সভ্যতার নতুন বামনতত্ত্ব

❑ সাম্য রাইয়ান 

মানুষের সমাজেও ‘ইকোলজিক্যাল সিলেকশন’ নামে এক ধরনের ব্যাপার ঘটে; যদিও জীববিজ্ঞানের বইয়ে এপ্রসঙ্গের অবতারণা এখনো হয়নি। কিন্তু চারপাশে তাকালে বোঝা যায়, সমাজও নিজের মতো করে মানুষ নির্বাচন করে। কোনো সমাজ কেমন মানুষকে টিকিয়ে রাখবে, কাকে সম্মানিত করবে, কাকে পিষে মারবে তা নির্ভর করে সেই সমাজের মানসিক পরিবেশের ওপর।

মরুভূমিতে যেমন মাছ টিকে থাকে না, তেমনি মূর্খতার অতিরিক্ত ঘনত্বে প্রতিভাবান মানুষও দীর্ঘকাল বাঁচতে পারে না। বাঁচলেও, নিজের স্বরূপে বাঁচতে পারে না। তাকে বদলাতে হয়। নিজের উচ্চতা কমাতে হয়। চিন্তার ডানা কেটে ফেলতে হয়। কারণ চারপাশে উড়তে না-পারা মানুষ বেশি হলে, আপনার উড়াল সন্দেহজনক হয়ে উঠতে বাধ্য।

প্রকৃতিতে এমন কিছু মাছ আছে, যেগুলো দূষিত পানিতে বহু প্রজন্ম বসবাস করতে করতে নিজের শরীরের গঠন বদলে ফেলে। তাদের লিভার বড় হয়, চোখ ছোট হয়, স্নায়ু ভোঁতা হয়। কারণ বিশুদ্ধ নদীর জন্য নির্মিত শরীর, নর্দমায় টিকে থাকতে পারে না। ফলে টিকে থাকার জন্য শরীরকে আপস করতে হয়।

সমাজেও একই ব্যাপার ঘটে। দীর্ঘদিন অসুস্থ সংস্কৃতির মধ্যে বাস করতে করতে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে। কৌতূহল কমে যায়। বিশ্লেষণক্ষমতা শুকিয়ে আসে। চিন্তার জায়গা দখল করে স্লোগান। যুক্তির জায়গায় বসে আবেগ। বইয়ের বদলে মানুষ খোঁজে শর্টকাট ভিডিও। ধীরে ধীরে, একটি জাতি জটিল বিষয় বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

সভ্যতার ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনো জাতি প্রথমে শিল্প, দর্শন বা বিজ্ঞান থেকে বিচ্যুত হয় না; তার প্রথম বিচ্যুতি ঘটে গভীর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা থেকে। মানুষ যখন আর দীর্ঘ লেখা পড়তে পারে না, দীর্ঘ চিন্তা সহ্য করতে পারে না, তখন বুঝতে হবে সভ্যতার মগজে অক্সিজেন কমে গেছে।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিপজ্জনক জায়গা। সেখানে নতুন চিন্তা জন্ম নিতো। রাষ্ট্র ভয় পেতো। প্রচলিত চিন্তা, প্রথা, প্রতিষ্ঠান অস্বস্তিতে ভুগতো। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রশ্ন উৎপাদন কারখানা। এখন বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে চাকরির কোচিং সেন্টারে। 
এই ধরনের বিবর্তনের ফলে সমাজে এক অদ্ভুত মিউটেশন ঘটে। জ্ঞানী মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়, কিন্তু চতুর মানুষ হয়ে ওঠে অপরিহার্য। কবি পরিণত হয় অনুষ্ঠান উপস্থাপকে। দার্শনিক পরিণত হয় টকশো অতিথিতে। বিজ্ঞানীকে মোটিভেশনাল বক্তার ভাষায় কথা বলতে হয়। কারণ সমাজ এখন আর গভীরতা গ্রহণ করতে পারে না; সে চায় বিনোদনের মোড়কে পরিবেশিত ইনফরমেশন।

এমন সমাজে ‘ভাষা’ অসুস্থ হতে বাধ্য। ক্রমশই শব্দের অর্থ বদলে যায়। ‘সাহসী’ বলতে বোঝায় উচ্চস্বরে চিৎকার করতে পারা মানুষকে। ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে বোঝায় টেলিভিশনে বেশি দেখা যায় যাকে। ‘সাংস্কৃতিক কর্মী’ বলতে বোঝায় উৎসবে সেলফি তুলতে পারে যে। অর্থাৎ ভাষা এখানে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

একসময় যে-সমাজ আইনস্টাইন তৈরি করতো, সে-সমাজ এখন তৈরি করছে ইনফ্লুয়েন্সার। যে-সমাজ দস্তয়েভস্কি পড়তো, সে-সমাজ এখন ক্যাপশন পড়ে। যে মানুষ আর সত্যের দিকে তাকিয়ে থাকতো; সে এখন অ্যালগরিদমের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই অবক্ষয় কখনো নিজেকে অবক্ষয় বলে মনে করে না। বরং নিজেকেই সভ্যতার সর্বোচ্চ রূপ বলে ঘোষণা করে। রোমান সাম্রাজ্য পতনের আগে নিজেদের খুব আধুনিক ভাবতো। মোগল সাম্রাজ্য ধ্বংসের আগে সবচেয়ে বেশি আচার অনুষ্ঠান করতো। মানুষ যখন পতনের দিকে যায়, তখন সে সাধারণত আরো জোরালো শব্দদূষণ তৈরি করে, যেন শব্দ দিয়ে ধ্বংসের আওয়াজ ঢেকে ফেলা যায়।

বাঙলাদেশেও এখন এমন এক সময় চলছে, যেখানে গভীরতা সন্দেহের বিষয়। বেশি পড়াশোনা করা আনস্মার্ট মানুষের কাজ। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফালতু ভিডিও দেখে যাওয়া স্বাভাবিক আচরণ।

ফলে জাতীয় মেধার ওপর এক ধরনের ‘কালচারাল ন্যাচারাল সিলেকশন’ কাজ করছে। যে বেশি চিন্তা করে, সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। যে কম চিন্তা করে, সে দ্রুত সফল হচ্ছে। যে মানুষ বই পড়ে, সে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। যে মানুষ ভড়ং ধরে, সে জনপ্রিয় হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন চলতে থাকলে একসময় পুরো সমাজের গড় মানসিক উচ্চতাই নিচে নেমে আসে। তখন বড় মানুষ জন্মালেও, তাকে ছোট হয়ে বাঁচতে হয়। নিজের ভাষা সহজ না করলে কেউ শোনে না। নিজের চিন্তা বিকৃত না করলে সোসাইটি গ্রহণ করে না।

নতুন এই পদ্ধতিতে সভ্যতা আর সরাসরি প্রতিভাকে হত্যা করে না; বরং তাকে বেঁচে থাকার জন্য বামন বানিয়ে ফেলে।