❑ সব্যসাচী রায়
রাজনীতি, ক্ষমতা আর মানবচরিত্রের ভণ্ডামিকে তুলে ধরার জন্য সাহিত্যে ‘স্যাটায়ার’ বা ব্যঙ্গবিদ্রূপের চেয়ে ধারালো কোনো অস্ত্র বোধহয় আর হয় না। যখন সমাজ বা রাষ্ট্রের অনাচার এতখানি জাঁকিয়ে বসে যে সাধারণ ভাষায় তার প্রতিবাদ করাও এক ধরনের অর্থহীনতায় রূপ নেয়, তখনই লেখকেরা আশ্রয় নেন রূপক আর স্যাটায়ারের। বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে আমরা দেখি, এই জনরা বা ধারাটি যুগের পর যুগ ধরে সমাজ পরিবর্তনের এবং ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিস যখন তার নাটকে তৎকালীন এথেন্সের যুদ্ধবাজ রাজনীতি আর বিচার ব্যবস্থার দুর্নীতি নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতেন, তখন থেকেই মূলত রাজনৈতিক স্যাটায়ারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। পরবর্তীতে রোমান কবি জুভেনাল বা হোরেস এই ধারাকে আরও ক্ষুরধার করে তোলেন। কিন্তু আধুনিক বিশ্বসাহিত্যে রাজনৈতিক স্যাটায়ার এবং ডিসটোপিয়ান রূপক আখ্যানকে যিনি এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তিনি জনাথন সুইফট। তার ছোটদের রূপকথা ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ তৎকালীন ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক দলাদলি, মানুষের অহংকার এবং রাজতন্ত্রের তীব্রতম ব্যবচ্ছেদ। সুইফটের সেই ধারাকে বিশ শতকে এসে আরও বাস্তবমুখী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলেন জর্জ অরওয়েল। অরওয়েলের ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ কিংবা ‘১৯৮৪’ উপন্যাস দুটি বিশ্বরাজনীতির এমন এক অমোঘ সত্যকে উন্মোচন করেছিল, যা আজও সমভাবে প্রযোজ্য। একটি খামারের পশুপাখিদের বিদ্রোহ কীভাবে শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্র আর আদর্শিক চ্যুতিতে গিয়ে শেষ হয়, তা আজ বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার পালাবদলের চিরন্তন এক সমীকরণ। একইভাবে জোসেফ হেলারের ‘ক্যাচ-২২’ উপন্যাসে যুদ্ধের আমলাতান্ত্রিক পাগলামি আর পুঁজিবাদের যে কুৎসিত রূপ দেখানো হয়েছে, তা পাঠককে হাসাতে হাসাতে এক পরম শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের দিকে তাকালে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ উপন্যাসে আমরা দেখি একজন স্বৈরাচারী শাসকের একাকিত্ব এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত পতনকে কীভাবে পরাবাস্তববাদের চাদরে মুড়িয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্বসাহিত্যের এই যে এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, যেখানে ক্ষমতা, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং মানুষের সুবিধাবাদকে ব্যঙ্গের ছাঁচে ফেলে ময়নাতদন্ত করা হয়, ঠিক সেই জনরা বা প্রেক্ষাপট থেকেই এবার আমাদের নজর ফেরাতে হয় সমকালীন বাংলা সাহিত্যের দিকে। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় ঘাসফুল প্রকাশনী থেকে আলোয় আসা সাম্য রাইয়ানের উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ মূলত বিশ্বসাহিত্যের এই ক্ষুরধার স্যাটায়ার ও রূপক জনরারই এক দেশীয় ও আধুনিক সংস্করণ। লেখক বইটির শুরুতেই পাঠকদের জন্য যে কৌতুকপূর্ণ সতর্কতা জুড়ে দিয়েছেন, “কুকুরকে বিশ্বাস করুন, এ উপন্যাসকে না” এ যেন সরাসরি জনাথন সুইফটের সেই রূঢ় হিউমারের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বাক্য পাঠককে শুরুতেই এক ধরনের অবিশ্বাসের দোলাচলে ফেলে দিয়ে চারপাশের চেনা বাস্তবতাকে নতুন করে প্রশ্ন করার এক উসকানি।
বিশ্বসাহিত্যের বড় বড় স্যাটায়ারগুলোতে যেমন কোনো একটি নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থা বা শোষণের রূপকে ফুটিয়ে তোলা হয়, সাম্য রাইয়ান তার উপন্যাসে তেমনি আমাদের চেনা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা এবং তথাকথিত আদর্শিক রাজনীতির চরম ও করুণ পতনকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। গল্পের চরিত্রগুলোকে যদি আমরা বিশ্বসাহিত্যের চিরচেনা আর্কেটাইপ বা ছাঁচের সাথে তুলনা করি, তবে রতনের চরিত্রটি আমাদের এক পরম চ্যুতি ও ট্র্যাজেডির কথা মনে করায়। রতন ছিল একসময়ের লড়াকু বামপন্থী ছাত্রনেতা, যার মুখে সারাক্ষণ লেনিন, মাও সে তুং কিংবা মার্ক্সের তত্ত্বের খই ফুটত। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে যে রাজপথ কাঁপিয়েছে, সময়ের পরিক্রমায় ও ক্ষমতার লোভনীয় হাতছানিতে সেই রতনেরই খোলস বদলে যায় এবং সে রূপান্তরিত হয় এক চরম সুবিধাবাদী যুবনেতায়। জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’-এর সেই শূকর চরিত্রগুলোর মতো, যারা একসময় মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছিল কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে নিজেরাই মানুষের মতো আচরণ শুরু করেছিল, রতনের এই রূপান্তরও ঠিক একই রকম নিষ্ঠুর। রতন এখন শ্রমিকের লাশ কিংবা বস্তির আগুনকে নিজের রাজনৈতিক ফায়দা এবং অর্থনৈতিক আখের গোছানোর মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না।
এই ক্ষমতার বৃত্তে রতনের সহযোগী ও পরিপূরক হিসেবে আমরা পাই বিশ্বজিৎ এবং সুলেখা দেবীকে। ছোটবেলায় অবয়ব আর দুর্বলতার কারণে যাকে সবাই ব্যঙ্গ করে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে ডাকত, সেই বিশ্বজিৎ আজ এক মহীরুহ পুঁজিপতি, যার কাছে মানুষের আবেগ কিংবা দেশের সার্বভৌমত্বের চেয়ে বড় ধ্রুব সত্য হলো ‘ডলার’ এবং মুনাফা। অন্যদিকে সুলেখা দেবী হলেন আমাদের সমাজের এনজিও সংস্কৃতি এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের এক নিখুঁত প্রতিনিধি, যে মুখে নারী অধিকার আর মানবাধিকারের মিষ্টি বুলি আউড়ে নিজের এক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করে এবং পর্দার আড়ালে পুঁজিপতি বিশ্বজিতের স্বার্থেরই পাহারা দেয়। যখনই কারখানায় বা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে কোনো অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে, সুলেখা দেবী তার তথাকথিত অধিকারকর্মীর খোলসটি চমৎকারভাবে ব্যবহার করে তার সুনিপুণ অভিনয়-প্রতিভা দিয়ে সেই আন্দোলনকে ঠান্ডা করে দেয়, ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিশ্বজিতের এই নগ্ন পুঁজি আর সুলেখার এই ছদ্মবেশী অধিকার ব্যবসা যেন জোসেফ হেলারের ‘ক্যাচ-২২’-এর সেই কর্পোরেট মানসিকতারই এক আধুনিক নাগরিক সংস্করণ, যেখানে শোষণের হাতিয়ার কেবল লাঠি বা বুলেট নয়, বরং অধিকার আর উন্নয়নের মিষ্টি বুলিও শোষণের অন্যতম বড় অস্ত্র হতে পারে।
এই সুবিধাবাদী আর শোষকদের ভিড়ে উপন্যাসে যে দুটি চরিত্র পাঠকের মনে গভীর এক বিষাদ আর সহানুভূতির জন্ম দেয়, তারা হলো শবনম (যার ডাকনাম শিখা) এবং কমরেড শাহজালাল। শবনমের ডায়েরির প্রতিটি পাতা আসলে এই আধুনিক, যান্ত্রিক ও কৃত্রিম নাগরিক জীবনের একাকিত্ব, হতাশা এবং টিকে থাকার জন্য একজন মধ্যবিত্ত মানুষের নিরন্তর ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল চিত্র। অন্যদিকে কমরেড শাহজালাল হলেন এই উপন্যাসের সেই আপসহীন ট্র্যাজিক হিরো, যিনি সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের ভেতরের আদর্শের আগুনটাকে নেভাতে দেননি। যখন চারপাশে সবাই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, তখনো শাহজালাল সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা অর্থনীতির বিরুদ্ধে নিজের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই আপসহীনতার মূল্য তাকে দিতে হয়েছে নিজের দল থেকেই বহিষ্কৃত হয়ে এবং শারীরিকভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে। শাহজালালের এই পরিণতি আমাদের দেখিয়ে দেয়, এই আধুনিক ও নিষ্ঠুর ব্যবস্থায় সততা ও আদর্শের পথ কতটা কন্টকাকীর্ণ।
সাম্য রাইয়ান তার এই উপন্যাসে সমকালীন মিডিয়া ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার কৌশলকে খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করেছেন ‘ফায়ারহোজিং’ (Firehosing) নামক মনস্তাত্ত্বিক ও প্রোপাগান্ডা টেকনিক। এটি এমন এক কৌশল, যেখানে কোনো একটি বড় বা মূল জাতীয় সমস্যাকে জনগণের নজর থেকে আড়াল করার জন্য রাষ্ট্র বা ক্ষমতার সুবিধাভোগী গোষ্ঠী একযোগে অসংখ্য ভুয়া তথ্য, গুজব, কুৎসা কিংবা অত্যন্ত চটুল ও অপ্রাসঙ্গিক ট্রল বা বিনোদন বাতাসে ছেড়ে দেয়, যাতে তথ্যের এই বিশাল বন্যায় সাধারণ মানুষের মস্তিস্ক অবশ হয়ে পড়ে এবং তারা আসল সমস্যা ভুলে যায়। অরওয়েল তার ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে ‘মিনিস্ট্রি অব ট্রুথ’-এর মাধ্যমে যেভাবে ইতিহাস আর সত্যের বিকৃতি দেখিয়েছিলেন, সাম্য রাইয়ান আমাদের এই চেনা কর্পোরেট এবং স্যোসাল মিডিয়ার যুগে ফায়ারহোজিংয়ের মাধ্যমে ঠিক সেই সত্যেরই এক আধুনিক রূপ দেখিয়েছেন।
উপন্যাসটির প্রথমার্ধে যেখানে আমরা এই বাস্তব ও চেনা রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনগুলো দেখতে পাই, দ্বিতীয়ার্ধে এসে বিশেষ করে বইয়ের ১০১ নম্বর পৃষ্ঠার পর থেকে আখ্যানটি এক সম্পূর্ণ নতুন ও অভাবনীয় মোড় নেয়। লেখক এখানে এসে বাস্তবতাবাদের দেয়াল ভেঙে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের ম্যাজিক রিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের (Surrealism) এক অদ্ভুত জগত তৈরি করেন। গল্পটি তখন এক বৈশ্বিক রূপ ধারণ করে, যার কেন্দ্রে চলে আসে ‘অন্ধ জাদুকর’ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চিরচেনা প্রতীক ‘আঙ্কেল স্যাম’ (Uncle Sam)।
এই অন্ধ জাদুকর চরিত্রটি আসলে সেইসব আন্তর্জাতিক সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী কিংবা দালাল বুদ্ধিজীবীদের রূপক, যারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মার্কিন বা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা ও পলিসিগুলো বাস্তবায়ন করার দালালি নেয়। এই জাদুকরের মুখ দিয়ে লেখক এক অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর সিস্টেমের কথা বলিয়েছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইনক্লুসিভ operating system’। জাদুকরের ভাষায়, এটি এমন এক জাদুকরী বা আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় একবার ইনস্টল বা চালু করে দিতে পারলে সেখানে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, খেলাফত, গণতন্ত্র কিংবা চরম অরাজকতা—সবকিছু একই সাথে সহাবস্থান করবে এবং কোনো কিছুতেই সিস্টেম ক্রাশ করবে না। এই রূপকটি আসলে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির এক চরম সত্যকে উন্মোচন করে যে, সাম্রাজ্যবাদের কাছে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের কোনো দাম নেই, তাদের কাছে দাসত্ব ও ব্যবসাই আসল।
ঐতিহাসিকভাবে আমরা বিশ্বরাজনীতি বা ইতিহাসে ‘আঙ্কেল স্যাম’ বলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে জাতীয় প্রতীক— শ্বেতকেশী, ছাগলাদাড়ি বিশিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তি যিনি মার্কিন সরকার বা সামরিক শক্তির প্রতীক— সাম্য রাইয়ান তাকেই এক ভিন্ন মাত্রায় ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্ধ জাদুকরের জবানিতে আঙ্কেল স্যামের প্রাসাদ এবং তার চরিত্রের যে দিকগুলো উঠে এসেছে, তা বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো উঁচু মানের রাজনৈতিক রূপকের সমকক্ষ। আঙ্কেলের প্রাসাদে কাচঘেরা কক্ষে উড়তে থাকা কোটি কোটি মাছি আসলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট এবং সর্বগ্রাসী নজরদারি ব্যবস্থার এক চমৎকার রূপক, যা দিয়ে আঙ্কেল পুরো দুনিয়াকে নজরে রাখেন। আঙ্কেল স্যাম সরাসরি কোনো দেশের স্বাধীনতা বা অধিকার দেন না, তিনি দেন ‘গণতান্ত্রিক ডলার’ বা ‘খেলাফতি ডলার’। এই ডলারের বিনিময়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো আঙ্কেলের কাছ থেকে ‘ফরেন গণতন্ত্র’ আমদানি করে, যা কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। আবার আঙ্কেলের প্রাসাদে একটি ‘আস্তাকুঁড়’ বা ভাগাড় রয়েছে ব্যর্থদের জন্য, যেখানে সেইসব দালাল বা স্বৈরাচারী শাসকদের স্থান হয় যারা আঙ্কেলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। উপন্যাসে দেখানো হয়েছে আঙ্কেলের প্রাসাদ থেকে যে জলধারা বের হয়, তা আসার সময় অন্য দেশের অশান্তির ধ্বংসাবশেষ নিয়ে আসে এবং যাওয়ার সময় ‘নতুন শান্তির ধারা’ নিয়ে যায়, যা মূলত শান্তির নামে অন্য দেশের খনিজ ও অর্থনৈতিক সম্পদ লুটে নেওয়ার মার্কিন ফরেন পলিসির দিকেই ইঙ্গিত করে।
সাহিত্যিক শৈলী ও লেখনীর দিক থেকে সাম্য রাইয়ান এই উপন্যাসে এক অসামান্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তীক্ষ্ণ ও জুভেনালিয়ান স্যাটায়ারের মতো বুদ্ধিদীপ্ত হিউমার এবং ব্যঙ্গবিদ্রূপ। আমাদের সমাজ ও রাজনীতির যে অন্ধকার ও কুৎসিত দিকগুলো নিয়ে আমরা সাধারণত গম্ভীর বা হতাশ হয়ে পড়ি, লেখক সেগুলোকে এত রসাত্মকভাবে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সংলাপে রূপ দিয়েছেন যে, পাঠক পড়তে পড়তে হাসবেন, কিন্তু পরক্ষণেই এক গভীর শূন্যতা, অসহায়ত্ব আর রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থমকে যাবেন। প্রথমার্ধের রিয়ালিজমের সাথে দ্বিতীয়ার্ধের সুররিয়ালিজমের যে মিশ্রণ লেখক ঘটিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি দেখা যায় না। এর ভাষা সহজ, সাবলীল এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ উপন্যাসটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বা কোনো কাল্পনিক চরিত্রের গল্প নয়, এটি আসলে বিশ্বসাহিত্যের সেই পলিটিকাল স্যাটায়ারধর্মী ঐতিহ্যেরই এক সার্থক দেশীয় উত্তরসূরি। এটি আমাদের ভূ-রাজনীতির নোংরা খেলা, মিডিয়ার মগজ ধোলাইয়ের মেকানিজম, এনজিও বা অধিকার ব্যবসার আড়ালের সত্য এবং আঙ্কেল স্যামরূপী এক অদৃশ্য ও সর্বগ্রাসী পুতুলের বাক্সে বন্দি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের এক স্পষ্ট আয়না। সাম্য রাইয়ান কোনো কৃত্রিম আশার বাণী বা সস্তা সান্ত্বনা দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করার পরিবর্তে তিনি আমাদের বাস্তবতার নগ্ন রূপটি চোখের সামনে মেলে ধরেছেন, যা প্রতিটি সচেতন ও চিন্তাশীল পাঠককে বইটির শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও দীর্ঘ সময় ভাবাবে এবং নিজেদের চারপাশের জগতটাকে নতুন করে দেখতে বাধ্য করবে।

