❑ ড. সুশান্ত চৌধুরী
১৯০৮ সালে খুলনার সেনহাটী জাতীয় বিদ্যালয়ের (বর্তমান দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী গ্রাম) শিক্ষক ও কবি হীরালাল সেনের কবিতার বই ‘হুঙ্কার’ প্রকাশ পায়। দেশ তখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। আর সেই স্বপ্ন জ্বেলে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বইটি হীরালাল সেন উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে৷ সেই উৎসর্গের জেরে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল বিশ্বকবিকেও! সেই মামলায় রাজসাক্ষী নাকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্তত আদালতের রেকর্ড তাই বলে। ছোটলাট অ্যাণ্ড্রু ফ্রেজারের মতলব ছিল রবীন্দ্রনাথকেও কাঠগড়ায় তোলা। আদালতে উপস্থিত বৃদ্ধ উকিল কালিপদ রায় জানিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন— স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষী তরুণের পক্ষে উত্তেজক কবিতা বা গান লেখা আদৌ অস্বাভাবিক নয়। ওকালতি তার পেশা নয়, সুতরাং কবিতা বা গান কী পরিমাণ উত্তেজক হলে সেটা আইনত দণ্ডনীয় হবে সেটা তাঁর জানা নেই।
সেই মামলায় আসামীকে কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অবশ্য কখনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিন্তু পুলিশের সন্দেহভাজনের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। লালবাজারের খাতায় তাঁর পরিচয় ছিল, ‘Robi Tagore, I. B. Suspect Number 11’। শোনা যায় জোড়াসাঁকো থেকে কবি রাস্তায় পা দিলেই গুপ্তচর মারফত খবর পৌঁছে যেত হেড-অফিসে।
উৎসর্গপত্রের জন্য এমন আজব ভোগান্তি সত্যিই বিরল। বই উৎসর্গ মানেই যে বিড়ম্বনা তা কিন্তু নয়৷ এটি ব্যতিক্রম ঘটনা৷ একটি বইয়ের উৎসর্গপত্র কী? এপ্রসঙ্গে অনির্বাণ রায় তাঁর ‘উৎসর্গপত্র’ বইয়ে লিখেছেন,
“উৎসর্গপত্র বইয়ের অঙ্গ। এক থেকে একাধিক ছত্রে তার আয়তন-বিস্তৃতি। এতে ধরা থাকে একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, দৃষ্টিভঙ্গি, মর্জিমেজাজ, সমাজসময়ের ধূসর ছবি, ইতিহাসের টুকরো, জীবনের ভগ্নাংশ— এমন কত কিছু।’’
এবার আসি বই উৎসর্গের খানিক গোড়ার কথায়৷ প্রাচীন ও মধ্যযুগেও বই উৎসর্গের চল ছিল বলে প্রমাণ মেলে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে এথেন্সবাসী গ্রিক রাজনীতিক অ্যারিস্টাইডিস নাকি বলেছিলেন, ‘উপাসনালয় উৎসর্গিত হয় দেবতার উদ্দেশে আর বই উৎসর্গ করতে হয় মহান মানুষকে।’ তাঁর ওই উক্তির কারণেই কি না জানা নেই, পাশ্চাত্যে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বেশির ভাগ বই-ই উৎসর্গিত হয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বা রাজপুরুষ-রাজরানিদের উদ্দেশে। ইংল্যান্ডে রেনেসাঁসের প্রথম যুগে বা ষোড়শ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে গ্রন্থ উৎসর্গের প্রথা পুরোদমে চালু হয়। তখন ইংল্যান্ডের রানি ছিলেন প্রথম মেরি। তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র ৪২ বছর, কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেই তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছিল বিচিত্র সব বিষয়ের ৩৩টি বই ও ১৮টি পাণ্ডুলিপি। ১৬০৫ সালে মিগুয়েল দে সেরভান্তেস তাঁর ডন কিহোতে উপন্যাসের প্রথম খণ্ড প্রকাশের সময় কোনো উৎসর্গপত্র না দিলেও বছর দশেক পরে যখন দ্বিতীয় আরেকটি অংশ নিয়ে এক অখণ্ড সংস্করণ বের হলো, তখন ঠিকই বেশ কয়েকজন স্পেনীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও প্রশাসকের নামে একটি উৎসর্গপত্র লিখেছিলেন। তবে বই-উৎসর্গের প্রথা আমাদের দেশে ছিল না, সংস্কৃত সাহিত্যধারায়ও এর তেমন কোনও নিদর্শন মেলে না। ইংরেজি গ্রন্থাদির অনুকরণে বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে এই উৎসর্গপ্রথা চালু হতে শুরু করে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পরে।
সাধারণভাবে বইয়ের উৎসর্গগুলি উপহারের একটি ঐতিহ্য হিসেবে প্রচলিত। এই ব্যক্তিগত বার্তাগুলি উপহারের অর্থের অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে, সেইসাথে সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক দলিলও স্থাপন করে। একটি সাধারণ উৎসর্গ একটি বইকে একটি বিশেষ মর্যাদাবান উপহারে পরিণত করতে পারে যা ভবিষ্যতে বিশেষ অর্থ বহন করবে।
অনেক গ্রন্থের উৎসর্গপত্র ধরে রাখে তৎকালীন সাহিত্যের ইতিহাস, এমনকি তার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে বইটির প্রকাশকালের সমাজ-ইতিহাস-রাজনীতির নানা চালচলন। কোনো বইয়ের উৎসর্গপত্রটি পড়ে লেখকের ব্যক্তিজীবনের নানান চড়াই-উতরাই, ভাবনা, পৃথিবীর অবয়ব ও মনোজগতের নানা কূটাভাসও পাঠক অনুভব করতে পারেন। এ ছাড়া রচয়িতার নিজস্ব ক্ষোভ, রসবোধ ও মেজাজ-মর্জির ধীর বা চঞ্চল চালচলনও এতে ধরা পড়ে বৈকি।
আধুনিককালে যন্ত্রশক্তি ও প্রযুক্তির কারণে বই প্রকাশ যেমন সহজ হয়ে এল, তেমনি বইয়ের উৎসর্গপত্রের বৈচিত্র্যও বাড়ল। রাজা-রানি-অভিজাতদের বৃত্তের বাইরে নানা মানবিক গল্পও জড়িয়ে যেতে থাকল সেসব ঘিরে। যেমন কার্ল মার্ক্স তাঁর মহাগ্রন্থ ডাস ক্যাপিটাল (১৮৬৭) উৎসর্গ করেন প্রয়াত বন্ধু স্কুলশিক্ষক উইলহেম উলফকে। যিনি কিনা মৃত্যুর আগে মার্ক্সের জন্য বেশ কিছু অর্থকড়ি রেখে গিয়েছিলেন। পুরো জীবনে লেখা নিজের সেরা বইটি তাই আর কাউকে উৎসর্গ করার কথা মার্ক্স ভাবতেও পারেননি।
উৎসর্গপত্র নিয়ে নানা রকম মন–কষাকষি বা উদ্ভট কাণ্ড অবশ্য দুর্লক্ষ্য নয়। কখনো কখনো প্রকাশকের খামখেয়ালিতে বা লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনে পাল্টে যায় উৎসর্গপত্র। আবার উৎসর্গপত্র মারফত মনের ক্ষোভ মেটানোর কাণ্ডও দুর্লভ নয়। মার্কিন কবি ই ই কামিংস একবার সেভেন্টি পোয়েমস নামের একটি বই প্রকাশের আশায় মোটমাট ১৪টি প্রকাশনা সংস্থায় পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম, প্রতিটির কাছেই তাঁকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। অগত্যা উপায় না দেখে মায়ের কাছ থেকে টাকা ধার করে বইটি তিনি নিজেই ছাপেন, যদিও নাম দেন পাল্টে। নো থ্যাংকস (১৯৩৫) শিরোনামে বইটি প্রকাশ পেলে দেখা যায়, যে ১৪ প্রকাশকের দ্বারস্থ হওয়ার পর কামিংস বিফল হয়ে ফিরেছিলেন, বইটি উৎসর্গিত হয়েছে তাঁদেরই নামে। চার্লস বুকাওস্কির মতো প্রথাভাঙা লেখক আবার তাঁর উপন্যাস পোস্ট অফিস-এর (১৯৭১) উৎসর্গপত্রে সোজা ঘোষণাই করেছিলেন, ‘বইটি কাউকে উৎসর্গ করা হয়নি’। ইংরেজ অভিনেতা ও লেখক স্টিফেন ফ্রাই তো আরও এক কাঠি সরেস, তাঁর দ্য লায়ার (১৯৯১) উপন্যাসের উৎসর্গপত্রের পাতায় খানিকটা ফাঁকা জায়গা রেখে নিচে লিখে দিয়েছিলেন, ‘ওপরে পুরো নামটা বসিয়ে নিন।’
পাশ্চাত্য কেতায় প্রথম বাংলা বই কাউকে উৎসর্গ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ১৮৫৯ সালে প্রকাশ পাওয়া নিজের শর্মিষ্ঠা নাটকটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ বাহাদুর ও রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ বাহাদুরকে। আজ থেকে ১৬০ বছর আগে শুরু হওয়া গ্রন্থ উৎসর্গের এই ধারা এখনো বাংলা সাহিত্যে বিচিত্ররূপে বহমান। মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) বা হেকটর-বধ (১৮৭১)। আবার রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করার বেলায় খানিক কৃপণ ছিলেন বলতে হয়। জীবদ্দশায় প্রকাশিত ২০৮টি বইয়ের মধ্যে তাঁর উৎসর্গপত্রসমেত প্রকাশিত বই মাত্র ৬৪টি। আবার কাউকে কাউকে দুটি করে বইও উৎসর্গ করেছেন। কাদম্বরীসহ মোট ৫১ জন ব্যক্তি তাঁর গ্রন্থের উৎসর্গলাভে ধন্য হতে পেরেছেন শেষমেশ।
সমকালীন বাংলা কবিতা জগতে উৎসর্গ যেন আরো বৈচিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়৷ সমকালের সদা নিরীক্ষাপ্রবণ কবি সাম্য রাইয়ান কল্পজগৎ উন্মোচনের ইঙ্গিত দেন উৎসর্গপত্রের সেই ছোট্ট পরিসরেও। কয়েকটিমাত্র শব্দে কখনো সেখানে তিনি মুগ্ধতা অথবা হাহাকারে গল্প বলেছেন, কখনো বলেছেন নিখাদ ভালোবাসার কথা, কখনো রেখেছেন অপার রহস্য। যে রহস্য উন্মোচনের দায়ভার বিদগ্ধ পাঠকমহলের উপরই বর্তায়৷ সাম্যর লেখার মতো তাঁর উৎসর্গপত্রের জগৎ বড়ই বিচিত্র, আকর্ষণীয়। এগুলো পড়লে তাঁর উথালপাতাল জীবনের নানা হাহাকার ও সাহিত্যিক প্রেরণার বিষয়ে ইঙ্গিত মেলে৷ এগুলো প্রত্যেক বইয়ে বিচ্ছিন্ন আকারে থাকায় এবং এদের আকার ক্ষুদ্র হওয়ায় হয়তো অনেকের উপলব্ধি এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেসব উৎসর্গপত্র একত্র করলে দেখা যাবে সাম্য রাইয়ানের নতুন এক জগত উদ্ভাসিত হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গদ্যের বই ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’৷ মাত্র ১৬ পৃষ্ঠার এ বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন, “পথিক ভাই/ কামরুল হুদা পথিক;/ যিনি আমাকে সুবিমল মিশ্রর সাথে পরিচয় করিয়েছেন৷” সরল সাদামাটা উৎসর্গ৷ যেহেতু কামরুল হুদা পথিক নামে কেউ একজন তাকে সুবিমলের সাথে পরিচয় করিয়েছেন, তারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তিনি সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে বইটি তাকে উৎসর্গ করেছেন৷
২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় সাম্য রাইয়ানের প্রথম কবিতার বই ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’৷ বাঙ্ময় প্রকাশিত এ বইটি তিনি উৎসর্গ করেন কবি রাশেদুন্নবী সবুজকে৷ উৎসর্গপত্রে লিখেন, ‘একজন মানুষ’৷ মানুষের পরিচয় দিতে কবি যখন লিখেন ‘একজন মানুষ’, তখন ‘মানুষ’ শব্দটি আমাদের সামনে একই সাথে রহস্য ও একগুচ্ছ জিজ্ঞাসা সমেত উপস্থিত হয়৷ বোঝা যায়, আমরা চারপাশে যত মানুষরূপী প্রাণী দেখি, রাশেদুন্নবী সবুজকে লেখক তাদের থেকে ব্যতিক্রম হিসেবে উপস্থাপন করেন৷ তাঁর বিচারে সবুজ প্রকৃত মানুষ৷
এরপর কবির ‘হলুদ পাহাড়’ ও ‘মার্কস যদি জানতেন’ শিরোনামে দুইটি ছোট বই (যথাক্রমে ২৪ ও ১৬ পৃষ্ঠা) প্রকাশিত হয় উৎসর্গপত্র ছাড়াই৷ এবং এর পরেই শুরু হয় আসল রহস্য৷ ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় কবির কবিতাবই ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷ ৬৪ পৃষ্ঠার এ বইয়ের অনুপম উৎসর্গপত্রটিতে কবি লিখেছেন,
‘সোনামুখী সুঁই থেকে তুমিচুইয়ে পড় সুতো হয়েনিচেই বিদ্ধ আমিসেলাই হই তোমার সুতোয়৷’
উৎসর্গপত্রটি যেন এক হৃদয়গ্রাহী প্রেমের কবিতা৷ কিন্তু কাকে উদ্দেশ্য করে কবি এই পংক্তি লিখেছেন তা অজানাই থেকে যায়৷ শুধু থাকে ইঙ্গিত৷ এই ইঙ্গিত আমাদের কৌতুহলী করে তোলে৷ আমরা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি৷ বইটির কবিতাগুলো পাঠ করে একটি নাম আবিষ্কার করতে পারি ‘হামিংবার্ড’ শীর্ষক কবিতায়৷ যেখানে কবি লিখেছেন, ‘চমকে দিও না তাথৈ/ উড়ে যাবে৷’ তাহলে কি তাথৈ কোন ব্যক্তির নাম— নারীবিশেষ? তাকেই কি উৎসর্গে ইঙ্গিত করেছেন? আমরা অনুমান করতে পারি মাত্র৷
২০২১ সালে প্রকাশিত হয় সাম্য রাইয়ানের আখ্যানধর্মী মুক্তগদ্যের বই ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’৷ এর উৎসর্গপত্র রহস্যময়, শিরোনামের সাথে সাজুয্যপূর্ণ— ‘ব্যাগভর্তি গুডবাই নিয়ে চললে কোথায়?’ এ তো নিছক উৎসর্গপত্রের সীমা ছাড়িয়ে কবির অন্তর্গত তরতাজা উপলব্ধির প্রকাশ। কাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন কবি? উত্তর অজানা৷ এটিও কি কোনো নারীকে? হামিংবার্ডকে? তাহলে কি যাকে কবি হামিংবার্ডের রূপকে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি কি চলে গেছেন? অজস্র কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে কবি সরে দাঁড়ান! এত রহস্য কেন তাঁর উৎসর্গপত্রে? রহস্যময় উৎসর্গ পত্রের কথা যখন উঠলই তখন যে উৎসর্গপত্রের রহস্য উদঘাটনে গবেষকদের রীতিমত গলদঘর্ম হতে হয়েছিল এবং তারা শেষ পর্যন্ত এর রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি, সেটির কথা উল্লেখ করতেই হয়৷ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সনেট সংকলনের উৎসর্গপত্রে উল্লিখিত ‘মি. ডব্লিউ এইচ’ আদতে কে, তা খুঁজে বের করতে বিশেষজ্ঞরা গলদঘর্ম হয়েছেন বহুবার। সম্প্রতি গবেষক জিওফ্রে কেনেভলি দাবি করেছেন, ওই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি আসলে বইয়ের প্রকাশক টমাস থর্পের বন্ধু উইলিয়াম হোম। উপরন্তু সনেটগুচ্ছের উৎসর্গপত্রটি আদৌ স্বয়ং শেক্সপিয়ারের রচিত, নাকি প্রকাশকই আদতে তা লিখে দিয়েছিলেন, এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
২০২২ সালে প্রকাশিত হয় সাম্য রাইয়ানের কবিতার বই ‘লিখিত রাত্রি’৷ ৫৫ পর্বের সিরিজ কবিতার এ বইয়ের উৎসর্গে কবি লিখেন, ‘এই মাঝরাতে ক্যান তুমি দূরের পাখি হইলা কও?’ এই উৎসর্গ পাঠের পর কবির অন্তর্গত তীব্র হাহাকার আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, আমরা আক্রান্ত হই৷ ভাবি, প্রিয় মানুষ মাঝরাতে দূরের পাখি হয়ে যাবে কেন? কতোটা নিবিড় বেদনা এই একটিমাত্র বাক্যে লুকানো তার রহস্য উন্মোচনে ডুব দিতে হয় লিখিত রাত্রির গহীনে৷ তবু যদি কিছু খোলসা হয় এই আশায়!
২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় কবিতার বই ‘হালকা রোদের দুপুর’৷ এর উৎসর্গপত্রে যে অনুপম নিবেদন কবির, তা-ও একবাক্যে— ‘আমাকে বহন করো নখের মতো, বেড়ে ওঠার যত্নে৷’ উৎসর্গপত্রও মনে হয় তাঁর কবিতার মতোই কৌতূহলোদ্দীপক। নখের প্রতীকে কবি এখানে অনুল্লেখিত একজনের সঙ্গী হবার যে নিবেদন পেশ করেছেন, তা কি সত্যি হবে? নখ আমাদের কাছে খুব সাধারন, কবিও খুব সাধারনভাবেই সঙ্গী হতে চেয়েছেন, বিশেষ কিছু আয়োজন তার দরকার নেই৷ সাধারণ, স্বাভাবিকভাবেই তিনি সঙ্গী হতে চেয়েছেন৷ তথাপি নখের প্রতি আমরা যতটুকু যত্নশীল, ততটুকু যত্নহীন হলেই তিনি সন্তুষ্ট৷ এর অধিক-বিশেষ প্রত্যাশা কবির নেই৷ কিন্তু নখের প্রতীকে এরকম আহ্বান নতুন৷ সামান্য সাধারন অতিপরিচিত নখও কবির সান্নিধ্যে কতটা নিপুণ ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হতে পারে তা সাম্য রাইয়ান দেখিয়েছেন৷ তাঁর উৎসর্গপত্রগুচ্ছ পাঠ করে কবিমনের ভেতরকার এক অতল হাহাকারের নিদর্শন আমাদের সামনে উঠে আসে না?
একটি চমৎকার জগৎ রয়েছে সাম্য রাইয়ানের বইয়ের উৎসর্গগুলোর৷ অনেক আড়াল, অনেক রহস্য নিয়ে তা পাঠককে আহ্বান জানায় কবিতার অন্তর্লোকে প্রবেশের৷ বিশেষত তাঁর চারটি গ্রন্থের উৎসর্গপত্র আমার দৃষ্টিতে একজনকেই উদ্দেশ্য করে লেখা৷ কবি সযত্নে তাঁর নাম এড়িয়ে পাঠককে দাঁড় করিয়েছেন অভাবিত রহস্যের দ্বারপ্রান্তে৷ এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা৷ যখন হিসাব করে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা ১১টি বই উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর ‘নতুন বৌঠান’ কাদম্বরী দেবীর নামে৷
উৎসর্গপত্র যেমন লেখকের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও হাহাকার, আশা-নিরাশা-স্বপ্ন ধরে রাখে, তেমনই তা সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রকাশ ঘটায়। তাই উৎসর্গপত্রের গভীর পাঠ থেকে লেখালেখির নানা জটিলতা ও লেখকদের মানসিকতার ইতি-নেতি বুঝতে কিঞ্চিৎ হলেও সুবিধা বৈকি।