সাক্ষাৎকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাক্ষাৎকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সরকার আশরাফ সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন নিসর্গ বইমেলা ২০২৫ সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছে৷

নিসর্গ: একজন লেখকের সামাজিক দায় ব্যাপারটা কেমন?

সাম্য রাইয়ান: লেখকের সভ্যতার প্রতি দায়, নিজের প্রতি দায়। সমাজের চাহিদা মেটানোর কোনো দায় লেখকের নেই। লেখক যদি সত্য বলতে-লিখতে পারেন, তাহলেই তার দায় পূরণ করা সম্ভব। একেকজন লেখক একেকরকম স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। কেউ ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য, কেউ জাতিগত স্বাধীনতার জন্য, কেউবা লেখার ফর্মের স্বাধীনতার জন্য...। এটা নির্ভর করে নির্দিষ্ট স্থান-কাল ও লেখকের শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির উপর। 

একজন লেখক যে শ্রেণি-অবস্থান থেকেই আসুন না কেন যদি তিনি সৎ ও সংবেদনশীল হন, তাহলে অবশ্যই তাঁর সাহিত্য ক্ষমতা ও আগ্রাসনের বিপরীতে নিপীড়িতের পক্ষে দাঁড়াবে।

কর্পোরেট, ক্ষমতা (power) এর প্রভাবমুক্ত থাকতে না পারলে মুক্ত বা স্বাধীন চিন্তা চর্চা করা অসম্ভব। দুর্বৃত্ত পুঁজির করাল গ্রাস থেকে, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে না পারলে স্বাধীন সৃষ্টি অসম্ভব। একারণেই নতুন চিন্তা-বোধের কারিগর কোনোরূপ চিন্তার দাসত্ব করতে পারেন না। তা সে হোক মহৎ কিংবা হীন চিন্তা।

বাঙলাদেশের দৃশ্যমান লেখকরা, যাদেরকে ইদসংখ্যা-পুজা সংখ্যা-বিজ্ঞাপন-মঞ্চ-টেলিভিশন সর্বত্র মুহুর্মুহু দেখা যায়, এদের অধিকাংশ সাহিত্যিকই নয়, বরং সাহিত্যিকের মুখোশ পরে আছে, যেন একেকটা ফেক আইডি। বছরের পর বছর ক্ষমতা আর সাহিত্যপাতায় একে অপরের পেছনে তেল ঘষাঘষি করে, মঞ্চে আসন পেতে গলায় ক্ষমতার মেডেল ঝুলিয়ে সুবিধার নানা প্রপঞ্চের দাসত্ব করে চলেছে। অথচ আমাদের দরকার অবিক্রিত ও অবিকৃত লেখক-বুদ্ধিজীবী।

নিসর্গ: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা পট পরিবর্তনে লেখকদের ভূমিকা ও অবস্থান ক্ষমতার সাথে পরিবর্তিত হতে দেখা যায়, এই বিষয়টিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

সাম্য রাইয়ান: প্রথমত বাঙলাদেশে সাহিত্য, লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা, প্রকাশনা শিল্প সবকিছুই অবিকশিত। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত হাতে গোণা কয়েকজন মাত্র ব্যক্তি ‘সাহিত্যিক’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, বাকি সব দলিল লেখক তুল্য। ফলে এদের না আছে প্রজ্ঞা, না আছে সত্য লেখার সাহস। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও এখানে পাঁচটা জাতীয় সাহিত্য পত্রিকা নাই, যেখানে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করতে পারবে এদেশের ৬৪ জেলার লেখকগণ! এমন পাঁচজন প্রজ্ঞাবান লেখক নাই, যাদের জীবন সাহিত্যে সমর্পিত— যার কাছে নতুন লেখকরা নিঃসঙ্কোচে হাজির হতে পারেন তার পা-ুলিপি নিয়ে, সংকটকালে যিনি নতুন দিশা হাজির করতে পারেন! ‘বাংলা একাডেমী’ এখনো জাতির মননের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি! আমাদের চলমান পরিস্থিতি যখন এমনই প্রতিকূল, তখন সংঙ্কৃতির ভাঙা সেতুটাকে নতুন করে জোড়বার প্রয়াস শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবতুল্য।

ফলে মানতে কষ্ট হলেও সত্য এইই যে, সাহিত্যিক হয়ে ওঠার যাপন এখানে চোখের সামনে উপলভ্য নয়। সকল বেড়াল নিজেকে বাঘ ভেবে হালুম করে ওঠে! 

ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের দালালিও পরিবর্তন হয়। দেখবেন জুলাই অভ্যুত্থানের আগে যারা বিগত রিজিমের দালালি করতো, অভ্যুত্থানের পর তারা নতুন রিজিম প্রতিষ্ঠার জন্য দালালি অব্যাহত রেখেছে। এইটা মূলত কালচারাল ফ্যাক্ট। কালচারাল রেভল্যুশন তো হয়নি এদেশে। এক মুঠো ভাতের জন্য কেউ রাস্তায় পড়ে আছে, কেউবা দাঙ্গা-হাঙ্গামা এমনকি খুন করতেও দ্বিধাহীন। লেখকরা যদি সত্যিকার লেখক হয়ে উঠতো, তাহলে এই সকল সংকট তাদের সাহিত্যে দৃশ্যমান হতো। অথচ তারা নিজেরাও এত অসক্ত বৈষয়িক নানা লোভে, যার কাছে ভাল দাম পায় তার কাছে কলম বন্ধক রাখে। সম্প্রতি দেখছি মামুলি আইফোন-ম্যাকবুকের জন্যও অনেকে জিভ ক্ষয় করতে দ্বিধা করছে না! এদের কোনো আদর্শই নাই। এরা মূলত টাকার জন্য কলমকে খদ্দেরের সাথে শুইয়ে দেয়। আর যারা প্রকৃতই সুশাসন চায়, গণতন্ত্র চায়; তারা সব আমলেই সংখ্যালঘু-নিপীড়িত।

নিসর্গ: দেশে যে প্রমিত ভাষার বিপক্ষে একটা ভাষার রাজনীতি চলছে- এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখা উচিত?

সাম্য রাইয়ান: ভাষা ও উপভাষার সাহিত্যিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। বাঙলার ভাষাবৈচিত্র্য অপূর্ব। একথা আমরা সবাই জানি, ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে লিখিত ও কথ্যরূপে তার ব্যবহার দরকার। ফলে উপভাষার সাহিত্য নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি বাঙলার সকল উপভাষা জানি-বুঝি না, সেইটা আমার ব্যর্থতা।
তবে এদেশের ঢাকাই সাহিত্যের ক্ষমতাধর কিছু লোক প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে ক’বছর যাবত জেহাদ ঘোষণা করেছেন, যার কোনো যুক্তিসঙ্গত তাত্ত্বিক ভিত্তি আমি খুঁজে পাই না।

বরং অন্য পয়েন্টে কিছু প্র্যাক্টিকেল সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বাঙলাদেশে উপভাষা কিন্তু সংখ্যায় কম নয়। এক্ষেত্রে মান ভাষায় যারা লিখছেন সেটা সাধারণ ঘটনা, কিন্তু রংপুর বা বরিশাল অঞ্চলের একজন লেখক তিনি চাইলে তার উপভাষায় লিখতে পারেন, এতে করে তার উপভাষাটি বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু প্র্যাক্টিকেল সমস্যাটি হলো, তাদের কেউ কেউ ঢাকাই উপভাষায় লিখে নিজেকে আরবান হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছেন। তাঁর জন্মঅঞ্চলের উপভাষা নিয়ে একজন লেখকের এই হীনমন্যতা গভীরভাবে সমস্যার কারন তো! বরং বাঙলার সকল উপভাষায় যদি সাহিত্য রচিত হতো, তাহলে বাঙলার ভাষাবৈচিত্র্য অপূর্ব ভঙ্গিতে দৃশ্যমান হতো। সেটা আদতে ভাষার কাজে লাগতো। এখন লেখক কোন ভাষায় লিখবেন তা অবশ্যই তার মর্জি। কিন্তু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সামগ্রিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হওয়া সময়ের দাবি।

আর এক্ষেত্রে যারা অগ্রণী রাজনীতিবিদ, তাদের সামগ্রিক কাজকর্মও সুবিধার না তো। এরা নাটক-সিনেমা বানাচ্ছেন, সেইখানে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, নারী-পুরুষ সম্পর্ক যেভাবে হাজির করছে, প্রেম ও যৌনতা যেভাবে উপস্থিত করছে তাকে সফট পর্ণের বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। এখন ফেসবুক রিলস ভিডিওর যে অবস্থা, এদের নাটক-সিনেমাও তেমনি। আর্টকালচারের নামে এরা প্রতারণা করছে।

নিসর্গ: সাহিত্যে ইতিহাসচেতনা কীভাবে রক্ষিত হবে যা অতিরঞ্জন বা ক্লিশে মনে হবে না?

সাম্য রাইয়ান: বাঙলাদেশের তথাকথিত লেখকের দল বছর বছর শুধু ক্ষমতার দালালী করে গেল— সেলিব্রেটি হলো, পদবীর লোভে পদলেহন করে গেল! ফলে এদের বদমায়েশির শিকার এদেশের সাহিত্য-ইতিহাস। শিল্পীর প্রধানতম কর্তব্য হলো তাকে সত্য বলতে হবে। এই কর্তব্য যদি সে সঠিকভাবে পালন করতে পারে, তাহলেই যথেষ্ট। লেখক-শিল্পী সে নয়, যে অতিরঞ্জিত করে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে আমরা যত লেখককে মুহুর্মুহু দেখতাম, বলতে গেলে সবাইই নানাভাবে ক্ষমতার পদলেহন করেছে— এই পদলেহনকর্মই আওয়ামীলীগকে ফ্যাসিবাদী করে তুলেছিল। যখন আওয়ামী লীগের পতন হলো তখন সেই লেখকগুলোকেই দেখলাম কেউ বিএনপি, কেউ জামাত আবার কেউ বৈষম্যবিরোধী ও অন্য অনেক নামে অনেক ক্ষেত্রে ভীড়ে গেল। এদের না আছে সততা, না আছে প্রজ্ঞা।
লেখকের পরিমিতিবোধ থাকার কথা সবচে বেশি। আমি কতটুকু লিখবো, আর কতটুকু না— এই বোধ না থাকলে সে সাময়িক হাততালি পেলেও শেষ গন্তব্য আস্তাকুঁড়। লেখক সমাজের সেই প্রয়োজনীয় ইনজেকশন যা শরীরে ইনজেক্ট করার সময় ব্যথা লাগে বটে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফল সভ্যতার উপকারেই লাগে। কিন্তু সমকালে সেই ব্যথাটুকু সমাজ গ্রহণ না-ও করতে পারে। এখন লেখক যদি মনে করেন, সমাজ মুচমুচে তেলেভাজা খেতে পছন্দ করছে বলে তাকে তা-ই সরবরাহ করি, তাহলে তা সমকালে যতই প্রশংসিত হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারন। যে ক্ষতি অতীতের অনেক লেখক করেছেন, এখন অনেক তরুণও করে চলেছেন। জনপ্রিয়তার লোভ লেখককে সভ্যতার অশ্লীল ক্লাউনে পরিণত করে।

নিসর্গ: আড্ডা বা ছোটকাগজ বা ইত্যাকার গোষ্ঠীবদ্ধতা সাহিত্যের কী কাজে লাগে?

সাম্য রাইয়ান: আড্ডা ও লিটল ম্যাগাজিন অঙ্গাঅঙ্গীভাবে যুক্ত। আর সৃজনশীল গোষ্ঠীবদ্ধতা লিটল ম্যাগাজিনের গ্রাউণ্ড। এক বা একাধিক লেখক যখন প্রচলিত চিন্তা-পদ্ধতির চর্চাপথে হাঁটাচলা করতে না পেরে নতুন পথের নির্মাণ করতে উদ্যত হন, তখনই গড়ে ওঠে লিটল ম্যাগাজিন। যে নিজেই নিজের পথ-নির্মাতা। গুচ্ছ গুচ্ছ নতুন পথের যাত্রীর আশ্রয়দাতাও সে-ই। লেখককে সে আটকে রাখে না, সীমাবদ্ধ করে না; অসীম ছোঁবার স্বপ্নটি দৃঢ়তার সাথে উস্কে দেয়। একটি সত্যিকার লিটল ম্যাগাজিন লেখককে নিয়ন্ত্রণ করে না, লেখককে ধারণ করে। লেখকের হাতের সাথে পা বেঁধে বলে না, ‘উড়ে যাও’; বরং বাঁধন খুলে দেয়ার গেরিলা ভূমিকা পালন করে সে।

আমাদের বঙ্গদেশে আরেকধরনের নীচশ্রেণির গোষ্ঠীবদ্ধতাও সগৌরবে চলমান! সাহিত্যিক গোষ্ঠীর নাম করে ক্ষমতাবান লোকেরা ব্যক্তিগত বাহিনী তৈরি করে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন! এরা ইচ্ছে হলে যা খুশি করতে পারে। জাতীয় কমিটি করতে পারে, আন্তর্জাতিক কমিটি করতে পারে, লিটলম্যাগ-জাতিগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিবৃতি দিতে পারে, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করতে পারে, লিটলম্যাগের নামে জুতোর দোকান দিতে পারে, লিটলম্যাগের সমিতি বানাতে পারে; এবং সকল কর্মকান্ডে ট্যাগলাইন দিতে পারে ‘সারাদেশের লিটলম্যাগ কর্মীদের পক্ষ থেকে!’ জ্বি এরই নাম প্রেম, প্রেমের নাম বেদনাৃ ও না স্যরি, এরই নাম ক্ষমতা, ক্ষমতার ডাকনাম ‘পাওয়ার’।

এইভাবে পুরনোপন্থী কিছু পার্টিআম্রেলাপার্সন নিজেদের কয়েকটি ‘লিটল ম্যাগাজিন’কে সারাদেশের লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে পথ দেখিয়েছে তারই পথ ধরে এখন দেশে ধর্মীয় পত্রিকাগুলোও নিজেদের সাহিত্যের লিটল ম্যাগাজিন দাবি করছে। খেলা শুধু এখানেই থেমে নেই, তারা ধর্মীয় পত্রিকাগুলো দিয়ে লিটল ম্যাগাজিন মেলা করছে, লিটল ম্যাগাজিন সমিতি বানাচ্ছে।

পুরনো চিন্তারপথের এই যাত্রীগণ লিটল ম্যাগাজিনের কাঁধে তাদের পুরনোপন্থী নানারকম— মনের মাধুরী মেশানো এজেন্ডা চাপিয়ে লিটলম্যাগের চলন ভারাক্রান্ত করতে চান। অথচ, এই সবরকম ফর্মেশন উল্টে দেয়াই লিটল ম্যাগাজিনের ধর্ম। লিটলম্যাগ— সে তো সকল প্রচল-প্রথার বিরূদ্ধে— যা কিছু প্রতিষ্ঠিত-আরোপিত— সেই সকল পদ্ধতি/সংজ্ঞার বেড়ি ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। কবিতার মতোই সে স্বাধীন ও মুক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তাপদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীতে তার অবস্থান। পুরনো চিন্তা দিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার চেষ্টা বাতুলতামাত্র!

একসময় এদেশে লিটলম্যাগের পাওয়ারফুল গোষ্ঠীগুলোর একমাত্র এজেন্ডা ছিল দৈনিক পত্রিকায় গল্প-কবিতা ছাপানোর বিরোধিতা করা। অথচ লেখক কোথায় লিখবেন, না লিখবেন, এইটা সেকেন্ডারি ইস্যু। গোটা দুনিয়ায় ফার্স্ট ইস্যু হচ্ছে লেখক কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন, কেন লিখবেন। কিন্তু ১৯৮০-র দশক থেকেই এইদেশে হলো উল্টো। লেখক কোন কাগজে লিখবেন, এটাই হয়ে গেল প্রধানতম আলোচ্য। ফলে শিল্পকলা শিল্পহীন, রইলো শুধুই কলা। তারই ফলাফল এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। অবিকশিত এই মুভমেন্ট হাজামজাডোবা পুকুরে ডুবে রইল। নতুন সাহিত্য নির্বাসিত, লিটলম্যাগ মুভমেন্ট বিপর্যস্ত। অবস্থা নির্মম, দুঃখজনক। না কোনো নতুন সাহিত্যতত্ত্ব, না কোন  নতুন সাহিত্যদর্শন— কিছুই দেয়া গেল না, আন্দোলিত হলো না সাহিত্য! একারণেই কলকাতার পঞ্চাশ বছর আগের কবিতা কিংবা ইউরোপ/লাতিনের দুইশ বছর আগের কবিতা লিখতে পারলেই আনন্দে-আহ্লাদে গদগদ হয়ে যাচ্ছি! কেউ কেউ তো আরো এক কাঠি সরেস— শতবর্ষ আগের কবিতার অনুকরণে লিখে নিজেকে নতুন সাহিত্যের প্রবক্তা দাবি করে বসছে! কতই রঙ্গ দেখি বাঙলায়!

তবুও থামে না প্রয়াস! কুমিরের খাঁজ কাটা গল্পের মতো লিখিত হতে থাকে দিস্তা দিস্তা এজেন্ডা, বস্তা বস্তা ধুলোবালির স্তুপ— গার্ডার ভেঙে যায়, তবু হুশ ফেরে না।

দুঃখটা কী জানেন, যে লিটলম্যাগ প্রচল-প্রথার বিরুদ্ধে, গত দশ বছরে তাতে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের লোকেরাও ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে! যে লিটলম্যাগ সকল প্রকার ক্ষমতা-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তাতে এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাতের নেতারাও ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে! যে লিটলম্যাগ সকল প্রকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে, তাতে এখন কর্পোরেট ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে!

অথচ, লিটল ম্যাগাজিনের এজেন্ডা বলে যদি কিছু হয়, হতে পারে শুধু একটাই— লেখকের স্বাধীনতা!

নিসর্গ: দেশের সাহিত্য পুরস্কারগুলোর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কেমন মনে হয়? পুরস্কারগুলো সাহিত্যের কী কাজে লাগে?

সাম্য রাইয়ান: সবথেকে হাস্যকর ব্যাপার হলো, বৃদ্ধ বয়সেও এদেশে লেখকরা কোনো পুরস্কার গ্রহণই বাদ রাখতে চান না; নানান পুরস্কার নিতে হাজির হন নগরে ও গ্রামে। যাদের বরং তরুণদের পুরস্কৃত করার কথা, আলোচনা-সমালোচনা দিয়ে, তারা নিজেরাই সেখানে পুরস্কার নেয়ার জন্য লালায়িত হয়ে থাকেন। আমি যখন দেখি যে লেখকের বিচারকের আসনে থাকার কথা সে নিজেই পুরস্কার নিচ্ছে— আমার হাসি পায়। 
এদেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পুরস্কার দেখলাম না যেটা সত্যিকার অর্থে লেখকের কোনো কাজে এসেছে। অন্তত যদি টাকাপয়সা দিত পাঁচ-দশ লাখ, তাতে অন্তত লেখকের কিছু উপকার হতো। কিন্তু ম্যাক্সিমাম পুরস্কারই অর্থমূল্যহীন। ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই। এরা বরং সাহিত্যকেই হাস্যকর করে তুলেছে। লেখক যদি লিখে সম্মানের জীবন যাপন করতে না পারেন সেটা সমাজের পশ্চাৎপদতার নিদর্শন। লেখক যদি বই বিক্রি করে ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে না পারেন তাহলে তিনি যখন ক্ষমতার পদলেহন করেন, সমাজের সে বিষয়ে কিছু বলার নৈতিক অধিকার থাকে কি? এদেশে এমন লেখক কেন আমরা পাই না যিনি শেষ বয়স পর্যন্ত লেখার মান ও সততার সাথে কম্প্রোমাইজ করেননি? এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করা দরকার।

এইসব পথচলতি পুরস্কারের অর্থমূল্য ছাড়া আর সব অপ্রধান আমার বিচারে। এখানে সরকারি-বেসরকারি বলতে গেলে সকল পুরস্কারই নিজেদের অসাহিত্যিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো বেড়ালকে বাঘ হিসেবে হাজির করতে চায়। বাংলা একাডেমি পুরস্কার হতে পারতো এদেশের লেখকদের জন্য সম্মানজনক পুরস্কার। কিন্তু ওর সাহিত্যিক মান লোক পুরস্কারের চেয়ে খারাপ। লোক পত্রিকা যে কয়েকজনকে পুরস্কার দিয়েছে যদিও তারা সকলে সম্পাদকের ১৯৯০ দশকের বন্ধু-বান্ধব, সে যা-ই হোক; তবু তারা সাহিত্যিক তো অন্তত। তাদের প্রত্যেকেরই উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম রয়েছে। কিন্তু বাংলা একাডেমি যা আমাদের ‘জাতীয় মননের প্রতীক’ হবার কথা ছিলো, সেখানে যাদের পুরস্কৃত করা হয়, তাদের অধিকাংশই সাহিত্যিকই না। এগুলো জাতির সাথে মশকরা, প্রতারণা। বছরের পর বছর এগুলো চলছে। দেখার কেউ নেই—কথা বলার কেউ নেই। যাদের মাঝে মাঝে এসব নিয়ে হাউকাউ করতে দেখি তার অধিকাংশই মূলত নিজেরা না পাওয়ার বেদনা নিয়ে হাউকাউ করছে৷ এদের চাওয়া ভীষণরকম আত্মকেন্দ্রিক।
অথচ একজন প্রকৃত লেখক, সে কখনোই বিক্রির জন্য নয়, সহজলভ্য নয়। চোখ ঘোরালেই তাকে পাওয়া যায় না। সভ্যতার সংখ্যালঘু জীব।

বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার৷

৯ই জুন ২০২৫ তারিখ বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রকাশিত৷

বাংলা ট্রিবিউন: কোন বিষয় বা অনুভূতি আপনাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করে?

সাম্য রাইয়ান: যা কিছু আমাকে চিন্তিত করে, যা আমি ভাবি—অনুভব করি, তারই নির্যাস কবিতা৷ আমার জীবন—সামগ্রিক অর্থে যাপন (দরশন) ও তার সাথে সম্পর্কিত সবকিছু নিয়ে আমার কবিতাযাত্রা৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি কী ধরনের থিম বা বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
সাম্য রাইয়ান: সাধারণত আমি মানব মনের বৈচিত্রময় অনুরণন লিখতে পছন্দ করি৷ সেই অর্থে বলা যায় প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশই আমার লেখার বিষয়৷ এখন অব্দি এর বাইরে কিছু লিখতে পারিনি৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তাৎক্ষণিক অনুপ্রেরণায় লেখেন, নাকি ধীরে ধীরে শব্দ সাজান?
সাম্য রাইয়ান: যখন আমি আইডিয়া পাই তাৎক্ষণিক চিন্তায় অনুপ্রাণিত হই, কিন্তু কবিতার অবয়বে তা ধীরে ধীরে রূপ পায়৷ আমি হয়তো একটা শব্দকে কেন্দ্র করে ভাবতে শুরু করলাম, ঐটা সেন্টার পয়েন্ট; যাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ পরিসর গড়ে ওঠে৷ আর তারপর আমি তাকে বারংবার সংস্কার করি, যাতে করে তা আমার কল্পনা ও অনুভূতির আরো কাছাকাছি পৌঁছতে পারে৷ এমন কবিতা আছে যা আমি এক বসায় লিখে ফেলেছি, পরে টুকটাক এডিটিং করেছি— খুবই সামান্য; যেমন: তীব্র কুড়িগ্রাম, হাসতে হাসতে মরে যাবো, স্বাধীনতা লাগবে, এরকম আরো আছে৷ অপরদিকে অনেক কবিতা আছে যা আমি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সময় নিয়ে লিখেছি৷ যেমন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘জীবনপুরাণ’-এর কথা, যা এক বছর সময় লেগেছিল লিখতে৷ আবার ধরুন, ‘গভীর স্বপ্নের ভেতর’, ‘বেধিদ্রুম’ বা ‘উড়ন্ত কফিন’ এই কবিতাগুলো লিখতেও এক বছরের কাছাকাছি সময় লেগে গিয়েছিলো৷ ফলে আইডিয়া তাৎক্ষণিক হলেও লিখতে আমার অনেক সময় লাগে৷ সে ধীরে ধীরে তৈরি হয়৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার কবিতার ভাষা ও শৈলী কীভাবে বেছে নেন?
সাম্য রাইয়ান: সেটা নির্ভর করে আমি কী নিয়ে লিখছি তার উপর৷ আমি যা চিন্তা করি, যেভাবে অনুভব করি তা প্রকাশের জন্য যেকোন পদ্ধতি গ্রহণ করতে আমি প্রস্তুত৷ তথাপি আমি চেষ্টা করি এক আনকোরা ভঙ্গিমার, যা সহজ কিন্তু গভীর৷

কবিতার ফর্ম, তার শরীরে ছন্দ, অলংকার—এই সকলই চলে আসে কবিতার প্রয়োজনে। ফর্মটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন কোনো ফর্মে লিখতে চাই না যা চর্বিতচর্বন। নতুন চিন্তা, যা আমি প্রকাশ করি, প্রচার করি; তা নতুন ফর্মেই প্রকাশ করতে পছন্দ করি।

তাছাড়া প্রতিটি পাণ্ডুলিপিতে আমি একই ফর্মে প্রকাশিত হতে পছন্দ করি না৷ ভিন্ন ভিন্ন বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হওয়া আমাকে নতুন ধরনের আনন্দ দেয়৷ ফলে ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ কিংবা ‘লিখিত রাত্রি’ কিংবা ‘হালকা রোদের দুপুর’ কিংবা ‘জলের অপেরা’ কোনটিরই ভাষা ও শৈলী এক নয়৷ কোনো এক ফর্মে ফিক্সড না হয়ে আমি বরং খুঁজে চলেছি এক অন্যতর ভাষা ও শৈলীকে…৷ বলতে পারেন, এ এক আনকোরা প্রেমের দিকে অন্তহীন যাত্রা৷

বাংলা ট্রিবিউন: কোন কোন কবির প্রভাব আপনার লেখায় আছে?
সাম্য রাইয়ান: নির্দিষ্ট করে ওভাবে বলতে পারবো না৷ তবে সাধারণভাবে, যে সকল কবির কবিতা আমি পড়েছি, ভালো বা মন্দ লেগেছে তার সবই কোনো না কোনভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে৷

বাংলা ট্রিবিউন: কথাসাহিত্যের চর্চা আপনার কবিতায় কতটুকু প্রভাব রাখে?
সাম্য রাইয়ান: আমার একমাত্র প্রকাশিত উপন্যাস— ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’৷ আরো কয়েকটি ফিকশন লিখবার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের; যেমন— ‘2.0 : সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’, ‘মিথ্যার মিউজিয়াম’, ‘মৌন’, ‘ঢাকার ওভারব্রীজে একটি গরু’, ‘এফ মাইনর’, ‘কেয়ারলেস ওম্যান’ আরো বেশ কয়েকটি৷ কবিতা আর কথাসাহিত্যের ভাষা-শৈলীতে অনেক মিল থাকলেও দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ক্ষেত্র ভাবতেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করি৷ কখনো কোথাও গিয়ে সব মিলিত হয়ে যাচ্ছে বটে, তবুও অমিলের জায়গাটি খুবই দৃশ্যমান৷ আমি যখন প্রথমবার ফিকশন লিখতে শুরু করলাম, তখন আমি এক নতুন জগৎ আবিষ্কার করেছিলাম৷ সেই উপলব্ধি সম্পূর্ণ অন্যরকম৷ আমার মনে হলো— উপন্যাস আমাকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দিচ্ছে, অনেক বেশি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে৷ সম্পূর্ণ আবরণমুক্তভাবে পাঠকের সামনে দাঁড় করাচ্ছে৷ ব্যাপারটা আতঙ্কেরও! এতে আমি ভীত সন্ত্রস্ত হলাম৷ কিন্তু তার প্রেমে পড়ে গেলাম৷ মনে হলো আরো লেখা উচিৎ৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রথম কবিতার বই সম্পর্কে কিছু বলুন। এটি লিখতে গিয়ে কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
সাম্য রাইয়ান: প্রথম বইটা (চোখের ভেতরে হামিং বার্ড, ২০২০) প্রকাশের আগে আমি প্রায় এক যুগ সিরিয়াসলি লেখালিখি করেছি৷ আমি যেহেতু কনসেপচুয়ালি পাণ্ডুলিপি গোছাই, ফলে একই সাথে আমার কয়েকটি কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি হচ্ছিলো সেসময়, ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ (২০২০), ‘লিখিত রাত্রি’ (২০২২), ‘জলের অপেরা’ (২০২৪)৷ প্রথম কবিতার বইটা প্রকাশের আগে প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে এক/দুই ফর্মার চারটা পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলাম, তিনটা কবিতা ও একটা গদ্যের৷ তবে প্রথম কবিতাপুস্তিকা প্রকাশের ঘটনাটা একটু বিব্রতকর৷ এক ছোট প্রকাশকের বারংবার অনুরোধে ২০১৪-তে প্রথম পুস্তিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করি৷ কিন্তু পাণ্ডুলিপি জমা দেবার পর জানুয়ারির শুরুর দিকে তিনি আমাকে জানালেন— এটি প্রকাশ করা সম্ভব না, কারন লিটলম্যাগ অঙ্গনের অনেকে আমাকে পছন্দ করছে না, তীব্র বিরোধীতা করছে৷ এরপর, যেহেতু পাণ্ডুলিপিটা গোছানো ছিলো আর ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলাম ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশের, ফলে পিছিয়ে আসতেও ইচ্ছে করছিলো না৷ আর কোনো প্রকাশকের কাছে গিয়ে আলাপ করারও আমার কখনো আগ্রহ ছিলো না ফলে শেষমেশ নিজেই ছেপে ফেললাম৷ এভাবে চারটা পুস্তিকা আমি নিজেই ছেপেছি৷ তারপর তো বাংলাবাজারের ঘাষফুল প্রকাশনী ২০২০ থেকে ছাপাছাপির দায়িত্ব নিয়ে আমাকে নির্ভার করলো৷ সেই থেকে এখন অব্দি আমার সব বইপুস্তক ওরাই ছাপছে৷

বাংলা ট্রিবিউন: সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা কি আপনার কবিতায় প্রভাব ফেলে? যদি ফেলে, তবে কীভাবে তা প্রকাশিত হয়?
সাম্য রাইয়ান: সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা—তা আমার মননে যে আলোড়ন তৈরি করে তার অন্তিম নির্যাস কবিতায় প্রকাশ করতে চেষ্টা করি৷ খোলা চোখে যা দেখি তা নিয়ে কম লিখলেও, বন্ধ চোখে যা দেখি মূলত তা নিয়েই আমার কবিতার সংসার৷ ক্ষণস্থায়ী কোনো বিষয়ে কবিতা বোধহয় আমি লিখিনি৷ সেই অনুভবের কথাই লিখতে চেষ্টা করেছি, যার মূল সুর আসলে কোন এক বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হয়েছে কালের পরিক্রমায়—পরিবর্তিত নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতায়ও৷

বাংলা ট্রিবিউন: পাঠকদের মন্তব্য আপনার লেখায় কোনো পরিবর্তন আনে?
সাম্য রাইয়ান: পাঠকদের মন্তব্য আমি খুব মনযোগ দিয়ে শুনি৷ তাদের সমালোচনা থেকে আমি নিজের ত্রুটি চিহ্নিত করতে চাই৷ কিন্তু সেইরকম মন্তব্য পাই না বললেই চলে৷ ফলে পরিবর্তনেরও সুযোগ নাই৷ এদেশে লেখালিখি নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হওয়া দরকার, তার গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি৷ বাক-স্বাধীনতা নাই তো৷ ফলে সমালোচনা সাহিত্য গড়ে ওঠেনি৷ রবীন্দ্র আমলে বা তিরিশের কথাও যদি বলি, যেরকম সমালোচনা করা হতো লেখা ও লেখকের, তা যদি এখন কেউ করে তাহলে নিশ্চিত গোলাগুলি লেগে যাবে৷ এদেশের তথাকথিত লেখকদের যে অবস্থা এখন, তা দেখে সামান্য সমালোচনার সাহসও কোন পাঠক রাখেন না৷ ফলে পাঠকের মন্তব্য শোনার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে৷

বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে কী ধরনের কবিতা লিখতে চান? নতুন কোনো ধারা বা শৈলীতে কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?
সাম্য রাইয়ান: কবিতায় আমার একটা অন্যরূপ-রূপান্তর প্রয়োজন৷ সেই সময়টা দিচ্ছি নিজেকে৷ ফলে আগামী চার-পাঁচ বছর কবিতার বই প্রকাশের পরিকল্পনা নেই৷ বিশেষ প্রয়োজনে পুস্তিকা হতে পারে, আবার! সাম্প্রতিক সময়ে কথাসাহিত্য আমার ভাবনার বিষয়৷ তাছাড়া গত পনের বছরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আমার প্রবন্ধ-নিবন্ধ-চিৎকারের এক সংকলন প্রস্তুত করছি—‘নীরবতা ভেঙে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসুক সশস্ত্র পিঁপড়ে’৷

বাংলা ট্রিবিউনের লিংক৷


পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘এবং’, যার সম্পাদক দেশিক হাজরা; প্রকাশ করেছিল সাম্য রাইয়ান একক সংখ্যা৷ ২৩ জুলাই ২০২৩ তারিখ প্রকাশিত সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত৷

এবং পত্রিকা: বিন্দু পত্রিকার সম্পাদনা করছেন ২০০৬ সাল থেকে এবং এই পত্রিকা, আজকের দিনে ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত উচ্ছ্বাস। আমাদের সকলেরই জানা। সম্পাদক হিসাবে নির্বাচনের জন্য সর্বপ্রথম আপনি কিভাবে একটি লেখাকে দেখেন—

সাম্য রাইয়ান: প্রধানত আমি দেখি লেখাটি নতুন কিছু দিতে পারছে কী না৷ সেটা হোক চিন্তায়, আঙ্গিকে বা অন্য কোনোদিকে৷ আমি আসলে নতুন লেখা, নতুন চিন্তা প্রকাশ করতে চাই; কবিতা, গদ্য, যা-ই হোক৷ যে লেখা সাধারনত, সচরাচর প্রচলিত পত্রিকাগুলো প্রকাশ করতে পারে না, চায় না; আমি সেধরনের লেখা প্রকাশে অধিক মনযোগী৷ আমি মনে করি, শুধু লেখা প্রকাশ করেই একটি লিটল ম্যাগাজিনের দায় শেষ হয়ে যায় না৷ সার্বিকভাবে একজন লেখককে পাঠকের সামনে উপস্থাপনের দায়ও লিটল ম্যাগাজিনের উপর বর্তায়৷ আনন্দের সাথে এই দায় বিন্দু বহন করে চলেছে এত বছর ধরে৷ ফলে তুমি খেয়াল করবে, এমন সব লেখক, যারা জনপ্রিয় না, গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু পাঠক তাদের সম্পর্কে খুব একটা জানেন না, বিন্দু তাদের নিয়ে আলোচনা, সাক্ষাৎকার এবং বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে৷

এবং পত্রিকা: আপনার বেশিরভাগ কাব্যগ্রন্থের নামকরণ দেখতে পাচ্ছি নিসর্গবর্ণনামূলক— যেমন ‘হলুদ পাহাড়’, ‘চোখের ভেতর হামিং বার্ড’, কিংবা সদ্য প্রকাশিত ‘হালকা রোদের দুপুর’ এই নামকরণ গুলির প্রসঙ্গে যদি দু চার কথা বলেন…

সাম্য রাইয়ান: তুমি বলার আগে আমি নিজেও এভাবে মিলিয়ে দেখিনি৷ আসলে এই কবিতাগুলো, যেগুলো নিসর্গপ্রবণ, সেগুলো আমার ব্যক্তিজীবনের চড়াই-উৎরাইয়ের সাথেই বোধয় সম্পর্কিত৷ কবিকে আমার কেবলই মনে হয়— জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি৷ সে নানান সম্পর্ক— প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের…, সকল সম্পর্ক! এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন— রক্ষা— চ্ছেদ— বিকাশ বিষয়েই মনে হয় কবিজীবনের সকল গবেষণা৷ সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ কবিতাসকল৷ ২০১২ পরবর্তী সময়ে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ আমার ব্যক্তিজীবনকে নির্মমভাবে আক্রান্ত করে তুলেছিলো৷ ‘পৃথিবী সিরিজ’ কবিতায় লিখেছিলাম,
“মৃদু শব্দেরা খুব দূরন্ত হয়েছে
আজকাল, ঘরবাড়ি তছনছ করে।
আমার পৃথিবী হ’লো উল্টোপালক
ভেঙে তছনছ—শ্রী একাকার!”
এত আঘাতে জর্জরিত হয়েই বোধকরি মানুষ থেকে দূরবর্তী হয়ে আমি প্রকৃতির নিকটবর্তী হয়েছি৷ অর্থাৎ মানুষকে বন্ধু বানানোর পরিবর্তে নিসর্গের বন্ধু হতে চেষ্টা করেছি৷ ‘ফুলকুমার’ কবিতায় লিখেছিলাম,
“মানুষের প্রতি নিষ্ফল প্রণয়যান
এড়িয়ে চলেছি আমি৷ দেখেছি
সেসব জীবনের ব্যর্থ অভিযান৷”
আরেকটি কবিতার কথা মনে পড়ছে, ‘লিখিত রাত্রি ২০’,
“ওরা চায় আমি পাগল হয়ে যাই, একা হয়ে যাই
শহরে ঘুরিফিরি নিঃসঙ্গ মানুষ; আমার মৃত্যু হোক
জলের অভাবে নির্মম: বর্ণনাতীত। অথচ কতো
পাখি ফুল নদী বন্ধু হচ্ছে অকপটে; কী তুমুল
আড্ডা দিচ্ছি আমরা। সুযোগ নেই, হবো: একলা-পাগল।”

এবং পত্রিকা: পাঁচের দশকের কবি, কবিতার অনিবার্য নাম উৎপলকুমার বসু এবং এই কাজের আগেও গদ্য রূপে উঠে আসে আরেকটি নাম আপনার কাছ থেকে সুবিমল মিশ্র (২০১৪)। তারপর সদ্য প্রকাশিত জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (প্রবন্ধ সংকলন) এই নামগুলো বেছে নেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ আছে কোন?

সাম্য রাইয়ান: উৎপলকু্মার বসু, সুবিমল মিশ্র কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, এঁদের সাহিত্যের প্রতি ব্যক্তিগত ভালো লাগা তো আছেই৷ সুবিমল মিশ্রকে নিয়ে যে পুস্তিকাটি লিখেছিলাম, সেটি ছিলো তাঁর সাহিত্য পড়তে পড়তে লিখিত নোটের সংকলন৷ এরপর উৎপলকুমার বসুকে নিয়ে সাত বছর ব্যাপী যে কাজটা করেছিলাম, সেটার কারন উৎপল পরবর্তী সময়ের কবিদের কবিতায় তাঁর প্রভাবের তীব্রতা; যা দেখে আমি প্রকৃতপ্রস্তাবে এর কারন অনুসন্ধান করতে চেয়েছিলাম৷ আবার যখন দেখলাম শারীরিক প্রয়াণের পর উৎপলকুমার বসুর কবিতা আরো তীব্রতর হয়ে উঠছে বাঙলা মুলুকে, তখন আরো বেশি আগ্রহী হলাম এর কারন জানতে৷ বাঙলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অর্ধ শতাধিক লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণ একত্রিত করে এই সংকলন প্রকাশ করেছিলাম৷ আর ওয়ালীউল্লাহ’র কথা নতুন করে কী বলবো! তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম স্মার্ট কথাসাহিত্যিক৷ আমি ভেবেছিলাম তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে বাঙলাদেশে অনেকেই অনেক উদ্যোগ নিবেন৷ কিন্তু আমি হতভম্ব হয়ে লক্ষ্য করলাম কেউই তাঁর শতবার্ষিকী প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন না৷ এত বড় অসম্মান মেনে নিতে পারলাম না৷ তাই বিন্দুর পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নিয়েছিলাম ‘জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ প্রবন্ধ-সংকলন প্রকাশের৷

এবং পত্রিকা: আমার শেষ প্রশ্ন, এই দশকের আপনার প্রিয় কবি—

সাম্য রাইয়ান: গত দুই দশকে এত এত ভালো কবিতা লেখা হয়েছে, হচ্ছে, যা অভাবনীয়৷ আগের দশকগুলোতে আমরা যেমনটা দেখেছি কয়েকজনমাত্র কবি উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন, ভালো কবিতা লিখছেন, কিন্তু দুই হাজার পরবর্তী সময়ে আমরা তেমনটা দেখছি না৷ এসময়ে একসাথে অনেকেই ভালো লিখছেন, উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন৷ যেন একটা বিকেন্দ্রীকরণের মতো ঘটনা ঘটছে৷ এইটা নতুন ঘটনা বাঙলা সাহিত্যে৷ ফলে অগ্রজরা অনেক ক্ষেত্রেই কনফিউজড হয়ে যাচ্ছেন এই সময়ের কবিতা আলোচনায়৷ ফলে এই দশকে আমার প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতার সংখ্যা অনেক৷ 





আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্রিকা ‘মনমানচিত্র’ সাম্য রাইয়ান বিশেষ সংখ্যার জন্য সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করে৷ যা ২৪ মে ২০২৩ তারিখ প্রকাশিত হয়৷

মনমানচিত্র: লিখিত রাত্রি।।  কবিতাগুলোর বুনন খুব সংহত, কিন্তু কবি’র অন্তর্লোক বড় ছত্রখান। কবি হিসাবে কী বলবেন?

সাম্য রাইয়ান: ‘লিখিত রাত্রি’ অনেক মগ্নতার বই, অশেষ ভালোবাসারও। যা রচিত হয়েছিলো ২০১৫-র জুন ও জুলাই মাসে৷ এখন ভাবতে অবাক লাগে কী আশ্চর্য মগ্নতায় আমি রচনা করেছিলাম মাত্র এক/দেড় মাসে এই পঞ্চান্নটি কবিতা! অথচ ওই সময় আমি মানসিকভাবে খুবই ডিসটার্বড ছিলাম৷ চারদিক থেকে এত এত আঘাত— বারবার ভেঙে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলাম৷ রচনার ছয় বছর বাদে ঘাসফুলের কল্যাণে পাণ্ডুলিপিখানা আলোর মুখ দেখেছিলো৷ এর মধ্যে কত সম্পাদনা, কত মাতামাতি এই সিরিজ নিয়ে!
পঞ্চান্ন পর্বের এই সিরিজজুড়ে আছে রাত্রির গল্প— অনেক রাত— রাতের পর রাত যা লিখিত হয়েছে— এক রাত্রিতে এসে তা মিলিত হয়েছে৷ সেখানে বিস্তৃত হয়েছে রাত্রির নিজস্ব আসবাব— কুকুর, পতিতা, নাইটগার্ড, পাখি, কবি, প্রেম, বিবাহ, ট্রাক ড্রাইভার…!

মনমানচিত্র: লোকাল ট্রেনের জার্নাল।। একেবারে গৃহস্ত ঘরের প্রেমিক ছেলেটি বুঝি আকুতিগুলো বলে যাচ্ছে একের পর এক। আপনার কী মনে হয়?

সাম্য রাইয়ান: ‘কবিতার দুর্বোধ্যতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনে; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো’ যাবে না।” আমি বুদ্ধদেবের এ বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত৷ কবিতা আমরা অনুভব করতে পারি৷ এমত ভাবনা থেকেই ২০১০ সালের দিকে শুরু করেছিলাম এক নতুন খেলা— কবিতা বনাম কবিতা কবিতা খেলা! এ হলো সিরিজ গদ্য৷ প্রথম গদ্যটি লিখেছিলাম, ‘সময়ের অসহায় দাস’, যা পরে বাতিল করেছি৷ এরপর লিখেছি, ‘হাঁটতে হাঁটতে পথ গ্যাছে ক্লান্ত হয়ে’৷ এরপর ক্রমান্বয়ে আরো প্রায় দশ-বারোটি গদ্য লিখেছি৷ এই গদ্যগুলোতে আমি বাঙলা ভাষার বিশেষত নতুন সময়ের নতুন কবিদের কবিতা পাঠপরবর্তী অনুভব ব্যক্ত করেছি৷ এগুলো মূল্যায়নধর্মী গদ্য নয়৷ কখনো কবিতা পড়তে পড়তে আমার মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়েছে, তা বিবৃত করেছি৷ আবার কখনো কোন কবিতা পড়ে ব্যক্তিগত কোন স্মৃতি মনে পড়েছে, তা-ই উল্লেখ করেছি৷ হুবহু, অকপটে!

মনমানচিত্র: চোখের ভেতরে হামিংবার্ড।। বইটিতে কেমন একটা শ্লোকের মত ব্যাপার আছে, আর আছে কেমন একটা স্বস্তির ভাবে। এমনটা কীভাবে হলো—আগের বইয়ের ছেঁড়াছেঁড়া ভাবটি কোথায় গেল?

সাম্য রাইয়ান: কবিকে আমার কেবলই মনে হয়- জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি৷ সে নানান সম্পর্ক- প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের- সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা৷ সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই এক রূপ ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷ এর উৎসর্গে লেখা আছে- ‘সোনামুখী সুঁই থেকে তুমি/ চুইয়ে পড়ো সুতো হয়ে/ নিচেই বিদ্ধ আমি/ সেলাই হই, তোমার সুতোয়।’
‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ে আমি একই ফর্মের কবিতাগুলো রেখেছি৷ যেমনটা আমি প্রতিটি পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে করি৷ 

মনমানচিত্র: বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা।।  কাব্যগ্রন্থের নামটি দেখে মনে হয়, এটি একজন মাওবাদী গেরিলা কবি'র কবিতা হয়ে উঠতে পারতো৷ কিন্তু তা হয়নি, যদিও পোড়খাওয়া রাজনৈতিক স্বপ্নের একটি আঁচড় আছে এখানে। বইটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

সাম্য রাইয়ান: এ পুস্তিকাটি আমার লেখালিখির শুরুর দিকের কয়েকটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত৷ তখন ছাত্র আন্দোলন করতাম৷ আর বাঙলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আমি শুরু থেকেই হতাশাবাদী ঘরানার৷ ফলে কবিতায় এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন বোধ করি৷ আর আমি এক সময়ে একরৈখিক কবিতাই লিখেছি তা নয়৷ একই সময়ে আমি বহুরৈখিক কবিতা লিখেছি৷ কিন্তু পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে আমি সময় নিয়েছি অনেক৷ এর প্রধান কারন হলো, আমি চেয়েছি কনসেপচুয়াল পাণ্ডুলিপি হোক প্রতিটি৷ ফলে একই সময়ে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ ও ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ের কিছু কবিতা লিখলেও পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে কবিতাগুলোকে আমি আলাদা করে ফেলেছি৷

মনমানচিত্র: মার্কস যদি জানতেন।। এই বইয়ের কবিতাগুলো আরও বেশি তির্যক ও সরাসরি হবে বলে ধারণা করেছিলাম, কিন্তু বাস্তবত সরাসরি না হয়ে কবিতাগুলো যথেষ্ট পরিমাণেই রূপকাশ্রয়ী- আপনার বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞান কী এমন যে, কবিতায় প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি, বা শ্রেণীসংগ্রামের জঙ্গমতা আসলে এর শৈল্পিক ভারসাম্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে?

সাম্য রাইয়ান: আপনার প্রশ্নের শেষাংশে আমার উত্তর আছে৷ আমি এমনটাই মনে করি, কবিতা আড়াল দাবি করে৷ আর এ প্রসঙ্গে আরেকটু বলি, আমার ধারনা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটা বড় ফ্যাক্ট৷ বাঙলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরাসরি কথা বলার কোন সুযোগ নেই৷ একসময় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইস্যুতে কার্টুন অনেক জনপ্রিয় ছিলো৷ কিন্তু আজ সেসব কার্টুন বিলুপ্ত! এর কারন বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা৷ কিন্তু এই ফর্মটি পরিবর্তিত হয়ে ‘মিমস’ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে৷ দুঃখের কথা হাসির ছলে বলছে৷ মানুষের বেদনা ঘনীভূত হতে হতে এমন রূপ ধারণ করেছে যে, তা নিয়ে নিজেই মশকরা করছে৷ কারন তার প্রতিবাদ করার শক্তিও আর নেই৷
তবুও এসময়ের কবিতায় এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়৷ সময়ে সময়ে কবিতার ফর্ম বদলে যায়৷ প্রতিবাদের কথা, রাজনৈতিক চিত্র— সেসব থাকে নতুন সময়ের ফর্মে৷ ষাট, সত্তর কিংবা নব্বই দশকে যে ফর্মে রাজনৈতিক কবিতা রচিত হয়েছে, আজ নতুন শতকে এসে সেই ফর্মে কবিতা লেখা হবে না, এটাই স্বাভাবিক৷ তারই প্রতিফল হয়তো পাচ্ছেন ‘মার্কস যদি জানতেন’-এ৷

মনমানচিত্র: হলুদ পাহাড়।। বইটিতে আবছা কোথায় যেন খানিক পরাবস্তবতার পোঁচ আছে। হলুদ পাহাড় নিয়ে আপনার অনুভব কী?

সাম্য রাইয়ান: ‘হলুদ পাহাড়’ এর কবিতাগুলো আমি এক মাসে লিখে ফেলেছিলাম৷ যেন হঠাৎ করেই এই সবগুলো কবিতা আমার কলমের ডগায় উপচে পড়ছিলো৷ অন্তর্গত অনুভূতিমালা আর দৃশ্যের বিবরণ লিখেছি; আমি যা দেখি— যেভাবে আমার চোখে ধরা পড়ে, তা-ই… হয়তো আমার ‘দেখা’ ‘স্বাভাবিক’ নয়… পরাবাস্তব হতে পারে… 

মনমানচিত্র: আপনার প্রত্যেকটি বই ভাবে ও ভঙ্গিমায় আলাদা আলাদা। আপনি কী থিমেটিক্যালি বইগুলো করেছেন?

সাম্য রাইয়ান: একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি হবার পর আমি সময় নিই; মাসের পর মাস কিছু লিখি না৷ পূর্বের ফর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করি৷ নতুন কিছু লিখতে চাই৷ নতুন চিন্তা— নতুন ফর্মে৷
আমার এমন হয়; দেখা যায়, মাসের পর মাস আমি কবিতা লিখিনি, লিখতে পারিনি; শুধুই ভেবেছি— চিন্তিত হয়েছি৷ কখনো বছর পেরিয়ে গেছে— কবিতা আসেনি! আগে মনে করতাম আর বুঝি লিখতে পারবো না, আমার বোধয় লেখা শেষ৷ কিন্তু না৷ তার পরই হঠাৎ করে কবিতা লিখতে শুরু করি; মনে হয় সাইক্লোনের মতো সবকিছু ভেঙেচুড়ে আসছে৷ দুর্বার গতি— যাকে রোধ করা অসম্ভব৷ এমন অবস্থা থাকে এক থেকে দেড় মাস৷ সেই সময় প্রচুর কবিতা লিখে ফেলি৷ এভাবেই লেখা হয়েছে ‘হলুদ পাহাড়’, ‘লিখিত রাত্রি’, ‘হালকা রোদের দুপুর’… 

মনমানচিত্র: একদম সাম্প্রতিক কালে অনেকের কবিতায় কেমন ধাঁধার মত একটা ব্যাপার থাকে। মনে হয়, পাঠকের যেন একটি ধাঁধার উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। ধরুন আপনার এই কবিতাটি—
এই হেমন্তে

উঠোনের সমস্ত ব্যর্থতা খুবলে আনা হৃৎপিণ্ডের
মতো প্রকাশ করা দরকার আজ। উনুনের গভীরতম
ক্যানভাস থেকে বের করে আনা দরকার সমস্ত অমুদ্রিত
জলের ইতিহাস। ডুবন্ত চাঁদের যাত্রী কীভাবে,
সেইসব তীব্র বিরল ছবি অলক্ষ্যে রোদের বাগানে
ফুটাতে দিয়ে কোনোদিন, সূর্যবেলায় খুব নির্ভার হবো।
আপনার কী মনে হয়, এই কবিতাটি পাঠকের প্রাণের কাছে আরও অনায়াস হয়ে উঠতে পারতো?

সাম্য রাইয়ান: আমি আসলেই চাই অনায়াস করে তুলতে৷ এমন একটি প্রচেষ্টা আমার মধ্যে কাজ করে৷ হয়তো পারি না, পেরে উঠি না ঠিকমতো৷ কিন্তু সহজ করে বলতে চাই৷ স্বাভাবিকভাবেই লিখি, বাড়তি কসরত আমি করি না কবিতায়৷ কিন্তু তা যে রূপ ধারণ করে তা কতোটা ‘স্বাভাবিক’ মনে হয় পাঠকের কাছে সে সম্বন্ধে আমার ধারণা নেই৷

মনমানচিত্র সব কবিরই জানায় অজানায় একটি দর্শন থাকে—আপনার দর্শন কী?

উত্তর: আমার দর্শন, সে তো কবিতায়ই প্রকাশিত৷ সেই দরশনের কথাই লিখি কবিতায়৷ আমার কবিতাই আমার দর্শন৷

মনমানচিত্র: আপনি বাংলা কবিতার পরম্পরায় নিজেকে কীভাবে যুক্ত করেন? আবার বাংলা কবিতার পরম্পরা থেকে নিজেকে কোথায় বিযুক্ত করে প্রাতিস্বিক হয়ে ওঠেন?

সাম্য রাইয়ান: আমার কথা, আমার বক্তব্য, যে কোনো বিষয় নিয়ে আমার যা চিন্তা তা আমি লিখি; লিখে বলি; এছাড়া আমার আর কোনো মাধ্যম নেই; বিকল্প নেই৷ আমি তা-ই লিখতে চেষ্টা করি কবিতায়— যে কথা আমার, যা কেউ বলছে না৷ বলার ভঙ্গিতে নতুন কিছু করবার প্রয়াস আমার মধ্যে থাকেই৷ এতে কতটুকু সফল আর কতটুকু ব্যর্থ তা পাঠকই বলতে পারবেন৷

দৈনিক শিল্প-সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক আবু জাফর সৈকত নিয়েছেন তাঁর সাক্ষাৎকার৷ যা ২৭ জুন ২০২০ তারিখ দৈনিক শিল্প-সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷

আবু জাফর সৈকত: করোনাকালীন এই সময়ে কেমন আছেন?
সাম্য রাইয়ান: ভালো নেই৷ নিজেকে এখন সার্কাসের ক্লাউন মনে হয়৷ ভালো থাকার ন্যূনতম আয়োজন এদেশে নেই৷ জীবন নিয়ে এখানে চলে রাষ্ট্রীয় সার্কাস, যা বন্ধ হওয়া দরকার৷

আবু জাফর সৈকত: লেখার শুরুটা কীভাবে?
সাম্য রাইয়ান: এলেবেলে লিখতে লিখতেই শুরু৷ কবে, কীভাবে তা আজ আর মনে নেই৷ তবে এক দিনের কথা মনে পড়ে, সম্ভবত ২০০৫ এর কোনো এক বিকেল, রাশেদুন্নবী সবুজ আমায় ডেকে বললেন, “তুই তো লিখতে পারিস, এক কাজ কর, ‘স্বাধীনতা তুমি’ নামে একটা কবিতা লিখে দে— একটা প্রতিযোগিতার জন্য৷” তো আমি সেদিন ওটি লিখেছিলাম, যদিও শেষপর্যন্ত প্রতিযোগীতায় পাঠানোর তারিখ বেমালুম ভুলে যাওয়ায় আর পাঠানো হয়নি৷ সম্ভবত ওইই প্রথম, কবিতা লিখবো মনস্থির করে লিখতে বসেছিলাম৷ এখানে একটি কথা বলে রাখি, ২০১২ পর্যন্ত আমার প্রায় সকল লেখাই আমি ফেলে দিয়েছি৷

আবু জাফর সৈকত: লিটল ম্যাগাজিন না ফেসবুক কোনটা শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, আপনার মতে?
সাম্য রাইয়ান: দুইটি ভিন্ন মাধ্যম৷ একটির সাথে অপরটির তুলনা চলে না৷ যেখানে ক্ষমতার (power) রক্তচক্ষু নেই, অন্যায্য সেন্সর নেই, সেটাই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম৷

আবু জাফর সৈকত: এই সময়ের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা পড়েন? সমসাময়িক কবিদের—
সাম্য রাইয়ান: এমনিতে বই তো পড়িই৷ তাছাড়া, ‘বিন্দু’ সম্পাদনার সুবাদে প্রচুর নতুন লেখা পড়া হয়৷ পত্র-পত্রিকায় দুই ধরনের ‘জিনিশ’ কবিতা নামে প্রকাশিত হয়, এক হলো: যা কবিতা, দুই হলো: যেগুলো তা নয়৷ আমি সবই পড়ি, যা নজরে পড়ে যায়৷ এই সময়ে প্রচুর ভালো কবিতা লেখা হচ্ছে৷ এখনকার অনেক কবির কবিতাই আমি পড়তে পছন্দ করি৷

আবু জাফর সৈকত: কবির সাথে অকবির তফাৎ কতোটুকু?
সাম্য রাইয়ান: প্রেমিকার সাথে গণিকার তফাৎ যতোটুকু৷

আবু জাফর সৈকত: পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তখন কী হতে চাইবেন?
সাম্য রাইয়ান: ‘কোয়ালা’ হতে চাইবো৷ অস্ট্রেলিয়ার এই প্রাণীটি তার জীবনের ৯৯% সময় খেয়ে আর ঘুমিয়ে কাটায়। ১% সময় সে তার জীবনসঙ্গী খোঁজে। খোঁজার জন্য খুব একটা কিছু ব্যতিব্যস্ত যে সে হয়, তাও নয়। কোনো সঙ্গী না জুটলে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

আবু জাফর সৈকত: একজন কবি ও দার্শনিকের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?
সাম্য রাইয়ান: কবি মাত্রই দার্শনিক, কিন্তু দার্শনিক মাত্রই কবি না৷ 

আবু জাফর সৈকত: কবির স্বাধীনতা বলতে আপনি কী মনে করেন?
সাম্য রাইয়ান: কবির জন্য অতিরিক্ত কোনো স্বাধীনতার দাবি আমি করি না৷ মানুষের বেঁচে থাকবার প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক স্বাধীনতা থাকলেই হলো৷

আবু জাফর সৈকত: এপার বাংলার কবিতার ভাষা এবং ওপার বাংলার কবিতার ভাষার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু এবং কেন?
সাম্য রাইয়ান: এখন তো কোনো পার্থক্য নজরে আসছে না৷ উভয়ই কলকাতার মান ভাষায় লিখছে৷ তবে পার্থক্য নজরে আসতো, যদি বাঙলাদেশের জেলায় জেলায় যে ভাষা বৈচিত্র্য, তা এদেশের কবিতায়— সাহিত্যে দৃশ্যমান হতো৷ 

আবু জাফর সৈকত: সাহিত্যের বিশ্বাস আর ধর্মের বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য বা দ্বন্দ্ব কোথায়?
সাম্য রাইয়ান: ধর্ম নিয়ে যা বলার, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ… এঁরা বলে গেছেন৷ আমি আর নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাই না৷

আবু জাফর সৈকত: কবিতায় ছন্দের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলুন।
সাম্য রাইয়ান: ছন্দ ছাড়া গাছে ফুল ফোটে না, বৃষ্টি ঝরে না৷ এমনকি শিশুর প্রথম কান্নাও ছন্দ ছাড়া নয়৷ জীবন ও জীবনহীনতার প্রতিটি সত্যবিন্দুতে রয়েছে ছন্দ৷ আর এই-সব-কিছু নিয়েই তো কবিতা…

আবু জাফর সৈকত: পুরস্কার একজন লেখকের জন্য প্রয়োজনীয়?
সাম্য রাইয়ান: পুরস্কারের ক্রেস্ট, মেডেল লেখকের কোনও প্রয়োজনই নেই৷ কিন্তু টাকাটা খুবই প্রয়োজন৷

আবু জাফর সৈকত: ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ আপনার এ বছর প্রকাশিত কবিতার বই৷ এটিকে আপনি প্রথম বই বলছেন, তাহলে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ বা ‘মার্কস যদি জানতেন’ এগুলোকে কি আপনি অস্বীকার করছেন?
সাম্য রাইয়ান: নাহ্, অস্বীকার করবো কেন? হামিংবার্ডের ফ্ল্যাপে সবগুলোর নাম উল্লেখ করেছি তো৷ ফেব্রুয়ারি মাসে কিছু সংবাদপত্র যখন বইটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলো তখন আমি এ বিষয়ে বলেছিলাম৷ আবারও বলছি, বাকিগুলো ছিলো পুস্তিকা, এক থেকে দুই ফর্মার চটি৷ যেমন আমার প্রথম প্রকাশিত পুস্তিকা ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’ এক ফর্মার গদ্য সুবিমল মিশ্রকে নিয়ে, তারপর তিনটি কবিতার পুস্তিকা যথাক্রমে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, ‘মার্কস যদি জানতেন’, ‘হলুদ পাহাড়’৷ এরপর চার ফর্মার বোর্ড বাঁধাই করে একদম বইয়ের রূপ দিয়ে প্রকাশিত হলো ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷

আবু জাফর সৈকত: বইটি প্রকাশের পর পাঠকদের সাড়া কেমন পেলেন? প্রকাশক নিয়ে কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়েছিলো কি?
সাম্য রাইয়ান: আমি লিটলম্যাগের বাইরে আজ পর্যন্ত কোথাও লিখিনি৷ ফলে জনপ্রিয় হবার তরিকার বাইরে আমার অবস্থান৷ আর আমি বেসিক্যালি মূর্খ লোক৷ আমার মতো একজন লেখকের যে সামান্য কিছু কবিতা, গদ্য যে লোকে পয়সা খরচ করে কিনে পড়ে এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া৷ আমি জানি, এঁরা সব সচেতন পাঠক৷ কেননা, সচেতন পাঠক ব্যতিত কেউ লিটলম্যাগ পড়ে না৷ আর লিটলম্যাগ যিনি পড়েন না, আমার সন্ধান পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়৷
হামিংবার্ড ব্যতীত সবগুলো পুস্তিকাই আমি নিজে ছেপেছি এবং নিজেই বিক্রি করেছি, ফলে পাঠকের সাথে সরাসরি আমার যোগাযোগ হয়েছে, পরিস্থিতিটা নিজে দেখেছি৷ ‘মার্কস যদি জানতেন’ পুস্তিকাটি তো আমি সম্পূর্ণ পাঠকের পয়সায় ছেপেছিলাম, পাঠক অগ্রিম পয়সা দিয়েছিলো প্রকাশের জন্য৷ আসলে এর মধ্য দিয়ে নিজেকে বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু এবার ঘাসফুল প্রকাশনীর মাহাদী আনাম নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে সবকিছু করেছেন৷ বিক্রিতেও আমার তেমন হাত ছিলো না৷ ফলে সরাসরি ব্যাপারটা দেখার সুযোগ এবার হয়নি আমার৷ কিন্তু অনেকে ফেসবুকে, ওয়েবসাইটে বইটি নিয়ে কথা বলেছেন, আলোচনা লিখেছেন, সেগুলো পড়েছি৷ আমি এ ভেবেই পুলকিত যে লোকে পয়সা খরচ করে এ বই কিনেছেন, পড়েছেন এবং এ নিয়ে কথাও বলছেন৷ 

আবু জাফর সৈকত: আপনি ২০০৬ থেকে লিটলম্যাগ ‘বিন্দু’ সম্পাদনা করছেন৷ কিছুদিন আগে ওয়েবসাইটও হয়েছে বিন্দুর৷ এত বছর ধরে কেন প্রকাশ করছেন?
সাম্য রাইয়ান: আমি বিন্দুর সম্পাদক হলেও বিন্দু আমার একার কাগজ নয়, আমাদের কাগজ, এর সাথে অনেকেই যুক্ত৷ সকলে মিলে আমরা এটি প্রকাশ করি৷ প্রথমে বিন্দু যে উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেছিলাম তা হলো, আমাদের লিখবার কোনো জায়গা ছিলো না৷ তাই একটা জায়গা দরকার ছিলো৷ এত বছর পরে এসেও মনে হয়, আজও কি আছে তেমন জায়গা, যেখানে আমরা হাত খুলে লিখতে পারি? বিন্দুর প্রয়োজনীয়তা আজও রয়েছে এজন্যই যে, আমরা আমাদের লেখাগুলো কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য যে কোনো শক্তির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই এখানে প্রকাশ করতে পারি৷ এখানে বলে রাখি, দিন দিন লেখক ও পাঠক উভয় দিক থেকেই পরিসর বাড়ছে, যা প্রমাণ করে বিন্দু প্রকাশ জরুরী৷ আর ওয়েবসাইট (bindumag.com) আরও আগেই দরকার ছিলো, নানা সীমাবদ্ধতায় তা করা হয়ে উঠেনি৷ ২০১৯ এর ২৬ মার্চ তা সম্ভব হলো৷ এতে আরও অধিক লেখা প্রকাশের এবং পাঠকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ হলো৷

আবু জাফর সৈকত: সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ৷
সাম্য রাইয়ান: ধন্যবাদ ‘শিল্প-সাহিত্য’ পত্রিকাকে৷ শুভকামনা…


সাম্য রাইয়ান- কবি, প্রাবন্ধিক, লিটল ম্যাগাজিন কর্মী, অ্যাকটিভিস্ট। সম্প্রতি তিনি কবিতা, কবিতার বিভিন্ন ধরন, লিটল ম্যাগাজিনসহ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানাদিক, নিজের কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে উঠে আসে কবিতা ভাবনা, জীবন ভাবনা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিয়ে স্বকীয় চিন্তার প্রতিফলন। ২০২২-এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন লাবণী মণ্ডল

লাবণী মণ্ডল: আপনার কবিতার সূচনা ও যাত্রাপথ সম্পর্কে জানতে চাই।
সাম্য রাইয়ান: শব্দখেলার আনন্দ থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম। তখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে অন্তমিল তৈরি করতে, সুর তৈরি করতে আনন্দ হতো। সেই থেকে শুরু, এরপর তো চলছে। ছোটবেলা থেকে গল্পের বই পড়া নেশা হয়ে গিয়েছিলো। পিতৃপ্রজন্মের কল্যাণে আমি জন্মের পরই বাড়িতে বইয়ের সমারোহ পেয়েছিলাম। সেই থেকে বইয়ের সাম্রাজ্যে ঢুকে গেলাম!

লাবণী মণ্ডল: আপনার কাছে কবিতা মানে কী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা আমার কাছে জীবনদর্শন। সূর্যের এক হাত নিচে মেলে দেয়া শরীরের দগদগে ঘা।

লাবণী মণ্ডল: কবিতার বিভিন্ন ধরন বা ফর্ম আছে। আবার এ সময়ে আমরা দেখছি শিল্প-সাহিত্যের অন্যান্য অনেক ধারার মতো কবিতাও ফর্ম থেকে বেরিয়ে আসছে। কবিতার এ দীর্ঘ যাত্রাপথে আধুনিক-উত্তরাধুনিক কবিতার বিভাজন বা ছন্দের ধারা সবই ভেঙে পড়ছে। আবার নতুন ফর্ম গড়েও উঠছে। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতার ফর্ম নিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। ফর্ম মুক্ত হওয়া আসলে একটা ধাঁধা। কারণ তা কেবলই এক ফর্ম থেকে বেরিয়ে আরেক ফর্মের দিকে যাত্রা!

লাবণী মণ্ডল: সার্থক কবিতা হয়ে ওঠার জন্য একটি কবিতায় কী কী থাকা জরুরি মনে হয়?
সাম্য রাইয়ান: সার্থক কবিতা হয়ে ওঠার জন্য অনুকরণ বাদ দিতে হবে। আবার বলি, অনুকরণ বাদ দিতে হবে। অনুকরণ মানুষ করবে না, অনুকরণ বানরের ধর্ম, মানুষ বানর নয়। প্রথমত, চিন্তার গভীরতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই চিন্তার প্রকাশভঙ্গি নতুন হতে হবে। আর সবচেয়ে যেটা বড় কথা, চিন্তাটা সৎ হতে হবে।

লাবণী মণ্ডল: সমকালীন ও বিশ্ব সাহিত্যে কাদের লেখা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
সাম্য রাইয়ান: আমার মনে হয়, আমি এ যাবৎ যা কিছু পাঠ করেছি, তার সবই আমাকে কোন না কোনভাবে প্রভাবিত করেছে।

লাবণী মণ্ডল: আপনার কবি সত্তা-প্রাবন্ধিক সত্তা-সম্পাদক সত্তা, এ তিনটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সাম্য রাইয়ান: আমি মূলত কবিতা লিখি। মাঝেমধ্যে প্রবন্ধ লিখি। পরিমাণে তা খুবই কম। আর সম্পাদনার কথা বললে এভাবে বলতেই পছন্দ করবো—আমি প্রধানত লেখক, লেখার প্রয়োজনে সম্পাদক। নিজের ভেতরে সম্পাদক সত্তা আমার লেখার ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক ভূমিকা রাখে। নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সুবিধে হয়। আমি নিজেই নিজের প্রথম ও প্রধান বিচারক।

লাবণী মণ্ডল: উৎপলকুমার বসু বিগত শতাব্দীর পাঁচের দশকের কবি। তাঁকে নিয়ে আপনার সম্পাদনায় একটি বই প্রকাশিত হয়েছে গত বইমেলায়। তিনি কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
সাম্য রাইয়ান: উৎপলকুমার বসু এমনই এক কবি, যিনি বেঁচে থাকতেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলা কবিতা জগতের অনিবার্য নাম। তার কবিতা পাঠকের কাছে এক বিস্ময় আর রহস্যের আধার হিসেবে আবির্ভূত হয়। তিনি তো সকলের মতো লেখেন না, তার আছে এক ‘ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা’। যার সম্মুখে দাঁড়ালে মনে হয়, এর সকল শব্দই বুঝি অমোঘ—বিকল্পহীন! পুজো করতে নয়, আতশকাচের তলায় বুঝে নেওয়ার কাঙ্ক্ষা থেকেই ২০১৫ সালে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করি বিন্দুর উৎপলকুমার বসু সংখ্যা প্রকাশের। এর মধ্যে আমাদের হতবিহ্বল করে উৎপল প্রয়াত হলেন ওই বছরের অক্টোবরে। পরের বছর সেপ্টেম্বরে মাত্র ছয়জন লেখকের প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশ করলাম বিন্দুর ক্রোড়পত্র— ‘স্পর্শ করে অন্য নানা ফুল’। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা প্রকাশের ভাবনা মাথায় রয়েই গেল। অবশেষে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় চারশত পৃষ্ঠার সেই বই আলোর মুখ দেখেছে, ভারত ও বাঙলাদেশের অর্ধশতাধিক লেখকের প্রবন্ধ নিয়ে।

লাবণী মণ্ডল: কবিতার অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি অর্থাৎ আঙ্গিক, উপমা, ছন্দ, শব্দের বুনন, ভাষার ব্যবহার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মিথ ইত্যাদি সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতার আঙ্গিক, তার শরীরে ছন্দ—এই সকলই চলে আসে কবিতার প্রয়োজনে। ফর্মটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন কোনো ফর্মে লিখতে চাই না যা চর্বিতচর্বন। নতুন চিন্তা, যা আমি প্রকাশ করি, প্রচার করি; তা নতুন ফর্মেই প্রকাশ করতে পছন্দ করি। এ ক্ষেত্রে অবশ্য জঁ লুক গোদার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সুবিমল মিশ্র লিখেছিলেন, ‘বলার ভঙ্গিটাই যখন বিষয় হয়ে ওঠে।’ কখনো কখনো এমনটাও হয়; আঙ্গিক নিজেই বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রত্যেক লেখকের মধ্যেই থাকে; যদি তিনি ‘ক্রিয়েটিভ লেখক’ হন। আমার কবিতার ক্ষেত্রে একসময় নিরীক্ষাচেষ্টাগুলো জ্বলজ্বলে হয়ে থাকতো, কারণ সেই নিরীক্ষাগুলো ছিলো বাহ্যিক, দৃশ্যমান। কিন্তু আমার বর্তমান কবিতায় বাহ্যিক, দৃশ্যমান নিরীক্ষা কমে তা কবিতার অন্তরে প্রবেশ করেছে। আমার সকল বইয়েই নতুন কিছু কাজ আমি করতে চেষ্টা করেছি; নতুন শব্দবন্ধ, বাক্যগঠন, চিন্তায় নতুনত্ব...। কিন্তু তা পাঠকের পাঠপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে না। আমি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সংকলন করি না, কনসেপচুয়ালী পাণ্ডুলিপি গোছাই। প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি কথা বলি, ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ বইয়ে এমন ধরনের গদ্য আমি লিখেছি, যা আমার জানামতে নতুন। ২০১১ থেকে এই ধরনের গদ্য আমি লিখতে শুরু করেছি। রাঁধুনী কতটা এক্সপেরিমেন্ট করে তরকারি রেঁধেছেন এটা ভোজন রসিকের আগ্রহের বিষয় নয়; তার একমাত্র আগ্রহ স্বাদে। এক্সপেরিমেন্ট বা কৌশল রাঁধুনীর ব্যক্তিগত বিষয়। আর নিরীক্ষা যেন পাঠ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে। ধরুন, একজন ইঞ্জিনিয়ার ভাবল বাসের সিট কভারে এত বছর এত এক্সপেরিমেন্ট করলাম, সবাই তার সুফল ভোগ করল—আরামে ভ্রমণ করলো; কিন্তু এর জন্য কত এক্সপেরিমেন্ট করতে হয়েছে তা নিয়ে যেহেতু কেউ কথা বলছে না, এবার একটা দারুণ এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। এই ভেবে তিনি বাসের সিট কভারে কাটা গেঁথে দিলেন। বাসের যাত্রীরা এবার হারে হারে টের পেল ইঞ্জিনিয়ার এক্সপেরিন্ট করেছেন! তো এই ধরনের লোক দেখানো এক্সপেরিমেন্ট আমি করি না। পেন ওয়ারেন তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এক্সপেরিমেন্টাল লেখা আবার কী? জেমস জয়েস কোনো এক্সপেরিমেন্টাল লেখা লেখেননি, তিনি ‘ইউলিসিস’ লিখেছেন। টি এস এলিয়ট ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’ লিখেছেন। যখন আপনারা একটা জিনিস ঠিক ধরতে পারেন না, তখনই তাকে এক্সপেরিমেন্ট বলে ফেলেন; এটা চাপাবাজির একটা অভিজাত শব্দ।”

লাবণী মণ্ডল: সচেতনভাবে, অবচেতনে বা পরিকল্পনা করে, বিভিন্ন উপায়ে কবিতা লেখার কথা প্রচলিত রয়েছে; এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন ও নিজে কীভাবে লেখেন?
সাম্য রাইয়ান: কবিতাগুলো আসলে কী এক ঘোরের মধ্যে লেখা হয়ে যায়, লেখাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘোরটা থাকেই! তাহলে কি একটা ঘোর কেটে গেল মানে একটা কবিতা শেষ হলো? আমার কাছে বিষয়গুলো এমনই মনে হয়। পিকাসোর একটা উক্তি আছে, ‘I don’t search, I find.’ পিকাসোর কথাটা মনে পড়লো। সম্ভবত অনুসন্ধানী মন অবচেতনে সর্বদাই অ্যাকটিভ থাকে, আর টুকে রাখে।

লাবণী মণ্ডল: কাব্যজীবনে আপনার ভেতরে চলমান সংগ্রাম ও সাংসারিক প্রভাব কতটা উপভোগ্য বা যন্ত্রণার?
সাম্য রাইয়ান: এই সময়ে কবির সন্ন্যাস সংসার ত্যাগ করে নয়, সংসারে থেকেই। যিনি কবি, তিনি সমাজ-সংসারের চলমান কার্যক্রমের মধ্যেই কবি। পারিবারিক যন্ত্রণা নয়; বরং একভাবে বলা যায়—পরিবারের প্রভাবেই আমি অল্প বয়সে আউট বই পড়তে শুরু করি। কিছু তো ঝামেলা থাকেই। কিন্তু সেটা অন্যদের তুলনায় আমার অনেক কম। বরং যা কিছু যন্ত্রণার তার কারণ রাষ্ট্র ও সমাজ।

লাবণী মণ্ডল: এ সময়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের ধারা অনেকটাই নগরকেন্দ্রিক। অথবা বলা যায় ঢাকাকেন্দ্রিক। এখানে ঢাকা কেন্দ্র, আরা পুরো দেশ প্রান্ত। কবি-সাহিত্যিকদের যেন অনেকটা কেন্দ্রে এসে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে হয়। আপনি কুড়িগ্রামেই থাকেন। সেখানেই সাহিত্যচর্চার মধ্যে আছেন। বলা যায়, গতানুগতিক ধারায় আপনি প্রান্তের কবি। এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? এটি কি আমাদের সাহিত্যমানের অবনমনকেই তুলে ধরে?
সাম্য রাইয়ান: প্রথম দশকের গোড়ার দিকে ঢাকায় ছিলাম কয়েক বছর। তারপর চলে আসি কুড়িগ্রাম। তারপর থেকে আছি এখানেই। কয়েকবছর ঢাকায় থেকে আমার মনে হয়েছে, ঢাকায় থাকলে আমার অন্য সবই হয়—শুধু লেখাটা ছাড়া। দেখুন, শুধু ঢাকাই তো বাঙলাদেশ নয়, চৌষট্টি হাজার গ্রামই বাঙলাদেশ। কিন্তু শুধু সাহিত্য নয়, সকল সেক্টরেই আমাদের কেন্দ্র হয়ে গেছে ঢাকা। এর ফলে সকল সেক্টরই ক্ষতিগ্রস্ত। বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। আর সমস্যা বলে যা হয়েছে তা হলো, অনেকরকম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে কুড়িগ্রামে থাকার জন্য। দূরত্বটা ফ্যাক্ট হয়েছে অনেক সময়। কিন্তু আমি এগুলো নিয়ে বিচলিত নই। কেননা, আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ...

লাবণী মণ্ডল: লিটল ম্যাগাজিন সাধারণত প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে এক ধরনের প্রতিবাদ। বর্তমানে আমাদের দেশে লিটল ম্যাগাজিনের চর্চাকে কীভাবে দেখেন?
সাম্য রাইয়ান: প্রথম দশকের (২০১০–২০২০) মধ্যবর্তী সময় থেকে বাঙলাদেশে কাগজে ছাপা লিটল ম্যাগাজিনের সংখ্যা ভয়াবহ রকম কমে এসেছে। যেগুলো দৃশ্যমান, তার অধিকাংশই আসলে সাধারণ সাহিত্য পত্রিকা। এগুলো তেজহীন বৃদ্ধ ঘোড়া। ২০১৮ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় লিটলম্যাগ চত্বরে যখন বিন্দুর স্টল ভেঙে দিল বাংলা একাডেমি, তখন সেখানে উপস্থিত বাকি ১৬০টি লিটল ম্যাগাজিন, যাদের স্টল ছিল তারা কেউ প্রতিবাদও করেনি। তাদের কারো মনেই হয়নি লিটলম্যাগের স্টল ভেঙে দেওয়ার প্রতিবাদ করা দরকার! এই ঘটনা আমাদের জন্য নতুন উপলব্ধি তৈরি করেছে। বাঙলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনগুলোর স্বরূপ উন্মোচন করেছে। একসময় এ দেশে লিটলম্যাগের প্রধানতম কাজ ছিল দৈনিক পত্রিকার বিরোধিতা করা। অথচ লেখক কোথায় লিখবেন, না লিখবেন, এইটা সেকেন্ডারি ইস্যু। ফার্স্ট ইস্যু হচ্ছে লেখক কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন, কেন লিখবেন। কিন্তু এখানে হলো উল্টো। কোন কাগজে লিখবেন, এটাই হয়ে গেল প্রধানতম আলোচ্য। ফলে শিল্পকলায় আর শিল্প নাই, রইলো শুধুই কলা। তারই ফলাফল এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। অবিকশিত এই মুভমেন্ট হাজামজাডোবা পুকুরে ডুবে রইল। আরও দেখা গেল, সারাদেশের লিটলম্যাগগুলো—যারা সত্যিকার অর্থে চর্চাটা করেছিল, এখনো করছে; ঢাকাই লিটলম্যাগঅলারা এবং ঢাকার সাথে যুক্ত লিটলম্যাগঅলারা সেগুলোকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার একটা ঘৃণ্য চক্রান্ত করল দশকের পর দশক। এই চক্রান্তের অনেক নমুনা প্রকাশিত রয়েছে। আসলে এই সেক্টরও ভরে গেছে কালচারাল ক্রিমিনাল দিয়ে। এখানেও আওয়ামী লীগ আর বিএনপির দালালি চলছে সমানতালে। ফলে সাহিত্য নির্বাসিত, লিটলম্যাগ মুভমেন্ট বিপর্যস্ত। অবস্থা নির্মম, দুঃখজনক।

লাবণী মণ্ডল: আপনি ২০০৬ সাল থেকে লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু’ সম্পাদনা করছেন। বর্তমানে অনলাইন ও প্রিন্ট সংস্করণে প্রকাশিত হচ্ছে বিন্দু। অনেক লিটলম্যাগ এর মধ্যে শুরু হয়েছে কিন্তু থেমে গেছে, আবার বিন্দু চলছে, এ বিষয়ে কিছু বলুন।
সাম্য রাইয়ান: আমি বিন্দুর সম্পাদক হলেও বিন্দু আমার একার কাগজ নয়, আমাদের কাগজ; এর সাথে অনেকেই যুক্ত। সকলে মিলে আমরা এটি প্রকাশ করি। প্রথমে বিন্দু যে উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেছিলাম তা হলো—আমাদের লিখবার কোনো জায়গা ছিল না। একটা জায়গা দরকার। এত বছর পরে এসেও মনে হয়, আজও কি আছে তেমন জায়গা, যেখানে আমরা হাত খুলে লিখতে পারি? বিন্দুর প্রয়োজনীয়তা আজও রয়েছে এজন্যই যে, আমরা আমাদের লেখাগুলো কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য যে কোনো শক্তির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই এখানে প্রকাশ করতে পারি। এখানে বলে রাখি, দিন দিন লেখক ও পাঠক উভয় দিক থেকেই পরিসর বাড়ছে। আর ওয়েবসাইট (bindumag.com) আরও আগেই দরকার ছিলো, নানা সীমাবদ্ধতায় তা করা হয়ে উঠেনি। ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ থেকে অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ শুরু হয়েছে। এতে আরও অধিক লেখা প্রকাশের এবং পাঠকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ হয়েছে।

লাবণী মণ্ডল: বাংলাদেশে সাহিত্য নিয়ে রাজনীতি বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই। বিশেষত লিটলম্যাগ নিয়ে।
সাম্য রাইয়ান: বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি আমাদের সবুজ ক্ষেত নষ্ট করে ফেলল। এদেশে বেশির ভাগ লিটলম্যাগ মানে বনসাই প্রকল্প। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী লোকজন এখানে সম্পাদনা করে, বুদ্ধিজীবী সাজে, কবিতা লেখে। সেই কবিতা নিয়ে যখন আপনি মন্তব্য করবেন তখনই বুঝতে পারবেন এদের সিন্ডিকেট কত গভীর। এদের হাতে আপনি মারও খেতে পারেন। আর অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, পয়সাঅলা কিংবা সুন্দরী নারীদের তাদের পয়সা কিংবা শরীরের বিনিময়ে কবি-লেখক বানানোরও অনেকগুলো সিন্ডিকেট এই দেশে আছে। এই দেশে সাহিত্য নিয়ে রাজনীতি খুব নোংরা ও সংকীর্ণভাবে হয়। কবি বা লেখক হতে চাইলে এখানে কোনও না কোনও গোষ্ঠীর হাতে নিজেকে সঁপে দিতে হয়! আপনি কত ভাল কবিতা লেখেন এখানে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আপনি কোন গোষ্ঠীর সাথে আছেন এটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি অধিকাংশ লিটলম্যাগও এখন আর লেখা দেখে না, লেখকের দালালি করার যোগ্যতা দেখে। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে, বস্তাপচা কবিতা হোক সমস্যা নাই, কিন্তু গোলামিতে ঊনিশ-বিশ হলেই আপনি বাতিল। আর আছে গলাবাজি। হম্বিতম্বি। এই শব্দদূষণও সাহিত্যের ক্ষতি করছে।

লাবণী মণ্ডল: বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বর্তমান দুরবস্থার পেছনের কারণগুলো কী?
সাম্য রাইয়ান: বাঙলাদেশে আসলে প্রচলিত সংগঠনের যে ফর্ম, সেইটাই ফেইল করেছে। ফলশ্রুতিতে দেখবেন, প্রচলিত সাহিত্য কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠন, যাদের অবস্থা নব্বই দশকেও রমরমা ছিল, আজ তারা স্রেফ জান নিয়ে টিকে আছে। সংগঠনের ফর্মের পরিবর্তন দরকার। যে সম্ভাবনা আমরা দেখেছি গণজাগরণ মঞ্চের প্রথমদিকের সাংগঠনিক ফর্মে কিংবা আরও পরিণত ফর্ম দেখেছি নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোর বিদ্রোহে। এই ফর্মেরই বিকাশ দরকার। আরেকটা বিষয় হলো—বর্তমান সংস্কৃতির সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চলন-বিচলনের বিস্তর ফারাক। আমাদের দেশে একটা কালচারাল রেনেসাঁ দরকার। কিন্তু সংস্কৃতির ভাঙা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে তা সম্ভব নয়; এর জন্য সংস্কৃতির নয়া সেতু গড়তে হবে। নেই অন্য কোনো সহজ বিকল্প।

লাবণী মণ্ডল: লেখালিখির সাথে আপনি একজন অ্যাকটিভিস্টও বটে, এই দুটো পাশাপাশি চলতে অসুবিধে হয় না?
সাম্য রাইয়ান: বর্তমান সময়ে ক্যাপিটালিজমের বহুমুখী আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে একজন মেরুদণ্ডসম্পন্ন লেখককে শুধু নিজের লেখাটি লিখলেই চলে না। সেই লেখা প্রকাশে অ্যাকটিভিস্টের ভূমিকায়ও নামতে হয়। সময় বদলেছে। বদলাচ্ছে। আরও বদলাবে। আক্রমণের রূপ বদলাচ্ছে। আপনাকে শুধু ভাত-কাপড়ে মারবে না এখন। আরও নানান কৌশলে মারবে। আপনি হাঁটা-চলা করবেন, লম্ফঝম্ফ করবেন, কিন্তু বেঁচে থাকবেন না। প্রতিষ্ঠান-পাওয়ার এর পক্ষের লোকজন নানা রূপে আপনাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলবে। আপনাকে অস্থির-অশান্ত করে তুলবে, জীবন অসহ্য করে তুলবে। এমনকি তারা লিটলম্যাগের বেশে হাজির হয়েও এটা করবে। এমন অবস্থায় চুপচাপ বসে থাকা মানে মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া। যা করতে হবে তা হলো—নিজের লেখাটা লিখে যেতে হবে, তা প্রকাশ করার জন্য লিটলম্যাগ জারি রাখতে হবে। লেখাটাই আসল কথা। এটাই সব ষড়যন্ত্রের মোক্ষম জবাব। লেখকের ব্রহ্মাস্ত্র। এটাই লেখকের প্রধানতম অ্যাকটিভিজম। লেখকজীবনের প্রধান কথা।

লাবণী মণ্ডল: জীবন নিয়ে আপনার ভাবনা...
সাম্য রাইয়ান: কবিকে আমার কেবলই মনে হয়—জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি। সে নানান সম্পর্ক—প্রাণের সাথে প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের—সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা। সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই আরেক নাম প্রেম। যা বেঁচে থাকার আনন্দ-বেদনা এবং অনুপ্রেরণা। তাই তো চোখের ভেতরে একটা হামিংবার্ড নিয়ে বসে আছি...

[মনমানচিত্র (আমেরিকা) পত্রিকার সাম্য রাইয়ান বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত৷]


সাম্য রাইয়ানের সাম্প্রতিক সাহিত্যকর্ম ও জীবনকথা সম্পর্কে জানতে দৈনিক উত্তর বাংলা পত্রিকার পক্ষ থেকে মুখোমুখি হয়েছেন সাইদুর রহমান সাগর৷ সাক্ষাৎকারটি ২৫ জুন ২০২১ তারিখ প্রকাশিত হয়েছে৷

সাইদুর রহমান সাগর: করোনার এই দীর্ঘ মহামারিতে আপনার সময় কেমন কাটছে, ভাই?
সাম্য রাইয়ান: করোনাকালীন পুরো সময়টাই এতোটা অস্থির চারদিক… এই সময় আমার প্রধান চেষ্টা ছিলো নিজেকে শান্ত রাখা৷ স্থির রাখা৷ এই সমাজব্যবস্থায় একজন সৎ লেখক/শিল্পীকে কতো রকম পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বিপন্নতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়, বেঁচে থাকতে হয়৷ কতোরকমভাবে নিজেকে ভাঁজ করতে হয়, নিজেকে বিপন্ন করতে তা সেই লেখক/শিল্পী ছাড়া আর কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব না, কারো পক্ষেই না৷

সাইদুর রহমান সাগর: নিজেকে কতোটা স্থির রাখতে পারলেন?
সাম্য রাইয়ান: পরিপার্শ্ব তো আর তা সহজেই হতে দিচ্ছে না৷ নানান প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে৷ এই অসুস্থ সোসাইটিতে হরেক রকম ক্রাইসিসের মুখোমুখি, এগুলো লেখালিখির জন্য স্বাস্থ্যকর ব্যাপার নয় আরকি৷

সাইদুর রহমান সাগর: লকডাউনের ঘরবন্দী সময়ে কী কী কাজ করলেন?
সাম্য রাইয়ান: ঘরবন্দী এই এক দেড় বছরে আমার জীবনে ঘরবন্দী থাকাটা প্রতিবন্ধকতা রূপে তেমন একটা নাই, কারন আমি নরমালিই দূরে কোথাও যাই না তেমন৷ এই সময়ে লেখার পরিমাণ বাড়েনি৷ নরমালি যেরকম লিখি সেরকমই, এক/দেড় বছরে বোধয় দশ-বারোটা কবিতা লিখেছি, মুক্তগদ্য লিখেছি তুলনামুলক বেশি— পাঁচটা বোধয় আর নিবন্ধ লিখেছি তিনটা বা চারটা৷ নিবন্ধগুলো সাহিত্যিক প্রসঙ্গে যেমন সেলিম মোরশেদ, মিজান খন্দকার, মারুফুল আলম…৷ আর অনলাইনে বিন্দুর কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করেছি৷ এর মধ্যে অবরুদ্ধ সময়ের ভাবনা, মহামারীদশার আধ্যান, উৎপলকুমার বসু সংখ্যা ও মাসুমুল আলম সংখ্যা উল্লেখযোগ্য৷ 
 
সাইদুর রহমান সাগর: কবিতার উপাদান আপনি কীভাবে খোঁজেন?
সাম্য রাইয়ান: পিকাসোর একটা উক্তি আছে—‘I don’t search, I find.’ তোমার প্রশ্ন শুনে পিকাসোর কথাটা মনে পড়লো৷ সম্ভবত অনুসন্ধানী মন অবচেতনে সর্বদাই অ্যাকটিভ থাকে, আর টুকে রাখে…৷ পরে এই টুকরো ভাবনা/পংক্তিগুলো লিখিত রূপ পায়৷ 

সাইদুর রহমান সাগর: ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ গ্রন্থের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাই৷
সাম্য রাইয়ান: গদ্য লিখি অনেকদিন৷ মুক্তগদ্য লিখছি প্রায় দশ বছর৷ দুই হাজার এগারোতে বিশেষ ধরণের মুক্তগদ্য লিখতে শুরু করি, এগুলো কবিতা নিয়ে, কিন্তু কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা নয়, বরং কবিতা পড়তে পড়তে আমার মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়েছে, যে অনুভূতি তৈরি হয়েছে তারই বর্ণনা৷ অকপটে গদ্যের শরীরে সংযুক্ত করেছি অ-নে-ক কবির কবিতাংশ৷ কোনো কবিতা পড়ার সময় হয়তো আমার ছেলেবেলার কোনো ঘটনা মনে পড়েছে বা কোনো এক রাতের দৃশ্য মনে পড়েছে, কিংবা নতুন কোনো চিত্রকল্প ভেবেছি সেইসবই বর্ণনা করে গেছি৷ ফলে এ গদ্য কখনো কবিতার মতো এগিয়েছে আবার কখনো গল্প, আবার কখনো প্রবন্ধের রূপ ধারণ করছে হয়তো এক/আধখানা অনুচ্ছেদে৷ এরকমই হয়েছে৷ এই ধরণের গদ্যগুলো ‘কবিতা বনাম কবিতা–কবিতা খেলা সিরিজ’ নামে প্রকাশ করেছিলাম বিভিন্ন লিটলম্যাগে৷
এছাড়াও কিছু মুক্তগদ্য আছে যেগুলো নীরেট অনুভূতি দিয়ে গাঁথা৷ প্রলাপও বলতে পারো৷ অন্ধকারের কুঠুরীতে বসে বকে যাওয়া কথামালা৷ জলের তরঙ্গ কিংবা শিশির-বিন্দু-প্রবাহের অনুভূতি তৈরি করবে মনে৷ কেউ কেউ এগুলোকে গল্পও বলেন৷ এইসব বেখেয়ালী রচনাকতক— আসলে একটা জার্নি— এই ট্রেন তোমাকে নির্দিষ্ট কোথাও পৌঁছে দেবে না, বরং যেতেই থাকবে৷ যতক্ষণ তোমার ইচ্ছে হবে যাত্রা করবে, কোনো রূপে আটকে গেলে ট্রেন থেকে নেমে যাবে— এটা তো লোকাল ট্রেন…

সাইদুর রহমান সাগর: অনেকে মনে করেন আপনি প্রেমের কবি৷ এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
সাম্য রাইয়ান: এইটা একটা গন্ডি৷ এরকম উপাধি-টুপাধি দিয়ে লেখককে আসলে একটা ছোট্ট গন্ডিতে আটকে ফেলা হয়৷ যেমন ধরো নজরুলকে বলতেছে বিদ্রোহী কবি, তাহলে নজরুলের যে এত এত প্রেমের কবিতা বা ভক্তিমূলক কবিতা সেইসবের কী হবে? কিংবা ধরো পল্লীকবি, বৃক্ষকবি, জাতিসত্ত্বার কবি, কিশোর কবি, তরুণ কবি, রাতের কবি, দিনের কবি এইসব খুবই ফানি ব্যাপার৷ কবির নামের সাথে কেউ কেউ যেমন ‘বিশিষ্ট’ শব্দটি যুক্ত করে বিশিষ্টতা আনয়ন করতে চায়! কিন্তু এতে করে কী বিশিষ্টতা যুক্ত হয় তা আমার বোধগম্য নয়৷ কবির সাথে ঐসব যুক্ত করে তাকে আটকে ফেলার মানে হয় না৷ কবি নানান বিষয় নিয়ে লিখে থাকেন, কিন্তু নির্দিষ্ট একটা সাবজেক্টে/অভিধায় তাকে আটকে ফেলাটা ভুল৷ ক্ষতিকরও৷ আমার ক্ষেত্রে এইটা কিছু লোক হয়তো বলে ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইটার কারনে৷ 

সাইদুর রহমান সাগর: আপনি একটি কবিতার বই গণঅর্থায়নে প্রকাশ করেছিলেন৷ এই ব্যাপারে জানতে চাই৷
সাম্য রাইয়ান: হ্যাঁ, ‘মার্কস যদি জানতেন’৷ এটা আসলে নিজেকে বাজিয়ে দেখার চেষ্টা৷ এই যে এত বছর ধরে লিখলাম৷ নিজের পুস্তিকাসব নিজেই প্রকাশ করেছিলাম৷ ২০২০ সাল থেকে অবশ্য ঘাসফুল প্রকাশনী আমার বইপত্র প্রকাশ করছে৷ তো লেখালিখির এই জার্নিতে ২০১৮তে আমার মনে হলো একটা পুস্তিকা পাঠকের টাকায় প্রকাশ করবো৷ আসলে দেখতে চেয়েছিলাম, পাঠক বলতে কিছু আছে কী না আমার কবিতার৷ আমি খুব সচেতনভাবেই বন্ধু বা পরিচিতজনদের কাছে টাকা নেইনি৷ খোলা আহ্বান রেখেছিলাম শুধুমাত্র পাঠকদের কাছে৷ এবং আশাতীত সাড়া পেয়েছিলাম৷ ফলস্বরূপ ‘মার্কস যদি জানতেন’ পাঁচশ' কপির পরিবর্তে এক হাজার কপি ছাপা হয়৷

সাইদুর রহমান সাগর: আগামীতে বই প্রকাশের ব্যাপারে পরিকল্পনা কী এই মুহূর্তে?
সাম্য রাইয়ান: পঞ্চান্ন পর্বের একটা সিরিজ কবিতা আছে ‘লিখিত রাত্রি’ শিরোনামে৷ ২০১৫ এ এই পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছিলাম৷ এটা ছাপার ইচ্ছা আছে৷ আর ‘হলুদ পাহাড়’ নামে একটা দেড় ফর্মার পুস্তিকা আছে, ঐটা রিপ্রিন্ট করবো ভাবছি৷ আর নতুন কিছু কবিতা আছে, এগুলো নিয়ে ‘জলের অপেরা’ শিরোনামে একটি বই করার ইচ্ছে৷ আর কিছু পরিকল্পনা আছে, যা ক্রমশ প্রকাশ্য৷

সাইদুর রহমান সাগর: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ভাই৷
সাম্য রাইয়ান: তোমাকেও ধন্যবাদ। ভালো থেকো৷


বাঙলাদেশের অন্যতম গল্প পত্রিকা ‘বয়ান’-এর চতুর্থ বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৮) ছাপা হয় সাম্য রাইয়ানের এই সাক্ষাৎকারটি। যা বয়ান সম্পাদক অমিতা চক্রবর্তী কর্তৃক গৃহীত। ছাপা ফর্মেটে প্রশ্নগুলোকে সরিয়ে শুধু সাম্য রাইয়ানের উত্তরগুলোকে রাখা হয়েছিল। তাই এখানেও সেভাবেই প্রকাশ করা হল।

সময়ের নিবিড় চিত্র লেখার জন্য লেখকের দরকার পাণ্ডিত্য, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। কিন্তু বর্তমান সময়ে লেখকদের মধ্যে এই দুই বস্তুর পরিমাণই অপ্রতুল। এত অপ্রতুল যোগ্যতা নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের মতো দলদাস হওয়া যায় (যা তিনি জীবনের শেষ পর্বে হয়েছিলেন) কিন্তু সৈয়দ শামসুল হকের মতো এক পিস ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ লেখা যায় না। এখন সবাই আছে টাকা আর ক্ষমতার ধান্দায়। ক্ষমতাসীনদের ‘ব্ল্যাক পাওয়ার’ এর ভাগের আশায়। এই ধরনের লেখকদের কাছে উঁচুমানের সাহিত্য আশা করা বোকামি। এইসবের বাইরে যারা আছেন, তারাও লেখালিখিতে খুব বেশি ‘সুবিধে’ করতে পারছেন না নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে পরিস্থিতি বদলাবে। সময় লাগছে। যেহেতু রাষ্ট্রের বিকাশের সাথেই দেশের শিল্প–সংস্কৃতির বিকাশ যুক্ত। এই দেশটার মায়াবী–করুণ মুখখানার দিকে তাকালেই আমার মায়া হয়। ভাবি, এই দেশে, কিছু লোক লোভ–খ্যাতির মোহমুক্ত হয়েও যে লিখছে, এইই তো বেশি।

প্রভাবশালী গল্প লেখা হলে তবেই না সমাজে গল্পের প্রভাব পড়বে। লেখাই তো হচ্ছে না ওরকম গল্প। অথবা লেখা হলেও হয়তো প্রকাশিত হয় না। এইসব, শিল্প–সাহিত্যের ভোক্তা যেহেতু শিক্ষিত–মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ফলে তাদেরকে আলোড়িত করবার মতো, তাদের মধ্যে প্রভাব রাখবার মতো গল্প লেখা হলে অবশ্যই তা দৃশ্যমান হতো। এই সংকট শুধু গল্পে না; সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও রয়েছে। হুমায়ুন আজাদ, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, তার আগে তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমূখ লেখকগণ যতোটা সাহস–পান্ডিত্য নিয়ে গল্প–উপন্যাস রচনা করেছেন, সেই সাহস–পাণ্ডিত্য, সততা আজকাল আমরা দেখি না। শুধু দেখি কসরৎ; এক মিনিটের জন্য বিখ্যাত হবার।

সমাজের সেই স্তরের নাম ‘লেখক’, যে স্তর গোটা সমাজকে পথ দেখায়। অথচ আজ লেখকই পথ হারিয়ে কলুষিত রাজনীতিবিদের কোলের কুত্তা হয়ে পায়ের কাছে বসে আছে! কতজন লেখক বাঙলাদেশের রাজনীতি সচেতন? যে ব্যবস্থায় রাজনীতিই সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে লেখকগণ নির্লজ্জভাবে প্রচলিত রাজনীতির কাছেই নিজে সঁপে দিয়েছেন। তাহলে সমাজকে পথ দেখাবে কে? এই সমাজে যত ব্যক্তি ‘লেখক’ হিসেবে হাজির রয়েছেন, প্রকৃতপ্রস্তাবে তার আশি শতাংশই দলিললেখক। শেক্সপীয়রের সেই ‘রঙ্গমঞ্চে’ ‘লেখক’ চরিত্রে অভিনয় করে চলেছেন মাত্র।

প্রবীণদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র ‘লেখক’ রয়েছেন। তাদেরকে সালাম। আর তরুণ যে জেনারেশনটি সদ্য লেখার বাজারে হাজির হয়েছে তারা অনেকগুলো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। যার কারণে কোয়ালিটি এবং কোয়ানটিটির দিক থেকে ‘লেখক’ এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা আছে বলে আমি মনে করি। আর প্রযুক্তি–প্লাবনের কারণে আগামীদিনে বড় ধরনের পাঠকশূন্যতায় ভুগতে হবে। কারণ সাধারণ পাঠকের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনই কমেছে লেখকপাঠকের সংখ্যাও। যার কারণে শুধু লেখকই না বরং খুব বড় হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে এই সোসাইটি। তারপর, আবারও, যথারীতি বইয়ের কাছে, শিল্পের কাছে ফিরে আসবে পরিত্রাণের আশায়। ফিরতে তাকে হবেই।


করোনাকালীন সময়ে, ২০২১-এর প্রথমদিকের লকডাউনে কবি সাম্য রাইয়ানের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন তরুণ কবি, চিত্রশিল্পী ও ‘অ-কার’ লিটলম্যাগ সম্পাদক হিম ঋতব্রত

হিম ঋতব্রত: শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?
সাম্য রাইয়ান: খুব একটা ভালো নেই। করোনা-লকডাউন... সব মিলিয়ে ব্যক্তিজীবন খানিকটা বিপর্যস্ত।

হিম ঋতব্রত: কবিতার সাথে কবির নিবিড় সম্পর্ক বা আমৃত্যু সঙ্গম! সত্যিই কি তাই?
সাম্য রাইয়ান: কবিতার সাথে সম্পর্ক বিনাশ হয় না কখনো। আর সেজন্যই কবিতা লেখা ছেড়ে দেয়ার এক যুগ পরেও উৎপলকুমার বসুকে আবারও কবিতা লিখতে হয়। তবে থেমে যাওয়ার উদাহরণও আছে। ফুরিয়ে যাবার উদাহরণও আছে। কিন্তু এতে করে তাদের সাথে কবিতার সম্পর্কের বিনাশ হয়েছে বলে মনে করি না।

হিম ঋতব্রত: কবিতার জন্য সাধনা, পড়া, অনুপ্রেরণা, আড্ডা বা নিঃসঙ্গতার গুরুত্ব কতটা? কবিতার প্রথম পংক্তি কি আপনার মাথায় অলৌকিকভাবে ধরা দেয়?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা লেখা ব্যাপারটা আমার কাছে সাধনা। নিবিষ্টভাবে সেই সাধনা করে যেতে হয়। এইটা জীবন যাপন প্রক্রিয়ারই অংশ। সাধনা, শ্রম, অভিজ্ঞতার সমষ্টিগত ফল কবিতা। অলৌকিকভাবে প্রথম পংক্তি কেন, একটা সেমিক্লোনও আমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। আমি যা লিখি, যতোটুকু লিখি, তার সবটাই আমার চর্চার ফল; সাধনার ফসল। আমার ধারণা, প্রত্যেক লেখক/শিল্পিরই কোথাও না কোথাও/কোন না কোন ভাবে একটি অনুপ্রেরণার জায়গা থাকে। ধরো, একজন কবিকে তরুণ বয়সে তার প্রিয় কোনো ব্যক্তি কবিতার প্রশংসা করেছিলেন; এটুকুই হয়তো তাকে ওই মুহূর্তে অনুপ্রাণিত করেছে। অথবা ধরো, একজন গল্পকারের প্রিয় বন্ধু তার গল্প পছন্দ করতো, এটুকুই তাকে সারাজীবন অনুপ্রাণিত করতে পারে। আবার চলতি পথে একটা ঘাসফড়িংয়ের সাথে দেখা হলো, একগুচ্ছ সবুজ পাতার সাথে দেখা হলো, এ থেকেও অনুপ্রাণিত হতে পারেন! প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশ সকল কিছুই অনুপ্রেরণার কারণ হতে পারে। আমার ধারণা, এটা আরো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রভাবেও হতে পারে। অন্য কেউ বিষয়টাকে গুরুত্ব না দিতে পারেন, কিন্তু যার জীবনে বিষয়টি ঘটেছে সে-ই জানেন তার জন্য বিষয়টি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি, হতে পারে সে নিজেও জানে না, অনুপ্রেরণা সে কোত্থেকে পাচ্ছে; তবু এটি সত্য— জগতের কোন না কোন বিষয় তাকে অনুপ্রাণিত করছে। আড্ডা খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখকের জীবনে। আড্ডা ছাড়া অন্তত আমার পক্ষে বোধয় বেঁচে থাকাই অসম্ভব। আবার কিছু আড্ডা আত্মঘাতী। আড্ডা যেমন লেখককে লেখক করে তুলতে পারে, তেমনই হত্যাও করতে পারে। আড্ডা লেখকের দৈনন্দিন জীবনের খুব সাময়িক ঘটনা। আর সার্বক্ষণিক অনিবার্য নিয়তি নিঃসঙ্গতা। লেখার কাজটি লেখকের একক হবার ফলে লেখক সেইখানে  একা; প্রচণ্ড—নির্মম একা। হাজার বছরের নৈঃসঙ্গচেতনা বহন করেন লেখক। লেখার জন্য আড্ডা এবং নিঃসঙ্গতা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

হিম ঋতব্রত: কবিতার অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি অর্থাৎ আঙ্গিক, উপমা, ছন্দ, শব্দের বুনন, ভাষার ব্যবহার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মিথ ইত্যাদি সম্বন্ধে আপনার বক্তব্য কী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতার আঙ্গিক, তার শরীরে ছন্দ— এই সকলই চলে আসে কবিতার প্রয়োজনে। ফর্মটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন কোনো ফর্মে লিখতে চাই না যা চর্বিতচর্বন...। নতুন চিন্তা, যা আমি প্রকাশ করি— প্রচার করি, তা নতুন ফর্মেই প্রকাশ করতে পছন্দ করি। এক্ষেত্রে অবশ্য জা লুক গোদার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সুবিমল মিশ্র লিখেছিলেন, ‘বলার ভঙ্গিটাই যখন বিষয় হয়ে ওঠে।’কখনো কখনো এমনটাও হয়; আঙ্গিক নিজেই বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রত্যেক লেখকের মধ্যেই থাকে। যদি তিনি ‘ক্রিয়েটিভ লেখক’ হন। আমার কবিতার ক্ষেত্রে একসময় নিরীক্ষাচেষ্টাগুলো জ্বলজ্বলে হয়ে থাকতো, কারণ সেই নিরীক্ষাগুলো ছিলো বাহ্যিক-দৃশ্যমান। কিন্তু আমার বর্তমান কবিতায় বাহ্যিক—দৃশ্যমান নিরীক্ষা কমে তা কবিতার অন্তরে প্রবেশ করেছে। ‘হলুদ পাহাড়’, ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’, ‘লিখিত রাত্রি’... এইসবে অনেক নতুন কাজ করেছি, নতুন শব্দবন্ধ, বাক্যগঠন, চিন্তায় নতুনত্ব আছে। কিন্তু তা পাঠকের পাঠ বাধাগ্রস্ত করবে না। রাঁধুনী কতটা এক্সপেরিমেন্ট করে তরকারি রেঁধেছেন এটা ভোজনরসিকের আগ্রহের বিষয় নয়। তার একমাত্র আগ্রহ স্বাদে। এক্সপেরিমেন্ট/কৌশল রাঁধুনীর ব্যক্তিগত বিষয়। আর নিরীক্ষা যেন পাঠ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে। ধরুন, একজন ইঞ্জিনিয়ার ভাবলো বাসের সিট কভারে এত বছর এত এক্সপেরিমেন্ট করলাম, সবাই তার সুফল ভোগ করলো— আরামে ভ্রমণ করলো কিন্তু এর জন্য কত এক্সপেরিমেন্ট করতে হয়েছে তা নিয়ে যেহেতু কেউ কথা বলছে না, এবার একটা দারুণ এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। এই ভেবে তিনি বাসের সিট কভারে কাটা গেঁথে দিলেন। বাসের যাত্রীরা এবার হারে হারে টের পেল ইঞ্জিনিয়ার এক্সপেরিমেন্ট করেছেন! তো এই ধরনের লোক দেখানো এক্সপেরিমেন্ট আমি করি না। পেন ওয়ারেন তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এক্সপেরিমেন্টাল লেখা আবার কী? জেমস জয়েস কোনো এক্সপেরিমেন্টাল লেখা লেখেননি, তিনি ‘ইউলিসিস’ লিখেছেন। টি. এস. এলিয়ট ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’ লিখেছেন। যখন আপনারা একটা জিনিস ঠিক ধরতে পারেন না, তখনই তাকে এক্সপেরিমেন্ট বলে ফেলেন; এটা চাপাবাজির একটা অভিজাত শব্দ।”

হিম ঋতব্রত: কাব্যজীবনে আপনার ভেতরে চলমান সংগ্রাম ও সাংসারিক প্রভাব কতটা উপভোগ্য বা যন্ত্রণার?
সাম্য রাইয়ান: এই সময়ে কবির সন্ন্যাস সংসার ত্যাগ করে নয়— সংসারে থেকেই। যিনি কবি— তিনি সমাজ-সংসারের চলমান কার্যক্রমের মধ্যেই কবি। পারিবারিক যন্ত্রণা নয়— বরং একভাবে বলা যায়— পরিবারের প্রভাবেই আমি অল্প বয়সে আউট বই পড়তে শুরু করি। কিছু তো ঝামেলা থাকেই। কিন্তু সেটা অন্যদের তুলনায় আমার অনেক কম বোধয়। বরং যা কিছু যন্ত্রণার তার কারণ রাষ্ট্র এবং সোসাইটি।

হিম ঋতব্রত: কবিতা ও অকবিতার মানদণ্ড কী?
সাম্য রাইয়ান: পাঠ অভিজ্ঞতা।

হিম ঋতব্রত: আপনার কাব্যজীবনে শিল্পের অন্যান্য শাখাগুলোর (চিত্রকলা, নাট্যকলা, নৃত্যকলা ইত্যাদি) সাথে সম্পর্ক কেমন?
সাম্য রাইয়ান: পেইন্টিং আর থিয়েটার আমাকে খুব বেশি টানে। দেখতে পছন্দ করি। নৃত্যকলার সাথে সংযোগ কম। তবে আমার সাথে সরাসরি সংযোগ ঘটেছে সংগীতের। পরিবারিক রেওয়াজ অনুযায়ী অন্য সব ভাই-বোনের মতো আমাকেও প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হবার আগে গানের স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছিলো। কুমারেশ স্যারের কাছে গান শিখেছিলাম পাঁচ-সাত বছর। ওই সময় সুরের সাথে আমার আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিলো। প্রাইমারি স্কুল পাশ করার পর আর সংগীত (শিক্ষা কিংবা পারফর্ম) কন্টিনিউ করা হয়নি। কিন্তু ঐ সংযোগ পরবর্তীতে কবিতায় প্রভাব ফেলেছে বলে আমার ধারণা।

হিম ঋতব্রত: যারা কবিতাকে অবসরের কাজ বলে মনে করে কিংবা প্রশ্ন করে কবিতা পড়ব কেন? তাদের কী বলবেন?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা কবির যাপন প্রক্রিয়ার অংশ। কবিতা না লিখেও যিনি বেঁচে থাকতে পারেন, তার লেখার দরকার আছে বলে মনে করি না।

হিম ঋতব্রত: কেবল কবিরাই কি কবিতার সিরিয়াস পাঠক?
সাম্য রাইয়ান: ব্যাপারটা একটু উল্টে ভাবি আমি। কবিতার যারা সিরিয়াস পাঠক— কবিতা তাদের প্রভাবিত করার ফলে কখনো কখনো তারাও লিখতে শুরু করেন।

হিম ঋতব্রত: একজনের কবিতায় আরেকজনের হাত চালানো— এটা কতটা দূষণীয় বা উপকারী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা যেহেতু নিরন্তর চর্চার ব্যাপার, সেহেতু বিশেষত প্রারম্ভিককালে কবিতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার দরকার আছে। আর এইটা আছে বলেই ‘প্রচারবিমুখ’ হিসেবে সর্বাধিক বিজ্ঞাপিত  কবি জীবনানন্দ দাশও কবিতার বই অনেককে পাঠিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে অনুরোধ করতেন।

হিম ঋতব্রত: নিঃস্বার্থ শিল্পচর্চা ও ঝাঁকের কৈ থেকে নিজেকে আলাদা রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং?
সাম্য রাইয়ান: যুগে যুগে শিল্পচর্চায় ঝাঁকের কৈ ছিলো— এখনো আছে— ভবিষ্যতেও থাকবে। তাদের থেকে নিজেকে আলাদা রাখার জন্য বাড়তি আয়োজনের প্রয়োজন নেই। যিনি প্রকৃতপ্রস্তাবে শিল্পী, তিনি এমনিতেই তাদের থেকে আলাদা— উজ্জ্বল প্রদীপ।

হিম ঋতব্রত: ‘মিছিল করে বক্তৃতা দিয়ে কিছুই হবে না; আসল কথা, ভালো কবিতা লেখা দরকার। তখন বই ছেপে গোপন জায়গায় রেখে দিলেও পাঠকরা খুঁজে নিয়ে পড়বে, বিজ্ঞাপন দিতে হবে না!’ বিনয় মজুমদারের এ বক্তব্যের সাথে আজকের দিনের কবিতার বাজার-বাণিজ্য ও সমগ্র বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
সাম্য রাইয়ান: বর্তমান সময়ে ক্যাপিটালিজমের বহুমুখী আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে একজন মেরুদণ্ডসম্পন্ন লেখককে শুধু নিজের লেখাটি লিখলেই চলে না। সেই লেখা প্রকাশে একটিভিস্টের ভূমিকায়ও নামতে হয়। সময় বদলেছে। বদলাচ্ছে। আরো বদলাবে। আক্রমণের রূপ বদলাচ্ছে। আপনাকে শুধু ভাত-কাপড়ে মারবে না এখন— আরো নানান কৌশলে মারবে। তুমি হাঁটা-চলা করবে, লম্ফঝম্ফ করবে, কিন্তু বেঁচে থাকবে না। প্রতিষ্ঠান-পাওয়ার এর পক্ষের লোকজন নানা রূপে তোমাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলবে। তোমাকে অস্থির-অশান্ত করে তুলবে, জীবন অসহ্য করে তুলবে। এমনকি তারা লিটলম্যাগের বেশে হাজির হয়েও এটা করবে। এমন অবস্থায় চুপচাপ বসে থাকা মানে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া। যা করতে হবে তা হলো, নিজের লেখাটা লিখে যেতে হবে, তা প্রকাশ করার জন্য লিটলম্যাগ জীবিত রাখতে হবে। লেখাটাই আসল কথা। এইটাই সকল ষড়যন্ত্রের মোক্ষম জবাব। লেখকের ব্রহ্মাস্ত্র। এইটাই লেখকের প্রধানতম অ্যাকটিভিজম। লেখকজীবনের প্রধান কথা।

হিম ঋতব্রত: যে সকল পাঠকেরা আপনার কবিতা ভালোবাসে এবং কবিতা সম্পর্কে যাদের বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়া রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
সাম্য রাইয়ান: আমার সময়ের কবিতা যারা পড়েন তারা অগ্রসর পাঠক। অগ্রসর না হলে তারা রবীন্দ্র-নজরুল পেরিয়ে আজকের সাম্য রাইয়ান অব্দি পৌঁছতে পারতেন না। তাদের উদ্দেশ্যে বাড়তি কিছু বলার নেই। যা বলার, তা কবিতায় বলেছি— বলি। তবে একটা বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন সময়ে আমার বই যারা কিনেছেন— মন্তব্য জানিয়েছেন— তার একটা বড় অংশই প্রধানত লেখক না, পাঠক। এটা আমি উপভোগ করি।

হিম ঋতব্রত: বর্তমানে কবিতায় বা কবিতার কার্যক্রমে সোশ্যাল সাইটের প্রভাব কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক?
সাম্য রাইয়ান: সোশ্যাল সাইট বলতে বাঙলাদেশে শুধু ফেসবুকই যেহেতু পপুলার, তাই এ নিয়েই বলি। ফেসবুকে এখন সবাই কবি। সবাই দুই লাইন লিখতে চেষ্টা করছে। এটা ভালোই। তবে ক্ষতি হচ্ছে যার সিরিয়াস কাজ করার কথা সে যখন ফেসবুকের লাইক-কমেন্টের মোহে পড়ে চটুলকর্মে মনোনিবেশ করছে। এরকম অনেককেই দেখছি। এটা আমাদের ক্ষতি। আরেকটা বিভ্রান্তি আছে। এরকম বলা হচ্ছে— “লিটলম্যাগের প্রয়োজন এখন নাই কারণ ফেসবুক এখন ‘মুক্ত মিডিয়া’। এখানে কোনো সম্পাদকের সেন্সর নেই— প্রতিষ্ঠানের চোখ রাঙানি নেই।” এই বক্তব্য খুবই হাস্যকর। কারন যারা ফেসবুককে মুক্ত মিডিয়া বলছে, তারা না বুঝে মন্তব্য করছে। ফেসবুকে সম্পাদক নেই ঠিকই কিন্তু সম্পাদকের থেকে বড় ‘সেন্সর রোবট’ আছে। প্রতিষ্ঠানের চোখ রাঙানি নেই ঠিকই কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ‘প্রতিনিধি রোবট’ এর খবরদারি আছে। ফেসবুকের ‘কমিউনিটি স্ট্যাণ্ডার্ড ব্রেক’ করলেই সেই পোস্ট/ছবি ফেসবুক আর দেখায় না। ডিলেট করতে বাধ্য করে। এরকম আরো অনেক বিষয় আছে— বাঙালি এগুলো বুঝবে আরো ধীরে। এবং তখন আবারো লিটলম্যাগেই ফিরতে হবে। কারণ লিটলম্যাগ ছাড়া কবিতা বা শিল্পের জন্য ইতিবাচক মুক্ত মাধ্যম আর নেই।

হিম ঋতব্রত: সমগ্র বিশ্বের কবিতার মূল সুর কি এক নাকি স্থান ভেদে তা ভিন্ন ভিন্ন?
সাম্য রাইয়ান: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কবিতা আমি বিভিন্ন ব্যক্তির অনুবাদের কল্যাণে পড়ি। তো সেইটা যেহেতু মূল পাঠ নয়, ফলে এই পাঠ নিয়ে এ ব্যাপারে মন্তব্য করা খুব একটা ঠিক হবে না। তবে আমার কাছে মূল সুর একই মনে হয় সারা পৃথিবীর কবিতার।

হিম ঋতব্রত: অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’ যুগে যুগে প্রকৃত শিল্পীরা কি এ-ই দারিদ্র্যের সাথেই লড়ে যাবেন?
সাম্য রাইয়ান: প্রকৃত শিল্পীকে যুগে যুগে দারিদ্র্যের সাথে লড়তে হবে, যদি রবীন্দ্রনাথের মতো খাওয়া-পড়ার যোগান কিংবা বুদ্ধদেব বসুর মতো চাকুরী না থাকে। কারন প্রকৃত শিল্পি কখনোই প্রতিষ্ঠিত চর্বিতচর্বনের চর্চা করেন না। ফলে তার যে বিপ্রতীপ ঘরানার শিল্প, তার অবস্থান ঐ সময়ের পপুলার আর্টের থেকে আলাদা হবে, যা থেকে পয়সা উপার্জন হবে না। আর যখন ঐ বিপ্রতীপ ঘরানার আর্ট পাবলিক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পপুলার হবে তখন হয়তো ওই শিল্পী এইসবের উর্দ্ধে থাকবেন।

হিম ঋতব্রত: একমাত্র প্রবল ইচ্ছাশক্তিই কি পারে কবির সকল বাধা ভেঙে ফেলতে?
সাম্য রাইয়ান: বাধা ভেঙে ফেলতে পারে কী না জানি না, তবে প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে বাধা ডিঙিয়ে যাওয়া যায়। সময়টাই তো লড়াই করে বেঁচে থাকার। যিনি লড়াই জারি রেখে নিজের কবিতাকে পণ্য হবার হাত থেকে, প্রতিষ্ঠানের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারেন তার কাছে বাধা পরাজিত হয়। আর যিনি লড়াই করে বাধা ডিঙাতে পারেন না তিনি অন্য কোনো উপায়ে জয়ী হন— হয়তো কখনো তা স্বেচ্ছামৃত্যুর রূপে বা অন্য কিছু…

হিম ঋতব্রত: জন্ম, জীবন, প্রেম, মৃত্যু সম্পর্কে আপনার ভাবনা বা জীবনদর্শন কী? জীবনের কোন অধ্যায়টিকে (শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বৃদ্ধ) বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?
সাম্য রাইয়ান: কবিকে আমার কেবলই মনে হয়-জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি। সে নানান সম্পর্ক— প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের— সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা। সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই আরেক নাম প্রেম। যা বেঁচে থাকার আনন্দ-বেদনা এবং অনুপ্রেরণা। তাই তো চোখের ভেতরে একটা হামিংবার্ড নিয়ে বসে আছি...। মানুষের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই গুরুত্বপূর্ণ—সুন্দর এবং প্রয়োজনীয়। প্রতিটি পর্বের আলাদা সৌন্দর্য আছে। শৈশবের সৌন্দর্য আর যৌবনের সৌন্দর্য এক নয়, কিন্তু উভয়ই সুন্দর। তারুণ্যের সৌন্দর্য সাহস— বিদ্রোহ— তড়িৎ গতি। আবার বৃদ্ধ বয়সের সৌন্দর্য প্রজ্ঞা। জীবনের একেক পর্বের সৌন্দর্য একেক রকম। অনেকে চিরতরুণ থাকতে চায়, বা বৃদ্ধ বয়সে তরুণ সম্বোধন করে— এইটা আমার কাছে অশ্লীল লাগে শুনতে। তরুণকে বৃদ্ধ সম্বোধন করলে যেমন খুশি হবার কিছু নাই, বৃদ্ধকে তরুণ বললেও খুশি হবার কিছু নাই। জীবনের প্রতিটি পর্ব তার আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে সুন্দর এবং প্রয়োজনীয়।

হিম ঋতব্রত: কবিতাই তো কবির শেষ আশ্রয়?
সাম্য রাইয়ান: কবিতাই কবির একমাত্র আশ্রয়।

NewsVillage24: এবার মেলায় কি আপনার বই বের হচ্ছে? প্রকাশিতব্য বই সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন।
সাম্য রাইয়ান: কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বাঘের বাচ্চা’ লিটলম্যাগাজিনের জন্য সমীরণ মোদকের অনুরোধে গত বছরের শেষ দিকে একটি গদ্য লিখেছিলাম ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’ শিরোনামে। এবার একুশে বইমেলায় এই গদ্যটিই পুস্তকাকারে প্রকাশিত হবে বাঙ্ময় প্রকাশনা থেকে। এটা আমার প্রথম পুস্তিকা। প্রকাশক রাশেদুন্নবী সবুজ। প্রচ্ছদ করছেন চারু পিন্টু।

NewsVillage24: সারাবছর লেখক-প্রকাশক বই প্রকাশ না করে এই একুশে বইমেলা এলেই বই প্রকাশ করেন।  বইমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশকে আপনি কীভাবে দেখেন?  
সাম্য রাইয়ান: বাঙলাদেশে পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দেয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম একুশে বইমেলা। ফলে বই প্রকাশের জন্য লেখক-প্রকাশকদের তাকিয়ে থাকতে হয় এই বইমেলার দিকে। আমার মনে হয় বিপনন সমস্যাই এর প্রধান কারণ। যেহেতু এদেশে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিপনন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি ফলে লেখক-প্রকাশকগণ স্বাভাবিকভাবেই বইমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ করবেন। এর কোনো বিকল্প আপাতত আমাদের হাতে নেই।

NewsVillage24: একুশে বইমেলা বাঙলাদেশের সাহিত্যে কী ধরণের প্রভাব ফেলেছে?
সাম্য রাইয়ান: বইমেলা তো লেখকদের কাছে তীর্থযাত্রার মতোই। একজন লেখক সারা বছর মুখিয়ে থাকেন বছরান্তে একটি বইমেলার জন্য। এই আয়োজনে লেখক সরাসরি তার অনেক পাঠকের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পান। ফলে সরাসরি পাঠকের মুখ থেকেও পাঠপ্রতিক্রিয়া জানা হয়। সবমিলিয়ে বাঙলা সাহিত্যে এর প্রভাব বেশ জোড়ালো বলেই আমার মনে হয়। তবে দিন দিন বইমেলাকেন্দ্রিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যে হারে বৃদ্ধি হচ্ছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

NewsVillage24: আমাদের প্রকাশনা শিল্প তরুণদের উৎসাহিত করার ব্যাপারে কী ধরনের ভুমিকা রাখছে বলে আপনি মনে করেন?  
সাম্য রাইয়ান: প্রকাশনা উপরণের সহজলভ্যতার কারণে লেখালিখির সাথে যুক্ত অনেক তরুণই এই শিল্পের সাথে যুক্ত হচ্ছেন। কেননা এখন বই প্রকাশ করা তেমন কোনো জটিল ব্যাপার নয়। পর্যাপ্ত লেখা আর টাকা হলেই বই প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু এই শিল্পকে বিকশিক করার জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগীতার পরিমাণ কিন্তু অত্যন্ত নাজুক। যে কোনো শিল্পকে পর্যাপ্ত বিকশিত করার জন্যই রাষ্ট্রীয় সহযোগীতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এদেশে রাষ্ট্রীয়  সহযোগীতার অপর্যাপ্ততার কারণে প্রকাশনা ব্যাপারটি আসলে এখনো শিল্পই হয়ে উঠেনি।

NewsVillage24: প্রকাশনা উপকরণের সহজলভ্যতার কারণে যে কেউ ইচ্ছা করলেই বই প্রকাশ করতে পারেন। এতে বছর বছর বাড়ছে বইয়ের সংখ্যা। বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মান বৃদ্ধি ঘটছে না বলে অনেকেরই অভিযোগ। বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দ্যাখেন?
সাম্য রাইয়ান: প্রকাশনা উপকরণের সহজলভ্যতার কারণে বইয়ের সংখ্যাবৃদ্ধির ঘটনাকে আমার কাছে পজেটিভই মনে হয়। বই প্রকাশ, বিপনন ও পাঠ– এই ব্যাপারগুলোকে কুক্ষিগত করে একটা সমাজ কোনোভাবেই বিকশিত হতে পারে না।

মানসম্মত বই যে প্রকাশিত হচ্ছে না তা তো নয়। এই দেশে, যেখানে মানুষের চিন্তাজগত কঠোরভাবে বুর্জোয়া প্রচারমাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত, নিয়ন্ত্রিত; সেখানে মানসম্মত বই প্রকাশের হার এরকমই হবে। বছর বছর শ’য়ে শ’য়ে মানসম্মত বই প্রকাশিত হবে না। আর সেই বইও লোকে লাইন দিয়ে কিনবে না।

দেখুন, কেবল প্রচার-প্রপাগান্ডার জোড়ে কোনো বই টিকে থাকে না, অন্তর্গত শক্তি থাকতে হয়। সে শক্তির জোড়েই একটি ভালো বই টিকে থাকে। হাজারো চটকদার বইয়ের ভিড়ে একটি ভালো বই উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকে।

[ প্রণব আচার্য্য গৃহীত এই সাক্ষাৎকারটি ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখ ০৬:৫২:৫৮ মিনিটে NewsVillage24.com-এ প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির প্রকাশনা এখন বন্ধ আছে।]

[ভারতের অনলাইন ছোটকাগজ ‘এবং’ ২৩ জুলাই ২০২৩ তারিখে প্রকাশ করেছিল সাম্য রাইয়ান একক সংখ্যা। সেই সংখ্যায় এবং সম্পাদক দেশিক হাজরা নিয়েছিলেন সাম্য রাইয়ানের নিম্নোক্ত সাক্ষাৎকার। সংখ্যাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।]
 
এবং পত্রিকা: বিন্দু পত্রিকার সম্পাদনা করছেন ২০০৬ সাল থেকে এবং এই পত্রিকা, আজকের দিনে ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত উচ্ছ্বাস। আমাদের সকলেরই জানা। সম্পাদক হিসাবে নির্বাচনের জন্য সর্বপ্রথম আপনি কিভাবে একটি লেখাকে দেখেন—

সাম্য রাইয়ান: প্রধানত আমি দেখি লেখাটি নতুন কিছু দিতে পারছে কী না৷ সেটা হোক চিন্তায়, আঙ্গিকে বা অন্য কোনোদিকে৷ আমি আসলে নতুন লেখা, নতুন চিন্তা প্রকাশ করতে চাই; কবিতা, গদ্য, যা-ই হোক৷ যে লেখা সাধারনত, সচরাচর প্রচলিত পত্রিকাগুলো প্রকাশ করতে পারে না, চায় না; আমি সেধরনের লেখা প্রকাশে অধিক মনযোগী৷ আমি মনে করি, শুধু লেখা প্রকাশ করেই একটি লিটল ম্যাগাজিনের দায় শেষ হয়ে যায় না৷ সার্বিকভাবে একজন লেখককে পাঠকের সামনে উপস্থাপনের দায়ও লিটল ম্যাগাজিনের উপর বর্তায়৷ আনন্দের সাথে এই দায় বিন্দু বহন করে চলেছে এত বছর ধরে৷ ফলে তুমি খেয়াল করবে, এমন সব লেখক, যারা জনপ্রিয় না, গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু পাঠক তাদের সম্পর্কে খুব একটা জানেন না, বিন্দু তাদের নিয়ে আলোচনা, সাক্ষাৎকার এবং বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে৷

এবং পত্রিকা: আপনার বেশিরভাগ কাব্যগ্রন্থের নামকরণ দেখতে পাচ্ছি নিসর্গবর্ণনামূলক— যেমন ‘হলুদ পাহাড়’, ‘চোখের ভেতর হামিং বার্ড’, কিংবা সদ্য প্রকাশিত ‘হালকা রোদের দুপুর’ এই নামকরণ গুলির প্রসঙ্গে যদি দু চার কথা বলেন…

সাম্য রাইয়ান: তুমি বলার আগে আমি নিজেও এভাবে মিলিয়ে দেখিনি৷ আসলে এই কবিতাগুলো, যেগুলো নিসর্গপ্রবণ, সেগুলো আমার ব্যক্তিজীবনের চড়াই-উৎরাইয়ের সাথেই বোধয় সম্পর্কিত৷ কবিকে আমার কেবলই মনে হয়— জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি৷ সে নানান সম্পর্ক— প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের…, সকল সম্পর্ক! এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন— রক্ষা— চ্ছেদ— বিকাশ বিষয়েই মনে হয় কবিজীবনের সকল গবেষণা৷ সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ কবিতাসকল৷ ২০১২ পরবর্তী সময়ে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ আমার ব্যক্তিজীবনকে নির্মমভাবে আক্রান্ত করে তুলেছিলো৷ ‘পৃথিবী সিরিজ’ কবিতায় লিখেছিলাম, “মৃদু শব্দেরা খুব দূরন্ত হয়েছে/ আজকাল, ঘরবাড়ি তছনছ করে।/ আমার পৃথিবী হ’লো উল্টোপালক/ ভেঙে তছনছ—শ্রী একাকার!”

এত আঘাতে জর্জরিত হয়েই বোধকরি মানুষ থেকে দূরবর্তী হয়ে আমি প্রকৃতির নিকটবর্তী হয়েছি৷ অর্থাৎ মানুষকে বন্ধু বানানোর পরিবর্তে নিসর্গের বন্ধু হতে চেষ্টা করেছি৷ ‘ফুলকুমার’ কবিতায় লিখেছিলাম, “মানুষের প্রতি নিষ্ফল প্রণয়যান/ এড়িয়ে চলেছি আমি৷ দেখেছি/ সেসব জীবনের ব্যর্থ অভিযান৷”

আরেকটি কবিতার কথা মনে পড়ছে, ‘লিখিত রাত্রি ২০’, “ওরা চায় আমি পাগল হয়ে যাই, একা হয়ে যাই/ শহরে ঘুরিফিরি নিঃসঙ্গ মানুষ; আমার মৃত্যু হোক/ জলের অভাবে নির্মম: বর্ণনাতীত। অথচ কতো/ পাখি ফুল নদী বন্ধু হচ্ছে অকপটে; কী তুমুল/ আড্ডা দিচ্ছি আমরা। সুযোগ নেই, হবো: একলা-পাগল।”

এবং পত্রিকা: পাঁচের দশকের কবি, কবিতার অনিবার্য নাম উৎপলকুমার বসু এবং এই কাজের আগেও গদ্য রূপে উঠে আসে আরেকটি নাম আপনার কাছ থেকে সুবিমল মিশ্র (২০১৪)। তারপর সদ্য প্রকাশিত জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (প্রবন্ধ সংকলন) এই নামগুলো বেছে নেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ আছে কোন?

সাম্য রাইয়ান: উৎপলকু্মার বসু, সুবিমল মিশ্র কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, এঁদের সাহিত্যের প্রতি ব্যক্তিগত ভালো লাগা তো আছেই৷ সুবিমল মিশ্রকে নিয়ে যে পুস্তিকাটি লিখেছিলাম, সেটি ছিলো তাঁর সাহিত্য পড়তে পড়তে লিখিত নোটের সংকলন৷ এরপর উৎপলকুমার বসুকে নিয়ে সাত বছর ব্যাপী যে কাজটা করেছিলাম, সেটার কারন উৎপল পরবর্তী সময়ের কবিদের কবিতায় তাঁর প্রভাবের তীব্রতা; যা দেখে আমি প্রকৃতপ্রস্তাবে এর কারন অনুসন্ধান করতে চেয়ে ছিলাম৷ আবার যখন দেখলাম শারীরিক প্রয়াণের পর উৎপলকুমার বসুর কবিতা আরো তীব্রতর হয়ে উঠছে বাঙলা মুলুকে, তখন আরো বেশি আগ্রহী হলাম এর কারন জানতে৷ বাঙলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অর্ধ শতাধিক লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণ একত্রিত করে এই সংকলন প্রকাশ করেছিলাম৷ আর ওয়ালীউল্লাহ’র কথা নতুন করে কী বলবো! তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম স্মার্ট কথাসাহিত্যিক৷ আমি ভেবেছিলাম তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে বাঙলাদেশে অনেকেই অনেক উদ্যোগ নিবেন৷ কিন্তু আমি হতভম্ব হয়ে লক্ষ্য করলাম কেউই তাঁর শতবার্ষিকী প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন না৷ এত বড় অসম্মান মেনে নিতে পারলাম না৷ তাই বিন্দুর পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নিয়েছিলাম ‘জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ প্রবন্ধ-সংকলন প্রকাশের৷

এবং পত্রিকা: আমার শেষ প্রশ্ন, এই দশকের আপনার প্রিয় কবি—

সাম্য রাইয়ান: গত দুই দশকে এত এত ভালো কবিতা লেখা হয়েছে, হচ্ছে, যা অভাবনীয়৷ আগের দশকগুলোতে আমরা যেমনটা দেখেছি কয়েকজনমাত্র কবি উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন, ভালো কবিতা লিখছেন, কিন্তু দুই হাজার পরবর্তী সময়ে আমরা তেমনটা দেখছি না৷ এসময়ে একসাথে অনেকেই ভালো লিখছেন, উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন৷ যেন একটা বিকেন্দ্রীকরণের মতো ঘটনা ঘটছে৷ এইটা নতুন ঘটনা বাঙলা সাহিত্যে৷ ফলে অগ্রজরা অনেক ক্ষেত্রেই কনফিউজড হয়ে যাচ্ছেন এই সময়ের কবিতা আলোচনায়, চিহ্নায়নে৷
আর এই দুই দশকে আমার প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতার সংখ্যা অনেক৷


অমর একুশে বইমেলার (২০১৬) মাঠে বাদল শাহ আলম সম্পাদিত সাহিত্যপত্র খননের পক্ষ থেকে এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়। অপ্রকাশিত৷

  • খননঃ এবারের মেলা কেমন লাগছে?
সাম্য রাইয়ানঃ মেলা যেমন হয় আরকি, হৈ চৈ, দৌড়-ঝাপ, মহাকোলাহল। আমার ভাল্লাগে না। তবু আসি, অনেক বন্ধুর সাথে দেখা হয়, আড্ডা হয়। আমি তো ঢাকা থেকে দূরে থাকি, বছরে সাধারণত এই একবারই ঢাকায় আসি, বইপত্র সব একসাথে পাওয়া যায়, এই-ই উদ্দেশ্য।
  • খননঃ আপনি মূলত কোন কাগজের সাথে যুক্ত? কোন কোন পত্রিকায় লিখছেন?
সাম্য রাইয়ানঃ মূলত আমি বিন্দুর সাথে যুক্ত; সম্প্রতি চারবাকের সাথে যুক্ত হয়েছি। নিয়মিত লিখছিলাম দ্রষ্টব্য, জঙশন আর অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা পরস্পরে। মাঝেমধ্যে করাতকল, বিরাঙ, শিরদাঁড়া, ঘুঘু, তৃতীয় চোখ, পুষ্পকরথ, বাঙাল, বিরোধ; কলকাতার বাঘের বাচ্চা, কোলাজ, ঋ৯ প্রভৃতি ছোটকাগজে লিখি।
  • খননঃ আপনাদের পত্রিকার নামসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিন।
সাম্য রাইয়ানঃ দশ বছর আগে যখন আমাদের লেখা প্রকাশের কোনো পত্রিকা ছিল না তখন ‘বিন্দু’ প্রকাশ করতে শুরু করি। মূলত কুড়িগ্রামের আমরা কয়েকজনই লিখতাম, তবে এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বন্ধুরা লিখছেন। বিন্দুর মোট ১৮ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, ১৯ তম সংখ্যার কাজ চলছে। এর বাইরে মাঝেমধ্যে ‘বিন্দু বুলেটিন’ প্রকাশিত হয়।
  • খননঃ আপনি কতোদিন ধরে লিখছেন?
সাম্য রাইয়ানঃ এলেবেলে লেখা লিখি অনেক আগে থেকে। সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করি ২০১০ এর পরে।
  • খননঃ বিন্দুর সাথে আর কে কে যুক্ত?
সাম্য রাইয়ানঃ লেখা, কম্পোজ, ছাপা, বাঁধাই, বিক্রি এই পর্যায়গুলোতে অনেক মানুষই বিন্দুর সাথে যুক্ত। প্রত্যেকেই বিন্দু পরিবারের একেকজন সদস্য হয়ে গেছেন আসলে। এর মধ্যে অনেকে যুক্ত ছিলেন, অনেকে বিযুক্ত হয়েছেন, এভাবেই বিন্দুর যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। এতকিছুর মধ্যেও কিছু মানুষের নাম বলতে পারি, যাঁরা বিন্দুকে আগলে রেখেছেন, কবি ও ছবিয়াল রাশেদুন্নবী সবুজ, কবি আহমেদ মওদুদ, কবি ও স্ক্রিপ্টরাইটার শুভ্র সরখেল, কবি আরণ্যক টিটো, কবি ভাগ্যধন বড়–য়া, কবি সৈয়দ সাখাওয়াৎ, কবি ফরহাদ নাইয়া, কবি তারিফ হক, কবি শামীম সৈকত, কবি ও চিত্রকর রাজীব দত্ত প্রমুখ।
  • খননঃ বিন্দুর উদ্দেশ্য কী?
সাম্য রাইয়ানঃ প্রকাশনার শুর থেকে বিন্দুর একটাই উদ্দেশ্য, নিজেদের ভালো লেখাগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রকাশ করা।
  • খননঃ আপনি কেন লেখেন? কাদের জন্য?
সাম্য রাইয়ানঃ আজকাল কেউ কেউ আমার লেখা পড়েন; বেশ বুঝতে পারি। কেউ যদি আমার লেখা না পড়তেন তবুও আমি লিখতাম। আমার লেখা, পাঠকের পড়া না পড়ার উপর নির্ভর করে না! আমার কথা, আমার বক্তব্য, যে কোনো বিষয়ে - আমার যা চিন্তা তা আমি লিখি; লিখে বলি; এছাড়া আমার আর কোনো মাধ্যম নেই; বিকল্প নেই। অতএব আমাকে লিখতে হবে; কথা বলতে হবে; যে কথা আমার, যা কেউ বলছে না।
  • খননঃ আপনার উদ্দেশ্য কী?
সাম্য রাইয়ানঃ তীব্র কবিতার দিকে যাত্রা ভিন্ন  কোনো উদ্দেশ্য নেই।
  • খননঃ আপনার কাছে ভালো মানের মনে হয় এমন কিছু কাগজের নাম বলুন।
সাম্য রাইয়ানঃ অনেকেই ভালো কাজ করছে। সবার নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। জঙশন, দ্রষ্টব্য, শিরদাঁড়া, কবিতাপত্র, অর্বাক, নিসর্গ, শালুক এঁরা ভালো কাজ করছে।

[ কবি সাম্য রাইয়ান। কুড়িগ্রামে জন্ম, সেখানেই বেড়ে উঠা। সেখানে বসেই লিখছেন দেশজুড়ে – বিভিন্ন লিটলম্যাগ, ওয়েবজিন আর পত্র-পত্রিকায়। কবিতার পাশাপাশি লিখছেন গদ্যও। এখনকার তরুণ লিখিয়েদের মধ্যে বেশ পরিচিত সাম্য। সম্পাদনা করছেন ছোটকাগজ 'বিন্দু'। যুক্ত আছেন সাহিত্য বিষয়ক ওয়েবজিন 'চারবাক' সম্পাদনার সাথেও। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার কাব্যগ্রন্থ 'বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা'। তার কাব্যচর্চা, ভাবনা ও পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেছেন সাম্প্রতিক দেশকালের রাফসান গালিব। ( দেশকাল পত্রিকার লিঙ্ক ) ]

প্রশ্ন: ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ আপনার কততম বই? বইটির নাম প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

সাম্য রাইয়ান: এটি আমার প্রথম কবিতার বই। গত বছর আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে, 'সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট' (গদ্য)।

বইটার নাম অনেক আগে ঠিক করেছিলাম। এ বছর জানুয়ারিতে মনে হয়েছিল নামটি পরিবর্তন করে নতুন নাম দিই, মহাকোলাহল। পরে নতুন নামটি ধোপে টিকল না; আগের নামটিই পুনঃবহাল হল। বইটি শুরু হয়েছে মহাকোলাহল দিয়ে। এই পাণ্ডুলিপি আমি যেভাবে গুছিয়েছি, তাতে এই নামটি ছাড়া অন্যকোনো নাম আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু এই বইয়ের কবিতাগুলোকে কোনো এক নামে ধরা সম্ভব নয়। এমন একটি নাম দিতে চেয়েছি যাতে পাঠক ভেতরের উপাদান সম্পর্কে যথা সম্ভব আভাস পায়। একটা তথ্য দিই, নামকবিতাটি সূচিপত্রে নেই, এটি বড় অক্ষরে ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে শিরোনামহীনভাবে।

প্রশ্ন: কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

সাম্য রাইয়ান:
এলেবেলে লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম অনেক আগে। সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করি ২০১০-র পরে।

বই প্রকাশ নিয়ে আমার বিস্তর ভাবনা আছে; পরে সুযোগ হলে বিস্তারিত বলব। এখন যা করছি, এইসব ছোট ছোট সংকলন, কয়েকটি লেখা নিয়ে পুস্তিকা, এইসব পড়লে- মনে হয় আমার কবিতা চেষ্টা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। বই বলতে আমি যা বুঝি, বই আমার কাছে যেরকম, প্রকৃত প্রস্তাবে তা আমি প্রকাশ করব অন্তত আরও দশ বছর পরে। এখন প্রস্তুতি পর্ব চলছে; যা কিছু করছি সবই এই প্রস্তুতিপর্বের অংশ।

 প্রশ্ন: কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কীভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

সাম্য রাইয়ান:
কবিতা লেখা ব্যাপারটা আমার কাছে সাধনা। অলৌকিক কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা সেমিকোলনও আমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। আমি যা লিখি, তার সবটাই আমার চর্চার ফল; সাধনার ফসল। একদিনের চব্বিশ ঘণ্টাই আমি চিন্তা করি; ভাবি। সেই ভাবনা গুলোই লিখি; এভাবে, লিখতে লিখতে যাচ্ছি...।

দুপুর মিত্র: আপনি কবিতা লিখেন কেন?
সাম্য রাইয়ান: আনন্দের জন্য। স্রেফ আনন্দের জন্য। আর কিছু না— কিচ্ছু না। একটা চিন্তা লেখার পর (তা সে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা এন্টি কবিতা, এন্টি গল্প, এন্টি উপন্যাস এন্টি প্রবন্ধ, নভেলা বা যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন) আমার মধ্যে যে আনন্দের সৃষ্টি হয়, অহংভাব তৈরি হয়— তার তুলনা কী—! পরবর্তীতে যদিওবা এই লেখার অধিকাংশই জায়গা করে নেয় কাগজের ঝুড়িতে। তাৎক্ষণিক। তবুও, লেখার সময় যে অফুরন্ত আনন্দ পেয়েছি এর অধিক কিছু পাবার নেই, আশা করিনা। এইসব আনন্দযজ্ঞের মধ্য দিয়ে সৌন্দর্যসৃষ্টি করি।

দুপুর মিত্র: কবিতা লেখার জন্য একজন কবির কী ধরনের প্রস্তুতি দরকার?
সাম্য রাইয়ান: প্রস্তুতি—! কবিতা আসলে প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করার মতো ব্যাপার নয়৷ লিখা ও প্রস্তুতি দুটোই প্যারালাল ভঙ্গিতে চলে৷

দুপুর মিত্র: সমসাময়িক কাদের কবিতাকে আপনার ভাল লাগে এবং কেন?
সাম্য রাইয়ান: শুরুতেই সমসাময়িক শব্দটার বিষয়ে আমার চিন্তা পরিষ্কার করতে চাই। শিল্পজগতে আমার ‘সমসাময়িক’ বিচার করব আমি সৃষ্টিযোগ্যতা দিয়ে। আমি যখন আবুল হাসানের কবিতা পড়ি, বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পড়ি, জীবনানন্দের কবিতা পড়ি তখন এঁদেরকে আমার পুরনো বলে মনে হয় না, সমসাময়িক।

আবার অনেক তরুণ বয়সীর কবিতা পড়ে মনে হয়, এ ব্যক্তি অনেক পুরনো; আমার আগের কালের। এর জৈবিক বয়স যতোই কম হোক—শিল্পজগতে এ আমার সমসাময়িক হতেই পারে না।

ভালোলাগা কবির তালিকাটায় রয়েছেন আবুল হাসান, আরণ্যক টিটো, সুহৃদ শহীদুল্লাহ্, নাভিল মানদার, আহমেদ নকীব, রাশেদুন্নবী সবুজ, শম্ভু রক্ষিত, মলয় রায়চৌধুরী, ফাল্গুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র, লিন্ডা মারিয়া বারোজ, শামীম কবির, ডায়ানা ডি প্রিমা, সঞ্চয় প্রথম, হুমায়ুন আজাদ, অনুপ চণ্ডাল, উৎপলকুমার বসু, শাহেদ শাফায়েত, ফ্রাঙ্ক ও’হারা, বিষ্ণু বিশ্বাস, রাইনার মারিয়া রিলকে, আহমেদ মওদুদ, বোদলেয়ারসহ আরো আরো বেশ কয়েকজন, যাদের নাম এই মূহূর্তে মনে নাই..

নদীতীরে দাঁড়ালে হুবহু বাতাস
যে কারণে ভালো লাগে, এ-ই কবিদের প্রকাশিত অধিকাংশ কবিতা ঠিক সেই কারণেই ভালো লাগে।

দুপুর মিত্র: সমসাময়িক কাদের কবিতাকে আপনার খারাপ লাগে এবং কেন?
সাম্য রাইয়ান: বুর্জোয়া প্রাতিষ্ঠানিক পত্র-পত্রিকা খুললেই তো বস্তাপঁচা শব্দের, প্রকাশিত মলমূত্র চোখে পড়ে। এদের নাম— কিংবা লেখা— কোনটাই মনে নেই— থাকে না, হারিয়ে যায়।
পুঁজের মতো, চতুর্দিকে এতো এতো আবর্জনা— ঘেন্না ধরে যায়।
খারাপ লাগার কারণ, বলি গু-য়ের গন্ধ যে কারণে খারাপ লাগে, এদের লেখাও সেই একই কারণেই খারাপ লাগে।

দুপুর মিত্র: নব্বই ও শূন্য এই দুই দশককে আপনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সাম্য রাইয়ান: একটু অবাকই হলাম প্রশ্নটা শুনে। নয়’র দশককে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি এটা ভুল, মিথ্যা। আর শূন্যকে দেখেছি শেষের দিকে, স্বল্পমাত্রায়। এই প্রশ্নটা, আমার সম্পর্কে না জেনেই করা হয়েছে বোধ করি; মিথ্যায় অপমানিত বোধ করি; প্রশ্নে উত্তর দেয়া নিয়েই সংশয় তৈরি হয়। —দোল খায়।

দুপুর মিত্র: পশ্চিমবঙ্গের কবিতা আর বাংলাদেশের কবিতার ফারাকটা কোথায়?
সাম্য রাইয়ান:
শিল্পক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল টাইম এন্ড স্পেস।

একজন শিল্পী কোন সময়ে শিল্পচর্চা করছেন, সেই সময় কী রকম; যুদ্ধের আগে—পরে, নাকি যুদ্ধকালীন এইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুদ্ধকে এখানে প্রতীকীভাবে বললাম।
আর একটা বিষয় হল স্পেস। শিল্পি যে জায়গায় শিল্পচর্চা করছেন সেই জায়গাটা ক্যামন, তার আবহ কী রকম, বহুজাতিক আলোয় আলোকিত নাকি প্রাকৃতিক অন্ধকার, এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আজ আমি যে চিন্তাটা লিখছি এই কুড়িগ্রামে বসে, পৃথিবীর অন্য যে কোন প্রান্তের একজন মানুষের চিন্তার সাথে এর সময়গত একটা মিল থাকতে পারে, যেহেতু আমরা একই সময়ের। কিন্তু স্পেস আলাদা হওয়ার কারণে তার প্রেক্ষাপট আলাদা—আমার আলাদা, তার সমস্যাসমাধান আলাদা আমার আলাদা, তাই এক্ষেত্রে স্থানগত একটা অমিল থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এই বিষয়টাকে শুধু ‘পশ্চিমবঙ্গ-বাঙলাদেশ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এভাবে ভাবলে বোধ করি লাভ হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাঙলার মিল-অমিল, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের কবিতায় অমুক শব্দটির ব্যবহার— তমুক শব্দটি কতোবার— এইসব হাবিজাবি— বালছাল নিয়ে বলবে, তিনটা বই পড়ে একটা বই (গবেষণা নামের গরুরচনা) লিখবে প্রতিষ্ঠানের রামছাগলরা; আমি না।

আমি শিল্পী; চিন্তা করি পৃথিবী-বিশ্বব্রহ্মা-কেন্দ্রিক; এমনকি চেষ্টা করি তারও অধিক— যতোটা প্রশস্ত করা যায়।

দুপুর মিত্র: ব্লগ সাহিত্যকে কী বিশেষ কিছু দিচ্ছে?
সাম্য রাইয়ান: ব্লগ একটা প্রকাশমাধ্যম। একটা প্রকাশমাধ্যম সাহিত্যকে কী দেবে?

দুপুর মিত্র: লিটলম্যাগের চাইতে ব্লগ গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার কাছে মনে হয় কি? হলে কেন, না হলে কেন নয়?
সাম্য রাইয়ান: প্রশ্নটা নিয়েই একটা সমস্যা আছে। লিটলম্যাগ তো একটা মুভমেন্ট.. একটা মাধ্যম.. একটা নীরবতা.. একটা ভাঙচুর.. একটা শিল্প.. একটা হাবিজাবি.. একটা প্রতিশিল্প..; আরো অনেক কিছুই; সেটা ছাপাও হতে পারে, অনলাইনও হতে পারে। এখানে প্রশ্নটা হয়তো হার্ডকপি ও সফটকপি বিষয়ক। সেক্ষেত্রে আপনার শব্দগুলোকে অটুট রেখেই আমার মতো ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘ব্লগ ও লিটল ম্যাগাজিন’ দুটোই প্রকাশমাধ্যম। ব্লগ একধরনের, লিটলম্যাগ আরেকধরনের। দুটোর বৈশিষ্ট্য দুই রকম, ত্রুটিও দুইরকম। কোনটির চাইতে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ তা কীভাবে বিচার সম্ভব, জানি না।

বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টাকে ব্যখ্যা করা যেতে পারে। দালালমেরুদন্ডহীন বুর্জোয়া-শয়তানরা ক্ষমতায় থাকার কারণে যেহেতু লিখিতভাবে এই রাষ্ট্রের মালিক জনগণ হলেও দখলসূত্রে ওরা, ফলে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো হয়নি। ইন্টারনেট-কম্পিউটার তাই এখনো ফ্যাশানের মতো। কতোজন পাঠকের ব্লগ পাঠের সক্ষমতা আছে? আমার নিজেরই তো নেই। আর দ্রষ্টব্য, বিন্দু, শিরদাঁড়া, গান্ডীব, জঙশন, প্রতিশিল্প, দুয়েন্দে প্রভৃতি লিটলম্যাগ যখন ছাপা হয়ে আসছে তখন খুব সহজেই তা পাঠের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

আবার আরকেটা বিষয় হলো, আমি কুড়িগ্রামে থাকি, ধরা যাক দ্রষ্টব্যের সুবিমল মিশ্র সংখ্যাটা আমি পড়তে চাচ্ছি—যা বইয়ের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না, এমনকি সম্পাদকের কাছেও কোন কপি নাই; এমন অবস্থায়, যদি দ্রষ্টব্যের ব্লগ সংস্করণ থাকতো তবে কিছুটা হলেও চোখ বুলানো যেত (যেহেতু সাইবার ক্যাফেতে বসলে টাকা দিতে হয় ঘড়ির কাটার হিসাবে), কিন্তু তা না থাকার কারণে হয়ত’ ঐ সংখ্যাটাই আমার পড়া হল না!

তাই আমার মতে লিটলম্যাগাজিনের দুই সংস্করণই থাকা প্রয়োজন। এখনতো বিনে পয়সায়ই ব্লগ খোলা যায়, যা স্বতন্ত্র ওয়েবসাইটের মতোই কাজ করে প্রায়; আমরা বিন্দুর (www.bindumag.com) ক্ষেত্রে যা শুরু করেছি। মোট কথা, হার্ডকপি ও সফটকপি একটি অপরটির সাথে সমন্বয় করে চলতে পারে। সেক্ষেত্রে দুইটিই পূর্ণতা পাবে।

সাক্ষাতকারটি অলস দুপুরে পড়তে ক্লিক করুন

 

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *