সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার : নিসর্গ লিটলম্যাগ

সরকার আশরাফ সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন নিসর্গ বইমেলা ২০২৫ সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছে৷

নিসর্গ: একজন লেখকের সামাজিক দায় ব্যাপারটা কেমন?

সাম্য রাইয়ান: লেখকের সভ্যতার প্রতি দায়, নিজের প্রতি দায়। সমাজের চাহিদা মেটানোর কোনো দায় লেখকের নেই। লেখক যদি সত্য বলতে-লিখতে পারেন, তাহলেই তার দায় পূরণ করা সম্ভব। একেকজন লেখক একেকরকম স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। কেউ ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য, কেউ জাতিগত স্বাধীনতার জন্য, কেউবা লেখার ফর্মের স্বাধীনতার জন্য...। এটা নির্ভর করে নির্দিষ্ট স্থান-কাল ও লেখকের শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির উপর। 

একজন লেখক যে শ্রেণি-অবস্থান থেকেই আসুন না কেন যদি তিনি সৎ ও সংবেদনশীল হন, তাহলে অবশ্যই তাঁর সাহিত্য ক্ষমতা ও আগ্রাসনের বিপরীতে নিপীড়িতের পক্ষে দাঁড়াবে।

কর্পোরেট, ক্ষমতা (power) এর প্রভাবমুক্ত থাকতে না পারলে মুক্ত বা স্বাধীন চিন্তা চর্চা করা অসম্ভব। দুর্বৃত্ত পুঁজির করাল গ্রাস থেকে, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে না পারলে স্বাধীন সৃষ্টি অসম্ভব। একারণেই নতুন চিন্তা-বোধের কারিগর কোনোরূপ চিন্তার দাসত্ব করতে পারেন না। তা সে হোক মহৎ কিংবা হীন চিন্তা।

বাঙলাদেশের দৃশ্যমান লেখকরা, যাদেরকে ইদসংখ্যা-পুজা সংখ্যা-বিজ্ঞাপন-মঞ্চ-টেলিভিশন সর্বত্র মুহুর্মুহু দেখা যায়, এদের অধিকাংশ সাহিত্যিকই নয়, বরং সাহিত্যিকের মুখোশ পরে আছে, যেন একেকটা ফেক আইডি। বছরের পর বছর ক্ষমতা আর সাহিত্যপাতায় একে অপরের পেছনে তেল ঘষাঘষি করে, মঞ্চে আসন পেতে গলায় ক্ষমতার মেডেল ঝুলিয়ে সুবিধার নানা প্রপঞ্চের দাসত্ব করে চলেছে। অথচ আমাদের দরকার অবিক্রিত ও অবিকৃত লেখক-বুদ্ধিজীবী।

নিসর্গ: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা পট পরিবর্তনে লেখকদের ভূমিকা ও অবস্থান ক্ষমতার সাথে পরিবর্তিত হতে দেখা যায়, এই বিষয়টিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

সাম্য রাইয়ান: প্রথমত বাঙলাদেশে সাহিত্য, লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা, প্রকাশনা শিল্প সবকিছুই অবিকশিত। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত হাতে গোণা কয়েকজন মাত্র ব্যক্তি ‘সাহিত্যিক’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, বাকি সব দলিল লেখক তুল্য। ফলে এদের না আছে প্রজ্ঞা, না আছে সত্য লেখার সাহস। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও এখানে পাঁচটা জাতীয় সাহিত্য পত্রিকা নাই, যেখানে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করতে পারবে এদেশের ৬৪ জেলার লেখকগণ! এমন পাঁচজন প্রজ্ঞাবান লেখক নাই, যাদের জীবন সাহিত্যে সমর্পিত— যার কাছে নতুন লেখকরা নিঃসঙ্কোচে হাজির হতে পারেন তার পা-ুলিপি নিয়ে, সংকটকালে যিনি নতুন দিশা হাজির করতে পারেন! ‘বাংলা একাডেমী’ এখনো জাতির মননের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি! আমাদের চলমান পরিস্থিতি যখন এমনই প্রতিকূল, তখন সংঙ্কৃতির ভাঙা সেতুটাকে নতুন করে জোড়বার প্রয়াস শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবতুল্য।

ফলে মানতে কষ্ট হলেও সত্য এইই যে, সাহিত্যিক হয়ে ওঠার যাপন এখানে চোখের সামনে উপলভ্য নয়। সকল বেড়াল নিজেকে বাঘ ভেবে হালুম করে ওঠে! 

ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের দালালিও পরিবর্তন হয়। দেখবেন জুলাই অভ্যুত্থানের আগে যারা বিগত রিজিমের দালালি করতো, অভ্যুত্থানের পর তারা নতুন রিজিম প্রতিষ্ঠার জন্য দালালি অব্যাহত রেখেছে। এইটা মূলত কালচারাল ফ্যাক্ট। কালচারাল রেভল্যুশন তো হয়নি এদেশে। এক মুঠো ভাতের জন্য কেউ রাস্তায় পড়ে আছে, কেউবা দাঙ্গা-হাঙ্গামা এমনকি খুন করতেও দ্বিধাহীন। লেখকরা যদি সত্যিকার লেখক হয়ে উঠতো, তাহলে এই সকল সংকট তাদের সাহিত্যে দৃশ্যমান হতো। অথচ তারা নিজেরাও এত অসক্ত বৈষয়িক নানা লোভে, যার কাছে ভাল দাম পায় তার কাছে কলম বন্ধক রাখে। সম্প্রতি দেখছি মামুলি আইফোন-ম্যাকবুকের জন্যও অনেকে জিভ ক্ষয় করতে দ্বিধা করছে না! এদের কোনো আদর্শই নাই। এরা মূলত টাকার জন্য কলমকে খদ্দেরের সাথে শুইয়ে দেয়। আর যারা প্রকৃতই সুশাসন চায়, গণতন্ত্র চায়; তারা সব আমলেই সংখ্যালঘু-নিপীড়িত।

নিসর্গ: দেশে যে প্রমিত ভাষার বিপক্ষে একটা ভাষার রাজনীতি চলছে- এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখা উচিত?

সাম্য রাইয়ান: ভাষা ও উপভাষার সাহিত্যিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। বাঙলার ভাষাবৈচিত্র্য অপূর্ব। একথা আমরা সবাই জানি, ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে লিখিত ও কথ্যরূপে তার ব্যবহার দরকার। ফলে উপভাষার সাহিত্য নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি বাঙলার সকল উপভাষা জানি-বুঝি না, সেইটা আমার ব্যর্থতা।
তবে এদেশের ঢাকাই সাহিত্যের ক্ষমতাধর কিছু লোক প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে ক’বছর যাবত জেহাদ ঘোষণা করেছেন, যার কোনো যুক্তিসঙ্গত তাত্ত্বিক ভিত্তি আমি খুঁজে পাই না।

বরং অন্য পয়েন্টে কিছু প্র্যাক্টিকেল সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বাঙলাদেশে উপভাষা কিন্তু সংখ্যায় কম নয়। এক্ষেত্রে মান ভাষায় যারা লিখছেন সেটা সাধারণ ঘটনা, কিন্তু রংপুর বা বরিশাল অঞ্চলের একজন লেখক তিনি চাইলে তার উপভাষায় লিখতে পারেন, এতে করে তার উপভাষাটি বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু প্র্যাক্টিকেল সমস্যাটি হলো, তাদের কেউ কেউ ঢাকাই উপভাষায় লিখে নিজেকে আরবান হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছেন। তাঁর জন্মঅঞ্চলের উপভাষা নিয়ে একজন লেখকের এই হীনমন্যতা গভীরভাবে সমস্যার কারন তো! বরং বাঙলার সকল উপভাষায় যদি সাহিত্য রচিত হতো, তাহলে বাঙলার ভাষাবৈচিত্র্য অপূর্ব ভঙ্গিতে দৃশ্যমান হতো। সেটা আদতে ভাষার কাজে লাগতো। এখন লেখক কোন ভাষায় লিখবেন তা অবশ্যই তার মর্জি। কিন্তু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সামগ্রিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হওয়া সময়ের দাবি।

আর এক্ষেত্রে যারা অগ্রণী রাজনীতিবিদ, তাদের সামগ্রিক কাজকর্মও সুবিধার না তো। এরা নাটক-সিনেমা বানাচ্ছেন, সেইখানে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, নারী-পুরুষ সম্পর্ক যেভাবে হাজির করছে, প্রেম ও যৌনতা যেভাবে উপস্থিত করছে তাকে সফট পর্ণের বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। এখন ফেসবুক রিলস ভিডিওর যে অবস্থা, এদের নাটক-সিনেমাও তেমনি। আর্টকালচারের নামে এরা প্রতারণা করছে।

নিসর্গ: সাহিত্যে ইতিহাসচেতনা কীভাবে রক্ষিত হবে যা অতিরঞ্জন বা ক্লিশে মনে হবে না?

সাম্য রাইয়ান: বাঙলাদেশের তথাকথিত লেখকের দল বছর বছর শুধু ক্ষমতার দালালী করে গেল— সেলিব্রেটি হলো, পদবীর লোভে পদলেহন করে গেল! ফলে এদের বদমায়েশির শিকার এদেশের সাহিত্য-ইতিহাস। শিল্পীর প্রধানতম কর্তব্য হলো তাকে সত্য বলতে হবে। এই কর্তব্য যদি সে সঠিকভাবে পালন করতে পারে, তাহলেই যথেষ্ট। লেখক-শিল্পী সে নয়, যে অতিরঞ্জিত করে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে আমরা যত লেখককে মুহুর্মুহু দেখতাম, বলতে গেলে সবাইই নানাভাবে ক্ষমতার পদলেহন করেছে— এই পদলেহনকর্মই আওয়ামীলীগকে ফ্যাসিবাদী করে তুলেছিল। যখন আওয়ামী লীগের পতন হলো তখন সেই লেখকগুলোকেই দেখলাম কেউ বিএনপি, কেউ জামাত আবার কেউ বৈষম্যবিরোধী ও অন্য অনেক নামে অনেক ক্ষেত্রে ভীড়ে গেল। এদের না আছে সততা, না আছে প্রজ্ঞা।
লেখকের পরিমিতিবোধ থাকার কথা সবচে বেশি। আমি কতটুকু লিখবো, আর কতটুকু না— এই বোধ না থাকলে সে সাময়িক হাততালি পেলেও শেষ গন্তব্য আস্তাকুঁড়। লেখক সমাজের সেই প্রয়োজনীয় ইনজেকশন যা শরীরে ইনজেক্ট করার সময় ব্যথা লাগে বটে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফল সভ্যতার উপকারেই লাগে। কিন্তু সমকালে সেই ব্যথাটুকু সমাজ গ্রহণ না-ও করতে পারে। এখন লেখক যদি মনে করেন, সমাজ মুচমুচে তেলেভাজা খেতে পছন্দ করছে বলে তাকে তা-ই সরবরাহ করি, তাহলে তা সমকালে যতই প্রশংসিত হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারন। যে ক্ষতি অতীতের অনেক লেখক করেছেন, এখন অনেক তরুণও করে চলেছেন। জনপ্রিয়তার লোভ লেখককে সভ্যতার অশ্লীল ক্লাউনে পরিণত করে।

নিসর্গ: আড্ডা বা ছোটকাগজ বা ইত্যাকার গোষ্ঠীবদ্ধতা সাহিত্যের কী কাজে লাগে?

সাম্য রাইয়ান: আড্ডা ও লিটল ম্যাগাজিন অঙ্গাঅঙ্গীভাবে যুক্ত। আর সৃজনশীল গোষ্ঠীবদ্ধতা লিটল ম্যাগাজিনের গ্রাউণ্ড। এক বা একাধিক লেখক যখন প্রচলিত চিন্তা-পদ্ধতির চর্চাপথে হাঁটাচলা করতে না পেরে নতুন পথের নির্মাণ করতে উদ্যত হন, তখনই গড়ে ওঠে লিটল ম্যাগাজিন। যে নিজেই নিজের পথ-নির্মাতা। গুচ্ছ গুচ্ছ নতুন পথের যাত্রীর আশ্রয়দাতাও সে-ই। লেখককে সে আটকে রাখে না, সীমাবদ্ধ করে না; অসীম ছোঁবার স্বপ্নটি দৃঢ়তার সাথে উস্কে দেয়। একটি সত্যিকার লিটল ম্যাগাজিন লেখককে নিয়ন্ত্রণ করে না, লেখককে ধারণ করে। লেখকের হাতের সাথে পা বেঁধে বলে না, ‘উড়ে যাও’; বরং বাঁধন খুলে দেয়ার গেরিলা ভূমিকা পালন করে সে।

আমাদের বঙ্গদেশে আরেকধরনের নীচশ্রেণির গোষ্ঠীবদ্ধতাও সগৌরবে চলমান! সাহিত্যিক গোষ্ঠীর নাম করে ক্ষমতাবান লোকেরা ব্যক্তিগত বাহিনী তৈরি করে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন! এরা ইচ্ছে হলে যা খুশি করতে পারে। জাতীয় কমিটি করতে পারে, আন্তর্জাতিক কমিটি করতে পারে, লিটলম্যাগ-জাতিগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিবৃতি দিতে পারে, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করতে পারে, লিটলম্যাগের নামে জুতোর দোকান দিতে পারে, লিটলম্যাগের সমিতি বানাতে পারে; এবং সকল কর্মকান্ডে ট্যাগলাইন দিতে পারে ‘সারাদেশের লিটলম্যাগ কর্মীদের পক্ষ থেকে!’ জ্বি এরই নাম প্রেম, প্রেমের নাম বেদনাৃ ও না স্যরি, এরই নাম ক্ষমতা, ক্ষমতার ডাকনাম ‘পাওয়ার’।

এইভাবে পুরনোপন্থী কিছু পার্টিআম্রেলাপার্সন নিজেদের কয়েকটি ‘লিটল ম্যাগাজিন’কে সারাদেশের লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে পথ দেখিয়েছে তারই পথ ধরে এখন দেশে ধর্মীয় পত্রিকাগুলোও নিজেদের সাহিত্যের লিটল ম্যাগাজিন দাবি করছে। খেলা শুধু এখানেই থেমে নেই, তারা ধর্মীয় পত্রিকাগুলো দিয়ে লিটল ম্যাগাজিন মেলা করছে, লিটল ম্যাগাজিন সমিতি বানাচ্ছে।

পুরনো চিন্তারপথের এই যাত্রীগণ লিটল ম্যাগাজিনের কাঁধে তাদের পুরনোপন্থী নানারকম— মনের মাধুরী মেশানো এজেন্ডা চাপিয়ে লিটলম্যাগের চলন ভারাক্রান্ত করতে চান। অথচ, এই সবরকম ফর্মেশন উল্টে দেয়াই লিটল ম্যাগাজিনের ধর্ম। লিটলম্যাগ— সে তো সকল প্রচল-প্রথার বিরূদ্ধে— যা কিছু প্রতিষ্ঠিত-আরোপিত— সেই সকল পদ্ধতি/সংজ্ঞার বেড়ি ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। কবিতার মতোই সে স্বাধীন ও মুক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তাপদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীতে তার অবস্থান। পুরনো চিন্তা দিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার চেষ্টা বাতুলতামাত্র!

একসময় এদেশে লিটলম্যাগের পাওয়ারফুল গোষ্ঠীগুলোর একমাত্র এজেন্ডা ছিল দৈনিক পত্রিকায় গল্প-কবিতা ছাপানোর বিরোধিতা করা। অথচ লেখক কোথায় লিখবেন, না লিখবেন, এইটা সেকেন্ডারি ইস্যু। গোটা দুনিয়ায় ফার্স্ট ইস্যু হচ্ছে লেখক কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন, কেন লিখবেন। কিন্তু ১৯৮০-র দশক থেকেই এইদেশে হলো উল্টো। লেখক কোন কাগজে লিখবেন, এটাই হয়ে গেল প্রধানতম আলোচ্য। ফলে শিল্পকলা শিল্পহীন, রইলো শুধুই কলা। তারই ফলাফল এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। অবিকশিত এই মুভমেন্ট হাজামজাডোবা পুকুরে ডুবে রইল। নতুন সাহিত্য নির্বাসিত, লিটলম্যাগ মুভমেন্ট বিপর্যস্ত। অবস্থা নির্মম, দুঃখজনক। না কোনো নতুন সাহিত্যতত্ত্ব, না কোন  নতুন সাহিত্যদর্শন— কিছুই দেয়া গেল না, আন্দোলিত হলো না সাহিত্য! একারণেই কলকাতার পঞ্চাশ বছর আগের কবিতা কিংবা ইউরোপ/লাতিনের দুইশ বছর আগের কবিতা লিখতে পারলেই আনন্দে-আহ্লাদে গদগদ হয়ে যাচ্ছি! কেউ কেউ তো আরো এক কাঠি সরেস— শতবর্ষ আগের কবিতার অনুকরণে লিখে নিজেকে নতুন সাহিত্যের প্রবক্তা দাবি করে বসছে! কতই রঙ্গ দেখি বাঙলায়!

তবুও থামে না প্রয়াস! কুমিরের খাঁজ কাটা গল্পের মতো লিখিত হতে থাকে দিস্তা দিস্তা এজেন্ডা, বস্তা বস্তা ধুলোবালির স্তুপ— গার্ডার ভেঙে যায়, তবু হুশ ফেরে না।

দুঃখটা কী জানেন, যে লিটলম্যাগ প্রচল-প্রথার বিরুদ্ধে, গত দশ বছরে তাতে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের লোকেরাও ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে! যে লিটলম্যাগ সকল প্রকার ক্ষমতা-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তাতে এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাতের নেতারাও ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে! যে লিটলম্যাগ সকল প্রকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে, তাতে এখন কর্পোরেট ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে!

অথচ, লিটল ম্যাগাজিনের এজেন্ডা বলে যদি কিছু হয়, হতে পারে শুধু একটাই— লেখকের স্বাধীনতা!

নিসর্গ: দেশের সাহিত্য পুরস্কারগুলোর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কেমন মনে হয়? পুরস্কারগুলো সাহিত্যের কী কাজে লাগে?

সাম্য রাইয়ান: সবথেকে হাস্যকর ব্যাপার হলো, বৃদ্ধ বয়সেও এদেশে লেখকরা কোনো পুরস্কার গ্রহণই বাদ রাখতে চান না; নানান পুরস্কার নিতে হাজির হন নগরে ও গ্রামে। যাদের বরং তরুণদের পুরস্কৃত করার কথা, আলোচনা-সমালোচনা দিয়ে, তারা নিজেরাই সেখানে পুরস্কার নেয়ার জন্য লালায়িত হয়ে থাকেন। আমি যখন দেখি যে লেখকের বিচারকের আসনে থাকার কথা সে নিজেই পুরস্কার নিচ্ছে— আমার হাসি পায়। 
এদেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পুরস্কার দেখলাম না যেটা সত্যিকার অর্থে লেখকের কোনো কাজে এসেছে। অন্তত যদি টাকাপয়সা দিত পাঁচ-দশ লাখ, তাতে অন্তত লেখকের কিছু উপকার হতো। কিন্তু ম্যাক্সিমাম পুরস্কারই অর্থমূল্যহীন। ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই। এরা বরং সাহিত্যকেই হাস্যকর করে তুলেছে। লেখক যদি লিখে সম্মানের জীবন যাপন করতে না পারেন সেটা সমাজের পশ্চাৎপদতার নিদর্শন। লেখক যদি বই বিক্রি করে ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে না পারেন তাহলে তিনি যখন ক্ষমতার পদলেহন করেন, সমাজের সে বিষয়ে কিছু বলার নৈতিক অধিকার থাকে কি? এদেশে এমন লেখক কেন আমরা পাই না যিনি শেষ বয়স পর্যন্ত লেখার মান ও সততার সাথে কম্প্রোমাইজ করেননি? এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করা দরকার।

এইসব পথচলতি পুরস্কারের অর্থমূল্য ছাড়া আর সব অপ্রধান আমার বিচারে। এখানে সরকারি-বেসরকারি বলতে গেলে সকল পুরস্কারই নিজেদের অসাহিত্যিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো বেড়ালকে বাঘ হিসেবে হাজির করতে চায়। বাংলা একাডেমি পুরস্কার হতে পারতো এদেশের লেখকদের জন্য সম্মানজনক পুরস্কার। কিন্তু ওর সাহিত্যিক মান লোক পুরস্কারের চেয়ে খারাপ। লোক পত্রিকা যে কয়েকজনকে পুরস্কার দিয়েছে যদিও তারা সকলে সম্পাদকের ১৯৯০ দশকের বন্ধু-বান্ধব, সে যা-ই হোক; তবু তারা সাহিত্যিক তো অন্তত। তাদের প্রত্যেকেরই উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম রয়েছে। কিন্তু বাংলা একাডেমি যা আমাদের ‘জাতীয় মননের প্রতীক’ হবার কথা ছিলো, সেখানে যাদের পুরস্কৃত করা হয়, তাদের অধিকাংশই সাহিত্যিকই না। এগুলো জাতির সাথে মশকরা, প্রতারণা। বছরের পর বছর এগুলো চলছে। দেখার কেউ নেই—কথা বলার কেউ নেই। যাদের মাঝে মাঝে এসব নিয়ে হাউকাউ করতে দেখি তার অধিকাংশই মূলত নিজেরা না পাওয়ার বেদনা নিয়ে হাউকাউ করছে৷ এদের চাওয়া ভীষণরকম আত্মকেন্দ্রিক।
অথচ একজন প্রকৃত লেখক, সে কখনোই বিক্রির জন্য নয়, সহজলভ্য নয়। চোখ ঘোরালেই তাকে পাওয়া যায় না। সভ্যতার সংখ্যালঘু জীব।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *