মূল্যায়ন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মূল্যায়ন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সাম্য রাইয়ানের কবিতার বই হলুদ পাহাড়
❑ দীপ শেখর চক্রবর্তী

সেই কবিতার প্রতি আমার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব আছে যার ভাষা নিজস্ব একটি পথ তৈরি করতে পেরেছে। ভাল কবিতার তিনটি স্তম্ভ বলতে বুঝি- নিজস্ব কাব্যভাষা, ব্যক্তিগত বিপন্নতার ‘না-উল্লম্ফন’ প্রকাশ এবং অতি অবশ্যই দেখার ক্ষমতা। বিশ্বাস করি, কবি যতটা দেখতে পান, তা ‘না-কবির’ দেখার থেকে অনেক বেশি। এই দেখা ভূগোলের নয়। সামান্যের মধ্যে অসামান্য দেখার ক্ষমতা। এই অসামান্য বলে যা লিখলাম তা আসলে, জীবনবোধ এবং দর্শন। অনেক অলংকার পরা অথচ মনের দিক থেকে রিক্ত কবিতা ক্লান্ত করে। সাম্য রাইয়ানের ‘হলুদ পাহাড়’ বইটির মলাটের পেছনে লেখা আছে, ‘নিরীক্ষাপ্রবণ কবি’। নিরীক্ষা (বিশেষ্য) শব্দের মানে পর্যালোচনা অথবা পরীক্ষা। অর্থাৎ শুধুমাত্র দেখা নয়। দেখার পর, তার বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণ কবির মনের (আত্মার?) ভেতর। কে বিশ্লেষণ করেন? কবির মন, যুক্তিবোধ, অভিজ্ঞতা। দৃশ্য এমনভাবে নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গিয়ে কবিতার প্রাথমিক আকারের কাছাকাছি যেতে পারে। বলা যায়, কবির মনে এই ‘নিরীক্ষা’ বারবার চলে। অনেকবার পর্যালোচনার ভেতর দিয়ে কবি পৌঁছন তার কবিতার কাছে। মূল রূপটি ছাপার অথবা প্রকাশিত হওয়ার পরেও চলতে থাকে নিরীক্ষণ। আমৃত্যু (কবিতার অথবা কবির)। সাম্য রাইয়ানের ‘হলুদ পাহাড়’-এর প্রচ্ছদে নীল ফুলদানি এবং তাতে শাদা ফুল। ফুলের ভেতরে হলুদের ছোঁয়া। সেজানের ছবির কথা মনে পড়ে। বইটির ভূমিকা ধীমান ব্রহ্মচারীর। প্রথম লাইনে তিনি লিখেছেন— ‘আমাদের চেতনায় যে ছবি সবসময় রঙিন হয়ে উঠতে পারে না, যে ছবি দেখার পরেই মিলিয়ে যায়, সেই ছবিই সাম্য রঙ তুলি দিয়ে এঁকেছেন।’ চেতনায় ছবি। দেখা। সাম্য লিখছেন নিরীক্ষণ। এই দেখা এবং নিরীক্ষণের ভেতরে সাম্য কিছু পংক্তি লিখছেন। পক্ষীরাজের ডানা কবিতায় সাম্য লিখছেন— ‘মাথার ওপরে পৃথিবীময় পাখাটি ঘুরতে ঘুরতে বেলা বাড়ছে, আমার ভয় করছে।’ এইটে পাখার ভেতর দিয়ে দেখা, নিরীক্ষণ। নিজস্ব বিপন্নতাকে মিলিয়ে নেওয়া পৃথিবীর বিপন্নতার সঙ্গে। এই কবিতার শেষ শব্দ, ‘ম্যাডহর্স’। পক্ষীরাজ কেন ‘ম্যাডহর্স’ হয়েছে? পক্ষীরাজের নিয়ন্ত্রণ যখন তার স্রষ্টার হাত থেকে বেরিয়ে যায়, যখন মুক্ত হয় ঘোড়াটি, তখন তা সভ্যতার কাছে ‘ম্যাডহর্স’-ই বটে। কবিতাও কি তাই নয়? এ তো গেল কবিতার কথা। আর কবি? ঠিক পরের ‘জোকার’ কবিতায় সাম্য লেখেন- ‘আমি সেই জন্মবধির, পুরোনো ভঙ্গিতে পোষা দুঃখগুলো খাঁচা থেকে বের করে ময়দানে খেলা দেখাই।’ বধির কেন? সাম্যের কবিতা কি দাঁড়িয়ে আছে কেবলই দৃশ্যের ওপরে? অনেক ক্ষেত্রেই আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যেমন গান, জীবনানন্দের কবিতায় তেমনই দৃশ্য। যে কবিতা দৃশ্যপ্রবণ তার গানের কাছে যাওয়ার সুযোগ কম। যেতেই পারে না, এমন বলছি না। তবে গেলে অনেকসময় নিজস্ব মাধুর্য হারায়। সাম্য ছবি লেখেন। তাই কি তিনি বধির? তার বধিরতা কি শক্তি নাকি বিপন্নতা? পুরোনো ভঙ্গিতে তিনি যে খেলা দেখান না, এটা স্পষ্ট। তার প্রকাশ ‘পুরোনো’ নয়। তবে দুঃখগুলো পুরোনো তথা চিরন্তন। কবি কি খেলা দেখান? সে প্রশ্ন অবান্তর। প্রশ্ন এই, কবি কি খেলা দেখাতে চান? ‘ফুলেল ধারণা’ কবিতায় সাম্য লেখেন, ফুলেরা পূর্ণ হবার আগেই চুপচাপ ঝরে যায়। আমি পড়ি, খেলাটি দর্শকের কাছে পৌঁছনোর আগেই চুপচাপ ঝরে যায়। কবির সত্যি এই। সাম্য লেখেন- ‘কোথাও ভরাট হচ্ছে না আর’। অপূর্ণ খেলাটি একটি শূন্যস্থান রেখে যাচ্ছে, যা ভরাট হওয়ার নয়। এই শূন্যস্থানের মানে কী? এই শূন্যস্থানটিই কি ‘হলুদ পাহাড়’? যেখানে হৈ-হুল্লোড় করা নিষেধ? যাকে দূর থেকে গাদাফুল ভেবে ভুল হয় মানুষের? শূন্যস্থানই কি সৌন্দর্যের ধারণা বয়ে আনে? এইসব প্রশ্ন আসে পাঠকের মনের ভেতরে। কতগুলো দৃশ্য তৈরি করেন সাম্য। যেমন-
ক। ‘তামাম রাত এক জীবন্ত কিংবদন্তি, অজগর সাপ।’ (ওপার অজগর)
খ। ‘সম্রাটের ক্ষত-বিক্ষত গণিকার প্রশস্ত গর্জন ক্রমে পুষ্ট হয়ে ওঠে।’ (অপার অজগর)
গ। ‘দুর্গন্ধময় হৃদয়গুচ্ছ বহন করতে করতেই আমরা পৌঁছব নবনীতা জলে;’ (ব্যর্থ হত্যাচেষ্টার পর)
ঘ। ‘প্রভূত বৃষ্টিসম্ভাবনা মেনে দীর্ঘ-শ্বাসের দৃশ্য ছাড়াই আমি গুচ্ছ গুচ্ছ পাখিকে আকার দিচ্ছিলাম।’ (আশ্রয়দাতা)।
ঙ। ‘অনাবৃত পরীদের ঘুমন্ত আস্তাবলে ছড়িয়ে যায় রক্তের নীর সুষমা।’ (বিষণ্ণ ছুটিবার)
এরকম দৃশ্যগুলোকে আঁকড়িয়ে এক একটি কবিতা যখন গড়ে উঠছে তখন বুঝি সাম্য যে কবিতা লিখছেন তা একান্তই নিজস্ব। কাব্যভাষা থেকে নিরীক্ষণ, ব্যক্তিগত বিপন্নতা ও উন্মাদনা থেকে উঠে আসছে। পথ, সাম্যই তৈরি করেছেন। কারুর থেকে ধার নেননি। যেমন কিছু ইংরেজি শব্দ মিশিয়েছেন সাম্য। শব্দের ভারসাম্য নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। এটি করতে গিয়ে কখনও দ্বিধাগ্রস্ত হননি। শুচিবায়ুগ্রস্ত না হয়ে, যেমন মনে হয়েছে লিখেছেন। এতে করে তার কবিতাগুলো বিশেষ স্বর (সুর বলতে পারছি না) লাভ করেছে। যেমন একটি শব্দ, ‘বানানবিভ্রাট’। অথবা ‘মহাবরিষণে’। সাম্য লেখেন, লিখতে পারেন, ‘স্রোতের ভাগাড়ে নাম লিখে রাখলাম’(জবাগাছ)। ‘অন্ধ কুস্তিগীর’ কবিতায় লেখেন, ‘মধ্যরাতের ভ্রম থেকে সযত্নে স্নিগ্ধ আবেগ তুলে রাখি শূন্যালোকে।’ লেখেন, ‘গোলাপ তুমি কনফিউজড হোয়ো না;’ কেন লেখেন কনফিউজড? বিভ্রান্ত লেখা যেত? দ্বিধাগ্রস্ত? না এখানেই চলে আসে কথাটি, সাম্য যে সময়ে কবিতা লিখতে এসেছেন তখন কেউ দ্বিধাগ্রস্ত অথবা বিভ্রান্ত হয় না। হয় কনফিউজড। সাম্য হননি। তিনি যেমন চেয়েছেন, লিখেছেন। এই দ্বিধাহীনতা তার কবিতার পক্ষে মঙ্গল নাকি অমঙ্গলের সেটি আগামীতে কবিই স্থির করবেন। এই বইতে পাওয়া আমার পরম প্রিয় কবিতা, ‘আপি’।
‘কখনও এমন হয়, বুঝি তার কণ্ঠ শুনতে পাই! মায়েরা কথা
বলছেন, আড্ডা দিচ্ছেন উঠোনে, শুনতে পাচ্ছি, তাঁরই তো কন্ঠ…’
সাম্যর এই কবিতাটি গান। বাকিগুলো ছবি হতে পারে। বাকি কবিতার ক্ষেত্রে তিনি হতে পারেন বধির। এখানে তিনি অন্ধ। ছুঁয়ে ছুঁয়ে লেখেন কবিতা। লিখতে পারেন।


সাম্যপুরাণ - সুবীর সরকার
❑ ধীমান ব্রহ্মচারী 

(১)

বাংলার উত্তর জেলার বাসিন্দা কবি সুবীর সরকার। পরিচয়ের পর আমি তাঁকে উত্তরের হাওয়া বলি। হওয়ার যেমন কোনো প্রবাহের দিক নেই,নেই অভিমুখ, কখনও শান্ত আবার কখনও প্রশান্ত হয়ে গাছের পাতায় শীতলতা প্রদান করে, সুবীরদাও তেমনই এক মুক্তমনা মানুষ। মাথার মধ্যে যার সবসময় ঘোরাফেরা করে শব্দের দোতারা। আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমনটা যে ঘটে তা এই বই তৈরিতেই অনেকটা বুঝতে পেরেছি। এখন প্রশ্ন কী ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে। এপার বাংলা আর ওপার বাংলা। মাঝখানে আছে সীমন্ত কাটাতার। এপক্ষ ওপক্ষ। বিবাদ। বদনাম। কাঁটা তারের বেড়া পেরিয়ে রাতের অন্ধকারে কত কত জীবিকার টানে এক দেশের মাটি থেকে অন্যদেশের মাটিতে চলে যাওয়া। এই যাওয়ায় আনন্দ থেকে বেশি আছে জীবনের  ঝুঁকি। জীবনের থেকেও আছে মৃত্যু ভয়। একই বাতাস,একই গাছের পাতা,একই মাটির জল বয়ে যায় তারের এপার থেকে ওপারে। অথচ একটা পাখি যখন কোনোও দেশের সীমানা লংঘন করে। পূর্ব পারের বাদল মেঘ যখন কাটা তার পেরিয়ে কিমি দুই এগিয়েই অঝোরে বৃষ্টি ঘটায় -- তখন কোথায় যেন সব হারিয়ে যায় উত্তাল ঝরে। কখনও কাউকে কোনো জবাবদিহি করতে হয়না দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যেতে। শুধু প্রশ্ন ওঠে আইনের খাতায়, আসামী বলে চিহ্নিত হয় আদালতের কাঠগোড়ায়। কিন্তু শুধুই কি এই আইনের ধারা নিয়ে দেশ শাসনের কাহিনি? আসলে তা হয়তো কখনোই নয়,তাইতো উত্তরের হাওয়া অনায়াসেই সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যায় ওপারের কুড়িগ্রামে। সাম্য বজায় রাখতে। ভালবাসতে। বুকে টেনে গান শোনাতে আবার সন্ধ্যে বেলায় ভাঙা আলোর রেখা ধরে ফিরে আছে পূরাণের কথা শোনাতে। যে গান তিনি গান, যে সুর আমার আপনার সবার হৃদয়ে বেজে উঠে সেইতো সাম্যপুরাণ।

এই পুরাণের কথা বলতে বলতে একটা কবিতার কথা মাথায় এলো। যদিও কবিতাটি কোনো কবিতার বইয়ের নয়। কবিতাটি আছে, একটি বইয়ের সূচনায়। এখানে পুরোটাই দিই—

কাশফুল

রেললাইনের ধারে মানুষের পিঠসমান কাশফুলের বন

টাইপরাইটার নিয়ে তার মধ্যে একজন বসে

একটা শালিখ নামল টাইপরাইটারে পুজোর আকাশ থেকে সাদা রং এক ঝাঁক মেঘও নেমে এল তাঁর মাথায়।

দূর দিয়ে চলে গেল ট্রেন...

ট্রেনে যেতে যেতে আমি স্বচক্ষে দেখলাম কাশবনের মধ্যে বসে সুভাষদা কবিতা লিখছেন। (জয়ের সুভাষ – জয় গোস্বামী/ দে’জ পাবলিশিং)
বইটির শুরুতেই কবি জয় গোস্বামী লিখছেন এই কবিতা। কী অসাধারণ একটা ছবি। একজন অগ্রজ কবির প্রতি তাঁর এই ধরনের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, এই রকমের সমর্পণ। কবিতার কী বিরাট এক চিন্ত্যক, দিকপাল, কবিতার অনন্য স্বর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে জয় গোস্বামী লিখছেন এই একটি কবিতা। যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় যাঁর কবিতায় আছে সজীবতা, আছে মায়ার গান, আছে বাদল মেঘের গম্ভীরতা। তাই তো একজন আদ্যন্ত কবির জন্য সময়ও অপেক্ষা করে থাকে, তাঁকে তার প্রাপ্য কাজে ফিরিয়ে আনতে।
আর যদি আমাদের বইটির দিকে তাকাই, তাহলে দেখব, এক অণুজ কবি, নাম সাম্য রাইয়ান তাঁকে উদ্দেশ্য করে বইটির ১৪ নং কবিতা।
কবি সুবীর সরকার লিখছেন তাঁর ১৪ নং কবিতায়—

“দৃশ্য দৃশ্যায়ন মুছে ফেলে সাম্য তার যাতায়াতের রাস্তায় বিছিয়ে দিতে থাকে ধনীবাড়ির খোলানের মস্ত এক মায়া। সেই মায়ায় নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে মধ্যরাতের শহর কুড়িগ্রাম।
আর সাম্য রাইয়ান লিখে ফেলেন ভুরুঙ্গামারীর
                                                                  রাস্তা”

আচ্ছা, নদী বিধৌত মাটির সজীবতা,  সরলতা এসব কিছু নিয়েই কি সাম্যর জীবন নয়? আসলে তো এই তাঁর নিজের জীবন, নিজের প্রেম, নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনন্ত প্রশ্ন! কবি সুবীর সরকার সেই প্রশ্নের সন্ধানে পাড়ি দেন ওপার বাংলায়। ‘দৃশ্য দৃশ্যায়ন মুছে ফেলে...’ এই যে একজন কবির যাতায়াতের পথে যেটুকু দৃশ্যমান এবং এই দৃশ্যবস্তু অনায়াসেই কবি নিজের অজান্তেই রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। সেখানে কোনো বেগ বা নিয়তির বাঁধা থাকে না। আর যে মাটি মেখে কবি সাম্য বড় হয়েছেন, যে ধুলো উড়িয়ে বিকেলের পড়ন্ত রোদ গায়ে মেখে শৈশব থেকে তরণের দিকে এগিয়েছেন সময়ের ক্ষণে, সেই সাম্যই তো পারেন মায়া দিয়ে, প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে নিজের গ্রামের মাটি আঁকড়ে ধরতে। সেই অনুভূতি নিয়েই কবি সুবীর সরকার লেখনে, “... সেই মায়ায় নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে মধ্যরাতের শহর কুড়িগ্রাম।” এই প্রকৃতি মায়া খুবই কঠিন, হৃদয়ে আঁকড়ে বসে নিজের জায়গাটুকু করে নিতে পারে। তাই তাঁকে নিয়েই কবিতা কথা বলতে, প্রথমেই তিনি বলেন—
বইটির ১নং কবিতায় তিনি লেখেন—
“সাম্য রাইয়ান তার দুই চোখ দিয়ে কেমন দূরাগত এক বিভ্রম কিংবা ভ্রম নিয়ে এই উত্তরদেশের উত্তর শিথানে প্রবাহিত নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। সে কি নদীজলপ্রবাহ দেখে আদতে কিঞ্চিৎ আনমনা হয়ে পড়ছিল!...”

আচ্ছা এই এক জীবনের দৃশ্য দেখে নেওয়া অন্যের চোখ দিয়ে। প্রবাহমান নদীর গতি যেভাবে মানুষের জীবন ও জাতির সমাজ এবং রাষ্ট্রজীবনকে প্রভাবিত করে, ঠিক তেমনই সেই প্রবাহ উপলব্ধি করতে পারেন সাম্য। তাঁর নিঃশব্দ অনুভব কোথাও এক গানের সুরের মতো শান্ত ও সমাহিত। তাই কবি সুবীর সরকার বলতে পারেন, মনের কথা, উপলব্ধির কথা।
বইটির তিন নম্বর কবিতা—
“এই গান এই বুকের ভেতর হাহাকার তৈরি করা সুর এই নদী এই নৌকো এই প্রায় সন্ধ্যাকাল নিয়ে এই উত্তরদেশের বুকের মধ্যে জেগে উঠতে থাকে এই অতিপ্রাকৃত মহাজগৎ, যেখানে প্রাচীন প্রবাদের মতো ক্রমে জায়মান হয়ে উঠতে থাকেন কবি সাম্য..” আচ্ছা এই কবিতা পড়লে কি সত্যিই মন আনন্দে ভরে ওঠে না? নদীর বুকে বাঁধা নৌকা আর সূর্যাস্তের আলো-আঁধারির সন্ধ্যাবেলার হিমেল হাওয়া, এই তো একজন শিল্পীর শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। আর এই জীবনের বাইরের যে অদৃশ্য জীবনের হাহাকার বা অতিপ্রাকৃতর আয়োজন, যেখানে স্বেচ্ছায় সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় না, দৈবাৎ সেখানে পৌঁছে যেতে হয়। সেই প্রাচীন মানুষের দিনযাপনের  কাহিনী শুনে বড় হতে থাকে কোনো আগামীর ছোট্ট শিশু। তাই তিনি অনির্দেশের উদ্যেশ্যে যাত্রা করতেই পারে। কবি সাম্য যেমন মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকেন, কবি সুবীরও তেমনই শরীরের মন্থর গতি নিয়ে এক কালখণ্ড অতিক্রমের স্বপ্ন দেখেন। যার জন্যই তিনি তাঁর ছয় নম্বর কবিতায় লেখেন এই বিচিত্র হাঁটতে থাকার আকস্মিক অভিজ্ঞতা। 
বইটির ছয় নম্বর কবিতা—
“সাম্য রাইয়ান হাঁটতে থাকে। তাকে তো এভাবেই হেঁটে যেতে হয়। তার শরীরের ছন্দে মাঝে মাঝে মন্থরতা
এসে গেলে সে নিজেকে তামাক বাড়িতে গান গাইতে থাকা, নাচ করতে থাকা পুরনো কালখন্ডের
নাচুনিদের কথা মনে করে। তার শরীর অধিগ্রহণ করে নেয় গান আর গান, যার সুরের দাউদাউ আগুনে জীবনভর…”

কবি সাম্য সম্পর্কে বেশ কিছুদিন আগে তারই ভূমিকায় লিখেছিলাম— গানের মায়া। গানের খেলা। গানের কথা। প্রেমের বাঁধন নিয়ে শুধুমাত্র সামনেই এগিয়ে যাচ্ছেন সাম্য। এই যে ‘পাগল’, সে তো সাম্যের নিজের প্রতীক। এই পাগলামি আছে নৈঃশব্দ্য জীবনে নিস্তব্ধতার মতো। জীবনের সবটুকু অপরাধ মুছে যাক পাখির ডানা মেলাতে, লাগামছাড়া জীবন পাক আবছা নীলের আভা। এই নীল তো জীবন। বিরাট নীলের সাগরে আছে একটা ছোট্ট নৌকা। সেও জীবন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পারে। আমরা সেই নৌকার পালে পাগল হাওয়া তুলে দেব। আসলে সাম্য জানে মানুষকে ভালোবাসার গোপন কৌশল। কতটা প্রেমে মানুষ নিজেকে হলুদ বনে ছড়িয়ে দেবে। তাই সমস্ত স্মৃতি সাম্যের কাছে গভীর হলেও কখনও বেদনাদায়ক নয়। আমরা যেটুকু জীবন নিয়ে আঁকড়ে আছি, যেটুকু মুক্ত বায়ু পাওয়ার তাগিদে বেরিয়ে পড়েছি সকালের রোদে, যেটুকু আশ্বাস নিয়ে চাঁদের কলঙ্ক লেপেছি আমাদের শিশুদের কপালের শুভ ভাগ্যের আশায়— সাম্যও সেই অনালোচিত— অবর্ণিত খামখেয়ালিপনায় আমাদের ভাসিয়ে দিয়েছেন তাঁর হলুদ পাহাড়ে। এই পাহাড়ের গায়ে রোদের আলো এসে ঠিকড়ে পরে, এই পাহাড়ের গায়ের মাটি পড়ে ফেলে সবুজ ঘাসের পোশাক, এই পাহাড়ের মাথায় নীল আকাশে গায়ে থাকে মেঘ। এই মেঘের কোলে নাচে বিদ্যুৎ। আমরা আষাঢ়ের বর্ষা আসার প্রতীক্ষায় বসে থাকি পাহাড়ের টিলায়। এই পাহাড় বানিয়েছেন রূপকার সাম্য। এই বিশ্ব রাজনীতির বাইরে মানুষের হাতে ফুল দিয়ে হাতকড়া পড়িয়েছেন সাম্য। নির্বাসন দিচ্ছেন তাঁর সদা চঞ্চল ও ওই হাসি মুখে পাহাড়ের কোলে। যাঁর নাম হলুদ পাহাড়। তাহলে এই হলুদ পাহাড়ের কবি কীভাবে মহানগরের পথে পা বাড়াবে? মাটির আলো, মৃদু বাতাস, নিশ্চয়তার শিলালিপি সবই তো কবি সাম্য নিজের মতো করে প্রত্যক্ষ করেন। তাই মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে তিনি সন্ধান পান ‘এক চিরায়ত পৃথিবীর’ যেখানে মানুষের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। অথচ কবি সাম্য উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে থাকেন নদীর মধ্যে গঙ্গায়। যেখানে চরের মানুষ বসবাস করেন। 
তাই সুবীর সরকার এ বইয়ের দশ নম্বর কবিতায় লেখেন—
“এই এই মাঠ প্রান্তর গহিন চরাঞ্চল জুড়ে কেবল গান আর গান। কোথাও অদৃশ্য বাদ্য ও বাজনার ঘোর। চরের অন্দরে কন্দরে এক চিরায়ত পৃথিবীর নবজন্ম হয়। মানুষের জন্ম মরণ নিয়ে কী অদ্ভুত বেঁচে থাকা! বেঁচে থাকবার পরিসর জুড়ে জুড়ে জীবনের বহমান প্রবাহে শরীর ডুবিয়ে দেয় সেই কবেকার জোড়া মহিষ। তখন মাথায় বহুবর্ণ গামছা জড়িয়ে সাম্য রাইয়ান হেঁটে যেতে থাকে তালুক মুলুক আর নয়া কোন জেগে ওঠা চরের দিকেই।”

