সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : আবু জাফর সৈকত

দৈনিক শিল্প-সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক আবু জাফর সৈকত নিয়েছেন তাঁর সাক্ষাৎকার৷ যা ২৭ জুন ২০২০ তারিখ দৈনিক শিল্প-সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷

আবু জাফর সৈকত: করোনাকালীন এই সময়ে কেমন আছেন?
সাম্য রাইয়ান: ভালো নেই৷ নিজেকে এখন সার্কাসের ক্লাউন মনে হয়৷ ভালো থাকার ন্যূনতম আয়োজন এদেশে নেই৷ জীবন নিয়ে এখানে চলে রাষ্ট্রীয় সার্কাস, যা বন্ধ হওয়া দরকার৷

আবু জাফর সৈকত: লেখার শুরুটা কীভাবে?
সাম্য রাইয়ান: এলেবেলে লিখতে লিখতেই শুরু৷ কবে, কীভাবে তা আজ আর মনে নেই৷ তবে এক দিনের কথা মনে পড়ে, সম্ভবত ২০০৫ এর কোনো এক বিকেল, রাশেদুন্নবী সবুজ আমায় ডেকে বললেন, “তুই তো লিখতে পারিস, এক কাজ কর, ‘স্বাধীনতা তুমি’ নামে একটা কবিতা লিখে দে— একটা প্রতিযোগিতার জন্য৷” তো আমি সেদিন ওটি লিখেছিলাম, যদিও শেষপর্যন্ত প্রতিযোগীতায় পাঠানোর তারিখ বেমালুম ভুলে যাওয়ায় আর পাঠানো হয়নি৷ সম্ভবত ওইই প্রথম, কবিতা লিখবো মনস্থির করে লিখতে বসেছিলাম৷ এখানে একটি কথা বলে রাখি, ২০১২ পর্যন্ত আমার প্রায় সকল লেখাই আমি ফেলে দিয়েছি৷

আবু জাফর সৈকত: লিটল ম্যাগাজিন না ফেসবুক কোনটা শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, আপনার মতে?
সাম্য রাইয়ান: দুইটি ভিন্ন মাধ্যম৷ একটির সাথে অপরটির তুলনা চলে না৷ যেখানে ক্ষমতার (power) রক্তচক্ষু নেই, অন্যায্য সেন্সর নেই, সেটাই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম৷

আবু জাফর সৈকত: এই সময়ের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা পড়েন? সমসাময়িক কবিদের—
সাম্য রাইয়ান: এমনিতে বই তো পড়িই৷ তাছাড়া, ‘বিন্দু’ সম্পাদনার সুবাদে প্রচুর নতুন লেখা পড়া হয়৷ পত্র-পত্রিকায় দুই ধরনের ‘জিনিশ’ কবিতা নামে প্রকাশিত হয়, এক হলো: যা কবিতা, দুই হলো: যেগুলো তা নয়৷ আমি সবই পড়ি, যা নজরে পড়ে যায়৷ এই সময়ে প্রচুর ভালো কবিতা লেখা হচ্ছে৷ এখনকার অনেক কবির কবিতাই আমি পড়তে পছন্দ করি৷

আবু জাফর সৈকত: কবির সাথে অকবির তফাৎ কতোটুকু?
সাম্য রাইয়ান: প্রেমিকার সাথে গণিকার তফাৎ যতোটুকু৷

আবু জাফর সৈকত: পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তখন কী হতে চাইবেন?
সাম্য রাইয়ান: ‘কোয়ালা’ হতে চাইবো৷ অস্ট্রেলিয়ার এই প্রাণীটি তার জীবনের ৯৯% সময় খেয়ে আর ঘুমিয়ে কাটায়। ১% সময় সে তার জীবনসঙ্গী খোঁজে। খোঁজার জন্য খুব একটা কিছু ব্যতিব্যস্ত যে সে হয়, তাও নয়। কোনো সঙ্গী না জুটলে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

আবু জাফর সৈকত: একজন কবি ও দার্শনিকের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?
সাম্য রাইয়ান: কবি মাত্রই দার্শনিক, কিন্তু দার্শনিক মাত্রই কবি না৷ 

আবু জাফর সৈকত: কবির স্বাধীনতা বলতে আপনি কী মনে করেন?
সাম্য রাইয়ান: কবির জন্য অতিরিক্ত কোনো স্বাধীনতার দাবি আমি করি না৷ মানুষের বেঁচে থাকবার প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক স্বাধীনতা থাকলেই হলো৷

আবু জাফর সৈকত: এপার বাংলার কবিতার ভাষা এবং ওপার বাংলার কবিতার ভাষার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু এবং কেন?
সাম্য রাইয়ান: এখন তো কোনো পার্থক্য নজরে আসছে না৷ উভয়ই কলকাতার মান ভাষায় লিখছে৷ তবে পার্থক্য নজরে আসতো, যদি বাঙলাদেশের জেলায় জেলায় যে ভাষা বৈচিত্র্য, তা এদেশের কবিতায়— সাহিত্যে দৃশ্যমান হতো৷ 

আবু জাফর সৈকত: সাহিত্যের বিশ্বাস আর ধর্মের বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য বা দ্বন্দ্ব কোথায়?
সাম্য রাইয়ান: ধর্ম নিয়ে যা বলার, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ… এঁরা বলে গেছেন৷ আমি আর নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাই না৷

আবু জাফর সৈকত: কবিতায় ছন্দের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলুন।
সাম্য রাইয়ান: ছন্দ ছাড়া গাছে ফুল ফোটে না, বৃষ্টি ঝরে না৷ এমনকি শিশুর প্রথম কান্নাও ছন্দ ছাড়া নয়৷ জীবন ও জীবনহীনতার প্রতিটি সত্যবিন্দুতে রয়েছে ছন্দ৷ আর এই-সব-কিছু নিয়েই তো কবিতা…

আবু জাফর সৈকত: পুরস্কার একজন লেখকের জন্য প্রয়োজনীয়?
সাম্য রাইয়ান: পুরস্কারের ক্রেস্ট, মেডেল লেখকের কোনও প্রয়োজনই নেই৷ কিন্তু টাকাটা খুবই প্রয়োজন৷

আবু জাফর সৈকত: ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ আপনার এ বছর প্রকাশিত কবিতার বই৷ এটিকে আপনি প্রথম বই বলছেন, তাহলে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ বা ‘মার্কস যদি জানতেন’ এগুলোকে কি আপনি অস্বীকার করছেন?
সাম্য রাইয়ান: নাহ্, অস্বীকার করবো কেন? হামিংবার্ডের ফ্ল্যাপে সবগুলোর নাম উল্লেখ করেছি তো৷ ফেব্রুয়ারি মাসে কিছু সংবাদপত্র যখন বইটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলো তখন আমি এ বিষয়ে বলেছিলাম৷ আবারও বলছি, বাকিগুলো ছিলো পুস্তিকা, এক থেকে দুই ফর্মার চটি৷ যেমন আমার প্রথম প্রকাশিত পুস্তিকা ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’ এক ফর্মার গদ্য সুবিমল মিশ্রকে নিয়ে, তারপর তিনটি কবিতার পুস্তিকা যথাক্রমে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, ‘মার্কস যদি জানতেন’, ‘হলুদ পাহাড়’৷ এরপর চার ফর্মার বোর্ড বাঁধাই করে একদম বইয়ের রূপ দিয়ে প্রকাশিত হলো ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷

আবু জাফর সৈকত: বইটি প্রকাশের পর পাঠকদের সাড়া কেমন পেলেন? প্রকাশক নিয়ে কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়েছিলো কি?
সাম্য রাইয়ান: আমি লিটলম্যাগের বাইরে আজ পর্যন্ত কোথাও লিখিনি৷ ফলে জনপ্রিয় হবার তরিকার বাইরে আমার অবস্থান৷ আর আমি বেসিক্যালি মূর্খ লোক৷ আমার মতো একজন লেখকের যে সামান্য কিছু কবিতা, গদ্য যে লোকে পয়সা খরচ করে কিনে পড়ে এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া৷ আমি জানি, এঁরা সব সচেতন পাঠক৷ কেননা, সচেতন পাঠক ব্যতিত কেউ লিটলম্যাগ পড়ে না৷ আর লিটলম্যাগ যিনি পড়েন না, আমার সন্ধান পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়৷
হামিংবার্ড ব্যতীত সবগুলো পুস্তিকাই আমি নিজে ছেপেছি এবং নিজেই বিক্রি করেছি, ফলে পাঠকের সাথে সরাসরি আমার যোগাযোগ হয়েছে, পরিস্থিতিটা নিজে দেখেছি৷ ‘মার্কস যদি জানতেন’ পুস্তিকাটি তো আমি সম্পূর্ণ পাঠকের পয়সায় ছেপেছিলাম, পাঠক অগ্রিম পয়সা দিয়েছিলো প্রকাশের জন্য৷ আসলে এর মধ্য দিয়ে নিজেকে বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু এবার ঘাসফুল প্রকাশনীর মাহাদী আনাম নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে সবকিছু করেছেন৷ বিক্রিতেও আমার তেমন হাত ছিলো না৷ ফলে সরাসরি ব্যাপারটা দেখার সুযোগ এবার হয়নি আমার৷ কিন্তু অনেকে ফেসবুকে, ওয়েবসাইটে বইটি নিয়ে কথা বলেছেন, আলোচনা লিখেছেন, সেগুলো পড়েছি৷ আমি এ ভেবেই পুলকিত যে লোকে পয়সা খরচ করে এ বই কিনেছেন, পড়েছেন এবং এ নিয়ে কথাও বলছেন৷ 

আবু জাফর সৈকত: আপনি ২০০৬ থেকে লিটলম্যাগ ‘বিন্দু’ সম্পাদনা করছেন৷ কিছুদিন আগে ওয়েবসাইটও হয়েছে বিন্দুর৷ এত বছর ধরে কেন প্রকাশ করছেন?
সাম্য রাইয়ান: আমি বিন্দুর সম্পাদক হলেও বিন্দু আমার একার কাগজ নয়, আমাদের কাগজ, এর সাথে অনেকেই যুক্ত৷ সকলে মিলে আমরা এটি প্রকাশ করি৷ প্রথমে বিন্দু যে উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেছিলাম তা হলো, আমাদের লিখবার কোনো জায়গা ছিলো না৷ তাই একটা জায়গা দরকার ছিলো৷ এত বছর পরে এসেও মনে হয়, আজও কি আছে তেমন জায়গা, যেখানে আমরা হাত খুলে লিখতে পারি? বিন্দুর প্রয়োজনীয়তা আজও রয়েছে এজন্যই যে, আমরা আমাদের লেখাগুলো কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য যে কোনো শক্তির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই এখানে প্রকাশ করতে পারি৷ এখানে বলে রাখি, দিন দিন লেখক ও পাঠক উভয় দিক থেকেই পরিসর বাড়ছে, যা প্রমাণ করে বিন্দু প্রকাশ জরুরী৷ আর ওয়েবসাইট (bindumag.com) আরও আগেই দরকার ছিলো, নানা সীমাবদ্ধতায় তা করা হয়ে উঠেনি৷ ২০১৯ এর ২৬ মার্চ তা সম্ভব হলো৷ এতে আরও অধিক লেখা প্রকাশের এবং পাঠকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ হলো৷

আবু জাফর সৈকত: সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ৷
সাম্য রাইয়ান: ধন্যবাদ ‘শিল্প-সাহিত্য’ পত্রিকাকে৷ শুভকামনা…

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *