❑ আশুতোষ বিশ্বাস
সময়ের দ্রাঘিমারেখায় কবি সাম্য রাইয়ানের কাব্য সৃজনভূমি শূন্য দশকের মাটি। এই দশকের আবহাওয়া, মানুষের হিড়িক-বাহিত চেতনপরিপুষ্টি জল, বায়ু, শব্দ, আলোক সংযোজন সবই এই দশকের রসপুষ্ট এবং সময়ের ধারাবাহিক অভীজ্ঞার বর্ণপ্রপাত। সাম্য রাইয়ানের চৈতনিক খৈলানে পতিত আলোকের ঝরনাধারায় চারিয়ে উঠেছে নতুন নতুন ভাবোদ্দীপিত চেতনার পংক্তি, বাক্য, শব্দপুঞ্জ। ভাবনার আকাশে ডানা মেলা মন-পাখি সারাদিন ক্রমশ পরিভ্রমণে রোদ্রের ওম সঞ্চারিত করে দিতে পেরেছেন সময় পরিব্যাপ্ত ভাবী কবি, আর কবিতাসমুদ্রের গভীরে একা একা দীপ-জ্বলা মণি-মানিক্যের রহস্য কিনারে। যেখানে চকিতে চেতনাদ্যুতি সময়কে উপচে আগামী সময়ের জন্য ফলদায়ী বর্ণিল ছায়চিহ্ন রেখে যায়। এই কবির কবিজন্মের ইতিহাস খুব বেশি অতীত-গভীরে শিকড় চালেনি, কিন্তু মহীরুহের আভাস সুবাতাস বয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রজ্ঞাদীপিত যৌবনলভিত সাম্যের কবিতার বর্ণপ্রতাড়িত পাতায় পাতায়। এই যুবক কবির দুচোখের যৌবনরাগ কখন যে যৌবনিক সংক্ষোভ শিখায় চৈতন্যের অন্ধকারে একে একে জ্বেলে দেয় বাতি তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না— এ কবির সার্চ লণ্ঠনের ফোকাস স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার অন্তরমহলে তাক করে থাকলেও দৃশ্যমান সময়ের বাইরে চলে গেছে কবির অন্তর্দৃষ্টি। আমাদের টক ঝাল মিষ্টি ভাঙাবাড়ি বাসাবাড়ি, প্রতিদিনের প্রাতিবেশিক কালিঝুলি মাখা স্বেদ বহমান আম-জনতার রৌদ্র ঝলসিত পচা শামুকে পা কাটা কলুষিত জীবন-গদ্যে কাব্যিক সাজ পরিয়ে দিয়েছেন অবলীলায়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সমাজ রাষ্ট্রের অংশীভূত হয়েও সাম্য রাইয়ান নির্দিষ্ট ভূগোলকের চারপাশে বন বন ঘুরতে থাকেন না, তার কাছে মানব বিশ্বের সমস্ত মনুষ্য-পদবাচ্যই তার আত্মার আত্মীয়, ভাই-ভগিনী। সাম্য তাঁর নামের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে কাব্যিক সাম্যতা ধরে রেখে চলেছেন। একনজরে কবি হিসেবে সাম্য রাইয়ান যতটা স্বদেশে প্রজ্ঞাপিত, বিজ্ঞাপিত তার চেয়ে বেশি সম্মানীত প্রতিবেশী দেশ ভারতবর্ষেও। আর এটা অবশ্যই তাঁর বয়সোচিত ভারপ্রগুণ্যে পরিতৃপ্তির দাক্ষিণ্যে প্রদেয় নয়— মাত্র আটাশ-তিরিশ বছরের যুবক কবির কপালে এইরকম ভোরের প্রত্যুষ সমীরণে টুপটুপ ঝরে পড়া শেফালি সদৃশ কবিতা সৌরভ তন্ময়ে বিভোর আপামর স্বদেশ বিদেশের বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যামোদী কবিতাপ্রেমিক। বাংলাদেশের কুড়িগ্রামে নয়ের দশকে সাম্য রাইয়ানের জন্ম। ২০০৫ সালে প্রথম কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ নামের কবিতা দিয়ে তাঁর প্রথম কবিতার মুদ্রণ সৌভাগ্য ঘটে। কুড়িগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় থেকেই সাম্য রাইয়ানের কাব্য এবং সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত। কবি রাশেদুন্নবী সবুজের অনুপ্রেরণায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ছাত্র ইউনিয়নের ‘মঞ্চ’ পত্রিকায়। সেসময় কুড়িগ্রামে কোন সাহিত্য পত্রিকা না থাকায়, ২০০৬ সালে তিনি কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সাহিত্যপত্র ‘বিন্দু’ সম্পাদনা কর্মে নিয়োজিত হন। ক্রমান্বয়ে লেখালেখির সুবাদে তিনি বিভিন্ন লিটলম্যাগের সাথে যুক্ত হয়ে যান। দেশের বিভিন্ন লিটলম্যাগে তাঁর কবিতা প্রকাশ হতে শুরু করে। এপার ওপার বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ‘তারারা’, ‘চারবাক’, ‘চালচিত্র’, ‘জঙশন’, ‘প্রতিশিল্প’, ‘শ্বেতপত্র’, ‘শিরদাঁড়া’, ‘উত্তরা এক্সপ্রেস’, ‘অ-কার’, ‘নিসর্গ’, ‘বাঘের বাচ্চা’, ‘অবগুণ্ঠন’, ‘আঙ্গিক’, ‘ছায়াবৃত্ত’, ‘কবি সম্মেলন’, ‘মাসিক কৃত্তিবাস’, ‘প্রতিধ্বনি’-সহ বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে অক্লান্তভাবে নিয়মিত লিখে চলেছেন।
এই পর্যন্ত তাঁর লেখা মুদ্রিত কাব্যগ্রন্থ এবং গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা দশটি। সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট (প্রবন্ধ), (২০১৫), কাব্যগ্রন্থ: ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ (২০১৬), ‘মার্কস যদি জানতেন’ (২০১৮), ‘হলুদ পাহাড়’ (২০১৯), ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ (অমর একুশে বইমেলা ২০২০), ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ (মুক্তগদ্য), (মার্চ ২০২১), ‘লিখিত রাত্রি’ (অমর একুশে বইমেলা ২০২২), ‘হালকা রোদের দুপুর’ (অমর একুশে বইমেলা ২০২৩), এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ: ‘জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ (প্রবন্ধ সংকলন), (সম্পাদনা), (অমর একুশে বইমেলা ২০২৩), উৎপলকুমার বসু (প্রবন্ধ সংকলন), (সম্পাদনা) (২০২২)।
‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ (২০১৬) নামের কাব্যপুস্তিকা নয়ের দশকের উদীয়মান যৌবনপ্রাজ্ঞ কবিদের কাছে একেবারে নতুনের কেতন উড়িয়ে চেতনের মগডালে— কেবলমাত্র কাব্য-নামেই কম করে দুঘণ্টার জন্য নিশ্চল ভাবনারাজ্যে ঢিল ছুঁড়ে দিয়ে গেল যেন! ঠিক যেমন স্রোতহীন পুষ্করিণী জলে খেলাচ্ছলে দুরন্ত বালক নিক্ষিপ্ত ইটের দলা পুষ্করিণীর টলটলে জল নাড়িয়ে দিয়ে শতমুখী ঢেউয়ের জাল বুনে দিয়ে গেল। কবিতা আর কবিভাবনায় মাহুর্তিক ইমারত গড়ে তোলার অক্লান্ত অনিঃশেষ অপরিনিবৃত্তির চরম অসুখ নিয়ে ভুগতে থাকা কবিরা কখন যে তাদের মস্তিষ্কের কোন এক নিভৃত কোষে লুফে নেন— অপার্থিব অনন্তের সুখদ দুখদ অনন্য ভাবতরঙ্গ তা কেউ জানেন না। এমনকি জোর গলায় বলা যায়, হাতে কলম উঁচিয়ে বসে থাকা চৌখশ কবির কাছেই সেই দৈবচরণ চকিত আভাস দিয়ে যাবে— তাও বলা যায় না। নিয়ত অনুশীলনে কবিতা পদবাচ্যময় কিছু শব্দের পাহাড় গড়ে তোলা যেতে পারে— কিন্তু সেগুলি যে সত্যিকারের কালজয়ী কাব্যচরণ হয়ে উঠবে তা কে বলতে পারে! আর এই কারণেই মনুষ্যপদবাচ্য প্রায় সকলেই কবিধর্মের মহত্তম গুণপনা নিয়ে জন্মালেও প্রকৃত কবি কিন্তু দু-একজনই। মহাকাল তার কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বলে লিখে রাখেন হাতে গোনা মুষ্টিমেয় কয়েকটি নাম। তুমি যতই কাগজে, পাথরে, গম্বুজ মিনারে নাম লিখে রাখো না কেন, সেই নাম মুছে যাবে।
সাম্য রাইয়ান গতানুগতিক ধারা প্রবাহিত জলে আটকে থাকা প্রতিভা নিয়ে আসেন নি, বরং যেখান থেকে সাধারণ অনেকেই ভাবনা বন্ধ করে দেন— সেখান থেকেই তাঁর ভাবনাপ্রক্ষালন শুরু। অনেকেই তাকে বলবেন স্রোতের বিপরীতে প্রধাবনক্ষম কাব্যস্রষ্টা, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না— পৃথিবীর প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত ক্রিয়া আছে। ধন্যাত্মক এবং ঋণাত্মক শক্তি বলয়ের মধ্যেই মানব বিশ্বের প্রাণভোমরা গান গেয়ে তরী বেয়ে এপার থেকে ওপারে লাফিয়ে পড়ে। কাজেই প্রকৃতি বিশ্বের এই দুটি ক্রিয়া সৃষ্টিতরঙ্গের মূলীভূত প্রধারা আর যা সমস্ত সৃষ্টিকর্মের মধ্যে বর্তমান। কেউ প্রথম ক্রিয়াটিকে মান্যতা দেবেন, নয় দ্বিতীয়টিকে আপ্তবাক্য ভাববেন। সাম্য রাইয়ান এই দুটো ক্রিয়ার চরম বাস্তবতাকে অঙ্গীকৃত করে তিনি সাজিয়ে নিয়েছেন এক নিজস্ব কাব্যিক ভুবন। সবাই বাঁধ বাঁধার কাজে লিপ্ত তখনও এই কবি বাঁধ ভাঙার কাজে মজেন। ভাঙা আর গড়ার খেলায় যখন এই কবি মজে থাকেন তখন আমাদের মনে হয় নির্জনে বসে ব্রহ্মা প্রলয় আর ধ্বংসের দুটি ভিন্ন ভিন্ন তালায় ভিন্ন ভিন্ন চাবি তাঁর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে প্রবেশ করাতে চাইছেন। কবি-ব্রহ্মাও তেমনি স্রোত আর বি-স্রোতের দুটি তালায় দুটি ভিন্ন চাবি দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে চাইছেন। তিনি দেখছেন, বুঝছেন— এবং যেটা বোঝাতে চাইছেন আমরা সাধারণেরা সেটাই বা কতটুকু বুঝছি? ‘‘কী করে নির্মিত হয় কবিতাগাছের ফল; মানুষের কাছে আজ অব্দি সেসব অমীমাংসিত বিস্ময়!”১ আমাদের এই কবি, ব্রহ্মগুণ সম্পন্ন হয়েও ভুল তালায় ভুল চাবি পুরে নিজেকে দেখার বিস্ময়কর সৃজন উপভোগ্য আনন্দময় রসঘনযাপন করেন। প্রতি মুহূর্তে কবিতা গাছে উপজিত কবিতা ফল দেখে অপার বিস্ময়ে অভিভূত হন, আহ্লাদিত হন। মাথায় চরম ঘা খেয়ে বনবন ঘূর্ণমান পাগলা কুকুর আর মৃগনাভ কস্তুরীবতী হরিণী প্রদাহ যন্ত্রণায় দিকবদিক ছোটাছুটির মধ্যের আনন্দঘন নুড়িবালি সংগ্রহ সৃজনশিল্পীরা অবলীলায় করে নেন। কবি সাম্য রাইয়ানও এই সৃজন কলাকৈবল্য নিকেতনে সুদূরকে হৃদয় সৌন্দর্যের ওমচর্যায় নন্দিত করেন বারবার—
‘‘... মুঠোভর্তি তেঁতুল আর নুন নিয়ে আমার যেন কোথায় যেতে ইচ্ছে করছে! কেন আমার আবার জন্ম হলো পৃথিবীতে, কেউ কি জানে? তোমার বাড়ি তো বহুদূর— তবে আপেলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে কোত্থেকে? তুমি কি আমার পাশে— আছো— কাছাকাছি কোথাও, বৃষ্টির আড়ালে। এই দিন তো পুরোটাই উষ্ণ ছিলো আজ, কেন এভাবে বৃষ্টি এলো?”২
মুঠোভর্তি তেঁতুল আর নুন নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার ঝোঁক আজকের এই লভিত জন্মে কবির চোখ মুখে চেতনায় উত্তরহীন বিস্ময়াভিষেক গ্রন্থিমোচন করে। নুন মাখা পাকা তেঁতুলের স্বাদ পুনরপি কবি জিহ্বায় ভর করে। এই স্বাদ এক জনমের নয়, বহু জন্মের ভেতর দিয়ে তেতুল-নুনের লালাময় লীলাভূমি পৃথিবীকে মনে পড়ে যায়। তোমার বাড়ি অনেক অনেক দূর হওয়া সত্বেও পাকা অবিকল পূর্বজন্মের মতো একই স্বাদ নিয়ে, গন্ধ নিয়ে আপেলের ঘ্রাণ আমাদের নাকে এসে লাগে কী করে! ‘তুমি’ নামের হৃদয় নিঙড়ানিয়া কেউ নিশ্চয়ই আমার আশেপাশে অবস্থান করছে, অথবা কাছাকাছি কোন মেঘ বা বৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে আছে। আর আজকের রোদেলা ভরপুর দুপুরের শুকনো তকতকে উষ্ণদিনে, আমাদের বিগত জন্মের দিনগুলি রাতগুলির মত নরম বৃষ্টি পৃথিবীতে নেমে এলো! সত্যি আমাদের এই জন্মের সঙ্গে গত কোন জন্মের নাড়িযোগ সম্পর্ক সূত্র আছে। আমাদের মনে পড়ে যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘প্রাচীন প্রবন্ধ’ গ্রন্থের ‘মেঘদূত’ নামের কালজয়ী প্রবন্ধের এই কয়টি চরণ—
‘‘...দূর হইতে যখনই পরস্পরের দিকে চাহিয়া দেখি তখন মনে হয়, এক কালে আমরা এক মহাদেশ ছিলাম, এখন কাহার অভিশাপে মধ্যে বিচ্ছেদের বিলাপরাশি ফেনিল হইয়া উঠিতেছে। আমাদের এই সমুদ্রবেষ্টিত ক্ষুদ্র বর্তমান হইতে যখন কাব্যবর্ণিত সেই অতীত ভূখণ্ডের তটের দিকে চাহিয়া দেখি তখন মনে হয়, সেই শিপ্রাতীরের যূথীবনে যে পুষ্পলাবী রমণীরা ফুল তুলিত, অবন্তীর নগরচত্বরে যে বৃদ্ধগণ উদয়নের গল্প বলিত, এবং আষাঢ়ের প্রথম মেঘ দেখিয়া যে প্রবাসীরা আপন আপন পথিকবধূর জন্য বিরহব্যাকুল হইত, তাহাদের এবং আমাদের মধ্যে যেন সংযোগ থাকা উচিত ছিল। আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের নিবিড় ঐক্য আছে, অথচ কালের নিষ্ঠুর ব্যবধান। কবির কল্যাণ্যে এখন সেই অতীতকাল অমর সৌন্দর্যের অলকাপুরীতে পরিণত হইয়াছে; আমরা আমাদের বিরহবিচ্ছিন্ন এই বর্তমান মর্তলোক হইতে সেখানে কল্পনার মেঘদূত প্রেরণ করিয়াছি।”৩
‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় বিগতের প্রতি বেদনানির্ভর আখ্যান ফুটিয়ে তুলেছেন কবি, যদিও কাব্যনাম শুনে অনেকেই ভরে থাকা স্মৃতিভাণ্ডার থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘ওড’ বা স্তুতিমূলক কবিতার একটা সুর শোনার জন্য উদগ্রীব থাকবেন। এক্ষেত্রে তাদের জন্য এই কাব্য সেই বাসনা পূরিত করতে পারবে না। বিগত রাইফেল বা কোন প্রয়োজনীয় যন্ত্র বিশেষের প্রতি সমবেদনা দেখাতে গিয়ে কবিকে ওডের ধর্ম থেকে চ্যুত হতে হয়েছে। ‘প্রতি’—নির্দেশিত কবিতা যে স্তুতিনির্ভর হতেই হবে সে কথা পাঠক আজ থেকে ভুলে গেলে সুবিধে আছে। আজকের শূন্যদশকের কবিদের মেজাজ আর মর্জি বদলেছে। নতুন কথা নতুন মেজাজে সাহিত্যের নতুন দিকে, নতুন রুটে অভিযান চালিয়ে লং রুটে চলেছেন, তবে মাঝে মাঝে রং রুট হয়ে গেলে আর কী করা যাবে। কারণ সকলেই কবি নন— কেউ কেউ কবি।
“আবার প্রথম থেকে, নতুন করে লিখছি পুরোটাবিগত সময়ের কর্মকে কেটেকুটে, ব্যাপককাটাকাটি হলেও নতুনে রয়েছে ছাপ, পুরানেরচিহ্নিত হচ্ছে ধীরে, না-লেখা কলম, তেলের কাগজতা-হোক, তবু আবিষ্কৃত হোক প্রকৃত যাপন...আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিনচালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন”৪
‘মেশিন’ নামাঙ্কিত কবিতায় সাম্য রাইয়ান যখন বিগতের প্রতি সমবেদনা সহানুভূতি পাঠকের সামনে রাখছেন, স্মৃতিভারনত পাঠকের স্মৃতিমেঘ ঘুরে ঘুরে আসে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই অমোঘ কবিতার চরণ-বিচরণ আকাশে— ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন। সেই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার ফিরে পাবার, পুঁজিবাদ নির্মূলের স্বপ্নবিভোর ঐতিহাসিক স্বপ্নদ্রষ্টা মহাপুরুষ কার্ল মার্কস, লেনিন, মাও জে দং। ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ দেশে দেশে যেমন পড়া হয়েছে তেমনি পোড়ানোও হয়েছে। সব মিলিয়ে বিগতের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে কবিকে বলতে হয়েছে— “আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।/মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন/চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন।” এই আদিম শ্রমিকের মেশিন চালাচালির মধ্যে আমিষ সুবাস কেউ কেউ পেলেও পেতে পারেন, আসলে আমাদের সভ্যতা সমাজ যুগপৎ ধ্বংস এবং সৃষ্টির মধ্য দিয়েই নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, আর তাই কবির বিগতের প্রতি বিষণ্ণমেদুর স্মৃতিতর্পণ— “একবার বিষাদ লিখে আমি কলমের নিব ভেঙে ফেলি।”
“বোবারা তাক করে আছে নিঃসঙ্গ হাসিফল।জারুল বৃক্ষ জানেকরতলে তপ্ত হচ্ছে বালুমরহুম সূর্যবতীর চোখে ঘাই হরিণীর নাভিপাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা সূর্যক্ষিপ্ত হলে রোদের তীব্রতা বাড়ে!নাভির ভেতরে তার লুকায়িত বনবেলিফুলের ঘ্রাণ, মুখরিত সকালে।”৫
আমাদের মনে পড়ে যায় জীবনানন্দ দাশের প্রবাদপ্রতিম কবিতার চরণ— “অন্ধেরা বেশি চোখে দেখে আজ।” একথা খুব সত্যি যে রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা কবিতার অঙ্গনে জীবনানন্দ দাশের খুব দরকার ছিল। তিনি বাংলা কাব্যোদ্যানে না আসলে আমাদের আধুনিক বাংলা কাব্য-কবিতা আজও সাবালকত্ব পেত না। দরকার ছিল রবীন্দ্রবলয় থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে এসে কবিতার গৃহবন্দী আত্মাকে কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে পাকা রাস্তায় মিশিয়ে দেওয়ার প্রযত্নলালিত সাহসী-প্রয়াস। যেখানে ‘হাসিফল’ নিঃসঙ্গে ঝরে পড়ে, সেখানে কু-মতলবী বোবারা সংঘ রচনা করে। বোবাদের শত্রু নেই, কিন্তু তাদের তো চোখ-কান-নাক-জিহ্বা আছে। তারা ঘ্রাণ নিতে পারে, স্বাদ নিতে পারে, স্পর্শ নিতে পারে, দেখতে পারে— শুধু বলতে পারেনা। পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে একটি ইন্দ্রিয় কাজ না করলে কী হবে বাকি চারটি অঙ্গ তো চৌখশ, ওস্তাদ! কাজেই সেই অন্ধ পেঁচা শব্দভেদী বাণ ছুঁড়ে নিঃসঙ্গ হাসিখুশিকে জখম করে। বনের জারুলগাছ খুব ভাল করে জানে যৌবনের রোদে তপ্ত হাতের বালুকাদলা ক্রমশ তেঁতে উঠছে, বনের ঘাই হরিণীর নাভির দিকে আঁখিপাত প্রঘটিত হচ্ছে। সকালের সূর্য দুপুর-বয়সী হলে তীব্রতা বাড়ে, আর ঘাই হরিণীর নাভিবিলাসী আমাদের প্রজন্মের উত্তরাধিকার জীবন প্রত্যুষেই জেগে ওঠে। বেলিফুলের তীব্রতা নিয়ে পরের দিনের সকাল আন্দোলিত করে, যৌবন মদমত্ত মুখরিত অনিবার্য আগামী সকাল, আমাদের কাছে অভিশাপ!
বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে সাম্য রাইয়ান কবি সুবোধ সরকারের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা ‘রূপমকে একটি চাকরী দিন’ কবিতার প্রায় জবাবি-কবিতা লিখেছেন ‘রূপমকে’ নাম দিয়ে। ‘সমবেদনা’ বলতে আমরা যা বুঝি— মোটামুটি সেই অভিভবই সাম্য রাইয়ান ধরার চেষ্টা করেছেন। আমাদের কাছে খোলসা হয়ে যায়— ‘বিগত রাইফেল’ শব্দের গূঢ়ার্থ অনুভবে। রাইফেল নিঃসৃত গুলি যেমন অব্যর্থ লক্ষ্যে আঘাত হেনে লব্ধিত জয় ছিনিয়ে আনে, তাই কবির সেই বিগত রাইফেলের প্রতি ভালোবাসা আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে এই কাব্যপুস্তিকার অবতারণা। সুবোধ সরকার এই শতাব্দীর একজন শক্তিশালী কবি। তার কবিতার একটি বিখ্যাত চরিত্র হল ‘রূপম’। রূপম বেকার যুবক, কিন্তু শিক্ষিত, এম.এ.পাশ। তার একটি চাকরী দরকার। কিন্তু আমাদের এই সমাজ, সমাজের নানাবিধ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা রূপমকে চাকুরী পেতে বাঁধা দিয়েছে। অথচ এই চাকুরী পাওয়ার জন্য এই সমাজ এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রদেয় সমস্ত শংসাপত্র রূপমের কাছে ছিল। সাম্য রাইয়ান দেখেছেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, চাকুরীব্যবস্থা সুবোধ সরকারের ‘রূপমকে’ চাকুরী দিতে পারে নি। কিন্তু কিছু তো একটা আছে যা রূপমকে বেছে নিতে হবে বা হয়েছে। সাম্য রাইয়ান রূপমের সেই ইলাস্ট্রেশন ভার্সন পাঠকের সামনে রাখলেন, যা হৃদয়বিদারক—
“রূপমকে একটা চাকরী দাও
এম এ পাশ করে বসে আছে ছেলেটা’
আমি আর সহজ কাজ কোত্থেকে দেই বলুন তো!
এই দুর্মূল্যের বাজারে আত্মহত্যার চেয়ে
সহজ কাজ কে-ই বা দিতে পারে আর কি হতে পারে?” ৬
‘মার্কস যদি জানতেন’(২০১৮) কাব্যপুস্তিকার নাম থেকেই অনুমেয় সাম্য রাইয়ান পৃথিবী বদলে দেওয়া এক মনীষীকে সাক্ষী রেখে কতগুলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াস করেছেন। মহামতি কার্ল মার্ক্স শোষণহীন এক সমাজব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন বিজ্ঞানসম্মত সমাজতান্ত্রিক এক রাষ্ট্রের বুনিয়াদ প্রবক্তা হিসেবে তিনি পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। এই কাব্যপুস্তিকার একটি কবিতার নাম ‘বাঘ’। মুক্তগদ্যছন্দে লেখা সুন্দর একটি গল্পের মোড়কে সুস্থ সমাজ বাস্তবতার সত্যানুসন্ধানে ব্রতী হয়েছেন কবি। অরণ্যের পশুশিকার বিশেষ করে বাঘ, সিংহ, হাতি জাতীয় পশুদের যে হত্যা করা আইনগত ভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা এই কবিতায় ধরা পড়েছে। বনের পশুদের বাঁচার অধিকার আইনগত ভাবে সমর্থিত হলেও আমাদের চোখের আড়ালে এখনও নানাভাবে এই আইন বিঘ্নিত হয়। চোরাশিকারী তাদের চোরা-কারবার প্রক্রিয়া কিছু লোভী মানুষের যোগসাজসে নির্মমভাবে রাতদিন করে চলেছে। কার্ল মার্কস যিনি সমাজের সকল মানুষের জন্য অধিকার রক্ষার ব্যাপারটিকে আইনসিদ্ধ করে গেছেন— কিন্তু সমাজের ভেতরে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাঁচার অধিকার তথা নিরাপত্তার কণ্ঠরোধ করে চলেছে। আমাদের সভ্য সমাজের মানুষ যে এইরকম পশুতে পরিণত হয়েছে তা যদি মার্কস জানতেন তাহলে কী হত? আর কবির কাছে মার্কস ছাড়া বলার তো কেউ নেই।
“আমাকে আদালতে তোলা হলো। বাঘ মেরেছি বলে ১২ বছরের কারাদণ্ড হলো আমার। শাস্তির ভারে নুয়ে পড়ে বললাম, আমার স্ত্রী-কন্যা—তাদের হত্যার শাস্তি কেউ পাবে না? আদালত বললেন, অবশ্যই আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে।”৭
মার্কস যদি জানতেন একটা আইনি বৈধতা লাগু হওয়ার পর তার জন্য বরাদ্দকৃত নির্ধারিত শাস্তি দেওয়ার পরও মানুষটির পরিবারের প্রতি আরো আরো অন্যায়,আরো আরো অবিচার করা হয় তার বিচার কেউ করছে না। আইনের রক্ষক হিসেবে পরিগণিত সমাজের উঁচুশ্রেণির মানুষ নানাবিধ বে-আইনি গহ্বরের ফাঁক-ফোঁকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটাও মার্ক্সের জানা উচিত বলেই এই কাব্য পুস্তিকার এই নামকরণ সার্থকতা আমাদের নজরে আসে। ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’— তারই মুক্তিকল্পে সমাজবিদ, দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের কাছে কবির স্মরণ-প্রার্থনা।
‘পরিচয়’ কবিতার মধ্য দিয়ে সহজ কথাটি আর সহজে পাঠকের সামীপ্যে এনেছেন সাম্য রাইয়ান। আমাদের সমাজে শোষক আর শোষিত এই দুটি সম্প্রদায় কবি জসীমুদ্দিনের রূপাই সাজুর মত একে অপরের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে। এই তাকানোতে প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রেমকাতর শুভদৃষ্টির মিলনাকাঙ্ক্ষাজাত আত্যান্তিক প্রেমজ বাসনা নেই। বরং আছে কি করে একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখবে— একে অপরের আজন্মবাহিত বৈরিতার ঠান্ডা বরফজল চুইয়ে পড়বে চিরকাল— একশ্রেণির মননপুষ্ট সুবিধেবাদী মানুষের প্রগাঢ় বৌদ্ধিক রসায়ন। কবির কাছে এই রসায়ন ধরা পড়ে গেছে, তাই সরাসরি প্রশ্ন। মার্কসও সমাজের মধ্যে ঘটে চলা এই রসায়ন হয়তো জানেন না—
“তুমি কি তাহার কুকুর?
লেলিয়ে দিয়েছে বলে
আক্রোশে ছুটে এলে!”৮
‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ কিংবা ‘মার্কস যদি জানতেন’ কাব্যপুস্তিকাদ্বয়ে কবির অন্তর্দৃষ্টি আপাত ঠিকঠাক, বাইরে থেকে দৃশ্যমান পরিপাট্য গুডি-গুডি সমাজ নড়াচড়া করছে, টলমল করছে, আষাঢ়ে ভাসিয়ে তরী পশ্চিমে কাজে যাবে। কিন্তু ভালো করে অনুভব করলে দেখা যাবে এই সমাজের ভেতরে ভেতরে বয়ে চলেছে একটি অশ্রুবিরচিত হ্রদ। বিগতের যা কিছু ভাল সব কিছুর স্মরণযোগ্য উপাখ্যাননির্ভর মণি-মানিক্য, কেবলই গল্পের জন্য। মুমূর্ষুর মাথার সামনে জীবনদায়ী ওষুধের বোতল সাজিয়ে রাখা আমাদের ‘শো-কেশ’ নির্ভর প্রসাধিত যাপনচক্র। সবিশেষ দক্ষতায় সাম্য রাইয়ান সমাজ অন্তর্গত বাছা বাছা অপ্রিয় বৈষম্য কম্বলের লোম বাছতে চেয়েছেন। স্বদেশ এবং স্বদেশের মানুষের ওপর প্রগাঢ় সমবেদনা নিয়েই সাম্য রাইয়ানের মনন-পঙ্খী উড়াল দিয়েছে বিগত রাইফেলের দেশে। সমাজ চৈতন্যের গভীরে শিকড় চালিয়ে সমাজবৃক্ষের সবুজ পাতায় হলদে ছোপ অবলোকন করেছেন কবি। মহামতি মার্কসের কাছেও পরিবর্তমান সমাজবিদ্যার সবটুকু খবর বোধহয় সেদিন ছিল না, সেই বার্তাটুকুও কবি সোৎসাহে দিতে চেয়েছেন। কবি সাম্য রাইয়ান সুখ–অসুখের মধ্যবর্তী আপেক্ষিক নো-ম্যান্স জোনে দাঁড়িয়ে বুঝে নিতে চেয়েছেন সমাজসত্যটুকু। এই কবির বুঝি প্রিয় একটি রঙের নাম হলুদ। চিল-চীৎকারময় জীবনানন্দীয় শূকরের যৌন উল্লাসপ্রমত্ত সময় শিবিরে হলুদের বর্ণপ্রপঞ্চময় এক ছায়াঘেরা হলুদ পাহাড় কবির বোধে এসে ধাক্কা মারে। কবির কল্পিত ‘হলুদ পাহাড়’ যেখানে স্বপ্নপাখিরা বাসা বাঁধে, স্বপ্নপাখিরা তাদের ভালোবাসা দিয়ে গড়া বাসায় বাসায় ডিম দেয়, ডিমে তা দেয়। তাদের হলুদ পাহাড়ের দেশে চীৎকার অবাঞ্ছিত আওয়াজ একদম প্রশ্রয় পায় না। আহ্লাদভূক পাখি শাবকের মুখ থেকে চি-চি ডাক শোনার জন্ম-সার্থকতা সেইসব মা পাখিদের স্বপ্নের ‘হলুদ পাহাড়’। সতর্ক পাঠক সাম্য রাইয়ানের কাব্যিক-চৈতন্যের বাঁকফেরা মুহুর্তের ক্ষিপ্রতা এতক্ষণে টের পেয়ে গেছেন নিশ্চয়ই। নিজস্ব কাব্যিক জগতে তিনি ঢুকে গেছেন। দেশ-কাল সমাজের কল-কল্লোলমন্দ্রিত জাতীয় সড়ক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাম্য রাইয়ান কল্পিত হলুদ পাহাড়ের ভূখণ্ডে পৌঁছে গেছেন। সমস্ত কবিদের একটা স্বপ্নকল্পিত দ্বীপ বা ভূখণ্ডের প্রচেতনা থাকে—সাম্য রাইয়ানের সেই ভূখণ্ডের নাম ‘হলুদ পাহাড়’ (২০১৯)। আধুনিক বাংলা কাব্য কবিতার ইতিহাসে দেখা যায় প্রতিটি সার্থকতম কবির কাছে একটি নিজস্ব কাব্য-উদ্যানে থাকে। আমাদের এই কবির কাব্যোদ্যানে পাঠক একটু জিরিয়ে নিতে পারেন—
“ভাবছি, কাউকে বলবো একটা পাহাড়ের ছবি বানাতে। হলুদ পাহাড়, তার উপরে মেঘ, শাদা শাদা মেঘ। দূর থেকে দেখে গাদাফুল ভেবে ভ্রম হবে মানুষের।ওরা খুশি হবে। মানুষ ভ্রমে প্রকৃতই আনন্দ পায়। পাহাড়ে উঠবে সকলে। কেউ কেউ পকেটে কিংবা পাটের ব্যাগে ভ্রমের আনন্দ ভরবে।কিন্তু হলুদ পাহাড়ে হৈ-হুল্লোর নিষেধ।”৯
‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যপুস্তিকায় কবিকে দেখা যায়— তিনি বেশি বেশি প্রকৃতি অন্বিষ্ট হয়ে পড়ছেন। জীবনের সঙ্গে লতাগুল্মময়, গাছপালাময় প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ভুলে যাবার নয়। ডালপালা-ছায়া-মায়া ঘেরা গ্রাম বাংলার গোবর নিকোনো উঠোনের এককোণে জবাফুল গাছটিও কবির একান্ত আপন, সেও তার কাছে মানবিক প্রতিমূর্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে— কবি চৈতন্যের আশেপাশে চৈতন্য হয়ে। প্রতিটি গ্রাম্য পরিবারের উঠোনে রোপিত একটি দুটি গাছ, একটি দুটি জবার ঝাড় পরিবারের জীবন্ত সদস্য হয়ে পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে। জবাগাছ শুধু কেন, ঘরের আঙিনা জুড়ে বেড়ে ওঠা যে কোন গাছ সটান সুস্থির দাঁড়িয়ে পরিবারের সব কিছু ঘটনা দুর্ঘটনা অবলোকন করে। পর্যটক বুনো স্বভাবী মানুষের প্রথম এবং প্রকৃত দ্রষ্টা উঠোনের এই জবাগাছ। ‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যপুস্তিকার প্রকৃতি সংশ্লিষ্টতা কবিকে নতুন করে আবিস্কার করার প্রাণতা জাগায়—
“মধ্যরাতের ঝি-ঝি আসলে রাত্রির নিজস্ব আসবাব।
আমি জলের উপরে নাম লিখে রাখলাম। আমি স্রোতের ভাগাড়ে নাম লিখে রাখলাম। মনে-হৃদয়ে-মগজে-মাথায় এতো যন্ত্রণা হয় কেন? শিশিরের শব্দে জগৎ বিদীর্ণ হবার দৃশ্য দেখবো বলে এখনও জেগে আছি। ‘প্রচণ্ড’ শব্দটা যদি ভেঙে ভেঙে দেখাতে পারতাম, কী ভয়ানক প্রতিবিম্ব তৈরি হয়েছে আমার! কিছু প্রজাপতি বিশ্বাস করবে পৃথিবীকে, তোমার মতো যারা সটান জবাগাছ; অথবা শরীরের বুনোপথে নিবিড় পর্যটক। এই সাজানো পথ ছেড়ে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না আজকাল।”১০
সত্যিই কবিকে দেখেছি ‘হলুদ পাহাড়’-র পর যে সব কবিতা বা কাব্যগ্রন্থগুলি তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সবগুলিতেই সেখানে প্রকৃতি মুখ্য ভূমিকা নিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছে মানুষের কাছে। ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ (২০২০) সে রকমই একটি কাব্যগ্রন্থ। আসলে ‘হামিং বার্ড’ একটি ছোট পাখি, সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ছোট্টপাখির সম্মানে ভূষিত এবং এই পাখিটি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগো দেশের জাতীয় পাখি হিসেবে স্বীকৃত। মানুষের ছোট্ট চোখের সঙ্গে তুলনীয় এই পাখিটিকে মুখ্য ব্যঞ্জনা করে সাম্য রাইয়ানের একটি আস্ত কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছে। আমাদের কাব্য-সাহিত্য-বিশ্বের অঙ্গনে এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুই রচিত হওয়ার অপেক্ষায়, কিন্তু সবটাই রচিত হয়ে উঠতে পারেনা। কোন কোন কবির চেতনার রঙে পান্না সবুজে পরিণত হয়, হীরে অন্য কোন বর্ণের মোড়কে নিজেকে উদ্ভাসিত করে। সাম্য রাইয়ানের এই কাব্যগ্রন্থে হামিং বার্ড চোখের সঙ্গে তুলনীয় এবং চোখের অভ্যন্তরে বসে কবিচেতনায় মোচড় এনেছে, স্বপ্নের অলিন্দে অলিন্দে বইয়ে দিয়েছে নদীর প্রবাহ, রক্তের ধারা—
“চোখের ভেতরে
একটা হামিংবার্ড
নিয়ে বসে আছিচমকে দিও না তাথৈ
উড়ে যাবে—উড়ে যাবে তারা—স্বপ্নেরা;
সারি সারি ডানা
ঘুমের ভেতরে বয়ে চলা নদী
হাতের তালুতে বয়ে যাবে
ঢোঁরা সাপ, রক্তের ধারা।”১১
সাম্য রাইয়ান প্রকৃতির অনুষঙ্গে অপ্রাকৃতিক মেঘের দোল-দোলানো দোলনায় দুলতে ভালোবাসেন। চোখের ভেতরের হামিং বার্ড ধরলার মতো উদ্ভ্রান্ত মেঘের মুখে চঞ্চু গলিয়ে তুলে আনে কবিতার মুগ্ধ রঙিন আলো। প্রেমের সৃজন ঋতুমাসে রূঢ় বর্ষার জল কার ঘরে ঢুকে যায়— চোখের হামিং বার্ড তার ছবি তুলে রাখে। আকাশ জুড়ে ঘনিয়ে আসা সাদা মেঘের ভেতর থেকে নেমে আসা অজস্র ধারায় বৃষ্টি, প্রকৃতি পৃথিবীর চারিদিক কাঁপিয়ে তছনছিয়ে নতুন বৃষ্টিতে সৃষ্টির ঘ্রাণ ছড়িয়ে শেষমেশ পৃথিবী ঘুমাতে যায়—
“থাকো, যেভাবে আছো বসে সেভাবেই!
উঠতে হবে না বৃষ্টি দেখতে, ভিজবেই?
…
তারপর শাদামেঘজুড়ে মেহগনি বনের ছবি
প্রসবের ঘ্রাণ চার্দিকে ছড়িয়ে ঘুমালো পৃথিবী।”১২
সাম্য রাইয়ান লিখিত ‘লিখিত রাত্রি’ (২০২২), “পঞ্চান্ন পর্বের এই সিরিজ জুড়ে রাত্রির গল্প— অনেক রাত— রাতের পর রাত যা লিখিত হয়েছে— এক রাত্রিতে এসে তা পূর্ণরূপ নিয়েছে। সেখানে বিস্তৃত হয়েছে রাত্রির নিজস্ব আসবাব- কুকুর, পতিতা, নাইটগার্ড, পাখি, কবি, প্রেম, বিবাহ, ট্রাক ড্রাইভার...”, কাব্যগ্রন্থের ব্লার্বঘোষিত এই পরিচিতি নেহাতই প্রকাশকের উপলব্ধিত গ্রন্থের বিষয়কেন্দ্রিক ভূমিকা। সাম্য রাইয়ান ‘লিখিত রাত্রি’-র প্রথম দর্শনে এক চমকপ্রদ কবিতার চরণ বিন্যাস পাঠকের চোখে পড়বে। কী সেই বিন্যাস? পঞ্চান্ন সিরিজের সংখ্যা চিহ্নিত এক থেকে পঞ্চান্ন প্রতিটি কবিতা পাঁচচরণে লিখিত, আর ছন্দের দিক দিয়ে প্রতিটি কবিতাই অক্ষরবৃত্ত ছন্দের গুরুভাব গুরুনাদ এবং গাম্ভীর্য নিয়ে স্বাধীন সত্তায় ক্রমশ উজ্জীবিত। ঘষিতে সৌরভময় চন্দনকাঠের মতো কবিতার প্রতিটি শব্দ প্রতিটি চরণ নিত্য নতুন অভিভব আর অনুভব নিয়ে পাঠকের মনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে। যে রাত্রি আজ লিখিত হয়ে পাঠকের কাছে এল— এই রাত্রির যেন শেষ নেই। আরব্য রজনীর সহস্র এক রাত্রির মতো প্রতিরাতে নতুন নতুন উপচয়ে শ্রোতাকে কাঠ করে রাখে, ভয়ে হিম করে রাখে-র মতো উজালা উতলা সাম্য রাইয়ানের এই ‘লিখিত রাত্রি’ নয়। তার রাতে ঘোরাফেরা করে আমাদের প্রতিদিনের চেনাশোনা পতিতা, কিছু পায়ের শব্দচেনা উচ্ছিষ্টভূক পথকুকুর, নয়তো বা জীবনানন্দের সেই ‘রাত্রি’ কবিতার কিছু গাড়লের মতো কেশে যাওয়া ট্রাক ড্রাইভার, যারা অস্থির পেট্রোল ঝেড়ে রাত কাঁপিয়ে অন্ধরাতের বন্ধ চোখ আলোয় কানা করে ছুটে যায়। ছুটে যায়— প্রতিশ্রুতি রক্ষার মরণপণ হাতের তালূ জীবন নিয়ে ছুটে যাওয়া সেই মহাজন, মহৎজন প্রিয়জনের কাছে—
“ছাপোষা মধ্যরাতে পুরোনো প্রেমিকাকে মনে পড়া
দোষের কিছু নয়। যখন তা ছিল বৃক্ষের নতুন
পাতাদের মতো। ওরা সুউচ্চ জিরাফের গ্রীবা থেকে
নেমে এলে, যে উজ্জ্বল পাখিঘুম আমার দিকে
তাকিয়ে থাকে, ওর কোনও ভাবনারেখা নেই!”১৩
ভাবনার শেষ রেখাহীন রাতের পাখিঘুম ছাপোষা মধ্যরাতে পুরোনো প্রেমিকাকে মনে করায় কোন পাপ নেই। কোন বাঁধা নেই— এই রাত এই রাতের লিখিত জীবন-কবিতা, জীবনে জীবন আনে। আমাদের মানব জীবনে তাই রাত্রিতে লেখা জীবনের লিখিত কবিতা আত্মশুদ্ধি আত্মপরিতৃপ্তির চোঁয়া ঢেঁকুর ওঠা সৎ এবং সত্য-কবিতা। ‘কয়েকটা মন খারাপের রাতে’ বনমোরগ হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে, বনমোরগের ভোরের কণ্ঠে আকাশ বিদারক চীৎকার নিয়ে জেগে ওঠার বাসনা আমাদের এই কবির লিখিত রাত্রির চরণ-অঙ্গে বিভূষিত হয়েছে। কবির এই বনমোরগ হওয়ার বাসনাকেন্দ্রে দেখা যায়— আমাদের এত এত ভালো বাসাবাসি, এত এত আলো হাসাহাসির উৎফুল্ল সমীরণ হিল্লোলে বনমোরগের কোন শুভাকাঙ্ক্ষী থাকে না। সাম্য রাইয়ানের রাত্রিতে লিখিত কবিতায় এই রকম সামাজিক বাস্তবতা আমাদের কঠিন কঠোর আলো ঝলমল চনমনে ‘দিন’টাকেও আতঙ্কের মনে হয়। আর ‘রাত্রি’ সে তো কালে-কালান্তরে বোধগম্যের বাইরে, রহস্যের মোটা চাদরে ঘেরা, সমস্ত সৃষ্টি আর প্রলয়ের সুতিকাঘর—
“যেতে যেতে পথে, মধ্যরাতে; কুকুর, পুলিশ ও
বেশ্যাকে নিঃশব্দে বলি—পথ আটকানো নিষেধ। এ
রাত শুধুই প্রেমিক, কবি ও পাগলের। গান শেষে
দ্যাখো পুরোটা জুড়ে শুধু ছেঁড়া পাতাফুল পড়ে
ছিলো যা, সকল খারিজ হলো অন্ধবাগান থেকে।”১৪
রাত্রির অন্ধবাগানে পড়ে থাকা ছেঁড়া গাছের শাখা-পল্লব, পুষ্প-মঞ্জুরী সকালের রোদ কুসুমিত আলোয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। রাত শুধুই প্রেমিক, কবি আর পাগলের জন্য অবারিত, কারণ এই পৃথিবীতে তারাই নিঃস্বার্থ, তারাই যা দেয় তার বিনিময়ে কিছু আশা করে না। ‘একহাতে দাও আর অন্য হাতে নাও’— এই ফর্মুলায় তারা বিশ্বাসী নয়। যে প্রেমিক কাউকে নিঃশর্ত ভালোবেসে হয়তো নিজেই ঠকেছে, যে কবি মায়াময় পৃথিবীর উদ্যানে ভালোবাসার বীজ বুনেছে, সেই বীজ থেকে গাছ গজালো কী না এখনও দেখে যেতে পারল না। কখনো ভেবেছে রাতের নরম শিশিরস্পর্শে চকিতে অঙ্কুরোদ্গম হয়েই বাতাসে মিলিয়ে গেল! আর পাগল সে তো প্রতিদিনের জন্য রাতের বাদশাহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেহের আলি, আসমুদ্র হিমাচল তার মুঠঠিতে। তাই রাতের এই কয়জন মেহেমানকে আটকানোর মতো কোন অজুহাতই পুলিশ, কুকুর বা অতীব সুন্দরী বেশ্যারও থাকতে পারে না। ‘লিখিত রাত্রি’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি নিশাচর প্রাণীর ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনিয়ে নৃত্য পটিয়সী রাত্রির অভিমুখে চলে যায়, প্রাক-রাত্রির বেদনা বৈষাদান্তিক ভ্রম লুকিয়ে রাখার আধার, রাত্রির নিকষ অন্ধকার ছাড়া আমাদের সূর্যতপা মানবিক পৃথিবীর আর কোথায় আছে? কবি সুবোধ সরকার যেমন তার সন্তানের কথামতো তাকে ‘ভালো জায়গাটা’-য় নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে— কবি আদপে ‘ভালো জায়গাটা কোথায়’ আছে সেটা খুঁজেই পান নি। সন্তানকে ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন নি—এটা ওটা খেলনা আর খাবারের লোভ দেখিয়ে কোনরকমে আশ্বস্ত করেছেন মাত্র! আসলে পৃথিবীতে ভালো জায়গাটাই নেই!
‘লিখিত রাত্রি’-র পরেই আর একটি কাব্যগ্রন্থের কথা আমাদের মনে আসে, যে কাব্যগ্রন্থে আমাদের নিসর্গ প্রকৃতির অপর একটি অনিবার্য পৃষ্ঠার কাব্যরূপ রচিত হয়েছে। ‘হালকা রোদের দুপুর’ (২০২৩), রাত্রি-লিখন পরবর্তী লিখনে হালকা-রোদ তৎসহ রোদের দুপুর না হলে সাম্য রাইয়ানের কাব্য পরিক্রমা অসম্পূর্ণ থেকে যাবার সম্ভাবনা থাকত। সম্ভত কবির সেই অনুমেয় প্রকৃতি বিলাসিতার এই গ্রন্থে পরিপূর্ণতা পেল—
“কিছু রোদ এসে আছড়ে পড়ছে মাঠে, মেয়েদের মতো। পৃথিবী এক ঢেউ ভুলে যাওয়া নদী! বেহায়া কুকুরদল- সস্নেহে তোমার সাথে। যতটা দেখে তুমি পৃথিবীকে ভাবো, পৃথিবী আসলে তার পর থেকে শুরু! পাখি নেই তবু ডানা ঝাপটানো আছে। দূরের আকাশে তার উথাল- পাথাল শব্দ- হাসিঠাট্টায়, লুকানো জীবাশ্মের মতো! জীবন বলপয়েন্ট, আপনি ফুরিয়ে যায়। আরও কিছু ফুলতোলা কাজ- নকশিকাঁথা, কোথায় হারায়?”১৫
গভীর অনুশীলন সাপেক্ষ টানাগদ্য কবিতা রচনা করতে গিয়ে, এই একেবারে আনকোরা আধুনিক প্রকরণের শিল্প সিদ্ধকাম সার্থকতা সাম্য রাইয়ান প্রথম থেকেই করায়ত্ব করেছেন। ‘হালকা রোদের দুপুর’-এ দ্বিপ্রাহরিক কাব্যিক প্রকৃতিবিহার বলতে যা বোঝায় কবি সেটাই করতে বেরিয়েছেন। এই কবি নিজেকে ভাঙছেন, নিজেকে গড়ছেন— নিজের লেখনীর অবিসংবাদী প্রান্তছায়া ছুঁয়ে আবার নতুন অনাস্বাদিত চৈতি-খৈলানে নিজেকে মেলে ধরার জন্য তীব্র অস্বস্তির বিষাদ নিয়ে এগিয়ে গেছেন। একটি কাব্যের অভিভব পরের কাব্যে এসেই যেন কবির কাছে তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কবির কাছে তাই নতুন আরও ভাব বিভাব দরকার হয়ে পড়ছে। পাল্লা দিয়ে অধরা নতুন কাব্য-প্রত্যয়কে খুঁজে পেতে চাইছেন। মোটামুটি এই সময়েই তার কবিতার ধারাবাহিক নিবিষ্ট কাব্যপাঠকের কাছে একটি ‘সাম্য রাইয়ানীয়’ উন্মুক্ত কবিতার হরিৎক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেছে বোঝা যায়। পাঠক যেন এত এত কবিদের ভিড়েও সাম্য রাইয়ানকে আলাদা করে চিনে নিতে পারছেন। এই চেনাটা অবশ্যই যে কোন কবির কাছে বড় শ্লাঘার, বড় আনন্দের। নিজস্ব কাব্যভাষা, ধ্বনিঝঙ্কার আর রূপকল্পের মুদ্রাগত ব্যবহারবিধিও কোন কোন ক্ষেত্রে সাম্য রাইয়ানকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে সাহায্য করছে। গদ্য কবিতার চলমান বাক্যস্রোতের মধ্যে অবিকল মুখের কথাকে (তা সে দেশি-বিদেশি যাইহোক না কেন) প্রবেশ করিয়ে দেবার শৈল্পিক দক্ষতা তার কবিতার সুর আর স্বরকে আলাদা করে দিয়েছে সন্দেহ নেই—
“অসংখ্য দুপুরের কথা বলা যেতে পারে, অগণিত মেয়েদের নাম। নির্ঘুম রাতের গল্প বলা যেতে পারে, অথবা দূরের কোনও গ্রাম। কোন গল্পে সূর্য অস্ত যাবে, ভেবে তুমি ছুঁড়ে দাও জ্যৈষ্ঠের রোদ। আহত ফুলের পাশে গেঁথে রাখো শিশুদের হাসি। সকলই দরকারি, কেবল মানুষ অহেতুক। বিচিত্র বেদনা পুশ করছে খেলাচ্ছলে। কাঁদছে অক্টোপাশ, প্রসাধনহীন চোখে...”১৬
‘হালকা রোদের দুপুর’ খুব দ্রুত ছুটে চলা অশ্বের নিয়ন্ত্রণ অশ্ব আরোহীর হাতের লাগামে সুতীব্র ভাবে আঁটা থাকে। ঘোড়া যত জোরেই ছুটতে পারে পারুক— আমি ঘোড়া ছোটাব আমার প্রয়োজনমতো। কবি দুপুরের রোদ চাইছেন, স্বাভাবিকভাবে সেই রোদ যেমনই হোক দুপুর মানে তার তীব্রতা থাকবে, সেই দুপুরের হালকা রোদের কল্পনা— কল্পনাতেই সম্ভব। হয়ত কবি দ্বিপ্রাহরিক তীব্রতাময় কড়া অনুভব হালকা চালে পাঠকসমীপে আনতে চাইছেন। আর এই কারণেই রোদের দুপুর কিন্তু হালকা, বলতে গেলে শীত-সকালের দুপুরের হালকা রোদ প্রার্থনার মতো মুখরোচক অনুভব কবির চোখে পড়েছে যা উন্মোচন করার জন্য এরকম একটি হালকা রোদের দুপুর চাইছেন—
“এক চশমায় কেটে যাচ্ছে দিন— কী করে! আগে তো কাটেনি, হেলায় হাত থেকে পড়ে অথবা চাপাচাপি— ভেঙে যেত কাচ। তখন, রোদের দুপুরে কথা বলতো না চোখ। নির্বাক চলচ্চিত্রসমেত হাসি হাসি মুখ। শব্দ ছাড়াই কোলাহলে নকল উল্লাস। যেন দিবসশেষের ঘুম, অনিবার্য! গোপনে চেয়েছিলো মেঘ, দূরের আরাম। কিছুই পায়নি সে, এই কথা ভুল হবে বলা। কাচের দেহরক্ষী নিয়ে আড়াল করেছে চোখের যৌনজীবন।”১৭
একদম হালকা চালে প্রসাধিত শব্দ বাক্যবাণ একটি একটি করে ময়দানে ছেড়ে দিলেন কবি। শব্দব্রহ্ম মহাশূন্যে একটু ঘোয়াঘুরি করার পর একসময় ঠিকঠাক জায়গায় মোক্ষম লক্ষ্যে এসে গেঁথে গেল। অপমানের তীব্রতাবোধ হালকা রোদের দুপুরে ‘লম্বুকা ঝটকা ধীরে সে লাগে’-র রেশ ধরে পাঠকমনে বেশ লাগল। প্রাতিবেশিক কারণে যোগ্যতমের বেঁচে থাকার তীব্রতায় জটিল জীবনচক্রে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলে বদলে নিচ্ছে। বুদ্ধি-মেধার সাথে ধূর্ততার মিশেলে কখনও কখনও নিজেকেই ভুল বুঝতে শুরু করছে। আর আমাদের এই সময়ের চৌখশ কবির চোখ এড়াবে কী করে! — ‘কাচের দেহরক্ষী নিয়ে আড়াল করেছে চোখের যৌনজীবন।’ ভয় লাগে এখন থেকে চশমাধারী যে কোন মানুষ দেখলেই সাম্য রাইয়ানের কবিতা পড়েছে এমন পাঠকের স্মৃতিতে জেগে উঠবে না তো— ‘চোখের যৌনজীবন’-বার্তা! যদি জাগে, আমার মতে সাম্য রাইয়ান তাহলে একজন কবি হিসেবে সার্থক। কৃষকের হাতের কাস্তে দেখে আমাদের মানসচোখে ‘কাস্তেকবি’ দীনেশ দাসের কথা মনে আসে, ডাকবাহক পিয়ন দেখলে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’-কে মনে পড়ে, রেলস্টেশনে কুলিকে দেখলে কাজি নজরুল ইসলামের ‘কুলি মজুর’-কে মনে পড়ে, তেমনি আমাদের কাছে ‘সোনালি কাবিন’-র প্রসঙ্গ এলে আল মাহমুদ, বাংলাভাষা, মাতৃভাষার উচ্চারণ প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানকে আধুনিক বাংলা কবিতা পাঠকের মনে বাজবে সেই কবি এবং কবিতার ধুন। সাম্য রাইয়ানের ক্ষেত্রে এরকমভাবে তাকে মনে পড়ার মতো চিত্রকল্প জড়ানো কাব্যচরণ তো আছেই। ‘হলুদ পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থের ‘হৈ হুল্লোড় নিষেধ’ চরণটিই আগামীতে প্রবাদবাক্য হতে যাচ্ছে। ‘হালকা রোদের দুপুর’-এ লিখিত কবির নিসর্গ এবং সমাজ অধীত বিদ্যা হালকা মেজাজে খররৌদ্রপ্রতাপবিকিরণক্ষম অনুভব পাঠকের মনে গেঁথে থাকল।
সাম্য রাইয়ান দুহাত খুলে বুক চিতিয়ে লিখে চলেছেন, কাব্য মায়াপ্রপঞ্চের ফলভারী নোয়ানো মাথার ডালে ডালে হাসিফল, বিষাদফল, বাসনাফল উন্মেষ বেদনার অস্থির—প্রমত্ত প্রয়াস আধুনিক বাংলা কবিতার অঙ্গননন্দিত প্রতিভাস আজ না হোক কাল পাঠকমুখে ঘুরে ঘুরে আসবে। লোকাল ট্রেনের জার্নাল ধরে যে মুক্তগদ্যের সাহিত্যরথে তিনি চড়ে বসেছেন, তাতে শূন্যদশক পরবর্তী সাহিত্যের ইতিহাস উশখুশ মাথা বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরও সবাইকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। আমাদের হাসি কান্নার মেঘ রৌদ্র, দৈনিক যাপনচক্রের সকাল- সন্ধের নুন পান্তা, যৌনতার চাপা ও ধুন্ধুমার উত্তাপ পরবর্তী প্রত্যাশাঞ্চলে আর কেউ থাকুক না থাকুন জেগে থাকবে একমাত্র ‘কবিতা’। এক আকাশ অন্ধকারে একটি ধ্রুবতারার উজ্জ্বল চোখ সারা রাত বিনিদ্র কাটাবে। আমাদের বাংলা কবিতা অবশ্যই আজকের দারুণ-দহনদিনে তপ্ত হাতের তালুর ওপর হাত রেখে বলবে— মনে পড়ছে সেই কবিতা ? মনে পড়ছে একটি শিশির বিন্দু একটি ঘাসের ওপর আনন্দ হয়ে ভাসছে...
তথ্যসূত্র:
১। সাম্য রাইয়ান, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, কাব্যগ্রন্থের ব্লার্বে লিখিত অংশ থেকে চয়িত।
২। সাম্য রাইয়ান, ‘মহাকোলাহল’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ- ৭
৩। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,’ প্রাচীন সাহিত্য’, ‘মেঘদূত’, www.bengaliebook.com, Page-12
৪। সাম্য রাইয়ান, ‘মেশিন’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ- ৯
৫। সাম্য রাইয়ান, ‘হরিণীর নাভি’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ-৩৫
৬। সাম্য রাইয়ান, ‘রূপমকে’, ‘রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ-২৮
৭। সাম্য রাইয়ান, ‘বাঘ’, ‘মার্কস যদি জানতেন’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃ-৩
৮। সাম্য রাইয়ান, ‘পরিচয়;, ‘মার্কস যদি জানতেন’, প্রকাশক: রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃ-৮
৯। সাম্য রাইয়ান, ‘হলুদ পাহাড়’, ‘হলুদ পাহাড়’, বাঙ্ময়, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: আগস্ট ২০১৯, পৃ-৭
১০। সাম্য রাইয়ান, ‘জবাগাছ’, ‘হলুদ পাহাড়’, বাঙ্ময়, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: আগস্ট ২০১৯, পৃ-১৯
১১। সাম্য রাইয়ান, ‘হামিং বার্ড’, ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২০, পৃ-১৮
১২। সাম্য রাইয়ান, ‘এই বরষায়’, ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২০, পৃ-২১
১৩। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: চার’, ‘লিখিত রাত্রি’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২২, পৃ-১২
১৪। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: ঊনপঞ্চাশ’, ‘লিখিত রাত্রি’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২২, পৃ-৫৭
১৫। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: এক’, ‘হালকা রোদের দুপুর’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৩, পৃ-৯
১৬। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: বাইশ’, ‘হালকা রোদের দুপুর’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৩, পৃ-৩০
১৭। সাম্য রাইয়ান, ‘কবিতাক্রম: তেত্রিশ’, ‘হালকা রোদের দুপুর’, প্রকাশক: মাহদী আনাম, ঘাসফুল, ১১/১ ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৩, পৃ-৪১