চুপ করে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর

❑ সাম্য রাইয়ান 

মানুষের নিয়ম
সমুদ্র গুপ্ত

স্বাধীনতা জিনিসটা অন্যরকম
একেক পরিপ্রেক্ষিতে একেক বিষয়কেন্দ্রে 
একেক পরিস্থিতিতে একেক চাহিদাক্ষেত্রে 
স্বাধীনতার একেক চেহারা

আজ যা তোমার স্বাধীনতা 
একই সাথে অন্যের ক্ষেত্রে বিপরীত 
আবার 
সহসাই এটির চিত্র ও ভঙ্গি পাল্টে যায়

একজন কবি কী ফর্মে সময়কে ধারণ করেন? না, ফ্রেমে আটকে রাখা যায় না উত্তরটা। তার কবিতার ভাষা, ছন্দ, ছায়া, প্রতিসরণ, দ্ব্যর্থকতা— সবকিছু মিলিয়েই যে এক অনিবার্য প্রতিবাদ রচনা করে, সেটিই হয়ে ওঠে কবির কাল-নিরীক্ষা। সমুদ্র গুপ্ত সেই অর্থে বাঙলাদেশের কবিতার জটিলতম নামগুলোর একটি। অরণ্যপ্রিয়, জনপদসন্ধানী, উচ্চারণে গর্বিত অথচ নিঃশব্দে ক্লান্ত; সমুদ্র গুপ্তের কবিতা এক অতল শব্দ-খনন। সেখানে আছে নরম, স্নিগ্ধ প্রেম; আবার হিংস্র সময়ের রক্তাক্ত দলিল, কখনো চিত্ররূপময়।

১৯৪৬ সালে জন্ম, ষাটের দশকের শেষভাগে কাব্যজগতে প্রবেশ। যে সময় বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বামপন্থা ও বিপ্লবী চেতনা তুঙ্গে, সেই সময়েই তাঁর লেখার শুরু। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব তাঁর কবিতায় গভীরভাবে অনুরণিত। কিন্তু তিনি শুধুই রাজনৈতিক কবি নন। বরং তিনি সময়ের উপর দাঁড়িয়ে সেই সময়কেই প্রশ্ন করতে পারেন, যেমন তিনি প্রশ্ন করেছেন ‘মানুষের নিয়ম’ কবিতায়— স্বাধীনতা আসলে কী? এটি কি পরম মান? নাকি আপেক্ষিক এক কৌশল?

সমুদ্র গুপ্তের কবিতায় প্রায়ই ধরা পড়ে ভাষার নিজস্ব উন্মোচন। শব্দ এখানে অর্থের অতিরিক্ত কিছু বহন করে— তারা রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং অস্তিত্বমুখী। কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে পরিহাস, কখনো চূড়ান্ত নির্লিপ্তি, কখনো রক্তাক্ত সংলাপ। “কোনো কোনো সময় কবিতা লিখি না; কবিতায় আমি বাস্তবতা লিখি”— এই কথাটি যেন তাঁর নিজের কবিতা নিয়ে নিজের স্বীকারোক্তি।

তাঁর কবিতার একাধিক থিম— আধিপত্য, শাসনব্যবস্থা, প্রতিরোধ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, দ্বিধা— বারবার ঘুরে ফিরে আসে বিভিন্ন রূপে। কিন্তু একটি বিষয় আসে আরও ঘনঘন—মানুষ। সেই মানুষ, যে কখনো রাষ্ট্রের প্রক্সি, কখনো প্রেমিক, কখনো বিদ্রোহী, আবার কখনো নির্বাক ভিখিরি। এই বিচিত্র মানুষের নিয়তিকে সামনে এনে তিনি প্রশ্ন রাখেন সময়ের কাছে। “মানুষের নিয়ম” এই ধারাবাহিকতার এক সংহত প্রকাশ।

স্বাধীনতা নামের শব্দটা কেবলই গর্বময় নয়, বরং ভয়ংকরও। এই শব্দ দিয়ে রচনা করা যায় ইশতেহার, আবার এই শব্দ দিয়েই ধামাচাপা দেয়া যায় যুদ্ধাপরাধ। অনেকটা টর্চলাইটের মতো— যেদিকে তাকাও, অন্য দিক অন্ধকার হয়ে যায়। কবি সমুদ্র গুপ্ত সেই অন্ধকারই আমাদের সামনে টেনে আনেন, অতলস্বরে বলেন—
“স্বাধীনতা জিনিসটা অন্যরকম।”

অন্যরকম মানে কী? বিপরীত? বিকল্প? নাকি বিদ্রোহ? এভাবে প্রশ্ন করতে করতে পাঠক বুঝতে পারে, কবিতার শুরুতেই যেন ঘোষণা করে দেয়া হলো— যে সংজ্ঞা আমরা জানি, কবি তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমাদের যাপিত সময়ে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি ঘন ঘন ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপনে, করপোরেট ব্র্যান্ডিংয়ে, বা ভুয়া বিপ্লবের ব্যানারে। ফলে সমুদ্র গুপ্তের কবিতা হয়ে উঠেছে এক প্রকার প্রতিবাদী আবেগ-নির্মাণ, এক ধরণের contra-poetry— যা পাঠককে নাড়িয়ে দেয় অভ্যন্তরীণ দ্বিধায়।

এই কবিতা পড়ার পর পাঠক দ্বিধায় পড়েন— আমি কি আসলে স্বাধীন? আমার যে স্বাধীনতা, সেটি কি কারও দাসত্বের বিনিময়ে? কবিতা তখন আর ভাষার খেলা নয়; হয়ে ওঠে এক গভীর দার্শনিক অবয়ব।

সমুদ্র গুপ্ত আমাদের মতো করে প্রেম করেননি, রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করেননি; এমনকি কবিতাও লেখেননি আমাদের মতো করে। তাঁর কবিতার ভাষা অনেকটা ঠান্ডা ছুরির মতো— রক্তপাতের পূর্বাভাস দেয়, কিন্তু চিৎকার করে না।
ঠিক যেমন “মানুষের নিয়ম” কবিতায়:
“একেক পরিবেশে একেক বিষয়কেন্দ্রে
একেক পরিস্থিতিতে একেক চাহিদাক্ষেত্রে
স্বাধীনতার একেক চেহারা”

এই বাক্য তিনটি যেন এক দ্রোহী লিফলেট। আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে সবকিছুর ‘নির্দিষ্ট-নির্ধারিত’ সংজ্ঞা আছে। স্বাধীনতারও খুব পরিষ্কার একটা সংজ্ঞা আছে পাঠ্যবইয়ে, রাষ্ট্রে, সমাজে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীনতা কোনো স্থির, সর্বজনীন ধারণা নয়। তা আপেক্ষিক, প্রেক্ষিতনির্ভর, ক্ষেত্রনির্ভর। শোষণ ও মুক্তির অভিঘাতে এর অর্থ বদলায়, যেমন মঞ্চের আলোর তীব্রতায় বদলায় মুখের অভিব্যক্তি। ‘মানুষের নিয়ম’ আমাদের এই সত্যের মুখে দাঁড় করায়৷

এমন কথা শোনার পর পাঠক যদি হকচকিয়ে যান, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা অভ্যস্ত সেইসব স্বাধীনতায়, যেখানে একজন ফেসবুকে যা খুশি লেখে আর ভাবে, “আমি কতো স্বাধীন!” অথচ সে বোঝে না, সে যেটা বলার অনুমতি পাচ্ছে— সেটাই আসল কারসাজি। অনুমতির স্বাধীনতা, নিঃশর্তের নয়। দৃশ্যমান স্বাধীনতার আড়ালে সে কতখানি পরাধীনতার শেকলবন্দি৷ সে এক বিরাট আলোচনা, শুধু একচিমটি নোকতা দিয়ে যাই, যেকারনে আইডির রিচ কমে যায়, যে কারনে আইডি ‘রেস্ট্রিকটেড’ হয়ে যায়৷

এটাই তো মানুষের নিয়ম—‘স্বাধীনতা’ যখন শাসকের ছায়ায় জন্ম নেয়, তখন সে নিজেই এক যন্ত্র হয়ে দাঁড়ায় অপরকে দমনের। এ কবিতা সেই যন্ত্রের মুখোশ খুলে দেখায়:
“আজ যা তোমার স্বাধীনতা
একই সাথে অন্যের ক্ষেত্রে বিপরীত৷”

কী অসহ্য একটা লাইন! তোমার অধিকার মানে অপরের দাসত্ব। তোমার চুমু মানে অপরের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া। তোমার ভাত মানে অপরের অনাহার। তোমার পতাকা মানে অপরের ভূগোল হারানো। এই যে একান্ত ব্যক্তিগত জয়, সেটা অন্য কাউকে হারিয়েই অর্জিত হয়। কবি বুঝতে পারছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাধীনতা ব্যক্তিস্বার্থের একটি প্রকরণ, যার চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে নিপীড়নের আকারে।

এই বিশ্লেষণ বিশ শতকের রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চারও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ইতালীয় চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি বলেছিলেন, “যে ক্ষমতা নিজেকে সর্বজনীন বলে দাবি করে, তার মধ্যেই নিহিত থাকে একান্ত ব্যক্তিগত আধিপত্য।” সমুদ্র গুপ্তও যেন কবিতায় সেই দর্শনের ছায়ায় এসে দাঁড়ান।

এ কবিতা পাঠ্যবইয়ের মুখস্ত স্বাধীনতা শেখায় না, বরং শেখায় স্বাধীনতাকে সন্দেহ করার মধ্য দিয়ে পরাধীনতা চিহ্নিত করতে।

এই সন্দেহটাই কবির বিশ্বাস। কবিরা তখনও কথা বলেন যখন বাকিরা চুপ থাকে। আর সমুদ্র গুপ্ত তেমন কবি, যিনি চুপ করে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর। তার কবিতা ধাক্কা দেয়— নিঃশব্দে। না, এখানে কোনও মহাকাব্যিক উচ্চারণ নেই, কোনও বিপ্লবের মোড়ক নেই। কিন্তু এই লাইনগুলো গুপ্তক্ষরণ ঘটায়—
“সহসাই এটির চিত্র ও ভঙ্গি পাল্টে যায়৷”

শুধু মানে বদলায় না, রং বদলায়, ভঙ্গিমা বদলায়। স্বাধীনতা একবার শীতল, একবার উন্মত্ত। একবার ডানপন্থী, একবার বাম। একবার ব্যানার, একবার ব্যারিকেড। একবার কবি, একবার সেনাপতি।

এমন কবিতা লেখা মানে রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ানো। কারণ রাষ্ট্র চায় বিশ্বাস, আর কবি চায় প্রশ্ন। রাষ্ট্র চায় সারিবদ্ধ উত্তরের ফর্মুলা, আর কবি লেখেন ছেঁড়া কাগজে, হঠাৎ ছিঁড়ে ফেলা প্রেমপত্রের মতো করে।

“মানুষের নিয়ম” কবিতাটি সেই আয়না, যেখানে মুখ নয়, দেখা যায় কেবল গলার দড়ি, কিংবা পায়ের বেড়ি। 
এই কবিতা কোনো আশ্বাস দেয় না, বরং পাঠকের স্নায়ুতে অস্পষ্ট সংকেত পাঠায়।
এমনভাবে, যেন মানুষ বলতে আমরা যা বুঝি, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একধরনের ট্র্যাজিক কার্টুন— যে স্বাধীনতা চায়, অথচ স্বাধীনতা কী তা-ই বোঝে না।

কবি এখানে রাজনীতি লেখেন না, বরং রাজনীতির ইথার ধরেন।
‘মানুষের নিয়ম’ কবিতাটি এ সমাজের মেডিকেল রিপোর্ট— যার প্রতি পংক্তিতে লেখা আছে সময়ের অসুখ, সমাজের বিকৃতি, আমাদের ভালোবাসার পচন। 

সমুদ্র গুপ্ত এমন কবি, যিনি শব্দ দিয়ে আঘাত করেন না— বরং শব্দের অনুপস্থিতি দিয়েই আঘাত করেন। তাঁর কবিতা পড়ে বোঝা যায়, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র ‘না-বলা বাক্য’।

এই কবিতা আমাদের সেই না বলা বাক্যগুলোর দিকে ঠেলে দেয়। যেখানে স্বাধীনতার ভাষা নেই, আছে শুধু অস্বস্তি। একধরনের গোপন আতঙ্ক— যা পাঠককে বলে, “মানুষের নিয়ম” নামের নিয়মগুলো আসলে নিয়ম নয়, সেগুলো মুখোশ। তাদের ভেতরে লুকিয়ে আছে চিৎকার, নিঃস্বতা, ব্যর্থতার দীর্ঘ ক্যানভাস।

এই কবিতা কোনো গাইডলাইন দেয় না, দেয় না পরিত্রাণও। শুধু প্রশ্ন তোলে। আর সেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে পাঠক বুঝে যায়—তার যে স্বাধীনতা দৃশ্যমান, হয়তো সেটাই তার সবচেয়ে বড় শৃঙ্খল। হয়তোবা৷

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *