বাঙালি জাতীয়তাবাদও কি ফ্যাসিবাদ?

❑ সাম্য রাইয়ান

বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ফ্যাসিবাদ আখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টা স্পষ্টত রাজনৈতিক প্রতারণা। এ জাতীয়তাবাদ জন্মেছে মুক্তির আন্দোলন থেকে—ভাষার অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং পরিশেষে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে। এর প্রতিটি ধাপেই প্রতিরোধ ছিল এক ধরণের মানবিক দাবি; যেখানে দমন-পীড়ন এসেছে শাসকগোষ্ঠীর দিক থেকে, প্রতিরোধ এসেছে নিপীড়িতের দিক থেকে। অথচ ফ্যাসিবাদ হলো তার বিপরীত—একটি প্রভুত্ববাদী, নিপীড়নকামী মতাদর্শ, যেখানে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার নামে ভিন্নমত দমন, সংখ্যালঘু নিধন, এবং একনায়কতন্ত্রের স্থাপনা ঘটে। তাই বাঙালির জাতীয়তাবাদকে ফ্যাসিবাদের সাথে তুলনা করা মানেই ইতিহাসের নৃশংস বিকৃতি।

যারা এই বিকৃতি ঘটায়, তারা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে “ভারতের ষড়যন্ত্র” বলেছিল, মুক্তিকামী জাতিকে “দেশদ্রোহী” আখ্যা দিয়েছিল। আজও তাদের রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা কিংবা নির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুসারীরা মুক্তির সংগ্রামকে অবমাননা করার জন্য ফ্যাসিবাদ শব্দটি ব্যবহার করে। কারণ, যদি বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ফ্যাসিবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি ক্ষুণ্ণ হয়, স্বাধীনতার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তাদের এ কাজের তাত্ত্বিক ভিত্তি কোথায়? তারা বলে—“জাতীয়তাবাদ সর্বত্রই ফ্যাসিবাদে রূপ নেয়।” কিন্তু এ তত্ত্ব আসলে আধা-সত্য। ইউরোপীয় ইতিহাসে, বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদে রূপ নিয়েছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অধীনে নিপীড়িত জনগণের মুক্তি আন্দোলনে জাতীয়তাবাদ ছিল মুক্তির শক্তি। আফ্রিকার ডিকলোনাইজেশন, ভিয়েতনামের সংগ্রাম, কিংবা আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ—সবখানেই জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদ নয়, বরং মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। বাঙালির ইতিহাসও সেই একই ধারার অংশ।

অতএব, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ফ্যাসিবাদ আখ্যা দেয়, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয়তাবাদের দ্বৈত চরিত্র অস্বীকার করে। এটি নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি নয়, বরং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এর লক্ষ্য মুক্তির ইতিহাসকে কলঙ্কিত করা এবং বর্তমান প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা, যেন মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার ধ্বংস হয়।

আজকের বাঙলাদেশে এই ষড়যন্ত্রের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কিছু স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী নিজেদের আধুনিক বা প্রগতিশীল সাজিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে নয়, বরং ইতিহাসকে অস্বীকার করেই তত্ত্ব দাঁড় করায়। এর মধ্য দিয়ে তারা সামরিক শাসনের উত্তরাধিকারকে বৈধতা দেয়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষা করে, এবং মৌলবাদী রাজনীতিকে গোপনে প্রশ্রয় দেয়। ভুল মানুষকে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়ার এই ধারা আসলে মুক্তিকামী রাজনীতিকে দমন করার ষড়যন্ত্র, যাতে নিপীড়ক আবারও শাসক হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ আসলে এক মুক্তির দর্শন, যেখানে মানুষ তার ভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করে। এই সংগ্রামকে ফ্যাসিবাদ বলা মানে নিপীড়িতকে শোষক হিসেবে চিহ্নিত করা—এ এক ধরণের প্রতিক্রিয়াশীল ছদ্মতত্ত্ব। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ফ্যাসিবাদ জন্মায় ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণে, মুক্তির দাবিতে নয়। যারা তা মানতে চায় না, তারা আসলে জনগণের শত্রু—এবং তাদের বিরুদ্ধে সত্য ও ইতিহাসের পক্ষ থেকে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *