চার্লস বুকাওস্কি: আমেরিকান ড্রিমের উল্টোরথ

❑ সাম্য রাইয়ান 

মাতালদের আমি বিশ্বাস করি। কারণ তারা মিথ্যা বলে না। মিথ্যা বলতে একটা কনস্ট্রাকশন লাগে। একটা আর্কিটেকচার। দেয়াল তুলতে হয়। প্লাস্টার করতে হয়। মাতাল বুকাওস্কির সেই ধৈর্য ছিল না। মদের বোতল হাতে উনি সারাজীবন হাতুড়ি নিয়ে সেই দেয়াল ভেঙেছেন।

মদ খেয়েছেন, নারীদের নিয়ে লিখেছেন, গালাগালি করেছেন, এগুলো সত্যি। কিন্তু এগুলোই সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ সত্যি। পৃথিবীতে মাতালের অভাব নেই। নারীঘটিত বিশৃঙ্খল মানুষেরও অভাব নেই। আমেরিকার প্রতিটা শহরে কয়েক হাজার মাতাল পাওয়া যাবে। বাঙলাদেশেও তা-ই৷ কিন্তু তারা কেউ বুকাওস্কি নয়।

যেমন পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ কেরানি ছিল। তাই বলে সবাই কাফকা হয়নি। বুকাওস্কির বিশেষত্বও অন্য জায়গায়। আমরা সাধারণত সফলতার আত্মজীবনী লিখি। বুকাওস্কি লিখেছেন ব্যর্থতার আত্মজীবনী।

পৃথিবীতে সফল লোকের অভাব নেই। ব্যর্থ লোকেরও অভাব নেই। কিন্তু ব্যর্থতাকে সাহিত্যে রূপ দেয়া বিরলতম কাজ৷

অথচ তার সামনে ছিলো আমেরিকান ড্রিম৷ আদতে যা এক বড়সড় রিয়েল এস্টেট বিজ্ঞাপন। একটা বাড়ি হবে। সামনে লন। দুটো বাচ্চা। একটা কুকুর। গ্যারেজে গাড়ি। প্রতিবেশী বারবিকিউ করছে। আপনি হাসছেন। বউ হাসছে। ব্যাংক হাসছে। হাসতে হাসতে মরে যাচ্ছে ক্রেডিট কার্ড৷

বুকাওস্কি ঐ ছবির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। থুতু মেরেছেন। কারন এই প্রকল্পে তিনি বিশ্বাস করতেন না।

তিনি বিশ্বাস করতেন বারে। ঘোড়দৌড়ে। টাইপরাইটারে। এবং ব্যর্থতায়।

ব্যর্থতাকে যারা ভয় পায় তারা বুকাওস্কিকে বোঝে না। কারণ তার সাহিত্যের প্রধান চরিত্র পরাজয়। এবং তারপরেও বেঁচে থাকা।

কিশোর বয়সেই নিষ্ঠুরতা পেয়েছিলেন বুকাওস্কি। সুন্দর ছেলেরা পায় প্রেম। অসুন্দর ছেলেদের কেউ কেউ পায় সাহিত্য। দ্বিতীয়টা বেশি বিপজ্জনক। তেরো বছর বয়সে প্রথম মদ খেলেন। পরে লিখলেন, কেউ আমাকে আরো আগে কেন এই অনুভূতির সন্ধান দেয়নি?

ধর্মপ্রবর্তকরা যেভাবে আলোর সন্ধান পান, সেভাবেই বুকাওস্কি পেয়েছিলেন অ্যালকোহলের সন্ধান। অবশ্য মদ তাকে বাঁচিয়েছে নাকি মেরেছে, এর উত্তর সম্ভবত দুটোই।

সভ্যতার ইতিহাস আসলে নেশার ইতিহাস। কেউ ধর্মে নেশা করে। কেউ রাষ্ট্রে। কেউ বিপ্লবে। কেউ প্রেমে। কেউ মদে। বুকাওস্কির সততা ছিল তিনি নিজের নেশার নাম বদলাননি।

১৯৩৯ সালে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে ছেড়ে দিলেন। লেখক হবেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত। ডাক্তার হলে আপনি জানেন কী হবে। ইঞ্জিনিয়ার হলে জানেন। ব্যবসায়ী হলেও জানেন। কিন্তু লেখক? অজানার উদ্দেশ্যে ছুটে চলা। সম্ভবত না খেয়ে মরবেন। বুকাওস্কি প্রায় সেটাই করেছেন।

চল্লিশের দশকে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীকে পাগল করে তুলছে, তখন অধিকাংশ তরুণের সামনে দুটি রাস্তা, যুদ্ধে যাওয়া অথবা যুদ্ধের সঙ্গে আপস করা। বুকাওস্কি কোনোটাই করলেন না। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ডাক এল। নানা শারীরিক ও মানসিক কারণ দেখিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিলেন।

এ নিয়ে তাকে কাপুরুষ বলা যায়। আবার বলা যায়, তিনি রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতারণাটা বুঝে ফেলেছিলেন। রাষ্ট্র মানুষকে বলে, মরো, তাহলে তুমি নায়ক। Uncle Sam want you for U.S army.

কিন্তু মৃত মানুষের কাছে নায়কত্বের কোনো দাম নেই।

যুদ্ধ শেষ হলো। আমেরিকা জিতল। পতাকা উড়ল। উন্নয়ন এল। সাবার্ব এল। পারিবারিক সুখের বিজ্ঞাপন এল। বুকাওস্কি দেখলেন অন্য দৃশ্য। ক্লান্ত শ্রমিক। পোস্ট অফিস। মাতাল। দেখলেন এমন মানুষ যারা প্রতিদিন সকালে উঠে কাজে যাচ্ছে, অথচ তাদের চোখে কোনো আলো নেই।

যুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর নতুন নায়ক আমেরিকা। সবাই নায়ক হতে চাইছে। ইউনিফর্ম। পতাকা। বিজয়। সেসময় বুকাওস্কি কী করছেন? বারে বসে আছেন। বাজে কবিতা লিখছেন। পোস্ট অফিসে কাজ করছেন। চাকরি হারাচ্ছেন। নারীদের সঙ্গে ঝগড়া করছেন। মাতাল হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন।

অর্থাৎ যে কাজগুলো একজন সভ্য নাগরিকের করা উচিত নয় উনি সেগুলোই করছেন।

এইখানেই মজা। কারণ ইতিহাসে দেখা গেল নায়কদের চেয়ে মাতালটাই বেশি সত্য বলেছে।

যার প্রতিটি বাক্য রাজনৈতিক। তিনি শ্রম নিয়ে লিখেছেন। ক্লান্তি নিয়ে লিখেছেন। অপমান নিয়ে লিখেছেন। তিনি বলেছেন, ন’টা-পাঁচটার চাকরি মানবজাতির বিরুদ্ধে বড় অপরাধগুলোর একটি।

লোকে হাসে। আমার প্যানিক অ্যাটাক হয়। জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি যুদ্ধ নয়। বড় ট্র্যাজেডি হলো, এমন একটা জীবন কাটানো, যেটা আপনি নিজেই চাননি।

বুকাওস্কির নায়করা তাই অফিস ক্লার্ক। ডাকবিভাগের কর্মচারী। বেকার। জুয়াড়ি। পতিতা। ভিখিরি। অর্থাৎ সভ্যতার ব্যাকস্টেজে পড়ে থাকা মানুষ। এদের নিয়েই তিনি একটা বিকল্প আমেরিকা বানিয়েছেন। সরকারি আমেরিকার বাইরে আরেকটা আমেরিকা। হলিউডের বাইরে আরেকটা হলিউড। জাতীয় সংগীতের বাইরে আরেকটা শব্দ। সেই শব্দের নাম চিনাস্কি। হেনরি চিনাস্কি। বুকাওস্কির ছদ্মনাম না বলে বলা ভালো, ওঁর ভূত। আমেরিকান ড্রিমের লাশের পাশে বসে থাকা একজন মর্গ অ্যাটেনডেন্ট। দিনের শেষে যে লোকটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যে জানে আজও কিছু হলো না। আজও পৃথিবী বদলালো না। আজও মদ খেতে হবে। সে চাকরি করে। নারীদের ভালোবাসে। নারীদের হারায়। লেখক হতে চায়। ব্যর্থ হয়। আবার চেষ্টা করে।

‘পোস্ট অফিস’, ‘ফ্যাকটোটাম’, ‘উইমেন’, ‘হ্যাম অন রাই’ সবখানেই সেই একই লোক। নাম পাল্টেছে। জামা পাল্টেছে। দুঃখ পাল্টায়নি।

বোধ করি বুকাওস্কির সবচেয়ে বড় অর্জন এখানেই। ব্যক্তিগত ব্যর্থতাকে তিনি সার্বজনীন অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছেন। যে লোক কোনোদিন আমেরিকায় যায়নি, সেও চিনাস্কিকে চিনতে পারে। কারণ পরাজয়ের কোনো পাসপোর্ট লাগে না।

অবশ্য পরে খ্যাতি এলো। ব্ল্যাক স্প্যারো প্রেস এলো। জন মার্টিন এলো। বই বেরোতে লাগল। টাকা এল। পাঠক এল। কিন্তু লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, বুকাওস্কির সাহিত্য তখনও একই রইল। একই বার। একই ঘোড়দৌড়। একই হোটেল। একই একাকিত্ব।

নিউ ইয়র্কারের এক সমালোচক অভিযোগ করেছিলেন, বুকাওস্কি একই গল্প বারবার লেখেন।

কথা সত্য। কিন্তু জীবনও কি তাই নয়? আমরা কি একই ভয়, একই প্রেম, একই অনুশোচনার লুপে বেঁচে আছি না?

বুকাওস্কি শুধু সেটা লুকাননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লিখেছেন। কবিতায়। গল্পে। উপন্যাসে। চিঠিতে। জার্নালে। এমনকি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছেও।

‘দ্য ক্যাপ্টেন ইজ আউট টু লাঞ্চ অ্যান্ড দ্য সেলর্স হ্যাভ টেকেন ওভার দ্য শিপ’ পড়লে মনে হয় একজন বৃদ্ধ মানুষ ধীরে ধীরে নিজের শরীরের পতন দেখছেন এবং সেই পতনকেও সাহিত্যে রূপ দিচ্ছেন।

এই ক্ষমতা খুব কম লেখকের থাকে। স্বভাবতই মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। কিছু মানুষ মৃত্যু নিয়ে লেখে। আর বুকাওস্কি মৃত্যুর সঙ্গে বসে মদ খেতে খেতে আমেরিকার উজ্জ্বল আলোর নিচে জমে থাকা আবর্জনার দিকে আঙুল তাক করেছিলেন।

আমাদের এই সভ্যতার মুখ থেকে মেকআপের আবরণ সরালে মনে হবে, এই জীবনটাই বেশি সত্য। তাই তাকে শুধু মদ, যৌনতা বা অশ্লীলতার লেখক বললে ভুল হবে। ওগুলো ছিল প্রপস। আসল বিষয় নিঃসঙ্গতা।

আর নিঃসঙ্গতা এমন একটা রোগ, যার ভ্যাকসিন এখনও আবিষ্কার হয়নি। নিঃসঙ্গতারও আবার শ্রেণিভেদ আছে। ধনী মানুষের নিঃসঙ্গতা আলাদা। সে পাহাড়ে যায়। থেরাপিস্ট রাখে। ইতালিয়ান কফি খায়। ইনস্টাগ্রামে লিখে, ‘টেকিং আ ব্রেক ফ্রম মাইসেল্ফ।’

গরিব মানুষের নিঃসঙ্গতা অন্য জিনিশ। সে রাত দুইটায় বার বন্ধ হওয়ার অপেক্ষা করে।

বুকাওস্কি দ্বিতীয় দলের লোক।

‘উইমেন’ উপন্যাসটা পড়লে বোঝা যায়। বাইরে থেকে মনে হয় এক লোকের নারীঘটিত কেচ্ছা। ভেতরে আসলে একজন মানুষের আতঙ্ক। বয়স বাড়ছে। শরীর ভাঙছে। ভালোবাসা টেকে না। কেউ কারও নয়। তবু মানুষ আরেক মানুষের কাছে যায়।

কেন যায়? বুকাওস্কিও এই প্রশ্নের উত্তর জানতেন না। জানলে এত লিখতেন না। আমরা সাধারণত শক্তির গল্প শুনতে ভালোবাসি। যে জিতেছে। যে সফল। যে ইতিহাস বদলে দিয়েছে।

