❑ আহম্মেদুল কবির
সকল প্রশংসা আল্লাহ সোবহনতালার। ইসলামী আদর্শে যাপিত মানুষ সেটাই বিশ্বাস করেন।
এ বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় যে এ বিশ্বাসের বিপরীতে কোন কিছু বললেই ধরে নেয়া হয় সে অমুসলিম। অমুসলিম কখনো এক ইশ্বরবাদ বিশ্বাস করে না।
২০২৫-এর একুশে বইমেলায় ঢাকার ঘাসফুল প্রকাশনী দুটি পৃথক প্রচ্ছদে সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে।
উপন্যাসটি আমার হাতে আসামাত্র আমি মুসলমান স্বভাবত কারণে কিছুটা সময় থমকে যাই। এরূপ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশ হবে সেটি ফেসবুকের মাধ্যমে, কখনো লেখকের সান্নিধ্যে থাকায় আমার অগ্রীম জানা ছিলো। তবে ফাইনালি যে সে নামেই উপন্যাসটি প্রকাশিত হবে সত্যিই ভাবিনি।
যখন উপন্যাসটি হাতেই পেলাম নিজের কাছে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ঔপন্যাসিক নিজেও একজন মুসলিম পরিবারের সন্তান—নিজেও মুসলমান। তাহলে কেন ঔপন্যাসিক এধরনের নামকরণে উপন্যাসটি লিখলেন? সেই ভাবনা থেকেই সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের- উপন্যাসটি পড়ে নিলাম এবং একই সাথে রিভিউ লেখার চেষ্টা করলাম। উপন্যাসটির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট জানার আগে জেনে নেই লেখকের বায়োগ্রাফি।
উপন্যাসটি লিখেছেন, বাংলাদেশের উত্তরের কুড়িগ্রাম জেলার তরুণ সাম্য রাইয়ান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী লেখক সাম্য রাইয়ানের এটিই প্রথম উপন্যাস।
সাম্য রাইয়ান অবশ্য কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। উপন্যাসটির পূর্বে তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থ— বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা (২০১৬), মার্কস যদি জানতেন (২০১৮), হলুদ পাহাড় (২০১৯), চোখের ভেতরে হামিংবার্ড (২০২০), লিখিত রাত্রি (২০২২), হালকা রোদের দুপুর (২০২৩), জলের অপেরা (২০২৪) প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ২০০৬ সাল থেকে বিন্দু নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করে আসছেন। তার কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ দেশ-বিদেশে প্রকাশ হয়ে আসছে। সাম্য রাইয়ানকে নিয়ে ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘তারারা’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মনমানচিত্র’, ভারতের ‘এবং পত্রিকা’ তাকে নিয়ে বিশেষ একক সংখ্যা ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘নিসর্গ’ বিশেষ মূল্যায়ন (ক্রোড়পত্র) প্রকাশ করেছে৷ ভারতের নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার সাম্য রাইয়ান প্রসঙ্গে ‘সাম্যপুরাণ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপন্যাসের শুরুটা অন্য সব উপন্যাসের মতো নয়, একদম ব্যতিক্রম কাব্যিকভাবে শুরু করা হয়েছে। যা উপন্যাস লেখার একটি অন্যরূপ সৌন্দর্য উপলদ্ধিতে দারুণভাবে আকৃষ্ট করবে পাঠকে। শুরুটা হয়েছে একটি কবিতা দিয়ে—
স্বরযন্ত্র চিনে ফেলেছি আজশ্বাসনালী কেঁপে ওঠে শব্দের তোড়েনির্লজ্জ আর উদ্ধত ভঙ্গির হাসিতেবিপন্ন নগরব্যাপী তৃণ, যেনদীর্ঘদিনে পেকে ওঠা সূর্যের কল্পনা!হাওয়ার পায়ে রুপোর বালাথাকো দ্বন্দ্বহীন—দ্বন্দ্বমুখরএদিক-ওদিক ঘুরেদ্যাখো বিদ্বেষ—কলহপ্রবণ সংকল্প।আকর্ষণ, ঝলমলে মায়া হারাচ্ছেনীল সংঘ, উপনিবেশ।পথ ভুল করা হাতিদের দীর্ঘশ্বাসের মতোকৃত্রিম নিসর্গ নামক অর্জন, সাময়িকআবহমান নৈঃশব্দ্য তাকে উপহাস করে—তড়িৎ-প্রবাহ দেখে মনে হয়, যা কিছুনিরুপায় সবুজ-ওরা রৌপ্যনির্মিতসহানুভূতিহীন; শুধুই লুটপাট, অন্ধ দৈত্যকুল!
তার পরের পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
শুরু করছি সেই মহান দেবতাকুলের নামে, যারা আমাদের জীবনকে বর্ণিল করতে হাতে তুলে দিয়েছেন ফেসবুক, টিকটক, টুইটার, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো অগণিত বেঁচে থাকার উপাদান; যার গণতান্ত্রিক চাহিদা এখন মৌলিক চাহিদার অধিক।
মোট ২৮টি অধ্যায়ে সমতল ও নিটোল মোট ২৩টি চরিত্র ও ক্ষুদ্র আরও শতাধিক চরিত্র সন্নিবেশন করে ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসটি লিখেছেন।
উপন্যাসটি পড়তে শুরু করলেই যেকোন পাঠকের মন ও মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি এক নিমিষেই ডুব দেবে বিশ্বের শাসনকর্তা আঙ্কেল স্যাম ও তার আজ্ঞাবহ অন্ধ জাদুকরের পিংপং জাদু কাঠির মহা সমুদ্রে। কী করছে আঙ্কেল পরিচালিত অন্ধ জাদুকর, কোন কাঠি ঘুরিয়ে নাচাচ্ছে আমাদের, কোথায় যাচ্ছি আমরা, আমাদের ভবিষ্যতইবা কী, আমাদের স্বাধীনতা কোথায়, আমাদের মুক্তি কোথায়— এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইবে সবাই।
উপন্যাসের ১.০ অধ্যায়ের সূচনালগ্নেই যে শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে বলা বাহুল্য উপন্যাসিক নিজেই বলেছেন, উপন্যাসটি অপ্রাপ্তমনস্কদের জন্য নয়।
সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপন্যাসটির বৈশিষ্ট্য বলতে গেলে এক কথায় বলতে হবে উপন্যাসটি ঐতিহাসিক ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লিখিত একটি সত্যরূপ অসত্য উপন্যাস। লেখক নিজেই বলেছেন, কুকুরকে বিশ্বাস করুন এই উপন্যাসকে নয়।
এই উপন্যাসের মূল চরিত্র আঙ্কেল স্যামের শারীরিক কোন উপস্থিত নেই, প্রবাহমান সময়ই এই উপন্যাসের মূল চরিত্র। উপন্যাসে আঙ্কেল স্যামকে উপস্থাপন করা হয়েছে তামাম দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরূপে। যার আঙুলের ইশারায় অন্ধ জাদুকর উপনিবেশ ধারার রাষ্ট্রগুলি নিয়ন্ত্রণ করে। নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সবকিছুই। আমরা দলিত হই বুর্জোয়া শ্রেণির যাতাকলে সর্বহারাশ্রেণির মানুষজন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পদতলে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের যাপন ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং হচ্ছে সে বিষয়টিকে পাঠকের কাছে তুলে ধরতেই রূপক অর্থে উপন্যাসিক উপন্যাসটির নামকরণ করেছেন সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের৷
একটু বাঁকাভাবে যদি বলতে যাই উপন্যাসটির নামকরণেও এক অন্যরূপ পিংপং জাদুগীরি দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক সাম্য রাইয়ান। আজকের এই বিশ্ব সভ্যতার আধুনিকায়নে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রশংসা করতে গিয়ে লেখক উপন্যাসের শুরুতেই স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন-
আমরা নিমকহারাম না। স্থূল চর্বির প্রতিটি কণার কসম, ইংরেজি ভাষার প্রতিটি বর্ণের কসম, ডলারের প্রতিটি নোটের কসম আমরা নিমকহারাম না। আমরা ভ্যারিয়েশনে বিশ্বাসী, কিন্তু তাঁর কৃতিত্ব- স্বীকৃতিতে এক-স্বীকারবাদী— যিনি নৌবহর-সিআইএ দিয়ে আমাদের জীবনরক্ষা করেন, যিনি এফডিএ দিয়ে আমাদের অন্নদান করেন, যিনি বিশ্বব্যাংক দিয়ে আমাদের পরিত্রাণ করেন, যিনি আইএমএফ দিয়ে আমাদের পরিত্রাণের পারদ পর্যবেক্ষণ করেন, যিনি এফবিআই দিয়ে আমাদের অন্দরমহল তদারকি করেন, যিনি ন্যাটো দিয়ে আমাদের সামরিক নিরাপত্তা প্রদান করেন, যিনি আইএসএএফ দিয়ে তালেবান-আল-কায়েদা থেকে আমাদের সুরক্ষিত করেন, যিনি এশিয়া এনার্জি দিয়ে আমাদের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করে, লোডশেডিঙের অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাতে চান এবং পাবলিকের ধাওয়া খেয়েও চিরবিদায় না নিয়ে নিজের নাম বদলে নবতর ছদ্মনাম ধারণ করে আবারও রাজস্ব বৃদ্ধির লোভনীয় স্বপ্ন দেখান, যেকোনো তুল্যেমূল্যে আমরা তাঁরই নাম জপি। অতএব, বিনাবিচারে-নির্দ্বিধায় আবশ্যিকভাবে প্রশংসা শুধুই তাঁর।
উপন্যাসিক শুরুতেই বলেছেন, আমরা নিমকহারাম না। নুন খেয়ে গুন গাওয়াই অমাদের ধর্ম। প্রশংসা তারই করতে হয়, সেটাই করেছেন ঔপন্যাসিক। এতে আল্লাহ সোবহনতালা সকল প্রশংসার উর্ধ্বে, লিখিত উপন্যাসে বিষয়টি তিনি উহ্য রেখেছেন। সকল প্রশংসার বিষয়টি নিয়ে ধর্মীয় বিতর্ক হতে পারে, তবে উপন্যাসটি পড়লে যেকেউ বুঝতে পারবেন এ উপন্যাসে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই, পুরোটাই রাজনৈতিক৷ আমার একবারও মনে হয়নি লেখক এখানে সকল প্রশংসা যে আল্লাহ সোবহনতায়ালার— সেটি অস্বীকার করেছেন।
লেখক নিজেও উপন্যাসটির ভূমিকা পর্বে লিখেছেন,
সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শিরোনাম থেকে শুরু করে চরিত্র গল্প, সংলাপ- এমনকি প্রতিটি বাক্য কাল্পনিক। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র এবং জীবিত বা মৃত ব্যক্তি কিংবা ‘বাস্তবতা’র সাথে এর বিন্দু পরিমাণও সম্পর্ক নেই। কুকুরকে বিশ্বাস করুন, এ উপন্যাসকে না।
উপন্যাসটির ভূমিকায় লেখক অপ্রাপ্তমনস্ক পাঠককে এর পাঠ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছেন। উপন্যাসটির কিউরিসিটি ঠিক সেখান থেকেই। উপন্যাসটির শুরু হয়েছে Warning দিয়ে, সমাপ্ত হয়েছে Buffering... দিয়ে।
উপন্যাসটি মোট ২৩টি চরিত্রকে ঘিরে কাহিনি বিস্তৃত হয়েছে। কাহিনির পশ্চাৎপটে রয়েছে উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থায় ডলার ছিটিয়ে একটি দেশের রাজনীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি ধ্বংস করে নিজেদের মতো করে আয়ত্ত করার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
কাহিনিতে উঠে এসেছে তেমনি এক বিস্তীর্ণ উপাখ্যান। এই উপাখ্যানে দেখানো হয়েছে অন্ধ জাদুকরের অলৌকিক শক্তি, যার জাদুর কাঠির ইশারায় রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তি, নাম কামানো সুধী, সুশীল, রতনের মতো প্রতারক যুবনেতা, বিশ্বজিতরে মতো চতুরঙ্গ ধান্ধাবাজ শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী শিক্ষিত জাতিগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ; এরা সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির সাথে হাত মিলিয়ে নিজের দেশকে করছে ধ্বংস। নিজ দেশের সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে শবনম, আখতারা, সুলেখা, বিণীতা, প্রভা মিত্রের মতো শতশত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষিত সুন্দরী নারী— কেউ আর্থিক দীনতায়, কেউ লোভে, কেউ অতিলোভে ওদের সাথে জড়িয়ে পড়ে কেউ হয়েছে রতনের, কেউ হয়েছে বিশ্বজিতের নামকাওয়াস্তে স্ত্রী, কেউ হয়েছে গার্লফ্রেড, কেউ হয়েছে বেড পার্টনার।
ওদের আচরণ, তোষামোদ, প্রভুভক্তির আতিশয্য অথবা নিজের অন্যায় ঢাকার প্রচেষ্টায় নির্ণন্দ্র সদস্ত যুক্তির অবতারণা উন্মোচিত হয়েছে উপন্যাসটিতে। উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় হচ্ছে উপন্যাসটির ডায়লগ।
ডায়লগ প্রধান এই উপন্যাসটির কিছু ডায়লগ পাঠকে মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। যেমন- উপন্যাসের ৩৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে—
তোমাকে দেওয়া হবে গণতান্ত্রিক ডলার, যা দিয়ে তুমি এ দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে। আর সেই ডলার খরচ করে তুমি আমদানি করবে ফরেন গণতন্ত্র, যা অত্যন্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হাতের স্পর্শ ছাড়াই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য উৎপাদন করা হয়।
৩১ পৃষ্ঠায়— শ্রমিক মারো সমস্যা নাই, খেয়াল রাখবা মানুষ যেন না মরে।
৩৪ পৃষ্ঠায়— যখন দেখবেন, আপনার চেয়ে আপনার ছায়া বড় হয়ে যাচ্ছে তখন বুঝবেন সূর্য অস্ত যাচ্ছে।
৪০ পৃষ্ঠায়— পাবলিক হলো আবেগের দাস। ওরা বন্দুকের সামনে থাকুক বা পিছনে থাকুক, আবেগ দিয়ে আঘাত করতে পারলেই ওদের পরাজয় আর আমাদের জয় নিশ্চিত।
৫৫ পৃষ্ঠায়— এই দেশের বজ্জাত জনগণ খেলাফত চায় না। তাদের বুঝানো অনেক খরচের ব্যাপার।
একই পৃষ্ঠায়— তিনি (আঙ্কেল স্যাম) ভ্যারিয়েশন বিশেষ পছন্দ করেন। ধর্ম যার যার ডলার সবার। আমাদের শত্রুপক্ষ বলে- সকল পার্টি কোনো না কোনো শ্রেণির পার্টি। কী হাস্যকর!
৫৮ পৃষ্ঠায়— পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিকা স্বৈরাচারী। এরা গণতন্ত্রবিরোধী।
৬৫ পৃষ্ঠায়— শিরদাঁড়া নিয়ে ঘোরা নন-বেইলেবল অফেন্স৷
একই পৃষ্ঠায়— জিডিপি বৃদ্ধির উন্নয়ন হলো লাশকে কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা!
৬৬ পৃষ্ঠায়— শ্রমিকের যা হয় হোক, উৎপাদন থামানো যাবে না কিছুতেই।
একই পৃষ্ঠায়— শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে মালিকের চাই শুধু ডলার।
৬৭ পৃষ্ঠায়— দেশ মানে কেবল রাজনীতি নয়, অর্থনীতি নয়, জিডিপি নয়, দেশ মানে আবেগ, সংস্কৃতি, জল- হাওয়া... জনমামসে এগুলোই গভীরতম সত্য।
৭২ পৃষ্ঠায়— টাকাই কি সব! ভালোবাসা, আদর্শ, দেশপ্রেম, এসব কেবলই আরব্য রজনীর রাজহাঁস?
৭৯ পৃষ্ঠায়— আমাদের দেশের বর্তমান শাসকশ্রেণি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল।
১২০ পৃষ্ঠায়— এদেশ একটা চলমান নরক। কোথাও শান্তি নাই। কারও কাছে না।
১২৫— মার্ক্স থাকেন শ্রমিকপল্লীতে৷
১২৬ পৃষ্ঠায়— আমি নিঃসঙ্গতা দিয়ে তোমাকে বিট করতে চেয়েছিলাম৷
১২৬ পৃষ্ঠায়— মার্ক্সরে পায় শুধু সেই, যার হারাবার কিছু নেই।
১২৮ পৃষ্ঠায়— পৃথিবীর যে কোন প্রাণীকে তোমার বন্ধু বানাতে পারবে। কিন্তু মানুষকে কখনোই না। এরা কারও বন্ধু হয় না, শুধু স্বার্থ সিদ্ধ করে৷
একই পৃষ্ঠায়— ভাগ্যিস পাখিরা মানুষের মতো নয়, নইলে আকাশ থেকেও রক্ত ঝরত!
একই পৃষ্ঠায়— ডলার পকেটে ঢুকলে বুভুক্ষুদের শরীরে ঝাঁকি আসে।
একই পৃষ্ঠায়— খামারি যখন গরুকে ভালোমন্দ খাইয়ে মোটাতাজা করে তোলে তখন গরু অত্যন্ত আনন্দিত হয়, কেননা নিজের পরিণতি সম্পর্কে সে জানে না।
১৪০ পৃষ্ঠায়— দুনিয়ার এতকিছু থাকতে মানুষ কেন যুদ্ধকে বেছে নিল? কে করবে ন্যায়-অন্যায়ের ফারাক, কে ভাঙবে মিথ্যার মিউজিয়াম!
১৪৩ পৃষ্ঠায়— সেদিন স্বপ্নে দেখি আমি গ্রেগর সামসার মতো করে ইঁদুর হয়ে গেছি! আর ল্যাজ নাড়ানো কুকুরের দল হয়েছে দুই ভাগে বিভক্ত। একদল ডলারপন্থি, অপরদল ডলারকাঙ্ক্ষী। ওরা অন্ধ জাদুকরকে কেন্দ্র করে ঘুরে ঘুরে নাচছে। ঘুম ভেঙে গেলেও নিজেকে আমার ঐ ইঁদুরই মনে হচ্ছে।
শেষ ডায়লগে বিশ্বজিৎ হালদার বলছে, নিজের স্বাধীনতার জন্য আমার উচিৎ আত্মহত্যা করা। কিন্তু না, আমি তো হিটলার না।
ঔপন্যাসিক তার উপন্যাসে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উত্থাপন করতে গিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের আমলে কুমিল্লার হালিমা টেক্সটাইল মিলস লিঃ এর শ্রমিক আঃ রহমান, জামাল খান ও তার স্ত্রীসহ শতশত শ্রমিকের না খেয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা, তাজরিন ফ্যাশন, রানা প্লাজা ধ্বসে শ্রমিকদের ঘটনা বহুল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের বেদনামিশ্রিত মৃত্যু বিষয়টিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ঔপন্যাসিক তাঁর আবেগ ও জিজ্ঞাসিত মস্তিষ্কে তেমনি একটি ঘটনা উপন্যাসটিতে উপস্থাপন করে ঐতিহাসিক ও বর্তমান সকল বুর্জোয়া চরিত্রকে এমনভাবে দাঁড় করিয়েছেন যে উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে আর বিশদ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না। উপন্যাসের চরিত্রগুলো সবাই উচ্চ শিক্ষিত। শতকরা ৮০ ভাগ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর রক্ত-শ্রম-ঘামের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত ‘পিরামিড শিক্ষাব্যবস্থার’ সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করার ভাগ্য-বর-ধন্য ব্যক্তিত্ব ওরা। জাতির ওদের নিয়ে কোথায় গৌরব করার কথা, অথচ এখন মুখ লুকাবে কোথায় তাই ভেবে পাচ্ছিল না হয়ত। শিক্ষিত, সচেতন, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদদের শুধু ডলার চাই ডলার চাই। ডলালের উন্মাদনায় সুইস ব্যাংকে টাকা জমানো, ডলার পাচার, বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ দখল, সম্পদ আহরণের মহোৎসব দেখে ঔপন্যাসিক তার পরিণতি ভেবে লিখে ফেলেছেন জর্জ অরওয়ের লেখা বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ জনরার একটি উপন্যাস সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের।
যেখানে দেখানো হয়েছে ডলারলোভী ওই সমস্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা দিনের পর দিন যেভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, সেই সত্যকে চেপে রাখা যাবে না। ঔপন্যাসিক বুঝাতে চাইছেন সত্যিকারের মনুষ্যত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত না হলে মানুষের কোন শিক্ষাই কাজে লাগে না বরং তা মানুষকে অধঃপতনের পথেই দ্রুত টেনে নামায়। সামাজিক উদ্দেশ্য, সামাজিক দায়িত্ববোধকে অস্বীকার করে, অন্যায় ও অসভ্যের কাছে নতিস্বীকার করে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হীন স্বার্থপর মনোভাবকে লালন করে কোন মানুষের মধ্যেই প্রকৃত স্বাধীনতা ও মর্যাদাবোধ গড়ে উঠতে পারে না। আর এক্ষেত্রে বিগত দিনের সংগ্রামী ধারায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা অবস্থান থেকে যে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা, শিল্পবোধ, সাহিত্য চেতনা, সংস্কৃতি ভাবনাসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখায় যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভান্ডার গড়ে উঠেছে তার সাথে সম্যক পরিচয় থাকা দরকার৷ যেমনটি ছিলো মার্কসবাদী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জীবন আচরণ ও তার সংগ্রামী জীবন ও সাহিত্যকর্মের শিক্ষায়।
নজরুলের একটা যথার্থ মূল্যায়ন এই কারণেও আরো বেশি দরকার যে, শাসকগোষ্ঠী এবং প্রতিক্রিয়াশীল কায়েমী স্বার্থবাদী মহল নজরুলের সংগ্রামী জীবনের শিক্ষাকে আড়াল করে, নজরুলকে ঘিরে বাঙালী হৃদয়-মানসে যে প্রচন্ড আবেগ রয়েছে তাকে একভাবে সুড়সুড়ি দিয়ে, হয় তাকে সাম্প্রদায়িক গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করতে চাইছিল নতুবা নজরুলের সাহিত্যকর্মের একটা খন্ডিত দিকের উপর আলোকপাত করে তাকে উদ্দেশ্যহীন নৈরাজ্যের সীমায় বাঁধতে। সেটা তো সম্ভব হয়নি।
ঔপন্যাসিক সাম্য রাইয়ান নজরুলের সেই আদর্শকে লালন করে তার উপন্যাসে চিৎকার করে বলেছেন জনগণের বুকের উপর চেপে থাকা ধনবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান দরকার, পুঁজিবাদী শ্রমদাসত্ব থেকে মানুষের মুক্তি একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজন। রাষ্ট্র এবং সমাজজীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে সকল প্রকার জবরদস্তি অর্থাৎ শাসন ক্ষমতা থেকে স্বৈরাচার উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। রাজনৈতিক গণসংগ্রাম জয়যুক্ত করতে হলে তার পরিপূরক একটা ব্যাপক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। আর এই প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের শক্তিকে সংহত ও সুগঠিত করা, মূল্যবোধের একটা উচ্চতর স্তরে মানুষকে তুলে আনা এবং নৈতিকতাকে বলিয়ান করে অপ্রতিরোধ্য অপরাজেয় শক্তিতে উন্মোচন করতে উপন্যাসটি লেখার প্রয়োজন বোধ করেছেন মনে করছি।
উপন্যাসটি লেখার সময়কাল বিবেচনায় দেখা গেছে উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের শোষিত সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী একযোগে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর হাসিনা সরকারের পতনও নিশ্চিত করেছে।
যেটা হবার কথা ছিলো বা হয়ে থাকে, উপন্যাসে বিষয়গুলো দারুণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরিশেষে বলতে পারি উপন্যাসটিতে ঔপন্যাসিকের
রাজনৈতিক চেতনা কার্ল মার্কসের রাষ্ট্র সংস্কারের নীতি ও আদর্শ এবং একই সাথে সাম্যবাদী ও মার্ক্সবাদী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনাদর্শনের উপলব্ধি তাড়িত করেছে। তবে উপন্যাসটি লেখার ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিক কিছুটা নষ্টালজিক শব্দ চয়ন করেছেন, সেক্ষেত্রে বলবো হেতু প্রাপ্তবয়স্ক সকলেই জানেন বাসররাতে কী করা হয়, সুতরাং ঢং করে অন্যকিছু বলার দরকার নেই। তবে উপন্যাসের অনুচ্ছেদের বিভাজনের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ (যেমন ১.১, ১.২ এভাবে) এবং বিজ্ঞাপন বিরতির বিষয় এবং একই সাথে উপন্যাসটি অতিসূক্ষ্ম ডায়ালগ প্রধান হওয়ায় উপন্যাস পড়তে চায় এমন নতুন পাঠক কিছুটা হলেও বিব্রত হতে পারেন। ঔপন্যাসিক নিজেই বলেছেন— এই উপন্যাসকে বিশ্বাস করবেন না। তাই আর অন্যকিছু ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে বলে বিশ্বাস করি না।
উপন্যাসের আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু বিবেচনা করলে সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপন্যাসটি এবারের ২০২৫ ঢাকার একুশে বইমেলায় প্রকাশিত রাজনৈতিক বিবেচনায় লিখিত একটি অনবদ্য সার্থক উপন্যাস।