তাই গতিময়তায় বিশ্বাস রেখেই তিনি নতুন পথের সন্ধানে ফিরতে চান।

(২)

কবিতা বলার ধরণ সবসময় কবির আত্মচেতনা ও জীবনের এক বড় অভিজ্ঞতা থেকে সঞ্চিত হয়। আমরা কবিতায় ঠিক তেমনই দেখে আসছি। আমাদের এই বই সাধারণত অন্যান্য বইয়ের মতো নয়। এই বই মূখ্যতই একজন কবির জীবন যাপন ও তাঁর সামগ্রিক জীবনের খণ্ড চিত্র। তাঁর জীবন গঠনের নানা দিক, পথ পরিবর্তনের কাহিনি।

প্রায় শুরুর কিছু কবিতা লেখার পর,তিনি চার (৪নং) কবিতায় লিখছে—
“ঘোড়াডাঙার মাঠ পেরিয়ে যেতে যেতে, গরুজলখাওয়া ঘাট অতিক্রম করতে করতে, ডাকাতিয়ার বিল ছুঁয়ে ছুঁয়ে সাম্য তার স্বপ্নের শাখা-প্রশাখাকে কখন কীভাবে যে ডানা মেলা পাখির বিস্তৃতি দিতে শুরু করে সেটা কিন্তু  কেউ বুঝতেই পারে না।
অথচ সাম্য একটানা তাকিয়ে থাকেন হলুদ পাহাড়ের
                                                         দিকে…”

এই কবিতাটি বড়ই আশ্চর্যের। একটি বড় গ্রামের ছবি আঁকেছেন কবি তাঁর শব্দ আর জীবনবোধ দিয়ে। এই প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ছে। বাংলাদেশে প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু’। মূলত সেই পত্রিকার সম্পাদক সাম্য রাইয়ান। এই বই পরিকল্পনার আগে আমার ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ যাবার কথা চলছিল। এমন সময় জানলাম উত্তরের কবি সুবীর সরকার যাচ্ছেন বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম। ফোনের ওপাশ থেকে সাম্যদা বলছেন— ‘আমরা এখানকার মানুষ হয়ে যত বেশি না কুড়িগ্রামকে চিনি তার থেকেও সুবীরদা খুব খুব ভালো চেনেন।’ সেই থেকেই কবি সুবীর সরকারের প্রতি এক অদম্য সম্পর্কের আত্মীয়তার অনুভূতি মনে মনে বুঝি। আর তাই সহজেই কবিতার মধ্যে বিরাট জনজীবন, মাঠের পর মাঠ, দিগন্ত দেখার যে স্বাদ আমরা তাতো সহজেই দেখতে পাই। “ঘোড়াডাঙার মাঠ পেরিয়ে যেতে যেতে, গরুজলখাওয়া ঘাট অতিক্রম করতে করতে,” –আলোচ্য লাইনটি খুব গ্রাম্য ময়তার রূপ। এই যে ঘোড়াডাঙার মাঠ পেরিয়ে যেতে যেতে, গরু জল খাওয়া ঘাট কখন সাম্য পার হতে যায়। আসলে কবিতার কথা মানে তো জীবনের কথা। এক কবির গ্রাম্য জীবনের কত চিত্র ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা তিনি জানার চেষ্টা করেছেন। আর এই দুইধারের প্রকৃতির দামামা দেখতে দেখতে কবি সাম্য যাচ্ছেন তাঁর নিঃশব্দ ও নিস্তব্ধ পাহাড়ের কোলে, নাম যার হলুদ পাহাড়। এই যাওয়ার কথা লিখতে লিখতে একটা ছোট্ট ঘটনার কথা মনে পড়ছে। আমি তখন ছোট। আমাদের শহর থেকে প্রায় আঠারো কিলোমিটার দূরে আমাদের গ্রাম। নাম দোগাছি। জনশ্রুতি আছে এইখানে নাকি দুটি গাছ ছিল। এখন কালের নিয়মে সেই গাছ না থাকলেও থেকে গেছে নাম। সেই দোগাছি যেতে গেলে নামতে হতো ঈদগাহ মোড়ে। সেখান থেকে বাড়ির গরুর গাড়িতে করে আমরা গ্রামে আসতাম জমির আল ধরে। প্রায় তিন ক্রোশ রাস্তা পেরিয়ে আমরা আসতাম ইস্কুলডাঙার মাঠ। এই মাঠ থেকে একটা রাস্তা উত্তরের দিকে চলে গেছে। একটি রাস্তা পশ্চিমে আরও একটি দক্ষিণে, আমরা ঢুকছি পূর্ব দিক দিয়ে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমরা গ্রামে থাকতাম বছরের তিন থেকে চার মাস তাও আবার ঠাকুরের পালির জন্য। সেই থাকাকালীন আমরা প্রায়শই সেই উত্তরের রাস্তা ধরে যেতাম পীরতলা বলে একটা ছোট্ট পাহাড়ের দিকে। ওখানে যাওয়ার রাস্তা বেশ অদ্ভুত। দুদিকে উঁচু উঁচু দেয়ালের মতো ছোট ছোট ঢিবি। আমি ঢিবির ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে যেতাম। হাতে একটা কঞ্চি নিতাম। কিছু ঝোপ জাতীয় গাছে কঞ্চি চালাতে চালাতে যেতাম। আর পূর্ব পারে থাকত বেশ বড় পাহাড়ের মতো উঁচু ঢিবি। ওখানে অনেকের গরু পাহাড়ের গায়ে চড়তো। মিহির দা বলে একজন থাকতেন আমাদের গ্রামের বাড়ির উলটো দিকে। ওইই গরু-ছাগলের পাল নিয়ে, সন্ধ্যের কালো আকাশ নিয়ে বাড়ি ফিরত। আমরা দেখতাম। আর দেখতে দেখতে সেই পিরতলায় পৌঁছে যেতাম। ওখানে  দেখার মতো বলতে জনশ্রুতি ছিল, হুসেনের সমাধি। তার সেই প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ। ওখানে ছোট ছোট হাতি, ঘোড়ার মূর্তি পাওয়া যেত। আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে সংগ্রহ করতাম, পাছে কেউ জানতে না পারে। আর সেই পীরতলার পাশেই ছিল একটা দিঘি। তখন দেখতাম দিঘির জলে অস্তগামী সূর্যের রক্তাভ আভা। এভাবেই গ্রামের বিকেল গুলো মাঝে মাঝে কাটত। এখানে কবি লিখছেন— “সাম্য তার স্বপ্নের শাখা-প্রশাখাকে কখন কীভাবে যে ডানা মেলা পাখির বিস্তৃতি দিতে শুরু করে সেটা কিন্তু  কেউ বুঝতেই পারে না।” –আসলে এই মাটির সঙ্গে মিশে থাকতে থাকতে সাম্যরও কোথাও যেন চিন্তার স্মৃতি বিস্তার পেয়েছে। তাই শাখা প্রশাখার মতো কখন সেই ভাবনা উড়ে গেছে সন্ধ্যার আকাশে। 
তিনি আট নম্বর কবিতায় বলছেন—
“উজানের দিকে তাকিয়ে কী দেখে সাম্য! সে কি তার চোখের মুখের পেশীর তরঙ্গ দিয়ে এক ঝাঁক পাখিদের উড়ে যাবার দৃশ্যের কাছে খুব মন্থরলয়ে
এগিয়ে যেতে চাইছে! উজান আকাশে কি মেঘ জমেছে! না কি ধুলোর ঘূর্ণি ছুটে আসতে চাইছে সেই উজান দেশ থেকেই” –আসলে এই উজান মানেই তো আগামীর জন্য বিরাট ভাবনা ও প্রয়াস। চোখে মুখের পেশী তরঙ্গ সাম্যকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বাদল মেঘের আসমানে। 
আবার—
কুড়ি নম্বর কবিতায় লিখছেন—
“নাগেশ্বরীর রাস্তা থেকে পান-সুপারি নিয়ে
শরীরভর্তি আলো মেখে
কবি সাম্য রাইয়ান ফিরে আসছিল
                                  জীবন ও উৎসবের ভেতর।”
এই কবিতায় এই যে ‘জীবন ও উৎসবের ভেতর’ শব্দ দিয়ে তিনি লিখছেন কবিতার আঙ্গিক, লিখছেন বাস্তব জাদুবিদ্যার তন্ত্র। এই আলোর আলেয়া মেখে নিয়েছে সাম্য তাঁর নিজের গায়ে। পরিণামদর্শী, স্বাধীনচেতা এবং কবিসুলভ এক অপার আনন্দের নাম সাম্য রাইয়ান। যিনি পরিভ্রমণ করেন নিজের গ্রাম, মাটি, জল, বাতাস আর সেই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে। 
সবশেষে বলি, এভাবেই তিনি সাম্য পুরাণ গাঁথেন পাঠকের জন্য। এক ধারাভাষ্যকার এর ভূমিকায় তিনি নিয়ে উপস্থিত করেন ওপার বাংলার কবিময় সত্তা সাম্য রাইয়ানকে। এভাবেই ছোট্ট স্বপ্নের আদলে তিনি নির্মাণ করতে পারেন স্থানহীন স্থানাঙ্ক। যা আপামর বাংলা কবিতা প্রেমী পাঠকের কাছে বিশেষ সমাদৃত হবে। তাই কবি সুবীর সরকার লেখেন—
“এই এই মাঠ প্রান্তর গহিন চরাঞ্চল জুড়ে কেবল গান আর গান। কোথাও অদৃশ্য বাদ্য ও বাজনার ঘোর। চরের অন্দরে কন্দরে এক চিরায়ত পৃথিবীর নবজন্ম হয়। মানুষের জন্ম মরণ নিয়ে কী অদ্ভুত বেঁচে থাকা! বেঁচে থাকবার পরিসর জুড়ে জুড়ে জীবনের বহমান প্রবাহে শরীর ডুবিয়ে দেয় সেই কবেকার জোড়া মহিষ। তখন মাথায় বহুবর্ণ গামছা জড়িয়ে সাম্য রাইয়ান হেঁটে যেতে থাকে তালুক মুলুক আর নয়া কোন জেগে ওঠা চরের দিকেই। তার দু চোখের মণিতে তখন জীবনের খুব মায়া খুব নিবিড় হয়ে জায়মান থাকে। আর তাকে জড়িয়ে ধরে হাজার বছরের কী এক সুতীব্র আলো। সেই আলোর ভেতর আমরা দেখে ফেলি উজান দেশের রঙ্গিলা সব পাখপাখালিদের যারা ভোরের আলোর ভেতর ফিরে আসতে থাকে একটা ১৬ নদীর দেশে।”

তারারা সাম্য রাইয়ান বিশেষ সংখ্যা
‘তারারা’ সাহিত্যের আলোকপত্র তার পূর্ব প্রতিশ্রুতিমতো ত্রৈমাসিক আত্মপ্রকাশ প্রধারা বজায় রেখেও অতিরিক্ত বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের ভাবনা ভেবেছিল। কোনও এক সময় প্রতিটি নিয়মিত সংখ্যার সঙ্গে সময়ের দাবি মেনে ক্রোড়পত্রও জুড়ে দেবার বাসনা রেখেছিল। ‘তারারা’ স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, তবে কোনও এক নির্দিষ্ট স্বপ্নের আঠাদণ্ডে ডানা লেপ্টে যাওয়া রামধনু দেশের নিরীহ প্রজাপতির প্রাণান্তক আই-ঢাই স্বপ্নকে ভয় পায়। শিউরে ওঠে। তারাদেশের বিমুক্ত অফুরান আকাশের সর্বোচ্চ প্রক্ষেত্র থেকে মুহুর্মুহু আলো ছুটে আসছে, এপারের আলোভূক, চেতনাভূক তারা-চেতন প্রমিথিউস সাধ্যমতো সেই আলোয় স্নান সেরে ফকিরের ঝোলা নিঃসৃত কিছু আলো-শব্দ আলো-বাক্য পাঠকের হৃদি রেখাতটে রেখে যাচ্ছে। ‘তারারা’-র দ্বেষ নেই, দেশ নেই, কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নেই, অথচ তারাভূক কিছু সাধক স্ব-স্ব ভূখণ্ডে দু’পা রেখে অনন্ত প্রজ্ঞাভূখণ্ডের মালিকানা হাতে তুলে নিয়েছে। এই জগত সৃজনের জগত। মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়েও এই জগতের কারবারিদের তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করা যায় না, যায় নি। ‘তারারা’ পত্রিকা পরিবার ‘আলো হয়, গেল ভয়, চারিদিক ঝিকমিক’ তারা-প্রাণদের অকুণ্ঠ কুর্নিশ জানায়।

‘তারারা’র এই বিশেষ সংখ্যা যাকে নিয়ে সজ্জিত, তিনি সেই কবি— তিনি সেই সম্পাদক— যিনি সেই মুক্তগদ্য লেখক যাকে কখনও চোখে দেখিনি। শুধু তাঁর কবিতা পড়ে পূর্বরাগে আক্রান্ত হয়েছিলাম, শরতের এক সন্ধেবেলা। সেই কবির নাম সাম্য রাইয়ান। সাম্য রাইয়ান মূলত কবি, একজন জাত-কবি বলতে যা বোঝায় সেই তরুণ কবিকে নিয়ে ‘তারারা’র এই বিশেষ সংখ্যা এবং তারারা পরিবারের প্রথম বিশেষ সংখ্যার শুরুয়াত এই কবিকে দিয়েই। আগেই বলেছি কবিদের কোন দেশ নেই, নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ড নেই। আমরা ক্ষুদ-বিতর্কে মাস-মাহিনা কাবার করা হাড়-হারামি কাঁকড়া প্রজাতি বদ্ধ পাঁকে এ ওর পা কামড়ে পড়ে থাকি। দেখেও দেখি না, বুঝি না বলে বোঝার চেষ্টাও করি না। নয়ের দশকে জন্মগ্রহণ করা এই কবিকে নিয়ে প্রথিতযশা প্রাবন্ধিক, কবি-সাহিত্যিকেরা বাঁকফেরা নতুন স্বপ্নঘোর তপ্তপ্রাণ কবিকে নিয়ে লিখেছেন। তাঁকে অনুধ্যান করেছেন। স্মৃতির পুনরূদ্ধার করেছেন, কবির রচনার বহুমুখী আলোকসম্ভাব্য এবং সার্থকতম সময়োত্তীর্ণ ভাব অনুভবগুলিকে মেধার সোনামুখী সুঁইয়ে পাঠকসমীপে গেঁথেছেন, বুনেছেন। একজন তরুণ কবিকে এখনই সুঁইগ্রন্থিতে গাঁথার কী প্রয়োজন ছিল? পক্ষে-বিপক্ষে দুই সারিতেই হাজারও মতামত থাকবে। তবুও সম্পাদক হিসেবে চরম শ্লাঘা এবং আত্মতুষ্টি এইখানেই যে, অনেক যুক্তি, প্রতি-যুক্তি, তর্ক, প্রতি-তর্ক, মতামত, প্রতি-মতামত উপরোধ, অনুরোধ করে শেষপর্যন্ত তরুণ কবির কাছ থেকে তাঁর নামে সংখ্যা প্রকাশের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। একজন কনিষ্ঠ সম্পাদক হিসেবে কবির কাছ থেকে এইরকম ছাড়পত্র আদায়— একটা জিৎ বলেই ধরে নিচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন— “এমন গরিবও আছে, যাহারা প্রাণ খুলিয়া কাহারো প্রশংসা করিতে পারে না।” এই সত্যই যেন বারবার বর্তমান সংখ্যা প্রকাশের সময়ে আমাদের সামনে নির্মমভাবে উপস্থিত হয়েছে। এমন অনেকেই মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে উপস্থিত হয়ে নিজের দরিদ্রতাকেই প্রস্ফূটিত করে তুলেছেন। বারবার মনে পড়েছে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কথা, “কোন কবিকে অস্বীকার করতে দু’চার মিনিট লাগে— স্বীকার করতে লাগে কয়েক বছর।” আমরা ‘তারারা’ পরিবার নতুন কবিতার স্বর পাঠকের সামনে তুলে ধরতে, তাকে বিশ্লেষণ করতে এবং সাহিত্যতত্ত্বের নিরীখে সেই স্বর পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ তথা ব্যবচ্ছেদ করতে চেয়েছি। সাম্য রাইয়ানের মতো কবি-স্বরকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি। এর পরে যদি কারোও কিছু বলার থাকে, তিনি বলবেন— তিনি মহাকাল। তরুণ কবি সাম্য রাইয়ানকে তাই ‘তারারা’ পত্রিকা এবং পত্রিকা পরিবারের পক্ষ থেকে আভূমি আনত শ্রদ্ধা। ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা আর ঐকান্তিক প্রার্থনা তাঁর কলম চলুক, আরও চলুক কাব্যভুবনের অদৃশ্য বন্ধনহীন এক একটি গ্রন্থির জঠর ছিঁড়ে বেরিয়ে আসুক নতুন নতুন সৃজন-সকাল।

সবাই ভালো থাকুন। পত্রিকার এই সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী, হিতাকাঙ্ক্ষী সকলকে অনিঃশেষ ধন্যবাদ, প্রীতি, প্রণাম। একজন সমকালীন কবিকে প্রসঙ্গ করে প্রাজ্ঞ প্রাবন্ধিকগণ রাতদিন এককরে ঘাম ঝরিয়ে আলোচনাগুচ্ছ  লিখেছেন, তা আমাদের তথা আগামী সময়ের সম্পদ হয়ে রইল। আপনাদের বিপুল অংশগ্রহণ, জোর সমর্থন, অনুপ্রেরণা ব্যতিরেকে এত বৃহৎ কলেবর নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ ছিল অসম্ভব। পত্রিকা সৃজন প্রকৌশলের পেছনে থাকা সেইসব অক্ষর-মুদ্রণজীবী মানুষদের, যারা ব্যক্তিনাম নয়, গোষ্ঠীনামে- ব্র্যান্ডনেমে, সুচারু কাজ আর ‘তারারা’র অধরা স্বপ্নকে অসম মেহনত দিয়ে এই সংখ্যার রূপকর্তা হয়ে রইলেন, তাদের সকলকে আন্তরিক প্রীতিময় শুভেচ্ছা। ‘তারারা’র এই বিশেষ সংখ্যা পত্রিকার দৃষ্টিনন্দিত প্রচ্ছদকর্তার নাম না নিলে খুব অন্যায় হবে। একাধারে কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক এবং প্রচ্ছদশিল্পী এই বহুধা গুণের অধিকারী দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশেষিত করা যায় এমন বিশেষণ আমার জানা নেই এবং কোনও বিশেষণই তাঁর গুণপণাকে সঠিকভাবে মাপা যায় না— কাজেই সেই চেষ্টা থেকে বিরত থাকলাম। ‘তারারা’র অগণিত পাঠক সাধারণ, সমালোচক-জনার্দনকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা— আবার দেখা হবে— তুমুল কথা হবে, এই বাসনায় পাঁজর ফুলিয়ে অনেকটা সুবাতাস একসঙ্গে ফুসফুসে টেনে নিলাম। 

আশুতোষ বিশ্বাস
স্বাগতা বিশ্বাস

[তারারা • জুন ২০২৩ • সাম্য রাইয়ান সংখ্যা]

❑ আশুতোষ বিশ্বাস 

সময়ের দ্রাঘিমারেখায় কবি সাম্য রাইয়ানের কাব্য সৃজনভূমি শূন্য দশকের মাটি। এই দশকের আবহাওয়া, মানুষের হিড়িক-বাহিত চেতনপরিপুষ্টি জল, বায়ু, শব্দ, আলোক সংযোজন সবই এই দশকের রসপুষ্ট এবং সময়ের ধারাবাহিক অভীজ্ঞার বর্ণপ্রপাত। সাম্য রাইয়ানের চৈতনিক খৈলানে পতিত আলোকের ঝরনাধারায় চারিয়ে উঠেছে নতুন নতুন ভাবোদ্দীপিত চেতনার পংক্তি, বাক্য, শব্দপুঞ্জ। ভাবনার আকাশে ডানা মেলা মন-পাখি সারাদিন ক্রমশ পরিভ্রমণে রোদ্রের ওম সঞ্চারিত করে দিতে পেরেছেন সময় পরিব্যাপ্ত ভাবী কবি, আর কবিতাসমুদ্রের গভীরে একা একা দীপ-জ্বলা মণি-মানিক্যের রহস্য কিনারে। যেখানে চকিতে চেতনাদ্যুতি সময়কে উপচে আগামী সময়ের জন্য ফলদায়ী বর্ণিল ছায়চিহ্ন রেখে যায়। এই কবির কবিজন্মের ইতিহাস খুব বেশি অতীত-গভীরে শিকড় চালেনি, কিন্তু মহীরুহের আভাস সুবাতাস বয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রজ্ঞাদীপিত যৌবনলভিত সাম্যের কবিতার বর্ণপ্রতাড়িত পাতায় পাতায়। এই যুবক কবির দুচোখের যৌবনরাগ কখন যে যৌবনিক সংক্ষোভ শিখায় চৈতন্যের অন্ধকারে একে একে জ্বেলে দেয় বাতি তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না— এ কবির সার্চ লণ্ঠনের ফোকাস স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার অন্তরমহলে তাক করে থাকলেও দৃশ্যমান সময়ের বাইরে চলে গেছে কবির অন্তর্দৃষ্টি। আমাদের টক ঝাল মিষ্টি ভাঙাবাড়ি বাসাবাড়ি, প্রতিদিনের প্রাতিবেশিক কালিঝুলি মাখা স্বেদ বহমান আম-জনতার রৌদ্র ঝলসিত পচা শামুকে পা কাটা কলুষিত জীবন-গদ্যে কাব্যিক সাজ পরিয়ে দিয়েছেন অবলীলায়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সমাজ রাষ্ট্রের অংশীভূত হয়েও সাম্য রাইয়ান নির্দিষ্ট ভূগোলকের চারপাশে বন বন ঘুরতে থাকেন না, তার কাছে মানব বিশ্বের সমস্ত মনুষ্য-পদবাচ্যই তার আত্মার আত্মীয়, ভাই-ভগিনী। সাম্য তাঁর নামের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে কাব্যিক সাম্যতা ধরে রেখে চলেছেন। একনজরে কবি হিসেবে সাম্য রাইয়ান যতটা স্বদেশে প্রজ্ঞাপিত, বিজ্ঞাপিত তার চেয়ে বেশি সম্মানীত প্রতিবেশী দেশ ভারতবর্ষেও। আর এটা অবশ্যই তাঁর বয়সোচিত ভারপ্রগুণ্যে পরিতৃপ্তির দাক্ষিণ্যে প্রদেয় নয়— মাত্র আটাশ-তিরিশ বছরের যুবক কবির কপালে এইরকম ভোরের প্রত্যুষ সমীরণে টুপটুপ ঝরে পড়া শেফালি সদৃশ কবিতা সৌরভ তন্ময়ে বিভোর আপামর স্বদেশ বিদেশের বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যামোদী কবিতাপ্রেমিক। বাংলাদেশের কুড়িগ্রামে নয়ের দশকে সাম্য রাইয়ানের জন্ম। ২০০৫ সালে প্রথম কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ নামের কবিতা দিয়ে তাঁর প্রথম কবিতার মুদ্রণ সৌভাগ্য ঘটে। কুড়িগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় থেকেই সাম্য রাইয়ানের কাব্য এবং সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত। কবি রাশেদুন্নবী সবুজের অনুপ্রেরণায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ছাত্র ইউনিয়নের ‘মঞ্চ’ পত্রিকায়। সেসময় কুড়িগ্রামে কোন সাহিত্য পত্রিকা না থাকায়, ২০০৬ সালে তিনি কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সাহিত্যপত্র ‘বিন্দু’ সম্পাদনা কর্মে নিয়োজিত হন। ক্রমান্বয়ে লেখালেখির সুবাদে তিনি বিভিন্ন লিটলম্যাগের সাথে যুক্ত হয়ে যান। দেশের বিভিন্ন লিটলম্যাগে তাঁর কবিতা প্রকাশ হতে শুরু করে। এপার ওপার বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ‘তারারা’, ‘চারবাক’, ‘চালচিত্র’, ‘জঙশন’, ‘প্রতিশিল্প’, ‘শ্বেতপত্র’, ‘শিরদাঁড়া’, ‘উত্তরা এক্সপ্রেস’, ‘অ-কার’, ‘নিসর্গ’, ‘বাঘের বাচ্চা’, ‘অবগুণ্ঠন’, ‘আঙ্গিক’, ‘ছায়াবৃত্ত’, ‘কবি সম্মেলন’, ‘মাসিক কৃত্তিবাস’, ‘প্রতিধ্বনি’-সহ বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে অক্লান্তভাবে নিয়মিত লিখে চলেছেন।

এই পর্যন্ত তাঁর লেখা মুদ্রিত কাব্যগ্রন্থ এবং গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা দশটি। সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট (প্রবন্ধ), (২০১৫),  কাব্যগ্রন্থ: ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ (২০১৬), ‘মার্কস যদি জানতেন’ (২০১৮), ‘হলুদ পাহাড়’ (২০১৯), ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ (অমর একুশে বইমেলা ২০২০), ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ (মুক্তগদ্য), (মার্চ ২০২১), ‘লিখিত রাত্রি’ (অমর একুশে বইমেলা ২০২২), ‘হালকা রোদের দুপুর’ (অমর একুশে বইমেলা ২০২৩),  এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ: ‘জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ (প্রবন্ধ সংকলন), (সম্পাদনা), (অমর একুশে বইমেলা ২০২৩), উৎপলকুমার বসু (প্রবন্ধ সংকলন), (সম্পাদনা) (২০২২)।

‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ (২০১৬) নামের কাব্যপুস্তিকা নয়ের দশকের উদীয়মান যৌবনপ্রাজ্ঞ কবিদের কাছে একেবারে নতুনের কেতন উড়িয়ে চেতনের মগডালে— কেবলমাত্র কাব্য-নামেই কম করে দুঘণ্টার জন্য নিশ্চল ভাবনারাজ্যে  ঢিল ছুঁড়ে দিয়ে গেল যেন! ঠিক যেমন স্রোতহীন পুষ্করিণী জলে খেলাচ্ছলে দুরন্ত বালক নিক্ষিপ্ত ইটের দলা পুষ্করিণীর টলটলে জল নাড়িয়ে দিয়ে শতমুখী ঢেউয়ের জাল বুনে দিয়ে গেল। কবিতা আর কবিভাবনায় মাহুর্তিক ইমারত গড়ে তোলার অক্লান্ত অনিঃশেষ অপরিনিবৃত্তির চরম অসুখ নিয়ে ভুগতে থাকা কবিরা কখন যে তাদের মস্তিষ্কের কোন এক নিভৃত কোষে লুফে নেন— অপার্থিব অনন্তের সুখদ দুখদ অনন্য ভাবতরঙ্গ তা কেউ জানেন না। এমনকি জোর গলায় বলা যায়, হাতে কলম উঁচিয়ে বসে থাকা চৌখশ কবির কাছেই সেই দৈবচরণ চকিত আভাস দিয়ে যাবে— তাও বলা যায় না। নিয়ত অনুশীলনে কবিতা পদবাচ্যময় কিছু শব্দের পাহাড় গড়ে তোলা যেতে পারে— কিন্তু সেগুলি যে সত্যিকারের কালজয়ী কাব্যচরণ হয়ে উঠবে তা কে বলতে পারে! আর এই কারণেই মনুষ্যপদবাচ্য প্রায় সকলেই কবিধর্মের মহত্তম গুণপনা নিয়ে জন্মালেও প্রকৃত কবি কিন্তু দু-একজনই। মহাকাল তার কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বলে লিখে রাখেন হাতে গোনা মুষ্টিমেয় কয়েকটি নাম। তুমি যতই কাগজে, পাথরে, গম্বুজ মিনারে নাম লিখে রাখো না কেন, সেই নাম মুছে যাবে।

সাম্য রাইয়ান গতানুগতিক ধারা প্রবাহিত জলে আটকে থাকা প্রতিভা নিয়ে আসেন নি, বরং যেখান থেকে সাধারণ অনেকেই ভাবনা বন্ধ করে দেন— সেখান থেকেই তাঁর ভাবনাপ্রক্ষালন শুরু। অনেকেই তাকে বলবেন স্রোতের বিপরীতে প্রধাবনক্ষম কাব্যস্রষ্টা, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না— পৃথিবীর প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত ক্রিয়া আছে। ধন্যাত্মক এবং ঋণাত্মক শক্তি বলয়ের মধ্যেই মানব বিশ্বের প্রাণভোমরা গান গেয়ে তরী বেয়ে এপার থেকে ওপারে লাফিয়ে পড়ে। কাজেই প্রকৃতি বিশ্বের এই দুটি ক্রিয়া সৃষ্টিতরঙ্গের মূলীভূত প্রধারা আর যা সমস্ত সৃষ্টিকর্মের মধ্যে বর্তমান। কেউ প্রথম ক্রিয়াটিকে মান্যতা দেবেন, নয় দ্বিতীয়টিকে আপ্তবাক্য ভাববেন। সাম্য রাইয়ান এই দুটো ক্রিয়ার চরম বাস্তবতাকে অঙ্গীকৃত করে তিনি সাজিয়ে নিয়েছেন এক নিজস্ব কাব্যিক ভুবন। সবাই বাঁধ বাঁধার কাজে লিপ্ত তখনও এই কবি বাঁধ ভাঙার কাজে মজেন। ভাঙা আর গড়ার খেলায় যখন এই কবি মজে থাকেন তখন আমাদের মনে হয় নির্জনে বসে ব্রহ্মা প্রলয় আর ধ্বংসের দুটি ভিন্ন ভিন্ন তালায় ভিন্ন ভিন্ন চাবি তাঁর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে প্রবেশ করাতে চাইছেন। কবি-ব্রহ্মাও তেমনি স্রোত আর বি-স্রোতের দুটি তালায় দুটি ভিন্ন চাবি দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে চাইছেন। তিনি দেখছেন, বুঝছেন— এবং যেটা বোঝাতে চাইছেন আমরা সাধারণেরা সেটাই বা কতটুকু বুঝছি? ‘‘কী করে নির্মিত হয় কবিতাগাছের ফল; মানুষের কাছে আজ অব্দি সেসব অমীমাংসিত বিস্ময়!”১ আমাদের এই কবি, ব্রহ্মগুণ সম্পন্ন হয়েও ভুল তালায় ভুল চাবি পুরে নিজেকে দেখার বিস্ময়কর সৃজন উপভোগ্য আনন্দময় রসঘনযাপন করেন। প্রতি মুহূর্তে কবিতা গাছে উপজিত কবিতা ফল দেখে অপার বিস্ময়ে অভিভূত হন, আহ্লাদিত হন। মাথায় চরম ঘা খেয়ে বনবন ঘূর্ণমান পাগলা কুকুর আর মৃগনাভ কস্তুরীবতী হরিণী প্রদাহ যন্ত্রণায় দিকবদিক ছোটাছুটির মধ্যের আনন্দঘন নুড়িবালি সংগ্রহ সৃজনশিল্পীরা অবলীলায় করে নেন। কবি সাম্য রাইয়ানও এই সৃজন কলাকৈবল্য নিকেতনে সুদূরকে হৃদয় সৌন্দর্যের ওমচর্যায় নন্দিত করেন বারবার—

‘‘... মুঠোভর্তি তেঁতুল আর নুন নিয়ে আমার যেন কোথায় যেতে ইচ্ছে করছে! কেন আমার আবার জন্ম হলো পৃথিবীতে, কেউ কি জানে? তোমার বাড়ি তো বহুদূর— তবে আপেলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে কোত্থেকে? তুমি কি আমার পাশে— আছো— কাছাকাছি কোথাও, বৃষ্টির আড়ালে। এই দিন তো পুরোটাই উষ্ণ ছিলো আজ, কেন এভাবে বৃষ্টি এলো?”২

মুঠোভর্তি তেঁতুল আর নুন নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার ঝোঁক আজকের এই লভিত জন্মে কবির চোখ মুখে চেতনায় উত্তরহীন বিস্ময়াভিষেক গ্রন্থিমোচন করে। নুন মাখা পাকা তেঁতুলের স্বাদ পুনরপি কবি জিহ্বায় ভর করে। এই স্বাদ এক জনমের নয়, বহু জন্মের ভেতর দিয়ে তেতুল-নুনের লালাময় লীলাভূমি পৃথিবীকে মনে পড়ে যায়। তোমার বাড়ি অনেক অনেক দূর হওয়া সত্বেও পাকা অবিকল পূর্বজন্মের মতো একই স্বাদ নিয়ে, গন্ধ নিয়ে আপেলের ঘ্রাণ আমাদের নাকে এসে লাগে কী করে! ‘তুমি’ নামের হৃদয় নিঙড়ানিয়া কেউ নিশ্চয়ই আমার আশেপাশে অবস্থান করছে, অথবা কাছাকাছি কোন মেঘ বা বৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে আছে। আর আজকের রোদেলা ভরপুর দুপুরের শুকনো তকতকে উষ্ণদিনে, আমাদের বিগত জন্মের দিনগুলি রাতগুলির মত নরম বৃষ্টি পৃথিবীতে নেমে এলো! সত্যি আমাদের এই জন্মের সঙ্গে গত কোন জন্মের নাড়িযোগ সম্পর্ক সূত্র আছে। আমাদের মনে পড়ে যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘প্রাচীন প্রবন্ধ’ গ্রন্থের ‘মেঘদূত’ নামের কালজয়ী প্রবন্ধের এই কয়টি চরণ—

‘‘...দূর হইতে যখনই পরস্পরের দিকে চাহিয়া দেখি তখন মনে হয়, এক কালে আমরা এক মহাদেশ ছিলাম, এখন কাহার অভিশাপে মধ্যে বিচ্ছেদের  বিলাপরাশি ফেনিল হইয়া উঠিতেছে। আমাদের এই সমুদ্রবেষ্টিত ক্ষুদ্র বর্তমান হইতে যখন কাব্যবর্ণিত সেই অতীত ভূখণ্ডের তটের দিকে চাহিয়া দেখি তখন মনে হয়, সেই শিপ্রাতীরের যূথীবনে যে পুষ্পলাবী রমণীরা ফুল তুলিত, অবন্তীর নগরচত্বরে যে বৃদ্ধগণ উদয়নের গল্প বলিত, এবং আষাঢ়ের প্রথম মেঘ দেখিয়া যে প্রবাসীরা আপন আপন পথিকবধূর জন্য বিরহব্যাকুল হইত, তাহাদের এবং আমাদের মধ্যে যেন সংযোগ থাকা উচিত ছিল। আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের নিবিড় ঐক্য আছে, অথচ কালের নিষ্ঠুর ব্যবধান। কবির কল্যাণ্যে এখন সেই অতীতকাল অমর সৌন্দর্যের অলকাপুরীতে পরিণত হইয়াছে; আমরা আমাদের বিরহবিচ্ছিন্ন এই বর্তমান মর্তলোক হইতে সেখানে কল্পনার মেঘদূত প্রেরণ করিয়াছি।”৩

‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় বিগতের প্রতি বেদনানির্ভর আখ্যান ফুটিয়ে তুলেছেন কবি, যদিও কাব্যনাম শুনে অনেকেই ভরে থাকা স্মৃতিভাণ্ডার থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘ওড’ বা স্তুতিমূলক কবিতার একটা সুর শোনার জন্য উদগ্রীব থাকবেন। এক্ষেত্রে তাদের জন্য এই কাব্য সেই বাসনা পূরিত করতে পারবে না। বিগত রাইফেল বা কোন প্রয়োজনীয় যন্ত্র বিশেষের প্রতি সমবেদনা দেখাতে গিয়ে কবিকে ওডের ধর্ম থেকে চ্যুত হতে হয়েছে। ‘প্রতি’—নির্দেশিত কবিতা যে স্তুতিনির্ভর হতেই হবে সে কথা পাঠক আজ থেকে ভুলে গেলে সুবিধে আছে। আজকের শূন্যদশকের কবিদের মেজাজ আর মর্জি বদলেছে। নতুন কথা নতুন মেজাজে সাহিত্যের নতুন দিকে, নতুন রুটে অভিযান চালিয়ে লং রুটে চলেছেন, তবে মাঝে মাঝে রং রুট হয়ে গেলে আর কী করা যাবে। কারণ সকলেই কবি নন— কেউ কেউ কবি।

“আবার প্রথম থেকে, নতুন করে লিখছি পুরোটা
বিগত সময়ের কর্মকে কেটেকুটে, ব্যাপক
কাটাকাটি হলেও নতুনে রয়েছে ছাপ, পুরানের

চিহ্নিত হচ্ছে ধীরে, না-লেখা কলম, তেলের কাগজ
তা-হোক, তবু আবিষ্কৃত হোক প্রকৃত যাপন...

আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।
মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন
চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন”৪

‘মেশিন’ নামাঙ্কিত কবিতায় সাম্য রাইয়ান যখন বিগতের প্রতি সমবেদনা সহানুভূতি পাঠকের সামনে রাখছেন, স্মৃতিভারনত পাঠকের স্মৃতিমেঘ ঘুরে ঘুরে আসে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই অমোঘ কবিতার চরণ-বিচরণ আকাশে— ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন। সেই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার ফিরে পাবার, পুঁজিবাদ নির্মূলের স্বপ্নবিভোর ঐতিহাসিক স্বপ্নদ্রষ্টা মহাপুরুষ কার্ল মার্কস, লেনিন, মাও জে দং। ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ দেশে দেশে যেমন পড়া হয়েছে তেমনি পোড়ানোও হয়েছে। সব মিলিয়ে বিগতের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে কবিকে বলতে হয়েছে— “আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।/মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন/চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন।” এই আদিম শ্রমিকের মেশিন চালাচালির মধ্যে আমিষ সুবাস কেউ কেউ পেলেও পেতে পারেন, আসলে আমাদের সভ্যতা সমাজ যুগপৎ ধ্বংস এবং সৃষ্টির মধ্য দিয়েই নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, আর তাই কবির বিগতের প্রতি বিষণ্ণমেদুর স্মৃতিতর্পণ— “একবার বিষাদ লিখে আমি কলমের নিব ভেঙে ফেলি।”

“বোবারা তাক করে আছে নিঃসঙ্গ হাসিফল।

জারুল বৃক্ষ জানে
করতলে তপ্ত হচ্ছে বালু
মরহুম সূর্যবতীর চোখে ঘাই হরিণীর নাভি

পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা সূর্য
ক্ষিপ্ত হলে রোদের তীব্রতা বাড়ে!
নাভির ভেতরে তার লুকায়িত বন
বেলিফুলের ঘ্রাণ, মুখরিত সকালে।”৫

আমাদের মনে পড়ে যায় জীবনানন্দ দাশের প্রবাদপ্রতিম কবিতার চরণ— “অন্ধেরা বেশি চোখে দেখে আজ।” একথা খুব সত্যি যে রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা কবিতার অঙ্গনে জীবনানন্দ দাশের খুব দরকার ছিল। তিনি বাংলা কাব্যোদ্যানে না আসলে আমাদের আধুনিক বাংলা কাব্য-কবিতা আজও সাবালকত্ব পেত না। দরকার ছিল রবীন্দ্রবলয় থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে এসে কবিতার গৃহবন্দী আত্মাকে কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে পাকা রাস্তায় মিশিয়ে দেওয়ার প্রযত্নলালিত সাহসী-প্রয়াস। যেখানে ‘হাসিফল’ নিঃসঙ্গে ঝরে পড়ে, সেখানে কু-মতলবী বোবারা সংঘ রচনা করে। বোবাদের শত্রু নেই, কিন্তু তাদের তো চোখ-কান-নাক-জিহ্বা আছে। তারা ঘ্রাণ নিতে পারে, স্বাদ নিতে পারে, স্পর্শ নিতে পারে, দেখতে পারে— শুধু বলতে পারেনা। পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে একটি ইন্দ্রিয় কাজ না করলে কী হবে বাকি চারটি অঙ্গ তো চৌখশ, ওস্তাদ! কাজেই সেই অন্ধ পেঁচা শব্দভেদী বাণ ছুঁড়ে নিঃসঙ্গ হাসিখুশিকে জখম করে। বনের জারুলগাছ খুব ভাল করে জানে যৌবনের রোদে তপ্ত হাতের বালুকাদলা ক্রমশ তেঁতে উঠছে, বনের ঘাই হরিণীর নাভির দিকে আঁখিপাত প্রঘটিত হচ্ছে। সকালের সূর্য দুপুর-বয়সী হলে তীব্রতা বাড়ে, আর ঘাই হরিণীর নাভিবিলাসী আমাদের প্রজন্মের উত্তরাধিকার জীবন প্রত্যুষেই জেগে ওঠে। বেলিফুলের তীব্রতা নিয়ে পরের দিনের সকাল আন্দোলিত করে, যৌবন মদমত্ত মুখরিত অনিবার্য আগামী সকাল, আমাদের কাছে অভিশাপ!

বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে সাম্য রাইয়ান কবি সুবোধ সরকারের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা ‘রূপমকে একটি চাকরী দিন’ কবিতার প্রায় জবাবি-কবিতা লিখেছেন ‘রূপমকে’ নাম দিয়ে। ‘সমবেদনা’ বলতে আমরা যা বুঝি— মোটামুটি সেই অভিভবই সাম্য রাইয়ান ধরার চেষ্টা করেছেন। আমাদের কাছে খোলসা হয়ে যায়— ‘বিগত রাইফেল’ শব্দের গূঢ়ার্থ অনুভবে। রাইফেল নিঃসৃত গুলি যেমন অব্যর্থ লক্ষ্যে আঘাত হেনে লব্ধিত জয় ছিনিয়ে আনে, তাই কবির সেই বিগত রাইফেলের প্রতি ভালোবাসা আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে এই কাব্যপুস্তিকার অবতারণা। সুবোধ সরকার এই শতাব্দীর একজন শক্তিশালী কবি। তার কবিতার একটি বিখ্যাত চরিত্র হল ‘রূপম’। রূপম বেকার যুবক, কিন্তু শিক্ষিত, এম.এ.পাশ। তার একটি চাকরী দরকার। কিন্তু আমাদের এই সমাজ, সমাজের নানাবিধ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা রূপমকে চাকুরী পেতে বাঁধা দিয়েছে। অথচ এই চাকুরী পাওয়ার জন্য এই সমাজ এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রদেয় সমস্ত শংসাপত্র রূপমের কাছে ছিল। সাম্য রাইয়ান দেখেছেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, চাকুরীব্যবস্থা সুবোধ সরকারের ‘রূপমকে’ চাকুরী দিতে পারে নি। কিন্তু কিছু তো একটা আছে যা রূপমকে বেছে নিতে হবে বা হয়েছে। সাম্য রাইয়ান রূপমের সেই ইলাস্ট্রেশন ভার্সন পাঠকের সামনে রাখলেন, যা হৃদয়বিদারক—

“রূপমকে একটা চাকরী দাও
এম এ পাশ করে বসে আছে ছেলেটা’
আমি আর সহজ কাজ কোত্থেকে দেই বলুন তো!
এই দুর্মূল্যের বাজারে আত্মহত্যার চেয়ে
সহজ কাজ কে-ই বা দিতে পারে আর কি হতে পারে?” ৬

‘মার্কস যদি জানতেন’(২০১৮) কাব্যপুস্তিকার নাম থেকেই অনুমেয় সাম্য রাইয়ান পৃথিবী বদলে দেওয়া এক মনীষীকে সাক্ষী রেখে কতগুলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াস করেছেন। মহামতি কার্ল মার্ক্স শোষণহীন এক সমাজব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন বিজ্ঞানসম্মত সমাজতান্ত্রিক এক রাষ্ট্রের বুনিয়াদ প্রবক্তা হিসেবে তিনি পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। এই কাব্যপুস্তিকার একটি কবিতার নাম ‘বাঘ’। মুক্তগদ্যছন্দে লেখা সুন্দর একটি গল্পের মোড়কে সুস্থ সমাজ বাস্তবতার সত্যানুসন্ধানে ব্রতী হয়েছেন কবি। অরণ্যের পশুশিকার বিশেষ করে বাঘ, সিংহ, হাতি জাতীয় পশুদের যে হত্যা করা আইনগত ভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা এই কবিতায় ধরা পড়েছে। বনের পশুদের বাঁচার অধিকার আইনগত ভাবে সমর্থিত হলেও আমাদের চোখের আড়ালে এখনও নানাভাবে এই আইন বিঘ্নিত হয়। চোরাশিকারী তাদের চোরা-কারবার প্রক্রিয়া কিছু লোভী মানুষের যোগসাজসে নির্মমভাবে রাতদিন করে চলেছে। কার্ল মার্কস যিনি সমাজের সকল মানুষের জন্য অধিকার রক্ষার ব্যাপারটিকে আইনসিদ্ধ করে গেছেন— কিন্তু সমাজের ভেতরে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাঁচার অধিকার তথা নিরাপত্তার কণ্ঠরোধ করে চলেছে। আমাদের সভ্য সমাজের মানুষ যে এইরকম পশুতে পরিণত হয়েছে তা যদি মার্কস জানতেন তাহলে কী হত? আর কবির কাছে মার্কস ছাড়া বলার তো কেউ নেই।

“আমাকে আদালতে তোলা হলো। বাঘ মেরেছি বলে ১২ বছরের কারাদণ্ড হলো আমার। শাস্তির ভারে নুয়ে পড়ে বললাম, আমার স্ত্রী-কন্যা—তাদের হত্যার শাস্তি কেউ পাবে না? আদালত বললেন, অবশ্যই আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে।”৭

মার্কস যদি জানতেন একটা আইনি বৈধতা লাগু হওয়ার পর তার জন্য বরাদ্দকৃত নির্ধারিত শাস্তি দেওয়ার পরও মানুষটির পরিবারের প্রতি আরো আরো অন্যায়,আরো আরো অবিচার করা হয় তার বিচার কেউ করছে না। আইনের রক্ষক হিসেবে পরিগণিত সমাজের উঁচুশ্রেণির মানুষ নানাবিধ বে-আইনি গহ্বরের ফাঁক-ফোঁকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটাও মার্ক্সের জানা উচিত বলেই এই কাব্য পুস্তিকার এই নামকরণ সার্থকতা আমাদের নজরে আসে। ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’— তারই মুক্তিকল্পে সমাজবিদ, দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের কাছে কবির স্মরণ-প্রার্থনা।

