❑ সাম্য রাইয়ান
শহীদ কাদরীর কবিতায় নগর এমন এক স্নায়ুবিক, স্পন্দিত, বিদ্রোহী প্রাণদেহ; যা মানুষের ঘাম, স্মৃতি, ক্লান্তি ও স্বপ্নের ভিতর দিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের নতুন শরীর নির্মাণ করে। এক ঢেউখেলানো, প্রায়জৈব সত্তা, যার হৃদস্পন্দন ধ্বনিত হয় মানুষের দৈনন্দিনতার সূক্ষ্মতম অনুরণনে৷ তাঁর “বৃষ্টি, বৃষ্টি” কবিতাটি এই নগর-সত্তার বিরল মুহূর্তের চিত্রণ, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নগরকে তার পরিচিত গতি ও ক্ষমতার কাঠামো থেকে বিচ্যুত করে, আর রাজপথে ক্ষমতা ফিরে পায় সেইসব মানুষ যারা সাধারণত শাসনের বাইরে, প্রান্তিক ও উপেক্ষিত। এখানে বৃষ্টি হয়ে ওঠে সামাজিক ও রাজনৈতিক এমনই দুর্যোগময় প্রতীক, যা একই সঙ্গে ধ্বংস ও মুক্তি বয়ে আনে।
এই কবিতা প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর শামসুর রাহমান তাকে বলেছিলেন, “বাংলা ভাষায় এভাবে বৃষ্টির কবিতা আর কেউ লেখেননি৷” আবদুল মান্নান সৈয়দের অভিমত ছিলো, “বাংলা কবিতায় বৃষ্টি নিয়ে তিন ধারার কবিতা রচিত হয়েছে। একটি ধারার জন্ম দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—অধিকাংশ কবি এ ধারাতেই লেখেন। দ্বিতীয় ধারার জন্ম দেন অমিয় চক্রবর্তী আর তৃতীয় ধারাটির প্রবর্তন করেন শহীদ কাদরী।”
“বৃষ্টি, বৃষ্টি” লেখার ইতিহাসটিও একেবারে নাটকীয়। শহীদ কাদরী বর্ণনা করেন এভাবে, “এক ঝড়ঝঞ্ঝার দিনে বাসায় আটকা পড়লাম। বাইরে বের হওয়ার কোনো উপায় নেয়। তখন কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে শুরু করি। এক টানেই লিখে ফেলি কবিতাটি। পরে আল মাহমুদ এসে হাজির। বলে, দোস্ত, সমকাল-এর জন্য কবিতা দাও। আমি বলি, কবিতা তো নেই, একটা খসড়া আছে, দেখো। আল মাহমুদ কবিতাটি পড়লেন। তারপর বললেন, এটাই চলবে। বলেই খাতা থেকে ছিঁড়ে নিয়ে গেলেন পৃষ্ঠাটি। আমার কাছে কোনো কপিও রাখিনি।” (কাজী জহিরুল ইসলামের নেয়া সাক্ষাৎকার, প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট ২০১৫)
এ প্রসঙ্গে হাসানআল আব্দুল্লাহকেও তিনি জানান, “‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ কবিতাকে ভেবেছিলাম পরিমার্জনা করব। কিন্তু আল মাহমুদ নিয়ে যান। বলেন, এটাই ঠিক আছে। পরে আর সংশোধন করা হয়নি।” (সাক্ষাৎকার, কালের কণ্ঠ, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬)
সংশোধন না করেই প্রকাশের জন্য দিতে রাজি হওয়া ব্যাপারটি একটু বিব্রতকর৷ কারন তিনিই তো বলেছেন, “আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ কানে (কবিতা ব্যতীত) অন্য কোনো আহ্বান পৌঁছায়নি। এটাকে ঠিক উন্মাদনা না, একাগ্রচিত্তে অনুশীলন। এটাই আমাদের মধ্যে ছিল।” তাঁর এ একাগ্রতায় আছড় ফেলতে পারেনি তার কবিখ্যাতি বা জনপ্রিয়তা৷ অন্য অনেকেই জনপ্রিয়তার মোহে যখন উন্মাদপ্রায়, তখন তিনি বলেন, “জনপ্রিয়তা নিয়ে আমি কখনোই ভাবিনি। জনপ্রিয়তা একটা ফালতু বিষয়।”
অন্যদিকে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশের পর যখন শামসুর রাহমান টেলিভিশনে একটা ঘণ্টা ধরে ওই বইয়ের ওপর আলোচনা করছেন, রিভিউ করেছেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সন্তোষ কুমারগুপ্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে মুনির চৌধুরী ওই বই সম্পর্কে বলছেন, কবির চৌধুরী কবিতাগুলো অনুবাদ করছেন এবং তা ছাপা হচ্ছে বাংলা একাডেমির পত্রিকায়, সৈয়দ আলী আহসান তাঁর বই ‘আধুনিক কবিতা ও তার অনুষঙ্গ’তে প্রবন্ধ লিখছেন, তখনও তিনি আত্মমূল্যায়নে আশ্চর্যরকম সংযত-সংহত-পরিমিত৷ নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, “আমার মনে হয়, শামসুর রাহমানের যে টোটাল কাব্যিক কৃতি সেটা ত্রিশের সমমানের। আল মাহমুদ আর আমি! আমরা একটু খাটো আছি। তার কারণ, আল মাহমুদ সম্পর্কে আমার ধারণা, আল মাহমুদ অত্যন্ত পাওয়াফুল কবি; কিন্তু তার মননের অভাব আছে। মননের অভাবজনিত কারণেই তাঁর কবিতা নেচারালি লিমিটেড। আর আমার কথা বলতে পারি যে আমি প্রস্তুতি নিয়েছিলাম বড় কবি হওয়ার, আমার মনন যে পরিমাণ বিস্তারিত, সংহত এবং প্রতিষ্ঠিত, সেই পরিমাণ কবিতায় আনতে পারিনি।” এই আত্মসমালোচনা কাদরীর শিল্পীসত্তারই প্রমাণ।
এই আত্মিক বিন্যাস জানা থাকলে “বৃষ্টি, বৃষ্টি” কবিতার পিছনের যন্ত্রণা, উপলব্ধি, এবং বহুমাত্রিকতা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
এ কবিতা নগরজীবনের এক অনন্য রূপক, যেখানে প্রকৃতি হঠাৎ করে শহরের ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে দেয় এবং প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি রাজপথের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়। শহীদ কাদরী বৃষ্টিকে শুধু দৃশ্যমান আবহ বা রোমান্টিক অনুভূতি হিসেবে নয়, বরং সামাজিক গতিশীলতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর ভেতরে ধ্বংস, মুক্তি, অস্থিরতা ও সৌন্দর্যের মিলিত স্রোত কাজ করে, যা বাঙলা কবিতায় বৃষ্টি-বিষয়ক প্রচলিত ধারাকে একেবারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কবিতার প্রথম অংশে আমরা দেখি হঠাৎ এক সন্ত্রাসের আগমন—“সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো।” অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ, রঙিন সন্ধ্যার ছবি অকস্মাৎ রূপ নেয় আতঙ্কে। রাজনৈতিক সহিংসতার সন্ত্রাস নয়, প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য আক্রমণকে তিনি তুলনা করেছেন “লাল আরশোলার মতো মড়ক” কিংবা “বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম”–এর সাথে। ভাষার মধ্যে যে দৃশ্যমান তীব্রতা, তা পাঠককে মনে করিয়ে দেয়, নগরের শৃঙ্খলা এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে পারে।
এই চিত্রকল্পগুলো সরাসরি ইন্দ্রিয়কে আঘাত করে—শুধু দৃষ্টির নয়, শ্রবণ, স্পর্শ, এমনকি ঘ্রাণের অনুভূতিকেও। “লাল আরশোলার মত মড়কে”–এর তুলনা পাঠককে ভিজ্যুয়াল ইমেজ দেয়, যেখানে মানুষের ভিড়কে দেখা যায় ক্ষুদ্র, অসহায়, কিন্তু বিপুল সংখ্যায় ছুটে চলা জীবের মতো। এই আরশোলা-চিত্রকল্প নগরের নিচতলার অন্ধকার, অপরিষ্কার, পরিত্যক্ত অংশের কথা মনে করায়—যা সাধারণত সভ্যতার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, কিন্তু বিপর্যয়ে হঠাৎ দৃশ্যমান হয়। অন্যদিকে, “বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম” একটি তীক্ষ্ণ, আক্রমণাত্মক চিত্র, যেখানে আকাশ হয়ে যায় জীবন্ত এক প্রাণী, আর বিদ্যুৎ তার ওপর পরিচালিত যুদ্ধাস্ত্র। ফলে, বৃষ্টি শুরুর আগেই কবিতায় এক যুদ্ধ-উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়।
বৃষ্টির আগমনকে শহীদ কাদরী একটি প্রযুক্তিগত ও শিল্পযান্ত্রিক শব্দচিত্রে ফুটিয়ে তোলেন—“করাত-কলের চাকা,” “লক্ষ লেদ-মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন।” এই ধ্বনিচিত্র বৃষ্টির শব্দকে যান্ত্রিক শিল্পের আওয়াজের সাথে মিশিয়ে দেয়। প্রকৃতির শব্দ ও মানুষের বানানো প্রযুক্তির শব্দ এখানে এক হয়ে যায়, যেন বৃষ্টি কেবল প্রাকৃতিক নয়, প্রযুক্তিগতও—একটি হাইব্রিড বিপর্যয়। হাওয়ার বর্ণনাতেও তিনি অনন্য—“হাওয়ার ময়ূরের মতো বর্ণালী চিৎকার” এক বিরল শ্রাব্য-দৃশ্যমান সংমিশ্রণ তৈরি করে, যেখানে কর্কশতা ও সুরময়তা, ধূসরতা ও রঙিনতা একসাথে বেঁচে থাকে।
কবিতার পরবর্তী অংশে বৃষ্টি হয়ে ওঠে সামাজিক বিপ্লবের প্রতীক। “রাজত্ব… বাউণ্ডুলে আর লক্ষ্মীছাড়াদের”—এই পংক্তিতে আমরা দেখি, শহরের প্রতিষ্ঠিত শাসকগোষ্ঠী, রাজস্ব আদায়কারী, সান্ত্রী—সবাই পালিয়ে গেছে। এই দৃশ্যে প্রকৃতি নগরের ক্ষমতার কাঠামো উল্টে দেয়। যারা সর্বদা ক্ষমতার বাইরে থাকে, সেই ভিক্ষুক, চোর, উদ্বাস্তু, অর্ধউন্মাদরা হঠাৎ যেন শহরের শাসক হয়ে ওঠে। দৃশ্যটি প্রায় থিয়েট্রিকাল—মাতাল প্ল্যাকার্ড, দুলতে থাকা সাইনবোর্ড, খড়খড়ির তাল—সব মিলিয়ে এক উচ্ছ্বসিত বিদ্রোহী নগর-দৃশ্য, যেখানে ক্ষমতাবানরা অনুপস্থিত।
শহরের ভাসমান জিনিশপত্র—সিগারেট-টিন, ছেঁড়া তার, নীল চিঠি, প্রেসক্রিপশন—দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র অথচ ব্যক্তিগত ইতিহাস বহন করে। বৃষ্টির স্রোতে তারা সবাই সমান হয়ে যায়। এই ভাসমান স্মৃতি এক গভীর দার্শনিক ইঙ্গিত দেয়; সভ্যতার সব চিহ্নই শেষ পর্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, আর জল তাদের নিরপেক্ষভাবে বয়ে নিয়ে যায়।
শহীদ কাদরীর ব্যবহৃত প্রতীকী উপাদান এখানে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। প্রলয়-হাওয়াকে তিনি তুলনা করেছেন “ইস্রাফিলের ওঁ”–এর সাথে, যা ইসলামী কিয়ামতের ধারণার সাথে মিলে যায়। এটি প্রকৃতির শক্তিকেই শুধু নয়, ইতিহাস ও সময়ের মহাবিপর্যয়কেও নির্দেশ করে।
কবিতার শেষে, বক্তা একা দাঁড়িয়ে থাকে “নগ্নপায়ে ছেঁড়া পাৎলুনে,” “নতুন নৌকার মতো” ঝলমলে, কিন্তু নিঃসঙ্গ। এই আত্মচিত্রণ একদিকে দুর্যোগে টিকে থাকা মানুষের গর্ব ও সজীবতার ইঙ্গিত, আবার অন্যদিকে গভীর একাকীত্বের প্রতীক। দেহের ভঙ্গি ও পোশাকের সরলতা বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে “নতুন নৌকা”-র দীপ্তিময়তার সাথে। ফলে, বক্তা একসাথে দুর্বল ও অদম্য—প্রলয়ের মধ্যে একমাত্র স্থির, অথচ দিকহীন যাত্রী। চারপাশে যখন শহর ভেসে যাচ্ছে, তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে, সে কোথায় ভেসে যাবে? এই প্রশ্ন যতটা না ভৌগোলিক তার অধিক অস্তিত্বমূলক—জীবনের স্রোত তাকে কোন অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাবে?
“বৃষ্টি, বৃষ্টি” কবিতাটি মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে। প্রথমত, এটি এক প্রলয়ের নগরচিত্র, যেখানে প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সংঘাত ঘটছে। দ্বিতীয়ত, এটি এক রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তরিত, ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের সাময়িক রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, এটি এক ব্যক্তিগত আত্মজিজ্ঞাসার কবিতা, যেখানে বিপর্যয়ের মধ্যেও ব্যক্তির একাকী সত্তা অক্ষুণ্ণ থাকে।
শহীদ কাদরীর নগরকবিতা সবসময়ই নগরের বাস্তবতাকে রোমান্টিক বা আইডিলিক করে না, বরং নগরের ভয়াবহতা, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়কে নগরের নিজস্ব সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। “বৃষ্টি, বৃষ্টি” এই দিক থেকে তাঁর কাব্যশৈলীর অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন—যেখানে ভাষা, চিত্রকল্প ও রাজনৈতিক অন্তর্নিহিত বার্তা মিলেমিশে এক নগর-প্রলয়ের মহাকাব্য রচনা করেছে।
বৃষ্টি এখানে মুক্তির প্রতীকও বটে; কারণ এটি সাময়িকভাবে হলেও প্রথাগত ক্ষমতাকে ভেঙে দেয়, আর প্রান্তিক মানুষদের হাতে রাজত্ব তুলে দেয়। তবে সেই মুক্তি ক্ষণস্থায়ী; শেষ পর্যন্ত, সব ভেসে যায়, সব মিলিয়ে যায় জলের স্রোতে। কেবল থেকে যায় বক্তার নিঃসঙ্গতা, যা এক অমোচনীয় মানবিক অভিজ্ঞতা।
এই দ্বৈততা—ধ্বংস ও মুক্তি, আতঙ্ক ও উল্লাস, ভেসে যাওয়া ও টিকে থাকা—কবিতাটিকে এক অনন্য জটিলতা দিয়েছে। ফলে “বৃষ্টি, বৃষ্টি” কবিতাটি হয়ে উঠেছে আধুনিক নগরজীবনের এক গভীর সমাজ-রাজনৈতিক ও অস্তিত্ববাদী দলিল। যেখানে শহর তার চেনা রূপ হারায়, ক্ষমতা সাময়িকভাবে হাতছাড়া হয়, আর মানুষ নিজের সবচেয়ে উলঙ্গ ও সত্য অবস্থায় প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়ায়। শহীদ কাদরী এই কবিতায় দেখান, প্রলয়ের মধ্যে জীবন স্থবিরতার বদলে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে; মানুষ তখন নিজের অবস্থান, গন্তব্য ও সঙ্গীদের নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়। জল যখন সব ভাসিয়ে নেয়, তখনও প্রশ্নটি রয়ে যায়—আমরা কোথায় যাচ্ছি, কারা আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে; সেই প্রশ্নই “বৃষ্টি, বৃষ্টি”কে এক সময়াতীত নগর-মহাকাব্যে রূপ দেয়। যে প্রশ্নের আদতে উত্তর নেই; আছে শুধু জলের শব্দ, ভেসে যাওয়া চিহ্ন, আর এক নিঃসঙ্গ মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা! যে মানুষই শেষ পর্যন্ত আধুনিক নগরের সবচেয়ে স্থায়ী সত্য।