুল হাসানের কণ্ঠ এখানে ব্যক্তিগত নয়, এক প্রত্যাখ্যাত রাষ্ট্রের কবি, এক নিঃসঙ্গ বোধিবৃক্ষের আত্মপরিচয়।

আবুল হাসান মারা যান মাত্র ২৮ বছর বয়সে। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনি বাঙলা কবিতায় রেখে যান এমনসব স্তব্ধ ও দীপ্ত প্রতীক, যা এখনো আমাদের কণ্ঠে ফিরে ফিরে আসে। তাঁর কবিতা নিঃসঙ্গ, কিন্তু নিজের মতো করে এক শুদ্ধ পথের খোঁজে অদম্য।

তিনি ছিলেন সেই কবি, যিনি বলেছিলেন—
“আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে”
এ প্রশ্নই হয়তো আজও বাঙলা কবিতার ভিতরে গুঞ্জরিত হচ্ছে—একজন আবুল হাসান হয়ে।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *