❑ সাম্য রাইয়ান
আমার একটা অভ্যাস আছে। কমার্শিয়াল বুকমার্ক খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। সামনে যা পাই, সেটাই বইয়ের ভেতরে রেখে দিই। বাসের টিকিট, ওষুধের প্রেসক্রিপশন, বিলের কাগজ, শুকিয়ে যাওয়া পাতা, কখনো ছাটকাগজে লেখা দু-তিনটা লাইন। তারপর মাস বা বছরখানেক পরে বইটা আবার খুললে মনে হয় অন্য একজন মানুষ আমার জন্য কিছু রেখে গেছে।
কমার্শিয়াল বুকমার্কগুলো দেখতে সুন্দর, ব্যবহারেও সুবিধাজনক। কিন্তু ওগুলোর কোনো অতীত নেই। গল্প নেই। জন্মের পর থেকেই তারা জানে, তাদের কাজ নির্দিষ্ট।
একবার শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার বইয়ের ভেতর সিনেমার টিকিট পেয়েছিলাম। সিনেমার নাম মনে ছিলো, কিন্তু ঘটনাটা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। অদ্ভুত লাগলো। একটা ছোট্ট কাগজ এত বড় একটা স্মৃতিকে কোথায় লুকিয়ে রাখে? মাথার ভেতরে নিশ্চয়ই এমন অনেক ঘর আছে, যেগুলোর চাবি আমাদের কাছে থাকে না। হঠাৎ কোনো গন্ধ, কোনো গান, কোনো কাগজ এসে দরজাটা খুলে দেয়।
একসময় মনে হতো, সব বই শেষ করতে হবে। পৃথিবীর যত গুরুত্বপূর্ণ লেখক আছেন, সবাইকে পড়ে ফেলতে হবে। এখন সেই তাড়া নেই। এখন একটা বইয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে ভালো লাগে। পড়ার মধ্যখানে বিরতি দিই। হাঁটাহাঁটি করি। চা খাই। আবার এসে পড়ি।
অনেকদিন আগে একজন আমাকে একটা বই উপহার দিয়েছিল। প্রথম পাতায় লিখেছিল, “কোনো একদিন এই বইয়ের ভেতর আমাকে খুঁজে পাবে।” বইটা এখনো আছে। মানুষটা নেই। প্রথম পাতার কালি ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু ওই এক লাইনের বয়স যেন আটকে আছে। মাঝে মাঝে বইটা খুলে শুধু ওই লেখাটা দেখি। তারপর বন্ধ করে রাখি।
এখনো নতুন কোনো বই কিনলে প্রথমে কয়েকটা পাতা উল্টে দেখি। বইয়ের গন্ধ নিই। কিছুদূর পড়ি, তারপর ভেতরে কোনো কাগজ রেখে দিই। ইচ্ছে করেই। আমি জানি, আজকের এই সাধারণ দিনটার কথা কয়েক বছর পরে আমার আর মনে থাকবে না। কিন্তু কোনো এক বিকেলে বইটা খুলে যখন ওই কাগজটা বের হবে, তখন আজকের মুহূর্তটা স্মরণ হবে। সময় আটকে থাকবে বইয়ের ভাঁজে।