সাম্য রাইয়ানের পুস্তিকাসংগ্রহ: আনিফ রুবেদের পাঠপ্রতিক্রিয়া

❑ আনিফ রুবেদ

ধারণা করছি, এই পুস্তিকাসংগ্রহ পাঠের মাধ্যমে সাম্য রাইয়ানের এখন পর্যন্ত লিখিত লেখার অধিকাংশ পাঠ করা গেল। এবং বেশ আনন্দ নিয়েই পাঠ করতে পেরেছি। 

এটি পাঁচটি পুস্তিকার একটি সংকলন। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যে পুস্তিকাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলো এখানে আছে। এই সংকলনের মাধ্যমে সাম্যের সাহিত্যচর্চার অঙ্কুর থেকে বর্তমান পর্যন্ত যে বিকাশ তার একটা স্বচ্ছ রূপ বা রূপরেখা আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে।

যে মানুষ সাহিত্য লিখবেন তাকে যদি আমরা একটা গোলক ধরি তাহলে সেই গোলকের ভেতর থাকে সাহিত্য সৃষ্টি করার একটা শক্তিশালী বাসনা এবং প্রতিভা। এই বাসনা এবং প্রতিভা চাপ তৈরি করে ফলে গোলক বিস্ফোরিত হয় এবং লেখক প্রকাশিত হন। এর মধ্যে থাকে আনন্দ, থাকে বেদনা, থাকে নিজের সাথে নিজের নতুন করে পরিচয় হওয়ার বিস্ময়। সংকলিত প্রথম পুস্তিকার নাম সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট। এটিতে সাম্য রাইয়ানের নিজেকে প্রথম প্রকাশের যে বিস্ফোরণ তার ছাপ রয়েছে স্পষ্ট এবং পাঠক প্রকৃত অর্থেই একটি শক্তিশালী অনুভূতির সাথে নিজের অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটাতে পারে যা আনন্দদায়ক। এটিকে প্রবন্ধ বলা যায় না, কবিতা বলা যায় না, গল্পও বলা যায় না। তবুও সবেরই অনুভব যেন মাখা আছে এখানে। ফলে, সাম্য লেখার শেষে যে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন তার উত্তর --- সাম্য রাইয়ান।

বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা দ্বিতীয় পুস্তিকা। এ পুস্তিকার কলেবর খুব ছোটো নয় এবং এগুলো কবিতা। এখান থেকেই সাম্যের সমগ্র মানুষকে নিয়ে চিন্তার জায়গাটা পরিচ্ছন্নভাবে খুলে গেছে। মানুষের স্বরূপ কিরূপ তার ছবি এগুলোতে রয়েছে বিভিন্নভাবে।
আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।
মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন
চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন।
[মেশিন]

আকাশে মেঘ নেই, তবু
পৃথিবী জুড়ে অন্ধকার 
নিবিড় অন্ধকার!
[অন্ধকাল]

তৃতীয় পুস্তিকা হলো মার্কস যদি জানতেন। এই পুস্তিকা জগতের সকল রাষ্ট্র, রাষ্ট্রব্যবস্থা, শাসন এবং এর ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলে। কখনো স্পষ্টভাবে কখনো শুধু ইঙ্গিতে। এসব ইঙ্গিতও স্পষ্ট। এখানে স্পষ্টতা এবং ইঙ্গিতের পার্থক্য অনেকটা পূর্ণ রঙকরা চিত্র আর রেখাচিত্রের(স্কেচ) পার্থক্যের মতো শুধু। পুস্তিকার প্রথম কবিতা ‘বাঘ’ অসাধারণ। প্রকাশ ধরনটা রেখাচিত্র যেমনভাবে বক্তব্য পেশ করে তেমনই।

হলুদ পাহাড় চতুর্থ পুস্তিকা। এখানে এসে সাম্য রাইয়ান শিল্পীতার দিকে আরও বেশি ঝুঁকেছেন; দর্শন এবং শিল্পের পুষ্টি বৃদ্ধি পেয়েছে দারুণভাবে; বোধের বাগান বিস্তৃত হয়েছে; প্রথম বিস্ফোরণের সেই শব্দ আর নেই এখান থেকে। সুচারু রূপ, সুকারু রূপ অর্জন করেছে তার কবিতারা। ‘জবাগাছ’ একটি চমৎকার কবিতা। তার প্রথম বাক্য এমন—
মধ্যরাতের ঝি-ঝি আসলে রাত্রির নিজস্ব আসবাব।
ঝিঝি যে রাতের আসবাব এই ভাবনাটা মুগ্ধ করে খুব।

শেষ বা পঞ্চম পুস্তিকা নিজের শবের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলি।
এখানে কবিতার শিরোনাম নেই। সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত। পুরো কবিতায় যেন শিরোনাম। ঋজুতা, স্পষ্টতা, তীক্ষ্ণতা এবং শৈল্পিক সুক্ষ্মতা কবিতাগুলোকে চমৎকার করে তুলেছে। এগুলোর বীক্ষণতা এবং প্রেক্ষাপট আরও গভীর; চিন্তাযোগ্য এবং উপভোগ্য। 

সাম্য রাইয়ানের কবিতার স্বাদ আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে যাক এই কামনা করি। 

ভালোবাসা কবি সাম্য রাইয়ান।