❑ সাম্য রাইয়ান
ফ্রানৎজ কাফকার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি সম্ভবত যক্ষ্মা বা প্রেমে ব্যর্থতা নয়। ট্র্যাজেডিটা হলো, মৃত্যুর পর তাঁর কথা কেউ শোনেনি।
কল্পনা করুন, একজন মানুষ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আছেন। চারদিকে ছড়িয়ে আছে কাগজ। গল্পের কাগজ। অসমাপ্ত উপন্যাসের কাগজ। চিঠি। ডায়েরি। একজন লেখকের জীবন আসলে শেষ পর্যন্ত কাগজের স্তূপ ছাড়া আর কী? তিনি একের পর এক সেই কাগজ আগুনে ফেলছেন। নিজের সন্তানদের নিজেই দাহ করছেন। শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কাগজ শেষ হচ্ছে না। তখন তিনি বন্ধুকে লিখে গেলেন—আমি মারা গেলে বাকিগুলোও পুড়িয়ে দিও।
বন্ধুর নাম ম্যাক্স ব্রড।
পৃথিবীর সাহিত্য ইতিহাসে এর চেয়ে বড়ো অবাধ্য বন্ধু খুব বেশি পাওয়া যাবে না।
কাফকা চেয়েছিলেন তাঁর লেখা মারা যাক। ম্যাক্স ব্রড চেয়েছিলেন কাফকা বেঁচে থাকুন।
শেষ পর্যন্ত কে জিতলেন?
আমরা জানি, কাফকা হেরে গেছেন।
আজ পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই তাঁর বই অনূদিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ওপর গবেষণা হয়। ‘কাফকাইস্ক’ শব্দটি অভিধানে জায়গা পেয়েছে। একজন লেখকের নামে বিশেষণ তৈরি হওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! বেশিরভাগ মানুষ জীবনে একটা ঘরও তৈরি করতে পারে না, আর কাফকা নিজের অজান্তেই একটা মনোজাগতিক ভূপরিসর তৈরি করে গেছেন।
মজার ব্যাপার হলো, তিনি নিজে এ ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না।
বরং উল্টো।
নিজের লেখাকে তিনি একসময় ‘মিসক্যারেজ’ বলেছিলেন। গর্ভপাতের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন নিজের সৃষ্টিকে। একজন লেখক তাঁর লেখাকে যতটা নির্মমভাবে অপমান করতে পারেন, কাফকা সম্ভবত ততটাই করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন না যে তাঁর লেখা পৃথিবীর সামনে থাকার যোগ্য।
এমন আত্মসন্দেহের উৎস কোথায়?
সম্ভবত তাঁর জীবনেই।
ছোটোবেলা থেকেই কাফকার চারপাশে ছিল দূরত্ব। বাবা-মা সংসারের প্রয়োজনে ব্যস্ত। স্নেহের চেয়ে শাসনের স্মৃতি বেশি। তিন বোনের সঙ্গে খেলেই শৈশব কেটেছে। পরবর্তীকালে সেই বোনদেরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গিলে খাবে। প্রেম এসেছে জীবনে, কিন্তু স্থায়ী হয়নি। ফেলিস বাউয়ারকে লেখা চিঠিগুলো পড়লে মনে হয়, একজন মানুষ প্রেম করছেন না, প্রেমের ধারণার সঙ্গে লড়াই করছেন।
কাফকার জীবনে সবকিছু যেন অসমাপ্ত থাকার জন্যই এসেছিল।
প্রেম।
স্বাস্থ্য।
পরিবার।
এমনকি তাঁর উপন্যাসগুলোও।
‘দ্য ট্রায়াল’, ‘দ্য ক্যাসল’, ‘আমেরিকা’— কোনোটাই তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।
অথচ অসমাপ্তির এই শিল্পীই লিখেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রথম বাক্যগুলোর একটি—
“As Gregor Samsa awoke one morning from uneasy dreams he found himself transformed in his bed into an enormous insect.”
এক সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা আবিষ্কার করল, সে এক বিশাল পোকায় পরিণত হয়েছে।
এই লাইনটা মনে হয় যেন কাফকার আত্মজীবনীরই শুরু।
কারণ কাফকা নিজেও ধীরে ধীরে এক ধরনের পোকায় পরিণত হয়েছিলেন। সমাজের কাছে নয়, নিজের কাছেই। যক্ষ্মা তাঁর শরীরকে ক্ষয় করছিল। একাকীত্ব তাঁর মনকে। তিনি ক্রমশ নিজের খোলসের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিলেন।
এই সময়েই তাঁর পাশে ছিলেন ম্যাক্স ব্রড।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে গিয়ে পরিচয়। তারপর বন্ধুত্ব। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। তর্ক। স্বপ্ন। হতাশা। একসময় ম্যাক্সই হয়ে উঠলেন সেই মানুষ, যাঁর ওপর কাফকা সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখতেন।
আর সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছা অমান্য করলেন।
১৯২৪ সালে যক্ষ্মায় মারা গেলেন ফ্রানৎজ কাফকা।
মৃত্যুর পর ম্যাক্স ব্রড তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী পাণ্ডুলিপি পোড়াননি। বরং প্রকাশ করলেন ‘দ্য ট্রায়াল’। তারপর একে একে অন্য লেখাগুলোও।
এখানেই প্রশ্নটা জন্ম নেয়।
ম্যাক্স কি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন?
নাকি বন্ধুকে উদ্ধার করেছিলেন?
যদি তিনি কথা রাখতেন, তাহলে আজ আমরা কাফকাকে জানতাম না। ‘মেটামরফসিস’ হয়তো থাকত, কিন্তু ‘দ্য ট্রায়াল’ থাকত না। ‘দ্য ক্যাসল’ থাকত না। আধুনিক সাহিত্যের একটি সম্পূর্ণ মহাদেশ হয়তো মানচিত্র থেকে মুছে যেত।
অন্যদিকে এটাও সত্য, একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করার অধিকার কারও নেই।
ম্যাক্স ব্রড হয়তো সাহিত্যকে বাঁচিয়েছেন।
কিন্তু বন্ধুত্বকে?
সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
তবে আমার মনে হয়, বিষয়টা এত সরল নয়।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কাফকার মৃত্যুর একশ বছর পরও আমরা সেই সিদ্ধান্তের বিচার করছি। অথচ তাঁর লেখার চরিত্রগুলো ঠিক এভাবেই বিচারহীন এক বিচারের মধ্যে আটকে থাকে।
সম্ভবত এটাই সবচেয়ে কাফকাসুলভ পরিণতি।
একজন মানুষ মৃত্যুর আগে বলেছিলেন—আমার সব লেখা পুড়িয়ে দিও।
একজন বন্ধু সেই কথা রাখেননি।
আর সেই অবাধ্যতার কারণেই পৃথিবী পেয়েছে ফ্রানৎজ কাফকাকে।