❑ সাম্য রাইয়ান
রঙ কি প্রাণহীন, নাকি তারও আছে ভালো-মন্দ অনুভূতি? পল গোগাঁর ছবি দেখলে মনে হয়, রঙ অনুভূতিপ্রবণ, সে-ও অসুস্থ হতে পারে। হলুদ সেখানে আনন্দের নয়, জ্বরের রং। নীল সেখানে শান্তির নয়, নির্বাসনের রং। তাঁর নারীরা কখনো সম্পূর্ণ মানুষ নয়, আবার সম্পূর্ণ প্রতীকও নয়। গোগাঁ কি তাদের আঁকতে আঁকতে আসলে নিজের হারিয়ে যাওয়া আদিমতাকেই খুঁজছিলেন?
পৃথিবীর শিল্প-ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনকে শিল্প থেকে আলাদা করে বিচার করা যায় না৷ তাদের ছবি, যৌনতা, পালিয়ে যাওয়া, পাপ, দারিদ্র্য, জ্বর, এমনকি তাদের আত্মবিধ্বংসও ক্যানভাসেরই অংশ। পল গোগাঁ তাদের একজন। যিনি ইউরোপীয় সভ্যতার সুশীল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখে কাদা মেখেছিলেন।
আজ সারাদিন আকাশ মেঘহীন। অথচ আমি যেন ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, তাহিতির কোনো উপকূলে দাঁড়িয়ে আছি—যেখানে নারীরা বাঙলার ফুলের মতো রঙিন, সমুদ্রের রং বিষণ্ন নীল, আর একজন পলাতক চিত্রকর নিজের সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্য রঙ মিশিয়ে চলেছেন। একের পর এক ক্যানভাসে তিনি রঙ দিয়ে লিখে চলেছেন ইউরোপের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আত্মহত্যাপত্র।
অদ্ভুত লাগে, একজন মানুষ ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ক্যানভাসের দিকে যায় কেন? সংসার, সন্তান, নিরাপত্তা—এসব ছেড়ে কেন কেউ অনিশ্চয়তার দিকে হাঁটে? আমরা জানি, মানুষের ভেতরে এক ধরনের ক্ষুধা থাকে যা ভাতে মেটে না। গোগাঁ সেই ক্ষুধার্ত মানুষ ছিলেন। তিনি জানতেন, সভ্যতা মানুষকে ‘ভদ্র’ করে, কিন্তু শিল্পীকে প্রায়শই মেরে ফেলে। তাই তিনি পালালেন। প্যারিস থেকে, পরিবার থেকে, ধর্ম থেকে, এমনকি নিজের পূর্বপরিচয় থেকেও।
কিন্তু পালিয়ে কোথায় যাওয়া যায়? তাহিতি কি সত্যিই মুক্তির জায়গা ছিল? নাকি সেটিও ছিল ইউরোপীয় কল্পনার আরেকটি উপনিবেশ? গোগাঁ যখন তাহিতির মেয়েদের আঁকছিলেন, তখন তিনি কি তাদের মানুষ হিসেবে দেখছিলেন, নাকি এক্সোটিক স্বপ্ন হিসেবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না।
আজ দুপুরে হঠাৎ মনে হচ্ছিল, আধুনিক শিল্পের ভেতরে এক গভীর ক্লান্তি আছে। আমরা যাদের ‘মায়েস্ত্রো’ বলি, তাদের অনেকেই আসলে পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি। তারা ব্যর্থ মানুষ ছিলেন, আর সেই ব্যর্থতার ভেতর থেকেই শিল্প জন্ম নিয়েছে। গোগাঁও তেমন। তিনি সংসারে ব্যর্থ, সম্পর্কে ব্যর্থ, অর্থনীতিতে ব্যর্থ, কিন্তু রঙের কাছে গিয়ে ভয়ঙ্করভাবে সফল।
শিল্পের ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, যারা সবচেয়ে সুন্দর ছবি এঁকেছে, তারা নিজেদের জীবন ভয়ংকর সুন্দরভাবে নষ্ট করেছে। হয়তো মহান শিল্পের ভেতরেই থাকে আত্মধ্বংসের গোপন রাসায়নিক।
গোগাঁ মারা গিয়েছিলেন দূর এক দ্বীপে, প্রায় নির্বাসিত মানুষের মতো। তাঁর মৃত্যুর সময় ইউরোপ খুব বেশি দুঃখিত হয়নি। সভ্যতা সাধারণত শিল্পীদের মৃত্যুর পরে গ্রহণ করে। কেননা জীবিত শিল্পী বিপজ্জনক; মৃত শিল্পী নিরাপদ। আজ জাদুঘরে তাঁর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে যে মানুষ বিস্মিত হয়, সে হয়তো জানেই না—এই ছবিগুলোর পেছনে ছিল জ্বর, ঋণ, কাম, ঔপনিবেশিক লালসা এবং এক অসুস্থ নিঃসঙ্গতা।
শিল্পের এমন অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, যার ভেতরে আপনি পাপও (এবং পূণ্য!) লুকিয়ে রাখতে পারেন৷ আর শিল্প অদ্ভুতভাবে, সেই পাপগুলোকেও সৌন্দর্যে পরিণত করে। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ পল গোগাঁ।
দিনহীনের দিনলিপি • ৮ মে ২০২৬