❑ সাম্য রাইয়ান
অ্যালেন গিন্সবার্গ পাঠের এবং তাকে নিয়ে আলোচনা করার রিস্ক অনেক৷ কেননা মধ্যবিত্তীয় ভদ্রলোকী কাঠামো তিনি ভেঙে ফেলেছেন, তছনছ করে দিয়েছেন৷
আমেরিকার কাছে বুকাওস্কির মতো গিন্সবার্গও অস্বস্তিকর নাম।
১৯৫৬ সালে ‘হাউল’ প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কিন সাহিত্য আর আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারেনি। কবিতার বই নিয়ে অশ্লীলতার মামলা হওয়াটা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল নয়। কিন্তু একটা কবিতার বই আদালতে দাঁড়িয়ে পুরো সাহিত্যিক স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠবে, সেটা বোধ করি কেউ ভাবেননি।
আমি আমার প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মনগুলোকে উন্মাদনায় ধ্বংস হতে দেখেছি...
এই পংক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটাই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে গোটা প্রজন্মের আর্তনাদের প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকা তখন নিজেকে পৃথিবীর সফলতম দেশ হিসেবে প্রচার করছে। চারদিকে সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, ভোগবাদ, পারমাণবিক শক্তি। কিন্তু গিন্সবার্গ সেই চকচকে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখছিলেন অন্য এক দেশ। সেখানে মানুষ একা। সেখানে মানুষের চেয়ে মেশিনের মূল্য বেশি। সেখানে সফলতাই ধর্ম।
তিনি সেই ধর্মের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছিলেন। এবং ধর্মদ্রোহীর মতোই আচরণ পেয়েছিলেন।
মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন সামরিকতন্ত্র, অর্থনৈতিক বস্তুবাদ এবং যৌন নিপীড়ন বিষয়ের জোরালোভাবে বিরোধিতা করেন। তাঁর কণ্ঠস্বরের ভেতরে যেমন নিউইয়র্ক আছে, তেমনি আছে বৌদ্ধ মন্ত্র। যেমন আছে জ্যাজ সংগীত, তেমনি আছে ভারতীয় সাধুদের প্রতি আকর্ষণ।
তিনি ভারতে এসেছিলেন ষাটের দশকে। কলকাতার অলিগলি ঘুরেছেন। শ্মশানে গেছেন। বাউলদের সঙ্গে মিশেছেন। অনাহার দেখেছেন। দারিদ্র্য দেখেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ভারতকে সেই পর্যটকসুলভ বিস্ময়ের চোখে দেখেননি, যেভাবে পশ্চিমারা সাধারণত দেখে।
গিন্সবার্গের অন্তর্লোকে একইসঙ্গে ধ্বনিত হতো কবিতা, রাজনীতি, যৌনতা, ধর্ম, মাদক, প্রতিবাদ, প্রেম আর বিষণ্ণতা। সে শব্দ কখনো এতটাই জোরালো যে, তিনি নিজেই সেগুলো আলাদা করতে পারতেন না।
আমাদের সোসাইটি কবিদের নিয়ে একটা রোমান্টিক ধারণা পোষণ করে। মনে করে, তাঁরা নিরিবিলি বসে কবিতা লেখেন। গিন্সবার্গ সেই ধারণাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছেন। তিনি মিছিলেও ছিলেন, আদালতেও ছিলেন, টেলিভিশনেও ছিলেন, রাস্তাতেও ছিলেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান তাকে মার্কিন প্রতিবাদী সংস্কৃতির ইতিহাসে বিবেকবান কণ্ঠস্বরদের অন্যতম করে তুলেছে। রাষ্ট্র যখন যুদ্ধকে দেশপ্রেম বলে চালাতে চেয়েছে, তিনি তখন যুদ্ধকে উন্মাদনা বলেছেন। রাষ্ট্র যখন শৃঙ্খলার কথা বলেছে, তিনি তখন স্বাধীনতার কথা বলেছেন।
এটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। যারা স্রোতের বিপরীতে চলেন, এ কেবল তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব৷
কারণ রাষ্ট্র কখনো কখনো আপনার সমালোচনাও সহ্য করতে পারে, কিন্তু উপহাস কখনোই নয়। গিন্সবার্গ রাষ্ট্রকে উপহাস করেছিলেন। এই কারণেই তিনি এখনও প্রাসঙ্গিক। বাঙলাদেশেও আপনি এমন বাস্তবতা লক্ষ্য করবেন৷
আজ পৃথিবীর অনেক দেশেই মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে ভয় পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাই কথা বলছে, কিন্তু খুব কম মানুষই সত্যিকার অর্থে কিছু বলছে। আসলে সবাই নিজেকে পণ্যে রূপান্তর করছে। নিজেই নিজের ব্র্যাণ্ড অ্যাম্বাসেডর!
গিন্সবার্গ পুরোপুরি ভণিতাহীন। শুধু তা-ই নয়; তিনি অগোছালো ছিলেন। ভুল করতেন। অতিরঞ্জিত ছিলেন। কখনো কখনো বিরক্তিকরও। কিন্তু নকল ছিলেন না। সম্ভবত এটাই তাঁর সবচেয়ে বড়ো গুণ।
অনেক কবি ভালো কবিতা লিখেছেন। অনেক কর্মী আন্দোলন করেছেন। অনেক দার্শনিক সমাজ নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু গিন্সবার্গের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়।
নিজের জীবনকেই তিনি আস্ত কবিতা করে তুলেছিলেন। সেই কবিতার ছন্দ উন্মাতাল, ব্যাকরণ ছিল সন্দেহজনক, শব্দচয়ন উস্কানিমূলক। কিন্তু তবুও মানুষ সেটি পড়েছে। কারণ পৃথিবী আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো নিখুঁত মানুষের গল্পে খুব একটা আগ্রহী নয়।
আগ্রহী সেইসব মানুষের প্রতি, যারা নিজেদের ক্ষতসমেত জনসমক্ষে হাজির হওয়ার সাহস রাখে। অ্যালেন গিন্সবার্গ তেমনই একজন মানুষ। একটা ভাঙাচোরা মাইক্রোফোন। শতাব্দী পেরিয়েও যা এখনও চিৎকার করে বলছে, স্বাধীনতা, মুক্তি, স্বাধীনতা…।
জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধা!
