করোনাকালীন সময়ে, ২০২১-এর প্রথমদিকের লকডাউনে কবি সাম্য রাইয়ানের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন তরুণ কবি, চিত্রশিল্পী ও ‘অ-কার’ লিটলম্যাগ সম্পাদক হিম ঋতব্রত।
হিম ঋতব্রত: শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?
সাম্য রাইয়ান: খুব একটা ভালো নেই। করোনা-লকডাউন... সব মিলিয়ে ব্যক্তিজীবন খানিকটা বিপর্যস্ত।
হিম ঋতব্রত: কবিতার সাথে কবির নিবিড় সম্পর্ক বা আমৃত্যু সঙ্গম! সত্যিই কি তাই?
সাম্য রাইয়ান: কবিতার সাথে সম্পর্ক বিনাশ হয় না কখনো। আর সেজন্যই কবিতা লেখা ছেড়ে দেয়ার এক যুগ পরেও উৎপলকুমার বসুকে আবারও কবিতা লিখতে হয়। তবে থেমে যাওয়ার উদাহরণও আছে। ফুরিয়ে যাবার উদাহরণও আছে। কিন্তু এতে করে তাদের সাথে কবিতার সম্পর্কের বিনাশ হয়েছে বলে মনে করি না।
হিম ঋতব্রত: কবিতার জন্য সাধনা, পড়া, অনুপ্রেরণা, আড্ডা বা নিঃসঙ্গতার গুরুত্ব কতটা? কবিতার প্রথম পংক্তি কি আপনার মাথায় অলৌকিকভাবে ধরা দেয়?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা লেখা ব্যাপারটা আমার কাছে সাধনা। নিবিষ্টভাবে সেই সাধনা করে যেতে হয়। এইটা জীবন যাপন প্রক্রিয়ারই অংশ। সাধনা, শ্রম, অভিজ্ঞতার সমষ্টিগত ফল কবিতা। অলৌকিকভাবে প্রথম পংক্তি কেন, একটা সেমিক্লোনও আমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। আমি যা লিখি, যতোটুকু লিখি, তার সবটাই আমার চর্চার ফল; সাধনার ফসল। আমার ধারণা, প্রত্যেক লেখক/শিল্পিরই কোথাও না কোথাও/কোন না কোন ভাবে একটি অনুপ্রেরণার জায়গা থাকে। ধরো, একজন কবিকে তরুণ বয়সে তার প্রিয় কোনো ব্যক্তি কবিতার প্রশংসা করেছিলেন; এটুকুই হয়তো তাকে ওই মুহূর্তে অনুপ্রাণিত করেছে। অথবা ধরো, একজন গল্পকারের প্রিয় বন্ধু তার গল্প পছন্দ করতো, এটুকুই তাকে সারাজীবন অনুপ্রাণিত করতে পারে। আবার চলতি পথে একটা ঘাসফড়িংয়ের সাথে দেখা হলো, একগুচ্ছ সবুজ পাতার সাথে দেখা হলো, এ থেকেও অনুপ্রাণিত হতে পারেন! প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশ সকল কিছুই অনুপ্রেরণার কারণ হতে পারে। আমার ধারণা, এটা আরো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রভাবেও হতে পারে। অন্য কেউ বিষয়টাকে গুরুত্ব না দিতে পারেন, কিন্তু যার জীবনে বিষয়টি ঘটেছে সে-ই জানেন তার জন্য বিষয়টি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি, হতে পারে সে নিজেও জানে না, অনুপ্রেরণা সে কোত্থেকে পাচ্ছে; তবু এটি সত্য— জগতের কোন না কোন বিষয় তাকে অনুপ্রাণিত করছে। আড্ডা খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখকের জীবনে। আড্ডা ছাড়া অন্তত আমার পক্ষে বোধয় বেঁচে থাকাই অসম্ভব। আবার কিছু আড্ডা আত্মঘাতী। আড্ডা যেমন লেখককে লেখক করে তুলতে পারে, তেমনই হত্যাও করতে পারে। আড্ডা লেখকের দৈনন্দিন জীবনের খুব সাময়িক ঘটনা। আর সার্বক্ষণিক অনিবার্য নিয়তি নিঃসঙ্গতা। লেখার কাজটি লেখকের একক হবার ফলে লেখক সেইখানে একা; প্রচণ্ড—নির্মম একা। হাজার বছরের নৈঃসঙ্গচেতনা বহন করেন লেখক। লেখার জন্য আড্ডা এবং নিঃসঙ্গতা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
হিম ঋতব্রত: কবিতার অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি অর্থাৎ আঙ্গিক, উপমা, ছন্দ, শব্দের বুনন, ভাষার ব্যবহার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মিথ ইত্যাদি সম্বন্ধে আপনার বক্তব্য কী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতার আঙ্গিক, তার শরীরে ছন্দ— এই সকলই চলে আসে কবিতার প্রয়োজনে। ফর্মটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন কোনো ফর্মে লিখতে চাই না যা চর্বিতচর্বন...। নতুন চিন্তা, যা আমি প্রকাশ করি— প্রচার করি, তা নতুন ফর্মেই প্রকাশ করতে পছন্দ করি। এক্ষেত্রে অবশ্য জা লুক গোদার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সুবিমল মিশ্র লিখেছিলেন, ‘বলার ভঙ্গিটাই যখন বিষয় হয়ে ওঠে।’কখনো কখনো এমনটাও হয়; আঙ্গিক নিজেই বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রত্যেক লেখকের মধ্যেই থাকে। যদি তিনি ‘ক্রিয়েটিভ লেখক’ হন। আমার কবিতার ক্ষেত্রে একসময় নিরীক্ষাচেষ্টাগুলো জ্বলজ্বলে হয়ে থাকতো, কারণ সেই নিরীক্ষাগুলো ছিলো বাহ্যিক-দৃশ্যমান। কিন্তু আমার বর্তমান কবিতায় বাহ্যিক—দৃশ্যমান নিরীক্ষা কমে তা কবিতার অন্তরে প্রবেশ করেছে। ‘হলুদ পাহাড়’, ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’, ‘লিখিত রাত্রি’... এইসবে অনেক নতুন কাজ করেছি, নতুন শব্দবন্ধ, বাক্যগঠন, চিন্তায় নতুনত্ব আছে। কিন্তু তা পাঠকের পাঠ বাধাগ্রস্ত করবে না। রাঁধুনী কতটা এক্সপেরিমেন্ট করে তরকারি রেঁধেছেন এটা ভোজনরসিকের আগ্রহের বিষয় নয়। তার একমাত্র আগ্রহ স্বাদে। এক্সপেরিমেন্ট/কৌশল রাঁধুনীর ব্যক্তিগত বিষয়। আর নিরীক্ষা যেন পাঠ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে। ধরুন, একজন ইঞ্জিনিয়ার ভাবলো বাসের সিট কভারে এত বছর এত এক্সপেরিমেন্ট করলাম, সবাই তার সুফল ভোগ করলো— আরামে ভ্রমণ করলো কিন্তু এর জন্য কত এক্সপেরিমেন্ট করতে হয়েছে তা নিয়ে যেহেতু কেউ কথা বলছে না, এবার একটা দারুণ এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। এই ভেবে তিনি বাসের সিট কভারে কাটা গেঁথে দিলেন। বাসের যাত্রীরা এবার হারে হারে টের পেল ইঞ্জিনিয়ার এক্সপেরিমেন্ট করেছেন! তো এই ধরনের লোক দেখানো এক্সপেরিমেন্ট আমি করি না। পেন ওয়ারেন তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এক্সপেরিমেন্টাল লেখা আবার কী? জেমস জয়েস কোনো এক্সপেরিমেন্টাল লেখা লেখেননি, তিনি ‘ইউলিসিস’ লিখেছেন। টি. এস. এলিয়ট ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’ লিখেছেন। যখন আপনারা একটা জিনিস ঠিক ধরতে পারেন না, তখনই তাকে এক্সপেরিমেন্ট বলে ফেলেন; এটা চাপাবাজির একটা অভিজাত শব্দ।”
হিম ঋতব্রত: কাব্যজীবনে আপনার ভেতরে চলমান সংগ্রাম ও সাংসারিক প্রভাব কতটা উপভোগ্য বা যন্ত্রণার?
সাম্য রাইয়ান: এই সময়ে কবির সন্ন্যাস সংসার ত্যাগ করে নয়— সংসারে থেকেই। যিনি কবি— তিনি সমাজ-সংসারের চলমান কার্যক্রমের মধ্যেই কবি। পারিবারিক যন্ত্রণা নয়— বরং একভাবে বলা যায়— পরিবারের প্রভাবেই আমি অল্প বয়সে আউট বই পড়তে শুরু করি। কিছু তো ঝামেলা থাকেই। কিন্তু সেটা অন্যদের তুলনায় আমার অনেক কম বোধয়। বরং যা কিছু যন্ত্রণার তার কারণ রাষ্ট্র এবং সোসাইটি।
হিম ঋতব্রত: কবিতা ও অকবিতার মানদণ্ড কী?
সাম্য রাইয়ান: পাঠ অভিজ্ঞতা।
হিম ঋতব্রত: আপনার কাব্যজীবনে শিল্পের অন্যান্য শাখাগুলোর (চিত্রকলা, নাট্যকলা, নৃত্যকলা ইত্যাদি) সাথে সম্পর্ক কেমন?
সাম্য রাইয়ান: পেইন্টিং আর থিয়েটার আমাকে খুব বেশি টানে। দেখতে পছন্দ করি। নৃত্যকলার সাথে সংযোগ কম। তবে আমার সাথে সরাসরি সংযোগ ঘটেছে সংগীতের। পরিবারিক রেওয়াজ অনুযায়ী অন্য সব ভাই-বোনের মতো আমাকেও প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হবার আগে গানের স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছিলো। কুমারেশ স্যারের কাছে গান শিখেছিলাম পাঁচ-সাত বছর। ওই সময় সুরের সাথে আমার আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিলো। প্রাইমারি স্কুল পাশ করার পর আর সংগীত (শিক্ষা কিংবা পারফর্ম) কন্টিনিউ করা হয়নি। কিন্তু ঐ সংযোগ পরবর্তীতে কবিতায় প্রভাব ফেলেছে বলে আমার ধারণা।
হিম ঋতব্রত: যারা কবিতাকে অবসরের কাজ বলে মনে করে কিংবা প্রশ্ন করে কবিতা পড়ব কেন? তাদের কী বলবেন?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা কবির যাপন প্রক্রিয়ার অংশ। কবিতা না লিখেও যিনি বেঁচে থাকতে পারেন, তার লেখার দরকার আছে বলে মনে করি না।
হিম ঋতব্রত: কেবল কবিরাই কি কবিতার সিরিয়াস পাঠক?
সাম্য রাইয়ান: ব্যাপারটা একটু উল্টে ভাবি আমি। কবিতার যারা সিরিয়াস পাঠক— কবিতা তাদের প্রভাবিত করার ফলে কখনো কখনো তারাও লিখতে শুরু করেন।
হিম ঋতব্রত: একজনের কবিতায় আরেকজনের হাত চালানো— এটা কতটা দূষণীয় বা উপকারী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা যেহেতু নিরন্তর চর্চার ব্যাপার, সেহেতু বিশেষত প্রারম্ভিককালে কবিতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার দরকার আছে। আর এইটা আছে বলেই ‘প্রচারবিমুখ’ হিসেবে সর্বাধিক বিজ্ঞাপিত কবি জীবনানন্দ দাশও কবিতার বই অনেককে পাঠিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে অনুরোধ করতেন।
হিম ঋতব্রত: নিঃস্বার্থ শিল্পচর্চা ও ঝাঁকের কৈ থেকে নিজেকে আলাদা রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং?
সাম্য রাইয়ান: যুগে যুগে শিল্পচর্চায় ঝাঁকের কৈ ছিলো— এখনো আছে— ভবিষ্যতেও থাকবে। তাদের থেকে নিজেকে আলাদা রাখার জন্য বাড়তি আয়োজনের প্রয়োজন নেই। যিনি প্রকৃতপ্রস্তাবে শিল্পী, তিনি এমনিতেই তাদের থেকে আলাদা— উজ্জ্বল প্রদীপ।
হিম ঋতব্রত: ‘মিছিল করে বক্তৃতা দিয়ে কিছুই হবে না; আসল কথা, ভালো কবিতা লেখা দরকার। তখন বই ছেপে গোপন জায়গায় রেখে দিলেও পাঠকরা খুঁজে নিয়ে পড়বে, বিজ্ঞাপন দিতে হবে না!’ বিনয় মজুমদারের এ বক্তব্যের সাথে আজকের দিনের কবিতার বাজার-বাণিজ্য ও সমগ্র বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
সাম্য রাইয়ান: বর্তমান সময়ে ক্যাপিটালিজমের বহুমুখী আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে একজন মেরুদণ্ডসম্পন্ন লেখককে শুধু নিজের লেখাটি লিখলেই চলে না। সেই লেখা প্রকাশে একটিভিস্টের ভূমিকায়ও নামতে হয়। সময় বদলেছে। বদলাচ্ছে। আরো বদলাবে। আক্রমণের রূপ বদলাচ্ছে। আপনাকে শুধু ভাত-কাপড়ে মারবে না এখন— আরো নানান কৌশলে মারবে। তুমি হাঁটা-চলা করবে, লম্ফঝম্ফ করবে, কিন্তু বেঁচে থাকবে না। প্রতিষ্ঠান-পাওয়ার এর পক্ষের লোকজন নানা রূপে তোমাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলবে। তোমাকে অস্থির-অশান্ত করে তুলবে, জীবন অসহ্য করে তুলবে। এমনকি তারা লিটলম্যাগের বেশে হাজির হয়েও এটা করবে। এমন অবস্থায় চুপচাপ বসে থাকা মানে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া। যা করতে হবে তা হলো, নিজের লেখাটা লিখে যেতে হবে, তা প্রকাশ করার জন্য লিটলম্যাগ জীবিত রাখতে হবে। লেখাটাই আসল কথা। এইটাই সকল ষড়যন্ত্রের মোক্ষম জবাব। লেখকের ব্রহ্মাস্ত্র। এইটাই লেখকের প্রধানতম অ্যাকটিভিজম। লেখকজীবনের প্রধান কথা।
হিম ঋতব্রত: যে সকল পাঠকেরা আপনার কবিতা ভালোবাসে এবং কবিতা সম্পর্কে যাদের বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়া রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
সাম্য রাইয়ান: আমার সময়ের কবিতা যারা পড়েন তারা অগ্রসর পাঠক। অগ্রসর না হলে তারা রবীন্দ্র-নজরুল পেরিয়ে আজকের সাম্য রাইয়ান অব্দি পৌঁছতে পারতেন না। তাদের উদ্দেশ্যে বাড়তি কিছু বলার নেই। যা বলার, তা কবিতায় বলেছি— বলি। তবে একটা বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন সময়ে আমার বই যারা কিনেছেন— মন্তব্য জানিয়েছেন— তার একটা বড় অংশই প্রধানত লেখক না, পাঠক। এটা আমি উপভোগ করি।
হিম ঋতব্রত: বর্তমানে কবিতায় বা কবিতার কার্যক্রমে সোশ্যাল সাইটের প্রভাব কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক?
সাম্য রাইয়ান: সোশ্যাল সাইট বলতে বাঙলাদেশে শুধু ফেসবুকই যেহেতু পপুলার, তাই এ নিয়েই বলি। ফেসবুকে এখন সবাই কবি। সবাই দুই লাইন লিখতে চেষ্টা করছে। এটা ভালোই। তবে ক্ষতি হচ্ছে যার সিরিয়াস কাজ করার কথা সে যখন ফেসবুকের লাইক-কমেন্টের মোহে পড়ে চটুলকর্মে মনোনিবেশ করছে। এরকম অনেককেই দেখছি। এটা আমাদের ক্ষতি। আরেকটা বিভ্রান্তি আছে। এরকম বলা হচ্ছে— “লিটলম্যাগের প্রয়োজন এখন নাই কারণ ফেসবুক এখন ‘মুক্ত মিডিয়া’। এখানে কোনো সম্পাদকের সেন্সর নেই— প্রতিষ্ঠানের চোখ রাঙানি নেই।” এই বক্তব্য খুবই হাস্যকর। কারন যারা ফেসবুককে মুক্ত মিডিয়া বলছে, তারা না বুঝে মন্তব্য করছে। ফেসবুকে সম্পাদক নেই ঠিকই কিন্তু সম্পাদকের থেকে বড় ‘সেন্সর রোবট’ আছে। প্রতিষ্ঠানের চোখ রাঙানি নেই ঠিকই কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ‘প্রতিনিধি রোবট’ এর খবরদারি আছে। ফেসবুকের ‘কমিউনিটি স্ট্যাণ্ডার্ড ব্রেক’ করলেই সেই পোস্ট/ছবি ফেসবুক আর দেখায় না। ডিলেট করতে বাধ্য করে। এরকম আরো অনেক বিষয় আছে— বাঙালি এগুলো বুঝবে আরো ধীরে। এবং তখন আবারো লিটলম্যাগেই ফিরতে হবে। কারণ লিটলম্যাগ ছাড়া কবিতা বা শিল্পের জন্য ইতিবাচক মুক্ত মাধ্যম আর নেই।
হিম ঋতব্রত: সমগ্র বিশ্বের কবিতার মূল সুর কি এক নাকি স্থান ভেদে তা ভিন্ন ভিন্ন?
সাম্য রাইয়ান: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কবিতা আমি বিভিন্ন ব্যক্তির অনুবাদের কল্যাণে পড়ি। তো সেইটা যেহেতু মূল পাঠ নয়, ফলে এই পাঠ নিয়ে এ ব্যাপারে মন্তব্য করা খুব একটা ঠিক হবে না। তবে আমার কাছে মূল সুর একই মনে হয় সারা পৃথিবীর কবিতার।
হিম ঋতব্রত: অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’ যুগে যুগে প্রকৃত শিল্পীরা কি এ-ই দারিদ্র্যের সাথেই লড়ে যাবেন?
সাম্য রাইয়ান: প্রকৃত শিল্পীকে যুগে যুগে দারিদ্র্যের সাথে লড়তে হবে, যদি রবীন্দ্রনাথের মতো খাওয়া-পড়ার যোগান কিংবা বুদ্ধদেব বসুর মতো চাকুরী না থাকে। কারন প্রকৃত শিল্পি কখনোই প্রতিষ্ঠিত চর্বিতচর্বনের চর্চা করেন না। ফলে তার যে বিপ্রতীপ ঘরানার শিল্প, তার অবস্থান ঐ সময়ের পপুলার আর্টের থেকে আলাদা হবে, যা থেকে পয়সা উপার্জন হবে না। আর যখন ঐ বিপ্রতীপ ঘরানার আর্ট পাবলিক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পপুলার হবে তখন হয়তো ওই শিল্পী এইসবের উর্দ্ধে থাকবেন।
হিম ঋতব্রত: একমাত্র প্রবল ইচ্ছাশক্তিই কি পারে কবির সকল বাধা ভেঙে ফেলতে?
সাম্য রাইয়ান: বাধা ভেঙে ফেলতে পারে কী না জানি না, তবে প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে বাধা ডিঙিয়ে যাওয়া যায়। সময়টাই তো লড়াই করে বেঁচে থাকার। যিনি লড়াই জারি রেখে নিজের কবিতাকে পণ্য হবার হাত থেকে, প্রতিষ্ঠানের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারেন তার কাছে বাধা পরাজিত হয়। আর যিনি লড়াই করে বাধা ডিঙাতে পারেন না তিনি অন্য কোনো উপায়ে জয়ী হন— হয়তো কখনো তা স্বেচ্ছামৃত্যুর রূপে বা অন্য কিছু…
হিম ঋতব্রত: জন্ম, জীবন, প্রেম, মৃত্যু সম্পর্কে আপনার ভাবনা বা জীবনদর্শন কী? জীবনের কোন অধ্যায়টিকে (শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বৃদ্ধ) বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?
সাম্য রাইয়ান: কবিকে আমার কেবলই মনে হয়-জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি। সে নানান সম্পর্ক— প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের— সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা। সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই আরেক নাম প্রেম। যা বেঁচে থাকার আনন্দ-বেদনা এবং অনুপ্রেরণা। তাই তো চোখের ভেতরে একটা হামিংবার্ড নিয়ে বসে আছি...। মানুষের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই গুরুত্বপূর্ণ—সুন্দর এবং প্রয়োজনীয়। প্রতিটি পর্বের আলাদা সৌন্দর্য আছে। শৈশবের সৌন্দর্য আর যৌবনের সৌন্দর্য এক নয়, কিন্তু উভয়ই সুন্দর। তারুণ্যের সৌন্দর্য সাহস— বিদ্রোহ— তড়িৎ গতি। আবার বৃদ্ধ বয়সের সৌন্দর্য প্রজ্ঞা। জীবনের একেক পর্বের সৌন্দর্য একেক রকম। অনেকে চিরতরুণ থাকতে চায়, বা বৃদ্ধ বয়সে তরুণ সম্বোধন করে— এইটা আমার কাছে অশ্লীল লাগে শুনতে। তরুণকে বৃদ্ধ সম্বোধন করলে যেমন খুশি হবার কিছু নাই, বৃদ্ধকে তরুণ বললেও খুশি হবার কিছু নাই। জীবনের প্রতিটি পর্ব তার আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে সুন্দর এবং প্রয়োজনীয়।
হিম ঋতব্রত: কবিতাই তো কবির শেষ আশ্রয়?
সাম্য রাইয়ান: কবিতাই কবির একমাত্র আশ্রয়।