❑ সাম্য রাইয়ান
শাদাকালো এই জঞ্জালে ভরা পৃথিবীর ভেতরেও শিশুরা আরেকটি রঙিন পৃথিবী দেখতে পায়, যা বড়দের চোখে ধরা দেয় না। শিশুর চোখে মেঘ কখনো হাতি, কখনো জাহাজ, কখনো আবার কোনো অজানা রাজ্যের দুর্গরূপে হাজির হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৃষ্টিতে সেই একই মেঘ কেবল জলীয় বাষ্পের সমাবেশ। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলোর একটি। দুনিয়াখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো বলেছিলেন, “প্রত্যেক শিশুই একজন শিল্পী।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাফায়েলের মতো নিখুঁত ছবি আঁকতে তার চার বছর সময় লেগেছিল, কিন্তু একটি শিশুর মতো আঁকা শিখতে লেগেছে পুরো জীবন।
মানবজাতির অগ্রগতির প্রধান কারণ হল মানুষ এমন সব কিছুর কল্পনা করতে পেরেছে, যা তখনও বাস্তব হয়ে ওঠেনি। প্রতিটি আবিষ্কারের আগে তা ছিল কেবলই একটি কল্পনা, প্রতিটি বিপ্লবের আগে কেবলই একটি স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন ও কল্পনাশক্তির প্রথম বিদ্যালয় রূপকথা।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন শিশুর কাছে রূপকথার চেয়ে স্মার্টফোন সহজলভ্য। এআই গল্প লিখে দিচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া শিশুর পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করছে। এই সময়ের সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, রূপকথার যুগ শেষ। বিজ্ঞান যখন সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, তখন রাজপুত্র, রাক্ষস, পরী কিংবা কথা বলা প্রাণীর প্রয়োজন কী? এআইয়ের যুগে রূপকথা আমাদের কী কাজে লাগে?
আপাতদৃষ্টিতে এ প্রশ্ন যৌক্তিক মনে হলেও আসলে বিপজ্জনক সরলীকরণ। মানুষের মস্তিষ্কের সবচেয়ে বিস্ময়কর ক্ষমতা হলো, সে বাস্তবে যা নেই, তাও কল্পনা করতে পারে। এই ক্ষমতাই শিল্প, দর্শন ও বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছে। যে শিশু একদিন কল্পনায় মেঘের ওপর দুর্গ নির্মাণ করে, সেই শিশুই বড় হয়ে হয়তো এমন একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করবে, যা আজ অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। বাস্তবকে অতিক্রম করার সাহস থেকেই সৃজনশীলতার জন্ম হয়। আর সেই সাহসের প্রথম পাঠশালা রূপকথা।
বাঙলা শিশু সাহিত্য এই সত্যেরই অনন্য দলিল। শিশুকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি, বাঙলা শিশু সাহিত্যে তার অন্যতম ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তিনি শিশুর কৌতূহলকে সম্মান করতে শিখিয়েছেন। তাঁর গল্পে আছে প্রাণ-প্রকৃতি, হাস্যরস, আর সবকিছুর কেন্দ্রে আছে বিপুল বিস্ময়।
পৃথিবীকে সব সময় একই নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না, এই উপলব্ধি বিজ্ঞানমনস্কতারও একটি অপরিহার্য ভিত্তি। কারণ বিজ্ঞানের শুরুই হয় প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে। অন্যরকম করে দেখার মধ্য দিয়ে। শিশুসাহিত্যে সম্পূর্ণ অন্যতর এক দুনিয়া নিয়ে হাজির হলেন সুকুমার রায়। বাঙলা ভাষায় অর্থহীনতার মধ্যেও যে গভীর অর্থ থাকতে পারে, তা জানলাম তারই কাছে। ‘আবোল তাবোল’, ‘হ য ব র ল’ প্রভৃতি তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
যে শিশু একটি সাধারণ বাক্সে গুপ্তধনের সম্ভাবনা দেখতে পারে, সে-ই একদিন সাধারণ পৃথিবীর ভেতর অসাধারণ সম্ভাবনাও আবিষ্কার করতে পারবে। এই বিশ্বাস থেকেই বাঙলা শিশু সাহিত্যে বিস্ময়ের এক গৃহস্থালি নির্মাণ করেছেন লীলা মজুমদার। তাঁর গল্পের জাদু ঢুকে পড়ে বারান্দায়, রান্নাঘরে, পুরোনো আলমারিতে কিংবা দুপুরবেলার নিস্তব্ধতায়। ‘পদিপিসির বর্মিবাক্স’, ‘হলদে পাখির পালক’ বা তাঁর অসংখ্য গল্প, সবখানেই দেখা যায়, শিশুর কল্পনাশক্তিকে তিনি বাস্তবের ভেতরে আশ্রয় দিয়েছেন। অলৌকিকতা সেখানে পৃথিবীকে নতুন করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
এই ধারায় দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার-এর অবদান একেবারেই স্বতন্ত্র। বাঙালির সমষ্টিগত কল্পনাশক্তির জীবন্ত ভাণ্ডার ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের ভয়, আকাঙ্ক্ষা, সাহস, প্রেম, লোভ ও মুক্তির স্বপ্ন সেখানে রূপক ও প্রতীকের ভাষায় আশ্রয় পেয়েছে। ঠাকুরমার ঝুলি-র রাক্ষস মানুষের আদিম হিংসা ও লোভের রূপক। আর পরী এমন এক সম্ভাবনার প্রতীক, যা বাস্তবের সীমা অতিক্রম করার সাহস জোগায়। এই কারণে শতবর্ষ পেরিয়েও লোককথা পুরোনো হয় না; সময়ের সাথে সাথে তার প্রতীক ও রূপক নতুন অর্থে বারবার ফিরে আসে।
ড. আশরাফ সিদ্দিকী বাঙলাদেশের লোকসাহিত্য গবেষণাকে শিশু সাহিত্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছেন। তিনি গ্রামবাঙলার মুখে মুখে ঘুরে প্রচলিত অসংখ্য লোককাহিনি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সাহিত্যিক পরিমার্জনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সংকলিত রূপকথাগুলো এ জাতির ইতিহাস, বিশ্বাস ও জীবনবোধের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
বাঙলার লোককথাকে প্রথম আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে তুলে ধরার অন্যতম পথিকৃৎ লালবিহারী দে। তাঁর সংকলিত Folk-Tales of Bengal বাঙলার মৌখিক ঐতিহ্যকে লিখিত সাহিত্যের মর্যাদা দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রয়াস। এ কাজের মধ্য দিয়ে বাঙলার রূপকথা আঞ্চলিকতার সীমা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় প্রবেশ করে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাঙলা শিশু সাহিত্যে রূপকথার স্বতন্ত্র জগৎ নির্মাণ করেছেন আলী ইমাম। তাঁর লেখার ভাষা সহজ, অথচ শিল্পিত; কাহিনি রোমাঞ্চকর ও মানবিক। শিশুমনের বিস্ময়, দুঃসাহস এবং আবিষ্কারের আনন্দকে তিনি এমনভাবে ধারণ করেছেন যেখানে শিশুরা ভাবতে উৎসাহী হয়।
বাঙলাদেশের শিশু সাহিত্যে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই)। যিনি শিশুদের জন্য পাঠ, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার একটি পরিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ করেছেন। সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত কাহিনি এবং মানবিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে তিনি শিশুর কৌতূহল, সংবেদনশীলতা ও কল্পনাশক্তিকে একসঙ্গে লালন করেছেন।
রূপকথা সংগ্রহ ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভূমিকা উল্লেখ না করলেই নয়, তিনি জ্যোতির্ময় ঠাকুর। দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে যখন মৌখিক লোকঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা রূপকথাগুলোকে সংকলিত করে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিত সংকলনগুলো বাঙলাদেশের লোকঐতিহ্য, ভাষা ও কল্পনাশক্তিকে সংরক্ষণের মূল্যবান প্রচেষ্টা।
বাঙলা শিশু সাহিত্যের ঐতিহ্য এখানেই থেমে নেই। সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রফেসর শঙ্কু কিংবা তারিণীখুড়ো-র গল্পে বিজ্ঞান, রহস্য ও কল্পনাকে একসূত্রে বেঁধেছেন। শৈলেন ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মুহম্মদ জাফর ইকবাল—প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব উপায়ে শিশুমনে বিস্ময়ের নতুন দরজা খুলে দিয়েছেন।
আজকের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের দ্রুত দক্ষ করে তুলতে চায়। সবাই জীবন বাজি রেখে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। কিন্তু দক্ষতার আগে প্রয়োজন কল্পনা। যার কল্পনা করার ক্ষমতা নেই, সে নতুন কিছু উদ্ভাবনও করতে পারবে না। সে যা করতে পারবে তা কেবলই বাস্তবতার অনুকরণ, অবিকল নকল। পৃথিবীর প্রতিটি বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনে ছিল একটি অসম্ভব কল্পনা। কিন্তু আমাদের দেশে শিশুরা কল্পনাবিমুখ হয়ে বেড়ে উঠছে।
সেদিন ফেসবুকে শ্রীলঙ্কার বাচ্চা একটা মেয়ের ভিডিও দেখলাম। কোলে ঘুম-ঘুম গন্ধগোকুলের বাচ্চা। পেছনে একটা মস্ত কাঁটাওয়ালা সজারু। আর সে দিব্যি আল ধরে হাঁটছে। পায়ের কাছে মুখ দিচ্ছে!
প্রথমে ভাবলাম এডিট করা। সজারুর বড় বড় কাঁটা। দৃশ্যত ভয়ংকর। আর গন্ধগোকুল তো মানুষ দেখলেই ভয়ে পালায়। অথচ এখানে দুটোই একটা বাচ্চার পিছু পিছু। গন্ধগোকুলটা কোলে, নিশ্চিন্তে। সজারুটা পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে। অনায়াস ভঙ্গিতে বহমান…
ভিডিওর কমেন্টে সবাই লিখছে cute, rare friendship। হ্যাঁ, rare-ই। কারণ আমাদের সমাজে বন্য মানে শত্রু। অথবা কনটেন্ট। এই মেয়েটা ওদের কনটেন্ট না বানিয়ে বন্ধু বানিয়েছে।
ইস্কুল-কলেজ আমাদের শিশুদের মাথায় বুলেটের মতো ঢুকিয়ে দিয়েছে, সবার চেয়ে বড় হতে হবে। বন্ধুর চেয়ে সেরা হতে হবে। অন্য প্রাণীকে ডোমিনেট করতে হবে। প্রকৃতিকে জয় করতে হবে। এই মেয়ে উল্টোটা করল। নিজেকে ঝুঁকিয়ে নিলো। নিচু হলো। কোলে তুলে নিল গন্ধগোকুলকে। হেঁটে গেল সজারুর সাথে। কেউ কাউকে জোর করলো না, হামলা করলো না।
এবার চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা ভাবুন, বাচ্চা মেয়েটা হাঁটছে। সজারুর কাঁটায় রোদ লাগছে। গন্ধগোকুলটা কোলে।
আমরা সবাই যদি একটু এইভাবে হাঁটতে পারতাম
তাড়াহুড়ো ছাড়া
ভয় ছাড়া
পাশাপাশি
তাহলে দুনিয়াটা এত হিংস্র-অসভ্য হতো না।
সমস্যা হলো, আমরা শিশু সাহিত্যকে এখনও কেবল নীতিশিক্ষার বই বলে মনে করি। প্রতিটি গল্পের শেষে একটি স্পষ্ট উপদেশ না থাকলে গল্পটি ব্যর্থ। অথচ সত্যিকারের সাহিত্য ভাবতে শেখায়। কল্পনা করতে উৎসাহী করে।
রূপকথা বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে বোঝার প্রস্তুতিপর্ব। একটি শিশু যখন রাক্ষসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছোট্ট নায়ককে দেখে, তখন সে সাহসকে অনুভব করতে শেখে। যখন একটি কথা বলা পাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, তখন প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের একটি নতুন ভাষা আবিষ্কার করে। এই অনুভবই মানুষকে সহানুভূতিশীল, সৃজনশীল ও প্রশ্নমুখর করে তোলে।
প্রযুক্তি যত এগোবে, রূপকথার প্রয়োজন ততই বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হাজার গল্প লিখতে পারে, কিন্তু শিশুর মতো রংধনু দেখে অবাক হতে পারে না। বিস্ময়ের এই ক্ষমতাই মানুষকে মানুষ করে তোলে।
রূপকথা সেই বিস্ময়কে বাঁচিয়ে রাখে। যে শিশু রূপকথা পড়ে বড় হয়, সে পরীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করবে এমনটা না; কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্নে বিশ্বাস করতে শিখবে।
এই বিশ্বাসের কোনো বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। সম্ভবত কোনো দিন হবেও না। আইনস্টাইন বলেছিলেন, “Imagination is more important than knowledge.” আর কল্পনার সবচেয়ে প্রাচীন, বিশ্বস্ত এবং সুন্দর আশ্রয়ের নাম রূপকথা।

.jpg)