মাছও এখন গাছে ওঠে

❑ সাম্য রাইয়ান 

মানুষের আদিমতম স্বপ্ন বোধহয় এটাই, সে সব জানবে, সর্ববিশারদ হয়ে উঠবে। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে যে বিশাল ফারাক, সেটা আমরা ভুলে গেছি। ফলে এমন এক সমাজ নির্মিত হয়েছে, যেখানে একটা মাছকে গাছে উঠে বিশ্বাস করাতে হয় সে একটা মাছ৷ ছাগলকে সাঁতার কেটে বিশ্বাস করাতে হয় সে ছাগল৷ আর এজন্যই মনুষ্য প্রজাতির মধ্যে ছাগল ক্যাটাগরির অংশকে দেখবেন সাঁতার কেটে চলেছে৷ 

সক্রেটিসের নাম সবাই জানে। কেন জানে? লোকটা বলেছিল আমি কিছু জানি না। এই একটা বাক্য বলেই দুই হাজার বছর ধরে টিকে আছে। এখন কেউ যদি বলে আমি কিছু জানি না, তাকে আমরা আনফলো করি। আর বিশেষজ্ঞ হিসেবে গ্রহণ করি সেই লোককে, যে স-ব জানে। অন্তত দাবি করে।

আমার এক পরিচিত লোক আছে। সকালে সমাজ-সংসার নিয়ে পোস্ট দেয়। দুপুরে ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্লেষণ করে। বিকেলে রবীন্দ্রনাথের কাব্যদর্শন। রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি। মাঝে মাঝে ভাবি, মানুষটা ঘুমায় কখন? তারপর বুঝলাম, ঘুমানোর দরকার নেই। কারণ জ্ঞান অর্জনের জন্য এখন আর সময় লাগে না। একটা ইউটিউব পিনিকই যথেষ্ট।

আগে বিদ্যা অর্জন করতে হতো। এখন ডাউনলোড করা যায়।

সমস্যা শুরু হয় যখন এই আত্মবিশ্বাস বাস্তব জগতে ঢুকে পড়ে। আড্ডায় সীমাবদ্ধ থাকলে ক্ষতি কম ছিল। এখন সাহিত্য পুরস্কারের বিচারক হয়। কমিটির সদস্য হয়। সিদ্ধান্ত নেয়। গল্প কী, কবিতা কী, শিল্প কী তা নির্ধারণ করে।

একজন লোক সারা জীবন ব্যাংকের লোন হিসাব করেছে। হঠাৎ দেখবেন সে কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। এমন ভঙ্গি, যেন জীবনানন্দ মারা যাওয়ার আগে উইল করে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।

আমি ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে না। ব্যাংকার ব্যাংক বুঝুক। কবি কবিতা বুঝুক।

সমস্যা হলো আমরা ভাবি, এক জায়গায় সফল হলেই সব জায়গায় সফল। একটা বড় ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন? অভিনন্দন। কিন্তু তাই বলে আপনি বোর্হেস বুঝবেন, এমন কোনো কথা নেই।

ধরুন একজন খুব ভালো ডাক্তার। ভয়ংকর ভালো। তার কাছে গেলে মানুষ সুস্থ হয়ে বের হয়। কিন্তু যদি উনি একদিন এসে আমাকে বলেন, বাঙলা কবিতার সংকট আসলে উত্তর-উপনিবেশবাদী পাঠের সংকট, আমি আঁতকে উঠব।

হার্ট অপারেশন করতে গিয়ে দেখলেন সার্জনের জায়গায় বসে আছেন স্থানীয় সাহিত্য সংসদের সভাপতি। বললেন, অস্ত্রোপচার আমি করিনি ঠিকই, তবে মানুষের হৃদয় নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছি।

আপনি সঙ্গে সঙ্গে পালাবেন। কিন্তু সাহিত্যে আমরা ঠিক এই কাজটাই প্রতিদিন করি। যে দশটা গল্পও পড়েনি, সে হয় গল্পের বিচারক।

যে কবিতা পড়ার চেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছে নিজের পরিচয়পত্রে পদবি যোগ করতে, সে কবিতার মান নির্ধারণ করছে।

আর আশ্চর্যের ব্যাপার, সবাই সেটা মেনে নিচ্ছে।

কারণ আমাদের সমাজে পদমর্যাদা আর প্রজ্ঞা এক জিনিশ।

এটা ভয়ংকর ভুল। বড় অফিস মানেই বড় মস্তিষ্ক না। বড় গাড়ি মানেই বড় চিন্তা না।

অনেক সময় বড় চেয়ার শুধুই বড় চেয়ার। চেয়ারকে আমরা জ্ঞান ভেবে ফেলি। যে কারণে একজন লোক কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হলেই মনে করি তিনি সাহিত্য, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহাকাশ গবেষণা সম্পর্কেও সমান দক্ষ।

পৃথিবীতে অজ্ঞতার আত্মবিশ্বাস সবসময় জ্ঞানের আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বেশি। দস্তয়েভস্কি পড়া কঠিন। কিন্তু ইদানিং দস্তয়েভস্কি সম্পর্কে মতামত দেওয়া খুব সহজ।

মার্ক্স পড়া কঠিন। মার্ক্সের নাম নিয়ে পলিটিক্স করা সহজ। কবিতা লেখা কঠিন। কবিতা বাতিল ঘোষণা করা সহজ। এবং সহজ জিনিশ মানুষ পছন্দ করে।

সোশ্যাল মিডিয়া এই প্রবণতাকে আরো মারাত্মক করে তুলেছে। এখন সবাই নিজের মোবাইল ফোনের ভেতর একটা ছোট্ট আদালত নিয়ে ঘোরে। সত্যি বলতে কী, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের হাতে এক বিরাট মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিয়েছে। মতামত আগে থেকেই ছিল। এখন শুধু শব্দ বেড়েছে। 

একবার ইউটিউবে দেখলাম, আরজ আলী মাতুব্বরের বিরুদ্ধে এক লোক বলল, আমি তাকে পড়িনি, তবে তার বই সম্পর্কে আমার তীব্র বিরোধীতা আছে। এগুলো জঘন্য৷

আমি বললাম, বাহ। সভ্যতা অনেক দূর এগিয়েছে। আগে মানুষ বই পড়ে মতামত দিত। এখন মতামত দিয়ে বই পড়া এড়ায়। জ্ঞান আর মতামতের মধ্যে পার্থক্য ছিল একসময়। এখন দুটোকে এক জিনিশ ধরা হয়।

এটা অনেকটা প্রেম আর বিয়েকে এক জিনিস ভাবার মতো ভুল। সম্পর্ক আছে। কিন্তু এক নয়।

আমার পৃথিবীর সব বিষয়ে মতামত থাকতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর সব বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হবে কেন? এই সাধারণ সত্যটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

ফলে সবাই বিশেষজ্ঞ। সবাই শিক্ষক। সবাই বিচারক। শুধু শিক্ষানবিশ কেউ না। ছাত্র কেউ না। শ্রোতা কেউ না। আর এখানেই আসল বিপদ।

কারণ সভ্যতা এই বক্তাদের দ্বারা এগোয় না। সভ্যতা এগোয় তাদের দ্বারা, যারা বলে, হতে পারে আমি ভুল তবু পরীক্ষা করা দরকার।

এই বাক্যটা বলার মতো লোক আজকাল বিরল। কিন্তু এটাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। ভুল হওয়া নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। আমাদের আপত্তি ধরা পড়ে যাওয়ায়। এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।

একজন মানুষ সারাজীবন নিজের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকে। অন্যায় করলে প্রথম কাজ কী? যুক্তি বানানো। পৃথিবীর ইতিহাসে যত অপরাধ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে অপরাধের ব্যাখ্যা। 

এক লোক প্রেমিকাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বলবে, ভালোবাসি বলে করছি। বাবা ছেলেকে নিজের ইচ্ছামতো চালাতে চায়। বলবে, ভবিষ্যতের জন্য করছি। সরকার নজরদারি করছে। বলবে, নিরাপত্তার জন্য করছি। একজন সেন্সর বই নিষিদ্ধ করছে। বলবে, সংস্কৃতি রক্ষার জন্য করছি।

কেউ বলবে না, আমি ক্ষমতা ভালোবাসি। কেউ বলবে না, আমি নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। মানুষ নিজের কাছে এতটাও সৎ না।

এই কারণেই ন্যায়বোধ ব্যাপারটাকে আমার ভয় করে। অন্যায়বোধ না। ন্যায়বোধ। কারণ পৃথিবীর বড় বড় বিপর্যয় সাধারণত খলনায়কদের দ্বারা হয়নি। হয়েছে এমন লোকদের দ্বারা, যারা বিশ্বাস করত তারা ঠিক। একমাত্র তারাই ঠিক৷ বাকিসব ভুল৷

ধর্মযুদ্ধের সৈনিক সকালে উঠে ভাবেনি, আজ একটু বর্বরতা করা যাক। উপনিবেশবাদীরা ভাবেনি, আজ কয়েকটা দেশ লুট করি। তারা ভেবেছে, আমরা সভ্যতা নিয়ে যাচ্ছি। মানুষ যখন নিজের স্বার্থে অন্যায় করে, তখন তাকে থামানো সহজ। কিন্তু যখন সে নৈতিকতার নামে অন্যায় করে, তখন সে প্রায় অপ্রতিরোধ্য।

ফেসবুক এই প্রবণতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখন প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একজন প্রসিকিউটর বাস করে। সকালে উঠে চার্জশিট। দুপুরে বিচার। বিকেলে রায়। রাতে ফাঁসি।

এবং পুরো প্রক্রিয়াটার অত্যাশ্চর্য দিক হলো, কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণের প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো অভিযোগটাই প্রমাণ।

আমি প্রায়ই ভাবি, পৃথিবীতে বিচারকের সংখ্যা এত বাড়ল কীভাবে! শৈশবে তো এত দেখিনি। আগে বিচারক হতে গেলে কিছু যোগ্যতা লাগত। এখন ওয়াই-ফাই থাকলেই হয়।

কেউ একটা বই লিখেছে। বইটা পড়িনি। কিন্তু মতামত আছে।

কেউ একটা সিনেমা বানিয়েছে। দেখিনি। কিন্তু অবস্থান আছে।

কেউ একটা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছে। শুনিনি। কিন্তু রাগ আছে।

রাগ এখন জ্ঞানের বিকল্প মুদ্রা। যার রাগ বেশি, তার বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি। এবং সোশ্যাল মিডিয়া সেই মুদ্রার কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আমি মনযোগ দিয়ে ফেসবুকের কমেন্ট সেকশন পড়ি। খুব শিক্ষণীয়। একজন লিখেছে, ‘বিষয়টা আমি জানি না, তবে...’ তারপর তিনশো শব্দ।

মানুষের আত্মবিশ্বাস সত্যিই বিস্ময়কর। এই আত্মবিশ্বাসের একটা নামও আছে। মনোবিজ্ঞানের ছাত্ররা জানে। যারা কম জানে, তারা প্রায়ই বেশি নিশ্চিত থাকে। আর যারা বেশি জানে, তারা সন্দেহে ভোগে। কারণ জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে। অজ্ঞতা করে উদ্ধত।

চিন্তা করাটা আমাদের কাছে জটিলতা, যা আমরা পছন্দ করি না। বরং পরিষ্কার উত্তর চাই। কে ভালো? কে খারাপ? কে দেশপ্রেমিক? কে বিশ্বাসঘাতক? কে কবি? কে ভণ্ড? সবকিছুর দ্রুত সমাধান চাই। ফাস্টফুডের যুগে ফাস্ট-জাজমেন্ট।

কিন্তু মানুষ ফ্রেঞ্চফ্রাই না। মানুষ জটিল। তলস্তয় বলেছিলেন, মানুষকে কেবল ভালো বা মন্দের ছকে ফেলে বিবেচনা করা যায় না৷

একজন ভালো কবি খারাপ স্বামী হতে পারে। একজন অসাধারণ শিক্ষক ভয়ংকর বাবা হতে পারে। একজন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ ভালো ক্রিকেটার পারে।

এই কথাগুলো মানুষ শুনতে চায় না। কারণ এতে গল্প নষ্ট হয়। আমরা গল্প ভালোবাসি। বাস্তবতা না। বাস্তবতা সবসময় গল্পের চেয়ে এলোমেলো। রাজনীতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বিরোধী দলে থাকলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি বিষয়। ক্ষমতায় গেলে জাতীয় নিরাপত্তা বেশি জরুরি হয়ে যায়। একই মানুষ। একই মুখ। একই কণ্ঠস্বর। শুধু চেয়ার বদলেছে। মতাদর্শ না, অনেক সময় এই সামান্য ফার্নিচারটাই মানুষকে বদলে দেয়। এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না।

চেয়ার একটা দার্শনিক বস্তু। একবার বসে দেখুন। পৃথিবী অন্যরকম লাগবে। আমি বহু সাহিত্যিককেও দেখেছি। পুরস্কার পাওয়ার আগে বিচারকদের গাল দিচ্ছে। পুরস্কার পাওয়ার পর বিচারব্যবস্থার প্রতি গভীর আস্থা জন্মেছে।

মানুষ খুব সুবিধার প্রাণী না। মানুষ সুবিধাবাদী প্রাণী। আমি নিজেও। আপনিও। সবাই। এই স্বীকারোক্তিটা জরুরি। কারণ যে মুহূর্তে আমি ভাবতে শুরু করি আমি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, সেই মুহূর্তেই আমি সবচেয়ে বিপজ্জনক।

সক্রেটিসের একটা সুবিধা ছিল। তিনি জানতেন, তিনি জানেন না। আমাদের অসুবিধা হলো আমরা জানি না যে আমরা জানি না।