❑ সাম্য রাইয়ান
রাষ্ট্র নিজেই একজন ওস্তাদ গল্প লেখক। তার গল্পে থাকে উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা বা জাতীয় গৌরবের মতো অজস্র উপাদান। কিন্তু সেই গল্পের বাইরে যে মানুষগুলো বেঁচে থাকে, তাদের গল্পকে চাপা দিতেও রাষ্ট্র ওস্তাদ। সোনাল্লাহ ইব্রাহিম [২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৭—১৩ আগস্ট ২০২৫] সেইসব চাপা পড়া গল্পের গল্পকার। তিনি রাষ্ট্রের হয়ে গল্প লেখেননি, রাষ্ট্র যাদের শিফট চেপে ডিলেট করতে চেয়েছে, তাদের গল্পগুলো লিখেছেন।
প্রথমে ‘সেই গন্ধ’। তারপর ‘কমিটি’। তারপর ‘জাত’। একটা বই আরেকটার দিকে ঠেলে দেয়। সোনাল্লাহ ইব্রাহিমকে এভাবেই পড়া উচিত। ডিসকনটিনিউটি দিয়ে। সরকারি ভাষা, সংবাদপত্রের কাটিং, ব্যক্তিগত ডায়েরি, রাস্তার কথাবার্তা, কোলাহল একসঙ্গে ঢুকে গেছে তাঁর উপন্যাসে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একের পর এক এভিডেন্স। ফুকো নিশ্চয়ই আগ্রহী হতেন। আর্কাইভও যে ন্যারেটিভ হতে পারে, সোনাল্লাহ সেটা অনেক আগেই বুঝেছিলেন।
আরবি উপন্যাস বলতে আমরা আজও নাজিব মাহফুজেই আটকে আছি। অথচ মাহফুজের পর যে ভাষা জন্ম নিল, তার সবচেয়ে একরোখা স্থপতিদের একজন সোনাল্লাহ ইব্রাহিম। মাহফুজ শহর নির্মাণ করেছেন, আর সোনাল্লাহ নির্মাণ করেছেন সে শহরের অভ্যন্তরীণ শব্দাবলী। সাইরেন, ঘোষণা, জিজ্ঞাসাবাদ, ফাইল, সন্দেহ। রাষ্ট্রের ভাষা কীভাবে মানুষের মাথার ভেতর ঢুকে পড়ে, সেই ভয়ংকর মেকানিজম তাঁর উপন্যাসের আসল বিষয়।
সাত বছর কারাগারে ছিলেন। কারাগারে দীর্ঘ সময় ধরে রুশ সাহিত্য, মার্ক্সবাদী চিন্তা এবং বিশ্বসাহিত্য পাঠ তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিকে আমূল বদলে দেয়। এই বাস্তবতা তাঁকে আরো বেশি রাজনৈতিক করে তুলেছে, ভাষাও বদলে দিয়েছে। ভাষার অলংকারের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। বাক্য ছোট হয়েছে। আবেগ নিয়ন্ত্রিত। যেন প্রতিটি শব্দ কাঠগড়া পেরিয়ে এসেছে। সাহিত্যে এমন শুষ্কতা খুব কম লেখকের আছে। এটা ঠিক নিরাবেগ নয়। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার সর্বোচ্চ কৌশল। হেমিংওয়ের আইসবার্গ থিওরি মনে পড়ে। আবার ক্যামুরও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোনাল্লাহ কারও মতো নন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক নির্মাণে রূপ দিয়েছেন।
তাঁর প্রথম বড় কাজ That Smell (Tilka al-Ra’iha, 1966)—যা সেন্সরের কারণে বিকৃত রূপে প্রকাশিত হয়, কিন্তু তাতেও কায়রোর পরাজিত এক প্রজন্মের বাস্তবতা তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। The Committee (Al-Lajna, 1981)-তে দেখা যায় অদৃশ্য এক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এক নাগরিকের টিকে থাকার সংগ্রাম, যা আরব জগতের বাস্তবের শ্লেষ। আবার Zaat (1992)-এ তিনি এক নারী সাংবাদিকের জীবনকাহিনি দিয়ে গোটা মিশরীয় সমাজের দুর্নীতি, ধর্মীয় ভণ্ডামি, আর টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিসরকে ব্যঙ্গ করেছেন।
ওনার ২০০৩ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের ভিডিওটা বহুবার দেখেছি। ওটা একটা জ্যান্ত পারফরম্যান্স। বক্তৃতাটা কমপ্যাক্ট সাহিত্যিক টেক্সট। রাজনৈতিক উপন্যাস লিখে অনেক লেখক যতটা রাজনৈতিক হতে পারেন না, সোনাল্লাহ কয়েক মিনিটের বক্তৃতায় ততটা হয়ে উঠেছিলেন। পুরস্কার গ্রহণ করার ভাষা আছে। এমনকি প্রত্যাখ্যানেরও। আর কে না জানে দ্বিতীয় ভাষাটি বিপজ্জনক।
জীবদ্দশায় অনেক লেখক নানা পুরস্কার পান, গ্রহণ করেন, বক্তৃতা দেন। কিন্তু খুব কম জনই আছেন, যারা সেই সুযোগকেই রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। সোনাল্লাহ ইব্রাহিম সেই বিরলতম কাজটি করেছিলেন।
সে বছর সরকার তাঁকে Egyptian State Merit Award in Literature (রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার) দেয়। উপস্থিত ছিল তাবড় তাবড় মন্ত্রী, সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা, আলো ঝলমলে সেলিব্রিটি সমাজ। যখন নাম ঘোষণা করা হলো, হাততালিতে গর্জে উঠল পুরো অপেরা হাউস। কিন্তু যিনি মঞ্চে উঠলেন, তাঁর চোখে-মুখে কোথাও কৃতজ্ঞতার হাসি নেই, কণ্ঠে রুদ্ধ কষ্ট আর প্রতিবাদের দৃঢ়তা। হাতে মাইক নিয়ে তিনি বলেছিলেন—
…আমাদের নাটক সিনেমা সাহিত্য গল্প-উপন্যাস থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিংবা শিক্ষা বিদ্যাচর্চা সবই গিয়েছে। বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। ... সরকার বলতে যা, তা হলো একগুচ্ছ মেলা-খেলা-মোচ্ছব আর মিথ্যার সমষ্টি। আর সীমাহীন দুর্নীতি। … দেশের সমগ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে দাবিয়ে রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ... দেশের মানুষের কাছে এই সরকারের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।...
পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের এই ঘোষণার পর অপেরা হাউসে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তা বিস্ফোরণের চেয়ে কম কিছু নয়। মন্ত্রী-আমলা থেকে শুরু করে সাহিত্যিক-সেলিব্রিটি সবাই বুঝেছিলেন, এখানে সাহসের জীবন্ত নমুনা রচিত হলো আজ। মিশরের সাহিত্য-ইতিহাসে ঘটনাটি এক কিংবদন্তিতুল্য মুহূর্ত হয়ে আছে।
তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে রাষ্ট্রের মিথ্যাচার, দুর্নীতি, দমননীতি এবং এর ভেতর আটকে থাকা সাধারণ মানুষের অসহায়তা। নিজের লেখনী এবং ব্যক্তিগত অবস্থান দুই দিয়েই দেখিয়ে দিয়েছেন সৌন্দর্যোৎসবের পাশাপাশি সাহিত্যের সত্য বলারও দায় আছে।
বাঙলা ভাষার পাঠকমহলে আমরা তাঁকে চিনতেই পারিনি। হয়তো সমকালীন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধ সমালোচনা আড়াল করেছে তাঁর সাহিত্যকে। হয়তো অনুবাদের অভাবই আমাদের চোখ থেকে তাঁকে দূরত্বে রেখেছে। অথচ এ পৃথিবীতে যেখানে মানুষ নিত্যই রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত, লকলকে জিভ বের করে ক্ষমতাসীনের জুতো থেকে পশাৎদেশ অব্দি চেটে দিতে ব্যস্ত, সেখানে একজন সোনাল্লাহ ইব্রাহিম কোনোকিছুর পরোয়া না করে রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তুলেছেন, এমনকি পুরস্কারের চকমকি আলোকও প্রত্যাখ্যান করেছেন, নির্ভয়ে নিঃসংকোচে। ভাবি, এত সাহস তৈরি হয় কোত্থেকে? আমাদের সমকালেও ক্ষমতার বিরুদ্ধে লেখক আছেন, কিন্তু ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার সাহসী দৃশ্য খুব বেশি দেখা যায় না। সোনাল্লাহ ইব্রাহিম সেই বিরল ব্যতিক্রম; একজন সাহিত্যিক হিসেবে যার প্রথম দায় নিজের বিবেকের কাছে, তারপর পাঠকের কাছে।
