মানবজীবন এমন এক বাক্য, পূর্ণচ্ছেদেও যার অর্থ শেষ হয় না

 সাম্য রাইয়ান 

জীবনকে আমরা কেবলই সম্পন্ন কাজ দিয়ে বিবেচনা করি। কে কী নির্মাণ করল, কী লিখল, কোথায় পৌঁছাল, কী রেখে গেল। আমাদের কাছে কেবল সমাপ্তিই মূল্যবান। অথচ একজন মানুষের জীবনকে বুঝতে চাইলে বিপরীত দিকে তাকানো দরকার। কারণ তার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গভীরতর অংশটি লুকিয়ে থাকে শেষ না হওয়া কাজের মধ্যে।

টেবিলের ওপর অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি, বুকশেলফে মেমরিমার্ক গুঁজে রাখা অর্ধপঠিত বই, দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা অসমাপ্ত ক্যানভাস কিংবা বহুদিন না খোলা একটি বাক্স। এই সবই সময়ের স্থগিত সিদ্ধান্ত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, কাজগুলো থেমে গেছে। কিন্তু না, কাজ থামেনি, জীবনের সঙ্গে তার সংলাপ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে।

সমাপ্তি মানুষের কল্পনার চেয়ে বেশি সুশৃঙ্খল। সেখানে শুরু আছে, মধ্যভাগ আছে, উপসংহার আছে। জীবনের বাস্তবতা এতটা সরলরৈখিক নয়। সেখানে অধিকাংশ কাজেরই শেষ অধ্যায় অরচিত থেকে যায়। অধিকাংশ বই পড়া শুরু হয়, শেষ করা হয় না। কোনো ভাষা শেখা শুরু হয়, কয়েক মাস পরে থেমে যায়। কোনো বাদ্যযন্ত্র কিনে রাখা হয়, তারগুলোয় ধীরে ধীরে ধুলো জমতে থাকে। প্রেম শুরু হয়, পরিণতি অব্দি গড়ায় না। বাইরে থেকে এগুলোকে ব্যর্থতা বলা সহজ। কিন্তু সব অসমাপ্ত কাজ ব্যর্থতার ফল নয়।

আমরা একই সঙ্গে অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জন্মাই, কিন্তু সময় তো সীমিত। ফলে প্রতিটি নির্বাচন একাধিক বর্জনের জন্ম দেয়। যিনি চিকিৎসক হয়েছেন, তার আর সংগীতশিল্পী হওয়া হয়নি। যিনি শিক্ষক হয়েছেন, তিনি হয়তো একসময় ভেবেছিলেন দূর সমুদ্রে জাহাজ চালাবেন।

দৈনন্দিন জীবনও মানুষকে অসমাপ্ত রেখে দেয়। একটি বই পড়তে বসে ফোন আসে। একটি চিঠি লিখতে লিখতে দরজায় কড়া পড়ে। একটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনায় বর্ষা পার হয়ে যায়। কোনো বৃদ্ধ ভাবেন, নাতিকে নিজের শৈশবের গল্প বলবেন। গল্পের শুরু হয়, শেষ আর হয় না। পরে পরিবারের কেউ শুধু মনে রাখে গল্পটির অস্তিত্ব। মানুষের জীবন এভাবেই অসংখ্য অর্ধবাক্যের সমষ্টি হয়ে ওঠে। জীবনের অসমাপ্ত কাজগুলো নীরবে মানুষের চারপাশে থেকে যায়। বহুদিন পরে আলমারি গোছাতে গিয়ে একটি পুরোনো খাতা হাতে এলে বোঝা যায়, একসময় অন্য রকম কিছু ভাবা হয়েছিল। কোনো ড্রয়ার থেকে রঙতুলি বের হলে মনে হয়, কোনো ছবি একদিন শুরু হয়েছিল। অসমাপ্ত এই সব কিছু প্রমাণ করে, মানুষের ইচ্ছা তার সামর্থ্যের চেয়ে বড়।

এই কারণেই একটি সমাজকে বুঝতে চাইলে তার নির্মিত স্থাপত্যের পাশাপাশি দেখতে হয় তার ফেলে রাখা স্থাপত্য, অর্ধনির্মিত সেতু, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা, অসমাপ্ত স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা মাঝপথে থেমে যাওয়া রেললাইন। সমাপ্তিতে থাকে কেবল সাফল্যগাঁথা; আর অসমাপ্তিতে সংগ্রাম, দ্বিধা ও সীমাবদ্ধতার ইতিহাস।

শিল্পকলার ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। একটি সম্পূর্ণ চিত্রকর্ম দর্শককে তার পরিণতি দেখায়। কিন্তু একটি অসমাপ্ত স্কেচ প্রায়ই কল্পনার জন্য বেশি জায়গা রেখে দেয়। সেখানে রেখাগুলো শেষ হয়নি, ফলে দর্শকের চোখও কাজের অংশ হয়ে ওঠে। অপূর্ণতার মধ্যে এই যে অংশগ্রহণের সুযোগ, সেটিই তাকে আলাদা করে তোলে। সবকিছু শেষ হয়ে গেলে কল্পনার দায়িত্বও শেষ হয়ে যায়।

সময় আমাদের জীবনে অসমাপ্তির সংখ্যা বাড়ায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পন্ন কাজের তালিকা যতটা দীর্ঘ হয়, তার থেকেও দীর্ঘতর হয় অসমাপ্ত কাজের তালিকা। 

সম্ভবত পরিপূর্ণ জীবন বলতে এমন কোনো জীবন নেই, যেখানে সব কাজ শেষ হয়েছে। মানুষের পরিচয় শুধু সে কী সম্পন্ন করেছে, তা দিয়ে নির্ধারন করা যায় না আসলে। তার পরিচয় গড়ে ওঠে অসমাপ্ত কাজগুলোর মধ্যেও। কারণ মানবজীবন এমন একটি বাক্য, পূর্ণচ্ছেদেও যার অর্থ শেষ হয় না।