❑ সাম্য রাইয়ান
এইবার ফুটবল বিশ্বকাপের গ্যালারিতে কঙ্গো যে খেল দেখালো তা ইতিহাসের স্মরণীয় হয়ে থাকবে। লাল স্যুট, লাল টাই পরে এক ব্যক্তি হাত তুলে নব্বই মিনিট গ্যালারিতে স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন। ম্যাচের শেষে তিনি মুখ চেপে ধরেন, তারপর আঙুল দিয়ে বন্দুকের ভঙ্গি করেন নিজের মাথার দিকে। শব্দহীন। জাস্ট এইটুকুই পারফর্মেন্স, হয়ে উঠলো হাজার বক্তৃতার চেয়ে শক্তিশালী। ‘ফিফা’র ক্যামেরা দ্রুত অন্যদিকে ঘুরে গেল। কিন্তু ততক্ষণে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে— কে এই মানুষটি?
তিনি মিশেল কুকা এমবোলাডিঙ্গা। যাকে সবাই চেনে ‘লুমুম্বা ভিয়া’, অর্থাৎ “লুমুম্বা বেঁচে আছেন” নামে। বিশ্বকাপের গ্যালারিতে তিনি এভাবেই শ্রদ্ধা জানালেন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে।
বর্তমান বাস্তবতায় একটা মানুষকে মেরে ফেলা চুটকির ব্যাপার। কিন্তু একটি চিন্তা? কণ্ঠস্বর? যুগে যুগে কালে কালে অগণিতবার এই চেষ্টা হয়েছে। সক্রেটিসকে বিষ খাইয়ে। যিশুকে ক্রুশে তুলে। চে-র হাত কেটে, গুলিতে হত্যা করে। লোরকার কবরের ঠিকানা মুছে দিয়ে। তবুও, বারবার মৃত এই মানুষেরা জীবিতদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। প্যাট্রিস লুমুম্বা সেই ধরনের মানুষ।
তাঁকে গুলি করা হয়েছিল। তারপর লাশ অ্যাসিডে গলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পৃথিবী থেকে তাঁর অস্তিত্বের শেষ প্রমাণটুকুও মুছে ফেলার চেষ্টা হিসেবে। অ্যাসিড তাঁর শরীর গলিয়ে শেষ করে দিয়েছে, কিন্তু চিন্তা হয়েছে আরো জীবন্ত। বরং যতই গলাতে গেছে, ততই তিনি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।
আফ্রিকার মানচিত্রে কঙ্গো একটি দেশ। কিন্তু উপনিবেশবাদের কাছে কঙ্গো ছিল একটি লোভনীয় খনি। রাবার, তামা, ইউরেনিয়াম, হীরা… যা কিছু মূল্যবান, স-ব ছিল সেখানে। শুধু কঙ্গোর মানুষগুলোর মূল্য ছিল না।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন। রাবার ও হাতির দাঁতের লোভে, লক্ষ-লক্ষ কঙ্গোলিজকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, সে-সময়ে কোটি মানুষের জীবন হারিয়ে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায়। আজও সেই অধ্যায় মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঔপনিবেশিক শোষণের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সভ্যতার নামে যে বর্বরতা ইউরোপ উপহার দিয়েছে, কঙ্গো তার অন্যতম ভয়ংকর উদাহরণ।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এর সবই হয়েছে উন্নয়ন, সভ্যতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে। কিন্তু ভাষা বদলে দিলেই অপরাধ সদাচারে পরিণত হয় না। আজও পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো নতুন আঙ্গিকে একই কাজ করছে।
| প্যাট্রিস লুমুম্বা |
লুমুম্বা তাই স্বাধীনতার দিনেও মাথা নত করে ধন্যবাদ দেননি। ১৯৬০ সালের ৩০ জুন। কঙ্গো স্বাধীন হল। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বেলজিয়ামের রাজা বোদুয়াঁ। অনুষ্ঠানে সবাই ভেবেছিলেন, নতুন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রথাগত ধন্যবাদ জানাবেন। কিন্তু লুমুম্বা ইতিহাস লিখলেন। তিনি সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, এই স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়। এটা এসেছে রক্ত দিয়ে। অপমান সহ্য করে। শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তিনি প্রকাশ্যে বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনের নৃশংসতার কথা বলেছিলেন। সেই বক্তৃতা শুধু কঙ্গোর নয়, পুরো আফ্রিকার স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অমর দলিল হয়ে আছে।
কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়; তারপর মৃত্যু…। ক্ষমতার কাছে সত্যের চেয়ে বিপজ্জনক-ভয়ংকর আর কিছু নেই। একটি সৎ চিন্তার প্রতিধ্বনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলে।
সত্যিই কি উপনিবেশ শেষ হয়েছে? এখন আফ্রিকার খনিজ সম্পদ কারা নিয়ন্ত্রণ করে? যুদ্ধ কারা উৎপাদন করে? শান্তিচুক্তি কারা লেখে? ঋণের ফাঁদ পাতে কারা? আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কারা? দাম বেশি দিয়ে নির্দিষ্ট দেশ থেকে পণ্য কিনতে কারা বাধ্য করে? উপনিবেশ এখন হাজির হয় ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, সামরিক চুক্তি, গোয়েন্দা সংস্থা আর উন্নয়নের ছদ্মাবরণে, ত্রাণকর্তা হিসেবে। সাম্রাজ্যবাদ এখন স্যুট টাই পরে, প্রেস কনফারেন্স করে, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে, হাতে মহান বার্তা ঝুলিয়ে উপস্থিত হয়।
লুমুম্বাকে হত্যা করার পরও তাঁরা নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। কারণ আগেই বলেছি, মৃত মানুষের ক্ষমতা কখনো কখনো জীবিত মানুষের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তাই লাশটাও রেখে যায়নি। অ্যাসিডে গলিয়ে ফেলেছে। গাধার মতো চিন্তা! একটা রাষ্ট্র ভেবেছিল, মৃতদেহ না থাকলে স্মৃতিও থাকবে না। অথচ আজ পৃথিবীর কোটি মানুষ লুমুম্বার নাম জানে। কিন্তু তাঁর হত্যাকারী ব্যক্তিরা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।
বেলজিয়াম বহু বছর পরে ক্ষমা চেয়েছে। অপরাধ এতটাই স্পষ্ট যে অস্বীকার করার আর উপায় নেই। কিন্তু ক্ষমা কি মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনে? একটি দেশের হারানো সম্ভাবনা কি ফেরত দেয়? যে শিশুরা বাবাকে হারিয়েছে, যে জাতি তার সবচেয়ে উজ্জ্বল নেতাকে হারিয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণের উপায় কী?
শুনলাম, এত বছর পরে অবশেষে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন একজন জীবিত অভিযুক্ত। তাঁর বয়স তিরানব্বই। অনেক দেরি হয়ে গেছে, তবু, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই বিচার দরকার।
পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি জিনিশ কী? সোনা? তেল? ইউরেনিয়াম? না। সবচেয়ে দামি জিনিস স্বাধীনতা। পৃথিবীর প্রায় সব যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাকে ঘিরে।
লুমুম্বার শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ সেই সমস্ত মানুষকে স্মরণ করা, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীনতার মানচিত্র আঁকা হয়েছে।
উপনিবেশের পতাকা ধ্বংস করা সহজ। কিন্তু উপনিবেশবাদী মানসিকতা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। যে মানুষ অন্য জাতিকে ছোট মনে করে, অন্য দেশের সম্পদকে নিজের সম্পত্তি ভাবে, অন্যের স্বাধীনতাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক মনে করে তার হাতে বন্দুক বা ব্রিফকেস যা-ই থাকুক না কেন, সে আজও উপনিবেশবাদী। আর তাই লুমুম্বা আজ আর শুধু কঙ্গোর নন। শুধু আফ্রিকার নন। গোটা দুনিয়ার প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের কমরেড।
যতদিন উপনিবেশী আগ্রাসন থাকবে, ততদিন লুমুম্বার নামও প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উচ্চারিত হবে।
মানুষের স্বাধীনতা অমর হোক।
সংযুক্তি:
কঙ্গোর স্বাধীনতা ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্যাট্রিস লুমুম্বার ভাষণ[নোট: আফ্রিকার উপনিবেশবাদ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীন কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা ১৯২৫ সালের ২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। বেলজিয়ামের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে কঙ্গোকে মুক্ত করার আপসহীন লড়াইয়ে তিনি নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৬০ সালের জুনে কঙ্গো স্বাধীনতা লাভ করে। তবে স্বাধীনতার পরপরই খনিজসমৃদ্ধ কাটাঙ্গা অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং বেলজিয়ামের মদদে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন তিনি। শীতল যুদ্ধের ভূ-রাজনীতি এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করার কারণে ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা বিংশ শতকের অন্যতম জঘন্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত।১৯৬০ সালের ৩০ জুন কঙ্গোর স্বাধীনতা ঘোষণার অনুষ্ঠানে প্যাট্রিস লুমুম্বা এই ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণটি সঙ্কলিত আছে ‘The Truth about a Monstrous Crime of the Colonialists’ (মস্কো, ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস পাবলিশিং হাউস, ১৯৬১, পৃষ্ঠা: ৫৩-৫৫) গ্রন্থে। এর অনুলিপি তৈরি করেছিলেন টমাস শ্মিট। ‘আখড়া’ নিয়েছে মার্কিস্ট ডট অর্গ সাইট থেকে। এআই দিয়ে অনুবাদ করে সম্পাদনা করেছে আখড়া টিম।]কঙ্গোর ভাই ও বোনেরা, বিজয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামীরা, কঙ্গো সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের অভিবাদন জানাই।আমার যে বন্ধুরা ক্লান্তিহীনভাবে আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন, আপনাদের সবাইকে আমি অনুরোধ করছি—১৯৬০ সালের ৩০ জুনের এই দিনটিকে আপনাদের হৃদয়ে চিরকালের জন্য একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন হিসেবে খোদাই করে রাখুন। এটি এমন এক দিন, যার তাৎপর্য আপনারা পরম গৌরবের সাথে আপনাদের সন্তানদের কাছে ব্যাখ্যা করবেন, যাতে তারাও পরবর্তীতে তাদের নাতি-পুতি ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের স্বাধীনতার এই মহান সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে পারে।আজ বেলজিয়ামের—যা একটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশ এবং আমরা এখন যার বরাবর, সমমর্যাদার অধিকারী—সাথে পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে কঙ্গোর এই স্বাধীনতা ঘোষিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কোনো কঙ্গোবাসীই কখনো ভুলে যাবে না যে, এই স্বাধীনতা কোনো উপহার হিসেবে আসেনি। এটি অর্জিত হয়েছে লড়াইয়ের মাধ্যমে; দিনের পর দিন ধরে চলা এক অবিরাম ও উদ্দীপনাপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এমন এক সংগ্রাম, যেখানে আমরা কোনো অভাব-অনটন বা কষ্টকে পরোয়া করিনি, এবং নিজেদের শক্তি কিংবা রক্ত দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করিনি।এই পথ ছিল অশ্রু, আগুন আর রক্তে ভেজা। আমরা আমাদের এই সংগ্রাম নিয়ে গভীরভাবে গর্বিত, কারণ এটি ছিল সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত, মহৎ এবং আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অবমাননাকর দাসত্বের অবসান ঘটানোর জন্য অপরিহার্য।আশি বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে এটাই ছিল আমাদের ভাগ্য, এবং আমাদের ক্ষতগুলো এখনও এতই দগদগে ও যন্ত্রণাদায়ক যে তা ভুলে যাওয়া অসম্ভব।আমরা এমন জোরপূর্বক শ্রম বা বেগার খাটার তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, যার বিনিময়ে পাওয়া মজুরি দিয়ে আমরা আমাদের ক্ষুধা মেটাতে পারতাম না, নিজেদের পরিধেয় বস্ত্র বা ভদ্রোচিত বাসস্থানের সংস্থান করতে পারতাম না, কিংবা আমাদের সন্তানদের পরম স্নেহে বড় করে তুলতে পারতাম না।সকাল, দুপুর ও রাতে—সবসময় আমাদের কেবল ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ হওয়ার ‘অপরাধে’ উপহাস, অপমান এবং চপেটাঘাত সহ্য করতে হয়েছে। কে কখনো ভুলতে পারবে যে, একজন কৃষ্ণাঙ্গকে সবসময় ‘তুই’ (tu) বলে সম্বোধন করা হতো? তা কোনো বন্ধুত্বের খাতিরে নয়, বরং ভদ্রোচিত ও সম্মানসূচক ‘আপনি’ (vous) শব্দটি কেবল শ্বেতাঙ্গদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল বলে।আমরা দেখেছি কীভাবে তথাকথিত ন্যায়সংগত আইনের নামে আমাদের জমিজমা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যেসব আইন আসলে কেবল গায়ের জোরের অধিকারকেই স্বীকৃতি দিত।আমরা ভুলে যাইনি যে, আইন কখনো শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য এক ছিল না; এক পক্ষের জন্য তা ছিল অত্যন্ত শিথিল, আর অন্য পক্ষের জন্য তা ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক।আমরা রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নিপীড়িত হয়ে এবং নিজেদের মাতৃভূমি থেকে নির্বাসিত হয়ে চরম ও নৃশংস কষ্ট ভোগ করেছি; আমাদের সেই নিয়তি ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।আমরা ভুলে যাইনি যে, শহরগুলোতে শ্বেতাঙ্গদের জন্য ছিল আলিশান অট্টালিকা আর কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য ছিল জীর্ণ কুঁড়েঘর; একজন কৃষ্ণাঙ্গের ‘ইউরোপীয়দের’ জন্য নির্ধারিত সিনেমা হল, রেস্তোরাঁ ও দোকানে প্রবেশাধিকার ছিল না; একজন কৃষ্ণাঙ্গকে যাতায়াত করতে হতো জাহাজের খোলে, বিলাসবহুল কেবিনে থাকা শ্বেতাঙ্গদের পায়ের নিচে।আমাদের এত এত ভাইকে যে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর কথা কে ভুলতে পারবে? কিংবা সেই অন্ধকার সেলগুলোর কথা, যেখানে নির্মমভাবে নিক্ষেপ করা হতো তাদের—যারা উপনিবেশবাদীদের শাসন, অবিচার, নিপীড়ন এবং শোষণের কাছে আর মাথা নত করতে চায়নি?আমার ভাইয়েরা, এই সবকিছু আমাদের ওপর অবর্ণনীয় কষ্ট নিয়ে এসেছিল। কিন্তু, ঔপনিবেশিক নিপীড়নে দেহে ও আত্মায় ক্ষতবিক্ষত হওয়া আমরা—যাদের আপনারা ও আপনাদের জনপ্রতিনিধিরা ভোট দিয়ে এই মাতৃভূমিকে পরিচালনা করার জন্য নির্বাচিত করেছেন—আপনাদের আশ্বস্ত করে বলছি: আজ থেকে সেই সবকিছুর অবসান ঘটল।কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের জন্ম ঘোষিত হয়েছে এবং আমাদের প্রিয় দেশের ভবিষ্যৎ এখন স্বয়ং তার নিজের জনগণের হাতে।ভাইয়েরা, আসুন আমরা একসাথে একটি নতুন সংগ্রাম শুরু করি—একটি মহৎ সংগ্রাম যা আমাদের দেশকে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং শ্রেষ্ঠত্বের দিকে নিয়ে যাবে।আমরা সবাই মিলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব এবং প্রতিটি মানুষের জন্য তার শ্রমের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করব।মুক্ত পরিবেশে কাজ করে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ কী করতে পারে, তা আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দেব এবং কঙ্গোকে পুরো আফ্রিকার গর্বে পরিণত করব।আমরা নিশ্চিত করব যেন এই মাতৃভূমির ভূমি ও সম্পদ প্রকৃত অর্থেই তার সন্তানদের কল্যাণে নিয়োজিত হয়।আমরা সমস্ত পুরনো ঔপনিবেশিক আইন সংশোধন করব এবং সেগুলোকে এমন নতুন আইনে রূপান্তর করব যা হবে ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক।আমরা মুক্ত চিন্তার ওপর সব ধরনের নিপীড়ন বন্ধ করব। আমরা নিশ্চিত করব যেন প্রতিটি নাগরিক মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত মৌলিক স্বাধীনতাগুলো পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেন।আমরা যেকোনো ধরনের বৈষম্য—তার উৎস যা-ই হোক না কেন—সম্পূর্ণ নির্মূল করব এবং প্রত্যেকের জন্য এমন এক জীবনমান নিশ্চিত করব যা মানুষের মর্যাদা, শ্রম এবং দেশের প্রতি আনুগত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।আমরা দেশে এমন এক শান্তি প্রতিষ্ঠা করব যা বন্দুক বা বেয়নেটের জোরে নয়, বরং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সদিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।আর এই সবকিছুর জন্য, আমার প্রিয় দেশবাসী, আমরা কেবল আমাদের নিজেদের বিপুল শক্তি এবং বিশাল সম্পদের ওপরই ভরসা রাখব না, বরং বিশ্বের বহু বিদেশি রাষ্ট্রের সহায়তার ওপরও আস্থা রাখব। আমরা তাদের সহযোগিতা তখনই সাদরে গ্রহণ করব, যখন তা আমাদের ওপর কোনো ভিন্ন নীতি চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং বন্ধুত্বের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসবে।এমনকি বেলজিয়ামও, যারা অবশেষে ইতিহাসের শিক্ষা অনুধাবন করতে পেরেছে এবং আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আর কোনো চেষ্টা করছে না, আমাদের সহায়তা দিতে ও বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে প্রস্তুত। এই লক্ষ্যে আমাদের দুটি সমান ও স্বাধীন দেশের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে এই সহযোগিতা উভয় দেশের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে। আমাদের পক্ষ থেকে, আমরা সদা সতর্ক থেকে, আমাদের স্বেচ্ছায় নেওয়া অঙ্গীকারগুলো মেনে চলার চেষ্টা করব।এভাবেই, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই—আমার সরকারের হাত ধরে যে নতুন কঙ্গো গড়ে উঠছে, তা হবে সমৃদ্ধ, মুক্ত এবং প্রগতিশীল। তবে বিলম্ব না করে আমাদের এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য, আমি কঙ্গোর সমস্ত আইনপ্রণেতা এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছে অনুরোধ করছি—আপনারা আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করুন।আমি আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আপনাদের সমস্ত উপজাতীয় ও আঞ্চলিক কোন্দল ভুলে যান; এগুলো আমাদের দুর্বল করে এবং বিদেশের মাটিতে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে।আমি আপনাদের সবাইকে আমাদের এই মহান উদ্যোগের সাফল্য নিশ্চিত করতে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে পিছপা না হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।সবশেষে, আমি আপনাদের বিনাশর্তে আমাদের সহনাগরিক এবং এ দেশে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তিকে সম্মান করার অনুরোধ জানাচ্ছি। যদি কোনো বিদেশির আচরণ সন্তোষজনক না হয়, তবে আমাদের বিচারব্যবস্থা অনতিবিলম্বে তাদের এই প্রজাতন্ত্রের ভূখণ্ড থেকে বহিষ্কার করবে; আর অন্যদিকে, যদি তাদের আচরণ ভালো হয়, তবে তাদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত, কারণ তারাও আমাদের দেশের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করছেন।কঙ্গোর এই স্বাধীনতা সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশের মুক্তির অভিমুখে একটি চূড়ান্ত ও নিষ্পত্তিমূলক পদক্ষেপ। আমাদের এই সরকার—যা জাতীয় ও গণ-ঐক্যের সরকার—সর্বদা দেশের সেবা করে যাবে।আমি কঙ্গোর সমস্ত পুরুষ, নারী ও শিশুকে একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার এবং আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কাজে দৃঢ়তার সাথে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানাচ্ছি।জাতীয় মুক্তির বীর সংগ্রামীদের প্রতি চিরন্তন গৌরব!দীর্ঘজীবী হোক স্বাধীনতা ও আফ্রিকান ঐক্য!দীর্ঘজীবী হোক স্বাধীন ও সার্বভৌম কঙ্গো!
