❑ সাম্য রাইয়ান
অসমাপ্ত বর্ষামুখর দিন। পুরনো ছাতার স্মৃতিরা একে একে ভীড় করে এই ঋতুর ধারে। বৃত্তাকার চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। এইবার ছিলো ডোরাকাটা, লাল-শাদা ছাতা, গৃহস্থ করেছি তাকে বামালসমেত। হারাবে কোথায়, কোন গৃহপাশে! জ্যান্ত আসামি ধরে গুম করে দেব পুলিশের মতো। আটকা পড়ে যাবে দুরূহ শোকবার্তায়। একে একে অজস্র দুপুর পেরিয়ে জমা হবে মকরবাগানে। খুঁজে পাবে সেলাইমেশিন, আবর্জনা ঘেটে। বাড়ি ফিরো আপন উদ্যমে, কেউ তোমাকে ডাকতে আসবে না। প্রবীন পঙ্গপাল কিংবা মৃত শিশুদের অমরত্ব নেই। চলে যাও সুসংবাদ পেরিয়ে শ্রাবণের মাঠে।(হালকা রোদের দুপুর ১৩ / সাম্য রাইয়ান)
বর্ষাকাল এলে মানুষ, গাছ, রাস্তা, টিনের চাল, পুরনো বাজার এমনকি ভাঙা সেতুও স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ে। বছরের অন্য সময়ে যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাঁটি, বৃষ্টি নামলে সেই রাস্তাটাই আর আগের মতো থাকে না। তারও আছে এক গোপন জীবন। বহুদিন যে কথাগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, জলের ঝাপটায় সেগুলো ভেসে ওঠে। আমাদের স্মৃতিও একইরকম৷ বছরের অধিকাংশ সময় বাক্সবন্দী, বৃষ্টি ফোঁটা পড়তেই ফুলে ওঠে। তখন হঠাৎ মনে পড়ে ছেলেবেলার স্কুলের কথা, গওহর পার্ক মাঠ দিয়ে বাড়ি ফেরা, ভেজা ব্যাগ আর স্কুলড্রেস, এমনকি সেইসব মানুষকে, দীর্ঘদিন যাদের ভুলে আছি।
আর মনে পড়ে প্রাক্তন ছাতাগুলোর কথা। আমার জীবনে যত ছাতা এসেছে, তাদের প্রায় সবাই নিখোঁজ হয়েছে। কোনো ছাতার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তারা সবাই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়েছে। কেবল সর্বশেষ লাল-শাদা ছাতাটি— যা আমি কিনিনি, মোকলেছ ভাই উপহার দিয়েছেন, ওইটি আশ্চর্যজনকভাবে রয়ে গেছে৷ মানুষের সবচেয়ে অবিশ্বস্ত সম্পদের নাম ছাতা। সে কখনো দীর্ঘদিন আপনার সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেবে না। বাসে, দোকানে, বইমেলায়, বন্ধুর বাড়িতে, হাসপাতালের বারান্দায়, যেখানেই সুযোগ পাবে, আপনার সঙ্গ ত্যাগ করবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হারানো ছাতার জন্য মানুষের যে কষ্ট হয়, হারানো অনেক সম্পর্কের জন্যও তা হয় না। কখনো কখনো সম্পর্ক হারানোর পেছনে যুক্তি থাকলেও, ছাতা হারানোটা পুরোপুরি যুক্তিহীন। এক বিকেলে আপনার হাতে ছিল, পরের বিকেলে নেই। ছাতারা আসলে পরিযায়ী পাখির আত্মীয়। নির্দিষ্ট ঋতুতে অন্য মানুষের জীবনে চলে যায়। আমরা শুধু মালিকানা দাবি করি, কিন্তু ছাতার নিজেরও তো ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকতে পারে, নাকি? অথচ সেই বিষয়ে আমরা চিন্তাহীন!
এইসব ছাতার মাথা ভাবতে ভাবতে খিচুরির কথা মনে এলো! এক বৃষ্টির দিনে আমি বোম্বাই মরিচের তীব্র আচারযোগে খিচুরী খেয়েছিলাম! সেই আমার বোম্বাই মরিচের সাথে প্রেম! তবে খিচুরীর সাথে প্রেমটা অনেক পুরনো৷ বৃষ্টির দিনে খিচুরী খাওয়ার ব্যাপারে বাঙালির একটা আলাদা জাতীয়তা আছে। এই জাতীয়তাবাদের কোনো ঘোষণাপত্র নেই, পতাকা নেই, সেনাবাহিনীও নেই। তবু বাঙলাদেশের লাখো মানুষ বর্ষার দুপুরে অঘোষিতভাবে এই জাতীয়তাবাদের অংশ হয়ে যায়। তারপর জানালার পাশে বসে থাকা, কিংবা জমিয়ে গল্প করা, সিনেমা দেখা। বাইরে বৃষ্টি। টিনের উপর অবিরাম শব্দ।
ইদানিং অবশ্য একটা সমস্যা হয়েছে৷ বজ্রপাত৷ সে যে অতীতে হতো না তা নয়, তবে এত ব্যাপক পরিসরে না৷ শৈশবে বজ্রপাতকে আমি অলৌকিক কিছু ভাবতাম। এখন জানি, এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। তবু ভয় কমে নি। বরং বেড়েছে। কারণ এখন আমি জানি মানুষ কত সহজে মারা যায়। খবরের কাগজে প্রায়ই দেখি, মাঠে কাজ করতে গিয়ে কেউ মারা গেছে, মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছে, গরু আনতে গিয়ে মারা গেছে। একটা আলোর রেখা আকাশ থেকে নেমে এলো, তারপর একজন মানুষ আদমশুমারির খাতা থেকে বাদ পড়ে গেল৷ কী ভয়ংকর!
এই ভয়টা আমি লুকিয়ে রাখি। বজ্রপাত শুরু হলে বুকের ভেতর অস্বস্তি তৈরি হয়। মনে হয়, আকাশের বিশাল আদালত আজ কাউকে দণ্ড দেবে। সেই দণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের নাম আমরা জানি না। সে হয়তো এই মুহূর্তে কোনো গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো ভাবছে, বৃষ্টি থামলে বাড়ি ফিরবে। হয়তো সন্তানের জন্য বাজার থেকে বিস্কুট কিনে নিয়ে যাবে। কিন্তু আকাশের কাছে তার পরিকল্পনা মূল্যহীন।
মানুষের মৃত্যুর কথা বর্ষাকালে বেশি মনে পড়ে। কারণ শুরুতেই লিখেছি, বর্ষার স্মৃতিমেদুরতার কথা৷ বৃষ্টি সবকিছুকে সাময়িকভাবে মুছে দেয়। রাস্তার ধুলো মুছে যায়। দেয়ালের পোস্টার মুছে যায়। উঠানের পায়ের ছাপ মুছে যায়। মানুষও কি এভাবেই মুছে যাবে? ধীরে ধীরে নামটা ঝাপসা হয়ে যাবে। আমরা যাদের হারিয়েছি, তাদের অধিকাংশের নামই একসময় ভুলে যাব। যেমন ভুলে গেছি শৈশবের শত শত বিকেল, হাজার বৃষ্টির শব্দ। শুধু রয়ে গেছে কিছু দৃশ্য। একটি ছাতা। একটি টিনের চাল। মুড়ি-চানাচুর মাখা হাত। দূরের বজ্রপাত। অকারণ বিষণ্নতা।
স্মৃতি খুব দুর্বল জিনিশ। একসময় প্রিয় মুখগুলোও আবছা হয়ে যায়। মৃত মানুষের কণ্ঠস্বর ভুলে যাই। হাঁটার ভঙ্গি ভুলে যাই। এমনকি হাসিটাও। শুধু কয়েকটা অস্পষ্ট দৃশ্য রয়ে যায়। মৃত্যু নিয়ে অনেক রোম্যান্টিসিজম থাকলেও প্রকৃত প্রস্তাবে, অধিকাংশ মৃত্যুই খুব সাধারণ। মানুষ বাজারে যেতে গিয়ে মারা যায়। ধান কাটতে গিয়ে মারা যায়। ঘুমাতে গিয়ে মারা যায়। বৃষ্টির দিনে গরুর রশি ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও মারা যায়। সংবাদপত্রে তিন লাইনের খবর হয়। পরদিন আর কেউ মনে রাখে না।
আজ দুপুরেও বৃষ্টি হয়েছিল। আমি জানালার পাশে বসে ছিলাম। সামনে মুড়ি-চানাচুর। দরোজার পাশে একটা নতুন ছাতা। যার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমি আস্থাহীন। হয়তো সে-ও একদিন হারিয়ে যাবে। কোনো বাসের সিটে বা ওষুধের দোকানে, কিংবা কোনো বইয়ের স্তূপের পাশে। পৃথিবীতে আমরা সবাই হারিয়ে যাওয়া ছাতার মতো। কিছুদিন কারো হাতে থাকি, তারপর একদিন অদৃশ্য হয়ে যাই। কেউ আমাদের খুঁজে বেড়ায়, কেউ আর খোঁজে না। কিছু স্মৃতি কয়েকদিন টিকে থাকে।
শুধু বর্ষা রয়ে যায়। বছর শেষে আবার ফিরে আসে। নতুন মানুষের মাথার উপর নতুন ছাতা খুলে যায়। নতুন শিশুরা মুড়ি-চানাচুর মেখে খায়। নতুন কেউ বজ্রপাতকে ভয় পায়। নতুন কেউ মারা যায়।
আর শ্রাবণের বিকেলগুলো, পুরনো হিসাবরক্ষকের মতো, সবকিছু লিখে রাখে। কোনো পুনর্বিবেচনা নেই। শুধু জল, স্মৃতি, ভয় এবং মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবন একের পর এক জমা হতে থাকে বৃষ্টিভেজা পৃথিবীর বিশাল নথিপত্রে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আকাশ আবার কালো হচ্ছে। মনে হচ্ছে আজও বৃষ্টি হবে। হয়তো কোথাও কোনো ছাতা হারাবে। কোথাও কোনো মানুষ প্রেমে পড়বে। কোথাও কোনো মানুষ মারা যাবে। কোথাও কোনো শিশু জানালার গরাদ ধরে বৃষ্টি দেখবে। আর আমি জানালার পাশে বসে ভাববো বহুদিন আগের কোনো বিকেলের স্মৃতি। যে বিকেল এখনও আমার ভেতরে বেঁচে আছে, শ্রাবণের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে, ভেজা তুলি হাতে…।
