সাম্য রাইয়ানের ফুলবতী-নদীমাতৃক কবিতার চিত্ররূপময়তা বিষয়ক সন্দর্ভ

❑ ড. অমিতাভ কর 

খুব সম্প্রতি এক কবির কবিতার বই পড়ে মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে আছি৷ আমি জানি না, সাম্প্রতিককালে বাংলা ভাষায় কোনো কবির পরপর সবগুলো কবিতার বই পড়ে এত নির্মল আনন্দ, না আমি অন্তত, ইদানিংকালে আর পাইনি৷ বে‌শির ভাগ ক‌বিরই প্রথম বই আর শেষ বইয়ের তেমন কোন পার্থক্য খুঁজে পাই না। প্রথম বই থেকে তারা যেন একই কবিতা লিখে যান শেষ গ্রন্থ পর্যন্ত। এর কারন হলো, বে‌শিরভাগ লেখকই নি‌জে‌কে মূল্যায়ন কর‌তে পা‌রে না। এরা ক‌বি হিসেবে অনগ্রসর গোত্রের। সম‌য়ের  সা‌থে সা‌থে চিন্তা না বদলা‌লে ক‌বিতা অগ্রসর হয় না। ক‌বিতা নামক ভাষার যে ফলাফল তা চিন্তারই প্র‌তিফলন। কবি ব্যক্তিটির চিন্তার বিকাশ ঘটলে তবেই না নতুন ক‌বিতা জন্ম নি‌বে!

অসাধারণ এই কবির হাতে লিখিত হয়েছে একগুচ্ছ যাদু-কবিতা৷ তার চিন্তাবিশ্ব রঙিন (colorful) এবং প্রকাশভঙ্গি অনন্য (Unique)৷ বারংবার পাঠের আবেদন সৃষ্টিতে সক্ষম৷ সদা নিরীক্ষাপ্রবণ এই কবির নাম সাম্য রাইয়ান৷ যিনি জন্মগ্রহণ করেন ৩০ ডিসেম্বর, নব্বইয়ের দশকে কুড়িগ্রাম জেলায়। ২০০৬ থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প-সাহিত্যের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু’ (www.bindumag.com)৷ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখছেন। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরণের আখ্যানধর্মী গদ্য৷ প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট [গদ্য, ২০১৪]; বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা [কবিতা, ২০১৫]; মার্কস যদি জানতেন [কবিতা, ২০১৮]; হলুদ পাহাড় [কবিতা, ২০১৯]; চোখের ভেতরে হামিং বার্ড [কবিতা, ২০২০]; লোকাল ট্রেনের জার্নাল [গদ্য, ২০২১]; লিখিত রাত্রি [কবিতা, ২০২২] ও হালকা রোদের দুপুর [কবিতা, ২০২৩]৷ সম্পাদিত গ্রন্থ : উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২], জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [প্রবন্ধ সংকলন]৷

তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমি আলোচনাযোগ্য অনেক প্রসঙ্গ খুঁজে পেয়েছি৷ বাংলার পাখি, ফুল, প্রেম, নদী নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন তিনি, যা প্রাচীনপন্থী ধারার চর্বিতচর্বন নয়৷ শুধু ‘হালকা রোদের দুপুর’ বইয়েই ‘ফুল’-এর চৌদ্দরকম ব্যবহার চোখে পড়ে৷ এমন নান্দনিক উপস্থাপন, যেখানে ফুলের চিত্রকল্প কবি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা বাস্তবে এগজিস্ট (Exist) করে নাকি পুরোটাই কবির কল্পনা এ নিয়ে আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছি না৷ ফুল বিশেষজ্ঞগণই এ বিষয়ে যথাযথ মন্তব্য করতে পারবেন৷ যেমন পাঁচ নং কবিতায় কবি লিখেছেন, “অতলে নেমেছো তুমি— কামিনী ফুলের সন্তান, তাকাও তাকাও চোখ বড় করে ফুলবতী মায়ের দিকে।” মাকে ‘ফুলবতী’ উপমায় ভূষিত করা আমার কাছে অভিনব মনে হয়েছে৷ আবার বারো নং কবিতায় তিনি লিখেছেন, “ঘন কালো রোদ, আর তাতে ব্যর্থ ফুলগুলো শুধুই বিড়বিড় করছে পাহাড়-পাহাড়।” এই পংক্তি পাঠে প্রথম কৌতুহল তৈরি করছে ‘ব্যর্থ ফুলগুলো’৷ প্রশ্ন জাগে ফুল ব্যর্থ হয় কী করে? এমন নতুন উপমা-রূপকের ব্যবহার আশ্চর্য করে৷ আবার রোদের রূপ তিনি কালো রঙে দেখছেন, এ যেন রোদের তীব্রতা বোঝানোরই প্রয়াস৷ ফুলের সফলতা হতে পারে পুরোপুরি ফুটে ওঠা৷ কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলেই কেবল ফুল ব্যর্থ হতে পারে৷ হয়তো সেজন্যই ফুলগুলো ‘পাহাড় পাহাড়’ ডেকে উঠছে, পাহাড়ে যেতে চাইছে৷ যেখানে মানুষের হৈ-হুল্লোড় নেই, ফুটে ওঠার প্রক্রিয়ায় সফল হতে পারে ফুল৷ আবার পনের নং কবিতায় তিনি নতুন এক ফুলের সাথে পরিচয় করান পাঠককে, যার নাম ‘আলোফুল’, “তবে কি শুধুই শব্দরাগ, সবুজ ঘনঘোরে তুলে নাও কিছু আলোফুলের ঘ্রাণ।” আমি জানি না বাস্তবে এই ফুল সত্যিই আছে, নাকি কবির কল্পনা৷ একুশ নং কবিতায়, “তার ঘুমের ভেতর, স্বপ্নে, জন্ম নিচ্ছে ফুল। কিছু পথচিহ্ন জেগে আছে অচেনা ফুলের শরীরে।” এরকম আরো দুটো ফুলের উল্লেখ আমি করব ভিন্ন কবিতা থেকে৷ ছাব্বিশ নং কবিতায় তিনি ‘সূর্যলতা ফুলের’ কথা লিখেছেন, “আকস্মিক জেগে ওঠে সূর্যলতা ফুল, আকাশ দেখার ছলে, ছবির ছলনায়।” পয়ত্রিশ নং কবিতায় তিনি লিখেছেন, “হঠাৎই জ্যান্ত হলো মন্দাক্রান্তা ফুল।” আমরা মন্দাক্রান্তা ছন্দ সম্পর্কে জানি৷ সতেরো অক্ষর বিশিষ্ট এই শ্রেণীর ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতি পংক্তির বর্ণগুলি লঘু-গুরু ক্রমে নির্দিষ্ট ক্রমে বিন্যস্ত হয়ে থাকে। প্রতি পংক্তির বর্ণসংখ্যা এবং লঘু-গুরু ক্রমে বিন্যাসের বৈচিত্রভেদে রচিত প্রত্যেকটি ছন্দ এক-একটি বিশেষ নামে পরিচিত হয়ে থাকে। কিন্তু ‘মন্দাক্রান্তা ফুল’, এমন উপমার সাথে পরিচয় ঘটলো প্রথমবার৷ আমি কবির একটিমাত্র কবিতার বই থেকে ‘ফুল’ বিষয়ে সামান্য উদাহরণ দিলাম মাত্র, পূর্ণাঙ্গ নয়৷ তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থেও এরকম অজস্র বিষয় আছে, যা বিস্তারিত গবেষণার দাবি রাখে৷

তাঁর কয়েকটি কবিতায় বিদেশী পাখি, যেগুলো বাংলায় বিশেষ মৌসুমে অতিথি হয়ে আসে, তাদের কথা খুঁজে পেলাম৷ বিদেশী পাখিকে কবি এমনভাবে বাংলা কবিতায় এডাপ্ট (adapt) করেছেন, যাকে আর অতিথি বলে মনে হয় না, তা যেন চিরচেনা ঘরের সন্তান হয়ে ওঠে৷ তিনি যখন লিখেন, “চোখের ভেতরে একটা হামিংবার্ড নিয়ে বসে আছি”, তখন হামিংবার্ড আর দূরবর্তী বিদেশী পাখি থাকে না৷ এছাড়া বাংলার অনেক পাখির কথাও তার কবিতায় বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়৷ 

পাখি, মিথ সব একাকার হয়ে নতুন রূপে অলংকৃত করে তার কবিতা৷ উল্লেখ করা যায় ‘জীবনপুরাণ’ থেকে কয়েকটি পংক্তি, “মানুষই হরণ করেছে মানুষের সুখ! / আহা জীবন / কী বিচ্ছিন্নতাপরায়ণ / তীব্র স্বরে ডেকে যায় / নিঃসঙ্গ শালিক৷” শালিক পাখিকে ভারতীয় ময়না বলা হয়ে থাকে। গ্রাম শহর মফস্বল যেকোনো জায়গাতেই আমরা শালিক পাখি দেখে থাকি। এরকম লোকগল্প প্রচলিত আছে যে, সকালে এক শালিক দেখা অশুভ, আবার জোড়া শালিক দেখলে ভাগ্য ফিরে যায়। জ্যোতিষও বলে, এক শালিক দেখা অশুভ, জোড়া শালিক দেখা শুভ। প্রচলিত এই লোকগাঁথাই যেন উত্তর আধুনিক রূপ পেয়েছে সাম্য রাইয়ানের ‘জীবনপুরাণ’ কবিতায়৷ নিঃসঙ্গ অর্থাৎ প্রচলিত ‘এক শালিক’ দৃশ্যের সাথে মানুষের সুখহীন যাপনের গল্প একাত্ম করে তুলেছেন৷ ‘হালকা রোদের দুপুর–দুই’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন “পাখি নেই তবু ডানা ঝাপটানো আছে”। এই কবিতার শুরুতেই উঠে এসেছে সুররিয়ালিস্টিক ভাবনার অতিচেতনা— “ডানা আঁকো— সশব্দে ঝাপটাও”৷ সত্যিই যেন পাঠক দূর থেকে শুনে উঠছে ডানার ঝাপট— উড়ে যাচ্ছে রক্ত-মাংসে নির্মিত কল্পনার অবয়ব। কবির কবিতায় আমরা পরিচিত হই ভিন্ন এক প্রতিবেশের সাথে৷

সাম্য রাইয়ানের কবিতায় শাশ্বত নদী বাঙ্ময় হয়ে ওঠে বারবার৷ নদীতীরে জন্ম হবার কারনে নদীকে তিনি নিবিড়ভাবে দেখেছেন, অনুভব করেছেন৷ নদী কবির মধ্যে নিবিড় জলমগ্নতা তৈরি করেছে৷ যার প্রতিফলন তাঁর কবিতার পরতে পরতে লক্ষ্যণীয়৷ নদী-জল-তরঙ্গ এসব নতুন রূপ পেয়েছে তাঁর কবিতায়৷ মরা নদী প্রাণ ফিরে পেয়েছে যেন কবির কল্পনায়৷ নদীর স্রোতকে কবি রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করেছেন৷ নদীর সাথে কবির যে প্রেম তা বারবার উঠে এসেছে৷ ‘বসন্তের সনেট’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, 
“তোমার চুলের ভাঁজে
এক তোড়া সনেট গুঁজে দাও
মরা নদী ভাষা ফিরে পাবে।”

তাহলে কি প্রেমিকার চুলকে তিনি নদীর মতো দেখেন? ঢেউ খেলানো চুল নদীর ঢেউয়ের সাথে মিশে এক নতুন চিত্রকল্প তৈরি করেছে৷ যেখানে কবি ‘এক তোড়া সনেট’ গুঁজে দিয়ে আরো নান্দনিক প্রাণবন্ত করে তুলতে চেয়েছেন৷ প্রেম তার কাছে নদীর মতোই প্রকট ও প্রাণবন্ত! ‘হালকা রোদের দুপুর–তিরিশ’ কবিতায় তার প্রকাশ ঘটে, “ঘঁষা কাচের মতো প্রেম চলে এসেছিলো নদীর ছন্দে, উদ্বাস্তু পাতার অধিক।” যে কবি নিজের জন্মকে নদীজন্ম বলে স্বীকৃতি দেন, তিনি নদীর বহুরূপ দর্শন করেছেন একথা বলাই যায়৷ কখনো কি তিনি হতাশাও ব্যক্ত করেন? 

“কৈশোরসেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে এলাম শহরে।
কী আছে নদীর গভীরে? আস্ত মাতাল সাগর?
অথবা শামীম সৈকতের বাঁশি? কিছু নাই। —ছাই!
বৃথা নদীজন্ম, কৈশোরসেতু, সোডিয়াম আলো;
আমাদের কথা কেউ ভেবেছে, যারা ঘুমিয়েছে?”
(একত্রিশ/ লিখিত রাত্রি)

নদীমাত্রই বিশ্বমানবতার পথিকৃৎ। বিন্দু বিন্দু পানিরাশির অববাহিকায় উৎসস্থল পাহাড়ের অভ্যন্তর থেকে ছড়া, নদ-নদী, মহানদী, সমুদ্র, পানিপ্রবাত ও মহাসাগরের সৃষ্টি। নদী ছড়া উপত্যকার নামেই গ্রাম-শহরের পরিচিত। নদীর সাথে মানুষের আত্মীয়তার বন্ধন চিরকালীন৷ তারই প্রকাশ ঘটেছে নিম্নোক্ত কবিতায়,
“ওরা চায় আমি পাগল হয়ে যাই, একা হয়ে যাই
শহরে ঘুরিফিরি নিঃসঙ্গ মানুষ; আমার মৃত্যু হোক
জলের অভাবে নির্মম: বর্ণনাতীত। অথচ কতো
পাখি ফুল নদী বন্ধু হচ্ছে অকপটে; কী তুমুল
আড্ডা দিচ্ছি আমরা। সুযোগ নেই, হবো: একলা-পাগল।”
(কুড়ি/ লিখিত রাত্রি)

সমাজ গঠনে নদীর ভূমিকা প্রাচীনকাল থেকেই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। নদী মানুষের জীবনে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নদ-নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে মানবসভ্যতার ইতিহাস। নদ-নদীগুলো যেন মায়ের হাতে সন্তানস্নেহে লালন-পালন করে চলছে। তাই ব্যক্তিজীবনেও কবি নদীর সাথে একাত্ম (কবির ভাষায় ‘নদীমাতৃক’) হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন৷ ‘নির্বাসনের বনে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন,
“গাছটা অসুস্থ; ওকে ডাক্তার দেখাবো। হাতে অনেক কাজ এখন। তোমার কাছে ফিরে নদীমাতৃক হবো।”

নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে নদীর এক আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতার পত্তন ঘটেছিল। আর নদীকে কেন্দ্র করেই মানুষ তার বসতি স্থাপন থেকে শুরু করে জীবনযাত্রা নির্বাহের পথ খুঁজে পেয়েছিল। নদীর তীরে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল আফ্রিকার হাড্ডার অঞ্চলের মানবজাতি। আদি অনন্ত কাল থেকেই নদী ব্যবসা বাণিজ্যের, জনবসতি স্থাপনের, কৃষিকাজ, শিল্প ক্ষেত্রে ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রাচীনকাল থেকেই নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বড় বড় সভ্যতা যেমন নীল নদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মিশরীয় সভ্যতা, সিন্ধু নদকে কেন্দ্র করে সিন্ধু সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীকে ঘিরে সুমেরীয় সভ্যতা এবং চীনের হোয়াংহো ও ইয়াং সিকিয়াংকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চৈনিক সভ্যতা। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে নদীর সাথে মানুষের এক আত্মিক সম্পৰ্ক রয়েছে। আমাদের আলোচ্য কবি সাম্য রাইয়ানের জন্ম নদ-নদীর ধাম কুড়িগ্রাম জেলায়৷ তথ্যমতে, এখনো ষোলটি নদ-নদী বিদ্যমান এই জেলায়৷ নিজের জন্মস্থানকে তিনি মাত্র আট পংক্তির ‘তীব্র কুড়িগ্রাম’ কবিতায় উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত কাব্যিক দক্ষতায়,

“উত্তরে ফিরে এলে পূর্বমৃত মেঘ
অনিচ্ছায় প্রেম বাড়ে—পুরনো আবেগ৷

বলো কেন ষোলনদে জাগাচ্ছো প্রণয়
প্রবীণ জানেন সবই—ক্ষুব্ধ গতিময়৷

সোনাভরী–ফুলকুমর সুসজ্জিত মায়া
শহরের নাভিতে জাগে—ধরলার ছায়া৷

অগণন সম্পদশালী—আরও উচ্চ দাম
বেহিসেবী ঘুমন্ত মেয়ে—তীব্র কুড়িগ্রাম৷”

এখানেই সীমাবদ্ধ না কবি৷ কবি দেখেন, নদী মানুষকে আকর্ষণ করে৷ মানুষ দুঃখিত হলে নদীর কাছে যায়, উৎসবে নদীর কাছে যায়৷ এই অনুভূতি উঠে এসেছে তাঁর ‘জলের অপেরা’ কবিতায়,
“ডানা আঁকো—সশব্দে ঝাপটাও
ডাকছে ব্যাকুল নদী
শিহরিত
হেঁটে হেঁটে আমি পৌঁছলাম
নদীর কাছে৷ অনেক মানুষ—
যারা হৃদয় ফেলে এসেছে 
ধরলার জলে, সকলে
একত্রিত আজ৷ হারানো 
হৃদয়ের গান শুনছে মেয়েটি
ছেলেটিও৷
হাটু মুড়ে ওর পাশে বসি
আমি তো যাবো না কারো সাথে
তোমার উপশিরা
যেদিকে এঁকেছে পথ
শুধু সেই দিকে যাবো৷
অন্য কোনো জলে
যাবো না৷”

প্রাকৃতিক ভারসাম্য হ্রাসের ফলে নদী দিন-দিন হারিয়ে ফেলছে তার নাব্যতা। নির্বিচারে বন ধ্বংসের কারণে পাহাড়ের মাটি আগের মতো বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে না-পারায় থাকে না মাটি ছোঁয়া পানি। ফলে পৃথিবী আশ্চর্য শুষ্কতায় পরিণত হচ্ছে৷ কবি তাই লিখেছেন, “পৃথিবী এক ঢেউ ভুলে যাওয়া নদী!” মাত্র একটি পংক্তিতে সামগ্রিক ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে৷ ‘হারিয়ে ফেলা গান’ কবিতায় হারিয়ে ফেলা জীবনসুরের জন্য হৃদয়ের হাহাকার লিখেন এইভাবে,
“সহস্র শব্দের তোড়ে কদমফুলের পাশে
অনর্গল নদী৷ শতাব্দী পেরিয়ে বুঝি সমুদ্র
অথবা নিশ্চুব ডোবাবিশেষ৷ তেমন কিছুই না
সামান্য হাইফেন৷ হারিয়ে ফেলা সুরের জন্য
এখনো আমার আকাশ৷ খাঁ খাঁ—!”

কত কত নদীর নাম উঠে এসেছে সাম্য রাইয়ানের কবিতায়, তা নিয়ে বিস্তর অনুসন্ধান প্রয়োজন৷ ‘হালকা রোদের দুপুর–পনের’ কবিতায় তিনি দিয়েছেন চন্দনা নদীর কথা, যা শুকিয়ে এতটাই করুণ রূপ ধারণ করেছে যে বাইনোকুলার দিয়ে যেন দেখতে হয় তাকে৷ কবির ভাষায়,
“নিশুতিতে, বৈষ্ণবীর গানে আশব্দ ফিরে এসো, বাইনোকুলারে চন্দনা নদীর মতো, ঘনঘোর রসকলি, প্রমুখ উদাস।”

‘হালকা রোদের দুপুর–ষোল’ কবিতায় নীলকণ্ঠ নদীর কথা লিখেছেন কবি,
“ব্যাকুল, বধির সুরগুলি দেয়ালে আটকে আছে স্তব্ধ সবুজ! তারও পরে দেখি নীলকণ্ঠ নদীর ভ্রমণ। শুধু হাহাকার মনে পড়ে— প্রাচীন ছাগল, হাঁস-মুরগী, ধুলোর দুপুর। শরীর ঘুমায়, আমি জেগে দেখি মুমূর্ষ বিদিন-রাত, তোমার চোখে বেঁচে আছে অন্তিম উলুধ্বণি।”

নদ-নদীর দান অপরিসীম হলেও মানুষ নদীর প্রতি বিরূপ আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন! নদীকে মেরে ফেলছে মানুষ৷ সচল নদী অচল হয়ে যাচ্ছে৷ যা কবির হৃদয়ে হাহাকার সুর তৈরি করে৷ কবি তখন লিখেন,
“স্বাভাবিক জামার বোতাম, পুরনো এবং বিশ্বস্ত। রিটায়ার্ড নদীর মধ্যখানে। যেন হারানো দিনের গ্রোসারি।”
(হালকা রোদের দুপুর–এগারো)

