রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তীর হাবিলদারগণ

❑ সাম্য রাইয়ান 

রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী • সাম্য রাইয়ান

রবীন্দ্রনাথকে আমরা ভালোবাসি। এতই ভালোবাসি যে তাঁকে পড়ার দরকার মনে করি না। নজরুলের ক্ষেত্রেও তাই। অথচ মানুষ যাকে ভালোবাসে তাকে নিয়ে কৌতূহল থাকে। কিন্তু আমাদের কোনো কৌতূহল নেই। আমরা আনুষ্ঠানিক। বছরে দুইদিন তাঁদের জন্ম হয়। তারপর আবার মৃত্যু। পরের বছর আবার জন্ম। এমন নিয়মিত পুনর্জন্ম পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম মানুষেরই ভাগ্যে জোটে। যিশুখ্রিষ্টও বোধহয় এতবার জন্মান না।

পঁচিশে বৈশাখ এল। শাদা শাড়ি। লাল পাড়। গলায় রবীন্দ্রসংগীত। এগারোই জ্যৈষ্ঠ এল। নজরুলগীতি। তারপর বাকি এগারো মাস তাঁরা অবসরপ্রাপ্ত। সরকারি চাকরির মতো। 

হাস্যকর ব্যাপার কী জানেন। জন্মজয়ন্তীর মঞ্চে যে লোক রবীন্দ্রসংগীত গাইছে, সে হয়তো রবীন্দ্ররচনাবলী ঠিকমতো উল্টেও দেখেনি। যে নজরুলের বিদ্রোহী আবৃত্তি করছে, সে হয়তো জীবনে নজরুলের একটা প্রবন্ধও পড়েনি। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামটা শুনেছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু তাতে কী! আমাদের দেশে চিন্তাচর্চার চেয়ে অনুষ্ঠানিকতা গুরুত্বপূর্ণ। আইডিয়ার চেয়ে অনলাইন পোস্টার। দর্শনের চেয়ে সেলফি। রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে দেয়া সহজ। নজরুলকে আবৃত্তি করাও সহজ। কিন্তু তাদের চিন্তা চর্চা করা কঠিন৷

মানুষ চিন্তার ফলাফল গ্রহণে আগ্রহী হলেও চিন্তাচর্চার প্রতি ন্যূনতম আগ্রহ নাই। যেমন সবাই স্বাস্থ্য চাইলেও, তা অর্জনে যে ব্যায়াম করতে হয়, তাতে রাজি না। জ্ঞানী হতে চাইলেও বই পড়তে আগ্রহী না। রবীন্দ্রনাথের নাম ব্যবহার করতে চাইলেও, রবীন্দ্ররচনাবলী নিয়ে পাঁচ মিনিট বসতে রাজি না। কারণ বসলে বিপদ। ওর ভেতরে বোম আছে৷ বিস্ফোরিত হবে৷

এই ভয়েই আমরা সহজ রাস্তা নিয়েছি। গান গাই। নাচি। নাটক করি৷ ফুল দিই। ছবি পোস্ট করি। ব্যাস, কিস্সা খাতাম।

শৈশব-কৈশোরে আমি ভাবতাম রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা এত হচ্ছে, নিশ্চয়ই দেশে চিন্তার মান খুব উঁচু। পরে দেখলাম ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। যত বেশি অনুষ্ঠান, তত কম পাঠ। যত বেশি শ্রদ্ধার মালা, তত কম বোঝাপড়া। 

নাচগান করতে কোনো সমস্যা নেই। গান অবশ্যই থাকবে। শিল্পের প্রকাশ তো দরকার। কিন্তু যদি ভাবা হয়, পঞ্চাশজন মিলে ‘আগুনের পরশমণি’ গাইলেই রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে, তাহলে সেটা ঠিক সেইরকম যুক্তি, যেরকম কেউ জিমের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলে দাবি করে সে বডিবিল্ডার।

রবীন্দ্রনাথকে পড়া কঠিন কাজ। কারণ তিনি আপনার রাজনৈতিক দলকে খুশি করবেন না। ধর্মীয় পরিচয়কে খুশি করবেন না। জাতীয়তাবাদকে খুশি করবেন না। ফ্যাসিবাদকে খুশি করবেন না৷ এমনকি আপনার ব্যক্তিগত অহংকেও খুশি করবেন না। তিনি বারবার বলবেন, মানুষ হও। আর আমরা তো জানিই, মানুষ হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।

ওহাবের দোকানে চা খেতে খেতে একজন আমাকে বলছিলেন, এবারের নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে পঞ্চাশের বেশি শিল্পী অংশ নিয়েছে। আমি বললাম, এর মধ্যে পাঁচজনও কি ‘সাম্যবাদী’ প্রবন্ধটা পড়েছে? তিনি উত্তর দিলেন না। আমিও জোর করিনি। মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলতে আমার ভালো লাগে না।

নজরুলকে আমরা বিদ্রোহী কবি বলে শেষ করে দিয়েছি। বিদ্রোহটা কী নিয়ে ছিল, কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, তাঁর ইসলামি সংগীত আর শ্যামাসংগীতের মধ্যে যে বিরল সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল, সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অথচ লোকটা সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় ভণ্ডামি, শ্রেণি বৈষম্য সবকিছুর বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। আজ যদি নজরুল বেঁচে থাকতেন, তাঁর আর জাতীয় কবি হওয়া হতো না, মবের তাণ্ডবেই জীবন বরবাদ হয়ে যেত।

কেউ যদি সত্যিই রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে চায়, তাহলে তাকে ‘সভ্যতার সংকট’ পড়তে হবে। জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাঁর দ্বিধা বুঝতে হবে। শিক্ষাবিষয়ক চিন্তা বুঝতে হবে। মানুষ আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর উদ্বেগ বুঝতে হবে। তখন দেখা যাবে রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করে যে লোকেরা প্রতিদিন ক্ষুদ্রতা, গোত্রবাদ, সংকীর্ণতা চর্চা করে, তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দূরত্ব মঙ্গলগ্রহের সমান।

নজরুলকে বুঝতে গেলেও বিপদ। সেখানে শুধু বিদ্রোহ নেই। প্রেম আছে। আধ্যাত্মিকতা আছে। শ্রেণিবোধ আছে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ আছে। তিনি যে ধরনের সাংস্কৃতিক সংশ্লেষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা আজও আমাদের নাগালের বাইরে।

কিন্তু এসব আলোচনা বিরক্তিকর। কারণ চিন্তা বিনোদন নয়।

একবার একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। রবীন্দ্রজয়ন্তী। ঘণ্টাখানেক গান হল। আধঘণ্টা নাচ। তারপর মিস্টি-সিঙারা। বাড়ি ফেরার সময় অন্যতম এক আয়োজককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সভ্যতার সংকট’ পড়েছেন? তিনি এমনভাবে তাকালেন যেন আমি ইউরেনিয়ামের বাজারদর জিজ্ঞেস করেছি।

আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, রবীন্দ্রনাথের কোন উপন্যাস আপনার সবচেয়ে প্রিয়? সে বলল, আমি আসলে গানের মানুষ। ব্যাপারটা লক্ষ করুন। আশ্চর্যের হলেও রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এখানে রবীন্দ্রপ্রেম মানে রবীন্দ্রপাঠ নয়। রবীন্দ্রপ্রেম মানে রবীন্দ্রসংগীতের  কমিটি করা, অর্থমনর্থম, অনুষ্ঠান, এইসব।

এটা ঐ দুই ব্যক্তির দোষ নয়। আমাদের সংস্কৃতির কাঠামোই এমন। বই এখানে পড়ার নয়, ঘর সাজানোর জিনিশ। 

সবমিলিয়ে আমরা এমন এক জাতিতে পরিণত হয়েছি যাদের কর্মকাণ্ড অদ্ভুত ধরনের। জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান নিয়ে যারা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে, তাদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের একটা পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ পর্যন্ত পড়েনি। নজরুলের গদ্য তো দূরের কথা। আমি কাউকে ছোট করছি না। আমিও অনেক লেখকের বই পড়িনি। কিন্তু না পড়ে এইসব আনুষ্ঠানিকতা অন্তত করি না।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যত অনুষ্ঠান হয়, তার এক শতাংশ মানুষও যদি তাঁর প্রবন্ধ পড়ত, তাহলে এই সমাজ অন্যরকম হত। নজরুলকে নিয়ে যত সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা হয়, তার এক শতাংশ মানুষও যদি তাঁর রাজনৈতিক লেখাগুলো পড়ত, তাহলে এই মবতান্ত্রিক সামাজের মান অন্য জায়গায় যেত।

কিন্তু সেদিকে কারও আগ্রহ নেই। কারণ চিন্তা লাভজনক নয়। চিন্তা দিয়ে চাকরি পাওয়া যায় না। প্রোজেক্ট বাগানো যায় না৷ ফেসবুকে লাইক বাড়ে না। কমিটির হাবিলদারও হওয়া যায় না। তাই আমরা চিন্তার বদলে সংস্কৃতির অভিনয় করি।

রবীন্দ্রনাথ পড়তে সময় লাগে। নজরুল বুঝতে শ্রম লাগে। তার চেয়ে গান গাওয়া সহজ। নাচ করা সহজ। আর প্রোজেক্ট বাগানো লাভজনক৷

কিন্তু একটা সত্যি কথা মনে রাখতে হবে। অনুষ্ঠানে বোঝাপড়া তৈরি হয় না। তার জন্য দরকার দীর্ঘ পাঠ, তর্ক, দ্বিমত, ভুল এবং সংশোধন…। একশো বছর রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে, হাজার বছর বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করেও মানবিক, বিদ্বৎসমাজ তৈরি করা যায় না। যে সমাজে চিন্তার চেয়ে অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে গড় বুদ্ধিবৃত্তিক মান ক্রমশ নীচে নামবেই। 
জল দেখে সাঁতার শেখা যায় না। তার জন্য নদীতে নামতে হয়। নদীমাতৃক বাঙলাদেশে আমরা বহুকাল নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছি। ছবি তুলছি। উৎসব করছি। ব্যানার টাঙাচ্ছি। কিন্তু নদীতে নামছি না।

একগুচ্ছ আকাঠ মূর্খের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে মাইক্রোফোন। কিন্তু জনাব, মাইক্রোফোন চিন্তা উৎপাদন করতে পারে না, চিন্তাকে উসকে দিতেও অক্ষম।