সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : মনমানচিত্র

আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্রিকা ‘মনমানচিত্র’ সাম্য রাইয়ান বিশেষ সংখ্যার জন্য সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করে৷ যা ২৪ মে ২০২৩ তারিখ প্রকাশিত হয়৷

মনমানচিত্র: লিখিত রাত্রি।।  কবিতাগুলোর বুনন খুব সংহত, কিন্তু কবি’র অন্তর্লোক বড় ছত্রখান। কবি হিসাবে কী বলবেন?

সাম্য রাইয়ান: ‘লিখিত রাত্রি’ অনেক মগ্নতার বই, অশেষ ভালোবাসারও। যা রচিত হয়েছিলো ২০১৫-র জুন ও জুলাই মাসে৷ এখন ভাবতে অবাক লাগে কী আশ্চর্য মগ্নতায় আমি রচনা করেছিলাম মাত্র এক/দেড় মাসে এই পঞ্চান্নটি কবিতা! অথচ ওই সময় আমি মানসিকভাবে খুবই ডিসটার্বড ছিলাম৷ চারদিক থেকে এত এত আঘাত— বারবার ভেঙে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলাম৷ রচনার ছয় বছর বাদে ঘাসফুলের কল্যাণে পাণ্ডুলিপিখানা আলোর মুখ দেখেছিলো৷ এর মধ্যে কত সম্পাদনা, কত মাতামাতি এই সিরিজ নিয়ে!
পঞ্চান্ন পর্বের এই সিরিজজুড়ে আছে রাত্রির গল্প— অনেক রাত— রাতের পর রাত যা লিখিত হয়েছে— এক রাত্রিতে এসে তা মিলিত হয়েছে৷ সেখানে বিস্তৃত হয়েছে রাত্রির নিজস্ব আসবাব— কুকুর, পতিতা, নাইটগার্ড, পাখি, কবি, প্রেম, বিবাহ, ট্রাক ড্রাইভার…!

মনমানচিত্র: লোকাল ট্রেনের জার্নাল।। একেবারে গৃহস্ত ঘরের প্রেমিক ছেলেটি বুঝি আকুতিগুলো বলে যাচ্ছে একের পর এক। আপনার কী মনে হয়?

সাম্য রাইয়ান: ‘কবিতার দুর্বোধ্যতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনে; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো’ যাবে না।” আমি বুদ্ধদেবের এ বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত৷ কবিতা আমরা অনুভব করতে পারি৷ এমত ভাবনা থেকেই ২০১০ সালের দিকে শুরু করেছিলাম এক নতুন খেলা— কবিতা বনাম কবিতা কবিতা খেলা! এ হলো সিরিজ গদ্য৷ প্রথম গদ্যটি লিখেছিলাম, ‘সময়ের অসহায় দাস’, যা পরে বাতিল করেছি৷ এরপর লিখেছি, ‘হাঁটতে হাঁটতে পথ গ্যাছে ক্লান্ত হয়ে’৷ এরপর ক্রমান্বয়ে আরো প্রায় দশ-বারোটি গদ্য লিখেছি৷ এই গদ্যগুলোতে আমি বাঙলা ভাষার বিশেষত নতুন সময়ের নতুন কবিদের কবিতা পাঠপরবর্তী অনুভব ব্যক্ত করেছি৷ এগুলো মূল্যায়নধর্মী গদ্য নয়৷ কখনো কবিতা পড়তে পড়তে আমার মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়েছে, তা বিবৃত করেছি৷ আবার কখনো কোন কবিতা পড়ে ব্যক্তিগত কোন স্মৃতি মনে পড়েছে, তা-ই উল্লেখ করেছি৷ হুবহু, অকপটে!

মনমানচিত্র: চোখের ভেতরে হামিংবার্ড।। বইটিতে কেমন একটা শ্লোকের মত ব্যাপার আছে, আর আছে কেমন একটা স্বস্তির ভাবে। এমনটা কীভাবে হলো—আগের বইয়ের ছেঁড়াছেঁড়া ভাবটি কোথায় গেল?

সাম্য রাইয়ান: কবিকে আমার কেবলই মনে হয়- জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি৷ সে নানান সম্পর্ক- প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের- সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা৷ সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই এক রূপ ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷ এর উৎসর্গে লেখা আছে- ‘সোনামুখী সুঁই থেকে তুমি/ চুইয়ে পড়ো সুতো হয়ে/ নিচেই বিদ্ধ আমি/ সেলাই হই, তোমার সুতোয়।’
‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ে আমি একই ফর্মের কবিতাগুলো রেখেছি৷ যেমনটা আমি প্রতিটি পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে করি৷ 

মনমানচিত্র: বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা।।  কাব্যগ্রন্থের নামটি দেখে মনে হয়, এটি একজন মাওবাদী গেরিলা কবি'র কবিতা হয়ে উঠতে পারতো৷ কিন্তু তা হয়নি, যদিও পোড়খাওয়া রাজনৈতিক স্বপ্নের একটি আঁচড় আছে এখানে। বইটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

সাম্য রাইয়ান: এ পুস্তিকাটি আমার লেখালিখির শুরুর দিকের কয়েকটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত৷ তখন ছাত্র আন্দোলন করতাম৷ আর বাঙলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আমি শুরু থেকেই হতাশাবাদী ঘরানার৷ ফলে কবিতায় এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন বোধ করি৷ আর আমি এক সময়ে একরৈখিক কবিতাই লিখেছি তা নয়৷ একই সময়ে আমি বহুরৈখিক কবিতা লিখেছি৷ কিন্তু পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে আমি সময় নিয়েছি অনেক৷ এর প্রধান কারন হলো, আমি চেয়েছি কনসেপচুয়াল পাণ্ডুলিপি হোক প্রতিটি৷ ফলে একই সময়ে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ ও ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ের কিছু কবিতা লিখলেও পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে কবিতাগুলোকে আমি আলাদা করে ফেলেছি৷

মনমানচিত্র: মার্কস যদি জানতেন।। এই বইয়ের কবিতাগুলো আরও বেশি তির্যক ও সরাসরি হবে বলে ধারণা করেছিলাম, কিন্তু বাস্তবত সরাসরি না হয়ে কবিতাগুলো যথেষ্ট পরিমাণেই রূপকাশ্রয়ী- আপনার বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞান কী এমন যে, কবিতায় প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি, বা শ্রেণীসংগ্রামের জঙ্গমতা আসলে এর শৈল্পিক ভারসাম্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে?

সাম্য রাইয়ান: আপনার প্রশ্নের শেষাংশে আমার উত্তর আছে৷ আমি এমনটাই মনে করি, কবিতা আড়াল দাবি করে৷ আর এ প্রসঙ্গে আরেকটু বলি, আমার ধারনা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটা বড় ফ্যাক্ট৷ বাঙলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরাসরি কথা বলার কোন সুযোগ নেই৷ একসময় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইস্যুতে কার্টুন অনেক জনপ্রিয় ছিলো৷ কিন্তু আজ সেসব কার্টুন বিলুপ্ত! এর কারন বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা৷ কিন্তু এই ফর্মটি পরিবর্তিত হয়ে ‘মিমস’ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে৷ দুঃখের কথা হাসির ছলে বলছে৷ মানুষের বেদনা ঘনীভূত হতে হতে এমন রূপ ধারণ করেছে যে, তা নিয়ে নিজেই মশকরা করছে৷ কারন তার প্রতিবাদ করার শক্তিও আর নেই৷
তবুও এসময়ের কবিতায় এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়৷ সময়ে সময়ে কবিতার ফর্ম বদলে যায়৷ প্রতিবাদের কথা, রাজনৈতিক চিত্র— সেসব থাকে নতুন সময়ের ফর্মে৷ ষাট, সত্তর কিংবা নব্বই দশকে যে ফর্মে রাজনৈতিক কবিতা রচিত হয়েছে, আজ নতুন শতকে এসে সেই ফর্মে কবিতা লেখা হবে না, এটাই স্বাভাবিক৷ তারই প্রতিফল হয়তো পাচ্ছেন ‘মার্কস যদি জানতেন’-এ৷

মনমানচিত্র: হলুদ পাহাড়।। বইটিতে আবছা কোথায় যেন খানিক পরাবস্তবতার পোঁচ আছে। হলুদ পাহাড় নিয়ে আপনার অনুভব কী?

সাম্য রাইয়ান: ‘হলুদ পাহাড়’ এর কবিতাগুলো আমি এক মাসে লিখে ফেলেছিলাম৷ যেন হঠাৎ করেই এই সবগুলো কবিতা আমার কলমের ডগায় উপচে পড়ছিলো৷ অন্তর্গত অনুভূতিমালা আর দৃশ্যের বিবরণ লিখেছি; আমি যা দেখি— যেভাবে আমার চোখে ধরা পড়ে, তা-ই… হয়তো আমার ‘দেখা’ ‘স্বাভাবিক’ নয়… পরাবাস্তব হতে পারে… 

মনমানচিত্র: আপনার প্রত্যেকটি বই ভাবে ও ভঙ্গিমায় আলাদা আলাদা। আপনি কী থিমেটিক্যালি বইগুলো করেছেন?

সাম্য রাইয়ান: একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি হবার পর আমি সময় নিই; মাসের পর মাস কিছু লিখি না৷ পূর্বের ফর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করি৷ নতুন কিছু লিখতে চাই৷ নতুন চিন্তা— নতুন ফর্মে৷
আমার এমন হয়; দেখা যায়, মাসের পর মাস আমি কবিতা লিখিনি, লিখতে পারিনি; শুধুই ভেবেছি— চিন্তিত হয়েছি৷ কখনো বছর পেরিয়ে গেছে— কবিতা আসেনি! আগে মনে করতাম আর বুঝি লিখতে পারবো না, আমার বোধয় লেখা শেষ৷ কিন্তু না৷ তার পরই হঠাৎ করে কবিতা লিখতে শুরু করি; মনে হয় সাইক্লোনের মতো সবকিছু ভেঙেচুড়ে আসছে৷ দুর্বার গতি— যাকে রোধ করা অসম্ভব৷ এমন অবস্থা থাকে এক থেকে দেড় মাস৷ সেই সময় প্রচুর কবিতা লিখে ফেলি৷ এভাবেই লেখা হয়েছে ‘হলুদ পাহাড়’, ‘লিখিত রাত্রি’, ‘হালকা রোদের দুপুর’… 

মনমানচিত্র: একদম সাম্প্রতিক কালে অনেকের কবিতায় কেমন ধাঁধার মত একটা ব্যাপার থাকে। মনে হয়, পাঠকের যেন একটি ধাঁধার উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। ধরুন আপনার এই কবিতাটি—
এই হেমন্তে

উঠোনের সমস্ত ব্যর্থতা খুবলে আনা হৃৎপিণ্ডের
মতো প্রকাশ করা দরকার আজ। উনুনের গভীরতম
ক্যানভাস থেকে বের করে আনা দরকার সমস্ত অমুদ্রিত
জলের ইতিহাস। ডুবন্ত চাঁদের যাত্রী কীভাবে,
সেইসব তীব্র বিরল ছবি অলক্ষ্যে রোদের বাগানে
ফুটাতে দিয়ে কোনোদিন, সূর্যবেলায় খুব নির্ভার হবো।
আপনার কী মনে হয়, এই কবিতাটি পাঠকের প্রাণের কাছে আরও অনায়াস হয়ে উঠতে পারতো?

সাম্য রাইয়ান: আমি আসলেই চাই অনায়াস করে তুলতে৷ এমন একটি প্রচেষ্টা আমার মধ্যে কাজ করে৷ হয়তো পারি না, পেরে উঠি না ঠিকমতো৷ কিন্তু সহজ করে বলতে চাই৷ স্বাভাবিকভাবেই লিখি, বাড়তি কসরত আমি করি না কবিতায়৷ কিন্তু তা যে রূপ ধারণ করে তা কতোটা ‘স্বাভাবিক’ মনে হয় পাঠকের কাছে সে সম্বন্ধে আমার ধারণা নেই৷

মনমানচিত্র সব কবিরই জানায় অজানায় একটি দর্শন থাকে—আপনার দর্শন কী?

উত্তর: আমার দর্শন, সে তো কবিতায়ই প্রকাশিত৷ সেই দরশনের কথাই লিখি কবিতায়৷ আমার কবিতাই আমার দর্শন৷

মনমানচিত্র: আপনি বাংলা কবিতার পরম্পরায় নিজেকে কীভাবে যুক্ত করেন? আবার বাংলা কবিতার পরম্পরা থেকে নিজেকে কোথায় বিযুক্ত করে প্রাতিস্বিক হয়ে ওঠেন?

সাম্য রাইয়ান: আমার কথা, আমার বক্তব্য, যে কোনো বিষয় নিয়ে আমার যা চিন্তা তা আমি লিখি; লিখে বলি; এছাড়া আমার আর কোনো মাধ্যম নেই; বিকল্প নেই৷ আমি তা-ই লিখতে চেষ্টা করি কবিতায়— যে কথা আমার, যা কেউ বলছে না৷ বলার ভঙ্গিতে নতুন কিছু করবার প্রয়াস আমার মধ্যে থাকেই৷ এতে কতটুকু সফল আর কতটুকু ব্যর্থ তা পাঠকই বলতে পারবেন৷

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *