গরীবের হরর গল্পের রূপকার সোমেন চন্দ

❑ সাম্য রাইয়ান

সোমেন চন্দ প্রসঙ্গে আলাপ করতে নিলে প্রথমেই আমাদের সাহিত্যিক স্মৃতিতে উঠে আসে তাঁর মৃত্যু, তারপর তাঁর লেখা। যেন একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর হত্যাকাণ্ড ধীরে ধীরে একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিককে ঢেকে ফেলেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী শহিদ লেখক ট্যাগটা এমন আঠার মতো লেগে গেছে যে লোকটা লেখক ছিলেন, সেটা অনেকেই ভুলে যায়। খুন হয়েছেন, তাই স্মরণীয়— ব্যাপারটা কিন্তু এমন না। লিখতেন বলেই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন। না লিখলে হয়তো বেঁচে যেতেন। অথবা আমাদের মতোই করুণভাবে বেঁচে থাকতেন। কে জানে! 

শিল্পী-সাহিত্যিকের মৃত্যু ব্যাপারটা রোম্যান্টিসিজমের কাতারে পড়ে গেলে আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে। জীবনানন্দ ট্রাম চাপায় মরলেন বলে কি তাঁর কবিতা বড়? কাফকা টিবিতে না মরলে কি একটু কম কাফকা হতেন? মোটেই না৷ সোমেন চন্দকেও সেভাবে দেখতে হবে। আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকটা আগুন রচনা করেছিলেন। তারপর একদিন তাকে হত্যা করা হলো। 

এদেশে সোমেন পাঠের সমস্যা হলো, তাঁকে বহু সময় এত বেশি রাজনৈতিক পাঠের মধ্যে আটকে ফেলা হয় যে তাঁর সাহিত্যিক জটিলতাটা আড়ালে চলে যায়। অথচ তাঁর গল্পগুলো পড়লে বোঝা যায়, তিনি স্মরণীয় শুধু নিহত হওয়ার কারণে নন। তাঁর ভাষা, মানুষের জীবনকে দেখার ক্ষমতা, ক্ষুধা ও শহুরে ক্লান্তিকে ধরার তীব্রতা—এসবই তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের বুঝতে হবে, মৃত্যু তাকে প্রতীকি রূপ দিয়েছে, আর সাহিত্য তাকে স্থায়ী করেছে।

তাঁর গল্পে জীবন অনেক বেশি প্রবল। সেখানে মানুষ আছে। তার অভাব আছে। ক্লান্তি আছে। ক্ষয়ে যাওয়া শহর আছে। আছে এমন সব মুহূর্ত, যেখানে একজন মানুষ নিজের ভেতরেই হেরে যাচ্ছে। বোধ করি, এখানেই তিনি আলাদা। এই যে ‘ইঁদুর’ গল্পটা। বাঙলা সাহিত্যের গ্রেটেস্ট আরবান হরর টেক্সটগুলোর একটা। আমি হরর বলছি কারণ ক্ষুধার চেয়ে বড় হরর কিছু নেই। মধ্যবিত্তরা ভূতের গল্পে ভয় পায়। গরীব লোকেরা ভয় পায় চাল বাড়ন্ত দেখলে। সোমেন গরীব লোকের সেই ভয়কে লিখিত রূপ দিয়েছেন। 

অনেকে ভাবে প্রগতিশীল সাহিত্য মানেই ট্র্যাক্ট। মানে লেকচার। যার পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ে মনে হবে পার্টি অফিসে বসে আছি। সোমেনকে পড়লে এই ধারণা ভেঙে যায়। একটা বাচ্চা না খেয়ে আছে, এটাও রাজনীতি। একজন মজুর সারা দিন কাজ করে রাতে মদ খেয়ে শুয়ে পড়ল, এটাও রাজনীতি। মেয়েটা পতিতালয়ে গেল, এটাও। আপনি রাজনীতি থেকে পালাবেন কোথায়? শ্বাস নিচ্ছেন? পলিটিক্যাল। প্রেম করছেন? পলিটিক্যাল। হেইট পলিটিক্স? সে তো আরও পলিটিক্যাল।

সোমেন চন্দকে নিয়ে সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হল, লোকটা মাত্র বাইশ বছর বেঁচেছিল। ভাবুন! বাইশ! এই বয়সে এখনকার ছেলেপুলে রিল বানায়, মোটিভেশনাল স্পিচ শোনে, আর নিত্যদিন ডিপি বদলায়! ওদিকে সোমেন চন্দ ওই বয়সে ফ্যাসিবাদবিরোধী মিছিলে নামছেন, শ্রমিক সংগঠন করছেন, গল্প লিখছেন। আর লেখাগুলো এমন না যে তাতে কাঁচা বয়সের ছাপ আছে। পড়লে মনে হয় ক্লান্ত কোনো ওল্ড ম্যান লিখছেন। যিনি ইতোমধ্যেই পৃথিবীকে দেখে ফেলেছেন।

আমার মনে হয় দারিদ্র্য মানুষের বয়স বাড়িয়ে দেয়। ক্ষুধা একটা ফাস্ট ফরওয়ার্ড বাটন। আপনি দ্রুত বুড়ো হয়ে যাবেন। সোমেনদের প্রজন্ম তো আর ক্যাফেতে বসে মার্কস পড়েনি। ওরা দেখেছে মানুষ সত্যি সত্যি না খেয়ে মরছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফ্যাসিবাদ। ঔপনিবেশিক শাসন। শহরে বেকারত্ব। একদম পচা সময়। সেই পচনের মধ্যে দাঁড়িয়ে লিখছিলেন সোমেন। তাই তার গল্পে সুগন্ধি নেই।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটা প্রবল ভুল ধারণা আছে। অনেকে ভাবে রবীন্দ্র-উত্তর মানেই রবীন্দ্রবিরোধিতা। মোটেই না। রবীন্দ্রনাথ নিজে খুব ভালো করেই বুঝতেন যে বাঙলা সাহিত্যকে রাস্তায় নামতে হবে। ওনার শেষদিকের লেখাগুলো পড়ুন। কী ভাঙন! কী হতাশা! সোমেনরা সেই পথেরই উত্তরসূরী। তবে ওদের ভাষা আরো ধারালো। কারণ ওরা রক্ত কাছ থেকে দেখেছে। রবীন্দ্রনাথ বার্ডস ভিউ থেকে সভ্যতার সংকট দেখেছেন। সোমেন দেখেছেন আঁতশ কাচের তলায়, মানুষের পেটের সংকট।

বাঙলা সাহিত্যের একটা সমস্যা কী জানেন? আমরা ভদ্রলোকী সাহিত্য বেশি লিখেছি। মানে চরিত্র গরিব হলেও লেখকের চোখ ভদ্রলোকের। সোমেনের চোখ তেমন না। তিনি গরিব মানুষকে অবজেক্ট বানান না। তাদের দিকে তাকিয়ে সেন্টি খান না। এই যে মধ্যবিত্তদের একটা ডিজিজ আছে— দরিদ্র মানুষ দেখলেই হিউম্যানিজম বেরোয়। আহা। উহু। তারপর বাড়ি ফিরে এয়ারকন্ডিশন চালিয়ে ঘুম। সোমেন এই ভণ্ডামি করেন না। তার গল্পের লোকেরা দুর্গন্ধ ছড়ায়, মারামারি করে, হিংসুটে, কামুক, ক্লান্ত। মানে সত্যিকারের মানুষ। সোমেন এই জায়গাটায় খুব সৎ ছিলেন। 

ওঁর মৃত্যুর ঘটনাটাও সিনেমাটিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বহুবার। মিছিলে গেল। আক্রান্ত হল। শহিদ হল। ব্যাস। কিন্তু আমি ভাবি অন্য কথা। যদি বেঁচে থাকতেন? কী লিখতেন? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ভেঙে পড়তেন? নাকি মহাশ্বেতার মতো আরও ধারালো হতেন? হয়তো পার্টির সঙ্গে ঝামেলা লাগত। হয়তো সোভিয়েত বা সিপিবির ভেতরে ছিপিবি দেখে হতাশ হতেন। কে জানে! অল্প বয়সে মরে যাওয়ার একটা সুবিধা আছে। মানুষ তখন আপনাকে বৃদ্ধ হতে দেখে না। আপনার ভুলগুলোও বুড়ো হয় না।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, বাঙলা সাহিত্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কী। জীবনানন্দের অবহেলা? বিভূতির দারিদ্র্য? মানিকের অসুখ? আমার মনে হয় সোমেন চন্দের মৃত্যু টপ টেনের মধ্যে থাকবে। কারণ এখানে সম্ভাবনাটাই খুন হয়েছে। একটা লেখক কী হতে পারতেন, সেটা আর জানা গেল না। বিশাল ক্ষতি।

এখনকার সময়ে সোমেনকে পড়া জরুরি। কারণ আমরা আবার একই জায়গায় ফিরে যাচ্ছি। বৈষম্য বাড়ছে। শ্রমিক মরছে। ডলার জিতে যাচ্ছে৷ বুদ্ধিজীবীরা কর্পোরেটের বিজ্ঞাপন লিখছে। প্রতিবাদও অনেকসময় ব্র্যান্ডেড। এই সময় সোমেনকে পড়লে বোঝা যায় সাহিত্য আসলে কতটা বিপজ্জনক জিনিশ হতে পারে। সত্যি করে লিখলে মানুষ ভয় পায়। রাষ্ট্র ভয় পায়। সমাজ ভয় পায়। কারণ সাহিত্য তখন প্রতিবিম্বের বদলে ছুরির ভূমিকা পালন করে।

সবচেয়ে বড় কথা, সোমেন চন্দকে তাঁর মৃত্যুর কথা ভেবে করুণা করে পড়লে ভুল হবে। উনি কোনো দুঃখী প্রতিভা না। উনি ভয়ংকর ট্যালেন্টেড লেখক। ভাষা দেখুন। কী কমপ্যাক্ট! কী তীব্র! একটা বাড়তি শব্দ নেই। যেন লোকটা জানতেন, সময় কম। দ্রুত লিখতে হবে। দ্রুত বলতে হবে। পৃথিবী অপেক্ষা করবে না।

সাহিত্য শেষপর্যন্ত কী? আমার তো মনে হয় মানুষের ভিতরের অন্ধকারে টর্চ মারা। সোমেন সেই টর্চটা খুব কম বয়সেই হাতে পেয়েছিলেন। তাই ওঁর লেখা এখনো জ্বলে। অনেক তথাকথিত বড় লেখকের চেয়ে বেশি। কারণ সেখানে জীবন আছে। রক্ত আছে। পচা শহরের গন্ধ আছে। আর আছে এমন এক ক্রোধ, যেটা আমাদের তথাকথিত ভদ্রসমাজ কোনোদিন পুরোপুরি হজম করতে পারবে না।