সাম্য রাইয়ানের গদ্য: কবিতার হাত ধরে পথচলা

❑ শামসুল কিবরিয়া 

লিটলম্যাগ নিয়ে যেসব তরুণ বর্তমানে সক্রিয় সাম্য রাইয়ান তাদের অন্যতম। তার চিন্তাভাবনা, লেখালেখি সবই লিটলম্যাগ কেন্দ্রীক। যে পত্রিকাটি নিয়ে সাম্যের এ অভিযাত্রা চলমান তার নাম ‘বিন্দু’। ছাপা এবং অনলাইন এ দুই মাধ্যমেই তিনি ‘বিন্দু’ নিয়ে বেশ সক্রিয় আছেন। পাশাপাশি লিখে চলেছেন কবিতা ও গদ্য। তরুণ কবি হিসেবে তার সক্রিয়তা ও রচনার গভীরতা আমাদের প্রজন্মকে আশান্বিত করে। 

এখন বড় অস্থির সময়। বিভিন্ন ধরনের মিডিয়ার হাতছানি আমাদেরকে সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে। কেননা এতে আদি রসের বিস্তার আছে। এর  সুড়সুড়ি অনুভব আমাদেরকে চিন্তাহীনভাবে ব্যস্ত রাখে। ফলে এ রঙিন জগতের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে মানুষ হারিয়ে ফেলে ব্যক্তিসত্ত্বাকে।

কিন্তু সাম্য সাহিত্যকে কেবল বিনোদনের উৎস হিসেবে নেননি। তিনি ছোটকাগজের সৈনিক। ফলে তাকে নিরন্তর যুদ্ধ করতে হয় পারিপার্শ্বিক অবস্থা, এমনকি নিজের সাথেও। ‘বিন্দু’কে সাথে নিয়ে তিনি এই যুদ্ধ তিনি বেশ ভালো করেই চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি তার যে মূল কাজ, কবিতা রচনা, তাতেও সমানতালে হাত চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তার  কয়েকটি বইও বের হয়ে গেছে। পাঠকের কাছে তার কবিতাগুলো আদৃত হয়েছে। 

এ সময়ে সবাই অল্প সময়েই প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। প্রতিষ্ঠার জন্য কেন আকুতি? প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে পড়তে কেন এত আকুলতা? প্রতিষ্ঠান তার নিজের প্রয়োজনে লেখককে কোলে তোলে আবার স্বার্থ হাসিল হয়ে গেলে পাছায় লাথি দিতেও দ্বিধা করে না। সাম্য খুব সচেতনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিজের জগৎ গড়ে তুলেছেন।

এ নিবন্ধের পরবর্তী অংশ অগ্রসর হবে সাম্য রাইয়ান প্রণীত লোকাল ট্রেনের জার্নাল ও সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট বই দুটি নিয়ে।

লোকাল ট্রেনের জার্নাল মুক্তগদ্যের একটি  বই। সাম্য রাইয়ান মূলত একজন কবি। তার গদ্যের হাতও যে চমৎকার চলে তার স্বাক্ষর রয়েছে এ বইয়ে। তার গদ্যের গায়ে অবশ্য কবিতার ছোঁয়াও লেগে আছে। তার কবিসত্বাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি গদ্য লিখতে গিয়েও।

এ বইয়ের গদ্যগুলোতে লেখক তার একান্ত অনুভূতির কথামালা সাজিয়েছেন। তার ভেতরে জন্ম নেয়া প্রায়-কবিতাগুলো তিনি গদ্যের আকারে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন। গ্রন্থভুক্ত গদ্যগুলো যদিও ব্যক্তিক অনুভূতিকে কেন্দ্র করে রচিত তবু তা যুক্ত করে সমষ্টিকে। সমষ্টিকে ভেতর ছড়িয়ে থাকা প্রেম, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, হাহাকার, কষ্টবোধ ব্যক্তিকে আলোড়িত করে। লেখক সমষ্টি থেকে আহরিত অনুভবগুলো সাজিয়ে পাঠকের সামনে হাজির করেন। এ গদ্যগুলোতে বেদনার ছাপ আছে। বরং বলা ভালো বেদনার রঙই বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে আছে। বই থেকে একটু পাঠ করে নেয়া যাক—
ঘুমিয়ে পড়েছে শব। ঘুমিয়ে পড়েছে কোলাহল। ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম। ঘুমন্ত মার্বেল, শুধুই গড়িয়ে যায়। গড়িয়ে গড়িয়ে আসে বিদীর্ণ আলোর ধারা।.........ঘুম থেকে উঠি আর ভুলে যাই এখন মধ্যরাত কী দুপুর! পাজল মেলে না আমার। ওহ্ পাজেল-ওহ্-! তারও কী সূত্র ভুলে গেছি? কীভাবে ভুলে গেলাম! আমার মনে হয় কখনো জানাই হয়নি। কী করে জানবো, আমি তো মূর্খ আকাঠ। স্বাদহীন গ্লিসারিন।
(বিদীর্ণ আলোর ধারা, লোকাল ট্রেনের জার্নাল)

তুমি’ নামক এক সত্ত্বার দেখা মেলে গ্রন্থভুক্ত বিভিন্ন গদ্যে। এই ‘তুমি’ কী কোনো প্রেয়সী। না-কি এই ‘তুমি’র মাঝে  লেখকের নিজেকে দেখার এক আকুলতা জড়িয়ে আছে? তুমি-আমি মিলে যে জগৎ গড়ে ওঠে তার সম্মিলিত পরিচয় ‘আমরা’। আমাদের মধ্যে নিজেকে বিকানোর হাজােেরা পথ। আছে বিশাল এক মধ্যবিত্তিক প্রচেষ্টা। আমাদের ভেতর থেকেই জেগে ওঠে নিরবচ্ছিন্ন নৈঃশব্দ্য। সাম্যের গদ্যে এসব বিষয় এসেছে—
কেন এত অভিমান, পড়ে থাকে ছায়া তার বিবর্ণ-বিস্তৃত চোখে। পুড়ে যায় বনভূমি বেবাক অহমে। তার পাশে, তুমি শুকরছানা বুকে চেপে নির্বিকার ঘনত্ব বাড়ে আর দুলে ওঠে তোমার প্রদীপ।
(কবি যা বলেন তা গুরুত্বপূর্ণ, যা বলেন না তা-ও গুরুত্বপূর্ণ, লোকাল ট্রেনের জার্নাল)

একজন লেখক যতই কল্পনা বিলাসী হোন না কেন তার লেখায় সমকালের ছাপ পড়তে বাধ্য। লেখকই সমকালকে মহাকালের দিকে টেনে নিয়ে যান। সাম্যের গদ্যে এর ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। তিনি তার সময়ের বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে এনছেন। বিভিন্ন সিস্টেমের সমালোচনাও করেছেন। তার ব্যক্তিক অনুভব এভাবে সামষ্টিক আকার ধারণ করে। তাই তার গদ্যে আমরা দেখতে পাই শিল্পের কথা, রাজাকারের কথা, এইম ইন লাইফের কথা, কবি ও কবিতার কথা, সীমান্তের কথা, কাঁটাতারের কথা। আমরা আরও পাঠ করি অন্ধকারের শব্দমালা, চকচকে ব্লেড ও রক্তের কথা, শুকনো ফুলের কথা, কান্নার কথা, নির্জনতার কথা। সাম্য আমাদেরকে নিয়ে যান এক ঘোরলাগা জগতে।

শিল্পকলায় যদি শিল্প না থাকে কবে থাকবে শুধুই কলা। প্রতিষ্ঠানের হুইলচেয়ারে বসে কর্তা তখন কলা ছোলাবেন আর খাবেন, ছোলাবেন আর খাবেন; সেই সাথে ছালগুলো পথে ছুঁড়ে দেবেন; যাতে আপনি/আমি কেউ কেউ তাতে আছাড় কেয়ে দাঁতমুখ ভাঙতে পারি। (অন্ধকারে সাঁতার কাটে নিঃসঙ্গ সোনার হরিণ, লোকাল ট্রেনের জার্নাল)

মুক্তগদ্যের এ বইয়ে সাম্য গদ্যের সাথে সাথে জুড়ে দিয়েছেন বিভিন্ন কবির কবিতার অংশ। গদ্যের সাথে প্রাসঙ্গিকতা তৈরির মাধ্যমে তিনি গদ্য ও কবিতার এ সম্মিলন ঘটিয়েছেন। এটাও তার কবি প্রতিভাকে উদ্ভাসিত করে তোলে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, গ্রন্থভুক্ত গদ্যগুলোতে কবিতার আমেজ রয়েছে। এটার পাশাপাশি গদ্যের শরীরে কবিতা জুড়ে দেয়ায় গদ্যের মধ্যে কবিতার যে সম্মিলন ঘটেছে তা পাঠযাত্রাকে কবিতাময় করে তুলে।

সাম্যের গদ্য পাঠককে ধরে রাখতে পারে। তার অনুভূতির সাথে পাঠকের আত্মিক বন্ধন স্থাপন সহজতর হয় বলে কোন বিরক্তি উৎপাদন করে না। বরং গদ্যের প্রবহমানতা পাঠককে মুগ্ধ করে দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে। যদিও তার গদ্য কবিতাশ্রয়ী তবু জটিলতার মোড়কে আবদ্ধ নয়। শব্দের ব্যবহারের পারঙ্গমতা এক্ষেত্রে উল্লেখ্য।

এবার সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট

সাম্য রাইয়ানের একটি পুস্তিকা সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট। সুবিমল মিশ্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী একজন লেখক। তার লেখক সত্ত্বা আজ অবধি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা নত করেনি। সাম্য তাকে নিয়েই এ গদ্যটি রচনা করেছেন। এ গদ্যে সুবিমল মিশ্রকে তিনি মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু খুব ছোটো একটি গদ্য তাই সুবিমলের পূর্ণ মূল্যায়ন এখানে হয়নি। সাম্য সে চেষ্টা করেনও নি বলা যায়। মোটামুটি সুবিমলের একটা সংক্ষিপ্ত অবয়ব আমরা এ গদ্যে দেখতে পাবো। পাঠক সুবিমল মিশ্রের চিন্তাধারা, তার আদর্শিক অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে কিছু ধারণা হলেও এ পাবেন এ গদ্য থেকে। আকারে ছোটো হলেও সুবিমলকে বিস্তারিতভাবে জানার জন্য এ গদ্যটি সহায়ক হতে পারে। এমন প্রচেষ্টার জন্য সাম্যকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।