বুকাওস্কি লিখেছেন হেরে যাওয়া মানুষদের নিয়ে। যারা কিছুই বদলাতে পারল না। যারা মাসের শেষে বাসা ভাড়া দিতে পারে না। যারা প্রেমিকার ফোনের অপেক্ষায় থাকে। যারা বার কাউন্টারে বসে নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মানুষগুলো সাহিত্য থেকে দীর্ঘদিন নির্বাসিত ছিল। বুকাওস্কি তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

এবং কাজটা তিনি করেছেন এমন একটা ভাষায়, যেটা সাহিত্যিক ভাষা বলে মনে হয় না। কবিতার মধ্যে তিনি গদ্য ঢুকিয়ে দিয়েছেন। গদ্যের মধ্যে ডায়েরি। ডায়েরির মধ্যে গালাগাল। গালাগালের মধ্যে বিষণ্ণতা। আবার হঠাৎ কোথাও এমন একটা লাইন লিখে দিয়েছেন, যেটা পড়ে মনে হয় লোকটা রাতভর রিলকে পড়েছেন।

নিজের কারিগরি তিনি লুকিয়ে রাখেন। ভালো জাদুকর যেমন হাতসাফাই লুকিয়ে রাখে। খারাপ জাদুকর হাতসাফাই দেখাতে ব্যস্ত থাকে। বুকাওস্কি তেমন ব্যস্ত ছিলেন না। এইজন্য তাকে অনুকরণ করা সবচে কঠিন। দেখতে সহজ। করতে অসম্ভব। ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতার মতো৷  বাঙলা সাহিত্যেও এই সমস্যা আছে। অনেকে ভাবে মুখের ভাষায় লিখলেই সহজ লেখা হয়ে গেল। মোটেই না। সহজ লেখা সবচেয়ে কঠিন। একটা বাক্য যত ছোট, তার দায় তত ব্যাপক।

সাহিত্য দীর্ঘদিন কেবল সুন্দরের দালালি করেছে। বুকাওস্কি এসে বললেন, সুন্দর না হলেও চলবে, সত্য হলেই হবে।

যদিও সত্য বলে কিছু আছে কিনা আমি নিশ্চিত নই। ধরুন, একই মেয়েকে দুজন ভালোবাসে। একজন বলে সে দেবদূত। আরেকজন বলে প্রতারক। মেয়েটা বসে আছে। চা খাচ্ছে। দুটো কথাই মিথ্যা। দুটো কথাই সত্য।

বুকাওস্কির কৃতিত্ব, উনি নিজের মতকে একমাত্র সত্য বলে চালাতে চাননি। তিনি বলেছেন, আমার দেখার ভঙ্গিটা এরকম। ব্যাস। এইজন্য তার আত্মজৈবনিক লেখাগুলো এত জীবন্ত। আত্মজীবনী সাধারণত আত্মপক্ষ সমর্থন। বুকাওস্কির ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ ধ্বংস। নিজেকে নিয়ে উনি এমন সব কথা বলেছেন যা বেশিরভাগ মানুষ মৃত্যুশয্যাতেও স্বীকার করবে না।

আত্মসম্মান নামক জিনিশটার প্রতি বোধয় তাঁর কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। অথবা ছিল, কিন্তু অন্যভাবে। হয়তো তিনি মনে করতেন নিজের সম্পর্কে মিথ্যা না বলাটাই আত্মসম্মান।

তার কবিতার দিকে তাকান। একটা বার। একটা চেয়ার। একটা সিগারেট। একজন নারী। একটা ঘোড়া। একটা টাইপরাইটার। এগুলো দিয়েই একটা মহাবিশ্ব বানিয়ে ফেলেছেন।

জয়েসের পর লেখা সহজ হয়ে গেছে, এই কথাটা যেমন সত্য, তেমনি আরেকটা সত্য হলো জয়েসের পর সহজভাবে লেখা আরও কঠিন হয়ে গেছে।

সমালোচকেরা প্রথমদিকে তাকে পাত্তা দেয়নি। কারণ সাহিত্য সমালোচনা প্রায়ই দর্জির প্যাটার্নে কাজ করে। কাপড়ের ভাঁজ মাপছে। সেলাই দেখছে। কাটিং দেখছে।

বুকাওস্কি এসে জামাটাই ছিঁড়ে ফেললেন। সমালোচক তখন কী করবেন? সেই লোককে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন যিনি বলছেন, আমার বিশ্লেষণে আগ্রহ নেই, আমাকে আরেক পেগ দাও।

তাঁর অনেক কবিতা দেখলে মনে হয় কয়েক মিনিটে লেখা। আসলে তার পেছনে আছে কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ। নৈরাশ্যবাদী হলে কি এত লেখা যায়? পঞ্চাশের বেশি বই। হাজার হাজার কবিতা। অগণিত চিঠি। এত লেখা একজন হতাশ মানুষ লিখতে পারে না। এত লেখার জন্য জীবনের উপর ভয়ংকর রকম বিশ্বাস দরকার।

হয়তো সে বিশ্বাস মানুষের উপর নয়। কিন্তু জীবনের উপর তো বটেই। বুকাওস্কি মানুষকে ভরসা করতেন না। রাষ্ট্রকে করতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়কে না। ধর্মকেও না। কিন্তু টাইপরাইটারকে করতেন। সেজন্যই প্রতিদিন নিয়ম করে ওতে বসতেন। লিখতেন। ছিঁড়তেন৷ আবার লিখতেন। শিল্পে প্রতিভার চেয়ে শৃঙ্খলার গল্প কম বলা হয়। বুকাওস্কি বাইরে থেকে বিশৃঙ্খল। ভেতরে ভয়ংকর নিয়মতান্ত্রিক। নইলে এত কাজ আসলে সম্ভব না।

এখানে তার সঙ্গে বালজাকের মিল আছে। টলস্টয়েরও। পার্থক্য শুধু পোশাকে। একজন কফি খাচ্ছেন। আরেকজন বিয়ার। কিন্তু দুজনেই টেবিলে বসে আছেন৷

বুকাওস্কি টিকে গেছেন। মৃত্যুর পরও। মৃত্যুর পরই বোধহয় বেশি। অধিকাংশ লেখক মৃত্যুর পরে ফুরিয়ে যায়। বুকাওস্কি ফুরাননি। প্রতি বছর নতুন সংকলন। নতুন চিঠি। নতুন জার্নাল। নতুন অপ্রকাশিত কবিতা। মনে হয় লোকটা এখনো কোথাও বসে লিখছেন। সিগারেট টানছেন। সভ্যতার দিকে তাকিয়ে গালাগাল করছেন। যুদ্ধের বিরোধীতা করছেন৷ আর ভাবছেন, এত মানুষ আমার বই পড়ছে কেন?

বিষয়টা তাকে বিব্রতও করতে পারত। কারণ বুকাওস্কির সাহিত্য মূলত আউটসাইডারের সাহিত্য। যারা দলে নেই। ক্লাবে নেই। পুরস্কারের তালিকায় নেই। যারা পার্টিতে এক কোনায় দাঁড়িয়ে পান করে। কথা বলে না। শুধু দেখে। বুকাওস্কি তাদের প্রতিনিধি।

আজও পৃথিবীর যে কোনো শহরে একটা সস্তা বারে ঢুকলে বুকাওস্কির চরিত্রদের দেখা পাওয়া যায়। কেউ চাকরি হারিয়েছে। কেউ প্রেম হারিয়েছে। কেউ কবিতা লিখছে। কেউ লিখতে পারছে না। কেউ মাতাল। কেউ অন দ্য রোড…

সভ্যতা বদলেছে। কিন্তু পরাজিত মানুষের চেহারা খুব একটা বদলায়নি। 

বুকাওস্কি সেই চেহারার রূপকার, যে মনে করে পৃথিবীর রেলগাড়িতে সে ভুল করে ঢুকে পড়েছে ভুল কেবিনে। এবং সম্ভবত ঠিক সেই কারণেই আজও এত পাঠক তার কাছে ফিরে যায়। তারা বুকাওস্কির কাছে সমাধান পায় না। আশাও পায় না। পায় স্বীকৃতি। দলহীন গোত্রহীন এই মানুষগুলোর নাগরিকত্বের স্বীকৃতি কে দেবে আর বুকাওস্কি ছাড়া?