প্রতারণার চাকার নীচে

❑ সাম্য রাইয়ান 

প্রতারণার চাপায় জীবন থেতলে যাচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা ঠকতে শুরু করি। রাত পর্যন্ত চলতেই থাকে। মুদি দোকান থেকে শুরু করে প্রেমিকার কাছে। এর মধ্যে রাষ্ট্র আছে। বন্ধু আছে। ফেসবুক আছে। সাহিত্য আছে। এমনকি নিজের শরীরও অনেকসময় ধোঁকা দেয়। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হয় এখনো তরুণ আছি। অথচ হার্ট বলে, বেশি উড়িস না বাবা।

মুদি দোকানদারের কথাই ধরা যাক। পাঁচশো গ্রামের জায়গায় চারশো চল্লিশ গ্রাম দিয়ে বসে আছে। ওজন মেশিনে কারচুপি। লিচু কিনতে যাবেন, একশটার দাম নিয়ে ৭০টা দিয়ে দেবে; বড়জোড় ৭৫! এর বেশি কখনোই নয়! যেন কেউ মাথার দিব্যি দিয়েছে—আশিতে আসিও না! যাবেন কই? চালে পাথর। মরিচে ইটের গুঁড়া। দুধে সাবান। মধুতে চিনি। মাছে ফরমালিন। ফলে কী দাঁড়াল? আপনি এইদেশে কোনোদিনই আসল জিনিশটা পাচ্ছেন না। বাজারে গিয়ে খাবার কেনার বদলে উন্নত মানের প্রতারণা কিনছেন। অথচ দোকানদার আপনাকে ভাই বলে ডাকবে। এই ‘ভাই’ শব্দটা বাঙলাদেশে খুব বিপজ্জনক। যত বেশি ভাই ডাকবে, তত বেশি ঠকার সম্ভাবনা।

প্রেমের ব্যাপারটাও কি আলাদা কিছু? মানুষ প্রেমে পড়ে নিজের সম্পর্কে একটা সুন্দর মিথ্যা বিশ্বাস করতে। কেউ আমাকে খুব ভালোবাসে— এই ধারণাটা ভয়ংকর নেশার মতো। আপনি এডিকটেড হয়ে যাবেন! তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারবেন, সেও নিজের দরকারে এসেছে; আপনিও তা-ই। সম্পর্কের ভেতরে বিশুদ্ধতা বলে কিছু নেই। টানাটানি আছে। হিসাব আছে। ইগো আছে। কে কাকে বেশি গুরুত্ব দিল। কে সিন করেও রিপ্লাই দিল না। কে স্টোরি দেখে রেখে দিল। আধুনিক প্রেম মূলত ডিজিটাল উদ্বেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানসিক লুজ মোশন।

একবার এক মেয়ে আমাকে বলেছিল, ‘আমি খুব অনেস্ট।’ মানুষ যখন নিজে থেকে বলে সে অনেস্ট, তখনই সন্দেহ করা উচিত। যেমন কেউ যদি বলে ‘আমি খুব ভালো মানুষ’, তখনও৷ ভালো মানুষদের সাধারণত ঘোষণা দিতে হয় না। হিটলারও কুকুর ভালোবাসত। ফরহাদ মজহার কবিতা লিখত। 

পৃথিবীতে ভয়ংকর লোকদের একটা কমন ব্যাপার আছে, তারা নিজেদের সম্পর্কে সুন্দর গল্প বানাতে পারে এবং অন্যের ব্যাপারে বিপুল কুৎসা রটনা করতে পারে। ফেসবুক পুরো ব্যাপারটাকেই আরো জটিল করে তুলেছে। সবাই এখন নিজের পিআর ম্যানেজার। একটা লোক সারাদিন নারীদের গালি দিয়ে, রাতে এসে স্ট্যাটাস দেবে, ‘Respect women’. যে লোক সাম্রাজ্যবাদী ডলার খেয়ে পেট মোটা করে ফেলেছে, সে আবার পোস্ট দেবে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। আমি এসব দেখে মজা পাই। মানুষ আসলে নিজেকে নিয়ে ফ্যানফিকশন লিখছে। বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্কই নাই।

সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতও খুব পবিত্র কিছু না। এখানে প্রতারণা আরো ইন্টেলেকচুয়াল। কেউ অন্যের লেখা মেরে দেয়। কেউ বন্ধুর নামে বদনাম ছড়ায়। কেউ পুরস্কার পাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ঢালছে। কেউ সাংস্কৃতিক সংগঠন করছে সোশ্যাল পাওয়ার প্র্যাকটিস আর সরকারি অর্থ তছরুপ করার জন্য। অথচ বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কী দারুণ সাংস্কৃতিক পরিবেশ! আমি এক ছিপিবি নেতাকে জানি, যিনি মঞ্চে উঠে পুঁজিবাদ ধ্বংসের কথা বলেন, তারপর বুর্জোয়াদের সাথে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকা কামান। হা হা, মার্কস যদি জানতেন!

আমাদের সাথে সবচেয়ে বড় প্রতারণা অবশ্য রাষ্ট্র করে। আপনি ট্যাক্স দেবেন। ভোট দেবেন। আইন মানবেন। তারপরও আপনার রাস্তা ভাঙা থাকবে। হাসপাতালে বেড থাকবে না। চাকরি পেতে ঘুষ লাগবে। মার খেয়ে মামলা করলে পুলিশ উল্টো আপনাকেই সন্দেহ করবে। তারপরও আপনি পাঁচ বছর কার লাত্থি খাবেন, তা নির্ধারণ করতে ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন। মানুষের মনস্তত্ত্ব খুবই ইন্টারেস্টিং। যে রাষ্ট্র তাকে প্রতিদিন ঠকাচ্ছে, মানুষ সেই রাষ্ট্রকেই টিকিয়ে রাখার জন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। স্টকহোম সিনড্রোমেরও বোধহয় একটা জাতীয় সংস্করণ আছে।

ধর্মের জায়গাতেও খুব ব্যতিক্রম কিছু হয় না। হুজুর প্রতারণা করছে। পুরোহিত করছে। টেলিভিশনের মোটিভেশনাল স্পিকার করছে। সবাই আপনার ভয়টাকে ব্যবহার করতে চায়। আপনি মরতে ভয় পান। একা হতে ভয় পান। ব্যর্থ হতে ভয় পান। এই ভয়টাই বাজার। কেউ জান্নাত বা স্বর্গ বিক্রি করছে। কেউ সাফল্য। কেউ প্রেম। কেউ আত্মবিশ্বাস। পৃথিবীর বড় ব্যবসাগুলো চলে মানুষের অনিরাপত্তা নিয়ে।

আমরা নিজেরাও নিজেদের ঠকাই। একজন লোক জানে তার বিয়ে আসলে ভেতর থেকে ভেঙে গেছে, তবু ছবি আপলোড দিয়ে লিখছে, ‘Together forever.’ একজন লেখক জানে সে মাঝারি মানেরও না, তবু নিজেকে জিনিয়াস ভাবছে। একজন শিক্ষক জানে সে পড়াতে পারে না, তবু ছাত্রদের ক্লাস নিয়েই যাচ্ছে। মানুষ নিজেকে ছাড়া আর সবাইকে সন্দেহ করে। অথচ নিজের ব্যাপারে অবিশ্বাসী হওয়া খুব বিরল প্রতিভা।

সততা এখন বেশ আনস্মার্ট ব্যাপার। শুনতে কেমন খ্যাত খ্যাত লাগে! মানে কীরকম একটা ব্যাপার—এ বাবা লোকটা নাকি সৎ! এরকম আরকি৷ দেখবেন, যে লোক ঠকাতে পারে না, তাকে সবাই ঠকায়। অফিসে ঠকবে। সম্পর্কে ঠকবে। বাজারে ঠকবে। প্রকাশকের কাছে ঠকবে। এমনকি রিকশাওয়ালাও বাড়তি ভাড়া চাইবে। পৃথিবী অনেকাংশেই স্মার্ট প্রতারকদের হাতে চলে গেছে। সৎ লোকেরা এখানে ডাইনোসরের মতো। বিলুপ্তপ্রায়।

তারপরও মানুষ প্রেম করে৷ বিয়ে করে। ব্যবসা করে। বন্ধুত্ব করে। কেন? কারণ পুরোপুরি অবিশ্বাস নিয়ে বাঁচা যায় না। মানুষকে কিছু মিথ্যা বিশ্বাস করতেই হয়। না হলে সকালবেলা বিছানা থেকে ওঠারও মানে থাকে না। এই যে আমি বই কিনি। জানি অনেক বইই হয়তো পড়া হবে না। তবু কিনি। কেন? এটাও তো আত্মপ্রতারণা।

কিন্তু সব প্রতারণা সমান না। কিছু প্রতারণা মানুষকে মেরে ফেলে। কিছু প্রতারণা মানুষকে টিকিয়ে রাখে। একজন মা যখন তার সন্তানকে বলেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ তখন তিনি নিজেও জানেন, কিচ্ছু ঠিক হবে না। তবু বলেন। কারণ মানুষ পুরো সত্য নিয়ে বাঁচতে পারে না। সভ্যতা দাঁড়িয়েই আছে সহনীয় মিথ্যার ওপর। পুরো সত্য জেনে ফেললে আর বাঁচতে ইচ্ছে করবে না, হার্ট অ্যাটাক হবে!

সমস্যা হলো, মিথ্যাও ক্লান্ত হয়েছে খুব। আগেকার প্রতারণায় তবু কিছু সৌন্দর্য ছিল। এখন সেটাও নেই। সবাই খুব দ্রুত ঠকাতে চায়। প্রেমে। রাজনীতিতে। সাহিত্যে। ব্যবসায়। বিপ্লবে৷ যেন পৃথিবী এক বিশাল কলসেন্টার। ওপাশ থেকে কেউ প্রতারণার প্যাকেজ হাতে বলে চলেছে, ‘স্যার, আপনার জন্য একটা বিশেষ অফার আছে...’