❑ স্বাগতা বিশ্বাস
নয়ের দশকের কবি সাম্য রাইয়ান তার কবিতার মাধ্যমে এপার ওপার দুই বাংলার পাঠকের হৃদয়ে স্থান নিয়েছেন। এই সোস্যাল মিডিয়ার জগতে দূরকে আর দূর মনে হয় না। কবি সাম্য রাইয়ান বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের কবি হয়েও আমাদের ভারতের কবিতাপ্রেমী পাঠকের অন্তরের অন্তঃস্থলে ও মস্তিস্কে প্রবহমান নদীর মতো বয়ে চলেছে তাঁর কাব্যরসধারা স্রোত। তাঁর বিভিন্ন কাব্য কবিতার মধ্যমে পাঠককুল ছাড়াও কোন এক উদ্দীপনা যেন কাজ করে। এই পর্যন্ত তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হল— ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’ (গদ্য ২০১৪), ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ (কবিতা ২০১৫), ‘মার্কস যদি জানতেন’ (কবিতা ২০১৮), ‘হলুদ পাহাড়’ (কবিতা ২০১৯), ‘চোখের ভেতর হামিং বার্ড’ (কবিতা ২০২০), ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ (মুক্তগদ্য ২০২১), ‘লিখিত রাত্রি’ (কবিতা ২০২২), সম্পাদিত গ্রন্থ– ‘উৎপলকুমার বসু’ (২০২২) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
কবি সাম্য রাইয়ানের ‘মার্কস যদি জানতেন’ (২০১৮) কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ১৪টি কবিতা রেখেছেন। তার মধ্যে প্রথম কবিতা নাম— ‘বাঘ’কবিতায় মেয়েটি যখন বাঘের মাংস খেতে চাইল, তখন বাজারে কোথাও বাঘের মাংস না-পাওয়ায় তারা সপরিবারে জঙ্গলে বাঘ শিকারের জন্য রওনা হল। এবং সেখানে শুধু বাঘ শিকারই নয় মানুষও (স্ত্রী কন্যা) শিকার হল। যার পরিণতি দেখা যায়— বারো বছরের জেল বা কারাদণ্ড। কিন্তু এখানে পশুশিকারের জন্য বারোবছর কারাদণ্ড হলেও মানুষ বা জীবন শিকারের দণ্ড বা সাজা হয় না। এই কবিতায় বন্য পশুজীবনের দাম থাকলেও মানুষের জীবনের কোন মূল্য নেই—
“বড় ভাল ছিল সেই প্রেমিকাসকলখুব ভোরে স্নান করে নিতো— হেসে খেলেওরা ধোয়া জামা গায়ে খোলা ময়দানে যেত।...মার্কস যদি জানতেনঅন্ধকারেও কত কাণ্ড ঘটছে রোজ।”
এই কবিতায় মেহনতি মানুষ ও তাদের শ্রম জীবনকে তুলে ধরেছেন। কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ’মানব জীবনের সমাজে যে তাদের উত্থান-পতন ও ধনীরা আরও ধনী এবং গরীবেরা আরও গরীবে পরিণত হচ্ছে—তাদের জীবন যাপনকে সমাজে সুন্দরভাবে বোঝাতে চেয়েছেন। তা এই কবিতার মূলভাব হিসেবে উঠে আসে। সমাজের শাসন ও শোষণ কীভাবে ঘটে চলেছে এবং এর প্রভাবে বেকার যুবকগণ তাদের বহু মূল্যবান সময়কে সঠিক কাজে লাগাতে পারছে না। তারা তাদের জীবনের গভীর ও মূল্যবান সময়কে বন্ধুদের সঙ্গে ধুলো বা ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কোন এক সময়ে এই কালো অন্ধকারে ঢাকা মেঘ সরে গিয়ে বৃষ্টির আকারে ঝরে পড়বে, সেই সময় সূর্যের কিরণে আকাশ ভরে উজ্জ্বল রামধনু রঙে রঙিন হয়ে ফুটে উঠবে এবং মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের মুখে নিশ্চিন্তির হাসি ফুটে ঊঠবে। কারণ মার্কস চেয়েছিলেন এক সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে। এইভাবে কবির মন-ভাবনাকে সুন্দরভাবে কাব্যব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। কবি সাম্য রাইয়ানের লেখা আর একটি কাব্যগ্রন্থ হল ‘হলুদ পাহাড়’ (২০১৯)। কাব্যগ্রন্থটির নামকরণে বিশেষভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছায়া পড়েছে। প্রকৃতিকেন্দ্রিক বা নিসর্গপ্রীতির স্বর্গীয় অনুভব এই কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে। পাহাড় মূলত প্রকৃতির সম্পদ। আর এই সম্পদ আধারের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ফল গুল্মজাতীয় ঝোপ ঝাড় নানাবিধ গাছপালা আর পতঙ্গ পশুপাখি্দের দেখা যায়, আর এইসব কিছুই প্রকৃতি সৃষ্ট। প্রকৃতির ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই গ্রহের মানব থেকে সমস্ত জীবিত সত্তার আলাদা করে কিছু করার চুল-পরিমাণ ক্ষমতা নেই। প্রকৃতি যেভাবে নিজেই নিজের সৌন্দর্যকে সৃজন করে সেইভাবে সেই সৌন্দর্যের আনন্দ নিকেতনে সমস্ত প্রকৃতিসৃষ্ট বাসিন্দাকে সমানভাবে স্থান করে দেয়, ফুল ফল খাদ্য বাসস্থান দিয়ে নিজেও বাঁচে অন্যকেও বাঁচিয়ে রাখে। নিজেও পতঙ্গের মতো উড়ে যেতে পারে—
“পাশ ফিরে ঘুমুচ্ছিলাম। হাওয়া কল জাগাচ্ছিলাম। জামরুল বন থেকে আবছা তাথৈ একা, গান শেষে ফিরে এলো।”(পতঙ্গ ডানা/ হলুদ পাহাড়)
প্রকৃতির পাগলামিতে চারিদিক হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এবং সেখানে নদী তার পুরোনো ছন্দে ফিরে এসেছে প্রতিবাদ জানাতে। তুমুল নদী পতঙ্গ ডানাদের ডাকছে ভালোবাসার মিহি হাতছানি দিয়ে। তারা বিপুল পরিমানে প্রকৃতির উন্মুক্ত চরাচরে অতি মধুর মিষ্টতা নিয়ে ফিরে এসেছে প্রকৃতির বারান্দায়। কিন্তু কবির ভাবনায় প্রকৃতির স্বয়ংক্রিয় সৌন্দর্য মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে থাকলেও তার মধ্যে যে বিকারহীন একটা যন্ত্রণা আছে— তা কবি অনুভব করেছেন। এই যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসার উন্মাদনা আর প্রাণতা কবির চেতনায় কবিতার বর্ণে বর্ণে অক্ষরে অক্ষরে পাহাড়ের ঢালুপথে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো গড়িয়ে গড়িয়ে ফিরে আসে। সেখানে কোন অজুহাত নয়— খোলামেলা সত্যতার শ্বেতশুভ্র নিবিড় স্পর্শ দিয়ে। মুক্তকেশী নারী বাধ্যবাধকতাহীন স্বাধীন–উন্মুক্ত নির্মল উচ্ছ্বলতায় বেঁচে থাকতে চায়। মুক্তমনে প্রকৃতির রণরঙ্গে মেতে স্বচ্ছন্দ্যে এগিয়ে যেতে চায়। প্রকৃতি এবং নারী উভয়েই সৌন্দর্যের আধার। তাদের বেদনাগুলোও প্রকৃতির মতো একই রকমের। কোন একটি ছোট চারাগাছ যে কত জল, ঝড়, কড়া রোদ সহ্য করে বড় হয়। ঘৃণা এবং ঘাত সহ্য করে সেই চারাগাছ একদিন বৃক্ষে পরিণত হয়। ফল, ফুল ছাড়াও প্রাণীকুলের প্রাণদায়ী প্রাণবায়ু দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে এই পৃথিবী গোলার্ধের সজীব সত্তা। ঠিক তেমনি একজন মানবী কন্যাকেও ছোট থেকে বড় হতে গিয়ে তাকে নানাবিধ সামাজিক পারিবারিক এমনকি মানসিকভাবে কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করে শিশু থেকে নারীতে রূপান্তরিত হতে হয়।
“মাথায় ফিতে বাঁধা শিখতে শিখতে ঘন হলুদের বুকে বিঁধে যাওয়া উভয় বেদনা একফুল থেকে ভীষণ রাইপথ বেয়ে উঠে যাবে জানতাম— সজাগ হরিণীর ছায়ায়। কোমলমতী কদমফুলের দিকে, তুমি মূঢ়, তুমি জলবৎ তরলং।”(পতঙ্গডানা/ হলুদ পাহাড়)
প্রকৃতির কোলে পতঙ্গরা তাদের ডানা পেয়ে কন্যা থেকে নারীতে পরিণত হবার মতোই পতঙ্গ ডানা হয়ে কোমলমতি কদমফুলের দিকে ছুটে চলে। কবি সাম্য রাইয়ান তাঁর ‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতায় দিয়েছেন, একটি নতুন স্বপ্নদ্বীপের সন্ধান, একটি স্বপ্নবীজের সন্ধান—
“ভাবছি, কাউকে বলবো একটা পাহাড়ের ছবি বানাতে। হলুদ পাহাড়, তার উপরে মেঘ, শাদা শাদা মেঘ। দূর থেকে দেখে গাদা ফুল ভেবে ভ্রম হবে মানুষের। ওরা খুশি হবে। মানুষ ভ্রমে প্রকৃতই আনন্দ পায়। পাহাড়ে উঠবে সকলে। কেউ কেউ পকেটে কিংবা পাটের ব্যাগে ভ্রমের আনন্দ ভরবে।কিন্তু হলুদ পাহাড়ে হৈ-হুল্লোড় নিষেধ।”(হলুদ পাহাড়/ হলুদ পাহাড়)
কবির এই কবিতাটিতে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে একটি ভাবনা উঠে এসেছে তা হল—ভ্রম বা ভুল। ‘হলুদ পাহাড়’ বলতে কবি এখানে ভ্রমের পাহাড়কেই বুঝিয়েছেন। যে ভ্রমে মানুষ ভেসে চলেছে। হলদে গাঁদা ফুলের পাহাড় মনে করে পর্যটনবিলাসী মানুষ ছুটে চলে যাবে। কিন্তু সেই হলুদ পাহাড়ে খুশি বা আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। সেটা তো একটা মনের ভ্রম, ভ্রমের কোন স্থায়িত্ব নেই। এই ভ্রমে মানুষ তাৎক্ষণিক আনন্দ পেলেও তা কোনদিন চিরস্থায়ী নয়। আবার দেখা যাচ্ছে এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দকে পেতে সকলে ভ্রমকেই সঠিক বলে মনে করে বুক পকেটে বা চটের ব্যাগে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখনকার সমাজে মানুষ সত্যি বা আসল বস্তু ছেড়ে, মিথ্যে বা নকলের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। এটা সঠিক নয় জেনেও— বেঠিক বা ধোঁয়াশার পেছনে ছুটতে পছন্দ করে— ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর তা জেনেও অনেকেই ধূমপান থেকে বিরত থাকতে পারেনা। এমনই অপ্রতিরোধ্য ভ্রমের শিকার এই গ্রহের মানুষ।
‘লিখিত রাত্রি’(২০২২) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত মোট পঞ্চান্নটি কবিতা আছে। কবিতাগুলি প্রতিটির আলাদা করে নাম নেই। সংখ্যা দিয়ে প্রতিটি কবিতা আলাদা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম কবিতা থেকে শেষ কবিতার মধ্যে সূক্ষ্ণ আন্তর-যোগ এবং ভাবসূত্র রয়েছে। আর কবিতাগুলির অন্যতম বিশেষত্ব হল প্রতিটি কবিতারই চরণ সংখ্যা পাঁচ। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি ঠিক এইরকম—
“ভূগোল ক্লাসের স্মৃতি ভুলে গেছি তমোগুণে! মধ্যরাতেমনে পড়ছে না কোনোমতে, যেন স্মৃতিখণ্ড জমা নেইকোথাও; নির্জনে ডাহুক ডাকে নাই বুঝি সারাংশসমেত।কী বলি—কার কাছে বলো, সকলই সকল; তুচ্ছ আলো।ও মরণ-রাত্রির ত্রাতা, অনাহূত বেদনায় ন্যুব্জ জীবন।”(লিখিত রাত্রি/ সংখ্যা ১)
এই মানবিক পৃথিবীতে সমস্ত কিছুই তুচ্ছ। যেমন জীবন আছে, জীবন আছে বলেই জীবনের এত স্বতঃস্ফুর্ততা, কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে এই জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। এই আছে তো এই নেই। সেখানে ‘অনাহূত বেদনায় ন্যুব্জ জীবন’। স্মৃতি এমন এক জিনিস যা খুব গভীর হলেও কখনো কখনো আবছা বা ধোঁয়াশা হয়ে যায়। মিষ্টি মধুর সুখদ স্মৃতিগুলো মন থেকে সরে যেতে চায় না আবার কোন বেদনাদায়ক স্মৃতি যা মনে থাকলেও সবসময় মাথায় থাকে না। তা ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। কোন আনন্দদায়ক ঘটনা যেমন আমাদের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয় তেমনি দুঃখজনক ঘটনা ভুলে থাকতে চাইলেও ভুলতে পারা যায় না— ‘লিখিত রাত্রি’ কাব্যগ্রন্থের ২৭ সংখ্যক কবিতা এই প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য—
“কত আকৃষ্ট হয়েছিলেম, ছবিতে দেখে তাকেমৃদু ভালোবাসা ধীরে- তপ্ত ও গতিময় হলেছুটে গেলাম, ছুঁয়ে দেখলাম গায়ে হেলান দিয়ে।স্মৃতিতে এখনো সবটা মনে আছে; অথচ সেদিনদোয়েল বলেছিল, বৃক্ষ আমাকে মনে রাখে নাই!’’
কবি ছবি দেখে আকৃষ্ট হয়েছেন এবং তাকে মৃদু ভালবাসার আঁচ ধীরে ধীরে তপ্ত গতিময় হয়ে উঠেছে কিন্তু তা এখন কেবল স্মৃতিমাত্র। তা ছুঁয়ে দেখা সম্ভব হবে না, কারণ বৃক্ষ আর তাকে ঠিক মনে রাখতে পারেনি।
কবির ‘লিখিত রাত্রি’ কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় ঘুমের ঘোরে ক্রোধের বহির্প্রকাশ করছিলেন। তার পা এগিয়ে যাচ্ছিল নিশাচর প্রাণী হয়ে নৃত্যরত রাত্রির দিকে। রাতজাগা নিশাচর পাখি পেঁচার সঙ্গে কবির এই রাত্রিকালীন অভিযানকে ধরা যেতে পারে। নিশাচর পাখির ডানার আড়ালে লাফিয়ে পড়ে হেলিকপ্টার। আর তা বিষাদগ্রস্ত ভ্রমে পরিণত হয়। ফেলে আসা রাত্রির বেদনাগুলি ঘুমের ভেতর এক এক করে জেগে ওঠে।
কবি তাঁর কাব্যগুলির মধ্যে আধুনিক বাংলা কবিতার ছন্দ, বিশেষ করে মুক্ত গদ্যছন্দের সুচারু ব্যবহার ছন্দের অনুষঙ্গে আসা নানাবিধ প্রতীক, চিত্রকল্প, শব্দ এবং ভাবের অনুষঙ্গে নিজস্ব বাক্যশৈলীর চমকপ্রদ ব্যবহার রেখেছেন। শব্দের অবয়বে চোখের সামনে বিষয় বা ঘটনার চলচ্চিত্রায়ন ঘটে যাচ্ছে যেন! সাম্য রাইয়ান শূন্য দশক পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতার একজন একনিষ্ঠ কবি এবং সাহিত্যসাধক। সব্যসাচীর মতো দু’হাতে লিখে চলেছেন। সম্পাদনা করছেন করে চলেছেন বিভিন্ন কালজয়ীগ্রন্থ আর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদনা করে চলেছেন ‘বিন্দু’ পত্রিকা। যা একইসঙ্গে এপার ওপার বাংলায় সাহিত্যরসিকপ্রিয়তা লাভ করেছে।