‘পরিচয়’ কবিতার মধ্য দিয়ে সহজ কথাটি আর সহজে পাঠকের সামীপ্যে এনেছেন সাম্য রাইয়ান। আমাদের সমাজে শোষক আর শোষিত এই দুটি সম্প্রদায় কবি জসীমুদ্দিনের রূপাই সাজুর মত একে অপরের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে। এই তাকানোতে প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রেমকাতর শুভদৃষ্টির মিলনাকাঙ্ক্ষাজাত আত্যান্তিক প্রেমজ বাসনা নেই। বরং আছে কি করে একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখবে— একে অপরের আজন্মবাহিত বৈরিতার ঠান্ডা বরফজল চুইয়ে পড়বে চিরকাল— একশ্রেণির মননপুষ্ট সুবিধেবাদী মানুষের প্রগাঢ় বৌদ্ধিক রসায়ন। কবির কাছে এই রসায়ন ধরা পড়ে গেছে, তাই সরাসরি প্রশ্ন। মার্কসও সমাজের মধ্যে ঘটে চলা এই রসায়ন হয়তো জানেন না—

“তুমি কি তাহার কুকুর?
লেলিয়ে দিয়েছে বলে
আক্রোশে ছুটে এলে!”৮

‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ কিংবা ‘মার্কস যদি জানতেন’ কাব্যপুস্তিকাদ্বয়ে কবির অন্তর্দৃষ্টি আপাত ঠিকঠাক, বাইরে থেকে দৃশ্যমান পরিপাট্য গুডি-গুডি সমাজ নড়াচড়া করছে, টলমল করছে, আষাঢ়ে ভাসিয়ে তরী পশ্চিমে কাজে যাবে। কিন্তু ভালো করে অনুভব করলে দেখা যাবে এই সমাজের ভেতরে ভেতরে বয়ে চলেছে একটি অশ্রুবিরচিত হ্রদ। বিগতের যা কিছু ভাল সব কিছুর স্মরণযোগ্য উপাখ্যাননির্ভর মণি-মানিক্য, কেবলই গল্পের জন্য। মুমূর্ষুর মাথার সামনে জীবনদায়ী ওষুধের বোতল সাজিয়ে রাখা আমাদের ‘শো-কেশ’ নির্ভর প্রসাধিত যাপনচক্র। সবিশেষ দক্ষতায় সাম্য রাইয়ান সমাজ অন্তর্গত বাছা বাছা অপ্রিয় বৈষম্য কম্বলের লোম বাছতে চেয়েছেন। স্বদেশ এবং স্বদেশের মানুষের ওপর প্রগাঢ় সমবেদনা নিয়েই সাম্য রাইয়ানের মনন-পঙ্খী উড়াল দিয়েছে বিগত রাইফেলের দেশে। সমাজ চৈতন্যের গভীরে শিকড় চালিয়ে সমাজবৃক্ষের সবুজ পাতায় হলদে ছোপ অবলোকন করেছেন কবি। মহামতি মার্কসের কাছেও পরিবর্তমান সমাজবিদ্যার সবটুকু খবর বোধহয় সেদিন ছিল না, সেই বার্তাটুকুও কবি সোৎসাহে দিতে চেয়েছেন। কবি সাম্য রাইয়ান সুখ–অসুখের মধ্যবর্তী আপেক্ষিক নো-ম্যান্স জোনে দাঁড়িয়ে বুঝে নিতে চেয়েছেন সমাজসত্যটুকু। এই কবির বুঝি প্রিয় একটি রঙের নাম হলুদ। চিল-চীৎকারময় জীবনানন্দীয় শূকরের যৌন উল্লাসপ্রমত্ত সময় শিবিরে হলুদের বর্ণপ্রপঞ্চময় এক ছায়াঘেরা হলুদ পাহাড় কবির বোধে এসে ধাক্কা মারে। কবির কল্পিত ‘হলুদ পাহাড়’ যেখানে স্বপ্নপাখিরা বাসা বাঁধে, স্বপ্নপাখিরা তাদের ভালোবাসা দিয়ে গড়া বাসায় বাসায় ডিম দেয়, ডিমে তা দেয়। তাদের হলুদ পাহাড়ের দেশে চীৎকার অবাঞ্ছিত আওয়াজ একদম প্রশ্রয় পায় না।  আহ্লাদভূক পাখি শাবকের মুখ থেকে চি-চি ডাক শোনার জন্ম-সার্থকতা সেইসব মা পাখিদের স্বপ্নের ‘হলুদ পাহাড়’। সতর্ক পাঠক সাম্য রাইয়ানের কাব্যিক-চৈতন্যের বাঁকফেরা মুহুর্তের ক্ষিপ্রতা এতক্ষণে টের পেয়ে গেছেন নিশ্চয়ই। নিজস্ব কাব্যিক জগতে তিনি ঢুকে গেছেন। দেশ-কাল সমাজের কল-কল্লোলমন্দ্রিত জাতীয় সড়ক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাম্য রাইয়ান কল্পিত হলুদ পাহাড়ের ভূখণ্ডে পৌঁছে গেছেন। সমস্ত কবিদের একটা স্বপ্নকল্পিত দ্বীপ বা ভূখণ্ডের প্রচেতনা থাকে—সাম্য রাইয়ানের সেই ভূখণ্ডের নাম ‘হলুদ পাহাড়’ (২০১৯)। আধুনিক বাংলা কাব্য কবিতার ইতিহাসে দেখা যায় প্রতিটি সার্থকতম কবির কাছে একটি নিজস্ব কাব্য-উদ্যানে থাকে। আমাদের এই কবির কাব্যোদ্যানে পাঠক একটু জিরিয়ে নিতে পারেন—

“ভাবছি, কাউকে বলবো একটা পাহাড়ের ছবি বানাতে। হলুদ পাহাড়, তার উপরে মেঘ, শাদা শাদা মেঘ। দূর থেকে দেখে গাদাফুল ভেবে ভ্রম হবে মানুষের।

ওরা খুশি হবে। মানুষ ভ্রমে প্রকৃতই আনন্দ পায়। পাহাড়ে উঠবে সকলে। কেউ কেউ পকেটে কিংবা পাটের ব্যাগে ভ্রমের আনন্দ ভরবে।

কিন্তু হলুদ পাহাড়ে হৈ-হুল্লোর নিষেধ।”৯

‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যপুস্তিকায় কবিকে দেখা যায়— তিনি বেশি বেশি প্রকৃতি অন্বিষ্ট হয়ে পড়ছেন। জীবনের সঙ্গে লতাগুল্মময়, গাছপালাময় প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ভুলে যাবার নয়। ডালপালা-ছায়া-মায়া ঘেরা গ্রাম বাংলার গোবর নিকোনো উঠোনের এককোণে জবাফুল গাছটিও কবির একান্ত আপন, সেও তার কাছে মানবিক প্রতিমূর্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে— কবি চৈতন্যের আশেপাশে চৈতন্য হয়ে। প্রতিটি গ্রাম্য পরিবারের উঠোনে রোপিত একটি দুটি গাছ, একটি দুটি জবার ঝাড় পরিবারের জীবন্ত সদস্য হয়ে পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে। জবাগাছ শুধু কেন, ঘরের আঙিনা জুড়ে বেড়ে ওঠা যে কোন গাছ সটান সুস্থির দাঁড়িয়ে পরিবারের সব কিছু ঘটনা দুর্ঘটনা অবলোকন করে। পর্যটক বুনো স্বভাবী মানুষের প্রথম এবং প্রকৃত দ্রষ্টা উঠোনের এই জবাগাছ। ‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যপুস্তিকার প্রকৃতি সংশ্লিষ্টতা কবিকে নতুন করে আবিস্কার করার প্রাণতা জাগায়—

“মধ্যরাতের ঝি-ঝি আসলে রাত্রির নিজস্ব আসবাব।

আমি জলের উপরে নাম লিখে রাখলাম। আমি স্রোতের ভাগাড়ে নাম লিখে রাখলাম। মনে-হৃদয়ে-মগজে-মাথায় এতো যন্ত্রণা হয় কেন? শিশিরের শব্দে জগৎ বিদীর্ণ হবার দৃশ্য দেখবো বলে এখনও জেগে আছি। ‘প্রচণ্ড’ শব্দটা যদি ভেঙে ভেঙে দেখাতে পারতাম, কী ভয়ানক প্রতিবিম্ব তৈরি হয়েছে আমার! কিছু প্রজাপতি বিশ্বাস করবে পৃথিবীকে, তোমার মতো যারা সটান জবাগাছ; অথবা শরীরের বুনোপথে নিবিড় পর্যটক। এই সাজানো পথ ছেড়ে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না আজকাল।”১০

সত্যিই কবিকে দেখেছি ‘হলুদ পাহাড়’-র পর যে সব কবিতা বা কাব্যগ্রন্থগুলি তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সবগুলিতেই সেখানে প্রকৃতি মুখ্য ভূমিকা নিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছে মানুষের কাছে। ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ (২০২০) সে রকমই একটি কাব্যগ্রন্থ। আসলে ‘হামিং বার্ড’ একটি ছোট পাখি, সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ছোট্টপাখির সম্মানে ভূষিত এবং  এই পাখিটি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগো দেশের জাতীয় পাখি হিসেবে স্বীকৃত। মানুষের ছোট্ট চোখের সঙ্গে তুলনীয় এই পাখিটিকে মুখ্য ব্যঞ্জনা করে সাম্য রাইয়ানের একটি আস্ত কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছে। আমাদের কাব্য-সাহিত্য-বিশ্বের অঙ্গনে এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুই রচিত হওয়ার অপেক্ষায়, কিন্তু সবটাই রচিত হয়ে উঠতে পারেনা। কোন কোন কবির চেতনার রঙে পান্না সবুজে পরিণত হয়, হীরে অন্য কোন বর্ণের মোড়কে নিজেকে উদ্ভাসিত করে। সাম্য রাইয়ানের এই কাব্যগ্রন্থে হামিং বার্ড চোখের সঙ্গে তুলনীয় এবং চোখের অভ্যন্তরে বসে কবিচেতনায় মোচড় এনেছে, স্বপ্নের অলিন্দে অলিন্দে বইয়ে দিয়েছে নদীর প্রবাহ, রক্তের ধারা—

“চোখের ভেতরে
একটা হামিংবার্ড
        নিয়ে বসে আছি

চমকে দিও না তাথৈ
          উড়ে যাবে—

উড়ে যাবে তারা—স্বপ্নেরা;
সারি সারি ডানা
ঘুমের ভেতরে বয়ে চলা নদী
হাতের তালুতে বয়ে যাবে
ঢোঁরা সাপ, রক্তের ধারা।”১১

সাম্য রাইয়ান প্রকৃতির অনুষঙ্গে অপ্রাকৃতিক মেঘের দোল-দোলানো দোলনায় দুলতে ভালোবাসেন। চোখের ভেতরের হামিং বার্ড ধরলার মতো উদ্ভ্রান্ত মেঘের মুখে চঞ্চু গলিয়ে তুলে আনে কবিতার মুগ্ধ রঙিন আলো। প্রেমের সৃজন ঋতুমাসে রূঢ় বর্ষার জল কার ঘরে ঢুকে যায়— চোখের হামিং বার্ড তার ছবি তুলে রাখে। আকাশ জুড়ে ঘনিয়ে আসা সাদা মেঘের ভেতর থেকে নেমে আসা অজস্র ধারায় বৃষ্টি, প্রকৃতি পৃথিবীর চারিদিক কাঁপিয়ে তছনছিয়ে নতুন বৃষ্টিতে সৃষ্টির ঘ্রাণ ছড়িয়ে শেষমেশ পৃথিবী ঘুমাতে যায়—

“থাকো, যেভাবে আছো বসে সেভাবেই!
উঠতে হবে না বৃষ্টি দেখতে, ভিজবেই?

তারপর শাদামেঘজুড়ে মেহগনি বনের ছবি
প্রসবের ঘ্রাণ চার্দিকে ছড়িয়ে ঘুমালো পৃথিবী।”১২

সাম্য রাইয়ান লিখিত ‘লিখিত রাত্রি’ (২০২২), “পঞ্চান্ন পর্বের এই সিরিজ জুড়ে রাত্রির গল্প— অনেক রাত— রাতের পর রাত যা লিখিত হয়েছে— এক রাত্রিতে এসে তা পূর্ণরূপ নিয়েছে। সেখানে বিস্তৃত হয়েছে রাত্রির নিজস্ব আসবাব- কুকুর, পতিতা, নাইটগার্ড, পাখি, কবি, প্রেম, বিবাহ, ট্রাক ড্রাইভার...”, কাব্যগ্রন্থের ব্লার্বঘোষিত এই পরিচিতি নেহাতই প্রকাশকের উপলব্ধিত গ্রন্থের বিষয়কেন্দ্রিক ভূমিকা। সাম্য রাইয়ান ‘লিখিত রাত্রি’-র প্রথম দর্শনে এক চমকপ্রদ কবিতার চরণ বিন্যাস পাঠকের চোখে পড়বে। কী সেই বিন্যাস? পঞ্চান্ন সিরিজের সংখ্যা চিহ্নিত এক থেকে পঞ্চান্ন প্রতিটি কবিতা পাঁচচরণে লিখিত, আর ছন্দের দিক দিয়ে প্রতিটি কবিতাই অক্ষরবৃত্ত ছন্দের গুরুভাব গুরুনাদ এবং গাম্ভীর্য নিয়ে স্বাধীন সত্তায় ক্রমশ উজ্জীবিত। ঘষিতে সৌরভময় চন্দনকাঠের মতো কবিতার প্রতিটি শব্দ প্রতিটি চরণ নিত্য নতুন অভিভব আর অনুভব নিয়ে পাঠকের মনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে। যে রাত্রি আজ লিখিত হয়ে পাঠকের কাছে এল— এই রাত্রির যেন শেষ নেই। আরব্য রজনীর সহস্র এক রাত্রির মতো প্রতিরাতে নতুন নতুন উপচয়ে শ্রোতাকে কাঠ করে রাখে, ভয়ে হিম করে রাখে-র মতো উজালা উতলা সাম্য রাইয়ানের এই ‘লিখিত রাত্রি’ নয়। তার রাতে ঘোরাফেরা করে আমাদের প্রতিদিনের চেনাশোনা পতিতা, কিছু পায়ের শব্দচেনা উচ্ছিষ্টভূক পথকুকুর, নয়তো বা জীবনানন্দের সেই ‘রাত্রি’ কবিতার কিছু গাড়লের মতো কেশে যাওয়া ট্রাক ড্রাইভার, যারা অস্থির পেট্রোল ঝেড়ে রাত কাঁপিয়ে অন্ধরাতের বন্ধ চোখ আলোয় কানা করে ছুটে যায়। ছুটে যায়— প্রতিশ্রুতি রক্ষার মরণপণ হাতের তালূ জীবন নিয়ে ছুটে যাওয়া সেই মহাজন, মহৎজন প্রিয়জনের কাছে—

“ছাপোষা মধ্যরাতে পুরোনো প্রেমিকাকে মনে পড়া
দোষের কিছু নয়। যখন তা ছিল বৃক্ষের নতুন
পাতাদের মতো। ওরা সুউচ্চ জিরাফের গ্রীবা থেকে
নেমে এলে, যে উজ্জ্বল পাখিঘুম আমার দিকে
তাকিয়ে থাকে, ওর কোনও ভাবনারেখা নেই!”১৩

ভাবনার শেষ রেখাহীন রাতের পাখিঘুম ছাপোষা মধ্যরাতে পুরোনো প্রেমিকাকে মনে করায় কোন পাপ নেই। কোন বাঁধা নেই— এই রাত এই রাতের লিখিত জীবন-কবিতা, জীবনে জীবন আনে। আমাদের মানব জীবনে তাই রাত্রিতে লেখা জীবনের লিখিত কবিতা আত্মশুদ্ধি আত্মপরিতৃপ্তির চোঁয়া ঢেঁকুর ওঠা সৎ এবং সত্য-কবিতা। ‘কয়েকটা মন খারাপের রাতে’ বনমোরগ হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে, বনমোরগের ভোরের কণ্ঠে আকাশ বিদারক চীৎকার নিয়ে জেগে ওঠার বাসনা আমাদের এই কবির লিখিত রাত্রির চরণ-অঙ্গে বিভূষিত হয়েছে। কবির এই বনমোরগ হওয়ার বাসনাকেন্দ্রে দেখা যায়— আমাদের এত এত ভালো বাসাবাসি, এত এত আলো হাসাহাসির উৎফুল্ল সমীরণ হিল্লোলে বনমোরগের কোন শুভাকাঙ্ক্ষী থাকে না। সাম্য রাইয়ানের রাত্রিতে লিখিত কবিতায় এই রকম সামাজিক বাস্তবতা আমাদের কঠিন কঠোর আলো ঝলমল চনমনে ‘দিন’টাকেও আতঙ্কের মনে হয়। আর ‘রাত্রি’ সে তো কালে-কালান্তরে বোধগম্যের বাইরে, রহস্যের মোটা চাদরে ঘেরা, সমস্ত সৃষ্টি আর প্রলয়ের সুতিকাঘর—

“যেতে যেতে পথে, মধ্যরাতে; কুকুর, পুলিশ ও
বেশ্যাকে নিঃশব্দে বলি—পথ আটকানো নিষেধ। এ
রাত শুধুই প্রেমিক, কবি ও পাগলের। গান শেষে
দ্যাখো পুরোটা জুড়ে শুধু ছেঁড়া পাতাফুল পড়ে
ছিলো যা, সকল খারিজ হলো অন্ধবাগান থেকে।”১৪

রাত্রির অন্ধবাগানে পড়ে থাকা ছেঁড়া গাছের শাখা-পল্লব, পুষ্প-মঞ্জুরী সকালের রোদ কুসুমিত আলোয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। রাত শুধুই প্রেমিক, কবি আর পাগলের জন্য অবারিত, কারণ এই পৃথিবীতে তারাই নিঃস্বার্থ, তারাই যা দেয় তার বিনিময়ে কিছু আশা করে না। ‘একহাতে দাও আর অন্য হাতে নাও’— এই ফর্মুলায় তারা বিশ্বাসী নয়। যে প্রেমিক কাউকে নিঃশর্ত ভালোবেসে হয়তো নিজেই ঠকেছে, যে কবি মায়াময় পৃথিবীর উদ্যানে ভালোবাসার বীজ বুনেছে, সেই বীজ থেকে গাছ গজালো কী না এখনও দেখে যেতে পারল না। কখনো ভেবেছে রাতের নরম শিশিরস্পর্শে চকিতে অঙ্কুরোদ্গম হয়েই বাতাসে মিলিয়ে গেল! আর পাগল সে তো প্রতিদিনের জন্য রাতের বাদশাহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেহের আলি, আসমুদ্র হিমাচল তার মুঠঠিতে। তাই রাতের এই কয়জন মেহেমানকে আটকানোর মতো কোন অজুহাতই পুলিশ, কুকুর বা অতীব সুন্দরী বেশ্যারও থাকতে পারে না। ‘লিখিত রাত্রি’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি নিশাচর প্রাণীর ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনিয়ে নৃত্য পটিয়সী রাত্রির অভিমুখে চলে যায়, প্রাক-রাত্রির বেদনা বৈষাদান্তিক ভ্রম লুকিয়ে রাখার আধার, রাত্রির নিকষ অন্ধকার ছাড়া আমাদের সূর্যতপা মানবিক পৃথিবীর আর কোথায় আছে? কবি সুবোধ সরকার যেমন তার সন্তানের কথামতো তাকে ‘ভালো জায়গাটা’-য় নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে— কবি আদপে ‘ভালো জায়গাটা কোথায়’ আছে সেটা খুঁজেই পান নি। সন্তানকে ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন নি—এটা ওটা খেলনা আর খাবারের লোভ দেখিয়ে কোনরকমে আশ্বস্ত করেছেন মাত্র! আসলে পৃথিবীতে ভালো জায়গাটাই নেই!

‘লিখিত রাত্রি’-র পরেই আর একটি কাব্যগ্রন্থের কথা আমাদের মনে আসে, যে কাব্যগ্রন্থে আমাদের নিসর্গ প্রকৃতির অপর একটি অনিবার্য পৃষ্ঠার কাব্যরূপ রচিত হয়েছে। ‘হালকা রোদের দুপুর’ (২০২৩), রাত্রি-লিখন পরবর্তী লিখনে হালকা-রোদ তৎসহ রোদের দুপুর না হলে সাম্য রাইয়ানের কাব্য পরিক্রমা অসম্পূর্ণ থেকে যাবার সম্ভাবনা থাকত। সম্ভত কবির সেই অনুমেয় প্রকৃতি বিলাসিতার এই গ্রন্থে পরিপূর্ণতা পেল—

“কিছু রোদ এসে আছড়ে পড়ছে মাঠে, মেয়েদের মতো। পৃথিবী এক ঢেউ ভুলে যাওয়া নদী! বেহায়া কুকুরদল- সস্নেহে তোমার সাথে। যতটা দেখে তুমি পৃথিবীকে ভাবো, পৃথিবী আসলে তার পর থেকে শুরু! পাখি নেই তবু ডানা ঝাপটানো আছে। দূরের আকাশে তার উথাল- পাথাল শব্দ- হাসিঠাট্টায়, লুকানো জীবাশ্মের মতো! জীবন বলপয়েন্ট, আপনি ফুরিয়ে যায়। আরও কিছু ফুলতোলা কাজ- নকশিকাঁথা, কোথায় হারায়?”১৫

গভীর অনুশীলন সাপেক্ষ টানাগদ্য কবিতা রচনা করতে গিয়ে, এই একেবারে আনকোরা আধুনিক প্রকরণের শিল্প সিদ্ধকাম সার্থকতা সাম্য রাইয়ান প্রথম থেকেই করায়ত্ব করেছেন। ‘হালকা রোদের দুপুর’-এ দ্বিপ্রাহরিক কাব্যিক প্রকৃতিবিহার বলতে যা বোঝায় কবি সেটাই করতে বেরিয়েছেন। এই কবি নিজেকে ভাঙছেন, নিজেকে গড়ছেন— নিজের লেখনীর অবিসংবাদী প্রান্তছায়া ছুঁয়ে আবার নতুন অনাস্বাদিত চৈতি-খৈলানে নিজেকে মেলে ধরার জন্য তীব্র অস্বস্তির বিষাদ নিয়ে এগিয়ে গেছেন। একটি কাব্যের অভিভব পরের কাব্যে এসেই যেন কবির কাছে তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কবির কাছে তাই নতুন আরও ভাব বিভাব দরকার হয়ে পড়ছে। পাল্লা দিয়ে অধরা নতুন কাব্য-প্রত্যয়কে খুঁজে পেতে চাইছেন। মোটামুটি এই সময়েই তার কবিতার ধারাবাহিক নিবিষ্ট কাব্যপাঠকের কাছে একটি ‘সাম্য রাইয়ানীয়’ উন্মুক্ত কবিতার হরিৎক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেছে বোঝা যায়। পাঠক যেন এত এত কবিদের ভিড়েও সাম্য রাইয়ানকে আলাদা করে চিনে নিতে পারছেন। এই চেনাটা অবশ্যই যে কোন কবির কাছে বড় শ্লাঘার, বড় আনন্দের। নিজস্ব কাব্যভাষা, ধ্বনিঝঙ্কার আর রূপকল্পের মুদ্রাগত ব্যবহারবিধিও কোন কোন ক্ষেত্রে সাম্য রাইয়ানকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে সাহায্য করছে। গদ্য কবিতার চলমান বাক্যস্রোতের মধ্যে অবিকল মুখের কথাকে (তা সে দেশি-বিদেশি যাইহোক না কেন) প্রবেশ করিয়ে দেবার শৈল্পিক দক্ষতা তার কবিতার সুর আর স্বরকে আলাদা করে দিয়েছে সন্দেহ নেই—

“অসংখ্য দুপুরের কথা বলা যেতে পারে, অগণিত মেয়েদের নাম। নির্ঘুম রাতের গল্প বলা যেতে পারে, অথবা দূরের কোনও গ্রাম। কোন গল্পে সূর্য অস্ত যাবে, ভেবে তুমি ছুঁড়ে দাও জ্যৈষ্ঠের রোদ। আহত ফুলের পাশে গেঁথে রাখো শিশুদের হাসি। সকলই দরকারি, কেবল মানুষ অহেতুক। বিচিত্র বেদনা পুশ করছে খেলাচ্ছলে। কাঁদছে অক্টোপাশ, প্রসাধনহীন চোখে...”১৬

‘হালকা রোদের দুপুর’ খুব দ্রুত ছুটে চলা অশ্বের নিয়ন্ত্রণ অশ্ব আরোহীর হাতের লাগামে সুতীব্র ভাবে আঁটা থাকে। ঘোড়া যত জোরেই ছুটতে পারে পারুক— আমি ঘোড়া ছোটাব আমার প্রয়োজনমতো। কবি দুপুরের রোদ চাইছেন, স্বাভাবিকভাবে সেই রোদ যেমনই হোক দুপুর মানে তার তীব্রতা থাকবে, সেই দুপুরের হালকা রোদের কল্পনা— কল্পনাতেই সম্ভব। হয়ত কবি দ্বিপ্রাহরিক তীব্রতাময় কড়া অনুভব হালকা চালে পাঠকসমীপে আনতে চাইছেন। আর এই কারণেই রোদের দুপুর কিন্তু হালকা, বলতে গেলে শীত-সকালের দুপুরের হালকা রোদ প্রার্থনার মতো মুখরোচক অনুভব কবির চোখে পড়েছে যা উন্মোচন করার জন্য এরকম একটি হালকা রোদের দুপুর চাইছেন—

“এক চশমায় কেটে যাচ্ছে দিন— কী করে! আগে তো কাটেনি, হেলায় হাত থেকে পড়ে অথবা চাপাচাপি— ভেঙে যেত কাচ। তখন, রোদের দুপুরে কথা বলতো না চোখ। নির্বাক চলচ্চিত্রসমেত হাসি হাসি মুখ। শব্দ ছাড়াই কোলাহলে নকল উল্লাস। যেন দিবসশেষের ঘুম, অনিবার্য! গোপনে চেয়েছিলো মেঘ, দূরের আরাম। কিছুই পায়নি সে, এই কথা ভুল হবে বলা। কাচের দেহরক্ষী নিয়ে আড়াল করেছে চোখের যৌনজীবন।”১৭

একদম হালকা চালে প্রসাধিত শব্দ বাক্যবাণ একটি একটি করে ময়দানে ছেড়ে দিলেন কবি। শব্দব্রহ্ম মহাশূন্যে একটু ঘোয়াঘুরি করার পর একসময় ঠিকঠাক জায়গায় মোক্ষম লক্ষ্যে এসে গেঁথে গেল। অপমানের তীব্রতাবোধ হালকা রোদের দুপুরে ‘লম্বুকা ঝটকা ধীরে সে লাগে’-র রেশ ধরে পাঠকমনে বেশ লাগল। প্রাতিবেশিক কারণে যোগ্যতমের বেঁচে থাকার তীব্রতায় জটিল জীবনচক্রে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলে বদলে নিচ্ছে। বুদ্ধি-মেধার সাথে ধূর্ততার মিশেলে কখনও কখনও নিজেকেই ভুল বুঝতে শুরু করছে। আর আমাদের এই সময়ের চৌখশ কবির চোখ এড়াবে কী করে! — ‘কাচের দেহরক্ষী নিয়ে আড়াল করেছে চোখের যৌনজীবন।’ ভয় লাগে এখন থেকে চশমাধারী যে কোন মানুষ দেখলেই সাম্য রাইয়ানের কবিতা পড়েছে এমন পাঠকের স্মৃতিতে জেগে উঠবে না তো— ‘চোখের যৌনজীবন’-বার্তা! যদি জাগে, আমার মতে সাম্য রাইয়ান তাহলে একজন কবি হিসেবে সার্থক। কৃষকের হাতের কাস্তে দেখে আমাদের মানসচোখে ‘কাস্তেকবি’ দীনেশ দাসের কথা মনে আসে, ডাকবাহক পিয়ন দেখলে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’-কে মনে পড়ে, রেলস্টেশনে কুলিকে দেখলে কাজি নজরুল ইসলামের ‘কুলি মজুর’-কে মনে পড়ে, তেমনি আমাদের কাছে ‘সোনালি কাবিন’-র প্রসঙ্গ এলে আল মাহমুদ, বাংলাভাষা, মাতৃভাষার উচ্চারণ প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানকে আধুনিক বাংলা কবিতা পাঠকের মনে বাজবে সেই কবি এবং কবিতার ধুন। সাম্য রাইয়ানের ক্ষেত্রে এরকমভাবে তাকে মনে পড়ার মতো চিত্রকল্প জড়ানো কাব্যচরণ তো আছেই। ‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থের ‘হৈ হুল্লোড় নিষেধ’ চরণটিই আগামীতে প্রবাদবাক্য হতে যাচ্ছে। ‘হালকা রোদের দুপুর’-এ লিখিত কবির নিসর্গ এবং সমাজ অধীত বিদ্যা হালকা মেজাজে খররৌদ্রপ্রতাপবিকিরণক্ষম অনুভব পাঠকের মনে গেঁথে থাকল।

সাম্য রাইয়ান দুহাত খুলে বুক চিতিয়ে লিখে চলেছেন, কাব্য মায়াপ্রপঞ্চের ফলভারী নোয়ানো মাথার ডালে ডালে হাসিফল, বিষাদফল, বাসনাফল উন্মেষ বেদনার অস্থির—প্রমত্ত প্রয়াস আধুনিক বাংলা কবিতার অঙ্গননন্দিত প্রতিভাস আজ না হোক কাল পাঠকমুখে ঘুরে ঘুরে আসবে। লোকাল ট্রেনের জার্নাল ধরে যে মুক্তগদ্যের সাহিত্যরথে তিনি চড়ে বসেছেন, তাতে শূন্যদশক পরবর্তী সাহিত্যের ইতিহাস উশখুশ মাথা বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরও সবাইকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। আমাদের হাসি কান্নার মেঘ রৌদ্র, দৈনিক যাপনচক্রের সকাল- সন্ধের নুন পান্তা, যৌনতার চাপা ও ধুন্ধুমার উত্তাপ পরবর্তী  প্রত্যাশাঞ্চলে আর কেউ থাকুক না থাকুন জেগে থাকবে একমাত্র ‘কবিতা’। এক আকাশ অন্ধকারে একটি ধ্রুবতারার উজ্জ্বল চোখ সারা রাত বিনিদ্র কাটাবে। আমাদের বাংলা কবিতা অবশ্যই আজকের দারুণ-দহনদিনে তপ্ত হাতের তালুর ওপর হাত রেখে বলবে— মনে পড়ছে সেই কবিতা ? মনে পড়ছে একটি শিশির বিন্দু একটি ঘাসের ওপর আনন্দ হয়ে ভাসছে...

তথ্যসূত্র:
১। সাম্য রাইয়ান, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, কাব্যগ্রন্থের ব্লার্বে লিখিত অংশ থেকে চয়িত।
২। সাম্য রাইয়ান, ‘মহাকোলাহল’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ- ৭
৩। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,’ প্রাচীন সাহিত্য’, ‘মেঘদূত’, www.bengaliebook.com, Page-12
৪। সাম্য রাইয়ান, ‘মেশিন’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ- ৯
৫। সাম্য রাইয়ান, ‘হরিণীর নাভি’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ-৩৫
৬। সাম্য রাইয়ান, ‘রূপমকে’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ-২৮
৭। সাম্য রাইয়ান, ‘বাঘ’, ‘মার্কস যদি জানতেন’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃ-৩
৮। সাম্য রাইয়ান, ‘পরিচয়;, ‘মার্কস যদি জানতেন’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃ-৮
৯। সাম্য রাইয়ান, ‘হলুদ পাহাড়’, ‘হলুদ পাহাড়’, বাঙ্ময়, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: আগস্ট ২০১৯, পৃ-৭
১০। সাম্য রাইয়ান, ‘জবাগাছ’, ‘হলুদ পাহাড়’, বাঙ্ময়, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: আগস্ট ২০১৯, পৃ-১৯
১১। সাম্য রাইয়ান, ‘হামিং বার্ড’, ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২০, পৃ-১৮
১২। সাম্য রাইয়ান, ‘এই বরষায়’, ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২০, পৃ-২১
১৩। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: চার’, ‘লিখিত রাত্রি’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২২, পৃ-১২
১৪। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: ঊনপঞ্চাশ’, ‘লিখিত রাত্রি’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২২, পৃ-৫৭
১৫। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: এক’, ‘হালকা রোদের দুপুর’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৩, পৃ-৯
১৬। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: বাইশ’, ‘হালকা রোদের দুপুর’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৩, পৃ-৩০
১৭। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: তেত্রিশ’, ‘হালকা রোদের দুপুর’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৩, পৃ-৪১

❑ সৈয়দ আহসান কবীর 

সাম্য রাইয়ান সময়ের বিপরীতে হাঁটা শব্দসাধক৷
শব্দের প্রজ্জ্বলিত শিখা তাঁর কবিতায় প্রাঞ্জলতা ছড়ায়। অন্যরকম মনে হয়। জেগে ওঠার অনুভূতি জাগায়। রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতার আনাচেকানাচে ঘোরে তার শব্দতীর; খুঁজতে থাকে কুপিবাতি। পাঠিকা-পাঠকের চোখে, মনে, মগজে গেঁথে দেন অস্থির বাস্তবতার প্রশ্ন। তিনি কবি সাম্য রাইয়ান।

সম্প্রতি ‘মার্কস যদি জানতেন’ তার কাব্যগ্রন্থটি পড়ছিলাম। পড়তে গিয়ে ‘ম্যাডামের দেশে’ ঘুরে এলাম। যেখানে তিনি লিখেছেন- “...এটা দাস ক্যাপিটালের যুগ/ ঘরে ঘরে মার্কস ঢুকে যাবে।” আমি অভিভূত।

কাব্যগ্রন্থজুড়ে অধিকাংশ কবিতায় কবি সাম্য রাইয়ান সমাজের আধখোলা চোখ বর্ণনায় মত্ত হয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। শীতল দ্রোহের গনগনে শব্দরা ভর করেছে পংক্তিমালায়। প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন সাদামাটা ভাষায়; রেখেছেন ধোঁয়াশা। যদিও পড়তে গিয়ে কিংবা ভাব বুঝতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়নি। উপমা, অলংকরণ, চিত্রকল্প সৃষ্টি করেনি জটিলতা। মেটাফোরিক্যাল কবিতাগুলোও হৃদয় ছুঁয়ে গেছে; গাম্ভীর্যের আতিশয্যে দুর্বোধ্য হয়নি।

কিছু কবিতায় তুলে ধরেছেন তার নিবিড় পর্যবেক্ষণ। ‘বিশ্বরূপ’ শিরোনামে লেখা কবিতায় তাই হয়তো কবি লিখেছেন- “চর্বিত মগজের পাশে হাতঘুড়ি ঝুলে আছে হৃদয়ের গোপন কোটরে।” ‘যুদ্ধবাদ’ কবিতায় লিখেছেন- “বোমারু রোবটের হাতে শব্দের ঝুলি, ক্রমিক সংখ্যার মতো নিক্ষেপ করছে তীব্র অপরিকল্পিত শব্দের ফোঁটা; ফলত পাখিরা হচ্ছে মানুষের মতো- চিৎপটাং। অস্থিরতার মতো ভয়াবহ পৃষ্ঠাগুলো অকপটে সঙ্গী হচ্ছে মানুষের। অতিদূর নক্ষত্রের মতো আবছা হলে দূরবর্তী দৃশ্যের ছায়া, আমি তবে কীভাবে তোমাকে ছোঁব?”

কবি সাম্য রাইয়ানের ওপর হাইকু’র ঢঙেও কবিতা ধরা দিয়েছে। যদিও সেখানে তিনি সমাজ সদস্যদের অবয়ব তুলে ধরতে সচেষ্ট থেকেছেন। উঠিয়ে এনেছেন মানুষের মতো দেখতে কারও কারও মধ্যে লুকিয়ে থাকা নিকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য। তাদের ‘পরিচয়’-এ তাই তিনি বোধ করি লিখেছেন—
“তুমি কি তাহার কুকুর?
লেলিয়ে দিয়েছে বলে
আক্রোশে ছুটে এলে!”

কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতা ‘মার্কস যদি জানতেন’-এ রাষ্ট্রের অধিবাসীদের প্রতি নান্দনিক খেদ প্রকাশ করেছেন। আগের নির্ভয় দিনগুলোকে প্রথমে তিনি তুলে ধরে পরে বর্তমান বাস্তবতাকে পঙ্ক্তিমালার পর্বে পর্বে এঁকেছেন। পরে ফের ফিরেছেন কালজয়ী মার্কসের কাছে। বলেছেন— “মার্কস যদি জানতেন/ অন্ধকারেও কত কাণ্ড ঘটছে রোজ।” আর শুরুতে নির্ভয় দিন এঁকেছেন এভাবে—
“বড় ভালো ছিল সেই প্রেমিকাসকল
খুব ভোরে স্নান করে নিতো— হেসে খেলে
ওরা ধোয়াজামা গায়ে খোলা ময়দানে যেত।”

কবি কবিতার প্রতি দায় রেখেছেন। বলেছেন কবিজীবনের কথা। সোচ্চার হয়েছেন শব্দবুলেট ছুড়তে। সচেষ্ট হয়েছেন জোরালো বক্তব্যের মাধ্যমে কবিত্বের নিজস্ব সত্তা ঘোষণায়। তিনি লিখেছেন— 
“যদি অব্যাহত বেঁচে থাকি
শ্বাস নিই গ্যালন গ্যালন;
প্রতিটি রক্তফোঁটা থেকে শব্দ জন্মাবে আর
গহীন থেকে বেরুবে নির্ভীক সিরাজ সিকদার।”
এ দৃঢ়তা কবিকে কাব্যসময়ের সিঁড়িতে কাল ধরে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

‘বাঘ’ লেখাটি একটি চমৎকার অণুগল্প হতে পারত। লেখাটি সমাজের দর্পণ বটে। সত্য ও ন্যায়ের মলিন প্রচ্ছদে উঠে এসেছে আলো ও কালোর পার্থক্য। যদিও কবিতা হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। সব মিলিয়ে গ্রন্থটি পড়ে আমার মনে হয়েছে— কবি সাম্য রাইয়ান সময়ের বিপরীতে হাঁটা নিপুণ শব্দসাধক। যা তাকে বিশেষত্ব দিচ্ছে, পরেও দেবে বলে বিশ্বাস।

দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকা থেকে সংগৃহীত৷

❑ স্বাগতা বিশ্বাস 

নয়ের দশকের কবি সাম্য রাইয়ান তার কবিতার মাধ্যমে এপার ওপার দুই বাংলার পাঠকের হৃদয়ে স্থান নিয়েছেন। এই সোস্যাল মিডিয়ার জগতে দূরকে আর দূর মনে হয় না। কবি সাম্য রাইয়ান বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের কবি হয়েও আমাদের ভারতের কবিতাপ্রেমী পাঠকের অন্তরের অন্তঃস্থলে ও মস্তিস্কে প্রবহমান নদীর মতো বয়ে চলেছে তাঁর কাব্যরসধারা স্রোত। তাঁর বিভিন্ন কাব্য কবিতার মধ্যমে পাঠককুল ছাড়াও কোন এক উদ্দীপনা যেন কাজ করে। এই পর্যন্ত তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হল— ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’ (গদ্য ২০১৪), ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ (কবিতা ২০১৫), ‘মার্কস যদি জানতেন’ (কবিতা ২০১৮), ‘হলুদ পাহাড়’ (কবিতা ২০১৯), ‘চোখের ভেতর হামিং বার্ড’ (কবিতা ২০২০), ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ (মুক্তগদ্য ২০২১), ‘লিখিত রাত্রি’ (কবিতা ২০২২), সম্পাদিত গ্রন্থ– ‘উৎপলকুমার বসু’ (২০২২) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

কবি সাম্য রাইয়ানের ‘মার্কস যদি জানতেন’ (২০১৮) কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ১৪টি কবিতা রেখেছেন। তার মধ্যে প্রথম কবিতা নাম— ‘বাঘ’কবিতায় মেয়েটি যখন বাঘের মাংস খেতে চাইল, তখন বাজারে কোথাও বাঘের মাংস না-পাওয়ায় তারা সপরিবারে জঙ্গলে বাঘ শিকারের জন্য রওনা হল। এবং সেখানে শুধু বাঘ শিকারই নয় মানুষও (স্ত্রী কন্যা) শিকার হল। যার পরিণতি দেখা যায়— বারো বছরের জেল বা কারাদণ্ড। কিন্তু এখানে পশুশিকারের জন্য বারোবছর কারাদণ্ড হলেও মানুষ বা জীবন শিকারের দণ্ড বা সাজা হয় না। এই কবিতায় বন্য পশুজীবনের দাম থাকলেও মানুষের জীবনের কোন মূল্য নেই—
“বড় ভাল ছিল সেই প্রেমিকাসকল
খুব ভোরে স্নান করে নিতো— হেসে খেলে
ওরা ধোয়া জামা গায়ে খোলা ময়দানে যেত।
...
মার্কস যদি জানতেন
অন্ধকারেও কত কাণ্ড ঘটছে রোজ।”

এই কবিতায় মেহনতি মানুষ ও তাদের শ্রম জীবনকে তুলে ধরেছেন। কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ’মানব জীবনের সমাজে যে তাদের উত্থান-পতন ও ধনীরা আরও ধনী এবং গরীবেরা আরও গরীবে পরিণত হচ্ছে—তাদের জীবন যাপনকে সমাজে সুন্দরভাবে বোঝাতে চেয়েছেন। তা এই কবিতার মূলভাব হিসেবে উঠে আসে। সমাজের শাসন ও শোষণ কীভাবে ঘটে চলেছে এবং এর প্রভাবে বেকার যুবকগণ তাদের বহু মূল্যবান সময়কে সঠিক কাজে লাগাতে পারছে না। তারা তাদের জীবনের গভীর ও মূল্যবান সময়কে বন্ধুদের সঙ্গে ধুলো বা ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কোন এক সময়ে এই কালো অন্ধকারে ঢাকা মেঘ সরে গিয়ে বৃষ্টির আকারে ঝরে পড়বে, সেই সময় সূর্যের কিরণে আকাশ ভরে উজ্জ্বল রামধনু রঙে রঙিন হয়ে ফুটে উঠবে এবং মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের মুখে নিশ্চিন্তির হাসি ফুটে ঊঠবে। কারণ মার্কস চেয়েছিলেন এক সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে। এইভাবে কবির মন-ভাবনাকে সুন্দরভাবে কাব্যব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। কবি সাম্য রাইয়ানের লেখা আর একটি কাব্যগ্রন্থ হল ‘হলুদ পাহাড়’ (২০১৯)। কাব্যগ্রন্থটির নামকরণে বিশেষভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছায়া পড়েছে। প্রকৃতিকেন্দ্রিক বা নিসর্গপ্রীতির স্বর্গীয় অনুভব এই কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে। পাহাড় মূলত প্রকৃতির সম্পদ। আর এই সম্পদ আধারের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ফল গুল্মজাতীয় ঝোপ ঝাড় নানাবিধ গাছপালা আর পতঙ্গ পশুপাখি্দের দেখা যায়, আর এইসব কিছুই প্রকৃতি সৃষ্ট। প্রকৃতির ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই গ্রহের মানব থেকে সমস্ত জীবিত সত্তার আলাদা করে কিছু করার চুল-পরিমাণ ক্ষমতা নেই। প্রকৃতি যেভাবে নিজেই নিজের সৌন্দর্যকে সৃজন করে সেইভাবে সেই সৌন্দর্যের আনন্দ নিকেতনে সমস্ত প্রকৃতিসৃষ্ট বাসিন্দাকে সমানভাবে স্থান করে দেয়, ফুল ফল খাদ্য বাসস্থান দিয়ে নিজেও বাঁচে অন্যকেও বাঁচিয়ে রাখে। নিজেও পতঙ্গের মতো উড়ে যেতে পারে—
“পাশ ফিরে ঘুমুচ্ছিলাম। হাওয়া কল জাগাচ্ছিলাম। জামরুল বন থেকে আবছা তাথৈ একা, গান শেষে ফিরে এলো।”
(পতঙ্গ ডানা/ হলুদ পাহাড়)

প্রকৃতির পাগলামিতে চারিদিক হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এবং সেখানে নদী তার পুরোনো ছন্দে ফিরে এসেছে প্রতিবাদ জানাতে। তুমুল নদী পতঙ্গ ডানাদের ডাকছে ভালোবাসার মিহি হাতছানি দিয়ে। তারা বিপুল পরিমানে প্রকৃতির উন্মুক্ত চরাচরে অতি মধুর মিষ্টতা নিয়ে ফিরে এসেছে প্রকৃতির বারান্দায়। কিন্তু কবির ভাবনায় প্রকৃতির স্বয়ংক্রিয় সৌন্দর্য মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে থাকলেও তার মধ্যে যে বিকারহীন একটা যন্ত্রণা আছে— তা কবি অনুভব করেছেন। এই যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসার উন্মাদনা আর প্রাণতা কবির চেতনায় কবিতার বর্ণে বর্ণে অক্ষরে অক্ষরে পাহাড়ের ঢালুপথে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো গড়িয়ে গড়িয়ে ফিরে আসে। সেখানে কোন অজুহাত নয়— খোলামেলা সত্যতার শ্বেতশুভ্র নিবিড় স্পর্শ দিয়ে। মুক্তকেশী নারী বাধ্যবাধকতাহীন স্বাধীন–উন্মুক্ত নির্মল উচ্ছ্বলতায় বেঁচে থাকতে চায়। মুক্তমনে প্রকৃতির রণরঙ্গে মেতে স্বচ্ছন্দ্যে এগিয়ে যেতে চায়। প্রকৃতি এবং নারী উভয়েই সৌন্দর্যের আধার। তাদের বেদনাগুলোও প্রকৃতির মতো একই রকমের। কোন একটি ছোট চারাগাছ যে কত জল, ঝড়, কড়া রোদ সহ্য করে বড় হয়। ঘৃণা এবং ঘাত সহ্য করে সেই চারাগাছ একদিন বৃক্ষে পরিণত হয়। ফল, ফুল ছাড়াও প্রাণীকুলের প্রাণদায়ী প্রাণবায়ু দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে এই পৃথিবী গোলার্ধের সজীব সত্তা। ঠিক তেমনি একজন মানবী কন্যাকেও ছোট থেকে বড় হতে গিয়ে তাকে নানাবিধ সামাজিক পারিবারিক এমনকি মানসিকভাবে কষ্ট  যন্ত্রণা সহ্য করে শিশু থেকে নারীতে রূপান্তরিত হতে হয়।
“মাথায় ফিতে বাঁধা শিখতে শিখতে ঘন হলুদের বুকে বিঁধে যাওয়া উভয় বেদনা একফুল থেকে ভীষণ রাইপথ বেয়ে উঠে যাবে জানতাম— সজাগ হরিণীর ছায়ায়। কোমলমতী কদমফুলের দিকে, তুমি মূঢ়, তুমি জলবৎ তরলং।”
(পতঙ্গডানা/ হলুদ পাহাড়)

প্রকৃতির কোলে পতঙ্গরা তাদের ডানা পেয়ে কন্যা থেকে নারীতে পরিণত হবার মতোই পতঙ্গ ডানা হয়ে কোমলমতি কদমফুলের দিকে ছুটে চলে। কবি সাম্য রাইয়ান তাঁর ‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতায় দিয়েছেন, একটি নতুন স্বপ্নদ্বীপের সন্ধান, একটি স্বপ্নবীজের সন্ধান—
“ভাবছি, কাউকে বলবো একটা পাহাড়ের ছবি বানাতে। হলুদ পাহাড়, তার উপরে মেঘ, শাদা শাদা মেঘ। দূর থেকে দেখে গাদা ফুল ভেবে ভ্রম হবে মানুষের। ওরা খুশি হবে। মানুষ ভ্রমে প্রকৃতই আনন্দ পায়। পাহাড়ে উঠবে সকলে। কেউ কেউ পকেটে কিংবা পাটের ব্যাগে ভ্রমের আনন্দ ভরবে। 
কিন্তু হলুদ পাহাড়ে হৈ-হুল্লোড় নিষেধ।”
(হলুদ পাহাড়/ হলুদ পাহাড়)

কবির এই কবিতাটিতে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে একটি ভাবনা উঠে এসেছে তা হল—ভ্রম বা ভুল। ‘হলুদ পাহাড়’ বলতে কবি এখানে ভ্রমের পাহাড়কেই বুঝিয়েছেন। যে ভ্রমে মানুষ ভেসে চলেছে। হলদে গাঁদা ফুলের পাহাড় মনে করে পর্যটনবিলাসী মানুষ ছুটে চলে যাবে। কিন্তু সেই হলুদ পাহাড়ে খুশি বা আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। সেটা তো একটা মনের ভ্রম, ভ্রমের কোন স্থায়িত্ব নেই। এই ভ্রমে মানুষ তাৎক্ষণিক আনন্দ পেলেও তা কোনদিন চিরস্থায়ী নয়। আবার দেখা যাচ্ছে এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দকে পেতে সকলে ভ্রমকেই সঠিক বলে মনে করে বুক পকেটে বা চটের ব্যাগে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখনকার সমাজে মানুষ সত্যি বা আসল বস্তু ছেড়ে, মিথ্যে বা নকলের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। এটা সঠিক নয় জেনেও— বেঠিক বা ধোঁয়াশার পেছনে ছুটতে পছন্দ করে— ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর তা জেনেও অনেকেই ধূমপান থেকে বিরত থাকতে পারেনা। এমনই অপ্রতিরোধ্য ভ্রমের শিকার এই গ্রহের মানুষ।

‘লিখিত রাত্রি’(২০২২) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত মোট পঞ্চান্নটি কবিতা আছে। কবিতাগুলি প্রতিটির আলাদা করে নাম নেই। সংখ্যা দিয়ে প্রতিটি কবিতা আলাদা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম কবিতা থেকে শেষ কবিতার মধ্যে সূক্ষ্ণ আন্তর-যোগ এবং ভাবসূত্র রয়েছে। আর কবিতাগুলির অন্যতম বিশেষত্ব হল প্রতিটি কবিতারই চরণ সংখ্যা পাঁচ। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি ঠিক এইরকম—
“ভূগোল ক্লাসের স্মৃতি ভুলে গেছি তমোগুণে! মধ্যরাতে
মনে পড়ছে না কোনোমতে, যেন স্মৃতিখণ্ড জমা নেই
কোথাও; নির্জনে ডাহুক ডাকে নাই বুঝি সারাংশসমেত।
কী বলি—কার কাছে বলো, সকলই সকল; তুচ্ছ আলো।
ও মরণ-রাত্রির ত্রাতা, অনাহূত বেদনায় ন্যুব্জ জীবন।”
(লিখিত রাত্রি/ সংখ্যা ১)

এই মানবিক পৃথিবীতে সমস্ত কিছুই তুচ্ছ। যেমন জীবন আছে, জীবন আছে বলেই জীবনের এত স্বতঃস্ফুর্ততা, কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে এই জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। এই আছে তো এই নেই। সেখানে ‘অনাহূত বেদনায় ন্যুব্জ জীবন’। স্মৃতি এমন এক জিনিস যা খুব গভীর হলেও কখনো কখনো আবছা বা ধোঁয়াশা হয়ে যায়। মিষ্টি মধুর সুখদ স্মৃতিগুলো মন থেকে সরে যেতে চায় না আবার কোন বেদনাদায়ক স্মৃতি যা মনে থাকলেও সবসময় মাথায় থাকে না। তা ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। কোন আনন্দদায়ক ঘটনা যেমন আমাদের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয় তেমনি দুঃখজনক ঘটনা ভুলে থাকতে চাইলেও ভুলতে পারা যায় না— ‘লিখিত রাত্রি’ কাব্যগ্রন্থের ২৭ সংখ্যক কবিতা এই প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য—
“কত আকৃষ্ট হয়েছিলেম, ছবিতে দেখে তাকে
মৃদু ভালোবাসা ধীরে- তপ্ত ও গতিময় হলে
ছুটে গেলাম, ছুঁয়ে দেখলাম গায়ে হেলান দিয়ে।
স্মৃতিতে এখনো সবটা মনে আছে; অথচ সেদিন
দোয়েল বলেছিল, বৃক্ষ আমাকে মনে রাখে নাই!’’

কবি ছবি দেখে আকৃষ্ট হয়েছেন এবং তাকে মৃদু ভালবাসার আঁচ ধীরে ধীরে তপ্ত গতিময় হয়ে উঠেছে কিন্তু তা এখন কেবল স্মৃতিমাত্র। তা ছুঁয়ে দেখা সম্ভব হবে না, কারণ বৃক্ষ আর তাকে ঠিক মনে রাখতে পারেনি।

কবির ‘লিখিত রাত্রি’ কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় ঘুমের ঘোরে ক্রোধের বহির্প্রকাশ করছিলেন। তার পা এগিয়ে যাচ্ছিল নিশাচর প্রাণী হয়ে নৃত্যরত রাত্রির দিকে। রাতজাগা নিশাচর পাখি পেঁচার সঙ্গে কবির এই রাত্রিকালীন অভিযানকে ধরা যেতে পারে। নিশাচর পাখির ডানার আড়ালে লাফিয়ে পড়ে হেলিকপ্টার। আর তা বিষাদগ্রস্ত ভ্রমে পরিণত হয়। ফেলে আসা রাত্রির বেদনাগুলি ঘুমের ভেতর এক এক করে জেগে ওঠে।

কবি তাঁর কাব্যগুলির মধ্যে আধুনিক বাংলা কবিতার ছন্দ, বিশেষ করে মুক্ত গদ্যছন্দের সুচারু ব্যবহার ছন্দের অনুষঙ্গে আসা নানাবিধ প্রতীক, চিত্রকল্প, শব্দ এবং ভাবের অনুষঙ্গে নিজস্ব বাক্যশৈলীর চমকপ্রদ ব্যবহার রেখেছেন। শব্দের অবয়বে চোখের সামনে বিষয় বা ঘটনার চলচ্চিত্রায়ন ঘটে যাচ্ছে যেন! সাম্য রাইয়ান শূন্য দশক পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতার একজন একনিষ্ঠ কবি এবং সাহিত্যসাধক। সব্যসাচীর মতো দু’হাতে লিখে চলেছেন। সম্পাদনা করছেন করে চলেছেন বিভিন্ন কালজয়ীগ্রন্থ আর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদনা করে চলেছেন ‘বিন্দু’ পত্রিকা। যা একইসঙ্গে এপার ওপার বাংলায় সাহিত্যরসিকপ্রিয়তা লাভ করেছে।

❑ ড. অমিতাভ কর 

খুব সম্প্রতি এক কবির কবিতার বই পড়ে মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে আছি৷ আমি জানি না, সাম্প্রতিককালে বাংলা ভাষায় কোনো কবির পরপর সবগুলো কবিতার বই পড়ে এত নির্মল আনন্দ, না আমি অন্তত, ইদানিংকালে আর পাইনি৷ বে‌শির ভাগ ক‌বিরই প্রথম বই আর শেষ বইয়ের তেমন কোন পার্থক্য খুঁজে পাই না। প্রথম বই থেকে তারা যেন একই কবিতা লিখে যান শেষ গ্রন্থ পর্যন্ত। এর কারন হলো, বে‌শিরভাগ লেখকই নি‌জে‌কে মূল্যায়ন কর‌তে পা‌রে না। এরা ক‌বি হিসেবে অনগ্রসর গোত্রের। সম‌য়ের  সা‌থে সা‌থে চিন্তা না বদলা‌লে ক‌বিতা অগ্রসর হয় না। ক‌বিতা নামক ভাষার যে ফলাফল তা চিন্তারই প্র‌তিফলন। কবি ব্যক্তিটির চিন্তার বিকাশ ঘটলে তবেই না নতুন ক‌বিতা জন্ম নি‌বে!

অসাধারণ এই কবির হাতে লিখিত হয়েছে একগুচ্ছ যাদু-কবিতা৷ তার চিন্তাবিশ্ব রঙিন (colorful) এবং প্রকাশভঙ্গি অনন্য (Unique)৷ বারংবার পাঠের আবেদন সৃষ্টিতে সক্ষম৷ সদা নিরীক্ষাপ্রবণ এই কবির নাম সাম্য রাইয়ান৷ যিনি জন্মগ্রহণ করেন ৩০ ডিসেম্বর, নব্বইয়ের দশকে কুড়িগ্রাম জেলায়। ২০০৬ থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প-সাহিত্যের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু’ (www.bindumag.com)৷ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখছেন। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরণের আখ্যানধর্মী গদ্য৷ প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট [গদ্য, ২০১৪]; বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা [কবিতা, ২০১৫]; মার্কস যদি জানতেন [কবিতা, ২০১৮]; হলুদ পাহাড় [কবিতা, ২০১৯]; চোখের ভেতরে হামিং বার্ড [কবিতা, ২০২০]; লোকাল ট্রেনের জার্নাল [গদ্য, ২০২১]; লিখিত রাত্রি [কবিতা, ২০২২] ও হালকা রোদের দুপুর [কবিতা, ২০২৩]৷ সম্পাদিত গ্রন্থ : উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২], জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [প্রবন্ধ সংকলন]৷

তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমি আলোচনাযোগ্য অনেক প্রসঙ্গ খুঁজে পেয়েছি৷ বাংলার পাখি, ফুল, প্রেম, নদী নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন তিনি, যা প্রাচীনপন্থী ধারার চর্বিতচর্বন নয়৷ শুধু ‘হালকা রোদের দুপুর’ বইয়েই ‘ফুল’-এর চৌদ্দরকম ব্যবহার চোখে পড়ে৷ এমন নান্দনিক উপস্থাপন, যেখানে ফুলের চিত্রকল্প কবি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা বাস্তবে এগজিস্ট (Exist) করে নাকি পুরোটাই কবির কল্পনা এ নিয়ে আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছি না৷ ফুল বিশেষজ্ঞগণই এ বিষয়ে যথাযথ মন্তব্য করতে পারবেন৷ যেমন পাঁচ নং কবিতায় কবি লিখেছেন, “অতলে নেমেছো তুমি— কামিনী ফুলের সন্তান, তাকাও তাকাও চোখ বড় করে ফুলবতী মায়ের দিকে।” মাকে ‘ফুলবতী’ উপমায় ভূষিত করা আমার কাছে অভিনব মনে হয়েছে৷ আবার বারো নং কবিতায় তিনি লিখেছেন, “ঘন কালো রোদ, আর তাতে ব্যর্থ ফুলগুলো শুধুই বিড়বিড় করছে পাহাড়-পাহাড়।” এই পংক্তি পাঠে প্রথম কৌতুহল তৈরি করছে ‘ব্যর্থ ফুলগুলো’৷ প্রশ্ন জাগে ফুল ব্যর্থ হয় কী করে? এমন নতুন উপমা-রূপকের ব্যবহার আশ্চর্য করে৷ আবার রোদের রূপ তিনি কালো রঙে দেখছেন, এ যেন রোদের তীব্রতা বোঝানোরই প্রয়াস৷ ফুলের সফলতা হতে পারে পুরোপুরি ফুটে ওঠা৷ কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলেই কেবল ফুল ব্যর্থ হতে পারে৷ হয়তো সেজন্যই ফুলগুলো ‘পাহাড় পাহাড়’ ডেকে উঠছে, পাহাড়ে যেতে চাইছে৷ যেখানে মানুষের হৈ-হুল্লোড় নেই, ফুটে ওঠার প্রক্রিয়ায় সফল হতে পারে ফুল৷ আবার পনের নং কবিতায় তিনি নতুন এক ফুলের সাথে পরিচয় করান পাঠককে, যার নাম ‘আলোফুল’, “তবে কি শুধুই শব্দরাগ, সবুজ ঘনঘোরে তুলে নাও কিছু আলোফুলের ঘ্রাণ।” আমি জানি না বাস্তবে এই ফুল সত্যিই আছে, নাকি কবির কল্পনা৷ একুশ নং কবিতায়, “তার ঘুমের ভেতর, স্বপ্নে, জন্ম নিচ্ছে ফুল। কিছু পথচিহ্ন জেগে আছে অচেনা ফুলের শরীরে।” এরকম আরো দুটো ফুলের উল্লেখ আমি করব ভিন্ন কবিতা থেকে৷ ছাব্বিশ নং কবিতায় তিনি ‘সূর্যলতা ফুলের’ কথা লিখেছেন, “আকস্মিক জেগে ওঠে সূর্যলতা ফুল, আকাশ দেখার ছলে, ছবির ছলনায়।” পয়ত্রিশ নং কবিতায় তিনি লিখেছেন, “হঠাৎই জ্যান্ত হলো মন্দাক্রান্তা ফুল।” আমরা মন্দাক্রান্তা ছন্দ সম্পর্কে জানি৷ সতেরো অক্ষর বিশিষ্ট এই শ্রেণীর ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতি পংক্তির বর্ণগুলি লঘু-গুরু ক্রমে নির্দিষ্ট ক্রমে বিন্যস্ত হয়ে থাকে। প্রতি পংক্তির বর্ণসংখ্যা এবং লঘু-গুরু ক্রমে বিন্যাসের বৈচিত্রভেদে রচিত প্রত্যেকটি ছন্দ এক-একটি বিশেষ নামে পরিচিত হয়ে থাকে। কিন্তু ‘মন্দাক্রান্তা ফুল’, এমন উপমার সাথে পরিচয় ঘটলো প্রথমবার৷ আমি কবির একটিমাত্র কবিতার বই থেকে ‘ফুল’ বিষয়ে সামান্য উদাহরণ দিলাম মাত্র, পূর্ণাঙ্গ নয়৷ তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থেও এরকম অজস্র বিষয় আছে, যা বিস্তারিত গবেষণার দাবি রাখে৷

তাঁর কয়েকটি কবিতায় বিদেশী পাখি, যেগুলো বাংলায় বিশেষ মৌসুমে অতিথি হয়ে আসে, তাদের কথা খুঁজে পেলাম৷ বিদেশী পাখিকে কবি এমনভাবে বাংলা কবিতায় এডাপ্ট (adapt) করেছেন, যাকে আর অতিথি বলে মনে হয় না, তা যেন চিরচেনা ঘরের সন্তান হয়ে ওঠে৷ তিনি যখন লিখেন, “চোখের ভেতরে একটা হামিংবার্ড নিয়ে বসে আছি”, তখন হামিংবার্ড আর দূরবর্তী বিদেশী পাখি থাকে না৷ এছাড়া বাংলার অনেক পাখির কথাও তার কবিতায় বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়৷ 

পাখি, মিথ সব একাকার হয়ে নতুন রূপে অলংকৃত করে তার কবিতা৷ উল্লেখ করা যায় ‘জীবনপুরাণ’ থেকে কয়েকটি পংক্তি, “মানুষই হরণ করেছে মানুষের সুখ! / আহা জীবন / কী বিচ্ছিন্নতাপরায়ণ / তীব্র স্বরে ডেকে যায় / নিঃসঙ্গ শালিক৷” শালিক পাখিকে ভারতীয় ময়না বলা হয়ে থাকে। গ্রাম শহর মফস্বল যেকোনো জায়গাতেই আমরা শালিক পাখি দেখে থাকি। এরকম লোকগল্প প্রচলিত আছে যে, সকালে এক শালিক দেখা অশুভ, আবার জোড়া শালিক দেখলে ভাগ্য ফিরে যায়। জ্যোতিষও বলে, এক শালিক দেখা অশুভ, জোড়া শালিক দেখা শুভ। প্রচলিত এই লোকগাঁথাই যেন উত্তর আধুনিক রূপ পেয়েছে সাম্য রাইয়ানের ‘জীবনপুরাণ’ কবিতায়৷ নিঃসঙ্গ অর্থাৎ প্রচলিত ‘এক শালিক’ দৃশ্যের সাথে মানুষের সুখহীন যাপনের গল্প একাত্ম করে তুলেছেন৷ ‘হালকা রোদের দুপুর–দুই’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন “পাখি নেই তবু ডানা ঝাপটানো আছে”। এই কবিতার শুরুতেই উঠে এসেছে সুররিয়ালিস্টিক ভাবনার অতিচেতনা— “ডানা আঁকো— সশব্দে ঝাপটাও”৷ সত্যিই যেন পাঠক দূর থেকে শুনে উঠছে ডানার ঝাপট— উড়ে যাচ্ছে রক্ত-মাংসে নির্মিত কল্পনার অবয়ব। কবির কবিতায় আমরা পরিচিত হই ভিন্ন এক প্রতিবেশের সাথে৷

সাম্য রাইয়ানের কবিতায় শাশ্বত নদী বাঙ্ময় হয়ে ওঠে বারবার৷ নদীতীরে জন্ম হবার কারনে নদীকে তিনি নিবিড়ভাবে দেখেছেন, অনুভব করেছেন৷ নদী কবির মধ্যে নিবিড় জলমগ্নতা তৈরি করেছে৷ যার প্রতিফলন তাঁর কবিতার পরতে পরতে লক্ষ্যণীয়৷ নদী-জল-তরঙ্গ এসব নতুন রূপ পেয়েছে তাঁর কবিতায়৷ মরা নদী প্রাণ ফিরে পেয়েছে যেন কবির কল্পনায়৷ নদীর স্রোতকে কবি রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করেছেন৷ নদীর সাথে কবির যে প্রেম তা বারবার উঠে এসেছে৷ ‘বসন্তের সনেট’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, 
“তোমার চুলের ভাঁজে
এক তোড়া সনেট গুঁজে দাও
মরা নদী ভাষা ফিরে পাবে।”

তাহলে কি প্রেমিকার চুলকে তিনি নদীর মতো দেখেন? ঢেউ খেলানো চুল নদীর ঢেউয়ের সাথে মিশে এক নতুন চিত্রকল্প তৈরি করেছে৷ যেখানে কবি ‘এক তোড়া সনেট’ গুঁজে দিয়ে আরো নান্দনিক প্রাণবন্ত করে তুলতে চেয়েছেন৷ প্রেম তার কাছে নদীর মতোই প্রকট ও প্রাণবন্ত! ‘হালকা রোদের দুপুর–তিরিশ’ কবিতায় তার প্রকাশ ঘটে, “ঘঁষা কাচের মতো প্রেম চলে এসেছিলো নদীর ছন্দে, উদ্বাস্তু পাতার অধিক।” যে কবি নিজের জন্মকে নদীজন্ম বলে স্বীকৃতি দেন, তিনি নদীর বহুরূপ দর্শন করেছেন একথা বলাই যায়৷ কখনো কি তিনি হতাশাও ব্যক্ত করেন? 

“কৈশোরসেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে এলাম শহরে।
কী আছে নদীর গভীরে? আস্ত মাতাল সাগর?
অথবা শামীম সৈকতের বাঁশি? কিছু নাই। —ছাই!
বৃথা নদীজন্ম, কৈশোরসেতু, সোডিয়াম আলো;
আমাদের কথা কেউ ভেবেছে, যারা ঘুমিয়েছে?”
(একত্রিশ/ লিখিত রাত্রি)

নদীমাত্রই বিশ্বমানবতার পথিকৃৎ। বিন্দু বিন্দু পানিরাশির অববাহিকায় উৎসস্থল পাহাড়ের অভ্যন্তর থেকে ছড়া, নদ-নদী, মহানদী, সমুদ্র, পানিপ্রবাত ও মহাসাগরের সৃষ্টি। নদী ছড়া উপত্যকার নামেই গ্রাম-শহরের পরিচিত। নদীর সাথে মানুষের আত্মীয়তার বন্ধন চিরকালীন৷ তারই প্রকাশ ঘটেছে নিম্নোক্ত কবিতায়,
“ওরা চায় আমি পাগল হয়ে যাই, একা হয়ে যাই
শহরে ঘুরিফিরি নিঃসঙ্গ মানুষ; আমার মৃত্যু হোক
জলের অভাবে নির্মম: বর্ণনাতীত। অথচ কতো
পাখি ফুল নদী বন্ধু হচ্ছে অকপটে; কী তুমুল
আড্ডা দিচ্ছি আমরা। সুযোগ নেই, হবো: একলা-পাগল।”
(কুড়ি/ লিখিত রাত্রি)

সমাজ গঠনে নদীর ভূমিকা প্রাচীনকাল থেকেই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। নদী মানুষের জীবনে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নদ-নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে মানবসভ্যতার ইতিহাস। নদ-নদীগুলো যেন মায়ের হাতে সন্তানস্নেহে লালন-পালন করে চলছে। তাই ব্যক্তিজীবনেও কবি নদীর সাথে একাত্ম (কবির ভাষায় ‘নদীমাতৃক’) হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন৷ ‘নির্বাসনের বনে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন,
“গাছটা অসুস্থ; ওকে ডাক্তার দেখাবো। হাতে অনেক কাজ এখন। তোমার কাছে ফিরে নদীমাতৃক হবো।”

নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে নদীর এক আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতার পত্তন ঘটেছিল। আর নদীকে কেন্দ্র করেই মানুষ তার বসতি স্থাপন থেকে শুরু করে জীবনযাত্রা নির্বাহের পথ খুঁজে পেয়েছিল। নদীর তীরে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল আফ্রিকার হাড্ডার অঞ্চলের মানবজাতি। আদি অনন্ত কাল থেকেই নদী ব্যবসা বাণিজ্যের, জনবসতি স্থাপনের, কৃষিকাজ, শিল্প ক্ষেত্রে ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রাচীনকাল থেকেই নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বড় বড় সভ্যতা যেমন নীল নদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মিশরীয় সভ্যতা, সিন্ধু নদকে কেন্দ্র করে সিন্ধু সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীকে ঘিরে সুমেরীয় সভ্যতা এবং চীনের হোয়াংহো ও ইয়াং সিকিয়াংকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চৈনিক সভ্যতা। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে নদীর সাথে মানুষের এক আত্মিক সম্পৰ্ক রয়েছে। আমাদের আলোচ্য কবি সাম্য রাইয়ানের জন্ম নদ-নদীর ধাম কুড়িগ্রাম জেলায়৷ তথ্যমতে, এখনো ষোলটি নদ-নদী বিদ্যমান এই জেলায়৷ নিজের জন্মস্থানকে তিনি মাত্র আট পংক্তির ‘তীব্র কুড়িগ্রাম’ কবিতায় উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত কাব্যিক দক্ষতায়,

“উত্তরে ফিরে এলে পূর্বমৃত মেঘ
অনিচ্ছায় প্রেম বাড়ে—পুরনো আবেগ৷

বলো কেন ষোলনদে জাগাচ্ছো প্রণয়
প্রবীণ জানেন সবই—ক্ষুব্ধ গতিময়৷

সোনাভরী–ফুলকুমর সুসজ্জিত মায়া
শহরের নাভিতে জাগে—ধরলার ছায়া৷

অগণন সম্পদশালী—আরও উচ্চ দাম
বেহিসেবী ঘুমন্ত মেয়ে—তীব্র কুড়িগ্রাম৷”

এখানেই সীমাবদ্ধ না কবি৷ কবি দেখেন, নদী মানুষকে আকর্ষণ করে৷ মানুষ দুঃখিত হলে নদীর কাছে যায়, উৎসবে নদীর কাছে যায়৷ এই অনুভূতি উঠে এসেছে তাঁর ‘জলের অপেরা’ কবিতায়,
“ডানা আঁকো—সশব্দে ঝাপটাও
ডাকছে ব্যাকুল নদী
শিহরিত
হেঁটে হেঁটে আমি পৌঁছলাম
নদীর কাছে৷ অনেক মানুষ—
যারা হৃদয় ফেলে এসেছে 
ধরলার জলে, সকলে
একত্রিত আজ৷ হারানো 
হৃদয়ের গান শুনছে মেয়েটি
ছেলেটিও৷
হাটু মুড়ে ওর পাশে বসি
আমি তো যাবো না কারো সাথে
তোমার উপশিরা
যেদিকে এঁকেছে পথ
শুধু সেই দিকে যাবো৷
অন্য কোনো জলে
যাবো না৷”

প্রাকৃতিক ভারসাম্য হ্রাসের ফলে নদী দিন-দিন হারিয়ে ফেলছে তার নাব্যতা। নির্বিচারে বন ধ্বংসের কারণে পাহাড়ের মাটি আগের মতো বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে না-পারায় থাকে না মাটি ছোঁয়া পানি। ফলে পৃথিবী আশ্চর্য শুষ্কতায় পরিণত হচ্ছে৷ কবি তাই লিখেছেন, “পৃথিবী এক ঢেউ ভুলে যাওয়া নদী!” মাত্র একটি পংক্তিতে সামগ্রিক ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে৷ ‘হারিয়ে ফেলা গান’ কবিতায় হারিয়ে ফেলা জীবনসুরের জন্য হৃদয়ের হাহাকার লিখেন এইভাবে,
“সহস্র শব্দের তোড়ে কদমফুলের পাশে
অনর্গল নদী৷ শতাব্দী পেরিয়ে বুঝি সমুদ্র
অথবা নিশ্চুব ডোবাবিশেষ৷ তেমন কিছুই না
সামান্য হাইফেন৷ হারিয়ে ফেলা সুরের জন্য
এখনো আমার আকাশ৷ খাঁ খাঁ—!”

কত কত নদীর নাম উঠে এসেছে সাম্য রাইয়ানের কবিতায়, তা নিয়ে বিস্তর অনুসন্ধান প্রয়োজন৷ ‘হালকা রোদের দুপুর–পনের’ কবিতায় তিনি দিয়েছেন চন্দনা নদীর কথা, যা শুকিয়ে এতটাই করুণ রূপ ধারণ করেছে যে বাইনোকুলার দিয়ে যেন দেখতে হয় তাকে৷ কবির ভাষায়,
“নিশুতিতে, বৈষ্ণবীর গানে আশব্দ ফিরে এসো, বাইনোকুলারে চন্দনা নদীর মতো, ঘনঘোর রসকলি, প্রমুখ উদাস।”

‘হালকা রোদের দুপুর–ষোল’ কবিতায় নীলকণ্ঠ নদীর কথা লিখেছেন কবি,
“ব্যাকুল, বধির সুরগুলি দেয়ালে আটকে আছে স্তব্ধ সবুজ! তারও পরে দেখি নীলকণ্ঠ নদীর ভ্রমণ। শুধু হাহাকার মনে পড়ে— প্রাচীন ছাগল, হাঁস-মুরগী, ধুলোর দুপুর। শরীর ঘুমায়, আমি জেগে দেখি মুমূর্ষ বিদিন-রাত, তোমার চোখে বেঁচে আছে অন্তিম উলুধ্বণি।”

নদ-নদীর দান অপরিসীম হলেও মানুষ নদীর প্রতি বিরূপ আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন! নদীকে মেরে ফেলছে মানুষ৷ সচল নদী অচল হয়ে যাচ্ছে৷ যা কবির হৃদয়ে হাহাকার সুর তৈরি করে৷ কবি তখন লিখেন,
“স্বাভাবিক জামার বোতাম, পুরনো এবং বিশ্বস্ত। রিটায়ার্ড নদীর মধ্যখানে। যেন হারানো দিনের গ্রোসারি।”
(হালকা রোদের দুপুর–এগারো)

দুঃখের বিষয়, বর্তমানে এই নদী ও মানবজাতির সম্পর্কে ছেদ পড়েছে। যে নদীকে কেন্দ্র করে মানবজাতি একদিন উন্নয়নে শিখরে পৌঁছনোর যাত্রা শুরু করেছিল এবং মানব সভ্যতার উন্নতিতে নদীর ভূমিকা অপরিসীম, সেই নদীকে আজ মানুষ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে নানাভাবে। অবৈধ বালু উত্তোলন একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে পরিগণিত৷ এই সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তিনি কবিতায় তুলে আনেন, অথচ তা পাঠককে বিরক্ত করে না, আরোপিত মনে হয় না৷ তিনি লিখেন এভাবে, “নিহত দুপুরের পরে নদী থেকে উঠে আসে বালু, অবৈধ উপায়ে।” আমাদের অসচেতনতা এবং উদাসীনতার কারণে অনেক নদ-নদী আজ সংকটের মুখে, কোনো কোনো নদী আবার হারিয়ে গেছে, কেউ কেউ নিজের গতি পরিবর্তিত করে বয়ে চলে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ‘হালকা রোদের দুপুর–নয়’ কবিতায় কবি এই পরিস্থিতিকেই যেন তুলে ধরেছেন,
“নিশ্চুপ ধ্যানবিন্দু ভেদ করে পৌঁছনো যায় না সরোবরে? মিথ্যা আকাশের প্রতি টান ছিলো। বুঝিনি তীব্র ঝড়ের সংকেত। নকল নদীর প্রতি টান ছিলো। ‘ঝাউগাছ কই পাই?’ বলে ওঠে টনটনে রোদ। কিছুটা পেরিয়ে যায় নিশ্চুপ বালুর দুপুর। নকল নদীর পাশে আসল ঝাউ-য়ের বন— চিত্রকল্প ভাবো দামোদর, ব্যক্তিগত চিত্রকল্প ভাবো।”

১৫০০ সালের পর থেকে বাংলার অনেক নদীর নদীখাতই ভৌগোলিক কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃসীমান্ত তিস্তা নদী তাদের মধ্যে একটি। এটি ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা, কোচবিহার জেলা ও বাংলাদেশের রংপুর জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তা মিশেছে ব্রহ্মপুত্রে। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে তিস্তার ভারতীয় অংশে গজলডোবায় স্থাপিত বাঁধের সবগুলি গেটবন্ধ বন্ধ করে দেয়া হলে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে জলপ্রবাহ শূন্যে নেমে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা অববাহিকায় মানুষের জীবন যাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি জান্তব হয়ে উঠলো রাজনীতি-সমকাল সচেতন কবি সাম্য রাইয়ানের কবিতায়৷ তিনি লিখলেন, 
“মধ্যাহ্নভোজের নদী। অঘ্রাণে ফিরে আসে দারুণ দানব। ফোলা পেট। চোখদু’টি কোটরের পার। ফিরতি পথে বালিয়াড়ি ধরে— তাকায় এবেলা। বহুবিধ সৈকতের পাশে, ভাষাহীন মানুষের মলিন সঙ্গম। দূরের বাতির মতো, দেখা যায় তিস্তার বাথান। হলুদ আলো, চোখ নেই; কিছুটা দ্যাখে বোধয়। দিবস শেষে আহত সকল গান ফিরে পায় নিজস্ব ঘরের গলা। জাগে বাথানের ভাষা। আলিঙ্গন করে কিছুটা কনসার্ট।”
(হালকা রোদের দুপুর–ছয়)

সাম্য রাইয়ান অত্যন্ত সমাজ সচেতন কবি৷ সমকালীন সমাজ-রাজনীতি তাঁর দার্শনিক নজর এড়াতে পারে না৷ তিনি সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে কাব্যিক বোধকে এতটাই একাত্ম করে তোলেন, যা নান্দনিক রূপ নিয়ে পাঠককে বিমোহিত করে৷ মননশীল পাঠক তাঁর কল্পজগতে অনুভূতির ডানা মেলে উড়তে পারেন৷ তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমি আলোচনাযোগ্য অনেক প্রসঙ্গ খুঁজে পেয়েছি৷ সবগুলো বিষয়ে আলোচনা করতে হলে প্রতিটি বিষয়ে আলাদা প্রবন্ধ রচনার দরকার হয়ে ওঠে৷ স্বীকার করছি যে, আমার এই সন্দর্ভ রচনার প্রয়াস অসম্পূর্ণ৷ সময় স্বল্পতার কারণে আমি তাঁর সকল রচনা ধরে পদ্ধতিগত আলোচনা লিখতে পারলাম না৷ তাঁর কবিতা গভীর মনোনিবেশ ও বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে৷ এর প্রধান কারন সাম্য রাইয়ানের কবিতা উচ্চকিত নয়, বরং তা গোপন সংরাগে চুঁইয়ে পড়ে আমাদের আর্দ্র করে।

❑ ড. সুশান্ত চৌধুরী 

১৯০৮ সালে খুলনার সেনহাটী জাতীয় বিদ্যালয়ের (বর্তমান দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী গ্রাম) শিক্ষক ও কবি হীরালাল সেনের কবিতার বই ‘হুঙ্কার’ প্রকাশ পায়। দেশ তখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। আর সেই স্বপ্ন জ্বেলে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বইটি হীরালাল সেন উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে৷ সেই উৎসর্গের জেরে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল বিশ্বকবিকেও! সেই মামলায় রাজসাক্ষী নাকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্তত আদালতের রেকর্ড তাই বলে। ছোটলাট অ্যাণ্ড্রু ফ্রেজারের মতলব ছিল রবীন্দ্রনাথকেও কাঠগড়ায় তোলা। আদালতে উপস্থিত বৃদ্ধ উকিল কালিপদ রায় জানিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন— স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষী তরুণের পক্ষে উত্তেজক কবিতা বা গান লেখা আদৌ অস্বাভাবিক নয়। ওকালতি তার পেশা নয়, সুতরাং কবিতা বা গান কী পরিমাণ উত্তেজক হলে সেটা আইনত দণ্ডনীয় হবে সেটা তাঁর জানা নেই।

সেই মামলায় আসামীকে কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অবশ্য কখনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিন্তু পুলিশের সন্দেহভাজনের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। লালবাজারের খাতায় তাঁর পরিচয় ছিল, ‘Robi Tagore, I. B. Suspect Number 11’। শোনা যায় জোড়াসাঁকো থেকে কবি রাস্তায় পা দিলেই গুপ্তচর মারফত খবর পৌঁছে যেত হেড-অফিসে।

উৎসর্গপত্রের জন্য এমন আজব ভোগান্তি সত্যিই বিরল। বই উৎসর্গ মানেই যে বিড়ম্বনা তা কিন্তু নয়৷ এটি ব্যতিক্রম ঘটনা৷ একটি বইয়ের উৎসর্গপত্র কী? এপ্রসঙ্গে অনির্বাণ রায় তাঁর ‘উৎসর্গপত্র’ বইয়ে লিখেছেন,
“উৎসর্গপত্র বইয়ের অঙ্গ। এক থেকে একাধিক ছত্রে তার আয়তন-বিস্তৃতি। এতে ধরা থাকে একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, দৃষ্টিভঙ্গি, মর্জিমেজাজ, সমাজসময়ের ধূসর ছবি, ইতিহাসের টুকরো, জীবনের ভগ্নাংশ— এমন কত কিছু।’’
এবার আসি বই উৎসর্গের খানিক গোড়ার কথায়৷ প্রাচীন ও মধ্যযুগেও বই উৎসর্গের চল ছিল বলে প্রমাণ মেলে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে এথেন্সবাসী গ্রিক রাজনীতিক অ্যারিস্টাইডিস নাকি বলেছিলেন, ‘উপাসনালয় উৎসর্গিত হয় দেবতার উদ্দেশে আর বই উৎসর্গ করতে হয় মহান মানুষকে।’ তাঁর ওই উক্তির কারণেই কি না জানা নেই, পাশ্চাত্যে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বেশির ভাগ বই-ই উৎসর্গিত হয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বা রাজপুরুষ-রাজরানিদের উদ্দেশে। ইংল্যান্ডে রেনেসাঁসের প্রথম যুগে বা ষোড়শ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে গ্রন্থ উৎসর্গের প্রথা পুরোদমে চালু হয়। তখন ইংল্যান্ডের রানি ছিলেন প্রথম মেরি। তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র ৪২ বছর, কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেই তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছিল বিচিত্র সব বিষয়ের ৩৩টি বই ও ১৮টি পাণ্ডুলিপি। ১৬০৫ সালে মিগুয়েল দে সেরভান্তেস তাঁর ডন কিহোতে উপন্যাসের প্রথম খণ্ড প্রকাশের সময় কোনো উৎসর্গপত্র না দিলেও বছর দশেক পরে যখন দ্বিতীয় আরেকটি অংশ নিয়ে এক অখণ্ড সংস্করণ বের হলো, তখন ঠিকই বেশ কয়েকজন স্পেনীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও প্রশাসকের নামে একটি উৎসর্গপত্র লিখেছিলেন। তবে বই-উৎসর্গের প্রথা আমাদের দেশে ছিল না, সংস্কৃত সাহিত্যধারায়ও এর তেমন কোনও নিদর্শন মেলে না। ইংরেজি গ্রন্থাদির অনুকরণে বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে এই উৎসর্গপ্রথা চালু হতে শুরু করে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পরে।

সাধারণভাবে বইয়ের উৎসর্গগুলি উপহারের একটি ঐতিহ্য হিসেবে প্রচলিত। এই ব্যক্তিগত বার্তাগুলি উপহারের অর্থের অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে, সেইসাথে সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক দলিলও স্থাপন করে। একটি সাধারণ উৎসর্গ একটি বইকে একটি বিশেষ মর্যাদাবান উপহারে পরিণত করতে পারে যা ভবিষ্যতে বিশেষ অর্থ বহন করবে।

অনেক গ্রন্থের উৎসর্গপত্র ধরে রাখে তৎকালীন সাহিত্যের ইতিহাস, এমনকি তার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে বইটির প্রকাশকালের সমাজ-ইতিহাস-রাজনীতির নানা চালচলন। কোনো বইয়ের উৎসর্গপত্রটি পড়ে লেখকের ব্যক্তিজীবনের নানান চড়াই-উতরাই, ভাবনা, পৃথিবীর অবয়ব ও মনোজগতের নানা কূটাভাসও পাঠক অনুভব করতে পারেন। এ ছাড়া রচয়িতার নিজস্ব ক্ষোভ, রসবোধ ও মেজাজ-মর্জির ধীর বা চঞ্চল চালচলনও এতে ধরা পড়ে বৈকি।

আধুনিককালে যন্ত্রশক্তি ও প্রযুক্তির কারণে বই প্রকাশ যেমন সহজ হয়ে এল, তেমনি বইয়ের উৎসর্গপত্রের বৈচিত্র্যও বাড়ল। রাজা-রানি-অভিজাতদের বৃত্তের বাইরে নানা মানবিক গল্পও জড়িয়ে যেতে থাকল সেসব ঘিরে। যেমন কার্ল মার্ক্স তাঁর মহাগ্রন্থ ডাস ক্যাপিটাল (১৮৬৭) উৎসর্গ করেন প্রয়াত বন্ধু স্কুলশিক্ষক উইলহেম উলফকে। যিনি কিনা মৃত্যুর আগে মার্ক্সের জন্য বেশ কিছু অর্থকড়ি রেখে গিয়েছিলেন। পুরো জীবনে লেখা নিজের সেরা বইটি তাই আর কাউকে উৎসর্গ করার কথা মার্ক্স ভাবতেও পারেননি।

উৎসর্গপত্র নিয়ে নানা রকম মন–কষাকষি বা উদ্ভট কাণ্ড অবশ্য দুর্লক্ষ্য নয়। কখনো কখনো প্রকাশকের খামখেয়ালিতে বা লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনে পাল্টে যায় উৎসর্গপত্র। আবার উৎসর্গপত্র মারফত মনের ক্ষোভ মেটানোর কাণ্ডও দুর্লভ নয়। মার্কিন কবি ই ই কামিংস একবার সেভেন্টি পোয়েমস নামের একটি বই প্রকাশের আশায় মোটমাট ১৪টি প্রকাশনা সংস্থায় পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম, প্রতিটির কাছেই তাঁকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। অগত্যা উপায় না দেখে মায়ের কাছ থেকে টাকা ধার করে বইটি তিনি নিজেই ছাপেন, যদিও নাম দেন পাল্টে। নো থ্যাংকস (১৯৩৫) শিরোনামে বইটি প্রকাশ পেলে দেখা যায়, যে ১৪ প্রকাশকের দ্বারস্থ হওয়ার পর কামিংস বিফল হয়ে ফিরেছিলেন, বইটি উৎসর্গিত হয়েছে তাঁদেরই নামে। চার্লস বুকাওস্কির মতো প্রথাভাঙা লেখক আবার তাঁর উপন্যাস পোস্ট অফিস-এর (১৯৭১) উৎসর্গপত্রে সোজা ঘোষণাই করেছিলেন, ‘বইটি কাউকে উৎসর্গ করা হয়নি’। ইংরেজ অভিনেতা ও লেখক স্টিফেন ফ্রাই তো আরও এক কাঠি সরেস, তাঁর দ্য লায়ার (১৯৯১) উপন্যাসের উৎসর্গপত্রের পাতায় খানিকটা ফাঁকা জায়গা রেখে নিচে লিখে দিয়েছিলেন, ‘ওপরে পুরো নামটা বসিয়ে নিন।’

পাশ্চাত্য কেতায় প্রথম বাংলা বই কাউকে উৎসর্গ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ১৮৫৯ সালে প্রকাশ পাওয়া নিজের শর্মিষ্ঠা নাটকটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ বাহাদুর ও রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ বাহাদুরকে। আজ থেকে ১৬০ বছর আগে শুরু হওয়া গ্রন্থ উৎসর্গের এই ধারা এখনো বাংলা সাহিত্যে বিচিত্ররূপে বহমান। মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) বা হেকটর-বধ (১৮৭১)। আবার রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করার বেলায় খানিক কৃপণ ছিলেন বলতে হয়। জীবদ্দশায় প্রকাশিত ২০৮টি বইয়ের মধ্যে তাঁর উৎসর্গপত্রসমেত প্রকাশিত বই মাত্র ৬৪টি। আবার কাউকে কাউকে দুটি করে বইও উৎসর্গ করেছেন। কাদম্বরীসহ মোট ৫১ জন ব্যক্তি তাঁর গ্রন্থের উৎসর্গলাভে ধন্য হতে পেরেছেন শেষমেশ।

সমকালীন বাংলা কবিতা জগতে উৎসর্গ যেন আরো বৈচিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়৷ সমকালের সদা নিরীক্ষাপ্রবণ কবি সাম্য রাইয়ান কল্পজগৎ উন্মোচনের ইঙ্গিত দেন উৎসর্গপত্রের সেই ছোট্ট পরিসরেও। কয়েকটিমাত্র শব্দে কখনো সেখানে তিনি মুগ্ধতা অথবা হাহাকারে গল্প বলেছেন, কখনো বলেছেন নিখাদ ভালোবাসার কথা, কখনো রেখেছেন অপার রহস্য। যে রহস্য উন্মোচনের দায়ভার বিদগ্ধ পাঠকমহলের উপরই বর্তায়৷ সাম্যর লেখার মতো তাঁর উৎসর্গপত্রের জগৎ বড়ই বিচিত্র, আকর্ষণীয়। এগুলো পড়লে তাঁর উথালপাতাল জীবনের নানা হাহাকার ও সাহিত্যিক প্রেরণার বিষয়ে ইঙ্গিত মেলে৷ এগুলো প্রত্যেক বইয়ে বিচ্ছিন্ন আকারে থাকায় এবং এদের আকার ক্ষুদ্র হওয়ায় হয়তো অনেকের উপলব্ধি এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেসব উৎসর্গপত্র একত্র করলে দেখা যাবে সাম্য রাইয়ানের নতুন এক জগত উদ্ভাসিত হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গদ্যের বই ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’৷ মাত্র ১৬ পৃষ্ঠার এ বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন, “পথিক ভাই/ কামরুল হুদা পথিক;/ যিনি আমাকে সুবিমল মিশ্রর সাথে পরিচয় করিয়েছেন৷” সরল সাদামাটা উৎসর্গ৷ যেহেতু কামরুল হুদা পথিক নামে কেউ একজন তাকে সুবিমলের সাথে পরিচয় করিয়েছেন, তারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তিনি সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে বইটি তাকে উৎসর্গ করেছেন৷

২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় সাম্য রাইয়ানের প্রথম কবিতার বই ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’৷ বাঙ্ময় প্রকাশিত এ বইটি তিনি উৎসর্গ করেন কবি রাশেদুন্নবী সবুজকে৷ উৎসর্গপত্রে লিখেন, ‘একজন মানুষ’৷ মানুষের পরিচয় দিতে কবি যখন লিখেন ‘একজন মানুষ’, তখন ‘মানুষ’ শব্দটি আমাদের সামনে একই সাথে রহস্য ও একগুচ্ছ জিজ্ঞাসা সমেত উপস্থিত হয়৷ বোঝা যায়, আমরা চারপাশে যত মানুষরূপী প্রাণী দেখি, রাশেদুন্নবী সবুজকে লেখক তাদের থেকে ব্যতিক্রম হিসেবে উপস্থাপন করেন৷ তাঁর বিচারে সবুজ প্রকৃত মানুষ৷

এরপর কবির ‘হলুদ পাহাড়’ ও ‘মার্কস যদি জানতেন’ শিরোনামে দুইটি ছোট বই (যথাক্রমে ২৪ ও ১৬ পৃষ্ঠা) প্রকাশিত হয় উৎসর্গপত্র ছাড়াই৷ এবং এর পরেই শুরু হয় আসল রহস্য৷ ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় কবির কবিতাবই ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷ ৬৪ পৃষ্ঠার এ বইয়ের অনুপম উৎসর্গপত্রটিতে কবি লিখেছেন,
‘সোনামুখী সুঁই থেকে তুমি
চুইয়ে পড় সুতো হয়ে
নিচেই বিদ্ধ আমি
সেলাই হই তোমার সুতোয়৷’ 
উৎসর্গপত্রটি যেন এক হৃদয়গ্রাহী প্রেমের কবিতা৷ কিন্তু কাকে উদ্দেশ্য করে কবি এই পংক্তি লিখেছেন তা অজানাই থেকে যায়৷ শুধু থাকে ইঙ্গিত৷ এই ইঙ্গিত আমাদের কৌতুহলী করে তোলে৷ আমরা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি৷ বইটির কবিতাগুলো পাঠ করে একটি নাম আবিষ্কার করতে পারি ‘হামিংবার্ড’ শীর্ষক কবিতায়৷ যেখানে কবি লিখেছেন, ‘চমকে দিও না তাথৈ/ উড়ে যাবে৷’ তাহলে কি তাথৈ কোন ব্যক্তির নাম— নারীবিশেষ? তাকেই কি উৎসর্গে ইঙ্গিত করেছেন? আমরা অনুমান করতে পারি মাত্র৷

২০২১ সালে প্রকাশিত হয় সাম্য রাইয়ানের আখ্যানধর্মী মুক্তগদ্যের বই ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’৷ এর উৎসর্গপত্র রহস্যময়, শিরোনামের সাথে সাজুয্যপূর্ণ— ‘ব্যাগভর্তি গুডবাই নিয়ে চললে কোথায়?’ এ তো নিছক উৎসর্গপত্রের সীমা ছাড়িয়ে কবির অন্তর্গত তরতাজা উপলব্ধির প্রকাশ। কাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন কবি? উত্তর অজানা৷ এটিও কি কোনো নারীকে? হামিংবার্ডকে? তাহলে কি যাকে কবি হামিংবার্ডের রূপকে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি কি চলে গেছেন? অজস্র কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে কবি সরে দাঁড়ান! এত রহস্য কেন তাঁর উৎসর্গপত্রে? রহস্যময় উৎসর্গ পত্রের কথা যখন উঠলই তখন যে উৎসর্গপত্রের রহস্য উদঘাটনে গবেষকদের রীতিমত গলদঘর্ম হতে হয়েছিল এবং তারা শেষ পর্যন্ত এর রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি, সেটির কথা উল্লেখ করতেই হয়৷ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সনেট সংকলনের উৎসর্গপত্রে উল্লিখিত ‘মি. ডব্লিউ এইচ’ আদতে কে, তা খুঁজে বের করতে বিশেষজ্ঞরা গলদঘর্ম হয়েছেন বহুবার। সম্প্রতি গবেষক জিওফ্রে কেনেভলি দাবি করেছেন, ওই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি আসলে বইয়ের প্রকাশক টমাস থর্পের বন্ধু উইলিয়াম হোম। উপরন্তু সনেটগুচ্ছের উৎসর্গপত্রটি আদৌ স্বয়ং শেক্সপিয়ারের রচিত, নাকি প্রকাশকই আদতে তা লিখে দিয়েছিলেন, এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

২০২২ সালে প্রকাশিত হয় সাম্য রাইয়ানের কবিতার বই ‘লিখিত রাত্রি’৷ ৫৫ পর্বের সিরিজ কবিতার এ বইয়ের উৎসর্গে কবি লিখেন, ‘এই মাঝরাতে ক্যান তুমি দূরের পাখি হইলা কও?’ এই উৎসর্গ পাঠের পর কবির অন্তর্গত তীব্র হাহাকার আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, আমরা আক্রান্ত হই৷ ভাবি, প্রিয় মানুষ মাঝরাতে দূরের পাখি হয়ে যাবে কেন? কতোটা নিবিড় বেদনা এই একটিমাত্র বাক্যে লুকানো তার রহস্য উন্মোচনে ডুব দিতে হয় লিখিত রাত্রির গহীনে৷ তবু যদি কিছু খোলসা হয় এই আশায়!

২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় কবিতার বই ‘হালকা রোদের দুপুর’৷ এর উৎসর্গপত্রে যে অনুপম নিবেদন কবির, তা-ও একবাক্যে— ‘আমাকে বহন করো নখের মতো, বেড়ে ওঠার যত্নে৷’ উৎসর্গপত্রও মনে হয় তাঁর কবিতার মতোই কৌতূহলোদ্দীপক। নখের প্রতীকে কবি এখানে অনুল্লেখিত একজনের সঙ্গী হবার যে নিবেদন পেশ করেছেন, তা কি সত্যি হবে? নখ আমাদের কাছে খুব সাধারন, কবিও খুব সাধারনভাবেই সঙ্গী হতে চেয়েছেন, বিশেষ কিছু আয়োজন তার দরকার নেই৷ সাধারণ, স্বাভাবিকভাবেই তিনি সঙ্গী হতে চেয়েছেন৷ তথাপি নখের প্রতি আমরা যতটুকু যত্নশীল, ততটুকু যত্নহীন হলেই তিনি সন্তুষ্ট৷ এর অধিক-বিশেষ প্রত্যাশা কবির নেই৷ কিন্তু নখের প্রতীকে এরকম আহ্বান নতুন৷ সামান্য সাধারন অতিপরিচিত নখও কবির সান্নিধ্যে কতটা নিপুণ ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হতে পারে তা সাম্য রাইয়ান দেখিয়েছেন৷ তাঁর উৎসর্গপত্রগুচ্ছ পাঠ করে কবিমনের ভেতরকার এক অতল হাহাকারের নিদর্শন আমাদের সামনে উঠে আসে না?

একটি চমৎকার জগৎ রয়েছে সাম্য রাইয়ানের বইয়ের উৎসর্গগুলোর৷ অনেক আড়াল, অনেক রহস্য নিয়ে তা পাঠককে আহ্বান জানায় কবিতার অন্তর্লোকে প্রবেশের৷ বিশেষত তাঁর চারটি গ্রন্থের উৎসর্গপত্র আমার দৃষ্টিতে একজনকেই উদ্দেশ্য করে লেখা৷ কবি সযত্নে তাঁর নাম এড়িয়ে পাঠককে দাঁড় করিয়েছেন অভাবিত রহস্যের দ্বারপ্রান্তে৷ এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা৷ যখন হিসাব করে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা ১১টি বই উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর ‘নতুন বৌঠান’ কাদম্বরী দেবীর নামে৷

উৎসর্গপত্র যেমন লেখকের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও হাহাকার, আশা-নিরাশা-স্বপ্ন ধরে রাখে, তেমনই তা সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রকাশ ঘটায়। তাই উৎসর্গপত্রের গভীর পাঠ থেকে লেখালেখির নানা জটিলতা ও লেখকদের মানসিকতার ইতি-নেতি বুঝতে কিঞ্চিৎ হলেও সুবিধা বৈকি।

❑ ড. মধুমঙ্গল ভট্টাচার্য 

“মাত্র আটাশ বছর গেল, অথচ
ঘুরে ঘুরে মনে হয় কয়েক শতাব্দী আগে
হারিয়ে গিয়েছিলাম ধূ ধূ রাস্তার পরে।
রাত-দিন একাকার, শহর-গঞ্জ-গ্রাম
দেখেছি সকল— পরিমিত পদক্ষেপে।

অবশেষে
নিক্ষেপিত আমি নষ্ট রেস্তোরাঁয়।”
(আটাশ বছর পর/ সাম্য রাইয়ান)

আটাশ বছর বয়সে কবি সাম্য রাইয়ান নিজেকে নষ্ট রেস্তোরাঁয় আবিষ্কার করেছেন৷ এই কবিতাটি পড়ার পর একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছিল৷ আমি ভাবছিলাম— একজন মানুষ যদি জীবনের আটাশ বছর অতিবাহিত হবার পর নিজেকে নষ্ট রেস্তোরাঁয় আবিষ্কার করেন তাহলে তার অনুভূতি কেমন হতে পারে৷ ‘আত্মকথা’ প্রসঙ্গে কবি অরুণেশ ঘোষ একবার বলেছিলেন “১১ বছর বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম জীবন নিরর্থক। বেঁচে থাকা উদ্ভট। জন্ম অকারণ ও আকস্মিক। ছক আগে থেকেই করা আছে, জন্ম মাত্রই দুটো শ্রেণীর যেকোনো একটাতে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। হয় দাস না হয় প্রভু। হয় অত্যাচারিত না হয় অত্যাচারী। শোষক নয়তো শোষিত। মানব সভ্যতা এর বাইরে কিছু জানে নি।” কোথায় যেন সাজুয্য খুঁজে পাচ্ছি দুই দেশের এই দুই কবির অনুভূতির মধ্যে৷ যদিও পুরোপুরি মেলানো যাচ্ছে না, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে অরুনেশ ঘোষ আত্মকথায় যা বলেছেন, সাম্য এত বছর পর পরিমিত ভঙ্গিতে তার নতুন উপলব্ধি প্রকাশ করতে একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন৷

দ্বিতীয় দশকে আত্মপ্রকাশকারী কবি সাম্য রাইয়ান অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাবনার বীজ বপন করতে সফল হয়েছেন।

আজকের এই অস্থির সময়ে দালালি আর দলাদলি করে সহজেই সাফল্য লাভের বিষয়টি মানুষ আত্মস্থ করে নিয়েছে। কিন্তু সাহিত্যক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অবলম্বন করে যথার্থ কবি হয়ে ওঠা কোনকালেই সম্ভব নয়। সেজন্য নিজস্ব এলেম থাকা দরকার। সাম্য সেই অগ্নি পরীক্ষায় কর্ণের মতো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন৷

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রান্তজেলা কুড়িগ্রামে বসেই মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সাম্যের গ্রন্থ সংখ্যা দশ। পর্যায়ক্রমে তাঁর রচনাগুলি হল:
       কাব্যগ্রন্থ—
      • বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা (২০১৬)
      • হলুদ পাহাড় (২০১৯)
      • মার্কস যদি জানতেন (২০১৮)
      • চোখের ভেতরে হামিংবার্ড (২০২২)
      • লিখিত রাত্রি (২০২২)
      • হালকা রোদের দুপুর (২০২৩)

      গদ্যগ্রন্থ—
     • সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট (২০১৫)
     • লোকাল ট্রেনের জার্নাল (২০২১)

      সম্পাদিত গ্রন্থ—
     • উৎপলকুমার বসু (২০২২)
     • জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (২০২৩)

কেবলমাত্র সংখ্যার নিরীখে নয়, বিষয়ভাবনা এবং আঙ্গিকের দিক থেকেও সাম্য রাইয়ান ক্রমশই নিজের স্বকীয় শিল্প প্রতিভা মেলে ধরেছেন অনায়াসে।

সাম্যের প্রথম কবিতাপুস্তিকা পরিচায়িকা অংশে যথার্থই লেখা হয়েছিল, 
“ঘটনার বয়ানসূত্র থেকে আলো ছড়ানো একটা কথামুখ দেখতে পাচ্ছি। নদীফলে ভেসে যাচ্ছে তীর, ঘনবুনটের জাল ভরে উঠছে ব্যর্থমাছে। গানবাহী শামুকপুত্র চিনে নেবে মহাকাল, পৃথিবীর ছায়া। নিবিড় দৃশ্যের মিউজিয়ামে দাঁড়িয়ে তবু একজন কবি, একা; তোমাপৃষ্ঠের নিচে প্রাণপ্রবাহের উপর একই সমতলে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। গ্যালনসম বিষাদ শুধু বেরিয়ে আসে কলমের ডগা দিয়ে। একবার বিষাদ লিখে আমি কলমের নিব ভেঙে ফেলি। পূর্বনির্মিত পশমী জঙ্গল থেকে কাগুজে শরীরে শাদায় লেপ্টে যায় দীর্ঘ হতাশার মতো ম্লাণ উপাখ্যান। কী করে নির্মিত হয় কবিতাগাছের ফল; মানুষের কাছে আজ অব্দি সেসব অমীমাংসিত বিষ্ময়!”

সাম্য রাইয়ানের কবিতার বিষয় ও আঙ্গিক বৈচিত্র্য এবং কাব্যকুশলতা সত্যিই বিষ্ময় জাগানিয়া৷ প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ থেকেই তিনি পরিণত কবি-মনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। কবি লিখেছেন,
“বিগত সময়ের কর্মকে কেটেকুটে, ব্যাপক
কাটাকাটি হলেও নতুনে রয়েছে ছাপ, পুরানের

চিহ্নিত হচ্ছে ধীরে, না-লেখা কলম, তেলের কাগজ
তা-হোক, তবু আবিস্কৃত হোক প্রকৃত যাপন...

আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।
মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন
চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন”
(মেশিন)

কিংবা

“এইখানে আমি একা, নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক।
তারপরও সে আছে এখানেই
মাড়াইকৃত চালের মতো শুভ্র শরীর নিয়ে
এখানেই কোথাও সে রয়ে গেছে
অপ্রকাশিত প্রজাপতি হয়ে।

শাদা প্রজাপতি এক জীবন্ত এরোপ্লেন।
হাত বাড়ালেই তার উন্মাতাল গান
উঠে আসে হাতে কান্নার সুর।”
(শাদা প্রজাপতি)

অথবা ‘নৈশসঙ্গী’ কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করা যায়, যেখানে কবি লিখেছেন,
“এই রাস্তা চলে গেছে
অধিকতর নিঃসঙ্গতার দিকে৷
পুরনো শহরে বয়সী শামুক, হেঁটে যায়
অক্ষয়দাস লেন পেরিয়ে—

পকেটে মুদ্রা নাচে৷
গলির মুখে নাচে পুলিশের গাড়ি৷

বেদনাহত কোকের বোতল ছুঁয়ে
নৈশ বন্ধুর সাথে ট্রাফিক পেরিয়ে হাঁটি৷
অদেখা প্রতিবেশিনীর নিঃশ্বাস কাঁধে
টের পাই, আমরা তখন মেঘের ছায়ায়
অন্ধকার, বৃষ্টিহীন গ্র্যাণ্ড এরিয়ায়!”

এভাবেই ব্যক্তিগত পরিসর থেকে রাষ্ট্রব্যাপী অদ্ভুত অন্ধকারের নগ্নচিত্র অনায়াসেই ফুটে ওঠে সাম্যের কবিতায়। তিনি তাঁর ‘শাদা প্রজাপতি’র মতো চোখে চারপাশের চেনা জগৎটাকে এমনভাবে অবলোকন করেন যা মননশীল পাঠককে তাঁর কবিতার মাধ্যমে অনির্বাণ কল্প-বাস্তবতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাষ্ট্র-পুলিস এবং আগ্রাসনকে কত সহজ-সাবলীলভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আগ্রাসনের বিপরীতে শিরদাঁড়া টানটান করে কবি এক বাক্যে সকল সাম্রাজ্য-অহং চুরমার করে দিলেন! সব থেকে আশ্চর্যের বিষয়, কবিতায় সাম্য রাইয়ানকে একরৈখিক আঙ্গিকে চিহ্নিত করা যায় না৷ কবিতায় তিনি বহুরৈখিক, একেকটি কবিতার বইয়ে তাঁকে আমরা নতুন রূপ-বর্ণে আবিষ্কার করি৷ এটি আসলে কবির নিজেকে আবিষ্কারেরই প্রক্রিয়া৷ সাম্যের কবিতার বইগুলো পড়তে পড়তে আমরা ক্রমাগত যেন নতুন ধরণের আবিষ্কার প্রক্রিয়ার সাথেই পরিচিত হতে থাকি৷ ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ে আমরা যে ফর্মের কবিতার সাথে পরিচিত হই— তা অত্যন্ত লিরিকাল, উপচে পড়া প্রেম—৷ ৬৪ পৃষ্ঠার এ বইয়ে কবিতা আছে ৪৮টি৷ সাম্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, গভীর দার্শনিক অভিব্যক্তি তিনি অতি সাবলীল ভঙ্গিমায় প্রকাশ করতে পারেন৷ মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের কথাখানি— ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে / সহজ কথা যায় না বলা সহজে৷’ সহজ কথা সহজে বলারই শুধু নয়, বরং জটিল-গভীর কথাও সহজে বলার অনায়াস ভঙ্গিমা সাম্য রপ্ত করেছেন৷ যা আমাদের বিস্মিত করে৷ উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে ‘জীবনপুরাণ’ কবিতার পংক্তি— “বানান ভুল হলে কাছের মানুষও কাচের হয়ে যায়!” এ যেন আমার-আমাদের মনের কথা৷ কত সহজ, সাবলীল; অথচ এর গহীনে লুকায়িত গভীর দর্শন৷ যার উপলব্দিক্ষমতা যত শক্তিশালী, সে পাঠক সাম্যের কবিতা তত নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন৷ এপ্রসঙ্গে সাম্য নিজেই লিখেছেন ‘জীবনপুরাণ’ কবিতায়— “গভীর, সহজ সুরে দর্শন জাগে / অনুরাগে৷”

‘শিকার’ কবিতায় কবি লিখেছেন—
“প্রার্থনায় শিকার করো প্রিয়তম হরিণীকে;
তার ভেতরে বইছে অনন্ত ঝরণাধারা!”
মাত্র দুই পংক্তি! মাত্র দুইটি! অথচ কী গভীর বক্তব্য৷ প্রিয়তম হরিণীকে শিকার করতে বলছেন কবি৷ অথচ হিংস্রভাবে নয়, প্রার্থনার মতো করে৷ শিকারের যে রূপের সাথে আমরা পরিচিত ছিলাম, এই কবিতা পাঠের পর সেই রূপ আমাদের সামনে ভেঙেচুড়ে যায়৷ যাকে শিকার করার কথা বলছেন, তাকেই তিনি প্রিয়তম বলে সম্বোধন করছেন৷ অর্থাৎ এই শিকার অন্যরকম শিকার৷ এখানে শিকারের হিংস্রতা নেই৷ জখম নেই৷ আসলে আছে প্রেম৷ প্রেম দিয়ে তিনি শিকার করতে চাইছেন, আসলে কবি এখানে ‘শিকার’ শব্দটি নিজের করে নেয়া বা আপন করে নেয়া অর্থে ব্যবহার করেছেন৷ কবি হিসেবে তিনি যথার্থ কাজই করেছেন৷ আগ্রাসন দিয়ে নয়, বরং প্রেম দিয়ে কবি দুনিয়া জয় করার মনোভাব পোষণ করেন৷ এটাই বাংলার আদি দর্শন৷ যা সাম্যের দর্শনের বিশেষ শক্তি৷ তিনি এ বাংলার মাটিবর্তী কবি৷ তাই তিনি ‘গভীর স্বপ্নের ভেতর’ কবিতায় লিখেন— “ফড়িং নয়, ধরতে চেয়েছি ফড়িংয়ের প্রেম৷” ফড়িং প্রতীক ব্যবহার করে কবি এখানে বস্তুকে নিজ কড়ায়ত্ত করার পরিবর্তে ভাবকে আলিঙ্গনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন৷ এ বইয়ের প্রায় প্রতিটি কবিতায়ই প্রেমের জয়গান গেয়েছেন কবি, জীবনের জয়গান গেয়েছেন৷ এই প্রেম শুধুই মানব-মানবীর নয়৷ অনেকটা সহজিয়া দর্শনের প্রেম৷ প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের প্রতি প্রেম এ বইয়ের প্রধান বিষয়৷ ‘নির্বাসনের বনে’ কবিতায় কবির বৃক্ষপ্রেম আমাদের আশ্চর্য করে৷ কত সাবলীলভাবে তিনি বৃক্ষকে মানুষেরই সমান মর্যাদায় ভালোবাসা দিয়েছেন তা টানাগদ্যে রচিত কবিতাটি পাঠ করলে বোধগম্য হয়—
“গাছটা অসুস্থ; ওকে ডাক্তার দেখাবো। হাতে অনেক কাজ এখন। তোমার কাছে ফিরে নদীমাতৃক হবো। সুবাসিত পাতাবাহারের কাছে কয়েকটা আকাশ জমা আছে; রাত গভীর হলে সেই গল্পটা শুনতে হবে আবার। কেন যে আসে উদগ্র শুক্রবার; সমস্ত প্ল্যান ভেস্তে যায় আমার; কোনোকিছু ঠিক থাকে না! পঠিত গানের নাম ধরে ডাকি তবু কোথা থেকে উঠে আসে সব ব্যর্থ কবিতামালা।

যে অসহ্য ওষুধবিক্রেতা জানে না মেঘেদের প্রকৃত বানান, তাকেও তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়ি যেতে হবে। এদিকে আমি একটা খসে পড়া নক্ষত্র পকেটে জমা রেখেছি; বৃষ্টি ভীষণ চিন্তায় ফেলে দিলো!”

এর পরের কাব্যগ্রন্থ ‘লিখিত রাত্রি’র কবিতাগুলো আঙ্গিক ও বিষয়বৈচিত্রে ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বই থেকে একদমই ব্যতিক্রম৷ আলাদা শিরোনামহীন, সংখ্যা চিহ্নিত ৫৫টি কবিতা নিয়ে এ বই কবির বিশেষ শক্তিমত্তার পরিচয় বহন করে৷ এ বইয়ের প্রতিটি কবিতা পাঁচ পংক্তি বিশিষ্ট এবং প্রতি পংক্তি ১৮ থেকে ২০ বর্ণ বিশিষ্ট৷ এ যেন আরেক নতুন কাব্যধারা, যা সাম্যের নিজস্ব ভঙ্গিমা৷ পুরো বইতে সাম্য আশ্চর্যভাবে স্ব-মেজাজ ধরে রেখেছেন৷ একই সুর-ভঙ্গিমায় পুরো বই তিনি সমাপ্ত করেছেন৷ এ সত্যিই রাত্রির গল্প৷ অনেক রাত নাকি একটিই রাত অনেক চোখে? বইটি পড়তে পড়তে এ প্রশ্নই আমার মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিলো৷ সবগুলো কবিতায় রাতের বিবরণ দিয়েছেন কবি৷ আসলে তিনি রাতই লিখেছেন৷ নামকরণ শতভাগ সার্থক৷ বইটির ফ্ল্যাপ উদ্ধৃত করি— “পঞ্চান্ন পর্বের এই সিরিজজুড়ে রাত্রির গল্প— অনেক রাত— রাতের পর রাত যা লিখিত হয়েছে— এক রাত্রিতে এসে তা পূর্ণরূপ নিয়েছে৷ সেখানে বিস্তৃত হয়েছে রাত্রির নিজস্ব আসবাব— কুকুর, পতিতা, নাইটগার্ড, পাখি, কবি, প্রেম, বিবাহ, ট্রাক ড্রাইভার…!” কবি সাম্য রাইয়ানের হাতে যে রাত লিখিত হয়েছে, কেমন তার রূপ? মলিন, মোলায়েম, কোমল? নাকি রুক্ষ, কঠোর, কঠিন? এর উত্তর খুঁজতে আমরা পাঠ করবো তাঁর কবিতা— 
“যেতে যেতে পথে, মধ্যরাতে; কুকুর, পুলিশ ও
বেশ্যাকে নিঃশব্দে বলি: পথ আটকানো নিষেধ। এ
রাত শুধুই প্রেমিক, কবি ও পাগলের। গান শেষে
দ্যাখো পুরোটা জুড়ে শুধু ছেড়া পাতাফুল পড়ে
ছিলো যা, সকল খারিজ হলো অন্ধবাগান থেকে৷”
(ঊনপঞ্চাশ)
উন্নত মন্দিরের কাছে প্রার্থনা করেছি—এ রাত
পূর্ণদৈর্ঘ্য হোক; নীলাভ ভায়োলিন স্থায়ী হোক
আদরের করোটিতে। মৃত শরীরের স্মৃতিবাহী
সকল জাহাজ জেগে উঠুক মানুষমেশিনের
অযৌন শিরদাঁড়ায় টিক টিক শব্দঘন্টা হয়ে।
(তিন)

এরকম আরো আরো কবিতাংশ উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করছে৷ এই কবিতাগুলো পড়তে শুরু করলে এমনই ঘোর তৈরি হয়, যা থেকে মুক্তি পাওয়া দুষ্কর৷ আমার ধারণা, এ বইটি ক্ল্যাসিক কবিতার রূপ পেতে পারে৷ শঙ্খ ঘোষের ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’, উৎপলকুমার বসুর ‘পুরী সিরিজ’, ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘জিরাফের ভাষা’ যেমন রচনার দীর্ঘকাল পরেও আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখতে সক্ষম, সাম্য রাইয়ানের ‘লিখিত রাত্রি’ও সেসরকম দীর্ঘকাল পরেও অগ্রসর পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারবে বলে আমার ধারণা৷ আমি প্রথমবার বইটি পড়ে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না দ্বিতীয় দশকে এত শক্তিশালী কবির আবির্ভাব ঘটেছে৷ নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার যে প্রবণতা সাম্যের কবিতায় বিদ্যমান, পরবর্তী কবিতার বইগুলোতেও কবি তাঁর সে সক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবেন এইই প্রত্যাশা৷ চেতনার ক্যানভাসে কবির আঁকা অন্তর্দহনের চিত্র আমাদের বিমোহিত করুক আগামীতেও৷

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *