❑ সাম্য রাইয়ান
যে রাতে প্রথম গোদারের সিনেমা দেখতে বসেছিলাম, তখন কেবল তার নাম আর দুই-একটা রিভিউয়ের বেশি কিছুই জানতাম না। প্রথম সে দেখার দিন-তারিখও মনে নেই। শুধু মনে আছে একটা পুরনো আমলের কম্পিউটার স্ক্রিন, রাতের ঘর, ধীর গতির ইন্টারনেট আর বিদেশী সিনেমা খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনা। আমাদের প্রজন্মের একটা সময় ছিল, যখন সিনেমার কাছে পৌঁছতেও পরিশ্রম করতে হতো। পুরানা পল্টনের ফুটপাতে সিডি-ডিভিডি খুঁজে চলা, বন্ধুর হার্ডডিস্কে কী আছে, কোন চলচ্চিত্রের ভালো কপি পাওয়া যাবে, কোথা থেকে নামানো যায়, ফাইলটির নাম ঠিক আছে কি না, সাবটাইটেল মেলে কি না, এসবের মধ্য দিয়ে সিনেমা আমাদের সামনে হাজির হতো। এখনকার মতো এক স্পর্শে পৃথিবীর প্রায় সব ছবি হাতের কাছে ছিলো না। সেই অন্ধকার সংগ্রহের ভেতর এক রাতে জঁ-লুক গোদারকে পেলাম। ছবিটি ছিল ব্রেথলেস (À bout de souffle)। প্রথম দেখায় ছবিটির কতটা কী বুঝেছিলাম, আজ বলতে পারব না। বরং মনে আছে, শেষ হওয়ার পর অস্বস্তি নিয়ে বসে ছিলাম। তার আগে সিনেমাকে দেখেছি একটা কমপ্লিট ওয়ার্ক হিসেবে; যার শুরু আছে, মধ্যভাগ আছে, পরিণতি আছে এবং সবকিছু শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো অর্থ নির্মাণ করে তবেই সমাপ্ত হয়। গোদারের সিনেমা সেই অভ্যাসটাকে অস্বীকার করল। দৃশ্যের ভেতর হঠাৎ যে কাট, কথার অপ্রত্যাশিত বাঁক, চরিত্রের আচরণের অনিয়ম, ক্যামেরার অস্থিরতা, সবকিছু মিলে মনে হলো সিনেমা এখানে সেই নিয়মগুলো অমান্য করছে। পরে জেনেছি, ব্রেথলেসের সেই ছিন্নভিন্ন গতি, হঠাৎ লাফ দেওয়া সম্পাদনা, প্রচলিত ধারাবাহিকতার প্রতি অনাস্থা চলচ্চিত্রের ভাষায় বড় পরিবর্তনের অংশ ছিল। কিন্তু তখন তো এতসব জানতাম না। শুধু বুঝেছিলাম, এই লোকটা সিনেমাতে আমাদের চেনা নিয়মগুলো মানছেন না। সেই না-মানাটাই আমাকে টেনে নিলো, আটকে রাখলো।
পরে ভিভর সা ভি (Vivre sa vie) প্রথমবার দেখে কিছুই বুঝিনি। ব্রেথলেসের তুলনায় এখানে যেন ঘটনাকে ইচ্ছা করেই আড়ালে রাখা হয়েছে। আনা কারিনার মুখ, তার শরীর, বসে থাকা, হাঁটা, কথোপকথনের বিরতি, মানুষের সঙ্গে তার দূরত্ব, সবকিছু একটা গল্পের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠছিল। তখন বিরক্ত হয়েছিলাম, মনে পড়ে। এখন বুঝি, সেই বিরক্তির কারণ ছিলো আমার দর্শক অভ্যাস্ততা। আমরা সাধারণত চরিত্রকে অনুসরণ করি তার পরিণতি জানার জন্য; গোদার সেখানে চরিত্রের অস্তিত্বের দিকে তাকাতে বাধ্য করেন। একজন নারী কীভাবে পর্দায় উপস্থিত হয়, তাকে কে দেখছে, ক্যামেরার দৃষ্টি কতটা আকাঙ্ক্ষার, কতটা সামাজিক, কতটা পুরুষের তৈরি, এই প্রশ্নগুলো তখন এত পরিষ্কার ছিল না, কিন্তু ছবিটি সেই প্রশ্নগুলোর জন্ম দিয়েছিল। পরে যখন দ্য কনটেম্পট (Le Mépris) দেখি, তখন সেই দৃষ্টির প্রশ্নটা অন্য জায়গায় ধাক্কা দেয়। ছবিটি প্রথমে তার সৌন্দর্য দিয়ে আমাকে আক্রমণ করেছিল। সমুদ্র, স্থাপত্য, আলো, শরীর, ঘরের বিস্তার, মানুষের মুখ, সবকিছু এত সুন্দর যে মনে হয় সৌন্দর্যই ছবিটির প্রধান বিষয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের নিচে ধীরে ধীরে দেখা যায় প্রেমের মধ্যে মালিকানা, শিল্পের মধ্যে বাজার, চলচ্চিত্রের মধ্যে অর্থের ক্ষমতা, পুরুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ— এরকম নানা প্রসঙ্গ। তখন একটা ব্যাপার প্রথম বুঝতে শুরু করি, গোদারের কাছে কোনো ছবি তার দৃশ্যমান সৌন্দর্যের মধ্যে আটকে থাকে না। তিনি ছবির পেছনের কাঠামোটা দেখাতে চান। আশ্চর্য হই। কে টাকা দিচ্ছে, কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কে দেখা যাচ্ছে, কে বাদ পড়ছে, কার শরীর ব্যবহার হচ্ছে, কার কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পিয়েরো দ্য ফু (Pierrot le Fou) আমার জন্য ছিল সেই ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে সেটাকেই উল্টে দেওয়ার অভিজ্ঞতা। ছবিটি দেখার সময় মনে হয়েছিল, গোদার গল্পের ওপর আর কোনো বাধ্যবাধকতা মানতে রাজি নন। রং, গান, বই, কবিতা, প্রেম, হিংসা, রাজনীতি, বিজ্ঞাপন, শরীর, সমুদ্র, বন্দুক, সবকিছু একই প্রবাহে এসে পড়ে। ধরুন, একটা দৃশ্য আবেগ তৈরি করতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই অন্য কোনো শব্দ বা বাক্য তাকে ভেঙে দিচ্ছে। মানুষের মাথার ভেতর তো কোনো সম্পাদকের টেবিল নেই। প্রেমের মাঝখানে রাজনীতি ঢুকে যায়, রাজনীতির মাঝখানে কোনো পুরোনো গান, কোনো বইয়ের বাক্য, শৈশবের স্মৃতি, যৌন আকাঙ্ক্ষা, অর্থের চিন্তা। গোদার সেই অগোছালো সহাবস্থানকে গ্রহণ করেছিলেন।
মসৃণতা কি সত্যিই শিল্পের শ্রেষ্ঠ গুণ? নাকি কখনো একটা দৃশ্যকে ভেঙে দেওয়া, একটা বাক্যকে অসমাপ্ত রাখা, দর্শককে তার অভ্যস্ত আবেগ থেকে সরিয়ে দেওয়া আরও সত্য হতে পারে? এই প্রশ্নের সঙ্গে আমার নিজের লেখালেখিরও কোথাও একটা গোপন যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। সাহিত্যকে সবসময় সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলতে হবে, এমন বিশ্বাসের জায়গায় ফাটল ধরেছিল। আলফাভিল (Alphaville) এসে সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রাজনীতির দিকে নিয়ে গেল। ভবিষ্যতের একটি শহর, অথচ তার ভয়ের জায়গাটা খুব পরিচিত। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করা, চিন্তার ওপর বিধিনিষেধ, মানুষের আবেগকে যুক্তির যন্ত্রে মাপা, প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবনকে শৃঙ্খলিত করা, এগুলো ভবিষ্যতের কল্পনা বলে মনে হয়নি।
টু অর থ্রি থিংস আই নো অ্যাবাউট হার (2 ou 3 choses que je sais d'elle) দেখার সময় প্রথমবার শহরকে সিনেমার সক্রিয় চরিত্র হিসেবে ভাবতে শুরু করি। শহর এখানে শুধু মানুষকে ধারণ করে না, মানুষকে তৈরি করে। বিজ্ঞাপন, পণ্য, বহুতল, রাস্তা, শ্রম, যৌনতা, ভোগ, মধ্যবিত্ত আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত জীবন, সবকিছু একই অর্থনৈতিক বুননের মধ্যে আটকে থাকে। এই ছবির পরে নিজের শহরকেও অন্য চোখে দেখেছি। তারপর উইকএন্ড (Week-end)। সেই দীর্ঘ যানজট প্রথমে হাস্যকর লেগেছিল। এত গাড়ি, এত মানুষ, এত অপেক্ষা, অথচ সবাই কোথাও যাওয়ার জন্য ছুটছে। পরে বুঝলাম, দৃশ্যটি আসলে আধুনিক সভ্যতার একটি নিষ্ঠুর প্রতিকৃতি। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ভোগ, গাড়ি, ছুটি, রাস্তা, মধ্যবিত্ত সাফল্য, সবকিছু শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ জ্যামে এসে আটকে যায়। সভ্যতা যত এগিয়ে যায়, তার আবর্জনার স্তুপও তত বড় হয়। ছবির ভেতরের সহিংসতা তখন পুরো ভোগবাদী কাঠামোর দিকে ছুড়ে দেওয়া বিদ্রূপ হয়ে ওঠে। এই ছবির পর বাস্তবের যানজটকেও মাঝে মাঝে অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছি। শহরের রাস্তায় আটকে থাকা হাজার মানুষকে হঠাৎ মনে হয়েছে একই ইচ্ছার ভেতরে একগুচ্ছ বন্দি চরিত্র।
ষাটের দশকে গোদার যেমন প্রচলিত গল্প বলার ধরন ভেঙেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তিনি আরও সরাসরি রাজনীতি, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, বিপ্লব, গণমাধ্যম ও প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গ ছুঁয়েছেন। লা শিনোয়াজ (La Chinoise), উইকএন্ড, পরে জঁ-পিয়ের গোরা-র সঙ্গে ডজিগা ভের্তভ গ্রুপের হয়ে নির্মিত উইন্ড ফ্রম দ্য ইস্ট (Le Vent d'est), ব্রিটিশ সাউন্ডস (British Sounds), প্রাভদা (Pravda), স্ট্রাগল ইন ইতালি (Luttes en Italie) কিংবা টু ভা বিয়াঁ (Tout va bien)-এর দিকে গেলে দেখা যায়, গোদারের সিনেমা ক্রমশ রাজনৈতিক চিন্তার পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে; সিনেমাকে তিনি তথাকথিত বিনোদন মনে করছেন না। ষাটের দশকের শেষদিকে গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল সেই বিশ্বাসেরই সম্প্রসারণ। সিনেমা তখন তাঁর কাছে চিন্তার সংঘর্ষের জায়গা।
গোদার দেখালেন, প্রশ্নটা কেবল, কী বলা হচ্ছে তা নয়, কীভাবে বলা হচ্ছে এবং কে বলছে। যে সিনেমা দর্শককে দুঘন্টার নিরাপদ ট্রাভেল করিয়ে শেষে একটি রেডিমেট অর্থ হাতে ধরিয়ে বাড়ি পাঠায়, তার বিপরীতে তিনি এমন চলচ্চিত্র বানিয়েছেন যেখানে দর্শককে বারবার নিজের অবস্থান পরীক্ষা করতে হয়। চরিত্র জানে সে সিনেমায় আছে, পরিচালক কখনো কখনো সেই নির্মাণপ্রক্রিয়াকেও দৃশ্যমান করেন, শব্দ আর ছবির সম্পর্ককে অস্বাভাবিক করে তোলেন। ফলে দর্শককে নিছক ভোক্তা করে রাখা হয় না। তাকে নিজের দেখার প্রক্রিয়াটিও দেখতে হয়।
যদিও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান এখন এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে তাঁকে প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভাবা কঠিন। বিদ্রোহ যখন ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, তখন তার ধার কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু গোদারের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা থেকেই যায়। তাঁকে যতই শ্রদ্ধার সঙ্গে চলচ্চিত্রের পাঠ্যবইয়ে বসানো হোক, তাঁর সিনেমা পাঠ্যবইয়ের ভাষাকেই অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। কারণ তিনি রেখে গেছেন সন্দেহ করার অভ্যাস। তাঁর সিনেমা দেখে তাঁর অনুগামী হওয়া সহজ, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে সত্যিই কিছু শেখা কঠিন। কারণ তাঁর সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা গোদারকেও সন্দেহ করা।
এখন সিনেমা হাতের মুঠোয়। অসংখ্য ছবি, অসংখ্য প্লাটফর্ম, অসংখ্য পদক। অতিরিক্ত ছবির ভিড় আমাদের আরও অমনোযোগী করে তুলছে। গোদারের সিনেমা এই অমনোযোগের বিপরীতে দাঁড়ায়। তিনি দর্শককে আরাম দেন না। ছবি দেখতে দেখতে ছবি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেন। একটি প্রেমের দৃশ্যকে প্রেমের বাইরে নিয়ে যান, একটি বিজ্ঞাপনকে অর্থনীতির মধ্যে, একটি শহরকে শ্রেণির মধ্যে, একটি নারীর মুখকে দৃষ্টির রাজনীতির মধ্যে, একটি চলচ্চিত্রকে তার অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বসিয়ে দেন।
সিনেমা তাঁর কাছে এমন চিন্তাযান, যার চলন মসৃণ নয়। এর মধ্যে শব্দ, রাজনীতি, কবিতা, বাজার, স্মৃতি সবকিছু ঢুকে পড়ে। এইই তাঁর সৌন্দর্য। তিনি চলচ্চিত্রকে সম্পূর্ণ করে দর্শকের হাতে তুলে দিতে চাননি; অসমাপ্ত রেখেছেন, যাতে দর্শক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই অনুপস্থিত অংশগুলোর সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারেন।
২০২২-এর ১৩ই সেপ্টেম্বর গোদার চলে গেলেন! কিন্তু তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়টা? পুরোনো কম্পিউটার, রাত, ধীরে বয়ে চলা সিনেমা, অপরিচিত ভাষা, নিচে ভেসে ওঠা সাবটাইটেল, একটা দৃশ্য বুঝতে না পেরে আবার দেখা, কোনো বন্ধুর সঙ্গে পরদিন সেই ছবি নিয়ে কথা বলা, নিজের ভেতরে অকারণে তার একটা দৃশ্য বহন করে বেড়ানো, এসবই গোদারের স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।
যাকে ধরে নেয়া হয়েছে ঠিক বলে, তিনি সেইসব বিষয়ের প্রতি অন্ধবিশ্বাসটা একটু কমিয়ে দিয়েছেন। সেই অবিশ্বাসের নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। এখন কোনো ছবি সুন্দর হলে তার সৌন্দর্যের আড়াল দেখতে ইচ্ছে করে! কোনো গল্প নিখুঁত হলে তার বাদ পড়া চরিত্রগুলোকে খুঁজতে ইচ্ছে করে!
তিনি পুরোনো পৃথিবীটাকে এমনভাবে জাম্প-কাটে জুড়ে দিয়েছেন যে সেদিকে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে মুখ ফেরানোর উপায় নেই। সেই দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য করাটাই গোদারের আসল ক্যারিশমা।