অন্তর্গত আবহাওয়া

❑ সাম্য রাইয়ান 

মানুষের অন্তর্লোকে নিজস্ব আবহাওয়া থাকে। বাইরে রোদ থাকলেও সেখানে কুয়াশা নামতে পারে। আবার পৃথিবী ডুবে গেলেও ভেতরে কেউ একজন নিশ্চিন্তে গাছে জল দিতে পারে। এই আবহাওয়ার কোনো রিপোর্ট হয় না। আবহাওয়া অফিসও জানে না। তাই প্রতিদিন ভুল পূর্বাভাস শুনে আমরা বের হই। ছাতা নিয়ে যাই রোদের দিনে। বৃষ্টিতে সঙ্গে রাখি দেশলাই।

দুনিয়ার কাছে ব্যবহৃত হতে হতে মানুষ ক্রমশই মানুষ হয়ে ওঠে। হাতের তালুতে যে দাগগুলো আছে, সেগুলো ভাগ্যরেখা না। অসংখ্য দরজায় কড়া নাড়ার ইতিহাস। কেউ খুলে দেয়নি। কেউ ভেতর থেকে বলেছে, এখন সময় না। কেউ বলেছে, ভুল ঠিকানায় এসেছেন। হাতের তালু মনে রেখেছে সেইসব ভুল দরজার ঘ্রাণ।

আমি আমার ছায়াকে সন্দেহ করি। ও আমার সঙ্গে থাকে, কিন্তু আমার সঙ্গে বাঁচে না। রোদ কমে এলেই পালিয়ে যায়। অন্ধকারে আমাকে একাই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

একদিন পুরোনো শার্টের পকেটে শুকনো পাতার মর্মর পেলাম। মনে করতে পারলাম না কোন গাছের। অথচ সে আমাকে চিনে ফেললো। বললো, একদিন খুব তাড়াহুড়ো করছিলে। আকাশের দিকে তাকাতে ভুলে গিয়েছিলে। আমি তখন তোমার পকেটে লুকিয়ে পড়েছিলাম।

আমরা কত কথা বলি! অথচ সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বাক্যগুলো উচ্চারণ করা হয় না। কেউ কাউকে বলে না, তুমি চলে গেলে এই শহরে বাতাশ ভারী হয়ে যায়। প্রতিটি ভাষায় অনেক শব্দ তৈরি হয়েছে, কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় তা আজও অপ্রতুল।

আমার একটা চেয়ার আছে। রাতে সে আমার অপেক্ষা করে। আমি বসলে কাঠের ভেতর থেকে মৃদু স্বর টের পাই। যেন দীর্ঘদিনের পরিচিত কেউ বলছে, এসেছো? আজও ফিরতে দেরি হলো? আমি উত্তর দিই না। কারণ কাঠের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলে নিজেকে পাগল মনে হবে। অথচ মানুষের চেয়ে কাঠকে বিশ্বাস করা নিরাপদ।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখি কয়েকজন শিশু বাতাশের হাত ধরে দৌড়াচ্ছে। বড়রা অন্যকিছু ধরে দৌড়ায়। শেষে দেখা যায়, বাতাশের হাত ধরে যারা ছুটেছিলো তারাই সুখী।

কিছু কিছু বিকেল মানুষের শরীরে এসে বসে থাকে পাখির মতো। উড়িয়ে দিতে চাইলে যায় না। চায়ের কাপ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। জানালার কাচে দূরের আলো জমে। মনে হয় কেউ আসবে। 

বড় রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধকে দেখলাম, জুতায় পালিশ দিচ্ছেন। জুতা চকচকে হচ্ছিলো, কিন্তু চোখজুড়ে সারাদিনের ধুলো। পৃথিবী এমনই। মানুষের ক্লান্তি পরিষ্কার করার মতো কাপড় আমরা আজও বানাতে পারিনি। বিশ্বাস রাখার মতো মেশিন আজও বানাতে পারিনি।

রাতে ঘুম আসতে চায় না। বালিশের নীচে হাত রাখি। সেখানে আরেকটা পৃথিবী আছে। কেউ তাড়া দেয় না। পকেটে কয়েনের মতো ঝনঝন করে না সময়। সেখানে ক্লান্ত মানুষ শ্মশ্রুল বৃক্ষের নীচে বসে। বৃক্ষ তার মাথায় রাখে হাত। এতটুকুই পরম চিকিৎসা।

আমাদের নদীগুলো হাঁটতে না পারা মানুষের স্বপ্ন। ওরা সবসময় কোথাও যেতে চায়। পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত ওদের অস্থিরতা দেখে আমি নিজের কথা ভাবি। কত জায়গায় গেছি! কোথাও পৌঁছাইনি। পৌঁছানোর চেয়ে যাত্রাই বেশি সত্য।

শেষ বিকেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি কয়েকটা পাখি খুব নিচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। মনে হলো তারা আকাশ ছেড়ে মানুষের কাছে নামতে চাইছে। ওরা ভুল করেছে। মানুষের এত কাছে আসা ঠিক হয়নি।

তবু প্রতিটি সকালে আমি জানালা খুলে দিই। প্রতিশ্রুতিহীন বাতাশ ঢুকে পড়ে। পর্দা নড়ায়। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজে হাত বুলিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে এমনভাবে কাঁধে রাখে হাত, মনে হয়– বেঁচে থাকাটা পুরোপুরি বৃথা হয়নি।