দুঃখের বিষয়, বর্তমানে এই নদী ও মানবজাতির সম্পর্কে ছেদ পড়েছে। যে নদীকে কেন্দ্র করে মানবজাতি একদিন উন্নয়নে শিখরে পৌঁছনোর যাত্রা শুরু করেছিল এবং মানব সভ্যতার উন্নতিতে নদীর ভূমিকা অপরিসীম, সেই নদীকে আজ মানুষ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে নানাভাবে। অবৈধ বালু উত্তোলন একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে পরিগণিত৷ এই সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তিনি কবিতায় তুলে আনেন, অথচ তা পাঠককে বিরক্ত করে না, আরোপিত মনে হয় না৷ তিনি লিখেন এভাবে, “নিহত দুপুরের পরে নদী থেকে উঠে আসে বালু, অবৈধ উপায়ে।” আমাদের অসচেতনতা এবং উদাসীনতার কারণে অনেক নদ-নদী আজ সংকটের মুখে, কোনো কোনো নদী আবার হারিয়ে গেছে, কেউ কেউ নিজের গতি পরিবর্তিত করে বয়ে চলে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ‘হালকা রোদের দুপুর–নয়’ কবিতায় কবি এই পরিস্থিতিকেই যেন তুলে ধরেছেন,
“নিশ্চুপ ধ্যানবিন্দু ভেদ করে পৌঁছনো যায় না সরোবরে? মিথ্যা আকাশের প্রতি টান ছিলো। বুঝিনি তীব্র ঝড়ের সংকেত। নকল নদীর প্রতি টান ছিলো। ‘ঝাউগাছ কই পাই?’ বলে ওঠে টনটনে রোদ। কিছুটা পেরিয়ে যায় নিশ্চুপ বালুর দুপুর। নকল নদীর পাশে আসল ঝাউ-য়ের বন— চিত্রকল্প ভাবো দামোদর, ব্যক্তিগত চিত্রকল্প ভাবো।”

১৫০০ সালের পর থেকে বাংলার অনেক নদীর নদীখাতই ভৌগোলিক কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃসীমান্ত তিস্তা নদী তাদের মধ্যে একটি। এটি ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা, কোচবিহার জেলা ও বাংলাদেশের রংপুর জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তা মিশেছে ব্রহ্মপুত্রে। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে তিস্তার ভারতীয় অংশে গজলডোবায় স্থাপিত বাঁধের সবগুলি গেটবন্ধ বন্ধ করে দেয়া হলে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে জলপ্রবাহ শূন্যে নেমে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা অববাহিকায় মানুষের জীবন যাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি জান্তব হয়ে উঠলো রাজনীতি-সমকাল সচেতন কবি সাম্য রাইয়ানের কবিতায়৷ তিনি লিখলেন, 
“মধ্যাহ্নভোজের নদী। অঘ্রাণে ফিরে আসে দারুণ দানব। ফোলা পেট। চোখদু’টি কোটরের পার। ফিরতি পথে বালিয়াড়ি ধরে— তাকায় এবেলা। বহুবিধ সৈকতের পাশে, ভাষাহীন মানুষের মলিন সঙ্গম। দূরের বাতির মতো, দেখা যায় তিস্তার বাথান। হলুদ আলো, চোখ নেই; কিছুটা দ্যাখে বোধয়। দিবস শেষে আহত সকল গান ফিরে পায় নিজস্ব ঘরের গলা। জাগে বাথানের ভাষা। আলিঙ্গন করে কিছুটা কনসার্ট।”
(হালকা রোদের দুপুর–ছয়)

সাম্য রাইয়ান অত্যন্ত সমাজ সচেতন কবি৷ সমকালীন সমাজ-রাজনীতি তাঁর দার্শনিক নজর এড়াতে পারে না৷ তিনি সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে কাব্যিক বোধকে এতটাই একাত্ম করে তোলেন, যা নান্দনিক রূপ নিয়ে পাঠককে বিমোহিত করে৷ মননশীল পাঠক তাঁর কল্পজগতে অনুভূতির ডানা মেলে উড়তে পারেন৷ তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমি আলোচনাযোগ্য অনেক প্রসঙ্গ খুঁজে পেয়েছি৷ সবগুলো বিষয়ে আলোচনা করতে হলে প্রতিটি বিষয়ে আলাদা প্রবন্ধ রচনার দরকার হয়ে ওঠে৷ স্বীকার করছি যে, আমার এই সন্দর্ভ রচনার প্রয়াস অসম্পূর্ণ৷ সময় স্বল্পতার কারণে আমি তাঁর সকল রচনা ধরে পদ্ধতিগত আলোচনা লিখতে পারলাম না৷ তাঁর কবিতা গভীর মনোনিবেশ ও বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে৷ এর প্রধান কারন সাম্য রাইয়ানের কবিতা উচ্চকিত নয়, বরং তা গোপন সংরাগে চুঁইয়ে পড়ে আমাদের আর্দ্র করে।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *