❑ সাম্য রাইয়ান
বিকেলের শেষ আলোটা জানালার গ্রিল বেয়ে ঘরে ঢোকে, তারপর খুব ধীরে ধীরে মেঝে থেকে সরে যায়। আলো সরে গেলে ঘর অন্যরূপে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। টেবিলের কোণে পড়ে থাকা একটা কলম, আধখাওয়া চায়ের কাপ, বইয়ের ভেতরে গুঁজে রাখা পুরনো ট্রেনের টিকিট, সবকিছু এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন বহুদিন ধরে আমার ফেরার অপেক্ষায় ছিল। অথচ আমি তো কোথাও যাইনি। একই ঘরে, একই শহরে, একই জীবনের ভেতর ঘুরপাক খেয়েছি। দূরত্বে নয়, পুনরাবৃত্তে হারিয়ে গেছি।
ইতিহাস নিজেকে পুনর্লিখন করে। কথাটা শুধু রাজনৈতিক অর্থে নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও প্রযোজ্য। একই অনুশোচনা ভিন্ন মুখাবয়বে ফিরে আসে। একই শূন্যতা অন্য ঠিকানায় বসবাস শুরু করে। আমরা মনে করি নতুন মানুষ, নতুন শহর, নতুন কাজ আমাদের বদলে দেবে। পরে দেখি, বদলায় শুধু দৃশ্যপট। অভিনেতা একই থাকে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই অনেক পুরনো মানুষের কথা মনে পড়ে। যাদের সঙ্গে রাত পার হয়ে যেত গল্পে। কোনো তাড়া ছিল না। এখন কারও সঙ্গে আলাপ শুরু হলে মনে হয়, এই মানুষটা কি সত্যিই শুনছে, নাকি নিজের উত্তর বলার জন্য অপেক্ষা করছে? দিন দিন বুঝতে পারছি, শুনতে পারাটাও এক বিরল প্রতিভা। যারা সত্যি শুনতে জানত, তারা জীবন থেকে এমনভাবে সরে গেছে যেন কোনোদিন ছিলই না। অথচ তাদের অনুপস্থিতির শব্দ আজও প্রতিধ্বনিত হয়।
দুঃখের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিলেও অভ্যাসের সঙ্গে পারি না। প্রতিদিন একই কাপ ধোয়া, একই দরজায় তালা দেওয়া, একই পথে হাঁটা, একই দোকানে চা খাওয়া, একই রকম সন্ধ্যা। জীবন সর্বদা বড় বিপর্যয়ে ভেঙে পড়ে না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুনরাবৃত্তির ভেতরে ক্লান্ত হয়ে যায়। ক্লান্তির নিজস্ব গন্ধ আছে। পুরনো বইয়ের পাতার মতো, যেখানে আঙুল রাখলেই ধুলো উড়ে যায়।
রাতে ঘুমোলে আমি দেখি, একটা রাস্তা ধরে হাঁটছি। রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া নেই, কদম নেই, তোমার দৃশ্যও নেই। শুধু দীর্ঘ ছায়া। সেই ছায়ার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, কেউ একজন সামনে আছে। তার কাছে পৌঁছাতে পারলেই সমস্ত অসমাপ্ত বাক্য শেষ করতে পারব। কিন্তু যত হাঁটি, দূরত্ব বাড়ে। ঘুম ভেঙে গেলে বুঝি, স্বপ্নও বাস্তবের মতো নিষ্ঠুর হতে শিখেছে।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ ক্ষমা করা নয়, ভুলে যাওয়া নয়, বেঁচে থাকাও নয়। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো এমনভাবে দিন পার করা, যাতে অনুপস্থিত মানুষদের জন্য প্রতিটি মুহূর্তে নতুন করে শোক করতে না হয়। এই কাজ কেউ শেখায় না। সবাই নিজের মতো করে এ বিদ্যা আয়ত্ত করতে চেষ্টা করে।
তবুও সন্ধ্যা নামে, আমি ধুপ জ্বেলে জানালা খুলে দিই। দূরে কারও বাসার ছাদে কাপড় উড়তে থাকে। কোথাও একটা বাচ্চা হাসে। একটা মোটরসাইকেল দ্রুত চলে যায়। নিজের নিয়মে চলতে থাকে পৃথিবী। আমি দাঁড়িয়ে থাকি। জীবন আমাদের জন্য থেমে থাকে না, কিন্তু আমরা অনেকেই একটি বিকেলের সামনে দাঁড়িয়ে আজীবন অপেক্ষা করে যাই। যে বিকেল আর কখনও ফিরবে না। অথচ প্রতিদিন অন্য আলো আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে; নতুন অথবা পুনরাবৃত্ত।