মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত

❑ ফজলুল করীম 

সাম্য রাইয়ানের উপন্যাস সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের

সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহসী, ক্ষুরধার এবং ভিন্নধর্মী সংযোজন। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় ঘাসফুল প্রকাশনী থেকে আলোয় আসা এই বইটি প্রথম দেখায় বা নামের দিক থেকে কেবল একটি রাজনৈতিক ইশতেহার বা স্লোগানধর্মী লেখা মনে হতে পারে, কিন্তু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টালে আমরা এক অদ্ভুত ঘোর, তীব্র আত্মদহন এবং আমাদের চেনা সমাজের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদের মুখোমুখি হই। লেখক বইটির শুরুতেই প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের জন্য এক অভিনব ও কৌতুকপূর্ণ সতর্কতা জুড়ে দিয়েছেন— “কুকুরকে বিশ্বাস করুন, এ উপন্যাসকে না”। এই একটি লাইনের মাধ্যমেই মূলত উপন্যাসের মূল সুরটি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। লেখক পাঠককে শুরুতেই এক ধরনের অবিশ্বাসের চাদরে জড়িয়ে নেন, যাতে পাঠক এই আখ্যানের প্রতিটি বাঁকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে চেনা বাস্তবতার ছাঁচে ফেলে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হন। তবে রূপকের আড়ালে এই উপন্যাসে যে বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে, তা সমকালীন বিশ্বরাজনীতি, দেশীয় ক্ষমতার দলাদলি, বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদ এবং কর্পোরেট শোষণের এক নগ্ন ও অকাট্য দলিল।

উপন্যাসের ক্যানভাসটি মূলত গড়ে উঠেছে আমাদের চেনা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা এবং তথাকথিত আদর্শিক রাজনীতির চরম ও করুণ পতনের ওপর। সাম্য রাইয়ান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষের নৈতিকতা, আদর্শ এবং আবেগগুলো শেষ পর্যন্ত পুঁজি বা ডলারের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। গল্পের মূল চরিত্রদের যদি আমরা এক এক করে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে এরা কেউই আকাশ থেকে পড়া কোনো চরিত্র নয়, বরং প্রতিদিন আমাদের যাপিত জীবনে, টেলিভিশনের টকশোতে, খবরের কাগজের পাতায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে আমরা যে মানুষদের দেখি, এরা তাদেরই এক একটি রক্ত-মাংসের প্রতিচ্ছবি।

গল্পের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো রতন। রতনের চরিত্রটি আমাদের সমাজের এক বিশাল তরুণ বা একসময়ের লড়াকু যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। ছাত্রজীবনে রতন ছিল বামপন্থী রাজনীতির একনিষ্ঠ কর্মী। লেনিন, মাও সে তুং কিংবা মার্ক্সের তত্ত্ব ছিল তার মুখে মুখে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে সে একসময় রাজপথ কাঁপিয়েছে, মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিজেকে সঁপে দিতে চেয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায়, বাস্তবতার রূঢ় আঘাতে এবং ক্ষমতার লোভনীয় হাতছানিতে সেই রতনেরই খোলস বদলে যায়। সে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় এক চরম সুবিধাবাদী যুবনেতায়। যে রতন একসময় শ্রমিকের অধিকার নিয়ে ভাবত, সেই রতনই এখন শ্রমিকের লাশ কিংবা কোনো বস্তিতে লাগা রহস্যময় আগুনকে নিজের রাজনৈতিক ফায়দা এবং অর্থনৈতিক আখের গোছানোর মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। রতনের এই পতন আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চরম দেউলিয়াত্বকে নির্দেশ করে, যেখানে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত ও দলীয় সুবিধাবাদ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রতনের ঠিক বিপরীত মেরুতে অথচ একই সমীকরণের অংশ হিসেবে আমরা পাই বিশ্বজিৎ চরিত্রটিকে। ছোটবেলায় যার অবয়ব আর দুর্বলতার কারণে তাকে সহপাঠী বা পরিচিতরা ব্যঙ্গ করে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে ডাকত, সেই বিশ্বজিৎ আজ এক মহীরুহ পুঁজিপতি। সময়ের সাথে সাথে সে নিজের নাম ও ভাগ্যের এমন এক পরিবর্তন ঘটিয়েছে যে, আজ সে পুরো ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। বিশ্বজিতের কাছে কোনো মানুষের আবেগ, দেশের সার্বভৌমত্ব বা মানবাধিকারের কোনো মূল্য নেই। তার কাছে একমাত্র ধ্রুব সত্য হলো ‘ডলার’ এবং মুনাফা। সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সেই নিষ্ঠুর চেহারা, যা মুনাফা অর্জনের জন্য যেকোনো স্তরে নামতে প্রস্তুত।

এই ক্ষমতার বৃত্তে বিশ্বজিতের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয় সুলেখা দেবী। সুলেখা চরিত্রটি আমাদের সমাজের এনজিও সংস্কৃতি এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের এক চমৎকার রূপক। সে মুখে নারী অধিকার, মানবাধিকার এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের কথা বলে, নিজের এক ধরনের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করে এবং এই তকমা ব্যবহার করে সমাজের ক্ষমতার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের আসনটি পাকাপোক্ত করে। কিন্তু পর্দার আড়ালে সুলেখা আসলে পুঁজিপতি বিশ্বজিতের স্বার্থেরই পাহারাদার। যখন কারখানায় বা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে কোনো অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে, যা বিশ্বজিতের ব্যবসার ক্ষতি করতে পারে, তখন সুলেখা দেবী তার তথাকথিত অধিকারকর্মী বা মধ্যস্থতাকারীর খোলসটি চমৎকারভাবে ব্যবহার করে। সে তার সুনিপুণ অভিনয়-প্রতিভা এবং বাগ্মিতা দিয়ে সেই শ্রমিক অসন্তোষকে ঠান্ডা করে দেয়, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সুলেখা ও বিশ্বজিতের এই কর্পোরেট সিন্ডিকেট মূলত এটিই প্রমাণ করে যে, শোষণের হাতিয়ার কেবল পুলিশ বা লাঠি নয়; এমনকি উন্নয়ন আর অধিকারের মিষ্টি বুলিও শোষণের অন্যতম বড় অস্ত্র হতে পারে।

এই সুবিধাবাদী আর শোষকদের ভিড়ে উপন্যাসে যে দুটি চরিত্র পাঠকের মনে গভীর এক বিষাদ আর সহানুভূতির জন্ম দেয়, তারা হলো শবনম (যার ডাকনাম শিখা) এবং কমরেড শাহজালাল। শবনম চরিত্রটিকে লেখক ডায়েরির পাতার মাধ্যমে উন্মোচন করেছেন। এই ডায়েরির প্রতিটি পাতা আসলে এই আধুনিক, যান্ত্রিক ও কৃত্রিম নাগরিক জীবনের একাকিত্ব, হতাশা এবং টিকে থাকার জন্য একজন মধ্যবিত্ত মানুষের নিরন্তর ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল চিত্র। শবনমের ভেতরের হাহাকার আমাদের চারপাশের সেইসব মানুষের গল্প বলে, যারা এই বিশাল পুঁজিবাদী গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে, কিন্তু মুখে এক টুকরো কৃত্রিম হাসি ধরে রেখে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে কমরেড শাহজালাল হলেন এই উপন্যাসের সেই ট্র্যাজিক হিরো বা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির এক মানুষ, যিনি সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের ভেতরের আদর্শের আগুনটাকে নেভাতে দেননি। যখন চারপাশে সবাই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, রতনের মতো সাবেক কমরেডরা ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ বসাতে ব্যস্ত, তখনো শাহজালাল সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা অর্থনীতির বিরুদ্ধে নিজের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই আপসহীনতার মূল্য তাকে দিতে হয়েছে অত্যন্ত নির্মমভাবে। যে দলের জন্য তিনি জীবন যৌবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই দল থেকেই তাকে শেষ পর্যন্ত বহিষ্কৃত হতে হয়, কারণ তার সত্য কথাগুলো দলের বড় বড় নেতাদের সুবিধাবাদী অবস্থানের জন্য হুমকি ছিল। শুধু বহিষ্কারই নয়, তাকে শারীরিকভাবেও চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। শাহজালালের এই পরিণতি পাঠককে এক গভীর অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে যে, এই আধুনিক ও নিষ্ঠুর ব্যবস্থায় কি তবে সততা ও আদর্শের কোনো স্থান নেই?

সাম্য রাইয়ানের উপন্যাস সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের
সাম্য রাইয়ান তার এই উপন্যাসে সমকালীন মিডিয়া ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার কৌশলকে খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে উপন্যাসে উল্লিখিত ‘ফায়ারহোজিং’ (Firehosing) নামক মনস্তাত্ত্বিক ও প্রোপাগান্ডা টেকনিকের ব্যবহার অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত। আমরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা মূলধারার গণমাধ্যমে যা দেখি, লেখক যেন তারই এক তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রূপ দেখিয়েছেন। ফায়ারহোজিং হলো এমন এক কৌশল, যেখানে কোনো একটি বড় বা মূল জাতীয় সমস্যাকে জনগণের নজর থেকে আড়াল করার জন্য রাষ্ট্র বা ক্ষমতার সুবিধাভোগী গোষ্ঠী একযোগে অসংখ্য ভুয়া তথ্য, গুজব, কুৎসা কিংবা অত্যন্ত চটুল ও অপ্রাসঙ্গিক ট্রল বা বিনোদন বাতাসে ছেড়ে দেয়। তথ্যের এই বিশাল বন্যায় সাধারণ মানুষের মস্তিস্ক অবশ হয়ে পড়ে। তারা আসল বা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা—যেমন অর্থনৈতিক সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা শ্রমিক হত্যা—এসব ভুলে গিয়ে সেইসব চটুল ও অর্থহীন বিষয় নিয়ে মেতে থাকে। রতন এবং তার দলবল কীভাবে এই টেকনিক ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে ডাইভার্ট করে দেয়, তা লেখকের লেখনীতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে।

উপন্যাসটির প্রথমার্ধে যেখানে আমরা এই বাস্তব ও চেনা রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনগুলো দেখতে পাই, দ্বিতীয়ার্ধে এসে বিশেষ করে বইয়ের ১০১ নম্বর পৃষ্ঠার পর থেকে আখ্যানটি এক সম্পূর্ণ নতুন ও অভাবনীয় মোড় নেয়। লেখক এখানে এসে বাস্তবতাবাদের দেয়াল ভেঙে এক পরাবাস্তব বা রূপক (Surrealism) জগতের অবতারণা করেন। গল্পটি তখন এক বৈশ্বিক রূপ ধারণ করে, যার কেন্দ্রে চলে আসে ‘অন্ধ জাদুকর’ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চিরচেনা প্রতীক ‘আঙ্কেল স্যাম’ (Uncle Sam)।

এই অন্ধ জাদুকর চরিত্রটি অত্যন্ত রহস্যময় এবং প্রতীকী। সে আসলে সেইসব আন্তর্জাতিক সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী কিংবা দালাল বুদ্ধিজীবীদের রূপক, যারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মার্কিন বা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা ও পলিসিগুলো বাস্তবায়ন করার সুপারি নেয়। এই জাদুকরের কোনো নিজস্ব চোখ নেই, সে অন্ধ, কারণ সে কেবল আঙ্কেল স্যামের চোখ দিয়েই দুনিয়াকে দেখে এবং আঙ্কেলের নির্দেশেই তার সমস্ত জাদু বা পলিসি প্রদর্শন করে। অন্ধ জাদুকরের মুখ দিয়ে লেখক এক অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর সিস্টেমের কথা বলিয়েছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইনক্লুসিভ অপারেটিং সিস্টেম’। জাদুকরের ভাষায়, এটি এমন এক জাদুকরী বা আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় একবার ইনস্টল বা চালু করে দিতে পারলে সেখানে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, খেলাফত, গণতন্ত্র কিংবা নৈরাজ্যবাদ একই সাথে সহাবস্থান করবে এবং কোনো কিছুতেই সিস্টেম ক্রাশ করবে না। এই রূপকটি আসলে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির এক চরম সত্যকে উন্মোচন করে। সাম্রাজ্যবাদের কাছে আজ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের কোনো দাম নেই। তাদের কাছে ইসলামপন্থী, সমাজতন্ত্রী বা চরম স্বৈরাচারী শাসক সবাই সমান, যদি তারা সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দাসত্ব মেনে নেয় এবং তাদের ব্যবসার বাজার উন্মুক্ত রাখে। আদর্শ কেবল জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার এক একটি খোলস মাত্র।

ঐতিহাসিকভাবে আমরা বিশ্বরাজনীতি বা ইতিহাসে ‘আঙ্কেল স্যাম’ বলতে যে চিত্রটি কল্পনায় আনি—১৮১২ সালের যুদ্ধ থেকে প্রচলিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই জাতীয় প্রতীক, একজন সাদা চুল ও ছাগলাদাড়ি ওয়ালা প্রবীণ মানুষ, যার মাথায় আমেরিকার পতাকার রঙের লম্বা হ্যাট থাকে। লেখক সাম্য রাইয়ান সেই চেনা প্রতীকটিকে এই উপন্যাসে এক অসামান্য ও ভয়ঙ্কর সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন। অন্ধ জাদুকরের বর্ণনায় আঙ্কেল স্যামের যে প্রাসাদ এবং তার কার্যাবলীর বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা পড়তে পড়তে পাঠকের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।

আঙ্কেলের প্রাসাদের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর কাচঘেরা বিশালাকার এক কক্ষ, যেখানে কোটি কোটি মাছি অনবরত উড়ে বেড়াচ্ছে। এই মাছিগুলো আসলে কোনো সাধারণ মাছি নয়, এগুলো হলো আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট, স্যোসাল মিডিয়া এবং সর্বগ্রাসী নজরদারি ব্যবস্থার (Surveillance State) এক চমৎকার রূপক। আঙ্কেল স্যাম এই কোটি কোটি মাছিরূপী সিসি ক্যামেরা বা অ্যালগরিদম দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, তাদের চিন্তা, তাদের ক্ষোভ এবং তাদের পরিকল্পনাকে ২৪ ঘণ্টা নজরে রাখছেন, যাতে তার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো সত্যিকারের প্রতিরোধ গড়ে উঠতে না পারে।

একই সাথে উপন্যাসে আঙ্কেল স্যামের দেওয়া ‘ডলার’ ও ‘গণতন্ত্রের’ যে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। আঙ্কেল স্যামের দরবার থেকে সরাসরি কোনো স্বাধীনতা বা প্রকৃত জনকল্যাণ আসে না। সেখান থেকে আসে ‘গণতান্ত্রিক ডলার’ কিংবা প্রয়োজনে ‘খেলাফতি ডলার’। এই ডলারগুলোর মূল কাজ হলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মগজ ও অর্থনীতিকে কিনে নেওয়া। এই ডলারের বিনিময়ে ওইসব অনগ্রসর বা উন্নয়নশীল দেশগুলো আঙ্কেলের কাছ থেকে ‘ফরেন গণতন্ত্র’ বা বিদেশি গণতন্ত্রের ফর্মুলা আমদানি করে। এই গণতন্ত্র আবার কোনো মুক্ত বা স্বাভাবিক জিনিস নয়, এটি আঙ্কেলের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল করে তৈরি করা হয়, যাতে এই গণতন্ত্র কেবল আঙ্কেলের স্বার্থই রক্ষা করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কোনো প্রকৃত মুক্তি না আনে।

এই রূপক আখ্যানের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অথচ বাস্তব অংশটি হলো আঙ্কেলের প্রাসাদের পেছনের সেই ‘আস্তাকুঁড়’ বা ভাগাড়ের বর্ণনা। এই ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয় সেইসব মানুষদের, যারা একসময় আঙ্কেলের খুব বিশ্বস্ত দালাল, স্বৈরাচারী শাসক কিংবা তাবেদার ছিল, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে যারা আঙ্কেলের এজেন্ডা বা পলিসি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা যাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সাম্রাজ্যবাদ যখন কাউকে আর প্রয়োজন মনে করে না, তখন তাকে কতটা নির্মমভাবে টিস্যু পেপারের মতো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, এই আস্তাকুঁড়টি তারই এক প্রতীকী চিত্র।

পাশাপাশি, আঙ্কেলের প্রাসাদ থেকে যে জলধারা বা নদীর উৎপত্তি ও প্রবাহ দেখানো হয়েছে, তা বর্তমান বিশ্ব-অর্থনীতির এক চমৎকার ময়নাতদন্ত। এই জলধারাটি যখন অন্য কোনো দেশে প্রবেশ করে, তখন তা আসার সময় সেই দেশের যুদ্ধ, মহামারি, অস্থিতিশীলতা আর অশান্তির ধ্বংসাবশেষ কুড়িয়ে নিয়ে আঙ্কেলের প্রাসাদে জমা করে। আর যখন আঙ্কেলের প্রাসাদ থেকে সেই জলধারাটি আবার ফেরত যায়, তখন তা ‘নতুন শান্তির ধারা’ বা শান্তির বুলি নিয়ে প্রবাহিত হয়। এটি আসলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন বা পশ্চিমা দেশগুলোর সেই সুপরিচিত ফরেন পলিসির দিকে আঙুল তোলে, যেখানে তারা প্রথমে কোনো দেশে অশান্তি বা যুদ্ধ বাধায়, তারপর সেই দেশের খনিজ, তেল বা অর্থনৈতিক সম্পদ লুটে নেয় এবং পরিশেষে সেখানে ‘শান্তি রক্ষা’ বা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ নাম করে নিজেদের স্থায়ী আসন গেড়ে বসে।

সাহিত্যিক শৈলী ও লেখনীর দিক থেকে সাম্য রাইয়ান এই উপন্যাসে এক অসামান্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত হিউমার এবং স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গবিদ্রূপ। আমাদের সমাজ ও রাজনীতির যে অন্ধকার ও কুৎসিত দিকগুলো নিয়ে আমরা সাধারণত গম্ভীর বা হতাশ হয়ে পড়ি, লেখক সেগুলোকে এত চটুল, রসাত্মক অথচ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সংলাপে রূপ দিয়েছেন যে, পাঠক পড়তে পড়তে হাসবেন, কিন্তু পরক্ষণেই এক গভীর শূন্যতা, অসহায়ত্ব আর রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থমকে যাবেন। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই কান্না বা হাহাকারই এই উপন্যাসের আসল সার্থকতা।

একই সাথে উপন্যাসের গঠনশৈলীতে রিয়ালিজম বা বাস্তবতাবাদের সাথে সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের যে মিশ্রণ লেখক ঘটিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি দেখা যায় না। প্রথমার্ধের রতনের কর্পোরেট ও রাজনৈতিক জীবনের করপোরেট বাস্তবতার সাথে দ্বিতীয়ার্ধের অন্ধ জাদুকরের প্রাসাদের সেই জাদু-বাস্তবতার রূপান্তরটি এত মসৃণভাবে ঘটেছে যে, পাঠকের কোথাও খটকা লাগে না, বরং পুরো আখ্যানটি একটি সুতোয় বাঁধা মনে হয়। উপন্যাসের ভাষাশৈলী অত্যন্ত আধুনিক, গতিশীল এবং সাবলীল। সমকালীন নাগরিক জীবনের ভাষা, ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শব্দ চয়ন এবং প্রাত্যহিক জীবনের কথোপকথন যেভাবে উপন্যাসে এসেছে, তা তরুণ পাঠকদের খুব সহজেই লেখার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ উপন্যাসটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বা কোনো কাল্পনিক চরিত্রের গল্প নয়, এটি আসলে আমাদের বর্তমান সময়ের এক জীবন্ত দলিল। এটি আমাদের ভূ-রাজনীতির নোংরা খেলা, মিডিয়ার মগজ ধোলাইয়ের মেকানিজম, এনজিও বা অধিকার ব্যবসার আড়ালের সত্য এবং আঙ্কেল স্যামরূপী এক অদৃশ্য ও সর্বগ্রাসী পুতুলের বাক্সে বন্দি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের নির্মম প্রতিচ্ছবি। সাম্য রাইয়ান কোনো কৃত্রিম আশার বাণী বা সস্তা সান্ত্বনা দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করেননি, বরং তিনি আমাদের বাস্তবতার নগ্ন রূপটি চোখের সামনে মেলে ধরেছেন, যা প্রতিটি সচেতন ও চিন্তাশীল পাঠককে বইটির শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ভাবাবে এবং নিজেদের চারপাশের জগতটাকে নতুন করে দেখতে বাধ্য করবে। যারা সস্তা প্রেমের গল্প বা চেনা ছকের গোয়েন্দা কাহিনীর বাইরে গিয়ে একটু ভিন্ন ধারার, বুদ্ধিদীপ্ত এবং রাজনৈতিক স্যাটায়ারধর্মী সাহিত্য পড়তে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই উপন্যাসটি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম একটি সেরা ও অবশ্য পাঠ্য বই।