সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : বাংলা ট্রিবিউন
বাংলা ট্রিবিউন: কোন বিষয় বা অনুভূতি আপনাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করে?
সাম্য রাইয়ান: যা কিছু আমাকে চিন্তিত করে, যা আমি ভাবি—অনুভব করি, তারই নির্যাস কবিতা৷ আমার জীবন—সামগ্রিক অর্থে যাপন (দরশন) ও তার সাথে সম্পর্কিত সবকিছু নিয়ে আমার কবিতাযাত্রা৷
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি কী ধরনের থিম বা বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
সাম্য রাইয়ান: সাধারণত আমি মানব মনের বৈচিত্রময় অনুরণন লিখতে পছন্দ করি৷ সেই অর্থে বলা যায় প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশই আমার লেখার বিষয়৷ এখন অব্দি এর বাইরে কিছু লিখতে পারিনি৷
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তাৎক্ষণিক অনুপ্রেরণায় লেখেন, নাকি ধীরে ধীরে শব্দ সাজান?
সাম্য রাইয়ান: যখন আমি আইডিয়া পাই তাৎক্ষণিক চিন্তায় অনুপ্রাণিত হই, কিন্তু কবিতার অবয়বে তা ধীরে ধীরে রূপ পায়৷ আমি হয়তো একটা শব্দকে কেন্দ্র করে ভাবতে শুরু করলাম, ঐটা সেন্টার পয়েন্ট; যাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ পরিসর গড়ে ওঠে৷ আর তারপর আমি তাকে বারংবার সংস্কার করি, যাতে করে তা আমার কল্পনা ও অনুভূতির আরো কাছাকাছি পৌঁছতে পারে৷ এমন কবিতা আছে যা আমি এক বসায় লিখে ফেলেছি, পরে টুকটাক এডিটিং করেছি— খুবই সামান্য; যেমন: তীব্র কুড়িগ্রাম, হাসতে হাসতে মরে যাবো, স্বাধীনতা লাগবে, এরকম আরো আছে৷ অপরদিকে অনেক কবিতা আছে যা আমি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সময় নিয়ে লিখেছি৷ যেমন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘জীবনপুরাণ’-এর কথা, যা এক বছর সময় লেগেছিল লিখতে৷ আবার ধরুন, ‘গভীর স্বপ্নের ভেতর’, ‘বেধিদ্রুম’ বা ‘উড়ন্ত কফিন’ এই কবিতাগুলো লিখতেও এক বছরের কাছাকাছি সময় লেগে গিয়েছিলো৷ ফলে আইডিয়া তাৎক্ষণিক হলেও লিখতে আমার অনেক সময় লাগে৷ সে ধীরে ধীরে তৈরি হয়৷
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার কবিতার ভাষা ও শৈলী কীভাবে বেছে নেন?
সাম্য রাইয়ান: সেটা নির্ভর করে আমি কী নিয়ে লিখছি তার উপর৷ আমি যা চিন্তা করি, যেভাবে অনুভব করি তা প্রকাশের জন্য যেকোন পদ্ধতি গ্রহণ করতে আমি প্রস্তুত৷ তথাপি আমি চেষ্টা করি এক আনকোরা ভঙ্গিমার, যা সহজ কিন্তু গভীর৷
কবিতার ফর্ম, তার শরীরে ছন্দ, অলংকার—এই সকলই চলে আসে কবিতার প্রয়োজনে। ফর্মটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন কোনো ফর্মে লিখতে চাই না যা চর্বিতচর্বন। নতুন চিন্তা, যা আমি প্রকাশ করি, প্রচার করি; তা নতুন ফর্মেই প্রকাশ করতে পছন্দ করি।
তাছাড়া প্রতিটি পাণ্ডুলিপিতে আমি একই ফর্মে প্রকাশিত হতে পছন্দ করি না৷ ভিন্ন ভিন্ন বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হওয়া আমাকে নতুন ধরনের আনন্দ দেয়৷ ফলে ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ কিংবা ‘লিখিত রাত্রি’ কিংবা ‘হালকা রোদের দুপুর’ কিংবা ‘জলের অপেরা’ কোনটিরই ভাষা ও শৈলী এক নয়৷ কোনো এক ফর্মে ফিক্সড না হয়ে আমি বরং খুঁজে চলেছি এক অন্যতর ভাষা ও শৈলীকে…৷ বলতে পারেন, এ এক আনকোরা প্রেমের দিকে অন্তহীন যাত্রা৷
বাংলা ট্রিবিউন: কোন কোন কবির প্রভাব আপনার লেখায় আছে?
সাম্য রাইয়ান: নির্দিষ্ট করে ওভাবে বলতে পারবো না৷ তবে সাধারণভাবে, যে সকল কবির কবিতা আমি পড়েছি, ভালো বা মন্দ লেগেছে তার সবই কোনো না কোনভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে৷
বাংলা ট্রিবিউন: কথাসাহিত্যের চর্চা আপনার কবিতায় কতটুকু প্রভাব রাখে?
সাম্য রাইয়ান: আমার একমাত্র প্রকাশিত উপন্যাস— ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’৷ আরো কয়েকটি ফিকশন লিখবার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের; যেমন— ‘2.0 : সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’, ‘মিথ্যার মিউজিয়াম’, ‘মৌন’, ‘ঢাকার ওভারব্রীজে একটি গরু’, ‘এফ মাইনর’, ‘কেয়ারলেস ওম্যান’ আরো বেশ কয়েকটি৷ কবিতা আর কথাসাহিত্যের ভাষা-শৈলীতে অনেক মিল থাকলেও দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ক্ষেত্র ভাবতেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করি৷ কখনো কোথাও গিয়ে সব মিলিত হয়ে যাচ্ছে বটে, তবুও অমিলের জায়গাটি খুবই দৃশ্যমান৷ আমি যখন প্রথমবার ফিকশন লিখতে শুরু করলাম, তখন আমি এক নতুন জগৎ আবিষ্কার করেছিলাম৷ সেই উপলব্ধি সম্পূর্ণ অন্যরকম৷ আমার মনে হলো— উপন্যাস আমাকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দিচ্ছে, অনেক বেশি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে৷ সম্পূর্ণ আবরণমুক্তভাবে পাঠকের সামনে দাঁড় করাচ্ছে৷ ব্যাপারটা আতঙ্কেরও! এতে আমি ভীত সন্ত্রস্ত হলাম৷ কিন্তু তার প্রেমে পড়ে গেলাম৷ মনে হলো আরো লেখা উচিৎ৷
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রথম কবিতার বই সম্পর্কে কিছু বলুন। এটি লিখতে গিয়ে কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
সাম্য রাইয়ান: প্রথম বইটা (চোখের ভেতরে হামিং বার্ড, ২০২০) প্রকাশের আগে আমি প্রায় এক যুগ সিরিয়াসলি লেখালিখি করেছি৷ আমি যেহেতু কনসেপচুয়ালি পাণ্ডুলিপি গোছাই, ফলে একই সাথে আমার কয়েকটি কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি হচ্ছিলো সেসময়, ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ (২০২০), ‘লিখিত রাত্রি’ (২০২২), ‘জলের অপেরা’ (২০২৪)৷ প্রথম কবিতার বইটা প্রকাশের আগে প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে এক/দুই ফর্মার চারটা পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলাম, তিনটা কবিতা ও একটা গদ্যের৷ তবে প্রথম কবিতাপুস্তিকা প্রকাশের ঘটনাটা একটু বিব্রতকর৷ এক ছোট প্রকাশকের বারংবার অনুরোধে ২০১৪-তে প্রথম পুস্তিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করি৷ কিন্তু পাণ্ডুলিপি জমা দেবার পর জানুয়ারির শুরুর দিকে তিনি আমাকে জানালেন— এটি প্রকাশ করা সম্ভব না, কারন লিটলম্যাগ অঙ্গনের অনেকে আমাকে পছন্দ করছে না, তীব্র বিরোধীতা করছে৷ এরপর, যেহেতু পাণ্ডুলিপিটা গোছানো ছিলো আর ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলাম ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশের, ফলে পিছিয়ে আসতেও ইচ্ছে করছিলো না৷ আর কোনো প্রকাশকের কাছে গিয়ে আলাপ করারও আমার কখনো আগ্রহ ছিলো না ফলে শেষমেশ নিজেই ছেপে ফেললাম৷ এভাবে চারটা পুস্তিকা আমি নিজেই ছেপেছি৷ তারপর তো বাংলাবাজারের ঘাষফুল প্রকাশনী ২০২০ থেকে ছাপাছাপির দায়িত্ব নিয়ে আমাকে নির্ভার করলো৷ সেই থেকে এখন অব্দি আমার সব বইপুস্তক ওরাই ছাপছে৷
বাংলা ট্রিবিউন: সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা কি আপনার কবিতায় প্রভাব ফেলে? যদি ফেলে, তবে কীভাবে তা প্রকাশিত হয়?
সাম্য রাইয়ান: সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা—তা আমার মননে যে আলোড়ন তৈরি করে তার অন্তিম নির্যাস কবিতায় প্রকাশ করতে চেষ্টা করি৷ খোলা চোখে যা দেখি তা নিয়ে কম লিখলেও, বন্ধ চোখে যা দেখি মূলত তা নিয়েই আমার কবিতার সংসার৷ ক্ষণস্থায়ী কোনো বিষয়ে কবিতা বোধহয় আমি লিখিনি৷ সেই অনুভবের কথাই লিখতে চেষ্টা করেছি, যার মূল সুর আসলে কোন এক বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হয়েছে কালের পরিক্রমায়—পরিবর্তিত নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতায়ও৷
বাংলা ট্রিবিউন: পাঠকদের মন্তব্য আপনার লেখায় কোনো পরিবর্তন আনে?
সাম্য রাইয়ান: পাঠকদের মন্তব্য আমি খুব মনযোগ দিয়ে শুনি৷ তাদের সমালোচনা থেকে আমি নিজের ত্রুটি চিহ্নিত করতে চাই৷ কিন্তু সেইরকম মন্তব্য পাই না বললেই চলে৷ ফলে পরিবর্তনেরও সুযোগ নাই৷ এদেশে লেখালিখি নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হওয়া দরকার, তার গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি৷ বাক-স্বাধীনতা নাই তো৷ ফলে সমালোচনা সাহিত্য গড়ে ওঠেনি৷ রবীন্দ্র আমলে বা তিরিশের কথাও যদি বলি, যেরকম সমালোচনা করা হতো লেখা ও লেখকের, তা যদি এখন কেউ করে তাহলে নিশ্চিত গোলাগুলি লেগে যাবে৷ এদেশের তথাকথিত লেখকদের যে অবস্থা এখন, তা দেখে সামান্য সমালোচনার সাহসও কোন পাঠক রাখেন না৷ ফলে পাঠকের মন্তব্য শোনার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে৷
বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে কী ধরনের কবিতা লিখতে চান? নতুন কোনো ধারা বা শৈলীতে কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?
সাম্য রাইয়ান: কবিতায় আমার একটা অন্যরূপ-রূপান্তর প্রয়োজন৷ সেই সময়টা দিচ্ছি নিজেকে৷ ফলে আগামী চার-পাঁচ বছর কবিতার বই প্রকাশের পরিকল্পনা নেই৷ বিশেষ প্রয়োজনে পুস্তিকা হতে পারে, আবার! সাম্প্রতিক সময়ে কথাসাহিত্য আমার ভাবনার বিষয়৷ তাছাড়া গত পনের বছরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আমার প্রবন্ধ-নিবন্ধ-চিৎকারের এক সংকলন প্রস্তুত করছি—‘নীরবতা ভেঙে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসুক সশস্ত্র পিঁপড়ে’৷
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : এবং পত্রিকা
“মৃদু শব্দেরা খুব দূরন্ত হয়েছেআজকাল, ঘরবাড়ি তছনছ করে।আমার পৃথিবী হ’লো উল্টোপালকভেঙে তছনছ—শ্রী একাকার!”
“মানুষের প্রতি নিষ্ফল প্রণয়যানএড়িয়ে চলেছি আমি৷ দেখেছিসেসব জীবনের ব্যর্থ অভিযান৷”
“ওরা চায় আমি পাগল হয়ে যাই, একা হয়ে যাইশহরে ঘুরিফিরি নিঃসঙ্গ মানুষ; আমার মৃত্যু হোকজলের অভাবে নির্মম: বর্ণনাতীত। অথচ কতোপাখি ফুল নদী বন্ধু হচ্ছে অকপটে; কী তুমুলআড্ডা দিচ্ছি আমরা। সুযোগ নেই, হবো: একলা-পাগল।”
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : মনমানচিত্র
এই হেমন্তেউঠোনের সমস্ত ব্যর্থতা খুবলে আনা হৃৎপিণ্ডেরমতো প্রকাশ করা দরকার আজ। উনুনের গভীরতমক্যানভাস থেকে বের করে আনা দরকার সমস্ত অমুদ্রিতজলের ইতিহাস। ডুবন্ত চাঁদের যাত্রী কীভাবে,সেইসব তীব্র বিরল ছবি অলক্ষ্যে রোদের বাগানেফুটাতে দিয়ে কোনোদিন, সূর্যবেলায় খুব নির্ভার হবো।
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : আবু জাফর সৈকত
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : লাবণী মণ্ডল
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : সাইদুর রহমান সাগর
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : গল্প পত্রিকা বয়ান
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : হিম ঋতব্রত
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : প্রণব আচার্য্য (newsvillage24.com)
সাম্য রাইয়ান: বাঙলাদেশে পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দেয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম একুশে বইমেলা। ফলে বই প্রকাশের জন্য লেখক-প্রকাশকদের তাকিয়ে থাকতে হয় এই বইমেলার দিকে। আমার মনে হয় বিপনন সমস্যাই এর প্রধান কারণ। যেহেতু এদেশে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিপনন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি ফলে লেখক-প্রকাশকগণ স্বাভাবিকভাবেই বইমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ করবেন। এর কোনো বিকল্প আপাতত আমাদের হাতে নেই।
সাম্য রাইয়ান: বইমেলা তো লেখকদের কাছে তীর্থযাত্রার মতোই। একজন লেখক সারা বছর মুখিয়ে থাকেন বছরান্তে একটি বইমেলার জন্য। এই আয়োজনে লেখক সরাসরি তার অনেক পাঠকের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পান। ফলে সরাসরি পাঠকের মুখ থেকেও পাঠপ্রতিক্রিয়া জানা হয়। সবমিলিয়ে বাঙলা সাহিত্যে এর প্রভাব বেশ জোড়ালো বলেই আমার মনে হয়। তবে দিন দিন বইমেলাকেন্দ্রিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যে হারে বৃদ্ধি হচ্ছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
সাম্য রাইয়ান: প্রকাশনা উপরণের সহজলভ্যতার কারণে লেখালিখির সাথে যুক্ত অনেক তরুণই এই শিল্পের সাথে যুক্ত হচ্ছেন। কেননা এখন বই প্রকাশ করা তেমন কোনো জটিল ব্যাপার নয়। পর্যাপ্ত লেখা আর টাকা হলেই বই প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু এই শিল্পকে বিকশিক করার জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগীতার পরিমাণ কিন্তু অত্যন্ত নাজুক। যে কোনো শিল্পকে পর্যাপ্ত বিকশিত করার জন্যই রাষ্ট্রীয় সহযোগীতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এদেশে রাষ্ট্রীয় সহযোগীতার অপর্যাপ্ততার কারণে প্রকাশনা ব্যাপারটি আসলে এখনো শিল্পই হয়ে উঠেনি।
সাম্য রাইয়ান: প্রকাশনা উপকরণের সহজলভ্যতার কারণে বইয়ের সংখ্যাবৃদ্ধির ঘটনাকে আমার কাছে পজেটিভই মনে হয়। বই প্রকাশ, বিপনন ও পাঠ– এই ব্যাপারগুলোকে কুক্ষিগত করে একটা সমাজ কোনোভাবেই বিকশিত হতে পারে না।
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : দেশিক হাজরা (এবং পত্রিকা, ভারত)
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : খনন লিটলম্যাগ
অমর একুশে বইমেলার (২০১৬) মাঠে বাদল শাহ আলম সম্পাদিত সাহিত্যপত্র খননের পক্ষ থেকে এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়। অপ্রকাশিত৷
- খননঃ এবারের মেলা কেমন লাগছে?
- খননঃ আপনি মূলত কোন কাগজের সাথে যুক্ত? কোন কোন পত্রিকায় লিখছেন?
- খননঃ আপনাদের পত্রিকার নামসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিন।
- খননঃ আপনি কতোদিন ধরে লিখছেন?
- খননঃ বিন্দুর সাথে আর কে কে যুক্ত?
- খননঃ বিন্দুর উদ্দেশ্য কী?
- খননঃ আপনি কেন লেখেন? কাদের জন্য?
- খননঃ আপনার উদ্দেশ্য কী?
- খননঃ আপনার কাছে ভালো মানের মনে হয় এমন কিছু কাগজের নাম বলুন।
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : সাম্প্রতিক দেশকাল পত্রিকা
[ কবি সাম্য রাইয়ান। কুড়িগ্রামে জন্ম, সেখানেই বেড়ে উঠা। সেখানে বসেই লিখছেন দেশজুড়ে – বিভিন্ন লিটলম্যাগ, ওয়েবজিন আর পত্র-পত্রিকায়। কবিতার পাশাপাশি লিখছেন গদ্যও। এখনকার তরুণ লিখিয়েদের মধ্যে বেশ পরিচিত সাম্য। সম্পাদনা করছেন ছোটকাগজ 'বিন্দু'। যুক্ত আছেন সাহিত্য বিষয়ক ওয়েবজিন 'চারবাক' সম্পাদনার সাথেও। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার কাব্যগ্রন্থ 'বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা'। তার কাব্যচর্চা, ভাবনা ও পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেছেন সাম্প্রতিক দেশকালের রাফসান গালিব। ( দেশকাল পত্রিকার লিঙ্ক ) ]
প্রশ্ন: ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ আপনার কততম বই? বইটির নাম প্রসঙ্গে কিছু বলুন।
সাম্য রাইয়ান: এটি আমার প্রথম কবিতার বই। গত বছর আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে, 'সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট' (গদ্য)।
বইটার নাম অনেক আগে ঠিক করেছিলাম। এ বছর জানুয়ারিতে মনে হয়েছিল নামটি পরিবর্তন করে নতুন নাম দিই, মহাকোলাহল। পরে নতুন নামটি ধোপে টিকল না; আগের নামটিই পুনঃবহাল হল। বইটি শুরু হয়েছে মহাকোলাহল দিয়ে। এই পাণ্ডুলিপি আমি যেভাবে গুছিয়েছি, তাতে এই নামটি ছাড়া অন্যকোনো নাম আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু এই বইয়ের কবিতাগুলোকে কোনো এক নামে ধরা সম্ভব নয়। এমন একটি নাম দিতে চেয়েছি যাতে পাঠক ভেতরের উপাদান সম্পর্কে যথা সম্ভব আভাস পায়। একটা তথ্য দিই, নামকবিতাটি সূচিপত্রে নেই, এটি বড় অক্ষরে ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে শিরোনামহীনভাবে।
প্রশ্ন: কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?
সাম্য রাইয়ান: এলেবেলে লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম অনেক আগে। সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করি ২০১০-র পরে।
বই প্রকাশ নিয়ে আমার বিস্তর ভাবনা আছে; পরে সুযোগ হলে বিস্তারিত বলব। এখন যা করছি, এইসব ছোট ছোট সংকলন, কয়েকটি লেখা নিয়ে পুস্তিকা, এইসব পড়লে- মনে হয় আমার কবিতা চেষ্টা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। বই বলতে আমি যা বুঝি, বই আমার কাছে যেরকম, প্রকৃত প্রস্তাবে তা আমি প্রকাশ করব অন্তত আরও দশ বছর পরে। এখন প্রস্তুতি পর্ব চলছে; যা কিছু করছি সবই এই প্রস্তুতিপর্বের অংশ।
প্রশ্ন: কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কীভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা লেখা ব্যাপারটা আমার কাছে সাধনা। অলৌকিক কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা সেমিকোলনও আমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। আমি যা লিখি, তার সবটাই আমার চর্চার ফল; সাধনার ফসল। একদিনের চব্বিশ ঘণ্টাই আমি চিন্তা করি; ভাবি। সেই ভাবনা গুলোই লিখি; এভাবে, লিখতে লিখতে যাচ্ছি...।
সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : দুপুর মিত্র (অলস দুপুর পত্রিকা)
দুপুর মিত্র: আপনি কবিতা লিখেন কেন?
সাম্য রাইয়ান: আনন্দের
জন্য। স্রেফ আনন্দের জন্য। আর কিছু না— কিচ্ছু না। একটা চিন্তা লেখার পর
(তা সে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা এন্টি কবিতা, এন্টি গল্প,
এন্টি উপন্যাস এন্টি প্রবন্ধ, নভেলা বা যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন)
আমার মধ্যে যে আনন্দের সৃষ্টি হয়, অহংভাব তৈরি হয়— তার তুলনা কী—!
পরবর্তীতে যদিওবা এই লেখার অধিকাংশই জায়গা করে নেয় কাগজের ঝুড়িতে।
তাৎক্ষণিক। তবুও, লেখার সময় যে অফুরন্ত আনন্দ পেয়েছি এর অধিক কিছু পাবার
নেই, আশা করিনা। এইসব আনন্দযজ্ঞের মধ্য দিয়ে সৌন্দর্যসৃষ্টি করি।
দুপুর মিত্র: কবিতা লেখার জন্য একজন কবির কী ধরনের প্রস্তুতি দরকার?
সাম্য রাইয়ান: প্রস্তুতি—! কবিতা আসলে প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করার মতো ব্যাপার নয়৷ লিখা ও প্রস্তুতি দুটোই প্যারালাল ভঙ্গিতে চলে৷
দুপুর মিত্র: সমসাময়িক কাদের কবিতাকে আপনার ভাল লাগে এবং কেন?
সাম্য রাইয়ান: শুরুতেই
সমসাময়িক শব্দটার বিষয়ে আমার চিন্তা পরিষ্কার করতে চাই। শিল্পজগতে আমার
‘সমসাময়িক’ বিচার করব আমি সৃষ্টিযোগ্যতা দিয়ে। আমি যখন আবুল হাসানের কবিতা
পড়ি, বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পড়ি, জীবনানন্দের কবিতা পড়ি তখন এঁদেরকে আমার
পুরনো বলে মনে হয় না, সমসাময়িক।
আবার অনেক তরুণ বয়সীর কবিতা পড়ে মনে
হয়, এ ব্যক্তি অনেক পুরনো; আমার আগের কালের। এর জৈবিক বয়স যতোই কম
হোক—শিল্পজগতে এ আমার সমসাময়িক হতেই পারে না।
ভালোলাগা কবির
তালিকাটায় রয়েছেন আবুল হাসান, আরণ্যক টিটো, সুহৃদ শহীদুল্লাহ্, নাভিল মানদার, আহমেদ নকীব, রাশেদুন্নবী সবুজ, শম্ভু রক্ষিত, মলয় রায়চৌধুরী,
ফাল্গুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র, লিন্ডা মারিয়া বারোজ, শামীম কবির, ডায়ানা ডি প্রিমা, সঞ্চয় প্রথম, হুমায়ুন আজাদ, অনুপ চণ্ডাল, উৎপলকুমার বসু, শাহেদ
শাফায়েত, ফ্রাঙ্ক ও’হারা, বিষ্ণু বিশ্বাস, রাইনার মারিয়া রিলকে, আহমেদ মওদুদ, বোদলেয়ারসহ
আরো আরো বেশ কয়েকজন, যাদের নাম এই মূহূর্তে মনে নাই..
নদীতীরে দাঁড়ালে হুবহু বাতাস যে কারণে ভালো লাগে, এ-ই কবিদের প্রকাশিত অধিকাংশ কবিতা ঠিক সেই কারণেই ভালো লাগে।
দুপুর মিত্র: সমসাময়িক কাদের কবিতাকে আপনার খারাপ লাগে এবং কেন?
সাম্য রাইয়ান:
বুর্জোয়া প্রাতিষ্ঠানিক পত্র-পত্রিকা খুললেই তো বস্তাপঁচা শব্দের,
প্রকাশিত মলমূত্র চোখে পড়ে। এদের নাম— কিংবা লেখা— কোনটাই মনে নেই— থাকে
না, হারিয়ে যায়।
পুঁজের মতো, চতুর্দিকে এতো এতো আবর্জনা— ঘেন্না ধরে যায়।
খারাপ লাগার কারণ, বলি গু-য়ের গন্ধ যে কারণে খারাপ লাগে, এদের লেখাও সেই একই কারণেই খারাপ লাগে।
দুপুর মিত্র: নব্বই ও শূন্য এই দুই দশককে আপনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সাম্য রাইয়ান: একটু
অবাকই হলাম প্রশ্নটা শুনে। নয়’র দশককে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি এটা ভুল,
মিথ্যা। আর শূন্যকে দেখেছি শেষের দিকে, স্বল্পমাত্রায়। এই প্রশ্নটা, আমার
সম্পর্কে না জেনেই করা হয়েছে বোধ করি; মিথ্যায় অপমানিত বোধ করি; প্রশ্নে
উত্তর দেয়া নিয়েই সংশয় তৈরি হয়। —দোল খায়।
দুপুর মিত্র: পশ্চিমবঙ্গের কবিতা আর বাংলাদেশের কবিতার ফারাকটা কোথায়?
সাম্য রাইয়ান: শিল্পক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল টাইম এন্ড স্পেস।
একজন
শিল্পী কোন সময়ে শিল্পচর্চা করছেন, সেই সময় কী রকম; যুদ্ধের আগে—পরে, নাকি
যুদ্ধকালীন এইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুদ্ধকে এখানে প্রতীকীভাবে বললাম।
আর একটা বিষয় হল স্পেস। শিল্পি যে জায়গায় শিল্পচর্চা করছেন সেই
জায়গাটা ক্যামন, তার আবহ কী রকম, বহুজাতিক আলোয় আলোকিত নাকি প্রাকৃতিক
অন্ধকার, এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আজ আমি যে চিন্তাটা লিখছি এই
কুড়িগ্রামে বসে, পৃথিবীর অন্য যে কোন প্রান্তের একজন মানুষের চিন্তার সাথে
এর সময়গত একটা মিল থাকতে পারে, যেহেতু আমরা একই সময়ের। কিন্তু স্পেস আলাদা
হওয়ার কারণে তার প্রেক্ষাপট আলাদা—আমার আলাদা, তার সমস্যাসমাধান আলাদা
আমার আলাদা, তাই এক্ষেত্রে স্থানগত একটা অমিল থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এই
বিষয়টাকে শুধু ‘পশ্চিমবঙ্গ-বাঙলাদেশ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এভাবে ভাবলে
বোধ করি লাভ হবে না।
পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাঙলার মিল-অমিল,
রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের কবিতায় অমুক শব্দটির ব্যবহার— তমুক শব্দটি
কতোবার— এইসব হাবিজাবি— বালছাল নিয়ে বলবে, তিনটা বই পড়ে একটা বই (গবেষণা
নামের গরুরচনা) লিখবে প্রতিষ্ঠানের রামছাগলরা; আমি না।
আমি শিল্পী; চিন্তা করি পৃথিবী-বিশ্বব্রহ্মা-কেন্দ্রিক; এমনকি চেষ্টা করি তারও অধিক— যতোটা প্রশস্ত করা যায়।
দুপুর মিত্র: ব্লগ সাহিত্যকে কী বিশেষ কিছু দিচ্ছে?
সাম্য রাইয়ান: ব্লগ একটা প্রকাশমাধ্যম। একটা প্রকাশমাধ্যম সাহিত্যকে কী দেবে?
দুপুর মিত্র: লিটলম্যাগের চাইতে ব্লগ গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার কাছে মনে হয় কি? হলে কেন, না হলে কেন নয়?
সাম্য রাইয়ান:
প্রশ্নটা নিয়েই একটা সমস্যা আছে। লিটলম্যাগ তো একটা মুভমেন্ট.. একটা
মাধ্যম.. একটা নীরবতা.. একটা ভাঙচুর.. একটা শিল্প.. একটা হাবিজাবি.. একটা
প্রতিশিল্প..; আরো অনেক কিছুই; সেটা ছাপাও হতে পারে, অনলাইনও হতে পারে।
এখানে প্রশ্নটা হয়তো হার্ডকপি ও সফটকপি বিষয়ক। সেক্ষেত্রে আপনার শব্দগুলোকে
অটুট রেখেই আমার মতো ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘ব্লগ ও লিটল ম্যাগাজিন’ দুটোই
প্রকাশমাধ্যম। ব্লগ একধরনের, লিটলম্যাগ আরেকধরনের। দুটোর বৈশিষ্ট্য দুই
রকম, ত্রুটিও দুইরকম। কোনটির চাইতে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ তা কীভাবে বিচার
সম্ভব, জানি না।
বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টাকে ব্যখ্যা করা যেতে
পারে। দালালমেরুদন্ডহীন বুর্জোয়া-শয়তানরা ক্ষমতায় থাকার কারণে যেহেতু
লিখিতভাবে এই রাষ্ট্রের মালিক জনগণ হলেও দখলসূত্রে ওরা, ফলে জনগণের
অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো হয়নি। ইন্টারনেট-কম্পিউটার তাই এখনো ফ্যাশানের মতো।
কতোজন পাঠকের ব্লগ পাঠের সক্ষমতা আছে? আমার নিজেরই তো নেই। আর দ্রষ্টব্য,
বিন্দু, শিরদাঁড়া, গান্ডীব, জঙশন, প্রতিশিল্প, দুয়েন্দে প্রভৃতি লিটলম্যাগ
যখন ছাপা হয়ে আসছে তখন খুব সহজেই তা পাঠের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
আবার
আরকেটা বিষয় হলো, আমি কুড়িগ্রামে থাকি, ধরা যাক দ্রষ্টব্যের সুবিমল মিশ্র
সংখ্যাটা আমি পড়তে চাচ্ছি—যা বইয়ের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না, এমনকি
সম্পাদকের কাছেও কোন কপি নাই; এমন অবস্থায়, যদি দ্রষ্টব্যের ব্লগ সংস্করণ
থাকতো তবে কিছুটা হলেও চোখ বুলানো যেত (যেহেতু সাইবার ক্যাফেতে বসলে টাকা
দিতে হয় ঘড়ির কাটার হিসাবে), কিন্তু তা না থাকার কারণে হয়ত’ ঐ সংখ্যাটাই
আমার পড়া হল না!
তাই আমার মতে লিটলম্যাগাজিনের দুই সংস্করণই থাকা
প্রয়োজন। এখনতো বিনে পয়সায়ই ব্লগ খোলা যায়, যা স্বতন্ত্র ওয়েবসাইটের মতোই
কাজ করে প্রায়; আমরা বিন্দুর (www.bindumag.com) ক্ষেত্রে যা
শুরু করেছি। মোট কথা, হার্ডকপি ও সফটকপি একটি অপরটির সাথে সমন্বয় করে চলতে
পারে। সেক্ষেত্রে দুইটিই পূর্ণতা পাবে।
সাক্ষাতকারটি অলস দুপুরে পড়তে ক্লিক করুন


