তরুণ ঘোষ ও বাঙলাদেশের দৃশ্যবোধের সংকট

❑ সাম্য রাইয়ান 

শিল্প নির্দেশককে আমরা সাধারণত সিনেমার পেছনের মানুষ বলে জানি। দর্শক হলে বসে নায়কের সংলাপ মনে রাখে, পরিচালকের নাম মনে রাখে, কখনো কখনো ক্যামেরাম্যানের কাজও আলাদা করে চোখে পড়ে; কিন্তু যে-মানুষটি পুরো চলচ্চিত্রের দৃশ্যমান পৃথিবী নির্মাণ করেন, দেয়ালের রং থেকে দরজার ক্ষয়, কুয়াশার ঘনত্ব থেকে চরিত্রের বসার চেয়ার পর্যন্ত; তাঁর নাম অধিকাংশ সময়ে দর্শকের স্মৃতিতে থাকে না। অথচ সিনেমা মূলত দৃশ্যের শিল্প। আর দৃশ্যের স্থপতি হচ্ছেন শিল্প নির্দেশক। বাঙলাদেশের চলচ্চিত্রে এই পর্দার আড়ালের মৌলিক কাজটি যাঁরা গভীর নিষ্ঠায় করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তরুণ ঘোষ।

তাঁর মৃত্যুসংবাদ শোনার পর আমি ভাবছিলাম, তিনি কেমনভাবে বেঁচে ছিলেন! কিংবা আরেকটু এগিয়ে যদি চিন্তা করি, বাঙলাদেশের মতো সাংস্কৃতিকভাবে খর্বায়িত সমাজে একজন শিল্প নির্দেশক আসলে কীভাবে বেঁচে থাকেন? কারণ শিল্প নির্দেশকের কাজ কেবল সাজসজ্জা নয়; তিনি একটি সময়, শ্রেণি, মানসিকতা, এমনকি সভ্যতারও দৃশ্যমান ভাষা নির্মাণ করেন। ফলে সমাজ যদি নিজেই কদর্যতার দিকে ঝুঁকে পড়ে, যদি মানুষের রুচি সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায় টিকটকীয় উত্তেজনা ও সস্তা আবেগে, তাহলে শিল্প নির্দেশকের কাজও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। তিনি বাধ্য হন নিজের কল্পনার উচ্চতা কমিয়ে আনতে। এটিই সাংস্কৃতিক ডোয়ার্ফিজমের নির্মম রূপ।

প্রকৃতিতে যেমন বিশাল প্রাণীরা খাদ্যের অভাবে ছোট হয়ে যায়, তেমনি শিল্পীরাও সাংস্কৃতিক রসদের অভাবে খর্ব হয়ে পড়েন। একজন বড় মাপের শিল্প নির্দেশকের জন্য দরকার হয় সেই মাপের দর্শক, গভীর চলচ্চিত্রবোধ, রঙ ও স্থাপত্য সম্পর্কে সচেতনতা, ইতিহাস ও লোকজ উপাদানের প্রতি সংবেদনশীলতা। কিন্তু যে-সমাজে সিনেমা বলতে মানুষ বোঝে ইউটিউব কনটেন্ট, সেখানে শিল্প নির্দেশনার সূক্ষ্মতা টিকে থাকা কঠিন। শিল্প তখন বাস্তবের অন্তর্লোক নির্মাণের পরিবর্তে হয়ে ওঠে প্লাস্টিকের সাজসজ্জা—প্রাণহীন প্রতিকৃতি।

এই প্রেক্ষাপটে তরুণ ঘোষকে দেখলে বোঝা যায়, তিনি মূলত এক বিলুপ্তপ্রায় শিল্পবোধের প্রতিনিধি। তাঁর কাজের দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি সিনেমাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ভিজ্যুয়াল সভ্যতা হিসেবে কল্পনা করতেন। তাঁর শিল্প নির্দেশনায় স্পেস কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। ঘর, নদী, উঠান, কাঠের দরজা, পাটখড়ির বেড়া—সবকিছু চরিত্রের মতো আচরণ করে। এ কারণেই তাঁর শিল্প নির্দেশিত চলচ্চিত্রগুলোতে লোকেশন হয়ে ওঠে কাহিনিরই সক্রিয় অংশ।

বাঙলাদেশে শিল্প নির্দেশনার সংকটের অন্যতম কারণ হলো এখানে বাস্তবকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে নকলকে বাস্তবের চেয়ে বেশি ভালোবাসা হয়। বিয়ের মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক পোস্টার পর্যন্ত সবকিছুতেই আছে অতিরঞ্জনের অসুস্থ প্রবণতা। ফলে সিনেমাতেও বাস্তবের ক্ষয়, মলিনতা, ধুলা, অন্ধকার গায়েব হয়ে যায়। মানুষ চায় চকচকে মিথ্যা। অথচ শিল্প নির্দেশকের প্রধান কাজই হলো দৃশ্যমান সত্য তৈরি করা। তরুণ ঘোষ এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি কৃত্রিমতার বদলে পরিবেশের ভেতরের জীবনটিকে ধরতে চেয়েছেন।

কিত্তনখোলা চলচ্চিত্রে তাঁর শিল্প নির্দেশনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। যেখানে তিনি একটি মৃতপ্রায় ভূগোলের আত্মাকেই যেন সেট দিয়ে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। এ চলচ্চিত্রে ক্লান্ত বাঙলার দীর্ঘশ্বাসের মতো নদী বয়ে চলে। ঘরগুলোকে দেখে মনে হয়, সেগুলো মনুষ্য নির্মিত নয়; বরং বৃষ্টি, দারিদ্র্য, অপেক্ষা ও সময় মিলে ধীরে ধীরে জন্ম দিয়েছে। দেয়ালের ক্ষয়, কাঠের কালচে রং, ভেজা বাতাশ, আধোঅন্ধকার উঠান—সবকিছু মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি এক আর্দ্র দৃশ্যভাষা তৈরি করে। এই ধরনের পরিবেশ নির্মাণ কেবল কারিগরি দক্ষতার ব্যাপার নয়। এর জন্য দরকার ভূগোলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষের মনস্তত্ব বোঝার ক্ষমতা। তরুণ ঘোষ বুঝতেন, বাঙলার নদী মানে ক্ষয়, ভাঙন, অপেক্ষা, নির্বাসনের দীর্ঘ গল্প। তাই তাঁর নির্মিত দৃশ্যগুলোকে বাস্তবের কপি মনে হয় না, মনে হয় বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো জীবনের পুনরাবির্ভাব।

এখানেই তরুণ ঘোষ বাঙলাদেশের মূলধারার তথাকথিত ‘গ্ল্যামারাস’ শিল্প নির্দেশকদের থেকে আলাদা। কারণ তিনি দৃশ্যকে অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেননি। দৃশ্য হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতার প্রতিরূপ। তিনি জানতেন, বাঙলাদেশের গ্রামের দেয়াল কখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়; পুরনো কাঠের জানালায় সময়ের ক্ষত জমে থাকে; নদীর ধারে থাকা ঘরের বাতাশ শহুরে বাতাশের মতো নয়। এই সূক্ষ্ম বোধ না থাকলে শিল্প নির্দেশনা কেবল স্টুডিও-সাজে পর্যবসিত হয়।

বাঙলাদেশে এখন চলচ্চিত্রের বড় সংকট গল্পের নয়, দৃশ্যবোধের। এখানে অধিকাংশ নির্মাতা ফ্রেমকে চিন্তা করেন না। তাঁরা ভাবেন সংলাপই সিনেমা। ফলে শিল্প নির্দেশকও ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারান। যাঁরা শিল্প নির্দেশনা করেন, তাঁদের কাজকে প্রায়ই বিয়েবাড়ির ডেকোরেশনের মতো দেখা হয়। অথচ সত্যিকারের শিল্প নির্দেশনা হলো নৃতত্ত্ব, স্থাপত্য, ইতিহাস, রঙতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বের সম্মিলিত শিল্প। তরুণ ঘোষের কাজের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই জটিলতাকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।

আমাদের সমাজে আজ যে-সাংস্কৃতিক জাইগান্টিজম দেখা যাচ্ছে, সেটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। প্রকৃতিতে যেমন ছোট প্রাণী খাদ্যের প্রাচুর্যে দানবাকৃতি ধারণ করে, তেমনি বাঙলাদেশেও নিম্নমানের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সস্তা কৌতুক, উত্তেজনামূলক ভিডিও, মুখস্থ মোটিভেশন, ধর্মীয় অভিনয়—এসব বিশালাকার সাংস্কৃতিক প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনার মতো সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ এগুলোর জন্য গভীর মনোনিবেশ দরকার, রুচি দরকার। আর এই সমাজ এখন মনোযোগের বদলে চায় তাৎক্ষণিক উত্তেজনা।

তরুণ ঘোষের মতো শিল্পীরা তাই এক ধরনের সাংস্কৃতিক নির্বাসনে জীবন কাটান। তাঁরা কাজ করেন, কিন্তু সমাজ তাঁদের ভাষা পুরোপুরি বোঝে না। যেমন একজন প্রকৃত কবিকে ফেসবুকের লাইক/কমেন্ট দিয়ে বিচার করা যায় না, তেমনি একজন শিল্প নির্দেশকের কাজও বক্স অফিসের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। তাঁর সাফল্য লুকিয়ে থাকে দর্শকের অচেতন অনুভূতিতে। দর্শক হয়তো বুঝতেই পারে না কেন একটি দৃশ্য এত জীবন্ত লাগছে, কেন একটি ঘর এত বাস্তব মনে হচ্ছে। সেই অদৃশ্য বাস্তবতার স্থপতি আসলে শিল্প নির্দেশক।

বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্মৃতিহীনতা। আমরা শিল্পীদের কাজ ব্যবহার করি, কিন্তু তাঁদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করি না। ফলে শিল্প নির্দেশকের মতো পর্দার পেছনের শিল্পীরা দ্রুত বিস্মৃত হন। আমাদের এখানে নায়কের জন্মদিন উদযাপিত হয়, কিন্তু শিল্প নির্দেশকের নামই মানুষ জানে না। কারণ আমরা দৃশ্যের অন্তরালের শ্রম দেখতে শিখিনি। কিংবা বলা ভালো, আমাদের শেখানোই হয়নি৷ এই অদেখা শ্রমের সংস্কৃতি আসলে উপনিবেশিক মানসিকতারও ফল। আমরা শুধু ফলটুকু দেখি, তার নির্মাণ প্রক্রিয়াকে দেখি না।

তরুণ ঘোষের চলচ্চিত্র দৃশ্যগুলোতে বস্তু কখনো নিষ্প্রাণ নয়। যেমন ধরুন, একটি ভাঙা নৌকা, একটি পুরনো হারিকেন বা একটি ছেঁড়া মশারিও অর্থ বহন করে। এই বস্তুতত্ত্বের ভেতর দিয়েই তিনি চরিত্রের সামাজিক অবস্থান, মানসিক অবস্থা, এমনকি ঐতিহাসিক সময়ও ফুটিয়ে তুলেছেন। বড় শিল্প নির্দেশকের বৈশিষ্ট্য এইই যে, তিনি সংলাপ ছাড়াই সমাজকে দৃশ্যমান করে তুলতে পারেন।

বর্তমান বাঙলাদেশের অধিকাংশ চলচ্চিত্রে যে-অসুস্থ রঙের ব্যবহার দেখা যায়, তাকে কী বলবো? কালচারাল ডোয়ার্ফিজমের লক্ষণ? বাস্তবের রংকে আমরা আর সহ্য করতে পারছি না, সবকিছুতে মাত্রাতিরিক্ত ব্রাইটনেস চাইছি। ফলে চলচ্চিত্রের দৃশ্যের সাথে শোরুমের বিজ্ঞাপনের পার্থক্য থাকছে না। এই প্রবণতা শুধু চলচ্চিত্রকে নয়, মানুষের অনুভূতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কারণ মানুষ যখন ক্রমাগত কৃত্রিম দৃশ্য দেখে, তখন বাস্তবের সূক্ষ্ম সৌন্দর্য অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তরুণ ঘোষের কাজ এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর দৃশ্যের রং ছিল জীবনেরই রং, যা মোটেই অতিরঞ্জিত নয়।

বাঙলাদেশে শিল্প নির্দেশনার সংকটকে আলাদা করে দেখা ভুল হবে। এটি আসলে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংকটের অংশ। যে-সমাজ বই পড়ে না, ইতিহাস বোঝে না, স্থাপত্য নিয়ে ভাবে না, সেখানে শিল্প নির্দেশনার মতো জটিল শিল্পচর্চা টিকে থাকা কঠিন। কারণ শিল্প নির্দেশককে একইসাথে লোকজ সংস্কৃতি, শহুরে স্থাপত্য, রাজনৈতিক ইতিহাস, এমনকি মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসও বুঝতে হয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কল্পনাশক্তিহীন পরীক্ষার যন্ত্রে পরিণত করছে। ফলে সিনেমার দৃশ্যমান জগতও ক্রমে দরিদ্র হয়ে পড়ছে।

এক সময় ইউরোপীয় সিনেমায় শিল্প নির্দেশকরা প্রায় দার্শনিকের মর্যাদা পেতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, মানুষ তার প্রতিবেশ দ্বারা গঠিত। একটি সমাজের ঘরবাড়ি, রাস্তা, বাজার, পাঠাগার—এসব তার মানসিকতার প্রতিফলন। তরুণ ঘোষের কাজেও এই উপলব্ধির ছাপ দেখা যায়। তাঁর নির্মিত দৃশ্যগুলোতে পানি, কাঠ, কাদামাটি, বাতাশ—এসব উপাদান বারবার ফিরে আসে। কেননা এদেশের মানুষের চেতনার ওপর গভীর প্রভাব রয়েছে আমাদের নদীমাতৃক ভূগোলের৷

আজকের বাঙলাদেশে যদি অ্যারিস্টটল জন্মাতেন, তাঁকে হয়তো টেলিভিশনের টকশোতে চিৎকার করতে হতো। বার্ট্রান্ড রাসেলকে দেখা যেতো ইউটিউব শর্টসে ‘সফল হওয়ার সহজ উপায়’ বলতে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে হয়তো সাহিত্য উৎসবের স্পন্সর খুঁজে বেড়াতে হতো। এই সমাজে গভীর সাংস্কৃতিক বোধ ক্রমেই উধাও হচ্ছে। তরুণ ঘোষের মতো শিল্পীরা সেই হারিয়ে যেতে থাকা শিল্পবোধের শেষ সাক্ষী।

তাঁর কাজ নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া উচিত ছিল। চলচ্চিত্র শিক্ষায় তাঁর শিল্প নির্দেশনার উদাহরণ পড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু বাঙলাদেশে দৃশ্যমান সংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক দিক নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক নির্মাতা জানেই না শিল্প নির্দেশক আসলে কী করেন! তাদের ধারনা, কয়েকটি পুরনো আসবাব রাখলেই পিরিয়ড ফিল্ম তৈরি হয়ে যায়।

তরুণ ঘোষের গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি দৃশ্যের ভেতরে সময়কে বন্দী করতে পারতেন। তাঁর নির্মিত পরিবেশে চরিত্র হাঁটলে মনে হয়, সেই জায়গার নিজস্ব ইতিহাস আছে। দেয়ালের ক্ষয় যেন বহু বছরের বৃষ্টি দেখেছে। কাঠের টেবিল যেন বহু মানুষের হাতের স্পর্শ বহন করছে। এই অনুভূতি তৈরি করা খুব কঠিন। কারণ এর জন্য শিল্প নির্দেশককে মানুষের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

আজকের অ্যালগরিদমিক পৃথিবীতে শিল্প নির্দেশকের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ এখন দৃশ্য ক্ষণস্থায়ী। মানুষ কয়েক সেকেন্ডের বেশি কোনো ফ্রেমে চোখ রাখে না। ফলে দৃশ্যের গভীরতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তরুণ ঘোষের কাজের দিকে তাকালে বোঝা যায়, একটি দরজা, একটি ছায়া কিংবা একটি নদীর তীরও মানুষের অন্তর্লোক স্পর্শ করতে পারে, যদি তা সততার সাথে নির্মাণ করা হয়।

বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নিম্নমানের বিষয়গুলো বিশাল আকার ধারণ করছে, আর সূক্ষ্ম শিল্পচর্চাগুলো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। হালকা বিনোদন দানবাকৃতি ধারণ করছে, আর শিল্প নির্দেশনার মতো গভীর নন্দনতাত্ত্বিক কাজগুলো ক্রমে বেঁটে হয়ে পড়ছে।

একটি জাতি কীভাবে ঘর বানায়, কীভাবে রং ব্যবহার করে, কীভাবে তার গল্পকে দৃশ্যমান করে—এসবের মধ্যেই তার মানসিকতা প্রকাশ পায়। তরুণ ঘোষ সেই দৃশ্যমান মানসিকতার একজন নির্মাতা ছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিল্প নির্দেশনা কোনো গৌণ কাজ নয়; এটি চলচ্চিত্রের আত্মা নির্মাণের শিল্প।

আজ যখন চারপাশে প্লাস্টিকের সংস্কৃতি, ডিজিটাল কৃত্রিমতা, ও তাৎক্ষণিক উত্তেজনার দাপট, তখন তরুণ ঘোষের কাজ আরও জরুরি হয়ে ওঠে। কারণ যে-সমাজ সূক্ষ্ম শিল্পকলা অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, সে সমাজ শেষপর্যন্ত সাংস্কৃতিক বামনতায় আক্রান্ত হয়। তখন বড় শিল্পীরা ছোট হয়ে যেতে বাধ্য হন, আর ছোট চিন্তাগুলো দানবাকৃতি ধারণ করে পুরো সংস্কৃতিকে গ্রাস করে ফেলে। আর এ থেকেই তৈরি হয় রুচির দুর্ভিক্ষ৷