সাম্য রাইয়ানের রেডিকিউলাস ঢপের উপন্যাস সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের

❑ নুসরাত জাহান 
দৈনিক দেশ রূপান্তর | প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬

সাম্য রাইয়ানের রেডিকিউলাস ঢপের উপন্যাস সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরকবি সাম্য রাইয়ানের কবিতা এর আগে বেশ পড়া হয়েছে। তবে উপন্যাস এই প্রথম। গত বছর লাল-কালো দুই রঙের প্রচ্ছদে বের হওয়া লেখকের প্রথম উপন্যাসটি আমার টপ লিস্টেড ছিল। দ্বিধাদ্বন্দ্ব শেষে রেনেসার লাল রঙা প্রচ্ছদটাই পছন্দ করে নিয়েছি। কিউট সাইজের বইটি হাতে নিতেই লালরঙের মাঝখানে শুকনো হলুদ প্রলেপে কালো অক্ষরে বিন্যস্ত শিরোনাম। যার ওপরে পাঠকের দিকে তাক করা আঙুল, উড়ছে চিল। নিচে জুতোর ছাপ। লালের ওপর সাদায় অঙ্কিত লেখকের নাম। যার পাশে হা করে কুকুর ডাকছে। নিচে যুদ্ধরত একদল মানুষ। আর একদম ওপরে তিনটি স্লোগান। যথাক্রমে,
এই ডলার গণতান্ত্রিক
এই ডলার লুটতে হবে...
গণতন্ত্র 
স্বৈরতন্ত্র 
খেলাফত 
ফ্যাসিবাদ 
সমাজতন্ত্র 
নৈরাজ্যবাদ— 
সবার উপরে ডলার সত্য
তাহার উপরে নাই
এ সবকিছুই যেন কীসের একটা ইঙ্গিত দেয়!

সেই ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবনা মনে নিয়ে বইটি খুলতেই ফ্লপে বিখ্যাত সার্বিয়ান প্রবাদ,
যুদ্ধ শুরু হলে রাজনীতিবিদরা অস্ত্র দেয়, ধনীরা খাবার দেয় আর গরিবেরা তাদের ছেলেদের দেয়। যুদ্ধ শেষ হলে রাজনীতিবিদেরা হাত মেলায়, ধনীরা খাবারের দাম বাড়ায় আর গরিবেরা তাদের ছেলেদের কবর খোঁজে।

লেখক শুরুতেই অপ্রাপ্তমনস্ক পাঠককে এটি পাঠ হতে বিরত থাকতে বলেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন,
কুকুরকে বিশ্বাস করুন, এ উপন্যাসকে না।
এরপর Worning... দিয়ে শুরু করেছেন। যার একেবারে শেষে রয়েছে Buffering...

শুরু করছি সেই মহান দেবতাকুলের নামে যারা আমাদের জীবনকে বর্ণিল করতে হাতে তুলে দিয়েছেন ফেসবুক, টিকটক, টুইটার, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো অগণিত বেঁচে থাকার উপাদান; যার গণতান্ত্রিক চাহিদা এখন মৌলিক চাহিদার অধিক।
এই লাইনগুলো দিয়েই শুরু। বইটি মূলত একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। যেখানে প্রতীকী অর্থে বিশ্ব মোড়ল, তাদের তাঁবেদার এবং বিচিত্র সাম্রাজ্যবাদের দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে।

রহস্যময় এবং ফ্যান্টাসিপূর্ণ দুটি চরিত্র উপন্যাসের গাঁথুনি বদলে দিয়েছে। সাম্রাজ্য অধিপতি আঙ্কেল স্যাম, যার শারীরিক কোনো উপস্থিতি ছিল না এবং তার খাস লোক অন্ধ জাদুকর, যিনি আঙ্কেলের হয়ে সব নিয়ন্ত্রণ করেন। পাঠক উপন্যাসটির পুরো দৃশ্যপট এনাদের নিয়ন্ত্রণে দেখতে পায়। আর বাস্তবিক অর্থে ভাবলে পৃথিবীটাও তো ঠিক এমনি ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, খেলাফত, সমাজতন্ত্র-ইত্যাদি ভেরিয়েশনে ডুবিয়ে রেখে আবার মাঝেমধ্যে নিজস্ব প্রয়োজনে সবকিছুর মাঝে ব্যালান্স ঠিক রেখে কিংবা এই বিভেদ উসকে দিয়ে আদতে সেই সাম্রাজ্যপতিরাই তো টিকে থাকছে। উঠে এসেছে ইনক্লুসিভ অপারেটিং সিস্টেমের কথা। ধর্ম যার যার ডলার সবার। শিক্ষিত, সচেতন, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পপতি সবার প্রয়োজন ডলার। যার উন্মাদনায় খুলে যায় সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কিংবা বেগমপাড়ার রাস্তা। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে ভাইরালে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখে ঠিক কীভাবে মূল টপিক থেকে জনসাধারণকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়! বইটি পড়তে গিয়ে ‘ফায়ারহোজিং’-টার্মটার সঙ্গে নতুন পরিচয় হয়। কমরেডদের দ্বারা বুর্জোয়া ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, কিংবা তৃণমূল থেকে উঠে আসা শবনমের মতো মেয়েদের বিপ্লবে মন্ত্রমুগ্ধ করে অনিশ্চিত জীবন, অতঃপর নির্মম পরিণতি। তাজরীন ফ্যাশন কিংবা রানাপ্লাজার মতো দুর্ঘটনাগুলোর অন্তরালে থাকা দৃশ্যপট এসব কিছুই প্রতিমুহূর্তে পাঠক রিলেট করতে পারবে।

সুশীল রূপধারী ভণ্ড রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং যুবনেতা রতন, সুচতুর এবং ধান্দাবাজ শিল্পপতি বিশ্বজিৎ, আখতারা, সুলেখা কিংবা শবনমের মতো উচ্চশিক্ষিত কিন্তু দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা নারী, একই সঙ্গে মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ঠিক কীভাবে নিজের অজান্তেই এই সাম্রাজ্যবাদ টিকিয়ে রাখা এবং বিস্তারের অংশীজন হচ্ছে সে এক প্রবল বিস্ময়! বর্ণিত হয়েছে এতকিছুর মাঝেও সততা বাঁচিয়ে রাখা কমরেড শাহজালালের বিদ্রোহ এবং পরিণতি। লেখক উপন্যাসটির প্রতিটি চরিত্রের অন্তরালে বুর্জোয়া ব্যবস্থাপনা স্থাপন, টিকে থাকা এবং বিস্তারের চিত্র এঁকেছেন। একই সঙ্গে কমিউনিজমের অন্তরালে থাকা বাস্তবতা, ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্ব এবং এ সময়ে মার্কসবাদের প্রয়োজনীয়তাসহ প্রাসঙ্গিক নানা বিষয় উঠে এসেছে।

ইদানীং উপন্যাসিকদের গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে শিরোনাম সংবলিত ছোট ছোট অনুচ্ছেদে সংকলিত উপন্যাস লিখতে দেখা যাচ্ছে। এ সময়কার লেখক সাম্য রাইয়ানও সেই নতুন ধারায় হেঁটেছেন। তবে সেই ছোট ছোট অনুচ্ছেদের স্কোরিংয়ে বেশ নতুনত্ব ছিল। সব মিলিয়ে উপন্যাসটি পাঠের অনুভূতি দুর্দান্ত।

উপন্যাসের নামটি দেখে অনেক সেনসেটিভ মানুষ হয়তো দ্বিধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু এটি পুরোদস্তুর একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। যা আয়রনি, স্যাটেয়ার, মেটাফোরের মতো বিভিন্ন সাহিত্যক উপাদানে ঠাসা। সব থেকে আকর্ষণীয় হচ্ছে এর ডায়ালগগুলো। বিশেষ করে সময়ে সময়ে অন্ধ জাদুকরের মেসেজ, বিজ্ঞাপন বিরতি কিংবা শেষের দিকে শবনমের লেখা দিনলিপি এ যেন পাঠককে ব্যতিক্রমী আস্বাদ দেয়। লোম শিউরে ওঠে।