হাইতির জার্সি, ফিফার ভয়

❑ সাম্য রাইয়ান 

হাইতির জার্সি, ফিফার ভয়

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। এইবারের একটা জার্সি নিয়ে ফিফা যে পরিমাণ ভয় পেল, তাতে মনে হচ্ছে ফুটবল না, ইতিহাসের ম্যাচ চলছে।

হাইতিকে জার্সি বদলাতে হয়েছে। অপরাধ কী? দু’শো তেইশ বছর আগের একটা স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়া। ভাবা যায়! আধিপত্যবাদীরা সব থেকে বেশি ভয় পায় সত্য ইতিহাস, স্মৃতিকে। কারণ স্মৃতিই আসল ডিনামাইট। পুরনো বিস্ফোরণ থেকেও নতুন আগুন জ্বলে উঠতে পারে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র কবিতা মনে পড়ে, “ধ্বংসেরও তবু কিছু অবশেষ থাকে, চিহ্ন থাকে
আমাদের তা-ও নেই-স্মৃতি নেই, চিহ্ন নেই, শূন্য গৃহাঙ্গন।”
(বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা)

কেন নেই? না থাকলে কার লাভ?

হাইতি নামটা শুনলেই আমার সি এল আর জেমসের কথা মনে পড়ে। দ্য ব্ল্যাক জ্যাকোবিনস। পৃথিবীর বড় বড় বিপ্লবের ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। কিন্তু দাসেরা যখন প্রভুদের হারায়, সেই গল্পটা সবাই বলতে চায় না। কারণ সেটা আদিপত্যবাদী শক্তির জন্য আরো অস্বস্তির, আরো অপমানের।

১৮০৩ সালে ভের্তিয়েরের যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী হেরেছিল। নেপোলিয়ন তখন নিজের সম্পর্কে কী ভাবতেন জানি না। সম্ভবত নিজেকে ইতিহাসের নির্বাচিত সন্তান। ইতিহাসে এই রোগ নতুন না। অনেকেই নিজেদের নির্বাচিত ভাবে। তারপর অন্যদের জীবনকে ফুটনোট বানিয়ে দেয়। নেপোলিয়নও তাই করেছিলেন।

লক্ষ্য করবেন, সাম্রাজ্যবাদ অধিকাংশ সময় জনতার উদ্দেশ্যে গোয়েবলসের মতো মিথ্যা বলে। না বলে উপায় নেই। সত্যি কথা বলে মানুষকে মরতে পাঠানো কঠিন। পোলিশ সৈন্যদের বলা হয়েছিল অন্য গল্প। হাইতিতে গিয়ে তারা দেখল তাদের কাজ স্বাধীনতার জন্য লড়া না, স্বাধীনতাকে হত্যা করা। তখন অনেকে বন্দুক ঘুরিয়ে দিল। 

আমরা সাধারণত বিশ্বাসঘাতকতাকে খারাপ শব্দ হিসেবে ব্যবহার করি। কিন্তু সব বিশ্বাসঘাতকতা খারাপ না। দাসমালিকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ভালো। সাম্রাজ্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ভালো। অন্যায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ভালো। পোলিশ সৈন্যরা সেই কাজটাই করেছিল।

তাই হাইতির জার্সিতে পোল্যান্ডের পতাকা ছিল। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে। কৃতজ্ঞতা হিসেবে। মৃতদের স্মৃতি হিসেবে। ফিফা সেটা পছন্দ করেনি।

ফিফার কথায় আমার অবাক লাগে না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে রাজনীতি অপছন্দ করে তা না। তারা শুধু এমন রাজনীতি অপছন্দ করে, যেটা ক্ষমতাবানদের অস্বস্তি তৈরি করে। যুদ্ধের ছবি চলবে। অস্ত্র নির্মাতাদের বিজ্ঞাপন চলবে। কর্পোরেট লুট চলবে। কিন্তু দু'শো বছর আগে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরা সাম্রাজ্যবাদকে হারিয়েছিল, সেটা মনে করিয়ে দেওয়া চলবে না।

আজকের ফ্রান্স আর নেপোলিয়নের ফ্রান্স এক জিনিস না। ইতিহাস কখনো এত সরল না। ফরাসি দলের দিকে তাকালে অর্ধেক পৃথিবী দেখা যায়। আফ্রিকা দেখা যায়। অভিবাসন দেখা যায়। উপনিবেশের ইতিহাস দেখা যায়। 

কয়েকদিন আগে পিএসজির চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় উদযাপন করতে গিয়ে প্যারিসের রাস্তায় যা হল, সেটাও মনে আছে। উৎসব কখন প্রতিবাদে বদলে যায় বোঝা যায় না। 

ফরাসি রাজনীতিতে পুরনো কেন্দ্র আর আগের মতো কেন্দ্র নেই। তরুণরা অন্য কিছু খুঁজছে। শ্রমিকরা অন্য কিছু খুঁজছে। অভিবাসীরা অন্য কিছু খুঁজছে। আগামী নির্বাচনে কী হবে জানি না। বিশ্বকাপ ফলাফল ভোটে প্রভাব ফেলবে কিনা জানি না। 

শুধু জানি, হাইতির বাতিল হয়ে যাওয়া জার্সিটা এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর জার্সি ছিল।

১২ই জুন ২০২৬