ছোটগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

❑ সাম্য রাইয়ান 

নীলাব্জ চক্রবর্তীর সেই পোস্ট—
“হাসপাতাল চললাম। সম্ভবতঃ সামান্য কয়েক রাত। জীবনে এই প্রথম। ফলতঃ একটু নার্ভাস। প্রসঙ্গ, লিভার। জানানো হল। বেশী উদ্বিগ্ন হবেন না। আবার হতেও পারেন। যা ইচ্ছা।” (২০-০৯-২৫)

এখন পড়ে মনে হয়, যেন নিজের শরীরের ভেতর ঘনিয়ে ওঠা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলেছিলেন—আমি যাচ্ছি, তবে ভয় পেয়ো না। অথচ আমরা জানতাম না, সেই ভয়ই শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রাস করবে।

১৯ তারিখ সকালে ঘুম ভাঙতেই দুঃসংবাদটি পেলাম। ১৮ নভেম্বর ২০২৫, রাত ১১টা ৪০—কবি নীলাব্জ চক্রবর্তী মারা গেছেন। সংবাদটি যেন হঠাৎ করে ভেতরের কোথাও গভীর ফাটল তৈরি করল। মনে হল, তার ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ যেন এখন অন্য অর্থে ঝলসে উঠছে—তিনি আমাদের খুব আগেই সতর্ক করেছিলেন, অথচ বুঝতে পারিনি।

তার মৃত‌্যু সংবাদ মন প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু যখন উপলব্ধি করতে শুরু করলাম, তখন বুঝতে পারলাম, তাঁর সেই “বেশী উদ্বিগ্ন হবেন না। আবার হতেও পারেন। যা ইচ্ছা।”– বলার ভেতর ছিল এক ধরণের কবি-দৃষ্টির গহন সংকেত, যেখানে মৃত্যু এক ছায়াময়ী দরজা মাত্র, ভীতিহীনভাবে আতঙ্কের সঙ্গে গাঁথা। এবং আজ, তাঁর অনুপস্থিতিতে, সেই দরজা আমাদের জন্য এক অমোঘ অনুরোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে—।

নীলাব্জের কবিতায় প্রায়ই অনুভব হয় সময় ও স্মৃতির এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য — জীবনের ক্ষুদ্র, অভিজাত ফাঁক-ফোকরগুলো তিনি যেভাবে ধরেছেন, তা সাধারণ চিত্র নয়, কিন্তু একটি অন্তরাত্মার মানচিত্র। উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে তাঁর কবিতা “বুকের বরফ / কেমন স্থিতিস্থাপক হল চাঁদে চাঁদে … আমি এই সতর্কবার্তার ভেতর ঢুকে যাচ্ছি…” — এখানে একটি সহজ কিন্তু গভীর অনুভব প্রকাশ পায়: দুঃশ্চিন্তা, অপেক্ষা, সেই অন্তরদৃষ্টির মধ্য দিয়ে “সতর্কবার্তা” শুধু কারণ বা উপাখ্যান নয়, বরং একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো অনুষঙ্গ।

এছাড়া, তাঁর “নিউটাউন” শিরোনামের কবিতায় দেখা যায় কাচ, বাদামী রুটি, পোস্ট-টেনসন তার — সব কিছু মিলিয়ে একটি আধুনিক শহরের ধীর গতির নকশা, যেখানে সময় নিজেই একটা স্বাদ বদলাচ্ছে। ভাষা ও শারীরিক অনুভূতির মিশ্রণ, তাঁর অন্তর্মুখী কণ্ঠকে এক নতুন মাত্রা দেয়।

তার কবিতার পৃথিবীটাকে আরও একটু ধীরে, আরও শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো তাল রেখে দেখতে হবে আমাদের। কেননা অনুভূতির কথা তিনি সশব্দে বলেননি; বরং সে অনুরণন কাগজে বৃষ্টির দাগের মতো লেগে থেকেছে। তার গদ্য, তার ফেসবুকের ছোট ছোট লেখা, আর তার বেড়ে ওঠার ধারাটি—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক “দূরবর্তী আত্মীয়তা”—যাকে চোখে দেখা যায় না, তবু টের পাওয়া যায়। এখন মনে হয়, তিনি আর লিখবেন না, পোস্ট করবেন না, নিজের ভেতরের গানটুকু শোনাবেন না—এটা ভাবতেই শ্বাস আটকে আসে।

নীলাব্জের নিজস্ব ভাষা, স্মৃতির প্রতি তার আন্তরিক নিষ্ঠা, আর বাস্তবকে সবসময় একটু তির্যক দিকে সরিয়ে দেখার অভ্যাস—সব মিলিয়ে তার কবিতা ও গল্পে এক প্রবল অন্তর্জগৎ গড়ে উঠেছিল। সেই অভ্যন্তরীণ উত্তাপে তিনি নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, আর আমরাও তার সেই উত্তাপেই আশ্রয় পেয়েছিলাম।

তার কবিতা এক ধরনের মৌন বোঝাপড়ায় যুক্ত—যেখানে বর্ণনার অধিক আছে অনুভূতির নক্ষত্রমণ্ডলের ভেতর দিয়ে জীবনকে অনুধাবনের চেষ্টা।

তার গল্পেও একই প্রবাহ। তার চরিত্রের কখনো পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না; বরং তারা নিজের অসমাপ্ত রূপেই পাঠকের মনে থেকে যায়। এটি ছিল তার স্বাতন্ত্র্য—অসমাপ্তির মধ্যেই অর্থ খুঁজে নেওয়া।

তার লেখায় শহরের গন্ধ, আলো-অন্ধকারে বসে থাকা কৈশোর, কিংবা ভেঙে যাওয়া প্রেমের অগোচর দগ্ধতা দেখে মনে হয়—তিনি মানুষকে নয়, মানুষের ভিতরের ছায়াকে ধরতে চেয়েছিলেন।চরিত্র তো অনেক লেখকই নির্মাণ করেন; কিন্তু নীলাব্জ চরিত্রের গলিঘুপচি চিনতেন।

তার শেষ দিকের লেখাগুলো পড়লে টের পাওয়া যায়—মানুষ নিজের জীবনকে কত বিচিত্রভাবে বহন করে। অসুস্থতার সময়ে তার ভাষা আরও ধীর ছন্দে রূপ নিতে থাকে, আরও নিবিড় মেদহীন হয়ে ওঠে। মৃত্যু তার কাছে ভয়ের ছিল বলে মনে হয় না; বরং তিনি মৃত্যুকে নিজের মতো করে এক ধরনের অন্ধকার দরজা হিসেবে দেখেছিলেন—যার ওপাশে নিশ্চয় আলো আছে, কিন্তু আমাদের দেখার সুযোগ নেই।

নীলাব্জ চক্রবর্তীর মৃত্যু—এক গভীর প্রয়োজনীয় স্বরের অনুপস্থিতি। এই স্বর তাকে ছাড়া অন্য কেউ তুলে নিয়ে যেতে পারবে না। তিনি যে স্তব্ধতা, যে আলো-ছায়ার পথ রেখে গেলেন—সেটাই এখন আমাদের কাছে আসল উত্তরাধিকার।

তাঁর মৃত্যুতে আমরা শুধু একটি স্বর হারালাম না; আমরা সেই নিঃশব্দ ঘোরটুকুই হারালাম, যা তাঁর প্রতিটি পংক্তি থেকে ধীরে ধীরে স্পন্দিত হয়। আমাদের কাজ অবশিষ্ট সেই স্পন্দনকে ধারণ রাখা, তাঁর বাকি কাব্যকে যত্নের সঙ্গে স্মরণ করা, এবং তাঁর আলো-ছায়ার মানচিত্রে আরেকবার ফিরে যাওয়া।

এমন একজন লেখকের জন্য প্রকৃত শোক লেখা যায় না। শুধু মনে রাখা যায়—তিনি আমাদের জীবনকে একটু বেশি স্পর্শ করতেন, অভ্যন্তরকে আরও সজাগ করতেন, এবং এই কঠিন সময়েও মনে করিয়ে দিতেন—লেখালিখি আসলে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটি ছোট আলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

নীলাব্জ চক্রবর্তী সেই আলোটি রেখে গেছেন। আর আমরা, যারা তাকে পড়েছি, তাকে অনুভব করেছি—আমাদের ভেতরের একটি জানালা আজ শূন্য হয়ে গেল।

২১ নভেম্বর ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান 

আজ শিক্ষক দিবস। এ দিনে শ্রদ্ধার ফুলের চেয়ে বেশি জরুরি প্রশ্ন করা—এই শিক্ষাব্যবস্থায় আসলে আমরা কী উদযাপন করছি? যে দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের প্রথম পাঁচশোর তালিকায় নেই, যে দেশে স্নাতক ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে না, যে দেশে শিক্ষকরা জ্ঞান নয়, প্রশাসনের অনুমোদনে বাঁচেন—সে দেশে শিক্ষক দিবস এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। আমরা উৎসব করছি, অথচ শিক্ষার মান তলানিতে নেমে গেছে। জ্ঞানের চর্চা হারিয়েছে, কেবল ডিগ্রি বেচাকেনা চলছে। শ্রেণিকক্ষ এখন আর চিন্তার ক্ষেত্র নয়, বরং চাকরির প্রশিক্ষণকেন্দ্র। শিক্ষক দিবস তাই উদযাপনের নয়, লজ্জা ও প্রতিবাদের দিন। একদিকে শিক্ষানীতির নামে ব্যবসা, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্ধ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের সংঘর্ষে বাঙলাদেশের শিক্ষা আজ নিস্পৃহ, জীর্ণ, পরাজিত এক প্রতিষ্ঠান।

দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর বলেছিলেন,
 
 “বস্তুত বিদ্যাশিক্ষার অনেক ডিগ্রী আছে, কিন্তু জ্ঞানের কোন ডিগ্রী নেই৷ জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন৷” 
 
অথচ এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য, জ্ঞান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে আজ ‘চাকরি পাওয়ার লাইসেন্স অফিস’। শিক্ষকরা জ্ঞানের অনুশীলক নন, বরং প্রশাসনিক নির্দেশের অনুসারী কেরানি। গবেষণার জায়গা দখল করেছে নকলপত্র, তোষণমূলক থিসিস, এবং পদোন্নতির রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের মুক্ত চিন্তা নয়, বরং আনুগত্য শেখাচ্ছে—ক্ষমতার প্রতি, দাতাদের প্রতি, অথবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি।

বাঙলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনোটি আজও QS World University Ranking বা Times Higher Education Ranking–এর প্রথম পাঁচশোর মধ্যে নেই। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, এমনকি ভিয়েতনাম পর্যন্ত তাদের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। কারণ তারা অন্তত গবেষণা, মৌলিক চিন্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব বুঝেছে। আমরা বুঝিনি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষমতার প্রান্তিক কার্যালয় বানিয়েছি।

শিক্ষার মান পতনের আরেকটি চিহ্ন—দেশের স্নাতক ও ফাউন্ডেশন কোর্সের মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। এমনকি বাঙলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক প্রোগ্রামই WES (World Education Services) বা UK ENIC–এর মানদণ্ডে স্বীকৃতি পায় না। এর মানে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় অকার্যকর। অথচ এই সনদ নিয়েই হাজারো তরুণ-তরুণী বিদেশে গিয়ে ব্যর্থ হয়, অপমানিত হয়। এর দায় কে নেবে?

আজকের শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন একটাই: এই ব্যবস্থায় শিক্ষক বলতে আমরা কাকে বুঝি? যিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, নাকি যিনি প্রশাসনিক চেয়ারে বসে শিক্ষকদেরই দমন করেন? শিক্ষকরা যদি ন্যায় ও নীতির কণ্ঠস্বর না হন, যদি তাঁরা প্রতিরোধের ভাষা রচনা না করেন, তবে তাঁরা শিক্ষার্থী নয়, কেবল পদস্থ কর্মকর্তাদের আনুগত্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন। একসময় যারা মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন, আজ তারা নিজেরাই ব্যবস্থার দাস।

শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির প্রশ্নটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি আর্থিক অনটনে ভোগেন, তবে তিনি মনোযোগ দিয়ে শিক্ষা দিতে পারবেন না। বরং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণে অধিক মনযোগী হবেন, প্রাইভেট পড়াবেন, কোচিং সেন্টার চালু করবেন, গাইড বইয়ের ব্যবসা করবেন, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ থেকে অর্থ লোপাট করার মতো দুর্নীতিতে যুক্ত হবেন৷ সমাজে শিক্ষকের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো তাঁদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা উন্নত করা এবং তাদেরকে রাজনৈতিক গোলাম বানানো বন্ধ করা। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার মর্যাদা যদি শিক্ষকেরা পান, তবে এ পেশা মেধাবীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বাঙলাদেশে প্রতিটি সরকারই শিক্ষানীতি সংস্কারের নামে বিকৃত করেছে। একদিকে বইপুস্তক নির্ভর, মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা, অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগণিত বাণিজ্য—সব মিলিয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটি হারিয়ে গেছে। শিক্ষা আর বিকশিত হবার উপায় নয়, এটি এখন কেবলই চাকরির প্রতিযোগিতার অস্ত্র। আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ক্রমশ কমছে। জাতীয় আয়ের মাত্র ২ শতাংশেরও কম ব্যয় করা হয় শিক্ষায়। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো অন্তত ৫–৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য, পরিবহন, প্রতিরক্ষা খাতে যেভাবে বরাদ্দ বাড়ানো হয়, শিক্ষাকে তেমনি গুরুত্ব না দিলে জাতি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারাবে।

এদেশে শিক্ষা আন্দোলন একসময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে গর্জেছিল। আজ সেই শিক্ষা আন্দোলন কোথায়? শিক্ষক সংগঠনগুলো আজ প্রশাসনের অনুচর, শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আজ রাজনৈতিক অস্ত্র। জ্ঞানচর্চা নেই, কেবল পদলাভের প্রতিযোগিতা।

শিক্ষক দিবসে তাই শ্রদ্ধার ভাষার চেয়ে প্রতিবাদের ভাষাই অধিক প্রাসঙ্গিক। কারণ, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করা মানে শিক্ষাকে রক্ষা করা। আর শিক্ষাকে রক্ষা করা মানে সত্যের পক্ষ নেওয়া, অন্ধ অনুসরণে না গিয়ে বোধের রাজনীতি তৈরি করা। শিক্ষকরা যদি আবার জ্ঞানের অন্বেষণে ফেরেন, যদি তারা শ্রেণিকক্ষকে প্রশাসনিক কক্ষ নয়, বরং মুক্ত চিন্তার মঞ্চে রূপান্তর করেন—তবেই বাঙলাদেশে শিক্ষা পুনর্জন্ম পাবে।

আজকের শিক্ষক দিবস তাই ফুল ও বক্তৃতার নয়, বিবেকের পুনর্জাগরণের দিন হওয়া উচিত। এই দিনে অঙ্গীকার হওয়া উচিত—শিক্ষাকে মুক্ত করব রাজনীতি, বাণিজ্য ও তোষণ থেকে। শিক্ষককে ফিরিয়ে দেব তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা—যিনি কেবল পাঠদানকারী নন, বরং সত্যের অনুসন্ধানী, সমাজবোধের নির্মাতা। শিক্ষা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রতিরোধ করতে শেখায়। শিক্ষক দিবসের আসল উদযাপন সেখানেই—যেখানে শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে নতুন চিন্তার গবেষণাগার, আর শিক্ষক হয়ে ওঠেন আলোর অনমনীয় প্রহরী।

❑ সাম্য রাইয়ান 

বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক কল্পচিত্র থেকে ফেব্রুয়ারি মাসকে বাদ দিয়ে দেখা যায় না। ফেব্রুয়ারির ভোর মানে শহীদ মিনারের পাদদেশে হাজারো কণ্ঠে গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’। ফেব্রুয়ারির বাতাসে আজও শোনা যায় রক্তঝরা পদধ্বনি, ফুলে ভরে ওঠে মিনার, শহীদের স্মৃতি মিলেমিশে যায় বর্তমানের শীতল সকাল আর উত্তাল বিকেলের সাথে। ফেব্রুয়ারি মানে প্রতীকী পুনর্জন্ম—এটি ভাষার, সংস্কৃতির, চেতনার মাস। এই ফেব্রুয়ারির বুকেই জন্ম নিয়েছিল অমর একুশে বইমেলা, যেটি আজ কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, হয়ে উঠেছে জাতির আত্মপরিচয়ের অন্যতম দ্যোতক।

কিন্তু বাংলা একাডেমি হঠাৎ ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালের বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসে নয়, শুরু হবে ২০২৫-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এবং শেষ হবে ২০২৬-এর জানুয়ারিতে। সরকারি যুক্তি—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রমজান মাস। শুনতে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণের এক কুৎসিত ছায়া।

প্রথমে নির্বাচন প্রসঙ্গ। ইতিহাস সাক্ষী, তিনবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হয়েছে—১৯৭৯, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে। অথচ বইমেলার সময় পাল্টাতে হয়নি। নির্বাচনের দিন ছুটি হওয়ায় অনেকেই ভোট দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বইমেলায় গিয়েছেন, ভিড় বরং বেড়েছে। তাহলে কেন এইবার হঠাৎ ভোটের অজুহাত? নির্বাচনের কারণে বইমেলায় ভিড় কমে যাবে—এমন ধারণা বাস্তব অভিজ্ঞতায় ভিত্তিহীন। আসলে এই সিদ্ধান্তের আড়ালে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অযৌক্তিক কর্তৃত্ব এবং মৌলবাদের চাপ, যা ধীরে ধীরে বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনকে গ্রাস করছে। মনে হয় যেন বইমেলাকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের অধীনস্থ করার এক মানসিকতা কাজ করছে—যেখানে সংস্কৃতি আর ইতিহাসের স্বাধীনতা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। 

বাংলা একাডেমি দ্বিতীয় যে অজুহাত দিয়েছে, তা হলো রমজান মাস। বলা হচ্ছে, রোজার মাসে বইমেলা চলতে পারে না। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, এটা একধরনের আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছু নয়। সন্ধ্যার পর ইফতার শেষে মেলায় ভিড় বাড়তে পারত, মানুষ পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত, ইফতারের পর বইমেলার পরিবেশ ভিন্ন মাত্রা পেত। অথচ এই সম্ভাবনাকে আঁকড়ে না ধরে বাংলা একাডেমি মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রমাণিত, মেলায় অস্থায়ী মসজিদ থাকে, নামাজের ব্যবস্থাও থাকে। তাহলে কেন এই ভীতসন্ত্রস্ত মনোভাব? স্পষ্টতই মৌলবাদের প্রতি একরকম তুষ্টির নীতি কাজ করছে। এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; একপ্রকার সাংস্কৃতিক পরাজয়ও।

একটু ফিরে দেখা যাক। ষাটের দশকে চট্টগ্রামে ছোট আকারে বইয়ের মেলা হতো, ঢাকায় বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে লেখক ও পাঠকের মিলনমেলা তৈরি হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাঙলাদেশে বইমেলা প্রকৃত রূপ নেয়। ১৯৭২ সালের পর থেকে এটি ধীরে ধীরে একুশের মাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। আশির দশকে বইমেলা শুধু বই বিক্রির জায়গা থাকেনি, হয়ে উঠেছে মত প্রকাশের ক্ষেত্র, রাজনৈতিক প্রতিরোধের জায়গা। সেনাশাসনের বিরুদ্ধে লেখক-পাঠক-শিল্পীরা বইমেলাকে ব্যবহার করেছেন প্রতীকী প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে। স্বাধীনতার পর বইমেলা হয়ে উঠেছে শহীদ মিনারের এক সম্প্রসারণ—যেখানে বই মানে প্রতিরোধ, বই মানে স্বাধীন চিন্তা। ফেব্রুয়ারির মাটিতে দাঁড়িয়ে বইমেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহীদদের রক্তে লেখা এই ভাষার উত্তরাধিকার বইয়ের ভেতরেই জীবন্ত।

ফেব্রুয়ারি মাসের সাথে বইমেলার প্রতীকী সম্পর্কের প্রশ্ন এখানে মুখ্য। তাহলে বইমেলাকে ফেব্রুয়ারি থেকে সরিয়ে নিলে কী হারাব আমরা? একুশের শহীদ স্মৃতির আবহে বইমেলার অর্থ দাঁড়ায় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। একে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সরিয়ে নিলে তা হয়তো প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভালো হবে, কিন্তু সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এটি হবে আত্মবিরোধী, আমরা হারাব সেই প্রতীকী সংযোগ, হারাব শহীদদের সাথে সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। বইমেলা হয়ে উঠবে শুধু কাগজ আর কালি বিক্রির বাজার। অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি তারিখ নয়, এটি ইতিহাস, এটি প্রতীক, এটি সংগ্রামের উত্তরাধিকার। ফেব্রুয়ারি না থাকলে বইমেলার বুক থেকে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ভয়াবহ—প্রজন্মের পর প্রজন্ম বইমেলাকে কেবল বাণিজ্যিক মেলা ভেবে বড় হবে, তারা আর জানবে না যে ফেব্রুয়ারি মানেই মাতৃভাষার আন্দোলন, শহীদ মিনার, আর বইমেলা একসাথে মিলে এক চেতনার নাম।

আজ যে বাঙলাদেশে মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তার প্রভাব পড়ছে সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর। বাংলা একাডেমি ও বইমেলাও এর বাইরে নয়। একসময় একাডেমি ছিল মুক্তচিন্তার প্রতীক, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা জায়গা। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনিক অজুহাতের আড়ালে মৌলবাদের তুষ্টিতে লিপ্ত। এটা কি কেবল কাকতালীয়? না, এর পেছনে একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা কাজ করছে—যেখানে মৌলবাদীরা চায় সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হোক, মানুষ বই থেকে দূরে সরে যাক, মুক্তচিন্তার জায়গা ধ্বংস হোক। তারা সবসময় চেয়েছে মানুষকে বই থেকে বিচ্ছিন্ন করতে, জ্ঞান ও সাহিত্য থেকে সরিয়ে নিতে। কারণ, বই মানুষের চিন্তাশক্তি জাগায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখায়। মৌলবাদ কখনোই প্রশ্ন পছন্দ করে না; তারা চায় অন্ধ অনুসরণ, চায় চিন্তার বদলে আনুগত্য। তাই বইমেলা দুর্বল করা তাদের পক্ষে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। যদি মানুষ বইমেলা থেকে দূরে সরে যায়, যদি ফেব্রুয়ারির প্রতীকময় সম্পর্ক ভেঙে যায়, তবে মৌলবাদের জয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাদের জন্য এটি সাংস্কৃতিক পরিসর খালি করার এক সুযোগ। বাংলা একাডেমির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে এটি স্পষ্ট যে, মৌলবাদের প্রতি তুষ্টির নীতিই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, বইমেলা অন্য মাসে হলেও কী আসে যায়? বই তো থাকবেই, পাঠক চাইলে আসবেন। কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রতীকী অর্থকে অবহেলা করলে তার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি অগাধ। একুশে ফেব্রুয়ারির আবহের সাথে বইমেলার এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আছে। ফেব্রুয়ারি আমাদের ইতিহাসে শোক, সংগ্রাম ও গৌরবের মাস। এই মাসেই বইমেলা মানুষকে বইয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের সাথে যুক্ত করে, শহীদদের স্মৃতির সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই যোগসূত্র ভেঙে গেলে বইমেলা হয়ে উঠবে কেবল একটি ব্যবসায়িক মেলা, ইতিহাসবিচ্ছিন্ন, আত্মাহীন।

দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কী হতে পারে? প্রথমত, সাংস্কৃতিক চেতনার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাবে। বইমেলা আর একুশের প্রতীক হয়ে থাকবে না। দ্বিতীয়ত, পাঠকপ্রজন্ম বইয়ের সাথে ইতিহাসের যোগসূত্র হারাবে। তৃতীয়ত, মৌলবাদীরা সাংস্কৃতিক পরিসর খালি করার সুযোগ পাবে। চতুর্থত, বাংলা একাডেমি তার ঐতিহাসিক ভূমিকা হারিয়ে কেবল একটি প্রশাসনিক অফিসে পরিণত হবে।

বইমেলার শক্তি সবসময় ছিল পাঠক ও লেখক। কিন্তু এবার লেখক-পাঠক-প্রকাশক, দৃশ্যত সকলের মতকে অগ্রাহ্য করে বইমেলার তারিখ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে এই সাংস্কৃতিক শক্তিকে দুর্বল করার অর্থ হলো দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা। বইমেলা ফেব্রুয়ারি ছাড়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধীরে ধীরে ভুলে যাবে কেন বইমেলা একুশের সাথে যুক্ত ছিল। তাদের কাছে বই হবে কেবল ব্যবসা, আর মেলা হবে কেবল উৎসব—এর ভেতরে আর থাকবে না সংগ্রামের উত্তরাধিকার। এটি শুধু ক্ষতি নয়, এটি সাংস্কৃতিক বিপর্যয়।

বাঙলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস প্রমাণ করে, মৌলবাদকে তুষ্টি করে টিকে থাকা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্রের লড়াই—সবকিছুতে মৌলবাদ ছিল প্রতিপক্ষ। আজ আবার সেই প্রতিপক্ষ সাংস্কৃতিক মঞ্চে প্রবেশ করেছে, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। বাংলা একাডেমি যদি সত্যিই বইমেলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চায়, তবে তার দরকার হবে মৌলবাদের ভয়ে না থেকে বই প্রকাশনা ও বিপণনকে সুশৃঙ্খল করা, লেখক-পাঠকের পারস্পরিক বিনিময়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা, সাহিত্যচর্চাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা। প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাত দেখিয়ে বইমেলার সময় সরিয়ে দেওয়া সমাধান নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, প্রতিষ্ঠানটি তার সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধের চেয়ে প্রশাসনিক সুবিধাবাদিতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এটি সেই আত্মবিরোধী সিদ্ধান্ত, যা কেবল প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নয়, মৌলবাদের জন্য পথ প্রশস্ত করার জন্যও নেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল—বাঙলাদেশ কি সত্যিই এই পথে যাবে? ফেব্রুয়ারির বইমেলা হারানো মানে শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হারানো নয়; এর অর্থ জাতির আত্মপরিচয়ের টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া। শহীদ মিনারের ফুল শুকিয়ে গেলে যেমন আমাদের বুক খালি লাগে, ফেব্রুয়ারি ছাড়া বইমেলা হলে তেমনই আত্মা খালি হয়ে যাবে।

অতএব এখনো সময় আছে—বাংলা একাডেমি চাইলে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বইমেলার মূল শক্তি পাঠক ও লেখক; তাঁদের ইচ্ছা ও অংশগ্রহণকেই সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফেব্রুয়ারি ছাড়া একুশে বইমেলা কল্পনা করা যায় না। এটি কেবল অগ্রহণযোগ্য নয়, সাংস্কৃতিকভাবে আত্মঘাতীও।

ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে শুধু একটি মাস নয়; এটি প্রতিরোধ, ভাষা, আত্মত্যাগ ও সৃষ্টির প্রতীক। একুশে বইমেলা সেই প্রতীকেরই সাংস্কৃতিক রূপায়ণ। ফেব্রুয়ারি ছাড়া বইমেলা মানে আত্মপরিচয়ের বিপর্যয়, ইতিহাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, এবং মৌলবাদের হাতে সাংস্কৃতিক পরাজয়।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত৷

❑ সাম্য রাইয়ান

খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় অষ্টম শ্রেণির এক আদিবাসী কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দমননীতি, নৃশংসতা ও ন্যায়বিচারের অভাবের আরেকটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই ঘটনার ভয়াবহতাকে ছাপিয়ে গেছে যে বিষয়টি—তা হলো, ধর্ষণের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের উপর সেনাবাহিনী ও সেটলার বাঙালিদের যৌথ হামলা। তাহলে বিষয়টি দাঁড়াল এই যে—ধর্ষণ নয়, বরং ধর্ষণ-বিরোধী প্রতিবাদই আজ রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ। এই ঘটনা শুধু একটি কিশোরীর প্রতি বর্বরতা নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার মৃত্যু।

বাঙলাদেশের সংবিধান বলে, সবাই সমান অধিকারভোগী। কিন্তু পাহাড়ে গিয়ে সেই বাক্যটি এক নির্মম ঠাট্টায় পরিণত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী যখন ধর্ষিত হন, তখন তিনি শুধু এক ব্যক্তি হিসেবে নয়—একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রতীক হিসেবে অপমানিত হন। তার শরীরে যে নির্যাতন চালানো হয়, তা মূলত রাষ্ট্রের দখলদারিত্বের ভাষায় প্রকাশিত সহিংসতা। এই ধর্ষণগুলো কেবল যৌন অপরাধ নয়, এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকাশ। পাহাড়ে নারীদেহ দীর্ঘদিন ধরে কি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে—যেখানে অস্ত্রের জায়গায় ব্যবহৃত হয় ক্ষমতার দম্ভ, প্রশাসনের পক্ষপাত, এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তাহীনতা?

পাহাড়ে ধর্ষণ নতুন নয়। কিন্তু বিচার? নেই। কেউ শাস্তি পায় না। বরং দেখা যায়, প্রশাসন ঘটনাকে আড়াল করতে উঠে পড়ে লাগে, গণমাধ্যমে খবর চাপা পড়ে যায়, তদন্তে বিলম্ব হয়, আর শেষে ‘অপরাধী অজ্ঞাত’—এই বাক্যে সবকিছু মিশে যায়। এই ‘অজ্ঞাত’ আসলে কারা? তারা কি পাহাড়ের আড়ালে বসবাসরত কোনো প্রেতাত্মা? না, তারা খুবই চেনা মানুষ—রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় বেঁচে থাকা, অপরাধে অভ্যস্ত, দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতিতে গা ভাসানো এক শ্রেণি।

এই দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি আমাদের রাষ্ট্রীয় চেতনারই অংশ হয়ে গেছে। ধর্ষণ যেন আর অপরাধ নয়, বরং প্রশাসনিক রুটিনের একটি অংশ। পাহাড়ে ধর্ষণ ঘটে—অভিযোগ ওঠে—প্রতিবাদ হয়—হামলা হয়—তারপর রাষ্ট্র চুপ থাকে। এই চক্রটি এক ভয়ঙ্কর নৈরাশ্য তৈরি করেছে, যেখানে পাহাড়ি মানুষ ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলেছে।

২৩ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর খাগড়াছড়ির রাস্তায় যেভাবে শিক্ষার্থীরা, সাধারণ মানুষ, স্থানীয় সংগঠন প্রতিবাদে নেমেছিল—সেটা ছিল পাহাড়ের ইতিহাসে এক সাহসী মুহূর্ত। কিন্তু সেই প্রতিবাদের উপর হামলা চালিয়েছে সেনাবাহিনী ও সেটলাররা। এই আক্রমণ শুধু একটি জনসমাবেশ ভাঙেনি, এটি পাহাড়ের মানুষের হৃদয়ে নতুন করে গেঁথে দিয়েছে সেই পুরনো ভয়—‘পাহাড়ে ন্যায়বিচারের কথা বলা যাবে না।’

পাহাড়ে সেনাবাহিনী থাকার উদ্দেশ্য কী? সেনাশাসন কি পাহাড়ের শান্তির নিশ্চয়তা দিয়েছে, না কি তা বরং পাহাড়কে এক স্থায়ী কারাগারে পরিণত করেছে? পার্বত্য শান্তি চুক্তির পরও কেন এখনো পাহাড়ে এত সেনাক্যাম্প, এত টহল, এত নজরদারি? পাহাড়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান এখন শান্তির নয়, একধরনের উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। তারা সেখানে পাহাড়িদের রক্ষা করতে নয়, বরং পাহাড়কে নজরবন্দি রেখেছে।

এই উপনিবেশিক মনোভাবই পাহাড়ের প্রতিটি ধর্ষণের পেছনে কাজ করে। ধর্ষণকে আমরা বারবার দেখি একক অপরাধ হিসেবে, কিন্তু পাহাড়ের ধর্ষণগুলো আসলে রাজনৈতিক অপরাধ। এগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দখলনীতি, বৈষম্য, সামরিকীকরণ, এবং বাঙালি সেটলারদের স্থায়ী প্রভাব। পাহাড়ে যখন কোনো কিশোরী ধর্ষিত হয়, তখন তার চিৎকার কেবল তার নয়, একটি গোটা জাতিগোষ্ঠীর আর্তনাদ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাষ্ট্র তা শোনে না। প্রশাসন তখন ব্যস্ত থাকে “আইনি প্রক্রিয়া চলছে” এই মুখস্থ কথায়।

যেন একটি স্বাধীন বাঙলাদেশের ভেতরে আরেকটি পরাধীন বাঙলাদেশ।

এই বিচ্ছিন্নতা, এই উদাসীনতাই পাহাড়ে অন্যায়কে স্থায়ী করে তুলেছে। রাষ্ট্রের নিরবতা আজ ধর্ষণের অন্যতম সহায়। প্রশাসন যখন কোনো অপরাধীকে রক্ষা করে, যখন কোনো ধর্ষণ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন রাষ্ট্র আসলে নিজেই ধর্ষকের পক্ষে দাঁড়ায়। 

ধর্ষণের বিচারহীনতা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা। ধর্ষণ পাহাড়ে এক ধরনের সামাজিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি ভীতির জন্ম দেয়, প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে, এবং আদিবাসী নারীর দেহকে রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের ভাষায় পরিণত করে।

একটি কিশোরীর শরীরের উপর দিয়ে চলে যায় জাতিগত নিপীড়নের ইতিহাস—তার আর্তনাদে মিশে থাকে শতাব্দীর অন্যায়।

পাহাড়ে যে মেয়েটি ধর্ষিত হলো, সে হয়তো এখন হাসপাতালে শুয়ে আছে—শরীরে অসহ্য ব্যথা, চোখ আতঙ্কে নীরব। তার নীরবতা বাধ্যতামূলক, কারণ এই সমাজে ধর্ষিত নারী এখনো লজ্জার প্রতীক, আর ধর্ষক ক্ষমতার প্রতীক।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই পাহাড়ের প্রতি দায়বদ্ধ হতো, তাহলে এই ঘটনাটি আজ জাতির আলোচনার কেন্দ্রে থাকত। কিন্তু রাষ্ট্র নীরব। উপদেষ্টাদের মুখে আলোচনা নেই, সরকারি পার্টি ও নেতাদের কণ্ঠে প্রতিবাদ নেই, গণমাধ্যমের বেশিরভাগই চুপ। এই নীরবতাই প্রমাণ করে—ধর্ষণের সংস্কৃতি এখন রাষ্ট্রেরই অংশ।

পাহাড় থেকে সেনাশাসন প্রত্যাহার না করলে, পার্বত্য চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না করলে, পাহাড়ে ন্যায়বিচার কখনো সম্ভব নয়। পাহাড়ের মানুষের অধিকার মানে কেবল জমির অধিকার নয়—এটি জীবন, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।

আমরা দাবি জানাই—
১. খাগড়াছড়ির ধর্ষণে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২. ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে হামলাকারী সেনাসদস্য ও সেটলারদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৩. আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. পাহাড়ে সেনাশাসন প্রত্যাহার ও পার্বত্য শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. পাহাড়ে সংঘটিত সকল ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীও জবাবদিহির আওতায় আসে।

একটি রাষ্ট্র তখনই সভ্য হয়, যখন সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা আজ এমন এক রাষ্ট্রে বাস করছি, যেখানে দুর্বলকে চেপে ধরা হয়, প্রতিবাদীকে দমন করা হয়, আর অপরাধীকে রক্ষা করা হয়।

পাহাড়ের কিশোরীর চোখে আজ পুরো বাঙলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তার অশ্রুতে ধুয়ে যাচ্ছে আমাদের সভ্যতার মুখ। আমরা যারা সমতলে বসে নীরব থাকছি, আমরা এই অপরাধের অংশ। কারণ নীরবতা মানে সম্মতি।

খাগড়াছড়ির সেই মেয়েটি আজ শুধু পাহাড়ের নয়, সে বাঙলাদেশের বিবেকের কন্যা। তার আর্তনাদ আমাদের সকলের ঘুম ভাঙিয়ে দিক—যাতে একদিন এই রাষ্ট্র তার কন্যাদের রক্ষা করতে শেখে, পাহাড়ে আবার শান্তি নামে, আর ধর্ষণ আর কখনো কোনো জাতির রাজনীতি না হয়।

রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিতে চাই—
একটি কিশোরীর কান্না পাহাড়ে পড়ে থাকে না,
তা প্রতিধ্বনি হয়ে একদিন সমতলেও আঘাত হানে।
যে রাষ্ট্র তার কন্যাদের রক্ষা করতে পারে না,
সে রাষ্ট্রের পতাকা যতই দিকে দিকে উড়ুক না কেন—তার নীচে কেবল লজ্জা, রক্ত আর ধর্ষণের গন্ধ।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান

ষাটের দশকের ঝঞ্ঝার মধ্যে জন্ম নেওয়া হাংরি আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি সুবিমল বসাক৷ কিন্তু তিনি কেবলমাত্র আন্দোলনের সীমায় আটকে না থেকে নিজের ভাষা ও ভঙ্গিমায় তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র পরিচয়। বাঙলা কবিতার শরীরে তিনি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকাইয়া বুলির হালকা অথচ ঝলমলে মিশ্রণ, যা পাঠকের কানে হাসির মতো বাজে আবার বিদ্রূপের মতো খোঁচাও দেয়। এমনকি তাঁর গদ্যেও ছিল একই ঢঙ—ডানপিটে, তীক্ষ্ণ অথচ প্রাণবন্ত, যেন একেবারে রাস্তাঘাট থেকে উঠে আসা ভাষা।

কিন্তু শুধু কবি বললে সুবিমল বসাককে সীমাবদ্ধ করা হয়। তিনি ছিলেন চিত্রকরও, রেখার টানে যার হাত ছিল অসামান্য। তাঁর আঁকায় যে মায়া ফুটত, সেটি যেমন আলাদা, তেমনি তাঁর সাহিত্যচর্চা ছিল বহুমুখী। সতীনাথ ভাদুড়ীর ভাবশিষ্য ফণীশ্বরনাথ রেণুর সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল, আর রেণুর ‘ময়লা আঁচল’ উপন্যাসের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন তিনি। অনেকেই জানেন না, সতীনাথ সমগ্র সম্পাদনার কাজেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। অর্থাৎ তিনি কেবল নিজের সৃষ্টির ভিতর দিয়ে নয়, অন্যের সৃষ্টিকেও নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ছিলেন।

হাংরি আন্দোলনের প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান ছিল কিছুটা আলাদা। অন্যরা যেখানে রাগ আর প্রতিরোধের তীব্রতায় মগ্ন, সেখানে তাঁর কবিতায় পাওয়া যেত খুনসুটি, রসিকতা, হালকা হাসি, আবার একইসঙ্গে জীবনযন্ত্রণার অদ্ভুত টান। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বিদ্রোহ হাসতেও পারে, আঞ্চলিক বুলিকে কাব্যের উচ্চভাষায় বসিয়েও জেগে থাকতে পারে। ‘হাবিজাবি’ কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায় এই ভঙ্গি ছড়িয়ে আছে। আমরা যারা পূর্ববঙ্গীয়, তাঁদের কাছে ঢাকাইয়া ভাষার টান এক অন্য আনন্দের উৎস ছিল, সুবিমল বসাক সেটিকে কবিতায় এনে এক নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিলেন।

আমার কাছে সুবিমল বসাকের সবচেয়ে বড় অবদান হলো কবিতার উপাদানকে বিস্তৃত করার দুঃসাহস। আমরা আগে ভাবতাম কবিতা মানেই কাব্যিকতা, সুন্দর শব্দ, অলঙ্কার, সুশ্রী আবহ। কিন্তু সুবিমল বসাক দেখিয়ে দিলেন, কবিতা আসতে পারে টঙের দোকান থেকে, ফাটা চপ্পলের শব্দ থেকেও, এমনকি কথার মধ্যে ছুঁচ-সুতো, পেরেক-ইস্ক্রুও কবিতার শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। হাংরিদের পুরো আন্দোলনের ভেতরই এই বদল ঘটেছিল, কিন্তু সুবিমল সেই বদলকে এমনভাবে জীবন্ত করে তুলেছিলেন যে তা হয়ে উঠেছিল মজা, খেলা আর প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে এক নতুন ছন্দ।

তাঁর প্রয়াণ আমাদের মনে এক শূন্যতা রেখে গেছে। কিন্তু শূন্যতা মানেই নিস্তব্ধতা নয়। তাঁর ভাষা, তাঁর ঢাকাইয়া মেজাজ, তাঁর আঁকা রেখার খেলা, সবকিছুই আমাদের ভেতর বেঁচে আছে। যখনই আমরা ভাবি কবিতা মানেই কিছু আলাদা, কিছু উচ্চাঙ্গ, তখনই সুবিমল বসাক ফিরে আসেন মনে করিয়ে দিতে—কবিতা মানে জীবন, কবিতা মানে প্রতিদিনের ভাষাকে নতুন চোখে দেখা। কাব্যিকতা উবে গেলে ভয় নেই, কারণ কবিতা আসবে নতুন চেহারায়, ভাঙাচোরা বাস্তব থেকে, মানুষের কথোপকথন থেকে।

কবিতা আসলে আমাদের বেঁচে থাকারই এক অদম্য ঘোষণা।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *